অবনী বাড়ি আছো
...................
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছ
যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো?
....................
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।
এতো কালো মেখেছি দু হাতে
এতোকাল ধরে!
কখনো তোমার ক’রে, তোমাকে ভাবিনি।
এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়
যেতে পারি
যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?
সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো
যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
একাকী যাবো না অসময়ে।।
আমি যাই
......
যেখানেই থাকো
এপথে আসতেই হবে
ছাড়ান্ নেই
সম্বল বলতে সেই
দিন কয়েকের গল্প
অল্প অল্পই
আমি যাই
তোমরা পরে এসো
ঘড়ি-ঘন্টা মিলিয়ে
শাক-সবজি বিলিয়ে
তোমরা এসো
কিছু মায়া রয়ে গেলো
..................
সকল প্রতাপ হল প্রায় অবসিত…
জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে
কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের,
শুধু এই –
কোনোভাবে বেঁচে থেকে প্রণাম জানানো
পৃথিবীকে।
মূঢ়তার অপনোদনের শান্তি,
শুধু এই –
ঘৃনা নেই, নেই তঞ্চকতা,
জীবনজাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু।
এক অসুখে দুজন অন্ধ
................
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ
দীর্ঘ দাঁতের করাত ও ঢেউ নীল দিগন্ত সমান করে
বালিতে আধ-কোমর বন্ধ
এই আনন্দময় কবরে
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ |
হাত দুখানি জড়ায় গলা, সাঁড়াশি সেই সোনার অধিক
উজ্জ্বলতায় প্রখর কিন্তু উষ্ণ এবং রোমাঞ্চকর
আলিঙ্গনের মধেযে আমার হৃদয় কি পায় পুচ্ছে শিকড়
আঁকড়ে ধরে মাটির মতন চিবুক থেকে নখ অবধি ?
সঙ্গে আছেই
রুপোর গুঁড়ো, উড়ন্ত নুন, হল্লা হাওয়ার মধ্যে, কাছে
সঙ্গে আছে
হয়নি পাগল
এই বাতাসে পাল্লা আগল
বন্ধ ক’রে
সঙ্গে আছে …
এক অসুখে দুজন অন্ধ !
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ ।
আতাচোরা
.........
আতাচোরা পাখিরে
কোন তুলিতে আঁকি রে
হলুদ ?
বাঁশ বাগানে যইনে
ফুল তুলিতে পাইনে
কলুদ
হলুদ বনের কলুদ ফুল
বটের শিরা জবার মূল
পাইতে
দুধের পাহাড় কুলের বন
পেরিয়ে গিরি গোবর্ধন
নাইতে
ঝুমরি তিলাইয়ার কাছে
যে নদিটি থমকে আছে
তাইতে
আতাচোরা পাখিরে
কোন তুলিতে আঁকি রে
—হলুদ ?
একবার তুমি
..........
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা কর –
দেখবে, নদির ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে
পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল
একবার তুমি ভাল বাসতে চেষ্টা কর |
বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল - ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়
সমস্ত পায়ে-হাঁটা পথই যখন পিচ্ছিল, তখন ওই পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে
যেন কবিতার নগ্ন ব্যবহার, যেন ঢেউ, যেন কুমোরটুলির সলমা-চুমকি-জরি-মাখা প্রতিমা
বহুদূর হেমন্তের পাঁশুটেনক্ষত্রের দরোজা পর্যন্ত দেখে আসতে পারি |
বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল
চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই - পাথরের ফাঁক-ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল -
অনেক সময় তো ঘর গড়তেও মন চায় |
মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে
আমাদের সবই দরকার | আমরা ঘরবাড়ি গড়বো - সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো |
রূপোলি মাছ পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে
একবার তুমি ভালবাসতে চেষ্টা করো |
এবার হয়েছে সন্ধ্যা
.............
এবার হয়েছে সন্ধ্যা। সারাদিন ভেঙেছো পাথর
পাহাড়ের কোলে
আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে
তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি
অন্যায় হবে না - নাও ছুটি
বিদেশেই চলো
যে কথা বলনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।
শ্রাবনের মেঘ কি মন্থর!
তোমার সর্বাঙ্গ জুড়ে জ্বর
ছলোছলো
যে কথা বলনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।
এবার হয়েছে সন্ধ্যা, দিনের ব্যস্ততা গেছে চুকে
নির্বাক মাথাটি পাতি, এলায়ে পড়িব তব বুকে
কিশলয়, সবুজ পারুল
পৃথিবীতে ঘটনার ভুল
চিরদিন হবে
এবার সন্ধ্যায় তাকে শুদ্ধ করে নেওয়া কি সম্ভবে?
তুমি ভালোবেসেছিলে সব
বিরহে বিখ্যাত অনুভব
তিলপরিমাণ
স্মৃতির গুঞ্জন - নাকি গান
আমার সর্বাঙ্গ করে ভর?
সারাদিন ভেঙ্গেছো পাথর
পাহাড়ের কোলে
আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে
তবু নও ব্যথায় রাতুল
আমার সর্বাংশে হলো ভুল
একে একে শ্রান্তিতে পড়েছি নুয়ে। সকলে বিদ্রূপভরে দ্যাখে।
চাবি
.....
আমার কাছে এখনো পড়ে আছে
তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি
কেমন করে তোরংগ আজ খোলো?
থুতনিপরে তিল তো তোমার আছে
এখন? ও মন নতুন দেশে যাবি?
চিঠি তোমায় হঠাত্ লিখতে হলো ।
চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে
রেখেছিলাম, আজই সময় হলো -
লিখিও, উহা ফিরত্ চাহো কিনা?
অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো
লিখিও, উহা ফিরত্ চাহো কি না?
দিন যায়
..........
সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে
শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে
অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে
শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায়
আকাশমনির ।
ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্ লা হাওয়া নয়
ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি
চন্দ্রমল্লিকার ।
জয়দেবের মেলা থেকে গান ভেসে আসে
সঙ্গে ওড়ে ধুলোবালি, পায়ের নূপুর
সুখের চট্ কা ভাঙে গৈরিক আবাসে
দিন যায় রে বিষাদে, ষাদে, মিছে দিন যায় …
পাবো প্রেম কান পেতে রেখে
..................
বড় দীর্ঘতম বৃক্ষে ব’সে আছো, দেবতা আমার |
শিকড়ে, বিহ্বল প্রান্তে, কান পেতে আছি নিশিদিন
সম্ভ্রমের মূল কোথা এ-মাটির নিথর বিস্তারে ;
সেইখানে শুয়ে আছি মনে পড়ে, তার মনে পড়ে ?
যেখানে শুইয়ে গেলে ধিরে-ধিরে কত দূরে আজ !
স্মারক বাগানখনি গাছ হ’য়ে আমার ভিতরে
শুধু স্বপ্ন দীর্ঘকায়, তার ফুল-পাতা-ফল-শাখা
তোমাদের খোঁডা-বাসা শূন্য ক’রে পলাতক হলো |
আপনারে খুঁজি আর খুঁজি তারে সঞ্চারে আমার
পুরানো স্পর্শের মগ্ন কোথা আছো ? বুঝি ভুলে গেলে |
নীলিমা ঔদাস্তে মনে পড়ে নাকো গোষ্ঠের সংকেত ;
দেবতা সুদূর বৃক্ষে, পাবো প্রেম কান পেতে রেখে |
ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ
...............
ইচ্ছে ছিলো তোমার কাছে ঘুরতে-ঘুরতে যাবোই
আমার পুবের হাওয়া।
কিন্তু এখন যাবার কথায়
কলম খোঁজে অস্ত্র কোথায়
এবং এখন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা কুঞ্জলতায়
রক্তমাখা চাঁদ ঢেকেছে
আকুল চোখ ও মুখের মলিন
আজকে তোমার ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ পুবের হাওয়া।।
মনে মনে বহুদূর চলে গেছি
মনে মনে বহুদূর চলে গেছি - যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয়
জন্মেই হাঁটতে হয়
হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে
একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি
পথ তো একটা নয় –
তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা
নদীর দু - প্রান্তের মূল
একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূণ্য
দুদিকেই কূল, দুদিকেই এপার-ওপার, আসা-যাওয়া, টানাপোরেন –
দুটো জন্মই লাগে
মনে মনে দুটো জন্মই লাগে
(কবির ৩২ তম জন্ম দিনে (২৬/১১/১৯৬৫) লেখা এই কবিতাটি কবিপত্নি শ্রীমতী মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের
সৌজন্যে প্রাপ্ত।)
শিশিরভেজা শুকনো খড়
.................
শিশিরভেজা শুকনো খড় শিকড়বাকড় টানছে
মিছুবাড়ির জনলা দোর ভিতের দিকে টানছে
প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছে
ভাল ছিলুম জীর্ণ দিন আলোর ছিল তৃষ্ণা
শ্বেতবিধুর পাথর কুঁদে গড়েছিলুম কৃষ্ণা
নিরবয়ব মূর্তি তার, নদীর কোলে জলাপাহার …
বনতলের মাটির ঘরে জাতক ধান ভানছে
শুভশাঁখের আওয়াজ মেলে জাতক ধান ভানছে
করুণাময় ঊষার কোলে জাতক ধান ভানছে
অপরিসীম দুঃখসুখ ফিরিয়েছিলো তার মুখ
প্রসারণের উদাসীনতা কোথাও ব’সে কাঁদছে
প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছে
(কবির ৫০ তম জন্ম দিনে (২৬/১১/১৯৮৩) লেখা এই কবিতাটি কবিপত্নি শ্রীমতী মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের
সৌজন্যে প্রাপ্ত।)
স্টেশন ভাসিয়ে বৃষ্টি
..............
মনে পড়ে স্টেশন ভাসিয়ে বৃষ্টি রাজপথ ধ’রে ক্রমাগত
সাইকেল ঘন্টির মতো চলে গেছে, পথিক সাবধান…
শুধু স্বেচ্ছাচারী আমি, হাওয়া আর ভিক্ষুকের ঝুলি
যেতে-যেতে ফিরে চায়, কুড়োতে-কুড়োতে দেয় ফেলে
যেন তুমি, আলস্যে এলে না কাছে, নিছক সুদূর
হয়ে থাকলে নিরাত্মীয় ; কিন্তু কেন? কেন, তা জানো না।
মনে পড়বার জন্য? হবেও বা । স্বাধীনতাপ্রিয়
ব’লে কি আক্ষেপ? কিন্তু বন্দী হয়ে আমি ভালো আছি।
তবু কোনো খর রৌদ্রে, পাটকিলে কাকের চেরা ঠোঁটে
তৃষ্ণার চেহারা দেখে কষ্ট পাই, বুঝে নিতে পারি
জলের অভাবে নয়, কোন টক লালার কান্নায়
তার মর্মছেঁড়া ডাক; কাক যেন তোমারই প্রতীক
রূপে নয়, বরং স্বভাবে - মনে পড়ে, মনে পড়ে যায়
কোথায় বিমূঢ় হয়ে বসে আছো হাঁ-করা তৃষ্ণায়!
কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০০৯
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০০৯
লুবনা চর্যা
ও লেজ কাটা ঘুড়ি,যতো খুশি উড়
......................
কোথায় যে যাই! মাঠভরা লাটিম ঘোরে তোর চোখের জঙ্গলে, আমি চেনাজানা চাঁদ আর কুয়াশর ঘর এখন ইচ্ছে করে ভুলে যাই। যে ঘর অন্ধকার কিন্তু খুব ধোয়া ওঠে, নদী থেকে ফেরার পথে একটু থামি সন্ধ্যার ডানা ভাজ করে।
যে তুই নিষ্ঠুরতায় হার মানাস কোনো শিকারী পাখিকে, অকারণে আমি ফিরে যাই তারই নিষ্পৃহ অনমনীয়তার দিকে। চিরহরিৎ বনে কল্পনার পাতা কুড়াতেও হঠাৎ কান্ত লাগে। ইমেজের সরাসরি প্রাপ্তি ছাড়া সবকিছু স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।
কিংবা যখন মৃত ও জীবন্তের পরিবেশে সমন্বয় করে ফেলি আর নিজেকে নিমজ্জিত হতে দেখি নাবিকের ছুড়ে দেওয়া ভোতা অ্যান্টিকাটারের মতো নীল অতলে, তখনই জিজ্ঞাসার প্রাণবন্ততা হারাই। বহু বহু দূর ছুটে মেঘের দলটা বুঝতে পারে, বাতাসের তারনা ধারণাটাই আদতে উড়–ক্কু....
তাই রৌদ্রচিলের সাথে বেদনাকথা উজাড় করতে যাই না আর গহীন আকাশে। ধীরে ধীরে বিদেহী জীবানুরা আমাকে গ্রাস করছে। তাদের প্রিয়পাত্র হই বৈপরীত্যে, উদ্ভট প্রেম-প্রকরনে।
আভপীড়নের কারণেই বেশিদিন যুদ্ধপ্রবন মৎস গোত্রে অবস্থান করা হলো না। যদিও গীতা এ সম্পর্কে ভার লাঘব করতে পারে অনেকখানি, তবু ওসব ধুনফুন চাতুর্যে আমার পোষায় না।
সমুদ্র আর আকাশের রং যেখানে একই ব্রাশ দিয়ে ঘষা হয়, আমার ইচ্ছামৃত্যু সে দেয়ালের অভ্যন্তরেই নিরাপত্তা পায়। আমি পারফর্ম করি পারলৌকিক আবেগগুচ্ছের।
শুরু ছাড়া শেষ করা যায় না বলে মানুষেরা প্রত্যেকেই ুদে ঐতিহাসিক। তারা সৌন্দর্যসচেতন করার জন্য আমার হাতে একটা আয়না এনে দিয়েছে, বিনিময়ে প্রত্যাশা করেছে কিছু মানবিক পারিশ্রমিক। হয়তো এবার জন্মদিনেও আতœহত্যা করা হবে না !
চূড়ায় চূড়ায় ফুটে থাকা কদম, কৃষ্ণচূড়া, জারুল বা রাধাচড়া আমাকে যে উচ্চতর অনিবার্যতার প্রজ্ঞা দিয়েছে- তা পরাজিত হউক আমি চাই। চলমানতা নৈরাশ্যের ঢেউ দ্যায় বলে আমি নেতিবাচক ভাবনা ভাবি। আমি নেতিবাচক ভাবনা ভাবি বলেই বিয়োগান্তক বৃষ্টির ছড়াছড়ি!
অগ্নিকান্ডে জাহাজ ডুবে গেলে বরপের স্তুপে কালো ছাতার মতো অসংখ্য গম্ভীর ভ্যাম্পায়ার চলে আসে। তারা প্রার্থনা করে তোর আতœা এবং দেহ। অথচ গভীর অস্বীকৃতি জানালে তুই হতে পারবি তো বিপন্নতামুক্ত।
সূর্যঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, রাত ১২ টায় সে আমাকে জন্মদিনের মিউজিক শোনায়। মৃত্যু-তন্ময়তা ভেঙে গেলে শরবনে ছুটি কিছু বাশি তৈরির জন্য। বন্ধুরা এলে সবাইকে একটা করে দেবো। একা থাকার পরিবর্তে সম্মিলিতে মিলে থাকার প্রতীক হচ্ছে বাশি। একাকী নিরবতায় কার সাথে বলো আমি ফাইট করি ? সংস্কার করার আগে বিতর্কের হাওয়াই সেতু পর্যবেণ করা চাই। তাই সেতুতে ওঠার জন্যে স্পোর্টিং কারের ভঙ্গিতে হালকা ও শলাকার আট পা বাড়াই।
(লুবনা চর্যা’র একমাত্র ও প্রথম বই জিওগ্রাফি, ইন অ্যা জ্যু...এর প্রথম কবিতা)
..............................................
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'আবিষ্কার পণ্ডিতদের মতে, আমাদের বাংলাভাষার আদি নিদর্শনের আবিষ্কার। এই চর্যাচর্যবিনিশ্চয়কে আমরা চর্যাপদ বলে চিনি। খুলনার কবি লুবনা চর্যা এই চর্যাপদকে নতুন করে লিখেছেন। মানে পুনর্লিখন। বাংলাভাষার তরুণ কবিদের এই পরীক্ষানীরিক্ষা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক নতুন সংযোজন। এই নীরীক্ষা একদিকে যেমন নতুন করে চর্যাপদকে আমাদের কাছে তুলে ধরে, তেমনি অন্যদিকে তরুণ কবিদের বিশাল মানসিক বৈচিত্রের খোঁজ নিতেও আমাদের সাহায্য করে।
ভাল লাগবে পড়লে।
একনজরে
চর্যাচর্যবিনিশ্চয়
পুনর্লিখন : লুবনা চর্যা
প্রকাশ : জানুয়ারী ২০০৭
পাঠকদের জন্য একটি চর্যা তুলে দিলাম।
পদ - ২
........
কাছিমের দুধে, কী ভয়ঙ্কর, উপচে
পড়ে ভাঁড়! শোন, তোমার দেহবৃক্ষের
তেতুঁলই যোগ্য খাবার কুমীরটার।
ঘরের মধ্যে চাইলেই আঙ্গিনা আছে,
অবধূতি রে! তথা গভীর মৌন রাতে
কানের ঝুমকো নিয়ে গেলো এক চোরে।
বুড়ো শ্বশুর ঘুমায়, কিন্তু বউয়ের
যে ঘুম নেই। সহজে চোরটা পেয়েছে
যা, চোরেই নিক তা, তাতে বউয়ের কী!
দিনের আলোতে যে কূলবধূ সামান্য
কাকের ভয়ে কাঁপে, রাতে সে ই একাকী
অভয়চিত্তে হাঁটে কামরূপের জন্য!
এমন কাব্য কুক্কুরী পা গাইলো-দেখি,
কোটিতে একজন বুঝলো এই শূন্য।
ক্ক্কুরী পা
......................
কোথায় যে যাই! মাঠভরা লাটিম ঘোরে তোর চোখের জঙ্গলে, আমি চেনাজানা চাঁদ আর কুয়াশর ঘর এখন ইচ্ছে করে ভুলে যাই। যে ঘর অন্ধকার কিন্তু খুব ধোয়া ওঠে, নদী থেকে ফেরার পথে একটু থামি সন্ধ্যার ডানা ভাজ করে।
যে তুই নিষ্ঠুরতায় হার মানাস কোনো শিকারী পাখিকে, অকারণে আমি ফিরে যাই তারই নিষ্পৃহ অনমনীয়তার দিকে। চিরহরিৎ বনে কল্পনার পাতা কুড়াতেও হঠাৎ কান্ত লাগে। ইমেজের সরাসরি প্রাপ্তি ছাড়া সবকিছু স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।
কিংবা যখন মৃত ও জীবন্তের পরিবেশে সমন্বয় করে ফেলি আর নিজেকে নিমজ্জিত হতে দেখি নাবিকের ছুড়ে দেওয়া ভোতা অ্যান্টিকাটারের মতো নীল অতলে, তখনই জিজ্ঞাসার প্রাণবন্ততা হারাই। বহু বহু দূর ছুটে মেঘের দলটা বুঝতে পারে, বাতাসের তারনা ধারণাটাই আদতে উড়–ক্কু....
তাই রৌদ্রচিলের সাথে বেদনাকথা উজাড় করতে যাই না আর গহীন আকাশে। ধীরে ধীরে বিদেহী জীবানুরা আমাকে গ্রাস করছে। তাদের প্রিয়পাত্র হই বৈপরীত্যে, উদ্ভট প্রেম-প্রকরনে।
আভপীড়নের কারণেই বেশিদিন যুদ্ধপ্রবন মৎস গোত্রে অবস্থান করা হলো না। যদিও গীতা এ সম্পর্কে ভার লাঘব করতে পারে অনেকখানি, তবু ওসব ধুনফুন চাতুর্যে আমার পোষায় না।
সমুদ্র আর আকাশের রং যেখানে একই ব্রাশ দিয়ে ঘষা হয়, আমার ইচ্ছামৃত্যু সে দেয়ালের অভ্যন্তরেই নিরাপত্তা পায়। আমি পারফর্ম করি পারলৌকিক আবেগগুচ্ছের।
শুরু ছাড়া শেষ করা যায় না বলে মানুষেরা প্রত্যেকেই ুদে ঐতিহাসিক। তারা সৌন্দর্যসচেতন করার জন্য আমার হাতে একটা আয়না এনে দিয়েছে, বিনিময়ে প্রত্যাশা করেছে কিছু মানবিক পারিশ্রমিক। হয়তো এবার জন্মদিনেও আতœহত্যা করা হবে না !
চূড়ায় চূড়ায় ফুটে থাকা কদম, কৃষ্ণচূড়া, জারুল বা রাধাচড়া আমাকে যে উচ্চতর অনিবার্যতার প্রজ্ঞা দিয়েছে- তা পরাজিত হউক আমি চাই। চলমানতা নৈরাশ্যের ঢেউ দ্যায় বলে আমি নেতিবাচক ভাবনা ভাবি। আমি নেতিবাচক ভাবনা ভাবি বলেই বিয়োগান্তক বৃষ্টির ছড়াছড়ি!
অগ্নিকান্ডে জাহাজ ডুবে গেলে বরপের স্তুপে কালো ছাতার মতো অসংখ্য গম্ভীর ভ্যাম্পায়ার চলে আসে। তারা প্রার্থনা করে তোর আতœা এবং দেহ। অথচ গভীর অস্বীকৃতি জানালে তুই হতে পারবি তো বিপন্নতামুক্ত।
সূর্যঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, রাত ১২ টায় সে আমাকে জন্মদিনের মিউজিক শোনায়। মৃত্যু-তন্ময়তা ভেঙে গেলে শরবনে ছুটি কিছু বাশি তৈরির জন্য। বন্ধুরা এলে সবাইকে একটা করে দেবো। একা থাকার পরিবর্তে সম্মিলিতে মিলে থাকার প্রতীক হচ্ছে বাশি। একাকী নিরবতায় কার সাথে বলো আমি ফাইট করি ? সংস্কার করার আগে বিতর্কের হাওয়াই সেতু পর্যবেণ করা চাই। তাই সেতুতে ওঠার জন্যে স্পোর্টিং কারের ভঙ্গিতে হালকা ও শলাকার আট পা বাড়াই।
(লুবনা চর্যা’র একমাত্র ও প্রথম বই জিওগ্রাফি, ইন অ্যা জ্যু...এর প্রথম কবিতা)
..............................................
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'আবিষ্কার পণ্ডিতদের মতে, আমাদের বাংলাভাষার আদি নিদর্শনের আবিষ্কার। এই চর্যাচর্যবিনিশ্চয়কে আমরা চর্যাপদ বলে চিনি। খুলনার কবি লুবনা চর্যা এই চর্যাপদকে নতুন করে লিখেছেন। মানে পুনর্লিখন। বাংলাভাষার তরুণ কবিদের এই পরীক্ষানীরিক্ষা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক নতুন সংযোজন। এই নীরীক্ষা একদিকে যেমন নতুন করে চর্যাপদকে আমাদের কাছে তুলে ধরে, তেমনি অন্যদিকে তরুণ কবিদের বিশাল মানসিক বৈচিত্রের খোঁজ নিতেও আমাদের সাহায্য করে।
ভাল লাগবে পড়লে।
একনজরে
চর্যাচর্যবিনিশ্চয়
পুনর্লিখন : লুবনা চর্যা
প্রকাশ : জানুয়ারী ২০০৭
পাঠকদের জন্য একটি চর্যা তুলে দিলাম।
পদ - ২
........
কাছিমের দুধে, কী ভয়ঙ্কর, উপচে
পড়ে ভাঁড়! শোন, তোমার দেহবৃক্ষের
তেতুঁলই যোগ্য খাবার কুমীরটার।
ঘরের মধ্যে চাইলেই আঙ্গিনা আছে,
অবধূতি রে! তথা গভীর মৌন রাতে
কানের ঝুমকো নিয়ে গেলো এক চোরে।
বুড়ো শ্বশুর ঘুমায়, কিন্তু বউয়ের
যে ঘুম নেই। সহজে চোরটা পেয়েছে
যা, চোরেই নিক তা, তাতে বউয়ের কী!
দিনের আলোতে যে কূলবধূ সামান্য
কাকের ভয়ে কাঁপে, রাতে সে ই একাকী
অভয়চিত্তে হাঁটে কামরূপের জন্য!
এমন কাব্য কুক্কুরী পা গাইলো-দেখি,
কোটিতে একজন বুঝলো এই শূন্য।
ক্ক্কুরী পা
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : শূন্য দশক,
লুবনা চর্যা
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০০৯
বিনয় মজুমদারের কয়েকটি কবিতা

আমার শোবার ঘর ছেড়ে
........................
আমার শোবার ঘর ছেড়ে আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
বারান্দার পাশ দিয়ে একটি মুকুট হেঁটে চলে গেল অতিশয় ধীরে,
আমি মনোযোগ দিয়ে তার বস্তাবৃত অঙ্গ দেখলাম।
এ মুকুট প্রৌঢ়া ফলে মুকুটের ফুল দুটি বেশ ঝুলে পড়েছে নিশ্চয়,
আরো এ বয়সে ফুলে অনেক নখের দাগ নিশ্চয় লেগেছে
মুকুট পরার কালে ফুল টেপবার ফলে, তবুও মুকুট তার ফুল
কৌশলে কাঁচুলি দিয়ে বেঁধেছে এমনভাবে যাতে মনে হয় তার ফুল
মোটেই ঝোলে নি আর বারংবার নিয়মিত মুকুট পরার ফলে নিশ্চয় মুকুট
বেশ বড় হয়ে গেছে এই প্রৌঢ় বয়সে ও যদিও অবিবাহিতা আছে।
আমার বাড়ির থেকে
....................
আমার বাড়ির থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি অগণিত যুবতী চলেছে।
এইসব বিবাহিতা এবং অবিবাহিতা যুবতীদিগের প্রত্যেকের
অন্তরে জয়পতাকা কিভাবে থাকে আমি সু ন্দর নিখুঁতভাবে দেখি
তাকিয়ে তাকিয়ে ওরা যখন হাঁটেঁ বা বসে থাকে।
প্রত্যেকটি যুবতীর অন্তরে জয়পতাকা প্রবেশ করেছে বহুবার,
নিজের অন্তরে ঢোকা জয়পতাকাকে খুব ভালবাসে যে কোনো যুবতী।
অনেক জয়পতাকা অন্তরে প্রবেশ করে তার মধ্যে যে জয়পতাকা
অন্তরে আনন্দ দেয় সবচেয়ে বেশি পরিমাণ
তাকেই বিবাহ করে অনূড়া যুবতীগণ। আমার বাড়ির থেকে বাইরে বেরিয়ে
প্রতিদিন আমি দেখি অগণিত যুবতী চলেছে।

মুকুট
.....
এখন পাকুড়গাছে সম্পূর্ণ নূতন পাতা, তার সঙ্গে বিবাহিত এই
বটগাছে লাল লাল ফল ফলে আছে।
চারিদিকে চিরকাল আকাশ থাকার কথা, আছে কিনা আমি দেখে নিই।
অনেক শালিক পাখি আসে রোজ এই গাছে, বট ফলগুলি
তারা খুটেঁ খুটেঁ খায় বসন্তের হাওয়া বয়, শালিকের ডাক
এবং পাতার শব্দ মিশে একাকার হয়ে চারদিকে ভাসে।
এখন অনেক মেঘ সোনালি রূপালি কালো আকাশে আকাশে।
একটি মুকুট সেই পাকুড় গাছের নিচে শাড়ি পরে দাড়িয়েঁ রয়েছে।
মদের ফেনার মতো সাদা সাদা দাঁত আমি অনেক দেখেছি।
জেনেছি আগুন যত্ দুরেই হোক না কেন তাকে দেখা যায়।
মুকুরের বুকে ঠাঁই পেতে হলে সরাসরি সম্মুখেই চলে যেতে হয়
পিছনে বা পাশে নয়; গ্রন্থ ছন্দোবদ্ধ হলে তবে আপনিই মনে থাকে
মৃত্যু অবধিই থাকে; মানুষ সমুদ্রকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসে।

চাদেঁর গুহার দিকে
..................
চাদেঁর গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, মেঝের উপরে
দাড়িয়েঁ রয়েছে চাঁদ, প্রকাশ্য দিনের বেলা, স্পষ্ট দেখা যায়
চাদেঁর গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, ঘাসগুল ছোট করে ছাঁটা।
ঘাসের ভিতর দিয়ে দেখা যায় গুহার উপরকার ভাঁজ।
গুহার লুকোনো মুখ থেকে শুরু হয়ে সেই ভাঁজটি এসেছে
বাহিরে পেটের দিকে। চাঁদ হেঁটে এসে যেই বিছানার উপরে দাঁড়াল
অমনি চাঁদকে বলি,' তেল লাগাবে না আজ' শুনে চাঁদ বলে
'মাখব নিশ্চয়, তবে একটু অপেক্ষা কর' বলে সে অয়েল ক্লথ নিয়ে
পেতে দিল বিছানায়, বালিশের কিছু নিচে, তারপর হেঁটে এসে চলে গেল
নিকটে তাকের দিকে,একটি বোতল থেকে বাম হাতে তেল নিয়ে এল
এসে তেল মাখা হাতে ভুট্টাটি চেপে ধরে।
যখন ধরল তার আগেই ভুট্টাটি খাড়া হয়ে গিয়েছিল।
চাঁদ আমি দুজনেই মেঝেতে দাঁড়ানো মুখোমুখি
এক হাতে ঘসে ঘসে ভুট্টার উপরে চাঁদ তেল মেখে দিল।

ভালোবাসা দিতে পারি
......................
ভালোবাসা দিতে পারি তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝরে যায়-
হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না।
এ আমার অভিজ্ঞতা। পরাবতগুলি জ্যোৎস্নায়
কখনো ওড়ে না; তবু ভালোবাসা দিতে পারি আমি।
শাশ্বত, সহজতম এই দান- শুধু অংকুরের
উদ্গমে বাধা না দেওয়া, নিষ্পেষিত অনালোকে রেখে
ফ্যাকাশে হলুদবর্ণ না করে শ্যামল হতে দেওয়া।
এতই সহজ, তবু বেদনায় নিজ হাতে রাখি
মৃত্যুর প্রস্তর, যাতে কাউকে না ভালোবেসে ফেলি।
গ্রহণে সক্ষম নও। পারাবত, বৃক্ষচূড়া থেকে
পতন হলেও তুমি আঘাত পাওনা, উড়ে যাবে।
প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি নিয়ে তুমি
চলে যাবে; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হব আমি।

সন্তপ্ত কুসুম ফুটে
.................
সন্তপ্ত কুসুম ফুটে পুনরায় ক্ষোভে ঝরে যায়।
দেখে কবিকুল এত ক্লেশ পায়, অথচ হে তরু,
তুমি নিজে নির্বিকার, এই প্রিয় বেদনা বোঝো না।
কে ক্থোয় নিভে গেছে তার গুপ্ত কাহিনী জানি।
নিজের অন্তর দেখি, কবিতার কোনো পঙক্তি আর
মনে নেই গোধূলিতে; ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।
অথবা গৃহের থেকে ভুল বহির্গত কোনো শিশু
হারিয়ে গিয়েছে পথে, জানে না সে নিজের ঠিকানা।

কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে
......................
কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে।
কৌটার মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা
উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ, দিকচক্রবাল।
সময়ে ভেবেছিলাম সম্মিলিত চায়ের ভাবনা,
বায়ুসেবনের কথা, চিরন্তন শিখরের বায়ু।
দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয়
তোমাকে অস্তিত্বহীনা, অথবা হয়তো লুপ্ত, মৃত।
অথবা করেছে ত্যাগ, অবৈধ পুত্রের মতো, পথে।
জীবনের কথা ভাবি, ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে
পুনরায় কেশোদ্গম হবে না; বিমর্ষ ভাবনায়
রাত্রির মাছির মতো শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা-
হাসপাতালের থেকে ফেরার সময়কার মনে।
মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে
প্রস্রাব করার মতো অস্থানে বেদনা ঝরে যাবে।
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
তিনটি নতুন কবিতা
.jpg)
শেষ কথা
(ইরাকের নিপীড়িত জনসাধারণের প্রতি উৎসর্গীত)
...............................
কাহিনী
.....
আজ ভোরে রেডিওতে একটি ঘটনা শুনলাম/ বিবরণে ছিলো মানব মৈত্রীর বাণী/ মন দিয়ে শুনি... মনে ভাসে দৃশ্যাবলী:/
ইরাকের স্বপ্নধৌত এক সাধারণ জনপদ, /হঠাৎ শত্রু সেনাবাহিনীর পদভারে আতংকিত/ ত্রাস ভয় ভেংচি কাটে চারদিকে/ আক্রান্তরা ভীত / যারা আক্রমনকারী (মার্কিন সেনাবাহিনী) ভয়ে আজ শংকিত তারাও। / ভয় এমনই এক রোগ, মৃদু বাতাসের শো শা / শব্দে মার্কিন সৈন্যরা শোনে হিমালয় শৃঙ্গে ঝড়ের মাতম। ভয়ানক ঝড়ের পরেই/ যেন মৃত্যু খুবলে খাবে - দেহ মন/ সীমাহীন সূর্যাস্তের অন্ধকারে অপহৃত সমস্ত জীবন/
সন্ধ্যার আকাশে ডানা মেলে আছে অলিক সময়/ চারদিকে কার্ফিউ তখন। মার্কিন সৈন্যরা দেখে/ কারা যেন আসছে এগিয়ে/আসছে দ্রুত ক্রমশই মুখোশধারী, কাঁধে কাঁধ/ ঘন দীর্ঘ এক অশেষ মিছিল/ অস্ত্র হাতে কি না, সন্ধ্যার অন্ধকারে দেখা মুস্কিল।/ মুখোশে আবৃত মুখ - মৃত্যুর মিছিলে / রাজপথে কাতারে কাতারে কারা ওরা ভীতিময়?/ সমরসাজে সজ্জিত সেনা সব ভয়ে ত্রস্ত্র/ অস্ত্রের উদরে জ্বলজ্বলে বুলেটের ফুলঝুরি/ বিস্ফারক হুকুমের অপেক্ষায় বাধ্য ভৃত্য - স্তদ্ধ /
সৈন্যদের মনের ভেতর ভয়ংকর ভড় /ছায়া অন্ধকারে আতংকের শত তলা জাদুঘর / সন্দিগ্ধ মার্কিন কমান্ডার, এর মাঝে হঠাৎ তার/ আদেশের দৃঢ় কন্ঠস্বর - "সিজ ফায়ার! সিজ ফায়ার!"/
স্বশস্ত্র বেবাক তরুন সৈন্যরা সব হতবাক/ ওরা ভাবে : আগন্তুক বেশে সমুখে নিশ্চিত যম - /এমন বিপদে তবু কেন হুকুমের মতিভ্রম!/ অগত্যা সৈন্যরা দ্রুত একসাথে নিরস্ত্র সকলে,/ মনে মনে যেন ওরা অবনত মৃত্যুর দুয়ারে/
সেদিন সন্ধ্যায়/ রাজপথে যারা বের হয়/ ইরাকের একদল প্রতিবাদী সাধু / প্রত্যেকে মুখোশ খুলে সৈন্যদের পাশ দিয়ে ধীরে/ নিজ পথে চলে গেলো হেটে। ঘৃনা বিবাদের পরিবর্তে /স্মিত হাসি শান্তিপ্রিয় সকলের মুখে/ (এভাবে সেদিন অকারণ রক্তপাত থেকে সত্যি/ রক্ষা পেয়েছিলো মানুষের বিবাদী স্বভাবে শ্রান্ত পৃথিবীর এক ফোটা মাটি।)

গীতিকা
......
অস্তিত্বের টানে নিজের জীবনে সব প্রাণ জয়ী হতে চায়।
বিস্ময়ের রঙধনু আকাশের তলে বসে তাই
শতরঙা প্রশ্ন আসে মনে - শত প্রশ্ন করে যাই:
আত্ম সমর্পনে শত্রু মিত্র সত্যি এক সাথে জয়ী হয়ে যায়?
যদি বাঘের সামনে হরিণ আর কোনো সাপের সামনে ইদুর?
জীবজগতের সত্য বেয়ে আজ মানুষের ধর্ম কতো দূর?
সূচালো শীতল তেজি সামুদ্রিক হাওয়ার দিকে
মুখ করে ডুবে যাই আরো এক গভীর বিস্ময়ে:
সমস্যার ছদ্মবেশে সমাধান হাটে পাশাপাশি?
প্রশ্নের সমুদ্রে ভাসি দিনরাত অদক্ষ সাতারু,
বৃক্ষের নিয়মে বিস্তারিত যাবতীয় চিন্তাগাথা
গহীন অন্তরে চিরদিন শত প্রশ্নের শেকড়,
জ্ঞানের সমুখে খুঁজে হয়রান প্রকৃত সত্যের ধ্রুবতারা -
দেখি তাসের ঘরের মতো ক্ষয়া - জ্ঞানের মাপক যতো !
অজানার অন্ধকারে তাই বুঝি দেখি রহস্যের পায়চারী ?
শাদা চোখে দেখি না কিছুই...
অনুমানে বলো কোন পথে তবে চলি ?
যতো প্রশ্ন ততো বেশী না-জানার ভয়, যতো উত্তর তারও ততো অজানা সংশয়,
সবকিছু এক পাশে রেখে তবু মন বলে আজ:
পৃথিবীতে যতো হৃদয় দুষণ, যুদ্ধ
ঈর্ষান্বিত নরনারী
আমাদের চারপাশে তার চেয়ে বহুগুন বেশী সহমর্মী।
মানুষের অনুভবে কত রঙ, কত আশা, স্বপ্ন
কত ভয়
কোনো অনুভব কোনো রঙ তবু শেষ কথা নয়।
বস্টন ২০০৪

সোয়ান লেক
.............
ভূমিকা
.......
যেতে পথে রাধা আন্মনে ভুলে গেছে তার জাপানি ছাতা।
নক্ষত্রের অগনিত প্রদীপ খচিত আদিগন্ত ধুসর তমস ঢাকা
রেশমী ঘোমটা - বাগানের দ্বারে দেখি পথভোলা সন্ধ্যা।
গীতিকা
....
বাগানে দু'জনে বসে আছি যেন বহু কাল - অনুজ্জ্বল
নক্ষত্রের মতো - পাশাপাশি নির্জনে নিঃশব্দে - হাতে হাত রেখে ।
সন্ধ্যার নিবিড় ছায়াচ্ছন্ন আধো অন্ধকারে
সোনালী জোনাকি - জ্বলে নিভে - লিখে যায়
অস্তিত্বের শত স্বর্ণবর্ণ পদাবলী।
সন্ধ্যার হৃদয়ে এতো এতো ছায়া দীর্ঘতর হয়
যাবতীয় ছায়া সব দীর্ঘ হতে হতে হয় গাঢ়
আধাঁর জমাট বেধে ছায়াসমাবৃত গাঢ় রাত্র।
নীলাভ সন্ধ্যার ক্ষীণালোকে দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে মহাকাল।
আকাশে চাঁদের নিরালোক পূর্ণকলা আগমন।
তাপহীন জ্যোৎস্নায় আপ্লুত রজনীগন্ধার অনুরণ দেখি;
সন্ধ্যার আড্ডায় বাতাসের উচ্ছ্বল অংশ গ্রহণ দেখে
গন্ধে গন্ধে সারা রাত দুলে গেছে শুভ্র গন্ধরাজ।
কামেনীর গন্ধে মাতালের মতো হৃদয়ের সুগন্ধে বিভোর -
নির্জনে দু'জনে বসে আছি - মুখোমুখি চোখে চোখ রেখে।
বহুযুগ পর আনত দৃষ্টিতে ছিল আমার একটি মৃদু হাসি
তোমার স্পর্শের আঙ্গুলে একটি মাত্র কথা - ভালোবাসি।

কালের তিলক
............
রাষ্ট্রের সীমানা বেধে আকাশকে পরাধিন করেছে যে প্রেম,
হৃদয়ের ডানা মেলে কিছুতেই যখন আর স্বস্তি হয়না,
স্বাধীন ইচ্ছায় পেশীপূর্ণ হাতের থাবা যখন - নিয়ন্ত্রন;
নিজের পতাকা গেড়ে যেন এক বনমানুষ হুংকার ছাড়ে;
বর্বর যুগের যে প্রেম মনকে এইভাবে চোরাপথে ধীরে
নিয়ে যায় ক্রমাগত জীবাশ্মের প্রাচীন সংস্কারে -
প্রতিশ্রুতিমুক্ত সম্পর্কের কোষে প্রোথিত জমাট অবিশ্বাস
আর অধুনিক জীবন দখলে রাখে যেই সাম্রাজ্যের প্রেত -
তার থেকে সরে গিয়ে - অপ্রেমের যতো বিস্ফারক ক্ষোভ,
তীব্র রোষ, প্রতিশোধ - ব্যর্থপ্রেমে যতো অপরাধবোধ,
সম্বালহীনের কন্ঠরোধ - সেই সব থেকে যতো দূরে থাকি -
সব স্বার্থপর মোহ থেকে হৃদয় আমার যতো মুক্তো রাখি
ফাগুনের শিওরে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকি যতোই মরু তৃষায়
স্পর্শের বাইরে রুমঝুম সুর সুদূর মেঘের আঙিনায়।
নীল নদ সিন্ধু গঙ্গা তীরে অচেনা কোন জনবসতি থেকে
ইভ যদি আজ বির্বতিত নতুন আদলে হাত ছানি দেয়,
সময়ের দুটি হাত বাড়িয়ে বুকের মাঝে যতো ডাকাডাকি,
মরিচিকা হয়ে বহু দূরে - প্রেমিক পুরুষ - তুমি স্বপ্নবাদী|
তোমার সাম্যের গান রোমান্টিক আবেশের মতো নিরালায়
আমার সমস্ত গাঢ় অনুভূতি ছুঁয়ে কেন পলকে শুকিয়ে যায় ?
হৃদয়ের গভীরতম রোমান্টিকতার নাম সমাজতন্ত্র ?
বুকের গভীর উষ্ণতায় যে শিশুর সুপ্ত স্বপ্ন মিশে থাকে,
প্রজাপতি পাখী আর শিশু - দৃষ্টি সরে গিয়ে থামে তার দিকে,
উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে শিশু - বৃষ্টিভেজা ভোরে,
আমাদের হৃৎস্পন্দনে যে শিশু কেঁদে ওঠে ঘুমের ঘোরে
ভ্রুণের ভাষার মতো তার নামও বুঝি সমাজতন্ত্র !
আজকের আদমের মন - অনুরাগে যদি হয় স্নিগ্ধ চাঁদ
পৃথিবীর বুকে শুধু রূপা ঝরা শান্ত এক পূর্নিমার রাত!
ভালোবেসে আজকের আধুনিক ইভ - কেবল স্রোতের ঢল,
হয় যদি আদমের বুকে কোনো নদী - টলোমলো ঢেউজল!
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : নব্বই দশক,
সেলিনা শিকদার
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
মাজুল হাসানের কবিতা
বেবি রহমান বলে কোথাও কেউ নেই
........................
বেবি রহমান বলে কোথাও কেউ নেই... আছে তার ছায়ার কঙ্কাল। সুখী মানুষের জামার মতো তার কোনো লেখা নেই, নেই শেমিজ-আভরণী দুপুর অম্লান। তবু, হয়তো কোথাও কেউ থাকে, যার নাম চৌরাসিয়া অথবা চরটকাটা। থাকে কমলার খোসার মতো আত্মঘাতী জল। অনল অবিকল। তবু কেন যে কখনো কখনো নিচে নয়, পুরো সমুদ্র উঠে যায় ঊর্ধ্বালোকে; সিলিংফ্যান বরাবর!
আজ এতদিন পর, পাতাকুড়ানী মেয়ে- তুমি ফিরে এলে সোনারঙ মাকড়সা হয়ে। তোমার জরির জালে ফিরে এলো কেটে-ফেলা পুরনো আঙুল, আমাদের পোষা সংসার, মায়া-কাকা, মা-মাসীমা-পরি দিদিমনি। মরে গিয়ে এতদিন তাদের সবার পরিণতি ছিলো নীল-বনসাই আর টালিখাতার লাল স্খলন; রুল-টানা টাউনিয়া রোদ অথবা পাথরকুচি ঘুম। তবু কোথাও কোনো হরতকি-বাঁকলে খোদিত নেই দুধ-ভাতের রূপকথা। রূপকথা, রূপকথা গো... আমি এক বেহায়া নদী। চাই, কেবল চাই একটিমাত্র জামরুল-গন্ধী নাম। আমার বয়স শঙ্খের সমান।
২.
একটা ব্যাঙের ছাতার নিচে আমাদের পরিচয়! তবু চকলেটগন্ধী বৃষ্টির জন্য কত আয়োজন। কত ওয়াগন, কত বগি, কত প্রত্নঅশ্ব-ইঞ্জিন। তবু বিবিধ বাতি আর টালমাটাল লাইটম্যান জানে, রাত এক বর্ণচোরা অধ্যায়। এখন তো তবে বাজির আসরে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এভাবে নিরুপায় ভাগ্যের ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বেঁধে আদতে কার কী লাভ হয়েছে? জগতের সবকিছুই কি জয়-পরাজয়?! কালা কৈতরের মতো চম্পা-বিবির দোলনা চলে গ্যালো কাছিমবাজার। শ্রীমান বিশ্বনাথপুর হয়ে ফিরে এলো শেষরাতের সেভেন-আপ-মেইল। স্টেশনমাস্টার আজ তোমাকে বলতেই হবে, এভাবে আর কতবার খোয়া যাবে ভেলু বোষ্টমীর পা?
বাড়ি যাও হুইসেল, বাড়ি যাও। নলিনী এখন ঘুম যাবে কেশুর-আলতা পদ্মপাতায়।
৩.
আর একবার অর্কেষ্ট্রা ডুকরে উঠলে আমি একটা নীল চোপড়া মাছ হয়ে যাবো। আমার উড়াল বিষয়ক দুর্বলতাগুলো তখন বন্ধুত্ব করে নেবে আমার স্বভাবের বিপরীত বৃক্ষছানাদের সাথে। আলাপ হবে: নন্দীগ্রাম। জ্বালাও- পোড়াও শরবিদ্ধ চাঁদ। সাল-সাদোইম বলো তো, নন্দিনীর নাকফুল আর আমলকীর তারা; মাঝখানে ফারাক কতটুকু? তোমার উত্তরের আশায় উত্তরাকাশে মাথাগুঁজে হেঁটে গ্যালো শ্বেত-শুভ্র হাতির দঙ্গল। পিছুপিছু একপাল কৃষ্ণ হরিণ, গ্যালো তাদের বাচ্চাকাচ্চারা। ওরা আমায় মনে করিয়ে দিলো পানিফলের স্বাদ।
আর একবার অর্কেষ্ট্রা ডুকরে উঠলে আমি এফোঁড়-ওফোঁড় চলে যাব সিংড়ার জঙ্গল। মাসকলাই ভেবে মুখে তুলে নেবো শতসূচ শোয়াশিং। পায়ের উপর দিয়ে রিং-রিং- চলে যাবে এনি, জলঢোড়া অথবা বিষাক্ত জলবোড়া সাপ। কিন্তু কেউ কোনো রা’ কাড়বে না। কারণ, আমার মুখে তখন আমলকীর তারা। বৃষ্টি এলে জগতের তাবৎ স্বাদ এসে ধরা দেবে একটা চুমুতে।
৪.
রাজহাঁস। প্রথমে ডুব দিলে লাল-পুকুরে, তারপর ডানার আলতো আঘাতে আন্দোলিত হলো আলটোপ্পা-জল। জরির-জহর। সবশেষে অশোকলতার মতো কাঁপলো আকুপাড়ার আরক-জলধি। আসলে রঙের ঊর্ধ্বে কোথাও কোনো জীবন নেই। তাই মিথ্যে রাখালের মিথ্যে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও মানুষ ফেরি করে ডানাওলা ডিম। ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে শত শত রঙিন মার্বেল। শরীরে তার স্মৃতি নান্মী পালক। এহেন সংকরিত উড়াল নিয়ে যেদিন সে হানা দিলো ব্যক্তিগত বিকেলে, দেখলাম— আহা, কী শুভ্র-দীপ্ত দেবদারু!
রাজহাঁস, তোমার শরীরে দাগ কাটে না কিছু। দিনদিন উন্নতগ্রীবা ফুলে-ফেঁপে পুষ্ট হচ্ছে আরো। অথচ জানা নেই, আমার একান্ত পোষ-মানা রুপালি বৃষ্টিগুলো তোমায় ছুঁয়েছিলো কাঁপা নোলকের মতো!
৫.
ঘর মানেই কাঠকয়লা- আগুনরঙা ফুল। ফুলের দেয়াল ফুটো হয় আর আমি তাতে ঠোঁট বুলাই। আজ যা লালা একদিন তাই হবে গোপনেরও গোপন। তখন ছাদ দিয়ে গলগল নেমে আসবে রাইশস্যের রক্ত। করি-করি করে আজও জিজ্ঞেস করা হলো না; হে ক্ষুরধার পিরানহা, মাংস খসে পড়লেও শিকার কি করে বেমালুম থাকে তখন? কেনই বা রক্ত ঝরলে মেঝে সচল হয়ে ওঠে? আমি সেসব এক্কাদোক্কা হেফজ করি উড-প্যাকারের গর্তে। আর ঘৃতকুমারীর রসে লিখে রাখি দুইমাস বয়সী ভ্রূণের আর্তি। একটা নতুন স্কুলফ্রক ছাড়া যার কোনো দাবি নেই; দায় নেই জন্ম প্রার্থনার। বলতে গেলে, সচলতার দায় কেবল মানুষের, যাদের দুই পা... ফুটন্ত, দুই হাত... ভূপাতিত; তবু কী সাবলীল উড়ন্ত! হে ম্রিয়মাণ ঘর, অপেক্ষায় থাকো। একদিন কথার ভারে ঠিক ঠিক হুড়মুড়িয়ে পড়বে সিঁটিমরিচের দুপুর। পড়বে খিলান, কোটাঘর, জমানো ইঁদুরের খুঁত। সেদিনের নাম হবে অশোকলতা।
৬.
শৈশবে যেসব নীল-সারসের স্বপ্ন দেখতাম আজ তারাই এনেছে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ। অভিযোগ যার অন্য নাম শিংমাছ, এমন এক দঙ্গল মুমূর্ষু সাঁতার এসে বলে গ্যালো- ডুমুর-পুকুরে আর কোনোদিন হেলেঞ্চাকুঁড়ির সাথে এনি-সাপের বিয়ে বসবে না। তবে কি হলুদ মেখে রাফেজা’বু কলপাড়ে বসবে না কোনোদিন? অথর্ব ঘুঘুরি এসে চাইবে না ভেঙে ফেলা থালার জীবন? হুঁইসেল বাজিয়ে মাথার ভেতরে থেমে থাকে দমকল। এখন মালগাড়ি স্থির, পেশকার স্থির, তিরতির কাঁপছে সেনবাগের মাথাকাটা মুহুরির বন। সব দিয়ে-থুয়ে, রাফেজার মা আমেনা-আয়া তবে কি এই কিনেছিলো- গুটলি-আমের ভূত! ও ভাই হেড মওলানা- তোমার কি কথা বলা পাখি আছে কোনো? ময়না টিয়া অথবা বুলবুলি? দ্যাখো না, এক ঘড়া জলপানও পাচ্ছে না রিক্সাওলা স্বামী। কেবল দমকল বাজছে। গদ্যেরা বাজছে, কিসামত-তাওরেগা বাজছে, দণ্ডপানি বাজছে। চারিদিকে শুষুকের কান্না। কেবল প্যাডেল ঘুরছে, কাচারিরোড ঘুরছে, বাহাদুরবাজার ঘুরছে, করবী ফুল ঘুরছে, আহা করবী ফুল!
৭.
নরম থাবায় ধারালো নখের বিড়ালেরা বেরিয়ে পড়ছে রাস্তায়। এমন সময়, গঙ্গাফড়িং-ছেলেমেয়েরাই কেবল অতিকায় লাটিম দাবি করতে পারে। লোডশেডিংকে বলতে পারে- মোস্ট ওয়েলকাম। চাইতে পারে- জল-সিঙাড়া, ফিনফিনা মিঠা পানিজাম! সেইমতে প্রতিটি কামরাঙা গাছ আসলে এক-একটা গল্পের ঝুড়ি। গল্পে বড়োরা সার্কারামা দেখছে, সার্কাসের ক্লাউন ছুটছে সরু দড়ির উপর দিয়ে। ঝলসানো আপেলের মতো ম্রিয়মাণ ঘরে জ্বলছে ক্ষীয়মাণ ধূপকাঠি। আমাকে সোনারকাঠি-রুপারকাঠির গল্প শোনাতো রাঙা পিসি। আতাফল, দাড়িকিনি মাছ... জোনাক নয়, পিসির পেট-খসানো বিধবা-রক্তে ভেসে যায় পদ্মপুকুর। গল্পের বাইরে মৃত রক্তজবা, প্লাস্টিকের বাঁশঝাড়। কাঁদছে কেউ! ওরাশিশু। ঝিঁঝিঁ। ঝিঁঝিঁরাই জগতের প্রাচীনতম বিদ্রোহী।
৮.
বেবি রহমান বলে কোথাও কেউ নেই। নেই কোনো মিথ্যের অপসংলাপ। তবু সত্যি: কেউ কেউ লাল-লাঠি খেলতে গিয়ে সূর্যের গুঁড়ো নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো। বেতার ভেঙে উছলে উঠেছিলো জলোচ্ছ্বাস। আশ্বিনী ঝড় মাথায় করে কেউ গিয়েছিলো তেঁতুলগাছের তলায়। অজগরের ফণায় চড়ে কেউবা গিয়েছিল খুনিয়াদীঘির পাড়। যে যেখানে যাক, আশলে, আমি চেয়েছিলাম মানুষ আর পঙ্খিরাজ সাপ যাতে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরে যায়। চেয়েছি স্বর্গস্মারক নখ— তাই দিয়ে হামলে পড়েছি সমুদ্রের গতরে। তবু সত্যি, সমুদ্রে মিঠামন নেই, মুড়কি-উখড়া নেই, মৎস্যকন্যার মতো নেই কোনো জলকুমার। তাই আমাকে ফিরতেই হয় নদীতীরে, জনপদে, চাকায়। তবু গাঙচিল, হায় গাঙচিল... গাঙচিল হয়তো মিথ্যে নয় কখনো!
৯.
তারা আমাকে ভূরিভোজের পরিকল্পনা করে। আর আমার কেবলি মনে হয়, বাবলা-কাটাই পৃথিবীর সবচে উৎকৃষ্ট কাটাচামচ। ওসব শোয়াশিং-চোখ আসলে মার্বেল বৈ অন্য কিছু নয় (রাত, একদিন ক্রুজ কাঁটা খেলবো তখন তোর সাথে)। তবু বাজার থাকে, ঘাট থাকে, থাকে আকাশ বিরুদ্ধ শামিয়ানা। পাশে কলকল জলকেলি। টুথপেস্টমার্কা হাসি দিয়ে আমরা ডলফিন-ফোয়ারা বানাই। হলিডে মেজাজে হাঙরেরা এসে কাচুলির গেরো আলগা করে। বেতারে তখন সন্ধ্যার কশ: ‘আলগা করো খোপার বাঁধন... তুহি বিন জিয়ারা না লাগে... না লাগে...’। পিঠে আমার মুয়ূরপুঞ্জ জিভ; বড় দয়াবান, হ্যাঁ মহাশয়!! ‘তুহি বিন জিয়ারা না লাগে...’। না লাগে চাবুকের দাগ। আহা জল, জটাধারী জল... ডুবোপথ... ডুমুরের ফুল! ফুল বাগিচায়, প্রকৃত আলোচনায়, জলই একমাত্র সত্য। দুধারে তেজপাতা বন। মাঝে জেগে থাকে দুই বাসিন্দার নিমজ্জিত রেললাইন। অথচ স্টেশনের কুলিমুটে, মাটির ভাঁড়ের কম্পমান চা, অয়েটিং রুম অথবা পাইলট-ক্যাপ টিকিটচেকার... কেউ জানে না- ডুবোপথ আমার অপেক্ষায় প্রতিদিন লাস্ট ট্রেনটাও মিস করে।
চালতা-পাতার ঈশ্বর
............
সব মানুষই উঠে যেতে চায় স্তনের এভারেস্টে— এটাই সত্য: এভারেজ পাঠপরিক্রমা শেষে একনিষ্ঠ বইপোকা হলেও আমাদের মন পড়ে থাকে ঐ উষ্ণতার দিকেই। আমাদের নারীকূল সূর্যদেবের জারজ-সন্তান বর নেন। অকপটে আমরা দুধ-চিড়া চিবাই। মেলায় গিয়ে চিলিক-বিলিক করি। তারপরেও একটা মৃতমাছের চোখ কী করে সাবলীল বেঁচে-বর্তে থাকে, সেই রহস্য আমাদের কাছে বেশি মনোযোগ পেয়ে যায়। আশলে আমরা প্রতিদিন একটা গাছের নিচে হা-করে দাঁড়াই। অতিথি পাখিরা বিষ্ঠা বর্ষণ করে। আর আমরা তার গুণাগুণ বিচারে একটা করে কমিটি গঠন করি। এভাবে লাট্টু ঘরতে থাকে, মাটি বিদীর্ণ হয়; আর আমরা কামতাড়িত হয়ে উঠি।
২.
আমি চৌরাসিয়া বুঝি না; বুঝি একমাত্র চালতা ফুল। আর বুঝি সঙ্গিনী মারা গেলে একাকী পেঙ্গুইন বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেয় কাচকাটা হিরার কলে! তাই তুমি যতই পলিগ্যামির কথা পাড়ো, প্রেমকে আমি কণ্ঠার হাড়বদল বলেই প্রচার করবো। তবু হয়তো নাভিরন্ধ্রে একদিন নশ্বর সিমেট্রি ঢুকে পড়বে। খোসপাঁচড়া ঢুকে পড়বে। টাটা-বাইবাই করতে করতে কার্নিশে ফাঁস দেয়া একটা বিকেল ঢুকে পড়বে চোখের সূর্যে। কিন্তু আমি কোনো উপাসানালয়ের চৌকাঠ মাড়াবো না। হায় একটা টাইম-মেশিনও বানানো হলো না জীবনে! সমর্পণের সমস্ত গন্ধম দিয়ে যদি আদতে একটি রূপকথাও লিখা না হয়, তবে আর পঙ্খিরাজ ঘোড়া পুষে কী লাভ?
৩.
আমাদের ছেকড়া মহল্লায় কোনো চালতা গাছ নেই। রেখে যায়নি কেউ; মাসি-পিসি, মহিষাল করিম ভাই; না কোনো পূর্বসূরি। তেমনি আমাদের পূর্বসূরিরা জানিয়ে যাননি কাশফুলের রক্তের কথা। আমরা সত্যিই জানি না- নদী কী করে নারায়ণের প্রসাদ আর লিঙ্গের খাঁজে জমে থাকা ক্বাথ একই ধারায় বয়ে নিয়ে যায়? ফলে এখনো আমরা মাখন চুরি করতে করতে ধুতরা গাছে গিরগিটি উঠার মতো করে দেবতা হয়ে উঠি। মাত্র বাদামি দিনটা পেরুলে এর ব্যতিক্রমও মিলবে। তখন শান্তনুর প্রেমে মজে যাবেন স্বয়ং গঙ্গা। আর শহরের ডাস্টবিনগুলো আলোকিত হয়ে উঠবে উচ্চকিত শিশুর কান্নায়। সেই কান্নায় একটা লাল-ঘুঙুর পরিয়ে দেবো বলে আমি রোজ-রোজ পথ ভুল করি।
৪.
দুপুর মানেই বিস্ময়। তিনিই জানেন, আত্মা কী করে ছোট হতে হতে হেটমুন্ডে মুখ-থুবড়ে পড়ে। তবু ছায়ারা আমাদের সারপ্রাইজ দেয়। ছায়া স্থিতিস্থাপক, ক্রম প্রসারমাণ। কখনো কখনো লিগামেন্ট শিথিল হয়ে যাওয়া আলোর মতো মেলে দেয় প্রচ্ছায়ার পেখম। এসব দেখতে দেখতে আমাদেরও ইচ্ছে করে পদব্রজে বাড়ি ফিরে ড্রইং রুমটাকে চমকে দিতে। ফেরার কথা ভুলতে আমরা স্যান্ডউইচ চিবাই অথবা স্যান্ডউইচ হাসে আমাদের চ্যাপ্টানো ভাব দেখে। মানুষ মাত্রই ক্ষুধাতুর, চৈত্রের নামান্তর। ভাবি, বমন ও বাতাসার মাঝে আদতেই কি ফারাক আছে? ক্ষুধাকে তবে পাপ বলি কী করে? আশলে, আমাদের যত পাপ-অপরাধ, লুপ্ত-সন্তাপ সবই একটা গোল্ডফিশকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিনই হেলায়-অবহেলায়, ছরার-বেহালায় মৃত্যু হয় তার। তার জায়গায় চলে আসে আরেকটা নতুন গোল্ডফিশ, সেইম-কালার সেইম-সাইজ। ড্রইংরুমে কুঁচকানো-কুশন। সাবধান কোনো সারপ্রাইজ নয়! জুতোর ভেতরে পচা গন্ধ। রুদ্ধশ্বাস।
হায়, একটা চালতা-পাতায় যতটুকু ঈশ্বর বিরাজমান ততটুকু সান্ত্বনাও অবশিষ্ট নেই আমাদের।
৫.
ঘ্রাণের পাঠশালাফেরত প্রজাপতিরা আজকাল কিডনাপ হয়ে যাচ্ছে। মেয়ের চিন্তায় পুড়ে যাচ্ছে বাসন্তীর কপাল। বাসন্তীর জ্বর। অন্য রকম জ্বর! অথচ আমরাই একদিন, ঘাসদের পৃথিবীর সবচাইতে বর্ধনশীল প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। এখন জন্ডিস-চৈত্র। তাই পল্টনে লাখো জনতায় আমাদের রংচটা অন্তর্বাস কেবলি খসে খসে যায়। এভাবে বিড়াল চলে গেলে পড়ে-থাকা উষ্ণতা আমাদের কাছে আরাধ্য হয়ে ওঠে। আমরা কেবল ঈর্ষাতুর হয়ে উঠি। আচার খাই, বিচার চেয়ে হল্লাধ্বনি দেই। এদিকে অর্জুন-কর্ণ কিংবা মাখনচোরা কৃষ্ণরা ক্রমাগত চক্রবাণ ছুঁড়তে থাকেন! ছুঁড়তেই থাকেন। তবু সিমেট্রিতে, সুররিয়ালিস্টিক মিউজিয়ামে¬ আমরাই কেবল বিষণ্ন বাঘের পিঠ চেটে দিতে পারি।
৬.
সমস্ত জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে। পোষা-বিড়াল, বিড়ালের পোষ, হাতের তুলুতে তিনটি চালতা ফুল অথবা কিছুই নয়- একদিন সব ফাঁস হয়ে যাবে। শহরে করমচা ফুল ফুটলেই সবকিছুই হয়ে যাবে চতুর্থ বিষয়, মূল্যহীন- অবান্তর। যেমনি অবান্তর এই পথের ইতিহাস আলোচনা; যেখানে চৈত্রের উত্তাপ আর বহুবর্ণা আইসক্রিম বহুবছর হাত ধরাধরি করে হেঁটে গেছে নিঃশব্দে। আত্মার অমরতা আজ শপিং-বিলাসিতা। আর শরীর সেতো শালপাতার পর্দা। সামনে তিমির হা’র মতো শূন্যতা; পেছনে দুধউরি জলমহলা। এখানে দাঁড়ানোর পর ঝুমঝুম ঘণ্টাবাঁধা অ্যারাবিয়ান ঘোড়ারাও একেবারে কাঠ হয়ে যায়! তবু কাঠের পা নিয়ে দলাদলি চলে, দেশে নির্বাচন হয়, অমোচনীয় কালির নিম্নমান নিয়ে রিট আবেদন হয় কোথাও কোথাও। তবে সবকিছুর আগে-পরে ঠিক থাকে ঈশ্বর ও ইবলিশের গাঁটছড়া।
এসবের বাইরে একটা খুদি-ফড়িংয়ের জন্য আমরা কি শোকদিবস পালন করতে পারবো কোনোদিন?
........................
বেবি রহমান বলে কোথাও কেউ নেই... আছে তার ছায়ার কঙ্কাল। সুখী মানুষের জামার মতো তার কোনো লেখা নেই, নেই শেমিজ-আভরণী দুপুর অম্লান। তবু, হয়তো কোথাও কেউ থাকে, যার নাম চৌরাসিয়া অথবা চরটকাটা। থাকে কমলার খোসার মতো আত্মঘাতী জল। অনল অবিকল। তবু কেন যে কখনো কখনো নিচে নয়, পুরো সমুদ্র উঠে যায় ঊর্ধ্বালোকে; সিলিংফ্যান বরাবর!
আজ এতদিন পর, পাতাকুড়ানী মেয়ে- তুমি ফিরে এলে সোনারঙ মাকড়সা হয়ে। তোমার জরির জালে ফিরে এলো কেটে-ফেলা পুরনো আঙুল, আমাদের পোষা সংসার, মায়া-কাকা, মা-মাসীমা-পরি দিদিমনি। মরে গিয়ে এতদিন তাদের সবার পরিণতি ছিলো নীল-বনসাই আর টালিখাতার লাল স্খলন; রুল-টানা টাউনিয়া রোদ অথবা পাথরকুচি ঘুম। তবু কোথাও কোনো হরতকি-বাঁকলে খোদিত নেই দুধ-ভাতের রূপকথা। রূপকথা, রূপকথা গো... আমি এক বেহায়া নদী। চাই, কেবল চাই একটিমাত্র জামরুল-গন্ধী নাম। আমার বয়স শঙ্খের সমান।
২.
একটা ব্যাঙের ছাতার নিচে আমাদের পরিচয়! তবু চকলেটগন্ধী বৃষ্টির জন্য কত আয়োজন। কত ওয়াগন, কত বগি, কত প্রত্নঅশ্ব-ইঞ্জিন। তবু বিবিধ বাতি আর টালমাটাল লাইটম্যান জানে, রাত এক বর্ণচোরা অধ্যায়। এখন তো তবে বাজির আসরে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এভাবে নিরুপায় ভাগ্যের ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বেঁধে আদতে কার কী লাভ হয়েছে? জগতের সবকিছুই কি জয়-পরাজয়?! কালা কৈতরের মতো চম্পা-বিবির দোলনা চলে গ্যালো কাছিমবাজার। শ্রীমান বিশ্বনাথপুর হয়ে ফিরে এলো শেষরাতের সেভেন-আপ-মেইল। স্টেশনমাস্টার আজ তোমাকে বলতেই হবে, এভাবে আর কতবার খোয়া যাবে ভেলু বোষ্টমীর পা?
বাড়ি যাও হুইসেল, বাড়ি যাও। নলিনী এখন ঘুম যাবে কেশুর-আলতা পদ্মপাতায়।
৩.
আর একবার অর্কেষ্ট্রা ডুকরে উঠলে আমি একটা নীল চোপড়া মাছ হয়ে যাবো। আমার উড়াল বিষয়ক দুর্বলতাগুলো তখন বন্ধুত্ব করে নেবে আমার স্বভাবের বিপরীত বৃক্ষছানাদের সাথে। আলাপ হবে: নন্দীগ্রাম। জ্বালাও- পোড়াও শরবিদ্ধ চাঁদ। সাল-সাদোইম বলো তো, নন্দিনীর নাকফুল আর আমলকীর তারা; মাঝখানে ফারাক কতটুকু? তোমার উত্তরের আশায় উত্তরাকাশে মাথাগুঁজে হেঁটে গ্যালো শ্বেত-শুভ্র হাতির দঙ্গল। পিছুপিছু একপাল কৃষ্ণ হরিণ, গ্যালো তাদের বাচ্চাকাচ্চারা। ওরা আমায় মনে করিয়ে দিলো পানিফলের স্বাদ।
আর একবার অর্কেষ্ট্রা ডুকরে উঠলে আমি এফোঁড়-ওফোঁড় চলে যাব সিংড়ার জঙ্গল। মাসকলাই ভেবে মুখে তুলে নেবো শতসূচ শোয়াশিং। পায়ের উপর দিয়ে রিং-রিং- চলে যাবে এনি, জলঢোড়া অথবা বিষাক্ত জলবোড়া সাপ। কিন্তু কেউ কোনো রা’ কাড়বে না। কারণ, আমার মুখে তখন আমলকীর তারা। বৃষ্টি এলে জগতের তাবৎ স্বাদ এসে ধরা দেবে একটা চুমুতে।
৪.
রাজহাঁস। প্রথমে ডুব দিলে লাল-পুকুরে, তারপর ডানার আলতো আঘাতে আন্দোলিত হলো আলটোপ্পা-জল। জরির-জহর। সবশেষে অশোকলতার মতো কাঁপলো আকুপাড়ার আরক-জলধি। আসলে রঙের ঊর্ধ্বে কোথাও কোনো জীবন নেই। তাই মিথ্যে রাখালের মিথ্যে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও মানুষ ফেরি করে ডানাওলা ডিম। ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে শত শত রঙিন মার্বেল। শরীরে তার স্মৃতি নান্মী পালক। এহেন সংকরিত উড়াল নিয়ে যেদিন সে হানা দিলো ব্যক্তিগত বিকেলে, দেখলাম— আহা, কী শুভ্র-দীপ্ত দেবদারু!
রাজহাঁস, তোমার শরীরে দাগ কাটে না কিছু। দিনদিন উন্নতগ্রীবা ফুলে-ফেঁপে পুষ্ট হচ্ছে আরো। অথচ জানা নেই, আমার একান্ত পোষ-মানা রুপালি বৃষ্টিগুলো তোমায় ছুঁয়েছিলো কাঁপা নোলকের মতো!
৫.
ঘর মানেই কাঠকয়লা- আগুনরঙা ফুল। ফুলের দেয়াল ফুটো হয় আর আমি তাতে ঠোঁট বুলাই। আজ যা লালা একদিন তাই হবে গোপনেরও গোপন। তখন ছাদ দিয়ে গলগল নেমে আসবে রাইশস্যের রক্ত। করি-করি করে আজও জিজ্ঞেস করা হলো না; হে ক্ষুরধার পিরানহা, মাংস খসে পড়লেও শিকার কি করে বেমালুম থাকে তখন? কেনই বা রক্ত ঝরলে মেঝে সচল হয়ে ওঠে? আমি সেসব এক্কাদোক্কা হেফজ করি উড-প্যাকারের গর্তে। আর ঘৃতকুমারীর রসে লিখে রাখি দুইমাস বয়সী ভ্রূণের আর্তি। একটা নতুন স্কুলফ্রক ছাড়া যার কোনো দাবি নেই; দায় নেই জন্ম প্রার্থনার। বলতে গেলে, সচলতার দায় কেবল মানুষের, যাদের দুই পা... ফুটন্ত, দুই হাত... ভূপাতিত; তবু কী সাবলীল উড়ন্ত! হে ম্রিয়মাণ ঘর, অপেক্ষায় থাকো। একদিন কথার ভারে ঠিক ঠিক হুড়মুড়িয়ে পড়বে সিঁটিমরিচের দুপুর। পড়বে খিলান, কোটাঘর, জমানো ইঁদুরের খুঁত। সেদিনের নাম হবে অশোকলতা।
৬.
শৈশবে যেসব নীল-সারসের স্বপ্ন দেখতাম আজ তারাই এনেছে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ। অভিযোগ যার অন্য নাম শিংমাছ, এমন এক দঙ্গল মুমূর্ষু সাঁতার এসে বলে গ্যালো- ডুমুর-পুকুরে আর কোনোদিন হেলেঞ্চাকুঁড়ির সাথে এনি-সাপের বিয়ে বসবে না। তবে কি হলুদ মেখে রাফেজা’বু কলপাড়ে বসবে না কোনোদিন? অথর্ব ঘুঘুরি এসে চাইবে না ভেঙে ফেলা থালার জীবন? হুঁইসেল বাজিয়ে মাথার ভেতরে থেমে থাকে দমকল। এখন মালগাড়ি স্থির, পেশকার স্থির, তিরতির কাঁপছে সেনবাগের মাথাকাটা মুহুরির বন। সব দিয়ে-থুয়ে, রাফেজার মা আমেনা-আয়া তবে কি এই কিনেছিলো- গুটলি-আমের ভূত! ও ভাই হেড মওলানা- তোমার কি কথা বলা পাখি আছে কোনো? ময়না টিয়া অথবা বুলবুলি? দ্যাখো না, এক ঘড়া জলপানও পাচ্ছে না রিক্সাওলা স্বামী। কেবল দমকল বাজছে। গদ্যেরা বাজছে, কিসামত-তাওরেগা বাজছে, দণ্ডপানি বাজছে। চারিদিকে শুষুকের কান্না। কেবল প্যাডেল ঘুরছে, কাচারিরোড ঘুরছে, বাহাদুরবাজার ঘুরছে, করবী ফুল ঘুরছে, আহা করবী ফুল!
৭.
নরম থাবায় ধারালো নখের বিড়ালেরা বেরিয়ে পড়ছে রাস্তায়। এমন সময়, গঙ্গাফড়িং-ছেলেমেয়েরাই কেবল অতিকায় লাটিম দাবি করতে পারে। লোডশেডিংকে বলতে পারে- মোস্ট ওয়েলকাম। চাইতে পারে- জল-সিঙাড়া, ফিনফিনা মিঠা পানিজাম! সেইমতে প্রতিটি কামরাঙা গাছ আসলে এক-একটা গল্পের ঝুড়ি। গল্পে বড়োরা সার্কারামা দেখছে, সার্কাসের ক্লাউন ছুটছে সরু দড়ির উপর দিয়ে। ঝলসানো আপেলের মতো ম্রিয়মাণ ঘরে জ্বলছে ক্ষীয়মাণ ধূপকাঠি। আমাকে সোনারকাঠি-রুপারকাঠির গল্প শোনাতো রাঙা পিসি। আতাফল, দাড়িকিনি মাছ... জোনাক নয়, পিসির পেট-খসানো বিধবা-রক্তে ভেসে যায় পদ্মপুকুর। গল্পের বাইরে মৃত রক্তজবা, প্লাস্টিকের বাঁশঝাড়। কাঁদছে কেউ! ওরাশিশু। ঝিঁঝিঁ। ঝিঁঝিঁরাই জগতের প্রাচীনতম বিদ্রোহী।
৮.
বেবি রহমান বলে কোথাও কেউ নেই। নেই কোনো মিথ্যের অপসংলাপ। তবু সত্যি: কেউ কেউ লাল-লাঠি খেলতে গিয়ে সূর্যের গুঁড়ো নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো। বেতার ভেঙে উছলে উঠেছিলো জলোচ্ছ্বাস। আশ্বিনী ঝড় মাথায় করে কেউ গিয়েছিলো তেঁতুলগাছের তলায়। অজগরের ফণায় চড়ে কেউবা গিয়েছিল খুনিয়াদীঘির পাড়। যে যেখানে যাক, আশলে, আমি চেয়েছিলাম মানুষ আর পঙ্খিরাজ সাপ যাতে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরে যায়। চেয়েছি স্বর্গস্মারক নখ— তাই দিয়ে হামলে পড়েছি সমুদ্রের গতরে। তবু সত্যি, সমুদ্রে মিঠামন নেই, মুড়কি-উখড়া নেই, মৎস্যকন্যার মতো নেই কোনো জলকুমার। তাই আমাকে ফিরতেই হয় নদীতীরে, জনপদে, চাকায়। তবু গাঙচিল, হায় গাঙচিল... গাঙচিল হয়তো মিথ্যে নয় কখনো!
৯.
তারা আমাকে ভূরিভোজের পরিকল্পনা করে। আর আমার কেবলি মনে হয়, বাবলা-কাটাই পৃথিবীর সবচে উৎকৃষ্ট কাটাচামচ। ওসব শোয়াশিং-চোখ আসলে মার্বেল বৈ অন্য কিছু নয় (রাত, একদিন ক্রুজ কাঁটা খেলবো তখন তোর সাথে)। তবু বাজার থাকে, ঘাট থাকে, থাকে আকাশ বিরুদ্ধ শামিয়ানা। পাশে কলকল জলকেলি। টুথপেস্টমার্কা হাসি দিয়ে আমরা ডলফিন-ফোয়ারা বানাই। হলিডে মেজাজে হাঙরেরা এসে কাচুলির গেরো আলগা করে। বেতারে তখন সন্ধ্যার কশ: ‘আলগা করো খোপার বাঁধন... তুহি বিন জিয়ারা না লাগে... না লাগে...’। পিঠে আমার মুয়ূরপুঞ্জ জিভ; বড় দয়াবান, হ্যাঁ মহাশয়!! ‘তুহি বিন জিয়ারা না লাগে...’। না লাগে চাবুকের দাগ। আহা জল, জটাধারী জল... ডুবোপথ... ডুমুরের ফুল! ফুল বাগিচায়, প্রকৃত আলোচনায়, জলই একমাত্র সত্য। দুধারে তেজপাতা বন। মাঝে জেগে থাকে দুই বাসিন্দার নিমজ্জিত রেললাইন। অথচ স্টেশনের কুলিমুটে, মাটির ভাঁড়ের কম্পমান চা, অয়েটিং রুম অথবা পাইলট-ক্যাপ টিকিটচেকার... কেউ জানে না- ডুবোপথ আমার অপেক্ষায় প্রতিদিন লাস্ট ট্রেনটাও মিস করে।
চালতা-পাতার ঈশ্বর
............
সব মানুষই উঠে যেতে চায় স্তনের এভারেস্টে— এটাই সত্য: এভারেজ পাঠপরিক্রমা শেষে একনিষ্ঠ বইপোকা হলেও আমাদের মন পড়ে থাকে ঐ উষ্ণতার দিকেই। আমাদের নারীকূল সূর্যদেবের জারজ-সন্তান বর নেন। অকপটে আমরা দুধ-চিড়া চিবাই। মেলায় গিয়ে চিলিক-বিলিক করি। তারপরেও একটা মৃতমাছের চোখ কী করে সাবলীল বেঁচে-বর্তে থাকে, সেই রহস্য আমাদের কাছে বেশি মনোযোগ পেয়ে যায়। আশলে আমরা প্রতিদিন একটা গাছের নিচে হা-করে দাঁড়াই। অতিথি পাখিরা বিষ্ঠা বর্ষণ করে। আর আমরা তার গুণাগুণ বিচারে একটা করে কমিটি গঠন করি। এভাবে লাট্টু ঘরতে থাকে, মাটি বিদীর্ণ হয়; আর আমরা কামতাড়িত হয়ে উঠি।
২.
আমি চৌরাসিয়া বুঝি না; বুঝি একমাত্র চালতা ফুল। আর বুঝি সঙ্গিনী মারা গেলে একাকী পেঙ্গুইন বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেয় কাচকাটা হিরার কলে! তাই তুমি যতই পলিগ্যামির কথা পাড়ো, প্রেমকে আমি কণ্ঠার হাড়বদল বলেই প্রচার করবো। তবু হয়তো নাভিরন্ধ্রে একদিন নশ্বর সিমেট্রি ঢুকে পড়বে। খোসপাঁচড়া ঢুকে পড়বে। টাটা-বাইবাই করতে করতে কার্নিশে ফাঁস দেয়া একটা বিকেল ঢুকে পড়বে চোখের সূর্যে। কিন্তু আমি কোনো উপাসানালয়ের চৌকাঠ মাড়াবো না। হায় একটা টাইম-মেশিনও বানানো হলো না জীবনে! সমর্পণের সমস্ত গন্ধম দিয়ে যদি আদতে একটি রূপকথাও লিখা না হয়, তবে আর পঙ্খিরাজ ঘোড়া পুষে কী লাভ?
৩.
আমাদের ছেকড়া মহল্লায় কোনো চালতা গাছ নেই। রেখে যায়নি কেউ; মাসি-পিসি, মহিষাল করিম ভাই; না কোনো পূর্বসূরি। তেমনি আমাদের পূর্বসূরিরা জানিয়ে যাননি কাশফুলের রক্তের কথা। আমরা সত্যিই জানি না- নদী কী করে নারায়ণের প্রসাদ আর লিঙ্গের খাঁজে জমে থাকা ক্বাথ একই ধারায় বয়ে নিয়ে যায়? ফলে এখনো আমরা মাখন চুরি করতে করতে ধুতরা গাছে গিরগিটি উঠার মতো করে দেবতা হয়ে উঠি। মাত্র বাদামি দিনটা পেরুলে এর ব্যতিক্রমও মিলবে। তখন শান্তনুর প্রেমে মজে যাবেন স্বয়ং গঙ্গা। আর শহরের ডাস্টবিনগুলো আলোকিত হয়ে উঠবে উচ্চকিত শিশুর কান্নায়। সেই কান্নায় একটা লাল-ঘুঙুর পরিয়ে দেবো বলে আমি রোজ-রোজ পথ ভুল করি।
৪.
দুপুর মানেই বিস্ময়। তিনিই জানেন, আত্মা কী করে ছোট হতে হতে হেটমুন্ডে মুখ-থুবড়ে পড়ে। তবু ছায়ারা আমাদের সারপ্রাইজ দেয়। ছায়া স্থিতিস্থাপক, ক্রম প্রসারমাণ। কখনো কখনো লিগামেন্ট শিথিল হয়ে যাওয়া আলোর মতো মেলে দেয় প্রচ্ছায়ার পেখম। এসব দেখতে দেখতে আমাদেরও ইচ্ছে করে পদব্রজে বাড়ি ফিরে ড্রইং রুমটাকে চমকে দিতে। ফেরার কথা ভুলতে আমরা স্যান্ডউইচ চিবাই অথবা স্যান্ডউইচ হাসে আমাদের চ্যাপ্টানো ভাব দেখে। মানুষ মাত্রই ক্ষুধাতুর, চৈত্রের নামান্তর। ভাবি, বমন ও বাতাসার মাঝে আদতেই কি ফারাক আছে? ক্ষুধাকে তবে পাপ বলি কী করে? আশলে, আমাদের যত পাপ-অপরাধ, লুপ্ত-সন্তাপ সবই একটা গোল্ডফিশকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিনই হেলায়-অবহেলায়, ছরার-বেহালায় মৃত্যু হয় তার। তার জায়গায় চলে আসে আরেকটা নতুন গোল্ডফিশ, সেইম-কালার সেইম-সাইজ। ড্রইংরুমে কুঁচকানো-কুশন। সাবধান কোনো সারপ্রাইজ নয়! জুতোর ভেতরে পচা গন্ধ। রুদ্ধশ্বাস।
হায়, একটা চালতা-পাতায় যতটুকু ঈশ্বর বিরাজমান ততটুকু সান্ত্বনাও অবশিষ্ট নেই আমাদের।
৫.
ঘ্রাণের পাঠশালাফেরত প্রজাপতিরা আজকাল কিডনাপ হয়ে যাচ্ছে। মেয়ের চিন্তায় পুড়ে যাচ্ছে বাসন্তীর কপাল। বাসন্তীর জ্বর। অন্য রকম জ্বর! অথচ আমরাই একদিন, ঘাসদের পৃথিবীর সবচাইতে বর্ধনশীল প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। এখন জন্ডিস-চৈত্র। তাই পল্টনে লাখো জনতায় আমাদের রংচটা অন্তর্বাস কেবলি খসে খসে যায়। এভাবে বিড়াল চলে গেলে পড়ে-থাকা উষ্ণতা আমাদের কাছে আরাধ্য হয়ে ওঠে। আমরা কেবল ঈর্ষাতুর হয়ে উঠি। আচার খাই, বিচার চেয়ে হল্লাধ্বনি দেই। এদিকে অর্জুন-কর্ণ কিংবা মাখনচোরা কৃষ্ণরা ক্রমাগত চক্রবাণ ছুঁড়তে থাকেন! ছুঁড়তেই থাকেন। তবু সিমেট্রিতে, সুররিয়ালিস্টিক মিউজিয়ামে¬ আমরাই কেবল বিষণ্ন বাঘের পিঠ চেটে দিতে পারি।
৬.
সমস্ত জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে। পোষা-বিড়াল, বিড়ালের পোষ, হাতের তুলুতে তিনটি চালতা ফুল অথবা কিছুই নয়- একদিন সব ফাঁস হয়ে যাবে। শহরে করমচা ফুল ফুটলেই সবকিছুই হয়ে যাবে চতুর্থ বিষয়, মূল্যহীন- অবান্তর। যেমনি অবান্তর এই পথের ইতিহাস আলোচনা; যেখানে চৈত্রের উত্তাপ আর বহুবর্ণা আইসক্রিম বহুবছর হাত ধরাধরি করে হেঁটে গেছে নিঃশব্দে। আত্মার অমরতা আজ শপিং-বিলাসিতা। আর শরীর সেতো শালপাতার পর্দা। সামনে তিমির হা’র মতো শূন্যতা; পেছনে দুধউরি জলমহলা। এখানে দাঁড়ানোর পর ঝুমঝুম ঘণ্টাবাঁধা অ্যারাবিয়ান ঘোড়ারাও একেবারে কাঠ হয়ে যায়! তবু কাঠের পা নিয়ে দলাদলি চলে, দেশে নির্বাচন হয়, অমোচনীয় কালির নিম্নমান নিয়ে রিট আবেদন হয় কোথাও কোথাও। তবে সবকিছুর আগে-পরে ঠিক থাকে ঈশ্বর ও ইবলিশের গাঁটছড়া।
এসবের বাইরে একটা খুদি-ফড়িংয়ের জন্য আমরা কি শোকদিবস পালন করতে পারবো কোনোদিন?
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : শূন্য দশক,
মাজুল হাসান
মাজুল হাসানের কবিতা

বনমোরগের তর্ক
..........
খুঁজতে খুঁজতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাব
আর পেতলের হাত নিয়ে তুমি ডিঙাতে থাকবে পাহাড়ের পর পাহাড়
তখন ঝর্ণার জলে যেসব গর্বিত গোল্ডফিস ডিম ভাসাতে আসবে
জামায় আঁকা মাছরাঙা তাদের টোটাবিদ্ধ করে নিয়ে যাবে দূর উপত্যকায়
অগত্যা আমাকেই নিতে হবে মহান দায়িত্ব,
আপেলকে বলতে হবে তরমুজ,
তরমুজকে বলতে হবে রেশনের লাইন
অথবা শোনাতে হবে ধরা পড়ে যাওয়া কোনো পুরনো মিথ্যার টেকনিক,
তবু শোনো হে কার্পাসমহলের ভরশূন্য পরী,
ডানাগড়ানো ঢালের নীচুতলার মানুষ আর উপরের সন্যাসী মেঘপরিবার
একটু পরে তোমরা সবাই শুনতে পাবে ‘চোখ গেল, চোখ গেল’ বলে
এক করুণ আর্তনাদ
কিন্তু ততোক্ষণে আমি একটা বনমোরগের সাথে তর্কে জড়িয়ে যাব
পরপুরুষ স্পর্শের আগে তোমার হাত সোনার সেতার ছুঁয়েছিল কীনা...
এই রহস্যে
আমাদের মধ্যে ঘটে যাবে ছোটখাটো একটা পালকযুদ্ধ।
রাহাদ বলল, দেখো
.............
হিরক রাজার সাথে রাজকুমারীর বড় ভাব
তাই ফুটপাত হয়ে যাচ্ছে টেডিবিয়ার সাজানো তুলতুলে জাজিম
ময়ূরে জমে যাচ্ছে বিমর্ষ চাঁদের ঘ্রাণ
বাটপারের ডাকবাক্সে শোভা পাচ্ছে পাচার হওয়া বসন্তের টুকিটাকি
আর বলতে হচ্ছে আমাকেই : শুনুন মিস্টার, ইহা বৃষ্টি
বৃষ্টি হয় তেতুল বর্ণ একা
একা মাত্রই সুস্থ এবং পবিত্র উন্মাদ
সুস্থরাই জাদুকর, আমি-তুমি-রাহাদ এবং
বিগত আত্মার টিকটিকি
অতঃপর উন্মাদরাই কেবল ভাল বাঁশি বাজাতে পারে
বাইনোকুলার
........
রুদ্ধশ্বাস, অপেক্ষায় রাখো। আমাকে নাও... নাও।
নাও যাতে কাল ক্যামেরার সামনে মাথায় একটা হলুদ মুনিয়া নিয়ে
আমি স্বাভাবিক পোজ দিতে পারি
খবরদার, তোমরা কিন্তু ভীড় করো না
ভীড়ে আমার কেবলি পেখম খসে-খসে যায়
আর ছোট্ট মুনিয়াটা যখন আরো ছোট্ট ঠোঁটে
সন্ধ্যাসমেত আমাকে উড়িয়ে নেবে চেরাডাঙ্গীর-পথ
তখন তোমরা সবাই নীলচোখের অধিকারী হবে
কিন্তু প্রয়োজনের সময় একটা বাইনোকুলারও তোমরা খুঁজে পাবে না।
বুদ্ধ মূর্তি ও করুণাদি’র লাল-শাদা
...........................
কে আমাকে দিলো মাটির বুদ্ধ মূর্তি?
জড়িয়ে ধরল মাঝ রাস্তায়। দেখো কেমন অর্ধেক সাপ
আর অর্ধেক বেটন-ধরা সাপুড়ে হয়ে গেলাম
কে আমাকে দিলো খালি রাস্তার খাঁ-খাঁ যৌনবেদনা?
সেই তখন থেকে রাস্তা দাবড়াচ্ছে চাকা খুলে যাওয়া মাতাল ট্রাক
আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে চিঠি ও অন্তর্বাস
মাথার ভেতর ডানা ঠুকছে খুনসুটি; টুনটুনি। টুনটুনির
রক্ত চাই
আজ লালে শাদায় হেসে উঠছে করুণাদি’র বাড়ি
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : শূন্য দশক,
মাজুল হাসান
শিরোনামহীন
মোহাম্মদ রফিক
১
আগুনবলয় থেকে একটি কুণ্ড
ছুটে এসে
স্থির হয় মাঘীকুয়াশায়;
মোটেও আড়ষ্ট নয়, পরিত্রাহি
বিক্ষোভে সন্ত্রাসে
ছড়ায় বিষম শব্দ চতুর্দিকে;
তার জন্ম-পরিচয় জানতে চাইলে,
চন্দ্রবোড়া
ফণা তোলে একটুকরো ধোঁয়া;
যত ক্ষিপ্র ত্রিশুলের মাথা থেকে
জন্ম নেয়
একে-একে স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা;
ছাইয়ে নয়, অঙ্গীকারে, টপ-টাপ
ঝরতে থাকে
দগ্ধ-চালা, ভাঙা-টিন, অস্থি-মজ্জা!
২
ভয় কি একদম উবে গেছে
মধ্যরাত্তিরের স্বপ্ন থেকে,
রমণের ঈষদুষ্ণ ইচ্ছা ঝাড়ে
দুটো বিষদাঁত,
মুণ্ডুহীন কায়াবৃত্ত বায়ুর অতল
ফুঁড়ে যেন বিন্দু-বিন্দু জল;
কোনো এক লবণ সাগর
তীরজুড়ে ছেড়ে যাওয়া,
কাঁকড়ার সার-সার খোসা
নড়ে ওঠে উত্তুরে হাওয়ায়,
মাঝে মাঝে ন্যাতানো রোদ্দুরে;
তারা কোনো খোপ থেকে,
ছাড়া পাওয়া ডাঁসা মুরগী নয়;
খোলা পেয়ে ঘরের দরজা
চৌকাঠ মাড়িয়ে এলেবেলে
কোলাহল, রক্তহিম শ্বাস!
৩
শ্বাসের নিরুদ্ধ রক্তে
মাংস ছিঁড়ে তীব্র ঘুম,
একটি সূঁই, বল্লমের ফলা,
কপট মৃত্যুর কথাকলি,
দুটি যুদ্ধ, বোমারু বর্ষণ,
প্রতারক জন্মদাগ কাটা
এক-একটি সহজাত বুলি,
চোখের কোটরে মৃদু ছাইয়ে
ডুবে যাওয়া প্রত্যন্ত গোধূলি,
স্বর্ণজটা ভ্রম দিব্যকান্তি!
৪
আদিনাদ, বিশ্বনাদ,
অনাদিনন্দন,
তেড়েফুঁড়ে তামাম বিলয়,
অবশেষে,
জাগাও, জাগিয়ে দাও,
মোহ্যমান
একটি ছায়া, কায়াহীন,
লুটায়, লুটিয়ে,
দুই কণা বালুমধ্যে
জনম মাতিয়ে,
এক ক্ষীর-সাগরের
গন্ধবহ মোহে!
১
আগুনবলয় থেকে একটি কুণ্ড
ছুটে এসে
স্থির হয় মাঘীকুয়াশায়;
মোটেও আড়ষ্ট নয়, পরিত্রাহি
বিক্ষোভে সন্ত্রাসে
ছড়ায় বিষম শব্দ চতুর্দিকে;
তার জন্ম-পরিচয় জানতে চাইলে,
চন্দ্রবোড়া
ফণা তোলে একটুকরো ধোঁয়া;
যত ক্ষিপ্র ত্রিশুলের মাথা থেকে
জন্ম নেয়
একে-একে স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা;
ছাইয়ে নয়, অঙ্গীকারে, টপ-টাপ
ঝরতে থাকে
দগ্ধ-চালা, ভাঙা-টিন, অস্থি-মজ্জা!
২
ভয় কি একদম উবে গেছে
মধ্যরাত্তিরের স্বপ্ন থেকে,
রমণের ঈষদুষ্ণ ইচ্ছা ঝাড়ে
দুটো বিষদাঁত,
মুণ্ডুহীন কায়াবৃত্ত বায়ুর অতল
ফুঁড়ে যেন বিন্দু-বিন্দু জল;
কোনো এক লবণ সাগর
তীরজুড়ে ছেড়ে যাওয়া,
কাঁকড়ার সার-সার খোসা
নড়ে ওঠে উত্তুরে হাওয়ায়,
মাঝে মাঝে ন্যাতানো রোদ্দুরে;
তারা কোনো খোপ থেকে,
ছাড়া পাওয়া ডাঁসা মুরগী নয়;
খোলা পেয়ে ঘরের দরজা
চৌকাঠ মাড়িয়ে এলেবেলে
কোলাহল, রক্তহিম শ্বাস!
৩
শ্বাসের নিরুদ্ধ রক্তে
মাংস ছিঁড়ে তীব্র ঘুম,
একটি সূঁই, বল্লমের ফলা,
কপট মৃত্যুর কথাকলি,
দুটি যুদ্ধ, বোমারু বর্ষণ,
প্রতারক জন্মদাগ কাটা
এক-একটি সহজাত বুলি,
চোখের কোটরে মৃদু ছাইয়ে
ডুবে যাওয়া প্রত্যন্ত গোধূলি,
স্বর্ণজটা ভ্রম দিব্যকান্তি!
৪
আদিনাদ, বিশ্বনাদ,
অনাদিনন্দন,
তেড়েফুঁড়ে তামাম বিলয়,
অবশেষে,
জাগাও, জাগিয়ে দাও,
মোহ্যমান
একটি ছায়া, কায়াহীন,
লুটায়, লুটিয়ে,
দুই কণা বালুমধ্যে
জনম মাতিয়ে,
এক ক্ষীর-সাগরের
গন্ধবহ মোহে!
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : ষাট দশক,
মোহাম্মদ রফিক
সরকার আমিনের কবিতা
ডাকাতি
.....
নিজ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গেলে
বহু ঐশ্বর্য রাই বৃথা যায়।
মন্দিরে দেবী দর্শনে গিয়েও লুকিয়ে রাখতে হয় চোখ
মানিব্যাগ নিয়ে সতর্ক থাকার মতো প্রযত্নে রাখতে হয় হৃদয়
বৃষ্টি মানেই মেঘের পরিণয়
আকাশকে আকাশ থাকতে হলে মাথা উঁচু করে রাখতে হয়।
হে আমার স্ত্রী
আমি অনুনয় করে বলছি -
ডাকাতি করো
তোমার ডাকের আশায়, ঘুমের পাশে বসে থাকি
তোমার ডাকাতির আশায়, পুলিশ স্টেশনে চাকরি করি।
বিড়ালের মন খারাপ
............
একটা বিড়ালের মন খারাপ দেখলে
আমার চোখে ঘুম আসে না
মন কেন তুমি এতো যন্ত্রণা করো?
খুব দুশ্চিন্তা হয়, কেন বিষণ্ন বিড়াল হাসে না।
আকাশের অসুস্থ তারাগুলোর জন্য কাঁদে প্রাণ
কেমন নিভু নিভু - রোগাটে
বৃষ্টির দিনে হৃদয় কেন এতো হাহাকার প্রবণ
আমি আর রাধা পড়ে গেছি এক সাথে বিরল জলের ফাঁদে !
অবশ্যই বলবো
..........
তুমি আমার কি লাগো অরণ্যের বৃষ্টি ?
আমার হৃদয় খারাপ, সময় খারাপ
তা বলে এসে একবারও ভিজিয়ে দেবে না ?
কাকের মতো ভিজতে ভিজতে কাঁপতে থাকলে
লোমকূপগুলোর ভেতর ঢুকে যাবে আরাধনা
মরতে মরতেও বেঁচে ওঠে বলবো প্রেম মন্দ কিছু নয়
সাবেক বিশ্বসুন্দরীর জেদ
..............
সাবেক বিশ্বসুন্দরী
পুরোনো দেহের ভারে নত।
তবু বেঁচে থাকতে সম্মত।
বসে করছেন শোক
বিষণ্ন লেকের পাড়ে।
পড়ে গেছে দাঁত, ভেঙে গেছে নখ
দুঃখ তাঁর অন্যতম শখ।
তাঁর জেদ দীর্ঘজীবী হোক।
হে গরু
.....
হে গরু, কোরবানির বিষণ্ন গরু, আমি তোমাকে জবাই করি
আমাকে জবাই করে দ্রব্যমূল্য
তোমার চামড়া খুব দামি এতে জুতা বানানো যায়
আমার চামড়ার দাম নাই
বড় মোটা
কোন কারণেই হৃদয়ে সুড়সুড়ি লাগে না।
বড় বড় চাকু দেখে তুমি কেঁদেছো
তোমার কালো চোখে আমি ভয় দেখেছি
আমি ভাই ভয়ের উর্ধ্বে
আমাকে ভয় পেতে নিষেধ করা আছে।
আমি হচ্ছি কারওয়ান বাজারের মরা ফাঙাস
আমি নই নাক উঁচু ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ
বহুতল ভবনের তলে গালে হাত দিয়ে ভাবি
আমি যেন কোন বাজারে বিক্রি হতে চেয়েছিলাম?
হে গরু কি সুন্দর করে তোমাকে আমি জবাই করেছি
তোমার রক্ত মাটিতে পড়েছে
আমার রক্ত আমি গিলে ফেলেছি।
sarkeramin@yahoo.com
.....
নিজ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গেলে
বহু ঐশ্বর্য রাই বৃথা যায়।
মন্দিরে দেবী দর্শনে গিয়েও লুকিয়ে রাখতে হয় চোখ
মানিব্যাগ নিয়ে সতর্ক থাকার মতো প্রযত্নে রাখতে হয় হৃদয়
বৃষ্টি মানেই মেঘের পরিণয়
আকাশকে আকাশ থাকতে হলে মাথা উঁচু করে রাখতে হয়।
হে আমার স্ত্রী
আমি অনুনয় করে বলছি -
ডাকাতি করো
তোমার ডাকের আশায়, ঘুমের পাশে বসে থাকি
তোমার ডাকাতির আশায়, পুলিশ স্টেশনে চাকরি করি।
বিড়ালের মন খারাপ
............
একটা বিড়ালের মন খারাপ দেখলে
আমার চোখে ঘুম আসে না
মন কেন তুমি এতো যন্ত্রণা করো?
খুব দুশ্চিন্তা হয়, কেন বিষণ্ন বিড়াল হাসে না।
আকাশের অসুস্থ তারাগুলোর জন্য কাঁদে প্রাণ
কেমন নিভু নিভু - রোগাটে
বৃষ্টির দিনে হৃদয় কেন এতো হাহাকার প্রবণ
আমি আর রাধা পড়ে গেছি এক সাথে বিরল জলের ফাঁদে !
অবশ্যই বলবো
..........
তুমি আমার কি লাগো অরণ্যের বৃষ্টি ?
আমার হৃদয় খারাপ, সময় খারাপ
তা বলে এসে একবারও ভিজিয়ে দেবে না ?
কাকের মতো ভিজতে ভিজতে কাঁপতে থাকলে
লোমকূপগুলোর ভেতর ঢুকে যাবে আরাধনা
মরতে মরতেও বেঁচে ওঠে বলবো প্রেম মন্দ কিছু নয়
সাবেক বিশ্বসুন্দরীর জেদ
..............
সাবেক বিশ্বসুন্দরী
পুরোনো দেহের ভারে নত।
তবু বেঁচে থাকতে সম্মত।
বসে করছেন শোক
বিষণ্ন লেকের পাড়ে।
পড়ে গেছে দাঁত, ভেঙে গেছে নখ
দুঃখ তাঁর অন্যতম শখ।
তাঁর জেদ দীর্ঘজীবী হোক।
হে গরু
.....
হে গরু, কোরবানির বিষণ্ন গরু, আমি তোমাকে জবাই করি
আমাকে জবাই করে দ্রব্যমূল্য
তোমার চামড়া খুব দামি এতে জুতা বানানো যায়
আমার চামড়ার দাম নাই
বড় মোটা
কোন কারণেই হৃদয়ে সুড়সুড়ি লাগে না।
বড় বড় চাকু দেখে তুমি কেঁদেছো
তোমার কালো চোখে আমি ভয় দেখেছি
আমি ভাই ভয়ের উর্ধ্বে
আমাকে ভয় পেতে নিষেধ করা আছে।
আমি হচ্ছি কারওয়ান বাজারের মরা ফাঙাস
আমি নই নাক উঁচু ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ
বহুতল ভবনের তলে গালে হাত দিয়ে ভাবি
আমি যেন কোন বাজারে বিক্রি হতে চেয়েছিলাম?
হে গরু কি সুন্দর করে তোমাকে আমি জবাই করেছি
তোমার রক্ত মাটিতে পড়েছে
আমার রক্ত আমি গিলে ফেলেছি।
sarkeramin@yahoo.com
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : আশি দশক,
সরকার আমিন
রেঙ্গুন সনেটগুচ্ছ : গৌতমই সর্বহারাদের ঘরামি
চয়ন খায়রুল হাবিব
১.
নীল আশ্বস্ত হয় শুধুমাত্র অন্যান্য নীলে
নীল বদলে যায় আকাশ্চুম্বী বিদ্যুতের নীল
কাতর নীল পূর্ণিমা হেঁটে যায়
বাংলার রাজকীয় বাঘের থাবায়
ক্ষিপ্ত বৈশাখের বিক্ষিপ্ত মহামল্লারে
নীলে নীলে নীল নীলপাহাড়ি মূর্ছনায়
আমার দেহঘড়ির চোদ্দতলায় চোদ্দ নীলের জালা
শিশু ণিল সবসময় ঘুমোচ্ছে
নৌনীল ভালোবাসে সাগরে ডুবসাঁতার
তাহলে কোন ণিল সবচেয়ে সত্যিকারের নীল
এর উত্তরে নীল রানার বয়ে আনে
মহানীল পদ্মসূত্রের শ্লোক
যখন শেষবারের মতন থামে নীল হৃতস্পন্দন
যখন ধনুর জাতক চিৎকার করে ওঠে : নির্বাণ নীল
২.
দীর্ঘমেয়াদি
সুদীর্ঘ পুরোপুরি পাস্তুরিত গেরুয়া সকাল
সকালের পেয়ালায়
ফট ফট ফট মাখন রঙের ভুট্টার খৈ
সোনালি কিশমিশগুলো
ভ্রু কোচকায় নরম শীত সূর্যের ছায়ায়
ব্রিওশ পাউরুটির
জিভে পানিতোলা থুতুর ফিশফিশ
শাদা হাতির পাকস্থলিতে
হাতির দাতের রান্নাঘরে
সিদ্ধার্থের মধু চুয়ে চুয়ে মিশবে
অসমীয়াদের বাঙালি খেদাও চায়ে
আমি সুখি : কারণ দুঃখ উধাও মহাদুঃখের মাদলে
বাদলাবাতাস আমার মা বৌদ্ধ পিতা
৩.
রক্তজবারা বিচিত্র নিজেদের রক্তাক্ততায়
রজনীগন্ধারা পবিত্র রাতের নির্লিপ্ততায়
শেফালিরা মুগ্ধ নজরুলের গানের সুরে
কদমেরা হতবাক গ্রীস্মের তাণ্ডবিতণ্ডায়
মহুয়ারা দোলে পাহাড়ের তিন চোয়ানি তালে
বর্ষবরণের খোপায় ঘুরে বেলি হেসেছে
টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে
গোলাপেরা অভিমানের আতরজলে গাঢ়
গাঁদাফুল আমাদের হাসিখুশি সেবিকা দিদি
ঘণ্টিফুল বাতাসে বাজায় স্কুল শেষের ঘণ্টা
তোমরা আমরা সবাই ফুল গোত্রের সর্বহারা পুতুল
চাইলেই পারি নিজেদের সুবাস নিজেরাই নিংড়াতে
মানুষেরা শুধু ফুল থেকে ভিন্ন ধর্ষণে ও সমরে
ফুলদেরও জীবন গড়ায় বিচ্ছেদে ও বাসরে
৪.
পরদেশে প্রবাশে সুতো কাটছে তিব্বতী চরকা
হিমালয় গলছে পুর্ণিমার প্রাচীনতম ঝরকায়
কুয়াশার আঁচলে দীর্ঘনিঃশ্বাসের জমিনে
একের পর এক প্যাগোডা জ্বলে ওঠে
যদিও জ্বলবার কথা ছিল না
এমনি মরণবাণ হেনেছিল চৈনিক লাল ফৌজেরা
ধর্মশালায় ঐ ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের ভিড়
তারাদের বাস্তব রূপকথায় ত্রিপিটকের ভেলা
ভেলাগুলো কালবেলার কুমার কুমারীদের বাহন
লেজ আঁশ কানকো দাঁড়াসহ ওরা কখনো মাছ কখনো মানুষ
আর ওদের পূর্বপুরুষ পূর্বরমণীরা
ইতিহাসের ডুবসাতারে ভাসবার আগে অস্ফূটে বলে
শরণাং গচ্ছামি : গৌতমই এখন সর্বহারাদের ঘরামি
৫.
ঘুটঘুটে অন্ধকার এক রেস্তরায়
খাদ্যের পরিবেশক ও পাচক সবাই অন্ধ
মেনুতে সব দেশের সব রকম খাদ্য
মসলার বদলে অনুপান হল অনুভূতি
জাফরাণ-অনুভূতি, দারুচিনি-অনুভূতি
পুদিনা-অনুভূতি, রংধুনু-অনুভূতি…
পাচক আসলে পাকাতে চায় খদ্দেরদের মাংস
কিম্বা খদ্দেররা এরি মধ্যে পরিণত খাবারে
ঘরে বাইরে খাদ্যগুলো এখন খোদক
হজমির অষুধ দেবে বোধিসত্যের নির্মোক
গোধূলিমাখা বিচিত্র বকুলের সালাদের পর
চাওয়া-পাওয়ার হিসাবের নেতৃত্ব দেয়
পরমের গেরুয়াধারীরা। রংধনু এখন রেঙ্গুন।
রেঙ্গুন ক্রমশ গড়ায় নির্বাণের রেস্তরায়
৬.
আমাকে খুন করে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে
রেঙ্গুন নদীতে : আমি ডুবে যাচ্ছি
আমার নির্ভার গেরুয়ার ভারে
প্রতিবেশীরা ঘুমিয়ে পড়েছে নদীর তলায়
যাতে আমার শরীর না ছোঁয় যন্ত্রণার পাতাল
আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে
জলচরেরা জিভ ছোয়াচ্ছে নির্বাণের প্রথম সিড়িতে :
বন্ধুবৎসল শুশুকের ঝাঁক
আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বয়ে নিচ্ছে
ওদের ওপরগামী ফিরতি সাঁতারে
প্রত্যেক জলচর প্রাণ শঙ্খনাদে হেসেছে
আমার উভচর অরহৎ দোলুনীতে
আমি ডুবে যাচ্ছি : আমাকে খুন করে
ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে রেঙ্গুন নদীতে
৬.
নির্বাসনে যাই আনন্দের পানশালায়
আজলাভরে পান করি সূর্যমুখীর রেণু
সূর্যরসে টইটম্বুর হবার পর
দেখতে পাই আমি পুরুষ কিন্তু স্পর্শকাতর
এবং অক্টোবর বীর্য খালাশের মাস
হরিণীরা সঙ্কেত পাঠাবে হরিণদের
ধাওয়া পালটা ধাওয়ার আদুরে ভঙ্গিতে
তাড়িত হরিণীরা ভান করবে পালানোর
কিন্তু আড়াল নেবার কোনো তোয়াক্কা করবে না
শান্তিনিকেতনে ও সুন্দরবনে
হরিণ-হরিণী মিলিত হবে চাঁদের বাগানে
বুদ্ধসঙ্গমে হরিণ হরিণী যখন ভরপেট
মিতকথনের মলাটে ছররা হানে ঘাতকের বেয়নেট
হরিণশাবক তখন লিঙ্গনিরপেক্ষ হরিণা
লন্ডন, সেপ্টেম্বর ২০০৭
১.
নীল আশ্বস্ত হয় শুধুমাত্র অন্যান্য নীলে
নীল বদলে যায় আকাশ্চুম্বী বিদ্যুতের নীল
কাতর নীল পূর্ণিমা হেঁটে যায়
বাংলার রাজকীয় বাঘের থাবায়
ক্ষিপ্ত বৈশাখের বিক্ষিপ্ত মহামল্লারে
নীলে নীলে নীল নীলপাহাড়ি মূর্ছনায়
আমার দেহঘড়ির চোদ্দতলায় চোদ্দ নীলের জালা
শিশু ণিল সবসময় ঘুমোচ্ছে
নৌনীল ভালোবাসে সাগরে ডুবসাঁতার
তাহলে কোন ণিল সবচেয়ে সত্যিকারের নীল
এর উত্তরে নীল রানার বয়ে আনে
মহানীল পদ্মসূত্রের শ্লোক
যখন শেষবারের মতন থামে নীল হৃতস্পন্দন
যখন ধনুর জাতক চিৎকার করে ওঠে : নির্বাণ নীল
২.
দীর্ঘমেয়াদি
সুদীর্ঘ পুরোপুরি পাস্তুরিত গেরুয়া সকাল
সকালের পেয়ালায়
ফট ফট ফট মাখন রঙের ভুট্টার খৈ
সোনালি কিশমিশগুলো
ভ্রু কোচকায় নরম শীত সূর্যের ছায়ায়
ব্রিওশ পাউরুটির
জিভে পানিতোলা থুতুর ফিশফিশ
শাদা হাতির পাকস্থলিতে
হাতির দাতের রান্নাঘরে
সিদ্ধার্থের মধু চুয়ে চুয়ে মিশবে
অসমীয়াদের বাঙালি খেদাও চায়ে
আমি সুখি : কারণ দুঃখ উধাও মহাদুঃখের মাদলে
বাদলাবাতাস আমার মা বৌদ্ধ পিতা
৩.
রক্তজবারা বিচিত্র নিজেদের রক্তাক্ততায়
রজনীগন্ধারা পবিত্র রাতের নির্লিপ্ততায়
শেফালিরা মুগ্ধ নজরুলের গানের সুরে
কদমেরা হতবাক গ্রীস্মের তাণ্ডবিতণ্ডায়
মহুয়ারা দোলে পাহাড়ের তিন চোয়ানি তালে
বর্ষবরণের খোপায় ঘুরে বেলি হেসেছে
টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে
গোলাপেরা অভিমানের আতরজলে গাঢ়
গাঁদাফুল আমাদের হাসিখুশি সেবিকা দিদি
ঘণ্টিফুল বাতাসে বাজায় স্কুল শেষের ঘণ্টা
তোমরা আমরা সবাই ফুল গোত্রের সর্বহারা পুতুল
চাইলেই পারি নিজেদের সুবাস নিজেরাই নিংড়াতে
মানুষেরা শুধু ফুল থেকে ভিন্ন ধর্ষণে ও সমরে
ফুলদেরও জীবন গড়ায় বিচ্ছেদে ও বাসরে
৪.
পরদেশে প্রবাশে সুতো কাটছে তিব্বতী চরকা
হিমালয় গলছে পুর্ণিমার প্রাচীনতম ঝরকায়
কুয়াশার আঁচলে দীর্ঘনিঃশ্বাসের জমিনে
একের পর এক প্যাগোডা জ্বলে ওঠে
যদিও জ্বলবার কথা ছিল না
এমনি মরণবাণ হেনেছিল চৈনিক লাল ফৌজেরা
ধর্মশালায় ঐ ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের ভিড়
তারাদের বাস্তব রূপকথায় ত্রিপিটকের ভেলা
ভেলাগুলো কালবেলার কুমার কুমারীদের বাহন
লেজ আঁশ কানকো দাঁড়াসহ ওরা কখনো মাছ কখনো মানুষ
আর ওদের পূর্বপুরুষ পূর্বরমণীরা
ইতিহাসের ডুবসাতারে ভাসবার আগে অস্ফূটে বলে
শরণাং গচ্ছামি : গৌতমই এখন সর্বহারাদের ঘরামি
৫.
ঘুটঘুটে অন্ধকার এক রেস্তরায়
খাদ্যের পরিবেশক ও পাচক সবাই অন্ধ
মেনুতে সব দেশের সব রকম খাদ্য
মসলার বদলে অনুপান হল অনুভূতি
জাফরাণ-অনুভূতি, দারুচিনি-অনুভূতি
পুদিনা-অনুভূতি, রংধুনু-অনুভূতি…
পাচক আসলে পাকাতে চায় খদ্দেরদের মাংস
কিম্বা খদ্দেররা এরি মধ্যে পরিণত খাবারে
ঘরে বাইরে খাদ্যগুলো এখন খোদক
হজমির অষুধ দেবে বোধিসত্যের নির্মোক
গোধূলিমাখা বিচিত্র বকুলের সালাদের পর
চাওয়া-পাওয়ার হিসাবের নেতৃত্ব দেয়
পরমের গেরুয়াধারীরা। রংধনু এখন রেঙ্গুন।
রেঙ্গুন ক্রমশ গড়ায় নির্বাণের রেস্তরায়
৬.
আমাকে খুন করে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে
রেঙ্গুন নদীতে : আমি ডুবে যাচ্ছি
আমার নির্ভার গেরুয়ার ভারে
প্রতিবেশীরা ঘুমিয়ে পড়েছে নদীর তলায়
যাতে আমার শরীর না ছোঁয় যন্ত্রণার পাতাল
আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে
জলচরেরা জিভ ছোয়াচ্ছে নির্বাণের প্রথম সিড়িতে :
বন্ধুবৎসল শুশুকের ঝাঁক
আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বয়ে নিচ্ছে
ওদের ওপরগামী ফিরতি সাঁতারে
প্রত্যেক জলচর প্রাণ শঙ্খনাদে হেসেছে
আমার উভচর অরহৎ দোলুনীতে
আমি ডুবে যাচ্ছি : আমাকে খুন করে
ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে রেঙ্গুন নদীতে
৬.
নির্বাসনে যাই আনন্দের পানশালায়
আজলাভরে পান করি সূর্যমুখীর রেণু
সূর্যরসে টইটম্বুর হবার পর
দেখতে পাই আমি পুরুষ কিন্তু স্পর্শকাতর
এবং অক্টোবর বীর্য খালাশের মাস
হরিণীরা সঙ্কেত পাঠাবে হরিণদের
ধাওয়া পালটা ধাওয়ার আদুরে ভঙ্গিতে
তাড়িত হরিণীরা ভান করবে পালানোর
কিন্তু আড়াল নেবার কোনো তোয়াক্কা করবে না
শান্তিনিকেতনে ও সুন্দরবনে
হরিণ-হরিণী মিলিত হবে চাঁদের বাগানে
বুদ্ধসঙ্গমে হরিণ হরিণী যখন ভরপেট
মিতকথনের মলাটে ছররা হানে ঘাতকের বেয়নেট
হরিণশাবক তখন লিঙ্গনিরপেক্ষ হরিণা
লন্ডন, সেপ্টেম্বর ২০০৭
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : আশি দশক,
চয়ন খায়রুল হাবিব
মোহাম্মদ রফিকের কপিলা থেকে


কানে ফুল নাকের নোলক তারও
বহু আগে
পঞ্চাশের মন্বন্তর, ডোম্বি বাড়ন্ত আহার
তবু
বাবুদের আনাগোনা
এমন শরীল একহারা
নরম কাদায় চ্যাং
বন্ধকী দিছিস বাজু
এই বাজী
বিয়ের রাতের থনে
জউনার উচাটন সোতে
নাও দিয়ে পারাপার
পারানির কড়ি
চোলাইয়ের
স্বাদে
কার্পাসের ডালে ডালে ফাট্যা পড়ে ফুলের আগুনি
হরিণী কতোটা জানে কতোটা সে সত্যিই হরিণী
নগর বাহিরে
দূরে
ভোর-ভোর পৌষের পার্বণে অন্য
ঢেঁকিতে ধানের গন্ধ
অন্যের দাওয়ায়
হাত পেতে
দু’একটা তেলেভাজা পিঠের আস্বাদ
ঝোলা গুড়
কানে ফুল নাকের নোলক তারও
বহু আগে
বুড়ি মা জমির ভাগ চলে গেছে মহাজনী সুদে
বড়ো হবি
তোরও একদিন রাগ করেচে রাগুনি
এক্ষুনি রে আসবে বর
দূর গাঁয়ে
ফিরবি নাইয়োরে
গ্রামপথে দু’একটা কোঠাবাড়ি হাল
আমলের জমিদারী
কাছারি ঊঠোন
ভ’রে
বাও দিচ্ছে ধানের মাড়াই
ওড়ে তুষ
তুষের কুহেলি
বৈঠকখানায় হাঁটু গেড়ে লোক
তামুকের ধোঁয়া
বাপমা’র ছনঘর
ঠিক
ঠিকই আছে পোড়ো-পোড়ো
স্বামীর সোহাগ বাহু
গলায় গুঞ্জের মালা
ব্যবহৃত আদর শরীলে এক
ওঠা-নামা হঠাৎ বকুনি
মুখ ঝাড়া দু’একটা
ওরে ডম্বি
চড় বা থাপ্পর
এই
বাদশাহ না হ’লেও বাদশাহী রীতি
কানে ফুল নাকের নোলক তারও
বহু আগে
পাল্টেছে শাসন রাজা অমাত্য রাজন তবু
কিছুই পাল্টেনি
খাল পাড়ে
বড়োজোর দু’একটা চালকল
ইতস্তত কিছু কাক
জউনার খরস্রোত জউনায় আজও উচাটন

অ্য মাগী তুই ফ্যাচরফ্যাচর দাঁত ক্যল্যায়া অত্তো হিহি
এ্যত্তো বড়ো অসুখ লইয়া কোন মুহে তর হাসন আয় যে
ক্ষয়ের রোগী হাসির লগে দাঁতের গোড়ায় অ ছ্যামড়ী তর
পুঁজের মতোন আজ মরিবি না হলি তো কাল মরিবি
অ মাসী তুই ঐ যে দ্যাখ না
দোরের গোড়োয় বেলির কুঁড়ি
মুখটি টিপে ক্যামনে হাসে
অরে একবার ক্যান জিগাও না
সন্ধে হলি পায়ে আলতা ঠোঁটেঁ আলতা চোখে কাজল
একবার কাঁদস একবার হাসস বুকের আঁচল খুইল্যা পইড়্যা
একবার উইঠ্যা গুনগুনায়া গাইতে থাহস জানলা খুইল্যা
গাঙ্গের পানে ভোলা নায়ের সুজন মাঝি ফ্যালফ্যালাইয়া
অ মাসী তুই এট্টু দ্যাখ না
গাঙ্গের জোয়ার ক্যামনে ক’রে
নিজের বুকে মোচড়ানি দেয়
অরে একবার ক্যান জিগাও না
দু’দিন পরে গতর খাগী মইরা যহন পইড়া রবি
ধনচাবনে কুকুর আইসা টান্যা লইবো শিয়াল খাবো
বাবুরা সব ভুইলা গিয়া অন্য মাগীর ঘর টোয়াইবো
ভুল কইর্যা কেউ তোর কথাডা খালি ঘরডা খোঁজ নিবো না
অ মাসী তুই পায়ের মলডা
হাতের বাজু কানের লকেট
খুইল্যা নিবি তারপরে না
পা ছড়াইয়া কাঁদতে বইবি
অ মাসী হোন ঐ টুহুতেই আমি খুশী বেজায় খুশী
ও পারেতে কালোরঙ্গা বৃষ্টি পড়ে এ পারেতে
লঙ্কা গাছটি রাঙ্গা টুকটুক গুণবতী ভাইরে আমার
আমের পাতা জামের পাতা ছুটছে এবার পাগলা ঘোড়া
অ মাসী তুই বল না দেহি
পাগলা ঘোড়া দেখতে ক্যামন
ছুইট্যা চলে পাঁজর ভাইঙ্গা
ক্যামনে তারে সামলে রাহি
অ মাসী তুই পোড়ামুখী জবাব না দি কানতে বইলি

প্রতিটি হাঁটার ঢঙএ
হাতের মুদ্রায়…মৃত্যু
সারামাস রোজা রেখে ঈদের সকালে গোস্ত
অনাহারী পেটে খাদ্য…মৃত্যু/বমি/ওলাওঠা/জ্বর
কব্বরের ভেতর কবর ভাঙ্গা ঝুরঝুরে খসা কব্বরের ভেতর কবর শীত
খ্যাঁক শিয়ালের…বাসা
এক দুই দুই এক
চোয়ালের ভাঁজে…ক্ষুধা
বোক্ষের পাঁজরে…ক্ষুধা
কুয়াশার তাজা ভোরে…ক্ষুধা
এক বুড়ি। জটা বুড়ি। বটের পাতায় জ্যোৎস্না ঝিলিমিলি দীঘিজলে
বাদুরের ডানা…ছায়া
নিদ্রাহীন চোক্ষে ঐ
চোক্ষের আগুনে…ক্ষুধা
নবান্নের
পার্বণে আমন গন্ধে
প্রত্যেক চীৎকারে…মৃত্যু/জরা/ক্ষুধা/ছায়া
উঠোনে উঠোনে ক্ষুধা
ছড়ানো ধানের…ক্ষুধা
বিপ্লবে
বিপ্লবে উত্তোলিত হাত দাঁতে দাঁত কামড়ে উত্তেজিত
প’ড়ে থাকা মাটি…জরা
খালেকের বেতো বৌ জুরুর কপালে
কবিতার কালসিটে স্পষ্ট গাঢ় বিরাট অক্ষরে
ক্ষুধা/মৃত্যু/মৃত্যু/ক্ষুধা
রঙ্গিলা নায়ের মাঝি ভাটির নদীতে যাও বাইয়া…ক্ষুধা
বাওকুংটা বাতাস যেমন মরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া…জরা
ফান্দেতে পড়িয়া বগা বন্দী হইলো ধর্লা নদীপাড়ে…মৃত্যু
খানকীমাগী স্বভাব যেমন ধরা পাঁচ টংকা স্বামী…ছায়া
খসম গ্যালো রে কৈ ছাড়ি…জরা/মৃত্যু/মৃত্যু/ছায়া
যদি ভাগ্যি ভালা হয়
খোদার ফজলে য্যান
মরণের বহু আগে কাফনের সাদা থান
রাখা যায় মাচানে গোছায়ে,
ক্ষুধা
মৃত্যু
ভয়
থাক
প্রতিঘরে ঢেঁকিশালে
রান্নাঘরে
থাক
বেঁচে থাক
জরা
খুদকুঁড়ো
ক্ষুধা
ভাগ্যির কপাল, যে যে ভুলুক, তবু তো ওলাবিবি
ভোলেনি কিচ্ছুতে…ঠিক চিনে নিছে…ক্ষুধা

প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে
অনাড়ষ্ট
রাঙ্গা জলে রক্তের জোয়ার বেয়ে নিজ হাতে
ভাঙা ডিঙি নাও
পৌঁছে যাবে পদ্মার চরের কোনো এক ছন ঘরে
সন্ধ্যায় দু’হাতে মুখ ঢেকে
চোখে জল। অভিষিক্ত হবে সাধারণ ঘরে খেটে খাওয়া
সাধারণ মেয়ে। শস্যের রাণীমাতা
ব’লে উঠবে তারস্বরে; না, ওটা ছিলো ঘুম, ঘুমের
কুহকে ভুল স্বপ্ন
ডাইনী বুড়ির লাশ প্রাসাদের সিঁড়ি গড়িয়ে-গড়িয়ে
কোথায় মিলিয়ে গেছে
ভুল ইতিহাসের বেনো জলে গেছে বেনা ভুবনের বেনা
স্রোতের তাণ্ডবে
বেঁচে আছি, বেঁচে থাকবো, সত্যিকার রাজমাতা
পেরিয়ে রুপোর দেশ মাটির সানকিতে লাল চাল
নোনা ডাল দাঁতে কামড়ে কালো মাটি ভেজাল কাঁকর
রাজহংসী
অংশীদার সম উৎপাদনে

একজন গপ্পো বলে অন্যজন সেই গপ্পো শোনে টুপটাপ
হাসিখুশী
গাইয়ের ওলানে মুখ শস্যের খামার, ওড়ে চুল
চোখে স্বপ্ন, রাখাল বাজায় বাঁশী, ছুটে আসে শুক
সারস ময়ূর বেজী হাটভাঙা মানুষের মুখ
নিশ্চিন্তে অচিন
স্বপ্ন
হাতে সড়কি কাঁধে ধনু বাহুতে কবিতা খাপখোলা
তরবারি, এই স্বাদ
চুঁ’য়ে পেকে ওঠে ধানশীষ। বটবুড়ো
নাড়ে জট
কুঁচের বরণী কন্যা মেঘের বরণী চুলে পায়ে প্যাঁক শাড়ির আঁচলে
ছেঁড়া লজ্জা ঢাকে মুখ
তবু নেই শেষ। নেই-নেই নিরুদ্দেশ
স-বু-জ
সবুজ
দেশ
উড়ে আসে কাক। বেশ! বেশ!
যার কোনো শুরু নেই তার নেই শেষ।
মোছো রক্ত, পৈঠার ওপরে কালসিটে এই
লড়াই চলবেই
কপিলা বই থেকে নির্বাচিত অংশ পুনর্মুদ্রিত হলো। স্কেচ: কাইয়ুম চৌধুরীর করা কবিতার অলঙ্করণ
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : ষাট দশক,
মোহাম্মদ রফিক
ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল

শামীম রেজা
বিসর্জনের প্রতিমার মতো ভাইসা যাচ্ছি কূল থেইকা কূলে জোয়ার ভাটায়, নক্ষত্র থেইকা অপার অন্ধকারে… অন্তিম চাহুনি ভাইসা গেছে স্বপ্নের জলের বহু আগে দুঃস্বপ্নের অন্তহীন রাতে। নিরন্তর আশ্বাসে যারা কাহিনী লিখাছে তাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করি, অন্তহীন মৃত্যুর জমপেশ এই উৎসবে। তোমাদের অভিসম্পাত দেই আর জিজ্ঞাস করতে চাই, পায়রা রঙের দিন ছিল কোন কালে কবে? এথেনসের জন্মঘড়ি থাইমাছিল কলিঙ্গের মৃত উৎসবে, অন্ধকারের পটভূমি লেখা আছে উদয়গিরি, অস্তগিরির গায়, দেখো দেখো নগরীর সমস্ত নিষ্প্রাণ আলো বিমর্ষ তাকায়। মৃত্যু তুমি কোন গ্লানি রেখা মুইছা দিতে চাও আমার সবুজ ডানায়… শূন্যে শূন্যে সংঘর্ষ রেখা আঁইকা যাবো মৃতপ্রায় স্তনের গোল কমলালেবু চিহ্নের উপর, তোমার শরীর আর শরীরের ভেতর যত প্রিয় মেঘ আছে সব আমি বৃষ্টি হয়া ভইরা দেব রক্তধারায়। অহেতু নিরুদ্দেশ যাত্রাকালে তোমার শরীর কাবার মিনার ভেবে জিয়ারত ছলে পোড়া নক্ষত্রের স্বাদ পাইয়া চুপি চুপি ফিরাছি ডেরায়। চোখের তারায় নগ্ন নারী দেহের মতো বিদ্যুৎ চমকায়, সেই থেইকা… গ্যাস চেম্বারে পুরো সাতটা বসন্তকাল ঘুমানোর আগে, অনন্ত মরুর দিকে চাইয়া থাইকে শুধু কিছু উটের ওলানের ছায়া আটকে যাইতে দেইখাছি অপোগণ্ড রাতে। একি দৃষ্টির বিলোড়ন!…
গভীর অন্ধকারের দিকে যেতে যেতে নিমজ্জিত জাহাজের হুইলে হাত রাইখা দেখেছি স্বাধীন মাছের সংঘারাম, পটশূন্য কার্তিকের মাঠে তোমার আমার কঙ্কাল ছায়া পইড়া আছে খড়ের ভাঁজে। কী সব অনুভূতির কেলি শুয়োরের সদ্য আগুনের অক্ষরের মতো পোড়ে মনে, চারিদিকে বিবস্ত্র বিশুদ্ধ অযুক্তির ভিতর থেইকা পাশা হাতে কতিপয় মুখ প্রেমিকার স্তন কাইটা জুয়া খেলে রাতে; অসমাপ্ত গল্পের পোকা শাইন জাল বুইনা চলে গভীর অক্ষরে, আততায়ী চোখে ঠাণ্ডা আগুন বাড়ে, আর কতিপয় বন্য শুকোর তার চোখ থেইকা নামে হৃদয়ের সবুজ কফিক্ষেতে, স্খলিত ঈশ্বরীর স্তনে মুখ রেখে তীরে বিদ্ধ করি জোছনার শরীর, কী সব অনুভূতির কেলি শ্মশানের সদ্য আগুনের অক্ষরের মতো পোড়ে মনে, ঘোড়ার কঙ্কাল হাঁটে কলিঙ্গের রাজপথে, সেইসব খোরাসানী ঘোড়া — ঘুড়ির খোঁজে মধ্যরাত শেষে নাইমা আসে আমাদের গাঁয়, সিডরের বাণ তখন হেমন্তের সমস্ত জানালা ভাইঙা দিয়া যায়।
কোনো এক কঠিন অন্ধকারের পায়ে বারবার ঘুঙুর বাঁইধা অসমাপ্ত গল্পের পোকা জাল বুইনা চলে গভীর নিরুদ্দেশে… সূর্যার রথারহণকালে তুমি কেন মৃত আপেলের ঠোঁটে কামড় দিছিলা? চারিদিকে রক্তের নেশা, রাত্রির কঙ্কালে মৃত খোলা ঝিনুকের মতো যোনির লাবণ্য ছড়ায়; তবুও কোথাও জন্মের উদ্ভাস চোখে পড়ে, মৃত্যুর আহ্বানে। এ কোন আদিম রূপকথার জোছনায় ডাকছো তুমি, প্রিয়তমার নিঃশ্বাসের ভিতর থেইকা হায়ানার সাদা দাঁত বাইর হয়, জোছনা রঙে; ঐ দেখো, ইন্দ্র তুচ্ছ সাধন ত্রুটিতে নিদ্রিতা প্রিয়তমা দিতির গর্ভে প্রবেশ করে ভ্রূণ খণ্ডিত করে যোগমায়ায়; এত নিয়ম মেনে কীভাবে বেঁচে থাকা যায়? কী সব অনুভূতির কেলি শ্মশানের সদ্য আগুনের অক্ষরের মতো পোড়ে মনে; ও কালপুরুষ, তুমি সবার অলক্ষ্যে কী দেখছো অমন করে? দেখো দেখো জ্বলন্ত অঙ্গার তালুতে মুঠো কইরা তৈরি করছি স্বর্ণের বাড়, তোমাকে পড়াবো এমন অলঙ্কার।
আমি এক প্রদোষের যাদুকর; অদৃশ্য শকুনের ছোবলে উপরে গেছে আমার চোখ, বুকের সমস্ত প্রিয় অক্ষর, তবুও প্রত্নচিহ্ন মুইছা যাওয়া মৈথুনমূর্তির সমস্ত রূপ পাঠ শেষে ভালবাসার খাদ থেইকা দূরে দাঁড়াই বাসক সন্ধ্যায়; আর তখন আবহ দৃশ্যে সুর তোলে নীলাম্বরী হাওড়ের ঢেউ; আমি কি প্রমিথিউস, জিউসের ঈগলের ছোবলে ছোবলে পুনঃ পুনঃ যকৃত জন্ম যার, ককেসাস পর্বত ঢালে; নাকি মা-কালীর অনাড়ম্বর সন্তান যাকে ধ্বংসের জন্য পাঠানো হয়েছে আনবিক- অমানবিক এই মৃত্তিকায়, সমুদ্র সৈকতে জন্মানো বিলি কাটা লাল কাঁকড়ার মতো আমার অন্ধ চোখ থেইকা বেরিয়ে আসে সাদা কবুতর, আর তখন পাগলা গারদের দেয়ালে সমস্ত রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে, মেথরপট্টিতেই শুধু চড়সের ঘোরে নাচে কৈতর — তোমরা যাকে তুচ্ছ করো, তোমরা কমলালেবুর মতো গোল সার্কাস মাঠে ইঁদুর-বিড়াল খেলার মায়ায় গল্প ফাঁদো। প্রতিটি মজা পুকুরে ডুমুর বিষ ছড়াতে ছড়াতে প্রিয় মাছগুলি মেরে জোছনা তাড়াও। ভাবো, জলবেশ্যাদের উপবাসী রাতে ঈশ্বরের নপুংশক শিশ্নের কথা, ভাবো আমার অন্ধ চোখের গোলকধাঁধায় নিমজ্জিত হাজার বছরের না ঘুমানোর কথা।
জীবন-জুয়ার কোর্টে টিকটিকির মতো লাফালাফি করে আমার অবিশ্বস্ত আঙুল, মুমূর্ষু গ্রামের দেয়ালে সারারাত সুর তোলে নদীর ভাঙন, আর টিকটিকি চোখে তুচ্ছ পতনের মতো ভাসি ঘূর্ণিজলের ছায়ায়; সরোদের সুর শুনি ভাঙনের গাঁয়… সুরের ভিতর থেইকা একটা আত্মঘাতী বাইসন কীভাবে যে তাইড়া আসে নিরীহ অনুভূতির পাড়ায়। আমিও যোগমায়ায় ডুইবা যেতে চাই প্রিয়তমা তোমার অপর দিঘির ভিতর… শত্রুতায় নয় শুধু ভালবাসায়, ও কালপুরুষ জ্বলন্ত অঙ্গার বুকে পুইড়া রাখি যেখানে ভালবাসা ফুরায়।
বিক্রি হয়া যাওয়া সেবাদাসীর চোখের মতো আমার চোখে ভাসে শৈশবের অন্তহীন নক্ষত্রের পথ, সমস্ত হাওড়ের স্থির জল বুকে পুইষা পুইষা মেলাই প্রত্নযুগের হারানো অক্ষর। সৃজনের পিছের আঁধার দেখতে চেও না তুমি, চারিদিকে মিলবে শুধু অদ্ভুত-অদ্ভুত মরুভূমি, মরুভূমিরও সৌন্দর্য আছে, এমন কি মরীচিকার। জানো কি, অসীম কালের কোন রেদ্যার টানে, গ্রহের দেহ পাল্টায় ভাটা আর জোয়ারের বানে;
শৈশবের কথা মনে এলে টেঙো আর সানাই বেজে ওঠে বৃক্ষ শাখায়। এখনও তারা যেন ইসকুল মাঠে বৌচি খেলার ছলে নক্ষত্র বাজায়। পাহাড়ি রাস্তার ভাঁজ খুলে দুর্গম গিরি অতিক্রমের পর মনে হলো এ যেন তোমার অসমাপ্ত সুর আর শরীর, প্রাচীন পাণ্ডুলিপির অক্ষর আবিষ্কারের নেশায় পেয়েছে আজ: সারারাত ধরে ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ, প্রার্থনার মতো পইড়া থাকা বিকলাঙ্গ পিতার মুখ, আলো না অন্ধকার ছড়ায় — এ কথা বলা দায়, এ আর এক যুদ্ধের পরিহাস, রাত্রিকে তার অন্ধকার নিয়া থাকতে দাও, রাত্রি শেষেই তো সকালের সবুজ গান, একথা বলে গেল অচেনা এক কবুতর।
দ্রাক্ষাবনের কাছে শান্তির বাণী শোনাবে বলে যে মেয়ে ক্রীতদাসী হয়া বিক্রি হয়া গেলো ত্রিপলীর মন্দির থেকে অবেলায়; সেইই ছিল আমার রক্তের বোন, তাকে এখন পাবো কোন অ্যাসিরীয়ায়। হায় নিশাপুর, খৈয়াম, তোমাকে দেখবে বলে রুমী গিয়াছিলে… তোমার ডেরায়, হাফিজের সাথে ছিলাম আমি — একটি হ্রদের পিছনে পিছনে সমুদ্র হাতে হেঁটেছি কাল থেকে কালের ফুলশয্যায়। হায় সেবাদাসী তোমার পাঠানো চিঠি থেইকা অক্ষরগুলা ক্রমাগত কোথায় যেন ঝইরা ঝইরা যায়, একদিন যারা তোমার শরীর পরিভ্রমণ শেষে স্বর্গের নয়টি স্তবক এক করেছিল মিথ্যা ভালবেসে, তারা আজ কোথায়? অথচ তোমার সমুদ্রের বিভিন্ন সত্তা এই গ্রহটি সাতটি নাম পরিগ্রহণ শেষে একটি নামে মিশে গেছে একই আত্মায়, আত্মা থেকে একটি সুর সমস্ত পাখিদের কণ্ঠে পৌঁছে গেলে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন সুরের সিম্ফনি তৈরি হয়, এই সুর বুকে কইরে সপ্ত আসমান সপ্ত জমিন উপরে নিচে খুঁইজা কোথাও পাওয়া গেল না সপ্ত আসমান জমিনের রূপভার, সপ্তর্ষিমণ্ডলে ঘুইরা ফিইরা আইসাছি এবার। নক্ষত্র আর নক্ষত্রের গোলকধাঁধাকে মহাজন এক কবি ভেবেছেন অনন্তশয্যার এই স্বপ্নগোলক, যাকে তোমরা অন্য নামে জানো।
এতদিন পরে আমি জেনে গেছি সমস্ত জ্যোতির্ময় গোলক পাওয়া যাবে আমার আত্মার ভিতর — আর এই জ্যোতির্ময় গোলকের ভিতরই আমার আবর্তন। জমিন কি আসলেই আকাশের ক্রীতদাস? দেহ কি আত্মার, তুমি কি আমার…? মাকড়শার নিপুণ জালে যেমন পোকামাকড় আটকে যায় তুমি আটকে গেছো গভীর গোপনের গোপন গোপনীয়তায়; পর্বতের শেষ শিখর স্পর্শশেষে খ্যাতির মোহে আর উন্মাদনায় মেতে উঠছিলা সবকিছু জেনে; নিচেই উপত্যকা গভীর খাদ — জানো তো তোমাকে নামতে হবে শেষ স্টেশনে, চূড়ায় উঠলেই আরো নিচে…হয়তো নামতে হবে নিস্তব্ধতারই জলে, জানি আমাদের এই ছোট্ট গ্রহখানি ছড়ায়ে পড়বে মহা বিস্মরণে অন্য কোনোখানে… সব প্রতিশ্রুতি ভাইঙা চইলা যাবে নিঃস্তব্ধতার গানে, অসংখ্য ঘূর্ণনে যখন মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলাম সেদিন ছিল না অফুরান আলো — সেই তো নিঃসঙ্গ হলাম, আবার ফিরে যাব স্তব্ধতার দেশে, ঐ দেখো মৃত মানুষ জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর এক একটা উজ্জ্বল আলো হয়া ভাসে।
যে আমি জ্ঞানের কাছে বিনম্র, যে আমি বেহেশতের চাবি হারায়েছি মেথরপাড়ায় — যা আমি খুঁজতে চাই না আর — এ এখন জাইনা গেছি অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই যদি তাৎপর্য হয়, তবে তুমি অর্জন হেতু মৃত, তমসার। তমসার পক্ষপাত হয়ো না মানুষ — মানুষের অতীত ভবিষ্যৎ নেই — থাকে শুধু মানবতা- ভালবাসায় — একথা বলেছিলা তুমি। জানো তো স্খলিত ঈশ্বরীর পা থেইকা ঘুঙুর সইরা গেছে আজ ঘৃণায়। উত্তর দিকে চাইয়া দেখো ওইসব খোরাসানী ঘোড়ার কঙ্কাল আজ বাতাসে নাচে — বাবুরনামার পৃষ্ঠা থেইকা কামান আর শাদা শাদা ঘোড়ারা সব ঝইরা গেছে অবশেষে, সাপের খোলশে হেমন্ত ঢুইকা বইসা আছে আজ, সম্মুখের পথ আগামীর গান গাইয়ে ওঠে বলে অনুসরণ করো আলোর নদীর দিকে যাত্রার… অথচ তোমার বুক পকেট থেইকা অনাহুত পোকার মতো বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত সব শাদা শাদা খরগোশ; আত্মাকে খরস্রোতা জলের মতো করে মস্তক অন্বেষার কাজে লাগায়ে সেইসব খরগোশের বাড়ি যাব এবার।
বিগত সব বসন্তে স্মৃতির করিডোরে গোপনে হাঁইটা গেছি নীল নদের ডানায়, মনপোড়া ছাইহীনতার ভিতর দাঁড়ায়েছি এই শিশুগাছ; সেইলেনাস হে অর্ধমানব, তোমার সিম্ফনির ধ্বনির অনুরোধ, শৈশবের কৌটায় যে রাণীর প্রাণভোমরা আটকে ছিল সমুদ্র তলের পাতাল সিন্ধুকে — তাকে তুমি সুরের তালে তুইলা আনো এই সৈকতের নির্জন বালুরেখায়। পৃথিবী থেইকা সব স্বপ্নরেখা মুইছা যাচ্ছে, মৃত্যুর সিঁড়ির তলায় ঘুমাইয়া পড়েছে একে একে অবশেষে, পৃথিবীর সমস্ত কালো ঘোড়া একসাথে ঢুইকা যেত ঠাকুমার ঝুলির অন্দরে, সেসব ঠাকুমারা নাই, বিশাল আকাশ-মাঠ-দিগন্তরেখা ঢাইকা গেছে পোড়ামাটির বেশে। নিঃসঙ্গ শিশুবৃক্ষ আমি, ঠাকুমার ঝুলি থেইকা বের হয়া কালো হাতির পিঠে চড়ে বেরিয়েছি কাল থেকে কালে, এসব এখন কল্পনার দূরতম গ্রহ, স্বপ্ন ফবিয়া বইলে মুছে দিচ্ছো প্রিয় পায়রার উড়াল! শিকারীর ফেইলা যাওয়া মুহূর্তগুলির ভেতর মাছ হইয়া সাঁতরাই আর মাঝে মাঝে সুরের খোঁজে কাঁসারিপট্টির দিকে যাই — দেখি দূরের শহর উইঠা আসে বন্দি পাখির খোপে, ফ্ল্যাট মনে কইরা ঘুমাইয়া আছে প্রিয়তমা আমার, অনুগত একটা রাতের সরলতা হারানো ক্ষোভ মনে পড়ে, বসন্ত উচ্ছেদ কালে…
আমাদের চোখগুলা নিয়া যারা মার্বেল খেলেছে মধ্যদুপুরে পশ্চিমপাড়ায়, তাদের কথা এবার থাক, পাগল হবার কিছুদিন পূর্বে সে চোখ বন্ধ করে হাঁটতো আর মধ্যরাতে একটা সাদা ঘোড়া তার বুক থেইকা বাইর কইরা তার পিঠে চইড়া মিলায়ে যেত দূর টিলার উদিত রেখায়, সকালে ট্রেনের হুইসেলের মধ্যে বিরান মাঠের নিঃসঙ্গতা বাজতো তার কানে, আর আমরা দেখতাম শ্রীচৈতন্যের হাড়পোড়া ছাই হাতে সে সূর্যরশ্মি আঁচলে গাঁইথা দুপুর উড়ায়। আমি হাতির চামড়ার তাবু তলে অনুগত একটি রাতের পিঠে চইড়া ছুটছি অদৃশ্য শিকারের খোঁজে… এবার সমুদ্রকে শিকার করবো জেনে হনুমান পিঠে করে পালায়েছে তারা, দেখা হবে ভূশণ্ডির প্যারেড গ্রাউন্ডে… আসলে কী চোখ বন্ধ কইরা হাঁটতো সে? নাকি জন্মের পর পশ্চিম পাড়ার লোকেদের মার্বেলের প্রয়োজনে চোখ দুটা নিয়াছিল বড় অবেলায়। সাঁকো উপড়ে পইড়া ছিলা বারানী খালের উপর, তারপর কতবার পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ শেষে সমুদ্রকে কোলে নিয়া ঢুকেছে লেপের ভিতর। আর ব্রহ্মাণ্ড তুমি চোখ বুইজা ছিলা — যেন পাখি টুনটুনি! বিগত দিনের পুঁথির মতো অবেলায় পইড়া থাকা তার শৈশব ঋষি দৃষ্টিতে তাকায় আকাশের অন্তরালে — পৃথিবীর সব সুর সব পথ থাইমাছে যেখানে — সেই পথের ওপারে নাকি স্ট্রবেরির ঝোপ — সেখানে একাত্তরটা ব্রাউন-কালো জেব্রার চোখ পইড়া আছে আঙুর বাগানে। সাত মার্চে সিংহের গর্জন শোনার আগে বাগানখানা ছিল হায়ানার দখলে, এদিকে সরলতা গাছটি ঝড়ে উপড়ে নিয়া গেছে বিষখালী নদী — সেইসব পোড়ো কুঠীবাড়ি, তাঁতীদের গাঁও, বাড়ৈপাড়া, কৃষ্ণচূড়া গাছের ছালে যে নাম লিইখা ছিলা তুমি সেই প্রিয় নাম, আহা! সব-সব নিয়া গেছে অদৃশ্য বাইসন…
দূরে নাবিকের লাশ, সূর্যসেনের সেই ছেলেকে ভুইলা গেছি আজ। যে সূর্যকে মুঠো কইরা ব্রহ্মাণ্ড ঘুইরাছে অসীম ক্ষমায়, তোমরা তাকে পাগল বলেই জানো, হায়! নিদ্রাহীন শুক্লপক্ষের গুমগুম রাত — কুমারী মায়ের মেয়ে যার বিন্যস্ত বেনীতে নদী সাঁতরে গেছে — সাঁতরে গেছে পুলসিরাতের রাত, মুক্তিকামী মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ডানায় আমার উড়াল — সারাদিন ধইরে বাল্যকালের হারানো মার্বেল খুঁজি — হাতে উইঠা আসে অচেনা গেরিলাদের অসমাপ্ত চোখের অক্ষর — আর সেইসব অক্ষর থেইকা বের হয়া আসছে মুক্তির অচেনা সবুজ পথ। ও রহস্য প্রতীম রাত — তোর পিঠে চইড়ে ছুটছি অদৃশ্য শিকারের খোঁজে — এদিকে কুমকুম কাঁপে অন্তিম সন্তাপে আগুন রঙে — একবার সমস্ত রহস্যের পকেট কেটে ফেলছিলা তুমি — বলছিলা এ ফসল যৌথহেতু জন্মবৃত্তান্ত নিয়া কখনো ভাবিনি, ডিএনএ ঘেটে দেখো — চূড়ান্ত বিচ্ছেদ কালে তোমারে কী কইরে বলি এ সন্তানের দায় আমার সকলি, আমার। আঙুল কাটার ইতিহাস লেপ্টে আছে, আজ তাঁতের শরীরে — ওসব ভুইলা গেছো তুমি — জাইনা গেছো সব জেলপাখি পলায়নপর নয় — জেলপাখি — আর নিরক্ষর জালুয়ার বউয়ের স্বাধীনতা কি একই সূত্রে গাঁথা…? একথা জানতে চেয়েছো তুমি। বরফকলের শব্দ বাজছে দূরে, জন্ম গুলতি হারায়ে বোবা-কালা বালিকা নেশাগ্রস্ত ঘোরে বিজনের মাঠে। নীল নীল ট্রেন-নীল আয়না নীল আসমান — চিতাবাঘের ক্ষুধার্ত নীল চোখে ভাসে বালিকার নিরীহ ঝিনুক যোনি। অবচেতনের পাহাড় চূড়ায় এ কার চিৎকার ধ্বনি, হৃদয়ের কাঁটাঝোপে হামাগুড়ি দিয়া নামে, অচেনা নদী আর এদিকে নগ্ননীলের ভিতর থেইকা অঞ্জলি হাতে তুমি উড়ছো নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে সেতু রেখায় রেখায়।
চুল থেইকা খইসা যাওয়া শ্লোকের মতো কিছু আঁধার এখনো আমাকে ডাকে, আমি দেখি শবাধারে পইড়া থাকা বিবর্ণ গোলাপ তুমি — প্রেম কি ফুটন্ত গোলাপের মতো কখনো ফোটার পরে নিদ্রা না যায়, নাকি ব্রাউন নর্তকীর উরুমূল থেইকা বেড়িয়ে আসা পাখির উড়াল? আসলে সে কি ঈশ্বরের স্বপ্নদোষে সৃষ্ট কোনো আদিগন্ধম ফল? এখন আমি নীল চোখ আর নীল জোছনার পার্থক্য খুঁজি, খৈয়ামের কলমে আঁকতে চাই আলআকসার মিনার, যাকে নর্তকীর স্তনের গোলকধাঁধার মতো মনে করে কতদিন মধুমক্ষিকার কাছে গিয়া তোমাকে খুঁইজাছে ওমর। তরল কফিনের মধ্যে জেগে ওঠা সভ্যতা সুহৃদ আগুনে পোড়ানোর আগে স্যাক্সোফোনের সুরে মাতৃগর্ভের নিজস্ব ঘোরে দোল খায় মন; মাহুতটুলীতে এখন কারা থাকে কিংবা ইংলিশ পাড়ায় — সেইসব মেয়েরা লালময়ূরের ডানায় মারিজুয়ানা ঘোরে জীবন বেঁইচাছে বাগের মাথায়। বাগের মাথার কথা মনে হইলে বাগেরহাটের কথা মনে পড়ে, আর তুমি মারা বাঘের চামড়ায় জীবিতের ধূসর রঙ খুঁজছিলা ঈশ্বরীর। মনে পড়ে সংখ্যালঘুর প্রতি হায়েনার অফুরান আহ্বান।
নগদের বায়না ছাইড়া দিয়া কালের আয়না রাখছি হাতে, তুমি জানো না বিষাক্ত সাপের খাঁচায় রাত কাটায়ে চিনাছি তোমায়, তোমার শয্যায় কোলবালিশ হয়া শুইয়া আছি শ্বেত শুভ্র লাশ। এও জানি জোছনা রাতে ম্লান শ্মশান গাত্রে আঁকা লাল গোলাপ তুমি। ভার্জিলের বন্ধু অগাস্টাস কিংবা হোরেস সাক্ষী, স্বর্গলোকের অধিপতি রীয়ার গর্ভে যার জন্ম সে আমার সন্তান। ভর সন্ধ্যায় নিমগ্নতা ভাইঙা পাখিদের কান্না থেইকা যে জল গড়াচ্ছে তাদের বাষ্প হয়া উইড়া যেতে দেখছি সুমেরু পর্বতে, আর তাই চারদিকে বরফের বিস্তরণ, জীবন থেইকা কেন এতদূরে গিয়াছিলা অমন হীম নিঃস্তব্ধতায় — বরফের নদী একাই যায়, কীসের টানে — নাকি সে দেখেছে আর্যদেবতাদের নাভিমূলে হীন বর্ণভেদ — নাকি, কালো ইংরাজ নেটিভ বামনদের দেখেছিল সে — দক্ষিণের বারান্দায় উজাগরি ছায়াপথ চুপিচুপি বইলে যায়, জানো কি? বলিভিয়ায় যত রক্ত পলাশ ফোটে চে গুয়েভারার চেহারায়, বর্ণভেদ দেখিনি কেউ এসব পলাশ-পাপড়িতে। মন জালুয়ার জাল ভুল জোছনায় ফেইলা ফেইলা একটা শীতকাল অদ্ভুত পাখি হয়া যেতে দেখি। শ্রাবণ পুইড়া যাচ্ছে ভুল বৃষ্টিতে, তোমার সন্দেহে বৈচিত্র্যহীন বেহেস্তে দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস বাষ্পিভূত হয়ে অচেনা নক্ষত্রের জন্ম দেয়। শিরদাঁড়ায় সন্দেহের শীতল রাত্রি নামে, আঙুরবালা দাদরা বাজায় আর রাতের রহস্য গলে গলে পড়ে নক্ষত্রের অগোচরে। নক্ষত্রের শরীর বেয়ে নাইমা আসা পাহাড়ি মেয়ে তেঁতুলপচা গন্ধ গায় তার, অভিযাগে বলে, মায়াপুরে তোমরা যারা পরীদের স্তনে মুখ রাইখা বিপন্ন বিস্ময়ের ঘোরে কাটছো সাঁতার তাদের বলি সময় চেতনায় মজে যাইও না ইতিহাসের পাতায় খোঁজো দূর কোনো হেলেনের অভিসার — আবারও প্রশ্ন কেন করো — টিকটিকির লেজের প্রাণ কীভাবে মর্মে নিলা তুমি? কীভাবে বলতে পারো দেবতা এক মুখোশের নাম? মৃত্যুবিষ — গিইলা তুমি কীভাবে করছো হজম? সমকামী পিঁপড়েদের মন্দিরে প্রস্তরলিপিতে আঁকা পাইছো ইভ আর আজাজিলের সঙ্গম, ইভের জন্মের বহুকাল আগে নাসপতি বনের অদূরে কে প্রথম ভূতগ্রস্তকালে উদ্ধত হয়াছিল আদিমাতার উপর — আর সেদিন একটা নতুন সকাল ঘুমায়ে ছিল তোমার নিপলের বিমূর্ত-মূর্ততার ভিতর।
আমিই কি সেই আদি পিতা? ভূতগ্রস্তকালে যার ছায়াপথ হারায়েছিল তোমার জলপাই ডানায়। আর তখন এক একটি নক্ষত্রের জন্ম, এদিকে ইঁদুর দাঁতে কাটছো তুমি হৃদয়ঘড়ি, তুমিই কি সেই আদিমাতা, যার বুকে ছিল খোরাসানী তরমুজের ঘ্রাণ। পূর্বজন্মের বীজ অন্তর্লীন ছিল চোখে তার; সাবওয়ে ধইরা আকাশ নামছে ভাঙা ব্রিজের ওপর — জেনে রাখো দীর্ঘশ্বাসেরও আছে দীর্ঘ দীর্ঘ সেতুর ইতিহাস, শিরার ভিতর দলিতের রক্ত চলাচল, বিমর্ষ অনুযোগে সিকান্দার তোমাকে বলি, অবিশ্বাসের দীর্ঘ সেতু হচ্ছি পাড়, সাপ ঝুইলা আছে সবুজ লতার ভিতর; গভীর সমুদ্রে নীলতিমিদের সমকামী গানে জরায়ুর মতো ফাটা চাঁদ ওঠে রূপকথার হারানো বাগানে। ভেনাসের মর্মর মূর্তির ভাঁজে জ্বলন্ত চুরুট ভিজে যায়, উগান্ডার রাজপথে ইদি আমিনের চোখ গলে সীসা ঝরে — আর সেই সীসা বুকে কইরা অভিশপ্ত কোন পথশিশু দৃষ্টি হারায় — তাহলে অন্ধ লোকটি মূর্ছনা নদী তীরে কুফরী কালামে কেন সুর তোলে? নিশিবক ছাপ ফেইলা আত্মঘাতী জোছনায় কেন ওড়ে? এসব দেখে নিঃসঙ্গ মধ্যরাত পাশ ফিইরা শোয়।
এবার পরিত্যক্ত এক সেবাদাসীর কথা বলবো যে কী না চন্দ্রগ্রহণকালে তার যুবতী স্তন ভোগ দিয়াছিল আর্যদেবতার কোলে অনিচ্ছায়, তারই সন্তান নাকি আমি? এ প্রশ্ন নিজকে করেছি বহু বহুবার, প্রতি সন্ধ্যাবেলা জুয়ার ছকে গোলাম গোলাম হয়ে ওদের হাতে হেরেছি হাজার বছর, হাজার হাজার জন্মের অন্ধকারে, তাই এবার দেবী ও দেবতাকে মধ্যরাতে দিয়াছি বেঁচে সুজনঘাটার ওপার, তেড়ে আসা উল্কার পিঠে চড়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে খুঁইজাছি প্রথম কুমারীর স্তনের ছাপ — যা কি না তোমার ছায়া বহন করে…
মহাকালের দিকে একটা সিপটিফিন ছুইড়া দেয়াই যথেষ্ট, যা দিয়া আটকায়া রাখছিলা তোমার কৌমার্য, হৃদয়ের ভিতরে আটকে যাওয়া মহাকাল আর তার সমস্ত মায়া বিক্রি করবো ভেবে যেই পশরা সাজায়ে বসেছি অনন্তের পথে, অন্ধকারের উজ্জ্বলতায়, তখনই গুপ্তঘাটি থেইকা কে যেন আমায় তুইলা নিল, সেই কি প্রথম স্বাধীনতা হারালাম, নাকি স্বাধীন হলাম আমি? সেই কি প্রথম কৌমার্য ভেঙে ভিন্ন কোনো গন্ধমফলের স্বাদ এলো পৃথিবীতে, বন্ধন কি পরাধীনতা নাকি মুক্তির যে কোনো নাম?
হে জৈতুন বৃক্ষ, তুমি তোমার শারীর খোল পিছনেই আততায়ীর তীর, লক্ষ স্থির — জৈতুন বৃক্ষ আমার কথা শুনলো, আর আগলে নিল তার আপন অন্দরে, যেন প্রকৃত মা আমার, কিন্তু স্বার্থান্ধ জীবগুলা গাছটাকে টুকরা টুকরা করে ফেললো — আর আমি সেই থেইকা কাঠের ভিতর জাইগা আছি — অসীম ক্ষমায়, আমৃত্যু তোমাদের গৃহে, গৃহের অন্তরে, অন্দরে।
কেন এক কার্তিকের খরার রাতে টবের ফুলের পাশে অন্ধ চাঁদ শুইয়া আছে দেখে ভুবনেশ্বরের রাণী উন্মাদের মতো শরীর উড়ায়ে ছিল তারায় তারায়, আহা ভুবনেশ্বর যার দৃশ্যগন্ধে পুরোটা সময় চইলা গেল বাঁজাদের দখলে, সময়ের অন্তর্বাসে সময় — রহস্য লিপির মায়াযুগ থেকে কিছু প্রেমপত্র পাঠায়েছিল আমায়, অন্ধকার থেকে ছিলানো কুমারী জোছনার স্বর নেশাগ্রস্ত চাঁদের শরীরে আছড়ে পড়ে, তিমিগুলি আঁকা ছিল লিপির অন্দরে — আর লিপির ভিতর থেইকা বের হইয়া আসছিল ঋতুবতী মেয়েদের কফিন বক্স — আর কফিন বক্সের উপর লেখা — বাবার বাড়ি! স্বামীর বাড়ি! এই আমার বাড়ি এই আমার প্রকৃত ঘর — , ও দাসেরে নির্বাসিতের গান শুনাও — গানের মধ্য দিয়া বেরিয়ে আসবে ঝুমুরদলের সেই কিশোরী মেয়ে যে কি-না ছায়ারেখা আঁইকাছিল পাণ্ডলিড চিংড়িতে — অর্থাৎ শুরুর প্রথমভাগে পুরুষ আর মধ্যভাগে নারী হয়ে, হায়রে কোরাল দ্বীপ! নীলমাছ, র্যা শ মাছ তোমাদের জন্মের কালে কান্নাগুলা বিক্রি কইরাছি ফেরারি জোছনার সীমানায়, বনশীলায় সাদা পাখিটার মতো একা একা নির্জন ডাকি কুলহীন ভয়াল চরে, যেখানে চাঁদ একটা ফালতু পরকীয়া ফাঁদ বলে মনে হয়। জুয়াগ্রস্ত ফিউদরের হাত ধইরা একটু একটু করে খুন হইয়া যাওয়া আমার রক্তে আমি ভীষণ উল্লাসে মাতি।
বাঁইচা থাকার কতগুলা শর্ত দিয়াছিলা তুমি — মহাপ্রস্থান রাতে, আকাশের সব ক্যালিগ্রাফি ভেঙে পড়বে গোপন সংঘাতে, জানো তো তিব্বতের রাস্তায় অতীশের পায়ের ধুলো এখনো শান্তির বাণী হয়া কাঁদে, ঋষিরা অদৃশ্য পর্বতের সানুদেশে জোছনা গায় মেখে প্রতীক্ষা করে, কাকে চায় তারা — তাদেরই প্রতিনিধি নাকি তুমি? ওহে অন্ধ বাউল।
কসাইয়ের চাপাতির নিচে শান্ত মাংসপিণ্ড কাঁইপা কাঁইপা ওঠে কার, কফিনের ভাইঙা যাওয়া তক্তা থেইকা বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস আমাতে লুকায়, আমি কালো গরিলার চইলা যাওয়া দেখি, তারাগলা রাতের গর্ভে দেশত্যাগী পাখি কাঁদে খাদের চূড়ায়, অনন্তের দিকহীন জালে পেচায়ে গেছি আমি আর রাবেয়া বসরি, তার মুখ থেইকা বাইর হয় কিশোরী বেলার গোপন অক্ষর — অক্ষরে লেখা আছে শান্তি, শান্তিরেখার উপর মৃত পড়ে আছে কতিপয় জালালি কৈতর। নিজের লাশ বহন কইরা নিয়া যাচ্ছি আমি — জীবন জুয়ায় হেরে যাওয়া যুবককুমার, খড়ের চাতাল বইলা এ শহরে যা কিছু আছে তা নিয়া গেছে রাতচোরা পাখি। একটা মেঠো ইঁদুর মইরা পইড়া আছে ডাকবাক্সের নিচে, পিয়ন আর এ পাড়ায় হয়তো আসবে না কোনোদিন, তার প্রিয়তমার চিঠির পতিত বাক্সের খোঁজে ইঁদুরটা আইসাছিল বুঝি — কিছু অক্ষর আর কাগজের লোভে তুমিই কি সেই ইঁদুর, নাকি আমি? এদিকে ঈশা গাধার পিঠে চড়ে মরুঝড় থামাতে যাচ্ছে দীপ্ত আড়ম্বরে।
আমি চলমান নদীর কান্না দেইখা চোখের দীর্ঘশ্বাস ছড়ায়ে দিয়াছি প্রতিটি শ্লোকের বাণীর ভিতরে। বিষাদের পোর্ট্রেট হাতে তুমি বলছিলা শিকারী চোখের সব মন্ত্র শিখা গেছি আমি, প্রিয়ার হৃদয়পোড়া ছাই দিয়া বানায়েছি দাঁতের মাজন? আমাকে দাবানলের ভয় দেখিয়ে কী লাভ? এত জাল কারা পেতেছে কূলে? প্রিয়ার একটা তিলের জন্যে আজ আর আঙুরের দেশ সমরখন্দ বুখারা কেউ দিবে না সুন্দর হাতে তুলে; প্রেমের আয়ু আজ দু’মিনিটের বায়ুতে নাচে, মায়ের জরায়ু থেইকা ব্যবচ্ছেদ শেষে ভালবাসা ভাগ হয়া যায়, স্বপ্নও কি পোড়ে নিঃশ্বাস দ্রোহে, অদৃশ্য মানবের গায় জ্বর, আগুনে তৈয়ারি শরীর মনেতে সাঁটা তাম্র মোহর।
কালিপূর্ণিমা রাইত টেঙো বাজছে তারাদের গাঁয়, গান্ধারীর পুত্র দুর্যোধন মৃতপ্রায়, জালালী জোড়া কৈতর নিয়া বেহুলার গান গায় যুধিষ্ঠির কৈবর্তপাড়ায়। একটা ডুবন্ত চাঁদ নরম ঘাসের মইধ্য থেইকা ভাইসা ওঠে, ফিরিঙ্গির কোসা নৌকার পাটাতনে বসে কে তুমি মায়া দ্বারা মুক্ত করলা অভিশপ্ত খাঁচাজীবন, বয়সন্ধির চুমুতে ছিল প্রথম বিস্মরণ — নক্ষত্রে অবগাহন, এরপর বরফ নক্ষত্রের দেশে রুপালি রুপালি ট্রেন আসে, যাত্রী নাই, শূন্য আবিষ্কারের বহু আগে তুমি আইছিলা অচেনা সমুদ্রের নীল ভালবেসে, পথিবী জন্মেরও বহুকাল আগে — সেসব কথা লেখা আছে বৃক্ষের বাকলে পরাণকথার আড়ালে, অদৃশ্যের শাখায় শাখায়।
প্রাচীন নদীকথার খসড়ায় জলঘুঙুরের নৃত্যরেখা আঁকা আছে প্রিয়তমা, কালরাত্তিরে ঠাকুমার ঝুলি থেইকা দুয়োরানীর ফেইলা যাওয়া দেড় জোড়া হীরকখচিত ঘুঙুর পাওয়া গেছে — ময়না পাহাড়ের গাঁয়, হরপ্পার বহুকাল আগে পতিত এক প্রাচীন মৃৎ শয্যায়; আর সেখানেই নৃত্যরতা ছিলা তুমি, তোমার দীর্ঘশ্বাসের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁইজে পাওয়া গেলো এক গ্লাস বাঘের দুধের ভিতর। মৃতদের শাদা জামায় বোতাম থাকে না, যেমন দীর্ঘশ্বাসের অর্থের ভিতর নির্বিকার বাতাসও গড়ায়, জানো তো আসন্ন মারীর মধ্যে যেতে যেতে তোমার ছেঁড়া শাড়ি আজ পতাকা হতে দেখেছি, তারপরও প্রশ্ন জাগে মনে তুমিই কি সাত ভাইয়ের এক বোন চম্পা, যার পায়ের ছাপচিত্র আঁকা ছিল প্রাচীন প্যাগাদাসের গায়? আজ শান্তিবিদ্ধ হয়া ঝুইলা আছে তোমার হৃৎপিণ্ড, মাংস দোকানের শিকের আড়ায়। হায়! একদিন তুমিই বলছিলা যেখানে জ্ঞান কোনো লাভের সম্ভাবনাই তৈরি করে না, সেখানে বিজ্ঞ হওয়া মানেই দুঃখ পাওয়া — আমি প্রতিবাদ করেছিলাম, আর তুমি সূচকলে গার্মেন্ট মেয়েদের দিকে আঙুল নির্দেশ করে আমার অলক্ষে চইলা গেলা আলেকজান্দ্রিয়া থেকে দক্ষিণের কোনো বন্দরে, আমি শৈশব বীজের ভিতর পুনঃ উদ্গম হেতু দেখতে পেলাম প্রেম ঘুমায়ে পইড়াছে যে মৃত নদীর পাড়ে সেখানে শরাহত এক দুপুর ঘুঘুর তানে অন্ধ বেহালাবাদক ছড়ে সুর তোলে, তোমাকে ডাকে আর তুমি আত্মার কাফেলা ছাইড়া ইসকুল বালিকার মতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়া বইসা আছো সামনের বেঞ্চিতে নিরাকার, বানানো ঈশ্বরের ছায়ায়।
আমার মনে পইড়া যায় তাঙবংশীয় চীনা সম্রাটদের কথা যারা কী না, রক্ষিতাদের সতীত্ব রক্ষার্থে নিষিদ্ধ নগরীর প্রাসাদে রাখতো মহিলা কারারক্ষী — কেন মনে পড়ে এ কথার উত্তর জানি না আমি, যদিও এখনও এসব ঘটে আমাদের গাঁয়। বীজের স্বরের ভিতর সিন্ধুর ঢেউ কে কবে দেখেছে এমন প্রশ্নের জবাব চেয়ো না তুমি? কোন অসীম র্যাঁদার টানে গ্রহের কক্ষপথ পাল্টায় আর পৃথিবীতে নেমে আসে ক্যাটরিনা-সিডর নার্গিসের মতো অনিন্দ-প্রলয়-শিবাগ্রহ জোয়ার ভাটায়। হায় রাত্রি, যজ্ঞডুমুরের ফেটে যাবার শব্দে তুমি ভয় পাও, তোমার ভিতরের পোষা সিংহের ডাক শুনেছি আমি শৈশব নদীর ওপারে, অন্ধ বেহালাবাদক ছড় টানে এখনো অবেলায়; প্রেম ঘুমায়ে আছে মৃত নদীর ওপাড়ে — দূর থেইকা ডাক নামে ডাক দাও কেন তারে — ভুবনেশ্বর? হায় ভুবনডাঙার চিল। কেন ডাকো তারে, অসীম খেয়ায় অবেলায়, হস্তী সীলের হারেমেও থাকে অনেকগুলা মক্ষীরাণী সীল, একে মাছ না বলে অন্য কী নামে ডাকা যায়, একই কি খেলা চলে ব্রহ্মমণ্ডলে? সেখানেও কি পুরুষ নক্ষত্রের ডাকে এমনই ছুইটা আসে নারী নক্ষত্র সেবাদাসী সেজে? আমারই মায়ের মতো বোবা কালা স্বাধীনতা হীনতায়? সরস্বতী আর লক্ষ্মীকে সাজায়ে রেখেছি বাম পাঁজরের নিচে, শুধু জানতে চাই দেবতা আর ঈশ্বর কতকাল পুরুষ সেজে রূপকথার গামলার সমস্ত খাবার একা একা গিলে খাবে? আদর্শলিপির দিন চুকেছে সেই কবে, ফ্রকের চলও উইঠা গেছে আমাদের পৃথিবী থেকে, অনিন্দ উৎসবে ইংলিশ প্যান্ট পরে না কেউ, তবু কেন পৌরুষ আর উপনিবেশি মুখোশের ঢেউ, মনুসংহিতার ভিতর আঁতকে আঁতকে ওঠে! সুতোকাটা ঘুড়িটার খোঁজে শৈশবে বায়ু মণ্ডলে ঘুরে ঘুরে চাঁদের বুড়ির কাছে গল্প শুনেছি কত-কত এসব এখন শোনা হয় না অত শত।
প্রিয় বালিকার বয়ঃসন্ধির রহস্য — কাজলরেখা-গুনাইবিবির পালা আর সমস্ত দেবী কেন যে মা উতলা মাতৃভোগা, এ কথা বলেছেন বাংলোর বারান্দা জুড়ে হাস্নাহেনার জোনাকি ঘ্রাণ ছড়ানো সেই চাঁদের বুড়ি, আদিগন্ত অন্ধকারে হাপায় এখন, হৃদি শুনতে পাচ্ছো প্রিয় প্রিয় নাম — শূন্যে মহাশূন্যে গোলকধাঁধার মতো ঝিমায় নক্ষত্র বিভায়। সময়ের মধ্যে হাত-পা চালায়ে কী লাভ, খাদের বাঁক থেইকা কে যেন বলে শৃঙ্খলে রাখার এ আর এক উপায়, দেবীর ঘরে শলতে জ্বেলে অর্ঘ্য মারো পূজায় পূজায়! দুপাশে বেহালাবৃক্ষের প্রান্তর বনঝোপ সুরে ভাসে শিরশির পাহাড়ি হাওয়া — শলতে জ্বলছে অদ্ভুত জোছনায়।
মন্দির বলতেই যৌনমন্দিরের গান ভাইসা কেন ওঠে মনে?… একথা অন্ধ বেহালাবাদকের — একি হোমার — না কি তার পূর্ব কোনো পুরুষ? সে কেন খাদের বাঁক থেইকা নাম ধইরা ডাকে — আর বলে এবার সমস্ত ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি পাঠাচ্ছি দূরাগত কোনো দেবতার ঠিকানায়। ডুবরি চোখে সমুদ্রের তলদেশ দেখতে পাচ্ছ বইলা ভেবো না জাইনা গেছো আপন অন্দর। ঢেউয়ের নেশা অপ্রতিরোধ্য, বাঁইকা যাওয়া বীজ থেইকা উত্থিত স্বপ্নীল বীজ আমি — আদিবাসী ওম শরীরে আমার, তোমরা আকাশ স্পর্শ করতে পারো জাইনা দুহাতে আগুন পুইড়ে শায়ারীর গুপ্ত করাত হাতে ছুটছি মৃতদের পোঁয়াতি পাড়ায়। সেখানেই অন্ধ বেহালাবাদকের সাথে দেখা, সুরের মূর্ছনায় পরানকথার শরীর থেইকা বের হয়া আসছে ছোট্টবেলার পড়া যুবতী কাজলরেখা — আর তাকে দেখছি নিরুদ্দেশ ছায়াপথে ধূলা উড়ায়ে আজ সাকিরার কণ্ঠে স্পানিশ গান গেয়ে রাত্রি ফুরায়… এদিকে কাজলা দিদি বাগানের গায়ে লেপ্টে থাইকা চন্দ্র হাতে আমাকে ডাকে আদুরে গলায়, রূপকথার সব সুয়োরাণী দুয়োরাণীর শরীর পাল্টায়, হায় আলেখ্যলিপি দৃশ্যের পট — পাল্টায় পার্কের বেঞ্চ, আর আমরা দেখি অনাহারী মানুষের শরীর চাইটা খাওয়া এক একটা দিন গুঞ্জারমালার পুতির মতো ঝইরা পইড়া যায় সবার অলক্ষ্যে। প্রতিদিন অসংখ্য চিঠি আসে শোকে-চের ভিতর তারা ঘুমায়, পিয়ন এপাড়ায় আসে না স্বাধীনতার পরই ডাকের ভিতর ভাঁজ-করা চিঠির অক্ষর মুক্তা হয়ে গড়ায় সমুদ্র চড়ায়। শিশুঘুমে নিঃস্তব্ধ এত এত বছর। দিগন্তের ছায়া আইসা গাঁইথা গেছে ভিন্ন রূপকথার গাঁয়, মাঠ বাইয়া যে ছায়া মিইশা গেছে হৃদয়ের ঘুমন্ত বন্দরে — না ঘুমের রাত্তিরে তারে কেন আনমনে এড়াতে চাও, কোথাও অচেনা পাখির শিস চিঠির অক্ষর নিয়া কেঁদে ওঠে, খুব চেনা মনে হয় — এমন কি তোমাদেরও ঘটে অঘ্রাণের শেষরাতে ?… যখন জলপাই রঙের গাড়ি ঝলসে দিয়া যায় রাস্তা, ঘাট, মনের দরজায়। নিস্তব্ধতার মানে মুখোমুখি শিকারী চোখ নিয়া ইঁদুর বিড়াল খোঁজা? নাকি আহত শিকার চোখে নিঃশব্দ জলের পতন দূরে বাদ্য বেজে ওঠে অচিনপাড়ায় — এ খেলা চিরকালের।
বরিশালের পথে লঞ্চের কেবিনে বসে রাত পান আর নদীকে নারী মনে করে কে কবে ভাসায়েছো ভেলা — কোথায় পালালো আজ কথকঠাকুর, এই ঘুমন্ত বেলায় — অন্তহীন প্রসববেদনায় রাত জাগে, ভূমিষ্ঠ হবার অপেক্ষায়, নীলিমায় নিঙড়ানো ঘাসে হাত রেখে অন্ধ বেহালাবাদক সুর তোলে অন্তরীক্ষে বেলা-অবেলায়, আর চালতা ফুলের মতো শোভিত সফেদ স্তন জাগে গরিব মেয়ের বুকে।
আবার কোথাও নির্জনে অচেনা পাখির শিস শুইনা তোমার কিশোরী কণ্ঠে শোনা পিয়া পিয়া ডাক মনে পড়ে নওরীন, এই অবেলায়, মাঠ বেয়ে যে ছায়া মায়া হয়া মিশা গেছে হৃদয়ের নির্জন গুহায়, তার কথা সতের বছর পর কেন ভূমিষ্ঠ হয় — ভালুকবাদুরের মতো স্বমেহনে মেতে উঠি এই অবেলায়। বিশ্বস্ততার ছুটি নিয়া কেন কান্নাগুলা বিক্রি কইরা চইলা গেলা হাজতি পাড়ায়। ইচ্ছের হাতে হাতকড়া পইরা তুমি কেন পইড়া আছো অচেতন গাঁয়। এইসব কথা জেনে পৃথিবীর সব অন্তঃস্বত্ত্বা নারীর গর্ভ থেইকা ভ্রণেরা বের হয়া বিভিন্ন নামে উড়তাচ্ছে মহাকালের অন্ধখারায়। হার্টের বাল্ব দিয়া কি দেশলাই জ্বলে? তোমার বুকের চারণভূমিতে হরিণ হয়া ছুইটাছি অফুরন্ত বেলায়, আর রিরংসার পাকে কত কত পোকা মরে পড়ে থাকে; তখন রাজ-রক্ষিতার মুখ মনে আসে, আসে প্রিয় মুখ — যা সেলাই করা হয়েছে জন্মের আগে। তবুও তো দেখি কুলহীন ভূমিরেখা জলরেখার অন্তর্বাসে জাগে, সামরিক রাষ্ট্রের দিকে থু-থু দিতে দিতে মনে হয় পাখিদের রাষ্ট্রে অস্ত্র হাতে কোন দানব দাঁড়ায়ে থাকে? হায় নির্জন ভিটামাটি জন্মভূমি আমার, তোমার দু’কাঁধে নাকি মুনকার নাকির বইসা বইসা ডায়েরি লেখে স্বমেহনবেলার! অনুরাগ জ্বলে মুহ্যমান সন্ধ্যায়। দেখে যাও একটি অনাথ বাচ্চা আর কত করুণ হলে পরে, ডানা গজানোর আগে চোখ দুটা বিক্রি হয়েছে তার অগোচরে। আমিই কি সেই বাচ্চা পাখি ত্রিভুবনের বাইরেও এক ভুবন ছিল যার!
জন্মের বন্ধনে যে মায়া তার, মুক্তিতে যিনি অকৃতদার, যাত্রী কি জানে গন্তব্যের শেষ কোথায় — পারাপারের মধ্য সীমায় সময়রেখা কোথায় হারায়ে যায় — ওপাড়ে যেতে হলে অচিন এক পাখি ডেথ সার্টিফিকেট চায় — হায় অনন্তের পাড়, কবরস্থানে বাঁশের কঞ্চি থেইকা একটা বাঁশ জ্বালায়েছে রুষ্ট শিব দেবতায়।
জানো তো ধ্বংসচূড় পাহাড়ের পথ ছেড়ে এবার যাবো আমি জন্মউপকূলে। যেখানে মৃত উপত্যকা থেইকা শহীদেরা ফুল নিয়া জাইগা আছে আলোর ইসকুলে, নক্ষত্র নামবে বলে। আমি কি সেই নক্ষত্র? যার শিষ্যরা বেদান্ত প্রজ্ঞা পারমিতা গীতবিতান রূপসী বাংলা হাতে এসেছিল আমার জন্ম উপকূলে। প্রজ্ঞা পারমিতার এক একটি অক্ষর পাখি হয়া শান্তির বাণী বিলায়েছে বহুকাল এই মৃত্তিকায় — তোমরা তাকে অনাদরে বিদায় করেছো — বুঝতে চাও নাই, এখনো আলোর ডাকবাক্স হাতে সুবর্ণনগরের রাস্তাগুলা ফুইটা আছে পদ্ম পাপড়ির অন্তরালে, যেন স্নিগ্ধ নদীর জলরেখায় এক একটা ঢেউ, আর দেখো প্রিয়তমা? পদ্মনাভির মুদ্রায় শান্ত সমুদ্র চমকায় মনের গ্রহে, কারণ দেশভাগের পাণ্ডুলিপি অসমাপ্ত স্বর হয়া বাইজা চলে বিউগলে, লিপির অক্ষর বোঝা দায় স্থায়ী বা অন্তরার আড়ালে সুর ছিঁইড়া যায়, সঞ্চারি পাখা বদলায়, দরজায় পরাধীন উড়াল এখনো পাখা ঝাপটায়, হারানো শৈশবে যে হাফপ্যান্ট হারায়েছি তা এখন কাটাতারে ঝুইলা আছে, নিজের দেশের ভিতর অপর দেশের আখড়ায়; তাহলে আমার শৈশব আটকে গেছে ষড়যন্ত্রের তারকাঁটায়! এই হলো উত্তর! ওপারে তাম্রলিপিতে আঁকা বসন্ত দিনে বৃষ্টির শব্দ কান্না হয়া ঝরে এপারে, আমাদের দেশে — সুবর্ণগাঁয়। যদিও গুহাচিত্রে আঁকা আছে শ্বেত ছায়াপথের কুটিল ছবি — এই পথে হাঁটি না আমি, সাগরবলাকারা নাচিতেছে ধুলোঝড়ে, ধূসর অন্ধকারে, অথচ মেরুদণ্ডে চিরধরা বসন্ত বৃক্ষ ফোঁপায়, তবুও রথের করিডোরে নক্ষত্র পায়চারী করে — নক্ষত্রের খোঁজে তোমরা গিয়াছো পরীদের কোকাবনগরে — সেখানে দেইখাছো আমায়, শান্তির কবুতর হাতে মায়াবৃক্ষের ছায়ায় আটকে পইড়া আছি, ভেবেছো কৃষ্ণকালি মা আমার সেবাদাসী নাম, কীভাবে তার ছেলে আসবে ভয়ানক ঘুণেধরা এ পাড়ায়? দু’পা কাটা ঈগলচিহ্নিত শ্বেত মানব, আলোকবর্তিকা আর কবুতর ডানা কামড়ে ধইরা আছে মহাকালের গোলকবেলার। আমার হৃৎপিণ্ডে সেলাইকলের শব্দ ঘোড়ার খুরের আওয়াজ হয়া বেজে চলে। ডোরাকাটা এ্যাপ্রোনে মিনার্ভা দেবী দাঁড়ায় নক্ষত্র বাড়ির দরজায়, তুমি কি এ্যাপোলোর ভালবাসার প্রিয় মুখ, কৃষ্ণকায় হেলেন, বিপর্যয়। দেশবিভাগ ধ্বস্ত চোখে দূর থেইকা দেখে কাসান্ড্রা — হায়! হেলেন, হায় কাসান্ড্রা! বৃষ্টির ঝালরে লিইখা যাচ্ছো সবুজ কান্নার দাগ, তবুও হারানো শৈশবের প্যান্ট খুঁজি রোদের জানালায়, সেই থেইকা কাপড়হীন বাঁইচা আছি ন্যাংটো এক সবুজ খোয়ানো পাখি… সন্ধ্যার বৃষ্টিতে মধ্যরাত নামে দুপুরে, স্বরগ্রামের ভিতর সমুদ্র আটকে যায়, মায়ের নাকফুল হারানোর শোক ভুলিতে পারি না এই মধ্যবেলায়, তারাপীঠ শ্মশান চিশতির কবরস্থান ভাগ হয়া যায়।
এদিকে কুমারের ঘুরন্ত চাকায় নরম মাটির ঘুম ভাঙে, পাখিদের অন্তর্গত কৃষিকর্মে এবার সভ্যতার প্রথম বীজ রোপিত হবে আমার জন্মউপকূলে, যে জোছনা শুইয়া ছিল বন্দি খামের ভিতরে চিঠির অক্ষরে, সে এখন দারুচিনি গাছের ছালে সূর্য ডুবে গেলে মৃত ঘোষণাপত্র পাঠ করে দিনের। তোমরা দেইখাছো শুধু জলরঙ গায় মাইখা মহাশূন্যে নিহারিকা হাতে ঘুমায়ে পইড়াছি আমি, যে আমি কাছিমের পিঠে চইড়া মহাশূন্যে যাত্রা শেষে ফিরবো সুবর্ণগাঁয়, তাকে কেন জিভকাটা যুবতীর স্তন ধইরা যে দেবতা অস্থির তাকায় তার কথা বলো? ব্রহ্মাণ্ড এক জাদুর বাক্স — রাতের পাপড়িগুলা বাতাসের ডানা বাইয়া মহাশূন্যে ভ্রমণ হেতু গেলে গুল্মহীন গোপন গর্ভকেন্দ্র ভাইঙা পড়ে অগোচরে, উদ্ভিদ পাড়ায়।
প্রিয়তমা তুমি জানতে চেয়েছো, তুমি কি শৈশব নক্ষত্র ইসকুলের ছাত্র, নাকি শিক্ষক, নাকি কল্কি অবতার — অন্য নাম ইমাম মেহদী যার। ওসব তুচ্ছ প্রশ্ন জানার আগে চেয়ে দেখো মায়াপথে কোনো এক নীলপাখি হাতছানি দিয়া ডাকে তোমায়, ওদিকে বালিকার মমির ঘ্রাণে আমার নিদ্রা ভঙ্গ হয় — আমার ঘুমহীন চোখ দেখে মহাকালের আয়না ভাইঙা পড়ে আছে তোমার বিছানায়, তোমার কি মনে পড়ে ইভেরও আগে কোনো এক নারীর দুধের বাটে প্রথম মুখ রাখছিল কোন প্রেমিক আর কোন শিশুর উজ্জ্বল ঠোঁট? যার ঠোঁটের স্পর্শে বিশ্ব যাদুর বাক্স খুইলা নক্ষত্র গড়াইছিল অচেতন দাওয়ায়। বোধিকাল লাভের দিন শেষ, ওহিও আর আসে না পৃথিবী চড়ায়, বোবা লণ্ঠনের তেল গইলা আগুন সমুদ্রের উৎপত্তি — আর আমি সেই সমুদ্র থেইকা আলোকবর্তিকা হাতে এসেছি তোমাদের গাঁয়, আমারই জন্ম উপত্যকায়।
অনন্তের সিঁড়ি বাইয়া হিমগর্ভের ভিতর প্রবেশের আগে মুসাকে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করায়েছি কালরাতে — সে মূর্ছিত পৃথিবীর শরীর থেইকা বুদ্ধু ভিক্ষুকের তাড়ানোর ইতিহাস দেখে নাই বলে তাকে রেখে মীননাথ দেখায়ে দেখায়ে নর্তকী নৃত্যে বসায় আফিম আসর, সেই থেইকা তার লিঙ্গ সাপ হয়া ছোবলে ছোবলে সুন্দরী রমণীদের নীল করে গড়ে দেন কংক্রিট পাথর। আর আমি পাথরের দেহকোষ থেইকা বার কইরা আনি প্রজ্ঞা পারমিতার উজ্জ্বল পাণ্ডুলিপি, তাই সাধনাবলে ছিন্ন খঞ্জনার দেহ এক হয়া মিশা যায় আমার আত্মায়। জোছনার রঙ যুবতীর স্তনে মিশা গেছে বলে দুধসাদা শিশুর চোখ-মুখ থেইকা বের হয় নক্ষত্রের আলো। তবুও চারদিকে ভূতগ্রস্ত সরীসৃপের গান, ময়ূরপাখার ঝাপটানিতে মরুঝড় ওঠে সমুদ্র উপকূলে! একটা গিরগিটি তার গোপনতা প্রকাশে ঝাঁপ দেয় অন্ধকার উপকূল পাড়ে, আর তখন স্বাধীন স্বাধীন মনে হয় তোমায়। নক্ষত্রপার্কের শোভাযাত্রায় মৃত নারীর হাসির রেশ বন্ধ হয়, আর এদিকে দেখো পদ্মচক্রের ভিতর জোছনা বিছায়ে আছে যেন বিষাক্ত সরীসৃপের বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুর দেহ, তাইতো পাগলি যুবতীর ডায়রি আজ স্তন-লিপিতে আঁকা বেদনা মন্দিরে। মৌরিফুল মৃত্তিকায় নয় আকাশে ফুটে আছে কে তাকে পৃথিবীতে নামাবে আজ; তাইতো নিঃশ্বাস বাষ্পিভূত হলে হৃদয়ের ভিতর বৃষ্টি নামে, প্রান্তিক গেটে একটা লাল ট্রেন কাপড় খুলে জন্মদিনের পোশাকে আহ্বান করে আমায় তার একান্ত যাত্রী হতে, তাইতো বিস্ময়ের তাৎপর্য খুঁজি বিয়াত্রিসের চেতনার বলকলে।
বিউগলের সুরে ডুবন্ত জাহাজের নাবিকের স্বর ভাইসা আসে, নিহত নাবিকের কণ্ঠে আমার নিরীহ পিতার স্বর। হাইপার স্পেস কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেইকা দূরে তবু কেন এমন চেনা চেনা লাগে স্বর। তার স্বরে জীববিবর্তনের ইতিহাস লেখা আছে, পৃথিবীর প্রথম পাথরের উপর বসে এই আমি ডুবন্ত জাহাজের মাস্তুল দেখি — শিউরে ওঠা ঘূর্ণির আবর্তে দেখি জাহাজ নয় এ যেন আমারই মাতৃভূমি! ভাড়াটে বাড়ির মেয়েরা শরীর উড়ায় ছাদে আর ঝিনুক বাটা খাবার দাও তুমি আমায়! চন্দ্রযানের গায়ে আঁকা যে আপেক্ষিকতার অনাবাসিক সূত্র তা কি আমার পিতার ছবিকেই মনে করিয়ে দেয় — মনে করিয়ে দেয় না-কি ডুবন্ত জাহাজটাই আগামী পৃথিবীর ছবি! ঘাসফড়িংয়ের পিঠে পতাকা নিয়া ঘুরি দিব্যজ্ঞানের খোঁজে, নারীর সলীল থেইকা ভাইসা আসে লবণের স্বাদ, পোষা চাঁদের আলো থেইকা মৃত সরীসৃপ বের হইয়া আসে, জল ও আগুনের মধ্যরাস্তায় গোপন সুড়ঙ্গ খুঁড়ে চলি জোছনার অন্ধকারে।
এবার আমি উল্কাজীবনের অন্তরালে একটা দীর্ঘ ঘুমের পরাণকথা শোনাবো তোমায়, ভ্রমরের মুদ্রাদোষে চিহ্নজন্মরেখা মুইছা যায় পোয়াতি বালিকার, একটি কঙ্কাল মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠে সময়ের অগোচরে, ভ্রূণের ঘুম ভাইঙা দেখে হিজড়ে বাড়ির গেট — পিকচার গ্যালারির ছাদ, মায়াবৃষ্টি নামে সেই ছাদে, আর প্রশ্ন জাগে খোরাসানেই কি শুধু খচ্চর বেশি জন্মে? তা না হলে জলপাইরঙা ওইসব প্রাণী কেন এত বেড়েছে আমাদের তৃতীয় তান্ত্রিক পাড়ায়।
কে হে তুমি জন্মউপকূলে অন্ধকার গীটার হাতে সুর তোলো অন্তজীবনের আলোর খোঁজে…মাধ্যাকর্ষণচ্যুত যৌনমন্দির আটকে যায় সনাতনী দেবীর জঙ্ঘায়, মর্গের দেয়ালে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির ভাঙা অক্ষরে লেখা হয় কুহকীমায়া নাকি পৃথিবীর নাম। পৃথিবীর শেষ শষ্যক্ষেতে একটি নিরীহ তারা উবু হইয়া পইড়া আছে এইকথা জেনে বৃষ্টির আশায়।
এ সময় গিলগামেসের পাণ্ডুলিপি হাতে বুদ্ধ এসে দাঁড়ায় দক্ষিণপাড়ায়, আশ্রমবালিকারা পাণ্ডুলিপির সবুজ অক্ষরগুলা তুইলা রাখে তাদের বুক পকেটে, আর প্রশ্ন করে না কেউ বুদ্ধের হাতে কেন এমন পৌরাণিক ঢেউ? তাই কিশোরী বয়নে বুকের উপর দুধের নহর বইয়া যায় তাদের — এই থেকে শুরু, গণিকা পাড়ার এক চিলতে রাস্তায় ধূসর কিছু অক্ষর ঢুইকা পড়ে সবার অলক্ষে অগোচরে, ডোমেদের টিনঝুপড়িতে ভাতপচা মদের বোতলে চিহ্নময় অক্ষর ভাসে, এটা গিলগামেস নাকি পোপলবুর অক্ষর একথা নিয়া তর্ক হয়া যায়। তাইতো আমার ছাত্রীরা আজ ব্লাডব্যাংকে শুধুমাত্র নেগেটিভ রক্ত দিয়া ফেরে অগত্যা অগোচরে। সবুজ আপেলের কথা প্রথম তুইলা ছিল আদমের ছেলে কাবিলের বোন, তাইতো নীলনদের পাথর ভেঙে বৃষ্টি হয়াছিল তখন।
হারমোনিয়ামের রীড মনে কইরা পাঁজর বাজায়েছি কালরাতে, যখন নাৎসি সেনারা তোমার স্তন কেটে বল বানানোর চেষ্টায় সবুজ আপেল ভাইবা কামড়েছিল অস্ট্রিয়ার রাস্তায়। কসমিক গ্রন্থ থেইকা অন্ধকার দূরতম দ্বীপে ঘোড়ার উড়াল দেখে উদ্ভট লাগে না আর, চাঁদ অথবা তোমার স্তন কশাইয়ের চাপাতির কোপে টুকরো টুকরো হয়ে ঝুইলা আছে নাকি শিকে, বিষাক্ত সাপের ফনার উপর জাগে আমার মানচিত্র, নালন্দার আলোকিত কলোনি রেখায়, নক্ষত্র শোয়া ছিল যা, তা আজ জেহাদী তরবারীতে রক্তগন্ধ বিলায়।
এছাড়া এই পাঁজরের কাছাকাছি গেলে দেখতে পাবে মাঘী পূর্ণিমায় একটা অন্ধ পাগল ধূমকেতু হাতে তার মেরুদণ্ডের হাড়ের ফোঁকরে সুর তোলে, সুরের ভেতরে একটা সবুজ হরিণ দৃশ্যত দৌড়ে দৌড়ে বেড়ায়; মাঝে মাঝে মনে হয় তুমিই সেই সবুজ হরিণ যার মায়ামৃগে আচ্ছন্ন হয়া আছে পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক। এদিকে উল্কাপথের বাঁকে বাঁকে অবচেতনের যত চুমুরেখা আঁকা আছে তা আজ ছায়াপথ হয়া নামে তোমার গৃহে। কে যেন বইলা গেল, তোমার গোপনাঙ্গে রাত্রিস্নান শেষে হৃদয়ের ব্লুপ্রিন্ট হাতে পৃথিবী নামক ডাকবাক্স নিয়া একটা উজ্জ্বল মাছ এসেছে এখানে, আর আমি বায়োস্কোপে চোখ রাইখা দেখি তোমার নগ্ন শরীর পইড়া আছে অপর নক্ষত্রের দেশে। হায় বুড়োকোচোয়ান দেখো দেখো আমি অদ্ভুত সিঁড়ি বাইয়া নাইমা যাচ্ছি নিচে অসীমের পানে।
হঠাৎ একদিন শৈশবে ইসকুলের টিফিনবক্স খুলতেই উইড়া গেল ঘুমন্ত এক কবুতর, কাঁপা কাঁপা কিছু পয়ার আইসা জুড়ে বসলো বক্সের ভিতর। আমি এদের জিততে দেখেছি পাখিডাঙার মাঠে সেখানে সাপলুডু খেলা খেলেছি এদেরই সাথে।
পাখিডাঙার মাঠের ওপাড়ে, এই সেই গিরিপথ — যেখানে অদ্ভুত ঘুমের ভিতর পাখিঘোড়া পেগাসাস ওড়ে আর তার পিঠে চড়ে তুমি দুঃসময় বিক্রি করো আমাদের পৃথিবীতে, কে হে তুমি কোচোয়ান? তোমাকে দেখে নেবো কোন ব্রহ্মাণ্ডে তোমার অবস্থান — চাঁদের চরকা হাতে যে লোকটা এসেছিল গিরিপথ বেয়ে তাকে বিক্রি কইরা দেয়া হয়েছে মৃত্যুর কাছে। ডোমেরা তার লাশ ব্যবচ্ছেদকালে একটা অদ্ভুত কবুতর উড়তে দেখেছে চাঁদের চরকা হাতে লোকটার বামপাঁজরে — সেই থেকে এখানে আর চাইলেও মেলে না সেই কবুতর।
এই সেই সেতুপথ যেখানে সাদা বরফের চাদরে ঢেকে আছে কবুতর — শ্মশানের ছাইমাখা নিঃশ্বাস। সবুজ বিড়ালের ছায়া খামচে পইড়া আছে মর্গের দেয়ালে, আমাদের ঘুমের গহ্বর থেকে একটা সাদা শকুন হামাগুড়ি দিয়া বের হয় — আর তখন আমরা দেখতে পাই নিরীহ ঘুমের হস্তলিপিতে লেখা মৃত্যুর মুদ্রাযন্ত্রের ইতিহাস। গণকবরের ভিতর থেইকা একটা অন্ধকার ঝাঁপ দেয় নিজস্ব ছুটির দিনের ভিতর — তখনো জ্বলন্ত একটা কবুতর দুরূহ মধুচক্রের কথা বলে, পুইড়া যাওয়া কণ্ঠনালী থেইকা বাইর হয় ব্রহ্মাণ্ড ইসকুলের স্বপ্নকথা।
আমার মনে পড়ে, সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রথম ঘূর্ণনকালে আমি একটা বৃক্ষশাখায় কবুতরের চেহারায় চোখ মেলেছি, মহাবিস্মরণের সেই প্রলয় রাতে। তাইতো ইসকুলের কাঠের দেয়ালে চকখড়ি দিয়া প্রথম যে মূর্তি এঁকেছি তোমার, সেই মূর্তি মাঝরাতে ইসকুল মাঠে আইসা বুদ্ধের দেয়া নামে ডাকে আমায়।
ওই মূর্তির ভিতর থেইকা এক পাখিওয়ালা মধ্যরাত শেষ হলে শূন্যখাঁচা হাতে বেরিয়ে আসে মানুষের অন্তরালে, আর শূন্যখাঁচায় ঘুমায়ে থাকা এক বালিকা তার সবুজ চোখ টিপে আহ্বান করে আমায় আকন্দফুলের ভিতর ফুটে যেতে… আমি তাকে প্রশ্ন করি মহাবিস্মরণকালে আসলে আমি কিংবা সে ছিলাম কি না অন্তর বৃক্ষডালে? প্রিয়তমা কিষাণী আমার জানো তো এই নির্জনে কল্পলক্ষ্মীকেও বিক্রয় হতে দেখেছি সাবওয়ে স্টেশনের চোলাই মদের দোকানে, আর আমি তখন কী কইরে বটঝুড়ির দোলনায় চড়ে যাবো জোছনার প্রান্তরে।
কালো মাছিদের প্রাচীন পাঠশালায় যাই, দেখি কবরের দেয়ালে চুনসুড়কি হয়া বাঁইচা আছে সভ্যতা আমার। অলিখিত অক্ষরে সুরকী কিংবা পোড়ামাটির বাড়ির ধূসর দেয়ালে লেখা আছে বীভৎস চিহ্ন জাইসুদ-মর্গেজ খায়খালাসী কিংবা নিলামনামায়। এ-তো গতকালের ইতিহাস, সসপ্যান ভর্তি রক্ত গিলা যাচ্ছে যারা এখনো আমার, তাদের প্রতি অসীম ব্রহ্মাণ্ডের নিদ্রাহীন কালো রাত বর্ষণ করি — দশচক্রের আবর্তনহীন চাকায় তোমরা ঘুরবে একদিন আমার পাঁজরে নির্মিত লৌহপথে। স্মৃতিকথার প্রতিষ্ঠায় যে হন্তারক গোধূলিমায়া লিপিবদ্ধ আছে তার থেইকা বিদ্রোহী একটা জোছনার অক্ষর ছুইটা আসে আমাদের রিডিংরুমের সেলফের উপর। আসলে যে কথা লেখেনি অন্ধ হোমার কিংবা বেদব্যাস বাল্মীকি সেইসব অসমাপ্ত পঙ্ক্তি লেখা জোছনার অক্ষর হয়া আসে কলমের জবানীতে — আমার পরিচয়ে যদিও সরুগলির ও মাথায় নদীপথ ঝুইকা আছে আস্থাহীনতায়, এও তো সত্য এই কবরখানার প্রতিটি বাঁশ থেকে উত্থিত সবুজ অঙ্কুর জানে মৃতের নিঃসঙ্গ হাড়ের রহস্যে, মৃত গেরিলার চোখের অক্ষরে লেখা ব্যক্তিগত চিঠির পৃষ্ঠার ভাঁজে উত্থিত সবুজ অঙ্কুরে, আর তার আত্মা শীত হয়া ঝুইলা আছে আমাদের পৃথিবীতে।
এদিকে বিশ্বস্ত উইলোওয়ার বলারের গুপ্ত আশ্রম থেইকা একটা শাদা খরগোশ দৃশ্যত এখনো শান্তির কথা বলে — মৃত গেরিলার স্বপ্নের কথা বলে… আর আমি ভাবি ফুলের পাপড়ি খাইয়া যে পতঙ্গ প্রাণ বাঁচে তাদের চেতনার কথা; কিংবা প্রাগজ্যোতির্মণ্ডলীর আগে কিংবা সমস্ত সৃষ্টির ধ্বংস শেষে আমিই কি আলোকবর্তিকা হাতে দাঁড়ায়ে ছিলাম কিংবা থাকবো কুলহীন-প্রান্তরহীন-প্রান্তরে!
চোখের ভিতর দিয়া যে ছায়াপথ মিইশা গেছে বিষণ্ন রশ্মির ঘরে সেখানেই নিরীহ স্বর্পজন্ম তার, চোখগুলা সুদে বিক্রি হলে ডাহুকের কাছ থেইকা স্বাধীনতা কিনাছি কাল, শরীরের সব হাড় পাকুদের দখলে গেলে জ্যোতিষ্কমণ্ডলের কিছু আলো নিয়াছি ধার, কারণ হাড় কিংবা চোখের চেয়ে এখানে আলোর আজ বেশি প্রয়োজন। অতপর কেয়াপাতার নৌকায় চড়ে নক্ষত্রের আলোকমণ্ডলে ঘুরি যোগমায়ায় যদি কিছু আলো ধার আনা যায়। আত্মার আলোকচিত্র পৃথিবীকে দেব বলে এসেছি এবার, আমাদের তৈরি নিরাকার ঈশ্বরের চেয়ে বড় কিছু নিয়া মানুষী পাড়ায়।
ওই দেখো জঙ্গল সমস্ত প্রাণীসহ চিৎ হয়া শুইয়া আছে আমার ডানায়, ঘুমপোকার ভিতর-বাহির কী এক অদ্ভুত পোড়াগন্ধ, আফিম গাছ দুলছে হৃদয় অন্দরে, নেশায় চোখ ধূসর হয়া আসে প্রিয়তমা, মৃগশিরায় মগ্ন সংকেত, কিশোর ব্লাকারের চোখে বিস্ময়ের অন্তহীন নক্ষত্র, মাতৃগর্ভ থেইকা বের হয়া আসে সমুদ্রের মতো স্বপ্নভাঙা অন্তহীন ঢেউ, স্বপ্নহীন এই রাত্তিকে মৃত ঘোষণা কর, সমস্ত মহাসড়ক শূন্যে উইঠা গেলে রেখাপথ তৈরি হয় মগজের অস্তরেখায়, নদী নিদ্রাকালে স্বপ্নবিক্রয় কেন্দ্র খুইলা গেছে জোছনা পাড়ায়, আর জোছনা পাড়ায় যাবার আগে জলপোকাদের বাড়ির খোঁজে যাব একবার; দেখে যাবো কীভাবে কালকেউটের দেহ বেয়ে সন্ধ্যা নামে; আমাকে অতদূর ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুলে খুঁজতে যেও না প্রিয়তমা, বৃক্ষের পাঁজরে লেখা আছে আমার আপন ঠিকানা।
ঢাকা ডিসেম্বর ২৯-৩১, ২০০৫
shamimrezadc@yahoo.com
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
কবিতা : নব্বই দশক,
শামীম রেজা
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
