কবিতা : আশি দশক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা : আশি দশক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

সরকার আমিনের কবিতা

ডাকাতি
.....
নিজ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গেলে
বহু ঐশ্বর্য রাই বৃথা যায়।
মন্দিরে দেবী দর্শনে গিয়েও লুকিয়ে রাখতে হয় চোখ
মানিব্যাগ নিয়ে সতর্ক থাকার মতো প্রযত্নে রাখতে হয় হৃদয়

বৃষ্টি মানেই মেঘের পরিণয়
আকাশকে আকাশ থাকতে হলে মাথা উঁচু করে রাখতে হয়।

হে আমার স্ত্রী
আমি অনুনয় করে বলছি -
ডাকাতি করো

তোমার ডাকের আশায়, ঘুমের পাশে বসে থাকি
তোমার ডাকাতির আশায়, পুলিশ স্টেশনে চাকরি করি।



বিড়ালের মন খারাপ
............
একটা বিড়ালের মন খারাপ দেখলে
আমার চোখে ঘুম আসে না
মন কেন তুমি এতো যন্ত্রণা করো?
খুব দুশ্চিন্তা হয়, কেন বিষণ্ন বিড়াল হাসে না।

আকাশের অসুস্থ তারাগুলোর জন্য কাঁদে প্রাণ
কেমন নিভু নিভু - রোগাটে
বৃষ্টির দিনে হৃদয় কেন এতো হাহাকার প্রবণ
আমি আর রাধা পড়ে গেছি এক সাথে বিরল জলের ফাঁদে !


অবশ্যই বলবো
..........
তুমি আমার কি লাগো অরণ্যের বৃষ্টি ?
আমার হৃদয় খারাপ, সময় খারাপ
তা বলে এসে একবারও ভিজিয়ে দেবে না ?
কাকের মতো ভিজতে ভিজতে কাঁপতে থাকলে
লোমকূপগুলোর ভেতর ঢুকে যাবে আরাধনা

মরতে মরতেও বেঁচে ওঠে বলবো প্রেম মন্দ কিছু নয়


সাবেক বিশ্বসুন্দরীর জেদ
..............
সাবেক বিশ্বসুন্দরী
পুরোনো দেহের ভারে নত।

তবু বেঁচে থাকতে সম্মত।

বসে করছেন শোক
বিষণ্ন লেকের পাড়ে।
পড়ে গেছে দাঁত, ভেঙে গেছে নখ
দুঃখ তাঁর অন্যতম শখ।

তাঁর জেদ দীর্ঘজীবী হোক।



হে গরু
.....
হে গরু, কোরবানির বিষণ্ন গরু, আমি তোমাকে জবাই করি
আমাকে জবাই করে দ্রব্যমূল্য
তোমার চামড়া খুব দামি এতে জুতা বানানো যায়
আমার চামড়ার দাম নাই
বড় মোটা
কোন কারণেই হৃদয়ে সুড়সুড়ি লাগে না।

বড় বড় চাকু দেখে তুমি কেঁদেছো
তোমার কালো চোখে আমি ভয় দেখেছি
আমি ভাই ভয়ের উর্ধ্বে
আমাকে ভয় পেতে নিষেধ করা আছে।

আমি হচ্ছি কারওয়ান বাজারের মরা ফাঙাস
আমি নই নাক উঁচু ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ
বহুতল ভবনের তলে গালে হাত দিয়ে ভাবি
আমি যেন কোন বাজারে বিক্রি হতে চেয়েছিলাম?

হে গরু কি সুন্দর করে তোমাকে আমি জবাই করেছি
তোমার রক্ত মাটিতে পড়েছে
আমার রক্ত আমি গিলে ফেলেছি।

sarkeramin@yahoo.com

রেঙ্গুন সনেটগুচ্ছ : গৌতমই সর্বহারাদের ঘরামি

চয়ন খায়রুল হাবিব


১.
নীল আশ্বস্ত হয় শুধুমাত্র অন্যান্য নীলে
নীল বদলে যায় আকাশ্চুম্বী বিদ্যুতের নীল
কাতর নীল পূর্ণিমা হেঁটে যায়
বাংলার রাজকীয় বাঘের থাবায়
ক্ষিপ্ত বৈশাখের বিক্ষিপ্ত মহামল্লারে
নীলে নীলে নীল নীলপাহাড়ি মূর্ছনায়
আমার দেহঘড়ির চোদ্দতলায় চোদ্দ নীলের জালা
শিশু ণিল সবসময় ঘুমোচ্ছে
নৌনীল ভালোবাসে সাগরে ডুবসাঁতার
তাহলে কোন ণিল সবচেয়ে সত্যিকারের নীল
এর উত্তরে নীল রানার বয়ে আনে
মহানীল পদ্মসূত্রের শ্লে­াক
যখন শেষবারের মতন থামে নীল হৃতস্পন্দন
যখন ধনুর জাতক চিৎকার করে ওঠে : নির্বাণ নীল

২.
দীর্ঘমেয়াদি
সুদীর্ঘ পুরোপুরি পাস্তুরিত গেরুয়া সকাল
সকালের পেয়ালায়
ফট ফট ফট মাখন রঙের ভুট্টার খৈ
সোনালি কিশমিশগুলো
ভ্রু কোচকায় নরম শীত সূর্যের ছায়ায়
ব্রিওশ পাউরুটির
জিভে পানিতোলা থুতুর ফিশফিশ
শাদা হাতির পাকস্থলিতে
হাতির দাতের রান্নাঘরে
সিদ্ধার্থের মধু চুয়ে চুয়ে মিশবে
অসমীয়াদের বাঙালি খেদাও চায়ে
আমি সুখি : কারণ দুঃখ উধাও মহাদুঃখের মাদলে
বাদলাবাতাস আমার মা বৌদ্ধ পিতা

৩.
রক্তজবারা বিচিত্র নিজেদের রক্তাক্ততায়
রজনীগন্ধারা পবিত্র রাতের নির্লিপ্ততায়
শেফালিরা মুগ্ধ নজরুলের গানের সুরে
কদমেরা হতবাক গ্রীস্মের তাণ্ডবিতণ্ডায়
মহুয়ারা দোলে পাহাড়ের তিন চোয়ানি তালে
বর্ষবরণের খোপায় ঘুরে বেলি হেসেছে
টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে
গোলাপেরা অভিমানের আতরজলে গাঢ়
গাঁদাফুল আমাদের হাসিখুশি সেবিকা দিদি
ঘণ্টিফুল বাতাসে বাজায় স্কুল শেষের ঘণ্টা
তোমরা আমরা সবাই ফুল গোত্রের সর্বহারা পুতুল
চাইলেই পারি নিজেদের সুবাস নিজেরাই নিংড়াতে
মানুষেরা শুধু ফুল থেকে ভিন্ন ধর্ষণে ও সমরে
ফুলদেরও জীবন গড়ায় বিচ্ছেদে ও বাসরে

৪.
পরদেশে প্রবাশে সুতো কাটছে তিব্বতী চরকা
হিমালয় গলছে পুর্ণিমার প্রাচীনতম ঝরকায়
কুয়াশার আঁচলে দীর্ঘনিঃশ্বাসের জমিনে
একের পর এক প্যাগোডা জ্বলে ওঠে
যদিও জ্বলবার কথা ছিল না
এমনি মরণবাণ হেনেছিল চৈনিক লাল ফৌজেরা
ধর্মশালায় ঐ ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের ভিড়
তারাদের বাস্তব রূপকথায় ত্রিপিটকের ভেলা
ভেলাগুলো কালবেলার কুমার কুমারীদের বাহন
লেজ আঁশ কানকো দাঁড়াসহ ওরা কখনো মাছ কখনো মানুষ
আর ওদের পূর্বপুরুষ পূর্বরমণীরা
ইতিহাসের ডুবসাতারে ভাসবার আগে অস্ফূটে বলে
শরণাং গচ্ছামি : গৌতমই এখন সর্বহারাদের ঘরামি

৫.
ঘুটঘুটে অন্ধকার এক রেস্তরায়
খাদ্যের পরিবেশক ও পাচক সবাই অন্ধ
মেনুতে সব দেশের সব রকম খাদ্য
মসলার বদলে অনুপান হল অনুভূতি
জাফরাণ-অনুভূতি, দারুচিনি-অনুভূতি
পুদিনা-অনুভূতি, রংধুনু-অনুভূতি…
পাচক আসলে পাকাতে চায় খদ্দেরদের মাংস
কিম্বা খদ্দেররা এরি মধ্যে পরিণত খাবারে
ঘরে বাইরে খাদ্যগুলো এখন খোদক
হজমির অষুধ দেবে বোধিসত্যের নির্মোক
গোধূলিমাখা বিচিত্র বকুলের সালাদের পর
চাওয়া-পাওয়ার হিসাবের নেতৃত্ব দেয়
পরমের গেরুয়াধারীরা। রংধনু এখন রেঙ্গুন।
রেঙ্গুন ক্রমশ গড়ায় নির্বাণের রেস্তরায়

৬.
আমাকে খুন করে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে
রেঙ্গুন নদীতে : আমি ডুবে যাচ্ছি
আমার নির্ভার গেরুয়ার ভারে
প্রতিবেশীরা ঘুমিয়ে পড়েছে নদীর তলায়
যাতে আমার শরীর না ছোঁয় যন্ত্রণার পাতাল
আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে
জলচরেরা জিভ ছোয়াচ্ছে নির্বাণের প্রথম সিড়িতে :
বন্ধুবৎসল শুশুকের ঝাঁক
আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বয়ে নিচ্ছে
ওদের ওপরগামী ফিরতি সাঁতারে
প্রত্যেক জলচর প্রাণ শঙ্খনাদে হেসেছে
আমার উভচর অরহৎ দোলুনীতে
আমি ডুবে যাচ্ছি : আমাকে খুন করে
ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে রেঙ্গুন নদীতে

৬.
নির্বাসনে যাই আনন্দের পানশালায়
আজলাভরে পান করি সূর্যমুখীর রেণু
সূর্যরসে টইটম্বুর হবার পর
দেখতে পাই আমি পুরুষ কিন্তু স্পর্শকাতর
এবং অক্টোবর বীর্য খালাশের মাস
হরিণীরা সঙ্কেত পাঠাবে হরিণদের
ধাওয়া পালটা ধাওয়ার আদুরে ভঙ্গিতে
তাড়িত হরিণীরা ভান করবে পালানোর
কিন্তু আড়াল নেবার কোনো তোয়াক্কা করবে না
শান্তিনিকেতনে ও সুন্দরবনে
হরিণ-হরিণী মিলিত হবে চাঁদের বাগানে
বুদ্ধসঙ্গমে হরিণ হরিণী যখন ভরপেট
মিতকথনের মলাটে ছররা হানে ঘাতকের বেয়নেট
হরিণশাবক তখন লিঙ্গনিরপেক্ষ হরিণা

লন্ডন, সেপ্টেম্বর ২০০৭

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের নির্বাচিত কবিতা












হজরত বায়েজিদ বোস্তামির প্রতি প্রার্থনা
(তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক)
...................
(উপক্রম :

চাটগাঁয় বাবা বায়েজিদ বোস্তামি
রেখে গেছেন কিছু কাছিম, যাদের আমি
ভীষণ ভয় পাই, কারণ, তারা ঢের
বৃদ্ধ, এমনকি আমার হৃদয়ের
চেয়েও। কাজেই তাদের আছে সে-গ্রাম্য চোখ
যাতে শুধু ভুলচুক ধরা পড়ে আমার। সে যাই হোক,
তাদের খোলগুলি যেহেতু ভরা শুধু পুরানো নৈতিকতায়,
আমি জানি, জবাবে আমারও কিছু বলবার থেকে যায়,
যা আমি বলতে পারি না, কেননা আমি শিশু, আর, হায়!
আমি শিশুই র’য়ে যাই, কারণ, তারা বুড়াই র’য়ে যায়।)

“আমি কী করিব, বাবা, তুমি ব’লে দেও।
আকাশের পিলা রঙে কী করিব আমি।
মাটির পাটল রঙে কী করিব আমি।
কী করিব সাদা মেঘে তুমি ব’লে দেও।

“তটিনীর রূপে রসে আশীবিষ হাসি।
নটিনীর রূপে রসে বিবমিষা রঙ।
জননীর ভুখা কোলে বিবমিষা রঙ।
ধমনির গলিপথে আশীবিষ হাসি।

“বাবা, কী দারুণ ভালো ছিল এই ঘাস।
মেঘ-ছেঁড়া, ঝাঁকেঝাঁক বুলবুলি চোর।
মোর ধান খেয়ে যেত বুলবুলি চোর।
কুমারী মায়ের মতো ছিল এই ঘাস।

“আমি কী করিব, বাবা, তুমি ব’লে দেও।
কী করিব সাদা ঘাসে তুমি ব’লে দেও।”

(উপসংহার :

পাপবিদ্ধ ইডিপাস ব্রোচের শয্যায়,
মৃতের পুস্তক থেকে প’ড়ে যায় প্রথম অধ্যায় :
পা- নি-
নিক্ষিপ্ত তিরের মুখে প্রতিধ্বনি আসে,
শির্কার শরবত আসে স্পন্জের গেলাসে :
আ- মিন্ ॥)

(ঢাকা, ১৯৮৯)


বহুড়ি
....
১
দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
আজ উঠো না আমার আতা গাছে,
ওখানে এক তোতার বাসা আছে।

দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
কাল শিমুলের ফলটা ফেটে গেছে,
জোনাক পোকা ছুটছে রাতবিদিকে,
আঁধার ঘরে ঢুকে সে যায় পাছে!

দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
আজ ফিরে যাও, পরশু কথা আছে।

২
ঠাকুরঝি, তুই আমার চোখের নীচে
খুঁজে মরিস কোন্ শাওনের রাত?
আমার নাভির নীচে, ঠাকুরঝি লো,
খুঁজিস রে, বোন, কোন্ বাঁওনের হাত?

তোরে তিন সত্যি করছি, ঠাকুরঝি,
আমি ষড়্ঋতুর আকাশ দেখি নি,
শুধু একটা স্বপন দেখেছিলাম কালকে-
মিছিল ক’রে আসছে ভাসান-পালকি!

তিন সত্যি করছি, ঠাকুরঝি,
আমি সে-পালকিতে চড়ি নি।

৩
তোর চোখে, সই, সিঁদুর-রাঙা মেঘ,
বুকের ভিতর পশলা,
আমার চোখে একটু চেয়ে দ্যাখ্,
চোতের আকাশ, ফরসা!

হেথায় ঝিঁঝির অসহ্য উৎপাত,
হোথায় ব্যাঙের জলসা-
ছোঁব না তোর মেন্দি-পিন্দা হাত,
আমার হাতে মসলা!
৪
জায়ের আমার হাজার গড়খাই,
খোয়াইডাঙায় গোরুর গাড়ির চাকা,
শুকনো ফুলে চৌদ্দটা মৌমাছি-
ভাসুর আমার কী ফাঁকা, কী ফাঁকা!

বিলের জলে ঢিল ছুঁড়েছে কেউ,
নিথর দেহে থিরথিরানো ঢেউ,
থরথরিয়ে কাঁপছে সিঁদুর, শাঁখা,
ভাসুর আমার কী ফাঁকা, কী ফাঁকা!

(ঢাকা, ১৯৮৯)


ঘাতক
....
এ-ঘর নিষিদ্ধ ব’লে তুন্তি শুধু ঢোকে এই ঘরে
যখনই থাকি না আমি, কিংবা মনে করে আমি নেই-
তুন্তি উঁকিঝুঁকি মারে, আনাচেকানাচে খুঁজে মরে
কোন্ এক মেঘ বুঝি, কোন্ এক মেঘের পিছেই।
আনাচেকানাচে শুধু অন্ধকার-মশা ঝাঁকেঝাঁক
গুনগুন করে, তুন্তি পাতে তাতে সহজিয়া কান :
যেন কী খবর এলো- দু’হাতে আঁধার করে ফাঁক।
এ-ঘরে অরুণ কোন্ শিশু বুঝি রাত্রিদিনমান
বইয়ের স্তুপের পিছে, অথবা খাটের নীচটাতে
অসম্ভবসম্ভব ভাষায় আমার তুন্তির সাথে
কথা কয়;- সেই ঘরে, যে-ঘর এমন সদাশয়,
নীল নিশি গাঢ় হ’লে নিজেকে ঘাতক মনে হয়;
তুনি- যেন কয়, ‘মামা, অ্যাতো লক্ত ক্যানো?’- সকালেই
এই ঘরে ঢুকতে ফের তুন্তিকে নিষেধ ক’রে দেই।

(ঢাকা, ১৯৯০)


বিনির্মাণ
.........
তীর্থযাত্রা করে ওস্তাগর;
ঘনায় চৌদিকে
তার দুগ্ধপোষ্য, তস্য দুগ্ধপোষ্যগণ :
সাতশ’ জোগালি আর তেরশত ঠিকে

যারা প্রায় সহজাত প্রতিভায়
ওস্তাদের অগোচরে নিয়েছিল শিখে
কীভাবে- উপর থেকে ক্রমাগত নীচে-
গেঁথে যেতে হয়

বেলুন-বোঝাই-করা নশ্বর সময়।

(ঢাকা, ১৯৯১)


জাগরণপালা
......
O my heart which I had from my mother!
O my heart which I had from my mother!
O my heart of my different ages!
Do not stand up as a witness against me…
For you are my Ka…
(Spell 30 B, THE BOOK OF THE DEAD)


আমার গলায় তুমি কে গো কথা কও অহোরাত্র?
কে গো দেখ আমার নয়নে, শোনো শ্রবণে আমার?
এই দেহের ভিতর দিয়ে দ্বিতীয় সে কোন্ পথ
চ’লে গেছে কোন্ দিকে, কোন্ আলোয়, কোন্ আলেয়ায়?
শত-পিতা-শত-পুত্র-পরম্পরা বংশলতিকায়
দোল খায়, অন্ধকারে সুরভি ছড়ায়! ধমনিতে
যে-তুমি রোপণ করো বিস্ময়ের বিষবৃক্ষ, আর
সন্ধ্যাভাষা- সাঁটলিপি- নিজস্ব নিয়মে, অহোরাত্র-
এবারে আমারে কহো কী আমার নাম, কী তোমার...

আমারে আমার কাছে কে দিল ফিরায়ে? কী-চক্রান্ত
নিদেন দু’দিন-থেকে রসরক্ত করিল দোহন?
এ-জাদু কোথায় ছেল? কোন্ ঠেঁয়ে? কোন্ চরাচরে?
আমার ভাঁড়ারঘরে সিঁদ কেটে কোন্ রেতে, আহা-
হে সা’ব, হিসাব দ্যাখো, খিচুড়ির চেয়ে চেলডেলে;
হ্যাঁ রে, কেনে আলি তুই, কানা কাক, কাক-তাড়-য়ার
ভাবে ম’জে? এই নায়ে বিন্দুবিসর্গের চেয়ে ছোট-
অথচ, তালেব আলি, কান্সা নাড়ো জিয়োলের মতো-
তোমারে চিনি নে? তুমি পয়লা লম্বর দুশমন!
আমারে ফাঁসাবে ব’লে সুজ্জির আগেই তুমি, সোনা,
উঠে ব’সে আছ, আর কী-জানি-কী ছুরা উল্টা ক’রে
পড়তিছও! ভাবো আমি কিছুই বুঝি নে? তবে শোনো,
তোমারে খোলসা করি পিতেপিতেমোর জোতাজুতি,
নানান বানের কথা, খরা, আর নানান উৎসব-
আজকাল বর্ণিবারে নাই আর বিশেষ সেসব।
ফিকশনে ফায়দা নাই তবে আর। আহা, বৈসো তিন
বিঘৎ তপাতে। আজও ছোঁওয়াছুঁয়ি কিছু থাকে, ভায়া।
রিচুয়াল। কী করা। বরঞ্চ ঐ ফাঁকটুকু রেখে
আঠারো অক্ষর গুনে বুনে যেতে পারো তুমি মোড়া,
ব’নে গেলে বসতে আপত্তি নেই, যেতে পারে ওড়া।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও বিগ বেন-এ?

যে-ঘাটে ছিলেম ব’সে দিবসাবসানে, মর্মপীড়া
তার থেনে বিঘা-তিন দূরে যেয়ে শস্যবান্, আহা!
আমাদের তোমাদের তাহাদের- আহা, কাহাদের?
এই জমি কারও ছিল? এই জমি ছিল শিশুদের।
এই নদী নদী নয়, যদি নয় শিশুদের গান-
দিগনে-র ব্যূহ ভেদি’ এই নদী গগনে উধাও।
(তব কুলদেবতার পরিচয় নদীরে শুধাও।)
তারারা মিছিল ক’রে নেমে আসে যেখানে নিয়ন-
-নীল জোনাকির মতো, যেখানে পশ্চিম থেকে পূর্বে
গগনের গায়ে এক গনগনে লাল শিরা কাঁপে,
যেখানে প্রেমের তলে ঈশ্বর পোড়েন হিম পাপে
সেখানে জীবন- মাটি গোরুর খুরের ছুঁচে উল্কি
আঁকে তার সারা গায়ে, পৃথিবীর শিশুদের তরে,
আমাদের তোমাদের তাহাদের প্রস্থানের পরে।
কাজেই, নাদান মোর, এ-ভিটেয় বৈসে তুমি শোনো,
পূর্বপুরুষেরা গায় তোমার গলায় কালেংড়ায়
যেই গান (শ্মশানেও না শুনি’ নিষেধ, নিষধের),
শ’য়ে-শ’ শিশুর চোখ জ্বলে যেথা অন্ধকার ঘুমে
খনির চুনির মতো খুন-টসটসে, প্রেতলোকে
যেথায় পৃথুলা এক ছিঁড়িছেন মন্দারের থোকা
ভূয়সী খোঁপার লাগি... ধবলগিরির শীর্ষ ফেটে
গড়ায়ে আসতেছে এক অক্ষয় ক্ষীরের বসুধারা-
নরম বলের বুকে পোরো তুমি ইসব ইশারা।

* * * * *

সত্য কি নিহিত ছিল এই বুনো-ষাঁড়ের লড়াই
বসুধার এই কোণে? যেখানে দোআঁশ-মাটি প্রতি-
-কাঠায়, -বিঘায় রইত সুফলন-, বিবৃতজঘন;
বনের বিজন বুকে অচেতন কিরাত-শবর;
উড্ডীন হরিণকেও পালাতে হয় নি মেলা-দূর
আপন নাভির থেকে... হিমালয়ে হৈম হিমবাহ
গর্বিণী গর্ভিণী হয়, সাগরে সাজশ করে ঝড়,
কোথাও নিস-ার নাই- ডোবো আর ভাসো, পর-পর...

কখনও কি ভাবো তুমি ছিলে ঐখানে, আর আছ
এইখানে? ছিলে-কি-ছিলে-না তাতে কী-বা এসে যায়,
যদি ভাবো : বিধিলিপি ঐ-ভাবে এড়ায়ে গিয়াছ-
প্রাচীন প্রাচী-র মৃত্যু ঠেকাবে না চীনের প্রাচীর!
হাউশ ক’রে কেউ আর খায় না সুপুরি-হীন পান,
কালেরও হয়েছে পেট, যা ঘটে তা নেসেসিটি বটে,
‘বৃক্ষেরও নড়ে না পাতা...’- মনে রেখো, হাড়-হাভাতের
ছোঁকছোঁকও মেনে নাও হে, কারণ, ‘কে জানে কী ঘটে...?’
ধ’রে নাও, দুনিয়ার দু’টো দিন বেসামাল ক’রে
বর্ষানে- ফেরাও যেতে পারে তবু যক্ষিণীর ঘরে
পরিপাটি ফিটফাট তৃতীয় দিবসে- এরকমই
ব্যাপারস্যাপার প্রায় গেছে হাতে এসে, এরকমই।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও বিগ বেন-এ?

ভবিতব্য, বুইলে কিনা, ভবিতব্য ভেবে আমাদের
অনেক পেকেছে মোচ, আমরা আর ওসবের মধ্যি
নাই। বুইলে কিনা। যদি আয়-ব্যয় বুঝি উঠতি চাও,
সন্ধারণই শ্রেষ্ঠ পন্থা- অবশ্যি বিকল্পও আছে :
ঊর্ধ্বরেতঃ আত্মরতি, আত্মক্ষয়, মর্ষণপুলক
(কেউ জানলা খুলে রাখে, কেউ বন্ধ, উদ্দেশ্যমূলক)।

তবে কিনা, আরাম হারাম-সম,- হারামিও জানে,
আরাম মুফত পেলে হারামের ভাতে পড়ে নুড়ি।
তেকারণে শয়তানেরা পৃথিবীতে যন্ত্রণার যন্ত্র
এক সন্তান করেছে। নৈলে বুঝে দ্যাখো, কী আচ্চৈর্য!
টয়েল ক’রেও তবু টয়লেট নাহি তব ভাগে!
ইসব তাঁদেরই কীর্তি। তাঁদের কিউ-তে যদি আজ
আলগোছে সান্ধাই মোরা, তেনারা কি বাদ সাধবেন?
তেনারা কি হাঁকবেন,- ঘোড়া হোস্ নে, খোঁড়া হ’য়ে থাক্!?
বলবেন,- নেমে যা নেমে যা তোরা, বুড়ে যাবে নাও!?
মনে তো হয় না ঠিক, যেরকম ভাবসাব দেখি :
ওপি এক, ওপি দুই- ঠেকে যাবে ওপি একশ’য়-
ওদের মতলবটা কী? মান্ষের ডেইরি ফার্ম্ নাকি?
পাতা-বেশি-চিনি-কম, স্ট্রং অ্যান্ড্ এনারজেটিক?
শামলা শিরে দিলেই উকিল- এমনকি শামলাও,- লাও!
এখন সামলাও ল্যাঠা- ঠ্যালাঠেলি, আমি আগে, আমি,
ফুল আগে, ফল আগে, গাছ আগে, বীজ আগে, আমি,
আমার আগেতে আমি, আমার পিছেও আমি ঠিক-
মেনে নাও, উঠে পড়ো, ভালো থাকো- যৎপরোনাসি-ক।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও বিগ বেন-এ?

পুষ্পকের ভেজাল টিকেট-হাতে অসঙ্খ্য সারস
ঠায়াসনে, অপান কোরাসে ভনে আবাহনী সাম :
অমরিকা! অমরিকা! অমরত্ব দেহো! ভিজা দেহো!
উদরে গ্রহণ করো ঔদরিক আমাদেরে, দেবি!
প্রত্যাহার করছি আমরা লক্ষ-লক্ষ নক্ষত্রের দাবি,
পঞ্চাশ নক্ষত্র-তলে প্রশমিত করো গাত্রদাহ!
ঊর লো, রিলিফ-ভুজে! দুঃস্বপ্নের চেয়ে দুরত্যয়
বিমূর্তধামে লভুক বাঙালের বিলাতান- প্রাণ
সুচিররুচিররূপে অগ্নিশুচিসূচিত নির্বাণ!
আমরা একান্নবর্তী প্রতিযোগী সহযোগিতায়
মগজ-মজ্জায় তব চন্দ্রযানে জোগাব ফ্যুয়েল-
লোহিতা, তরলা, ফুল্লা, ফানাফিল্লা, ফেনিল, ফুলেল!

* * * * *

তোমারে শুধাই শেষে রহস্য এ-রগড়ের, আর
নিরোধের ইতিবৃত্ত, বৃত্তবন্দি এই ইতিহাস-
মায়ের জঠরে ব’সে যে-সকল বাদ-অনুবাদ
অষ্টাবক্রি আবশ্যিক করেছিল, আর যে-নিবিদ্
‘আল্লাহু আকবর’ শুনে গুনেছিল সমূহ প্রমাদ;
দশম দুয়ার দিয়ে কিমাকার রাহুর মতন
সে আজ বেরিয়ে আসে- রক্তবীজ- আমার রতন!
বিশদ বেদান- তার ব্যাখ্যা করো, হে সবুজ সখা,
হে কমরেড, এ-আজাব কোন্ পাপে, কার পাপে, কার?

তখন বললেন তিনি, আঁধিয়ারে শ্যেন-দিঠি ঠেরে :
একদিন সভ্যতার হাবি-জা.বি. নব্য নালন্দায়
মিশ্কাত আন্জুম, আহা, মেশকাম্বর করেছিল সেপ্র
অমানিশাম্বরে, আর বেখেয়াল ব্যাঙের ছাতায়
ডিপোজিটেড হচ্ছিল ভাইটামিন শনৈঃ শনৈঃ।
কতিপয় ভোজনরসিক তার দ্রব্যগুণ বুঝে
বিমূঢ়া প্রকৃতি-পানে মুহুর্মুহুঃ দিতেছিল হানা-
সে-কাহিনি বলতে বলতে নক্ষত্রপ্লাবিত এক রাতে
শকুনের শুকনো হাড়ে গজিয়ে গেছিল তাজা ডানা;
সেই জোশে, ছায়াপথে, অতিদূরপাল্লার সাঁতারে,
ছাড়িয়ে গিয়েছিল সে সূর্যের সপ্তাশ্ব-রথ গতি-
উক্ত ঘোড়ারোগ, অত্র, মহা-এপিডেমিক, সমপ্রতি।
অ্যাবইউজ করছেন কেন, একটু ইউজ করুন-না, ব্রাদার,
দেখবেন, একই দাওয়াইয়ে সর্বরোগ সারিছে আপনার।

ডোবাল ডোবাল, আহা, নাঙ্গা-গায়ে মরেছে মেয়েটা!
কী দেখি, দেখনহাসি, উহার মরণ, নাকি সেটা ?

এপিকের হিরোদের ট্র্যাজেডিকে ধামাচাপা দিয়ে
কখনও সাইড-রোল নারী চাউর করে রতির প্রতিভা,
পিতার অগস্ত্যযাত্রা কাঁধে নিয়ে তবু মনে হয়,
দ্যাখো দ্যাখো কীরূপ সন্তপ্ত আমি, আড়নজরে, হায়,
আমার অপূর্ব দুঃখে স্বর্গের প্রস্বাদ পিয়ো, প্রিয়,
(অতিরিক্ত দু’টি ফোঁটা এঁকে দিনু তুঁহার জিহ্বায়!)

বেচারি আমেথিনাথ, একদিকে মুণ্ডু তব ফ্লাই
করে, আর আর-দিকে মাতমের তলে-তলে লোকে
হাপুস নয়নে লখে তব তন্বী কন্যার চেকনাই!
আভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান খাড়া বক-পায়ে
তার পাণিপীড়নের তরে (সের্ফ্ দরদ-বশতঃ)।
বোমারু ফুলের তোড়া ছিল না কি এরও চেয়ে প্রেয়?
প্রিয় তুমি ছিলে না কি এরও চেয়ে তামিলের চোখে?
হা পণ্ডিতকুলসূর্য! কী দেখালে মিশেলের খেল্!
(আমাদের সম্বাদপত্রগুলি এককাটি সরেস :
টপলেস স্ত্রী-লাশ-চিত্রে জলোচ্ছ্বাস করে উদ্বেল-
‘কাঁদো, দেশবাসী, কাঁদো! অশ্রুপাত, বীর্যপাত করো!’)
কেবল মুর্দাই দেয় মৃত্যুকে সহজ প্রোটোকল,
কেবল মুর্দাই পারে শিশ্ন যোনি রাখিতে শীতল।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও বিগ বেন-এ?

সৌম্যের সাধন-ধনে, ত্রিশঙ্কু হৃদয়, ত্রিসন্ধ্যায়
উদ্যম-বিহীন বেগে জিতেন্দ্রিয়-জীন-পুরঃসর
রংহাৎ ধাবন করো পুনশ্চ প্রবল রিরংসায়
স্বপ্নের গোমুখ-মুখে- জযন্ত্র জাগাও- অনশ্বর।

আমি জানি, ও হৃদয়, পনিরূপে তোমার উদয়,
সৌন্দর্যের সার্থবাহ- আহা, তবু ভুলে যেতে হয়
সেইদিন কোন্ তারা অভ্যুদিত হয়েছিল, কোন্
দেউলের গর্ভগৃহে আরতির ধ্বস- স্বস্ত্যঃয়ন
আভাসিত করেছিল অবম ওমেন- অতঃপর
আকাশের গোলটুপি পুড়ে গেল সূর্যের ভিতর।
হৃদয়, মৃত্তিকাসনে পেতে রাখো শ্রুতির গালিচা,
সর্বাঙ্গে শ্রবণ করো সুপারনোভার ফ্যান্টাজিয়া,
চুম্বক-চুম্বনে চুষে বিচ্ছেদের তীব্র অ্যাম্ব্রোজিয়া
জর্জিয় প্যাথস ছাড়া ধুনিবে না অন্য ধুন কোনো :
‘কালো কাক কত ভালো, ভালো কাক কত কালো’- ওম্।
‘ঈট্স্ ওয়ার্ম্, পোকা খায়, কালো-কালো’- দুয়েন্দয়ে নমঃ!
‘এই এই এই এই এই’ (- ইতি সরকার মাসুদ।)

ঘুমোবেন্না, ঘুমোবেন্না, গান সবে শুরু হ’ল মম।

(রাজশাহি, ১৯৯২)

‘তনুমধ্যা’- থেকে
...........
তামাদি
Order in all things, logic in the dark;
Arrangement in the atom and the spark;
Time in the heart and sequence in the brain…
CANTOS, Conrad Aiken


প্র থ ম স র্গ
.........
একবার শখ হ’ল, বীজ ভেঙে ভিতরে তাকাই :
তাতেই অনর্থপাত, এখানে যা চাই তা তো নাই!
পেন্ডুলাম-ফণা দোলে কাঁচা-পাকা দুই অন্ধকারে;
টিকি খাড়া হয়ে যায় অগ্নিশর্মা তালুতে আমার।
আলো ফুঁড়ে উড়ে এলো জনা-তিন উদার পুরুষ-
এক জন চোখে দিল সুন্নতি সুর্মা- তিন দিকে
না আলো না অন্ধকার, গুলে গেল সকল হদিস;
তখন আরেক জন ধুয়ে দিল পথিক চরণ,
ভূমিতে সটান শুয়ে অতঃপর হ’য়ে গেল পথ;
বোঁচকায় কম্বল দিল, হাতে লাঠি, তৃতীয় পুরুষ,
এবং আমার যাত্রা রাত-রাত অগস্তের পিছে।
মেরু-দিন থামে মেরু-রাতের স্টেশনে- তিন জন
নেমেই গা-ঢাকা দিল তাল-তাল কল্কি অবতারে।
অনেক দুঃস্বপ্ন হেঁটে বুঝে যাই ডিম্বাকার সব,
আপন বোধির তলে জেগে উঠি দুরন্ত মনসুর-
বীজ ভাঙি, নিজেকেই খুঁজে পাই বীজের ভিতর।

ঘাসেদের সর্বনাশ ঘ’টে গেছে তরশুরও আগে।
পদ্মার শরীরে থান, কে রাখে হিসাব কত দিন।
কাঁঠাল-ছায়ায় এক লুকানো কুটির আর কুটিরে লুকানো
সোনাবউ- আর তার দেড়গজি ঘোমটায় লুকানো হরিণ...
হরিণ! হরিণ! ওরা পশু নয়, তাই
ওদের জিহ্বার ‘খাই’ চোখের চামড়া দিয়ে বিসমিল্লা করে।
সঠিক আইজা আমি জানি না অবশ্য, এরও বহু যুগ পরে
প্রসূত প্রভূত আমি পলিহীন রক্তের ভিতরে-
রক্ত বলতে যে-আঁতুড়ে বোঝায় না ঊষার পূষন্,
আকাশকুসুম নয়, বালু-তেল, প্রবীণার অকালকুসুম-
পলাশ কিংশুক নয়, এমনকি সে জবাও তো নয়, সুতরাং
লাগে না সে দেব দৈত্য নর কিংবা বানরেরও ভোগে,
তথাচ অভাবে তার মম চিত করে সদা হারাঙ্ হারাঙ্!

এতকাল নদীকূলে চাঁদ সদাগর
যাহা ল’য়ে ছিল ভুলে সকলই সে দিল তুলে
ত্রিকাল ভেলায়...
এই ভেলা থামবে না থামবে না আর,
ভেসে যায় ভেসে যায় ডালিমকুমার।

একদিন ধানের নদীতে নাও বেয়েছি, সুজন,
থেমেছি বিক্রমপুরে, বেসাতি করেছি শ্রীনগরে,
আর কলাকোপায় ‘মাতার ছেলে’ খেলারাম-দাতা
চুবিয়ে মেরেছে তার বউটিকে দুধের পুকুরে-
ওরা আগে তেলি ছিল, পদ্মার ভাঙনে আচানক
রাজার গোপন ধন ঝরেছিল তেলের নৌকায়,
সেই থেকে ‘সাহা’ তারা (‘তেলিসাউ’ বলে মন্দলোক),
শান-বাঁধা ঘাটে তারা দিয়েছিল নদীটাকে শান
(অকৃতজ্ঞ ইছামতি বেশিদিন বয় নি পাষাণ)।
কত জমি গিলে খেলো গোবিন্দপুরের জমিদার,
চাঁড়ালের খুলি দিয়ে সাজাল সে কত-না মশান,
সেও তো পারে নি খেতে ইছামতি নদী-ভরা গান,
আর নদী-ভরা ধান- নদী-ভরা ধানের বাইচ-
আর তা-ই পুঞ্জি ক’রে ফেঁপেছিল আমার ব্যাপার।
সেই আমি- খেলারাম, জমিদার, কেউ নয়, সেই
কেউ-নয় আমি, শেষে নদীটাকে করেছি সাবাড়!
মানুষের ভুখা পেট আকাশ, বাতাস, নদী, কিছুই বাছে না,
শিশুর সবুজ হাসি, মায়ের শাড়ির পাড়, কিছুই বাছে না।

একদা গোলাপি এক ঝড় উঠেছিল,
ভেঙে প’ড়ে গিয়েছিল আমার কার্নিস তার তোড়ে,
ভাঙা বাক্শে ইচ্ছামৃত্যু মলিন স্মৃতির চিঠিগুলো
‘দে জল দে জল’ ব’লে গিয়েছিল উড়ে-
ধিন তাতা ধিন তাতা ধিন তাতা তা ধিন তা ধিন ধিন ধিন
তার পরে দপ্ ক’রে ঝড় বুজে বাতাস হলুদ হায় হায়,
চিঠিগুলি বাজ হ’য়ে ঝাঁপ দিয়ে আমার দু’-চোখ
ঠুক্রে, উপ্ড়ে, তুলে নিয়ে গেল রাতের গুহায়,
আর আমি রাত-রাত রাতের পাহাড়ে কী অসুখ...
চোখ গেল চোখ গেল চোখ গেল

রাত-রাত রাতের দুধের দহে উথালপাথাল,
আর রাত, তোলপাড় অন্ধকার প্রসব-ব্যথায়
কোঁকায়, গোঙায় রাত-রাত,
অন্ধকার রাঘব বোয়াল
রাত-রাত বদহজমি আংটি গিলে ফেলে
কাতরায়, ফুটি-ফাটা জমি চোষে রাত-কানা হেলে,
স্মৃতিবিস্মৃতির কুশপুত্তলিকা পোড়ে রাত-রাত,
চোখ গেল চোখ গেল চোখ গেল
দে জল দে জল
রাত-রাত...

পুলিপোলাও
.......
উৎসর্গ: বিষ্ণু বিশ্বাস, সৈয়দ তারিক, মনিরুল আলম।

১
এখন তো সব আমি মেনেই নিয়েছি।
সেই সব সেই সব, সেই হাহাকার-রব, ঠেলে
দিয়েছি কয়েক-কোটি বহুমুখী সুড়ঙ্গের কোনোটিতে, আর ভুলে গেছি;
কী আশ্চর্য সঙ্ঘটনা হবে তা হঠাৎ ফিরে পেলে!
চোয়ানো-ওয়াইন-হেন গ’লে পড়ে ঊষার শিশির,
চোয়ানো-ওয়াইন-হেন ঘনায় দুপুর,
রাতের পাতাল-রেলে ঢুকে পড়ে তারপর পলাতক শির,
টানেলে ফানেলে ডুবসাঁতার- আনখ সমুদ্দুর!
অথচ কীইবা দাবি করেছিনু তোমার নিকটে :
সকল প্রকারই ছিল তুচ্ছ, অবান্তর-
শুধুই প্রকৃতি, শুধু প্রকৃতির উচ্ছিষ্টেই তুষ্ট ছিনু বটে;
না মরে পাষাণ দেশ, দিলা দ্বীপান্তর!
তোমার- তোমারই জন্যে তবু আমি দিবা-বিভাবরী
পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি!

৪
যদি এ-বোতল-বার্তা কোনোদিন পৌঁছে যায়, যদি পৌঁছে যায়,
সেই ঘাটে- যে-ঘাটে একদা যতী বেহুলার ভেলা
ঠেকেছিল বৃহস্পতিবার বারবেলা :
অসম্ভব অঘটন অনুমিত হয়েছিল আকাশের ঈশান কোনায়-
জানি, সেও হবে এক দুর্ঘটনা, প্রকৃতির দুর্গতির প্রায়,
চম্কে গিয়ে থম্কে যাবে হয়তো কোনো ভেঙে-গিয়ে-শুরু-হওয়া মেলা,
যেম্নিতরো ঘটেছিল সেদিন পহেলা
আষাঢ়ে- সেদিন, মানে, সেই অনিশ্চিত আবহাওয়ায়,
পাষণ্ড যৌবন যবে ঈশ্বরের আরশের ভিৎ
ধ’রে চণ্ড নাড়া দিয়ে স্যামসন-সম
বোমার মতন ফেটে বাহিরিতে চায়, আহা, আপনার থেকে,
এমনকি লখিন্দরও যেদিন উঠেছে ন’ড়ে বর্ষার অজস্র অভিষেকে...
আর আজ- এ-বোতল-বার্তা পড়তে পড়তে, প্রিয়তম,
যে-ঋতু আমার মাঝে দেখ তুমি, তার নাম শীত।

১৬
ইছামতি- এই নাম, অক্ষরে অক্ষরে বহমান
সদ্যঃপাতী জীবনের চিরায়ত বামে :
ইছামতি- এই নাম, আর তার ব্যঞ্জনার ধুল-পরিমাণ
অভিঘাতে বাস্তুহারা, আমি, পরিণামে-
এবং আকাশ চিরে আড়াআড়ি সমান দু’-ভাগে
দুগ্ধশুভ্র পারাবত নেমে আসে অন্তরিন রাতে,
সর্ব গর্ভপ্রসূনের পরাগে পরাগে
ঋতুর ঝাপট লাগে- কী যে মোহে মাতে
জীবনের, জননের দোতারার তার!
কী-মায়ায় কমপ্রপক্ষ্ম, ফুল্ল মুখখানি
পলকের তরে ঐ রুপালি রেখার
অধিজ্যামিতির জালে ধরা দেয় : জানি,
ইছামতি- এই নাম, কোনো দেশে উচ্চারিত হয়,
হারাবার ভয়ে যারে স্বপ্ন ক’রে রেখেছে সময়।

২১
কও তোতা, কাহিনি তোমার বাখানিয়া,
টক্কা টরে টরে টক্কা টক্কা টরে টরে
কেমনে আইলা তুমি আধখানা পোড়া পাখা নিয়া
উড়িতে উড়িতে আর পুড়িতে পুড়িতে এই কদলী নগরে?
আহা ও কিসের দাগ লেগে আছে ঠোঁটে
আরক্তিম? জ্যোৎস্নার ঝিলিক্ বুঝি চোখের কোনায়
এক কণা? অথচ তোমার কণ্ঠ বুজে গেছে ঝড়ের ঝাপটে,
কনীনিকা জ’মে গেছে সমুদ্র-নোনায়!
টক্কা টক্কা টরে টরে টক্কা টরে টরে
ক্যান্ বা আইলা, পাখি, কদলী নগরে?
কোন্ বা নমাজ তুমি করেছিলে কাজা,
নতুবা সাবাথে কোন্ করেছিলে আমিষভোজন,
যে, তোমারই শিরে শুধু নেমে এল আকাশের সাজা,
তোমারই জেনিথে শুধু ফুটো হ’য়ে গেল যে ওজোন?

২৪
জানি না কোত্থেকে, কবে, আমি ভেসে এসেছি হেথায়,
এই অতর্কিত দ্বীপে, এই নিরালায়,
যেখানে রক্তের ধূপ নিয়ত জ্বালায়
অগণ্য অমারাত্রির নির্ধারিত, কিন্তু তবু অনিশ্চিত, জন-ুরা; যেথায়
হৃদয় বিদরে, হায়, পুরবৈয়াঁ বায়;
কোথাও, প্রশ্নের তোড়ে, সন্দেহে পাণ্ডুর, তেতালায়,
যদিও মদির কোনো অন্ধকার, অন্ধ কা’রে ছলিয়া পালায়
অসঙ্খ্য সূর্যের চোখে- অব্যয় আভায়-
সাধনায় বেদনায় যারে আমি জানি নি কখনও,
যে-মৌন লুকায়ে রয় নিজকীয় গোধূলিবেলায়, কোনো বন্দি, অন্ধ দেবতার কামনা-নিকোনো
আলোহিম গোধূলিবেলায়,
বিগলিত আপন ছায়ায়। তারে চেয়েছি কি চাই নি তা স্পষ্ট
নয় এই গোধূলিবেলায়। কোন্ ঘাটে, আঘাটায়, কিংবা কোন্ ভ্রষ্ট নষ্ট
রজোধারা- আমার আকাশ থেকে- আঁধারে- অমায়- এই বাস-ুহারা গোধূলিবেলায়!

৩১
একটি অন্ততঃ ফুল না-ঝরুক, একটি অন্ততঃ
সবুজ মুখের রূপ অম্লান রহুক চিরকাল-
ঠাকুরের কানে কত শত
এমতো প্রার্থনা উড়ে যায় ফি-সকাল...
উড়ে যায় ও হারায়- কোথায়, দেবতা
নিজে তা জানে না (যদি জানার উপায়ও তার থাকে;
কেননা অকর্ণ সে তো- এত মানুষের এত কথা
শুনিবে যে, বয়রা হওয়াই লাগে তাকে)।
আমি দেবতাকে নয়, নিজেকেই বলি, ওরে মন,
একটি ছবিকে তুই ধ’রে রেখে রেটিনার পিছে,
তা-ই দেখে পার ক’রে দে রে এই জঙ্গম জীবন
যাবৎ অচিন পাখি খাঁচায় নাচিছে-
যেমন মাসুদ খান এঁকেছেন তূর্ণ ট্রেনে আলোকবধূর
পিত্রালয়ে যাওয়া -নাম্নী কবিতায়, তেমন রঙিন, বহুদূর!

৩৫
ঋতু রুদ্ধ হয়েছে আমার,
ঝ’রে গেছে জরায়ুর মুকুল সকলই,
থেমে গেছে আদিগন্ত কোকিল-কাকলি,
তবু কি রে ক্লান্ত হয় জন্তু কামনার?
এই যে মোহন পূতি- নন্দনবনের নর্দমার,
ভুবন-বিসার এই কস্তুরীর আবিল আমোদ,
কোথায় পালাই আমি এর থেকে, এই বেশুমার
ঘাম, রক্ত, রোদ,
পুরাতন দেহ ফেটে বের-হ’য়ে-আসতে-চাওয়া এ-নূতন বোধ,
এই গ্লানি, অপমান, পূর্ণ-পরাজয়
গুঁড়ো ক’রে উড়ে-আসা বোমারু এ-ক্রোধ!
দ্বিতীয় ঋতুর মতো এই রক্তক্ষয়-
এই প্রেম! এই শিশু- এর কাছে কার
শরীর গড়িয়ে আসবে খেলনার আকার?

৪৪
কোথায় আমার ঘর? কে-ই বা আপন? কে বা পর?
মোছলমানের দেশে জন্ম মম নাছারার কুলে!
অবস্থা এমন, হায়, প্রায়শঃ কাপড়-জামা খুলে
পরীক্ষা করিয়া দ্যাখে কেমন নাগর।
কেহ কহে- ‘মদ খায়!’ কেহ-বা- ‘শুয়োর!’
‘গোছল করে না এরা, আজন্ম নাপাক!’
অথবা- ‘এখনও খৎনা হয় নাই ওর!
এমনও আদম নাকি পয়দা করেন আল্লাপাক!’
- অতঃপর আসিলাম খেরেস্তানি দেশে :
কেহ কহে- ‘শুয়োর কি চলে, বাছা? গোরু? মাংস? মাছ?
শুনেছি তোমার দেশ ফি-বছর দলাদলি, মৌলবাদ, ঘূর্ণিঝড়ে, বানে যায় ভেসে-
আমরা রিলিফ দিই; তবু কেন রিফ্যুজি-দূষিত করো আমাদের সচ্ছল সমাজ?
‘তোমার দেশে কি আছে মানবাধিকার, আর গণতন্ত্র, অন-র্জাল, বিশ্ববিদ্যালয়?
অনেক দেখেছ, বাপু, সাহেববাড়ির বৈঠকখানা, এইবেলা ভালোয় ভালোয়...’

৪৫
নীরবে এসেছি ভেসে, এসেছি একাকী,
মানচিত্র-বহির্গত গোধূলি-বাঁধুলি-রাঙা দ্বীপে,
বাংলাদেশের এক ছোট্ট কালো পাখি-
বেঁধেছি বিবিক্ত বাসা বাত্যা-ভাঙা ক্লিফে।
এসেছি যেখান থেকে সেথা ছিল অস্তি নঞর্থক,
সদর্থক নাস্তিময় বর্তমান এই অন্তরীপ-
যা ছিল তা ছিল না কো, যা আছে তা নাই- ভয়ানক
বিপ্রতীপে বিপ্রতীপে চ’লে চলে আমার জরিপ।
এসেছি উড়ে কি আমি? উড়ি নাই। আমি শুধু নিশ্চল ছিলাম।
আকাশই এগিয়ে গেছে, অথবা পিছিয়ে, আমি কিছুই জানি না।
জানি নি- কখন বাস্তু হয়েছে নিলাম।
ঘুম থেকে জেগে উঠে (অথবা ঘুমিয়ে প’ড়ে) দেখি সবই কেমন অচেনা!
অবশ্য সকলই তবু খাড়া বড়ি থোড় আর থোড় বড়ি খাড়া-
শুধু- আর কোনোদিন, কোনোদিন, কোনোদিন দেখব না একখানা দোহারা চেহারা!

৬০
কে-সব কী-সব বলে আমার মাথায় অবিরত?
কিছুই বুঝি না আমি- বিজাতীয় সেইসব কথা,
টর্নেডো করেছে খাড়া আমার মগজে তারা বাবেলের মতো-
এ নির্বাক্ কোলাহল, নাকি এ সবাক্ নীরবতা?
আমি কান বন্ধ করি, প্রাণের ভিতরে তারা বাজে,
অজস্র ঝিঁঝির ডাক কর্কট রোগের মতো পাঁজরে চ্যাঁচায়,
আমাকে বাজায় তারা অপার্থিব বেতার এস্রাজে-
আমাকে তারের মতো কেবলই আমার সাথে গিঁট দেয়, কেবলই প্যাঁচায়।
পরিশেষে পাসরি মায়ের বুলি, মায়েরে পাসরি,
দিব্যি কথা ব’লে চলি অসঙ্খ্য ছায়ার সাথে, তাদেরই ভাষায়,
আমার চুটকিতে, হায়, জ’মে যায় যে-কোনো আসরই-
আমার যে-কথা নিজে বুঝি না, সে-কথা, আহা, সবেরে হাসায়!
এ-আমি কে? এ-আমি কী? ও মা, তুমি দেহো দরশন!
দশ-হাতে আঁধার সরিয়ে করি তোরই অন্বেষণ।

৬৪
সহসা আশ্চর্য এক আলো ভায় : বুকে বাজে আখেরি আজান-
গায়ের নরম রোম তৎক্ষণাৎ শক্ত হিম শজারুর ঝাঁটা...
কে জানি দেয়ালা হাসে বিড়ালের পারা, বলে, ‘চলেন, বাজান!
আল্লারসুলের নামে ভিতরে বাড়ান ডান পা-টা।’
আমি আঁৎকে উঠে কই, ‘সে কী কথা! আমি কেন, আলা হজরত?
অন্য লোকে মরে-টরে, অ্যাক্সিডেন্ট্ করে, কলে হাত-পা হারায়,
ফাঁসি যায়, চাকু খায়, পুড়ে মরে, ডুবে মরে, আচমকা বেমক্কা অক্কা পায়-
সেসব কাগজে পড়ি, টিভি-রেডিওতে শুনি, তারপর হাঁটি নিজ পথ,
যে-পথ অন্যের নয়- যারা মারে, মরে যারা, যাদের জীবনে হয় নানা খুনাখুনি...
ভালো কথা। আমি কী করিতে পারি তাহার বিহিত? আপনি ভুল ঠিকানায়,
ফেরেস-াপ্রবর!’ তিনি না-কন কিছুই, শুধু জেব খুলে দেখান তখনই
প্রজাপতি চিহ্ন এক... উচ্চক্ষু কাতরে ভনি, ‘অ্যাই বাপ, তোরে কি মানায়
এ-নৃশংস শিশুহত্যা!’- পবনেতে জগন্ময় উঠিল গুমরি’
পাঁজরের শূলব্যথা : ‘তুমি কেনে থাক, সাঁই, আমি কেনে মরি!’

(সিডনি, ১৯৯৫-২০০১)



ম্যাকাবার
......
কালোর চেয়ে কালো কেবল রাত আছে,
তারচে’ কালো প্রেম কেন তোর কল্পনা?

১
কালো বিদ্যুৎ চমকায়, আহা, শোঁ-শোঁ কালো হাওয়া ধমকায়, ভাই,
কালো সূর্যটা জ্বেলে কালো রোদ প্রাণ জড়ে মোর শঙ্কায়, ভাই।
আমি কোন্ দিকে কোন্ বোন-ঝিকে ডাকব, বাড়ায়ে অন্ধের হাত!
ভালো কালো রাত, কালো আখেরাত, কালো ধারাপাত কর্ আঁধিয়ার;
সকল কালোর সেরা কালো তুই,- আয়, আমি শুই- শব-এ-বরাত!
গ্র্যানিট-কঠিন এ-কফিন মম আজ হোক তমোপহ হাতিয়ার!
কালোতে কালোতে কাটাকাটি হবে, লাঠালাঠি হবে লঙ্কায়, ভাই,
রগ-রঙ-চটা কালো সূর্যটা নীল হ’য়ে যাবে শঙ্কায়, ভাই!

২
কে তুমি কালো রাতে এসেছ আলো হাতে, বালিকা?
কোথায় ছিলে তুমি নীল-নিখিলে, ভূমিপালিকা?
আমি তো আমাতেই ছিলাম ঘামাতেই মাথাকে
কে তুমি অগোচরে ছিলা এ-চরাচরে, সকলই
আট্কে রেখে নখদর্পণের দখলে, কাকে
গেঁথেছ অক্ষিতে- সে যে এ-ধক্কিতে, ধকলই!
কোথায় তারে নিয়ে যাবা রে ছিণ্ডি’ এ-জালিকা?
কেন গো কালো রাতে মেতেছ কালোয়াতে, বালিকা?

(সিডনি, ২০০৩)


শাহ্ মখদুম
.......
রাত : সম্নাম্বুলিস্ট্ ট্রেনটা ছুটে যায়, সুনসান
শূন্যমার্গে; যেন মর্গের দেরাজে দেরাজে লাশ
বার্থে বার্থে হিমায়িত ঘুম-গুমসুম ইনসান;
রাত-কানা এক টিকেট চেকার করে খানাতল্লাশ।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : ছাইচাপা আপার বার্থে ধূমপিণ্ডের মতো
গুলে-যাওয়া কোনো প্রত্যঙ্গের করি অনুসন্ধান,
চোখ কান হাত চুল নখ দাঁত ছড়ায়ে ইতস্ততঃ
ঢুঁড়ি লাপাত্তা আত্মা আমার- হৈহৈ হয়রান।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

তিরিশ পাখির মতো উড্ডীন এক-ট্রেন খণ্ডতা,
মহান্ সেমুর্গ্ আর কত দূর? পোড়াদহ জংশন
আর কত পথ? শত শত প্রাণ শুষে নিয়ে, অন্ধটা
কই আমাদের নঞ্ হ’য়ে, হায়, ব’য়ে যায় শন্ শন্?

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : তকরার- একবার যদি পড়শি আমায় ছুঁতো!
গলন্ত-লোহা-বহা যমুনায় খেয়া দেয় নিশি-কানু;
শরীর পালায় শরীরীকে ফেলে; সময়ের চেয়ে দ্রুত,
একটা মানুষ হবে ব’লে, ছোটে এক-ট্রেন শুক্রাণু!

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

(সিডনি, ২০০৪)

কাকে?
.....
তুষারে-ঢাকা তোমার লাশ
বেরিয়ে আছে একটা শেষ
কুঁকড়ে-থাকা আঙুল-
আমি মাড়াই তোমার বুক,
পাথর-যোনি, হিম চিবুক,
রক্ত-জমা জানু,
ঊষর কেশ-

পেঙ্গুইন, মেরুভালুক-
দুই আকাশে নাচে আলো-
মধ্যে সব সবুজ
গ্র্যাফাইট-গাঢ় কুজ্ঝটিকা,
অন্ধকূপে ঊহ্য শিখা,
তবু আমার সবুর
অনিঃশেষ।

(সিডনি, ২০০৯)


অনুবাদ কবিতা
.........
মাহমুদ দারবিশ
আমি গণহত্যা দেখেছি

আমি গণহত্যা দেখেছি, একখানা
মানচিত্র মেরেছে আমাকে
সরল কথার আমি ছানা
দেখেছি কাঁকর-খোয়া উড়তে ঝাঁকে-ঝাঁকে
দেখেছি নীহারকণা বোমার মতন ঝ’রে পড়তে
মুখের উপরে হায় আমার মনের দরজা বন্ধ করল ওরা
কার্ফিউ কায়েম করল, ব্যারিকেডে রাস্তা ভরল ওরা
আমার হৃদয় বদ্লে গেল সরু একটা গলিতে
বদ্লে গেল পাঁজর পাথরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে

ডব্ল্যু বি ইয়েটস
তিন ঝাড়
......
বলল রমণী একদা প্রিয়েরে তার,
‘হায়, সেই প্রেমে আস্থা রাখে না কেউ
যে-প্রেমে সঠিক খাদ্য অপ্রতুল;
আর, যদি তুমি হারাও সে-প্রেমকেই
গাইবে কীভাবে আর ও-প্রেমের গান?
ত্রুটি যে আমার সত্যিই অতিকায়।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘কক্ষে তোমার প্রদীপ রেখো না জ্বেলে,’
বলে রমণীয়া রমণী সে পুনরায়,
‘গোপনে, যখন রাত্রি দ্বিপ্রহর,
আসব তোমার অপেক্ষ শয্যায়,
নিজেকেই নিজে যদি তা করতে দেখি,
মনে হয়, আমি ম’রে যাব লজ্জায়।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘গোপনে গোপনে ভালবাসি আমি তাকে,
দাসী রে আমার, বলি তোকে, বলল সে,
‘আমি জানি, আমি ম’রে যাব বুক ফেটে
যদি সে তিলেক আমাকে ভালো না বাসে,
কিন্তু আমার শুচিতা নিছনি দিলে
তখনই-বা প্রাণ ধরব কীভাবে, কীসে?
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘কাজেই, তোকেই শুতে হবে তার পাশে,
ও যেন ভাবতে পারে যে আমিই সেটা।
আর, মনে হয়, আমরা সবাই একই
জ্বলে না যখন কোনোই প্রদীপ সেথা,
আর, মনে হয়, আমরা সবাই একই
যখন শরীর- ঢাকা নয় পোশাকে তা।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

না-ডাকতে কোনো কুকুর, ঘণ্টা-ধ্বনি
মধ্যরাতের- শুনে সে বলত নিজে,
‘ভাগ্যে মাথায় এসেছিল চিন্তাটা,
কী-সুখী আমার প্রিয়েরে দেখাচ্ছে যে’;
অথচ যখন দাসীটিকে সারাদিন
ঝিমাতে দেখত- ব্যথা কি উঠত বেজে?
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘না, আর কোনোও গান নয়,’ বলল সে,
‘কেননা প্রেয়সী এসেছিল চুপিসারে
এক-সাল আগে পয়লাবারের মতো
দুপুর-রাতের প্রহরে আমার ঘরে,
এবং ঘড়ির ঘণ্টাটি বাজলেই
শুতে যে হবেই আমাকে চাদর মুড়ে।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘হাসি-কান্নার গান, পবিত্র গান,
কামনার গান’- বলেছিল লোকগুলো।
কেউ কি কখনও শুনেছে অমোন গান?
না- কেবল তারা সেইদিনই শুনেছিল।
কেউ কি অমোন হাঁকিয়েছে ঘোড়া আর?
না- শুধু সেদিন সে-ই তা হাঁকিয়েছিল।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

কিন্তু যেমনি ঘোড়াটির এক খুর
ইঁদুর-গর্তে গেল বিলকুল ঢুকে,
মাথা নীচে দিয়ে প’ড়েই সে ম’রে গেল
তার প্রেয়সীর চ’ক্ষের সম্মুখে-
হায় সে-ও ম’রে গেল যে তৎক্ষণাৎ,
এমনই আঘাত বেজেছিল তার বুকে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

দাসীটি কেবল বহুদিন বেঁচে তার
কবর-দু’টির তদারকি করে, আর
দু’-কবরে দু’টি বুনেছিল সে যে ঝাড়;
যখন সেগুলি বড় হ’ল, তো সবার
মনে হ’ত, একই শিকড়ে তাদের বাড়,
গোলাপও তাদের মিলেমিশে একাকার।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

যখন দাসীর মরণের এল কাল,
পুরুত এসেছে তার পাপ-নিরাময়ে,
গোপন যা-কিছু ক’য়ে দিল বুড়ি তায়।
তাকিয়ে থাকল মুখে তার মূক হ’য়ে
পুরোহিত, আর সে ছিল সমঝদার,
বুড়িটার কথা শুনেছিল সে হৃদয়ে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

কবর দিতে সে বলল সে-দাসীটার
তার কর্ত্রীর প্রিয়ের অপর পাশে,
তার কবরেও লাগাল গোলাপঝাড়,
আর তারপর যে-কেউ সেখানে আসে
গোলাপ তুলতে ঝাড়গুলি থেকে, কার
শিকড় কোথায়, জানতেই পারে না সে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

কবি আবদুর রবের আরো কয়েকটি কবিতা


আবদুর রব


মুহূর্ত
......
দরোজা খোলার শব্দে চেতনা নিষ্ক্রিয়
মৃত্যুর মুহূর্ত এই বুঝি দু হাতে কপাট খুলে
ধরে ফেলে
ফিরে যেতে চাই পালাতে আকৃষ্ট হয় মন
বাকহীন তুমি মধ্যবর্তী।

তোমার দুচোখ নিস্তব্ধতা ভাঙে, হঠাৎ বাতাসে
যেভাবে বৃক্ষের ডালপালা কথা বলে। আমি
ভূমিষ্ঠ হলাম।

আমার পেছনে ছিল উদ্বেগ, সন্ত্রাস
অকুস্থলে তুমি দেবী লুসিনা!


রাত্রির আকাশ হাসে
............
ফল খায়, ফুল খায়, খায় মানুষের
সমস্ত বিশ্বাস।
অমেয় পিপাসা আর প্রতিটি মুখের
ক্ষুধা কেড়ে খেতে খেতে ঢুকে পড়ে
শ্যামনগরের অলোক ঘোষের ঘরে।

জানি না জানি না বলে যতোই চেঁচাক
তার ঘর থেকে শরতের রঙ খেয়ে
ঠোঁট চাটতে চাটতে কে যেন বেরিয়ে এলো।

জারুলতলায় শঙ্খলগ্ন দুটি সাপ
যেন দুটি অভিজ্ঞতা।
পরিত্যক্ত শিশুটিকে বুকে নিয়ে
বসে আছে চন্দ্রা, নাকি সংঘামিত্রা?
হয়তোবা পিতার ইচ্ছায়
বটের চারা নিয়ে যাবে সে সিংহলে।

এভাবে খেতে খেতে খেয়ে ফেললো মানুষ জনম
রাত্রির আকাশ হাসে তারায় তারায়।


ক্রুসেড
.......
আজকাল কেউ কারো জন্যে বসে থাকে না,
যে যার মতোন বেছে নেয় নিজস্ব ক্রুসেড
কে শত্রু কে মিত্র কার সাথে এ লড়াই?
পুনর্জন্মে আস্থা নেই, একাই প্রস্তুতি নেয়
একাই সম্পন্ন হয়
কর্মহীন কবি বৃথা ছন্দ মেলায়, তার
আকাঙ্ক্ষার কাচপাত্র থেকে ঝরে
মানুষের পুনর্মিলনের তৃষ্ণাজল।


খঞ্জ
...
নতুন পতাকা নিয়ে ছুটে যাচ্ছে
মৃত্যুভান ছেড়ে ছুটে যাচ্ছে অপসাম।
যে কোন জীবনে অভ্যস্ত মানুষেরা মরুবিছা,
কতো আর স্বপ্ন নিয়ে হবে সারিবদ্ধ;
তার চেয়ে যে যেদিকে পারে পালাক, পালাতে থাক।
অশ্বখুরে চূর্ণ-বিচূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে কেউ কেউ তবু রয়ে যাবে, গায়ে জ্বর
খঞ্জ পথিকের বেশে।

ভুল আত্মা
........
প্রভু, এই দেখুন আমার উরুদেশ
এইখানে ছোরাবিদ্ধ করে
আমি কাল সারা রাত কাটিয়েছি
যন্ত্রণা গোপন করে।
আমার বিশ্বাস আপনার ভুল আত্মা
কোনো অনিষ্ট সাধনে
বদ্ধপরিকর

শয্যাসঙ্গী হলেও জানি না আপনার মানের খবর
নিষ্প্রয়োজন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
অতএব অঙ্গবিদ্ধ করে দেখলাম
এবার বলুন মনোবাঞ্ছা।

পর্সিয়ার কথা শুনে অশ্রুসিক্ত তবু সে ব্রুটাস
বিশ্বাসের লাশ অতিক্রম করে ভেঙেছে রেকর্ড।


নদী সিকস্তি
.......
সারা জীবনের মতো মুখ এঁটে থাকতে হবে
বোকা চাঁদ জ্যোৎস্না জলে দু চোখ ভাসাবে
এই এক টুকরো হাড় হয়তো প্রতিটি বাঘের গলায়
বিঁধে আছে।

অন্তরীক্ষ হতে উড়ে এসে যে সারসী তাকে
উদ্ধার করেছে সে তো শুধু নিত্য সাথী।
নদী সিকস্তির কথা কিছুই জানে না
বৃথা ঘর সাজায়, গোলাপ পরে চুলের খোঁপায়।

সে যেন তোমার
ধানশীষ কিশোর বালক
সারাপথ অনর্গল কথা বলে
কতো কি যে জানার রয়েছে তার!
তুমি তো দূরের আত্মা কিভাবে তোমাকে পাবো?
দিগনন্তে সায়াহ্ন, অন্ধকার ঘরবাড়ি
দুরাশা নয়নজুড়ে...।


নতুন উত্তাপ
.........
মার্কসবাদ কি জেফারসনের গণতন্ত্র?

বার্লিন প্রাচীর থেকে বের হয়ে লোকগুলো
এই কথা বলে,
লালতারা চিবোতে চিবোতে ঢুকে গেল
নিকটস্থ বেশ্যালয়ে।

বিশ্বাস ত্রিশঙ্কু হলে হালে পানি পায় না,
পালে বাতাস লাগে না
সব পাখসাট থেমে যায়
সত্য হয়ে ওঠে ‘আমি’ আর আমার ক্লীবত্ব,

নতুন উত্তাপ নিয়ে ওরা কোথায় চলেছে?


ঈর্ষা
...
জীবনের সব কাজ-কারবার প্রকাশ্যে কে করে?
কাপ্তান বন্ধুরা তাই খ্যাতির অমোঘ সূত্র করেছে গোপন
নিজেকে নগণ্য করে রয়েছি ওঁদের হাতে
সুলভ শপিং ব্যাগ।

কানামাছি আমি, মুগ্ধ নার্সিসাস ওঁরা
ওঁরা ভোঁ-ভোঁ সতত চালায় গুঞ্জরণ;
ওঁরা সব রেড-কাউ ওলান ঝাঁকিয়ে উঠে যায়;
কৌটার লেবেলে।

বাতাসেও ভূমি ক্ষয় হয় অথচ ওঁদের কোনো ক্ষয় নেই,
ওঁরা নগ্ন হয়ে
ছুটে যাচ্ছে
অমরতার দিকে।


কিনারা বিচ্ছিন্ন সাঁকো
.............
বহুদিন কিছু বাড়ি কিছু মুখ
অগম্য-অদেখা যায় নগরের অন্য প্রান্তে
যখন তখন সুখ সেখানে মজুদ ছিল
কে যেন কালের কাঁটা ছড়িয়ে রেখেছে
এই অধমের সেই পথে।

সেই বাড়ি আর সেই মুখগুলো
অস্পষ্ট অক্ষর
চোখ ও মনের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে
ক্যামিলিয়নের মতো ঠোঁট ছুড়ে গ্রাস করে
নিয়ে যেতে চায় নিজের ভেতরে।

আমার নিজস্ব বর্তমান কিছু বাধা বটে,
সেটা শেষ কথা নয়,
আছে কিছু ব্যথিত সম্পর্ক যেন কিনারা বিচ্ছিন্ন সাঁকো।

মস্তিষ্কের শিশুরা
.........
হায়! হায়! জলে পড়ে ডুবে যাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা
তাদের আতঙ্ক চিৎকারে দাঁড়াতে পারি না।
ত্রাণে ব্যস্ত দেখি না কে-কারা ওপরে দাঁড়িয়ে
নির্বিকার ছুড়ে দিচ্ছে শিশু অনর্গল।

অভিশাপ দেব কাকে? সবাই আমার
ফুঁ দিয়ে ফিরিয়ে আনি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস।

শুনেছি জলের কোলাহল চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতি।
হিমালয় থেকে নামে তরল সমাজ।
ভুল স্বীকারের বাঁকে বসে ভাবে অর্থনীতিবিদ।
তারপর রব ওঠে ক্যালরি বাড়াও, মুখ খুলে দাও।
আমার কপাল পোড়া, মাথায় ঋণের বোঝা,
বোবা-কালা-অন্ধ আমি কখনো দেখি না
শিশুগুলো এইভাবে ছুঁড়ে দিচ্ছে কারা?



ইডিপাস
.......
কেন আমি চক্ষুষ্মান?
কেন আমি এ মাতার সম্মুখীন?
অরক্ষিত বুক
কোলে, কাঁখে মাথায় সন্তান
পরিণতি অতিক্রম করে হেঁটে যাচ্ছে সন্ধ্যা
তাকে দেখে ফেলি তবে কি আমিও ইডিপাস?


ঘণ্টাঘর
.......
নদীচরে জোয়ারের জলে ভাসে, সাদা চুল বৃদ্ধের মস্তক
স্টিমার বাজালো হুইসেল;
শৈশব সমাপ্ত করে
কিছু টাকি মাছ হাতে ওঠে এলো উলঙ্গ বালক দল।
চক্রবাঁক শেষ হতে না হতেই
প্রবল হাঁ করে থাকে ক্রেন,
শূন্যে ঝোলে সমূহ ত্রিকাল;
জোড়া জোড়া দুঃখ ভাসে অভিমুখ পানে।

সারবত্তা প্রতিবিম্বহীন,
বিস্তারিত সব কথা মনে থাকে না এখন,
ব্যাধির কাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে,
জগৎ-সংসার ধূমায়িত;
সবার অলক্ষে বেড়ে ওঠে স্ত্রী-পুত্র চেতনা;
বারবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি ওদের শরীর;
আঁতকে উঠি, বুকের ভেতর ঘণ্টাঘর...।

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০০৯

জলমগ্ন পাঠশালা






জলমগ্ন পাঠশালা : কাজল শাহনেওয়াজ

সূচিপত্র
জলমগ্ন পাঠশালা/ অবান্তব/ কেমন করে বলবো/ একদা অজস্র স্বপ্ন তুমি ও দৃশ্যপট/ থাকতো যদি দীর্ঘকায় পাইন/ পদ্যের বই/ সাইবারনেটিক্স/ হাইড্রলিক/ পরিস্থিতি/ রহস্যখোলার রেঞ্চ/ বায়োলজী ক্লাশে/ হাকুড়দিয়া/ কেওয়াটখালি লোকোশেড/ একরামপুরের দুপুর/ গারো ও ইহুদীরা/ ব্রেনড্রেন/ টেরর ছেলেটি যেভাবে বলেছিল/ হ্রস্বতম জেব্রার রূপকথা/ হেরোইন/ জংশন/ ভালোবাসার দানো/ একটি বিকল্প কবিতা/ দাঁত/ আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী/ নিশার ভাষা/ অতনু/ দুই/ কন্যাকে/ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিরিজ/ লিরিকগুচ্ছ/ মৃত্যু আজ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে মৃতদেহ ছেড়ে



জলমগ্ন পাঠশালা
.............
ডাল ঝুঁকে বর্ষার প্লাবিত মগ্নতাকে
ছুঁয়ে ছিলো অলস, মন্থর গতিতে
দুপুরের কৃষ্ণ আঙ্গিনায় পার হলো উদাস শামুক
আমাদের জ্যৈষ্ঠ মাস গোড়ালীর ঘাসে
এক পা দুই পা করে জলমগ্নতায় অদৃশ্য হলো।

পুকুরের থৈ থৈ কৃষ্ণ কথায় চাঁদের ছায়া হলো থৈ থৈ থালা
হিঙ্গুল পাতার আঠালো থাবায় মগ্ন গ্রাম, মগ্ন দুপুরের পাঠশালা।

যেন অর্ধেক আঁধারে ভরা সরু খালের অন্তর,
প্রাকৃতিক বেঞ্চির তক্তা ভেসে গেছে অন্তপ্লাবনে
মৃত এক টুনটুনির অনুপম দেহ ভেসে যায় স্রোতের সমতলে
আধপাকা হিজল নামে মাছের সন্ধানে।

ওরা মাছ, ওরা দেশান্তরিত একদল মানুষের মতো
টিনের আধডোবা মোরগের পাশে বসবাস করে
ভাঙা বর্ষাকে জোড়া লাগালো-
কি যে দূর আত্মীয়তা মানুষ ও মাছে।

মৎস শিকারীরা এলো, নৌকার ছইএ ছিন্ন হার
ওরা পরিহার করেনি, ওরা তবু মৎস বিনাশী;
মাছের সবজে নীল চোখ ওরা ভালোবাসে,
ওরা জলের ভেতর রূপালী মাছের ঝাঁক ভালবেসে হৃদয়ের জালে তুলে নেয়।

ধান খেতে বাদামী পালকঅলা বক
কালো নৌকা এলে উড়ে যায়
দলছুট মাছ ও পালক পাশাপাশি অনন্তকাল ডুবে যেতে যেতে
নেমে যায়, চলে যায়, যেন হৃদয়ের কাছে ফিরে আসে।

মুঠোবন্দী নিশিন্দা পরীর গল্প, কারা এলো?
পানির ঘূর্ণিতে শ্যাওলার সবুজ চোখ, কারা এলো?
জলমগ্ন ঝিঁঝিঁদের সংসারে কারা এলো -
পেছনে হাটে আর ঝরা শিশিরের গল্পে
চোখ খুলে বর্ষা দেখে!


অবাস্তব
......
কে গেলো? কে? রেলোয়ে স্লীপার ধরে জড়োসড়ো?
আকাশের পথভ্রষ্ট পাখী কোন? ঝরা পাতা সমাজের?
পার্কে রাত্রিতে বহুদূরের আকাশ দেখিয়ে নিজেকেই বলেছিলাম
ঐ দেখো পাহাড় দেখা যায়
ঐ দেখো দূরে বিরাজ করে কেমন শূন্যতা
অবাস্তব দু’ফোঁটা পানিতে চোখ ভরে উঠেছিলো
পায়ের চটির মাঝখানে নখ ঘষে ঘষে
বলেছিলাম - ঐ দেখো নদী, ঐ দেখো
কি এক বিশাল চোখ তাকিয়ে এদিকে
দুটি কৃত্রিম হাতে শরীর জড়িয়ে বিড়বিড় করে এইসব বলেছিলাম।

কে গেলো, কে?
মাননীয় বৃক্ষের আড়ালে, কে গেলো জড়োসড়ো হয়ে
পথহারা পাখী? ঝরা পাতা সমাজের? তুমি?


কেমন করে বলবো
..............
কেমন করে বলবো
আমার হাতে বীজগণিত আর পাটীগণিত, তোমার হাতে ইতিহাসের নোট
আমার গায়ে ধুসর বর্ণের সার্ট আর কীটনাশকের রঙের চোঙা প্যান্ট
তোমার গায়ে আগুন না প্রজাপতির মরা রক্ত, মেরুন রঙের?

‘আমরা খুব আজ ব্যক্তিগত চিনাবাদাম খাবো
বাঁক ছাড়িয়ে যেতে যেতে কুড়োবো খুব
মাশরুমের টুপি, খুঁজে নেবো এমন কিছু ফুল
যারা নিজেরাই অদ্ভুত এবং বলবে সকল কথা!’

‘যেমন?’

‘যেমন কদম, কদম!
বুকের মধ্যে গোল, নিরেট, অনুর্বর
বর্ষাকালে খুলতে থাকে প্রাকৃতিক বন্ধন
নিজে এতো সুন্দর তবু ভেসে ভেসে জীবন কাটায়-’

‘যেমন কদম
একটি বৃত্ত নিজের ভেতর, একটি গণিত সমস্ত গাছের
অনুভবের নিজস্ব গোলক, পুরো জ্যামিতিক;
জটিল গতির সন্ধানে সে নিজেই অনুপস্থিত
দ্রুত ঝরে পড়ে আত্মস্মৃতির ভেতর-’



একদা অজস্র স্বপ্ন তুমি ও দৃশ্যপট
....................
তুমি বললে বনতুলশী, আমি বললাম ভুল
মাঠের মাঝে ফুটলো আমার নন্দনেরই ফুল।

মাঠ কুমড়ো নদী ঘেঁষে অবাক করা চোখ
আকাশ থেকে পড়লো বুঝি অপূর্ব আলোক।
সরু ফিতে কার যে চুলের নিরব অসহায়
আমার বুকের রাস্তা দিয়ে অল্প ঘেঁষে যায়।
পথের পাশে এগিয়ে গেলে অশ্বত্থের পাশে
ঈশ্বরেরই নাকে মতো মঠ এগিয়ে হাসে।
সবুজ জলাভূমি হেঁটে বাঁক ফেরালেই দেখি
বনতুলশী ঝোপে তুমি নিরবতার পাখি।

নিজেই বলি বনতুলশী, আবার ভাবি ভুল
মাঠের মাঠে এ যে আমার নন্দনেরই ফুল।


পদ্যের বই
..........
গুমটি ঘরে লুকিয়ে ছিলাম বেশ কয়েকটি রাত
বুটের লাথির ভয়ে
শালিখ আর চড়ুই এসে ব্যঙ্গ করতো প্রতিটি সকাল
ওরা আজকাল ভয়ই পায় না
মেনে নিয়েছে ফেরারী লোকজন।

বাইরে ঝুলছে তালার গহ্বর
ব্রোঞ্জযুগের নিদর্শনের মতো
দরোজা থেকে এঁকেবেঁকে ঠিক ভেতরের দিকে
একটি গোপন তক্তপোষ।

সঙ্গে ঝোলার মধ্যে রোগা কাব্যগ্রন্থ, হলুদ মলাট
প্রথম পাতা ছেঁড়া
দেশ এখন উপচে পড়ছে আর্তনাদের ফেনায়
বদ্ধ ঘরে টিনের চালে সেই শব্দের কাঁপন লাগে।

নিশানা নেই পথের
বসে আছেন যারা বসে থাকার, হাত তুলছেন, পা তুলছেন
খুলে দেবেন ঈশ্বরের তালা?
কারা, তারা কারা?

হলুদ পাতা থেকে
ক্ষণকালের বিশ্রামের ফাঁকে
ঊর্ধ্বে ওঠে ক্লান্ত চিলের ডানা
গুমোট ঘরে লতিয়ে ওঠে বুনো ধুন্দুল লতা
মেঝেয় ধানী ইঁদুর

আমার রোগা পদ্যের বই
কোথায় তুমি কই
আড়াই হাতের তক্তপোষে চুপচাপ আজকাল
আমি পেতে আমার জাল
শুধুই ভাঙি দিনের কাঠি, রাতের কংকাল।


সাইবারনেটিক্স
..........
তুমি এলে ট্রাক্টরের কলকব্জা নড়ে ওঠে
নি:শ্বাসে কাঁপে ঘাম
তুমি এলে সাইলেন্সার থেকে ভকভক ছোটে

তুমি থাকো যদি চুপচাপ
ধুলো ও কার্বন জমে ইনজেক্টরে
বুঁজে যায় থার্মোষ্ট্যাট ভাল্ব

তুমি না এলে
নড়ে চড়ে ওঠে হিসেবের গভর্নর, বিনা তাড়ায়
ধানখেতে কালো ফড়িং পেশী টানটান করে দাঁড়ায়।


হাইড্রলিক
.......
আমার হাত স্মৃতির পথ চলা থেকে নেমে এসে
কণ্ঠরোধ করছে আমাকেই বিশাল
একজোড়া হাইড্রলিক হাত

ভারী হয়ে উঠছে পা যেন বহুদিন
রোপা আমনের খেতে দাঁড়িয়ে ছিলাম
হতবিমূঢ় একজোড়া কাদামোজা পরে

আজ আমার চোখে কুয়াশা অবিকল
অঘ্রাণের খামার বাড়িতে একজোড়া
পুকুরেরই মতো


পরিস্থিতি
........
আসবে যদি ভাব নিতে তবে পিপা নিয়ে এসো
কালো ওয়েল্ডিং গ্লাস চোখে পরে এসো
সীসার জ্যাকেট পরে এসো
মিলিটারি বুট পায়ে এসো
গ্লাভস নিয়ে এসো

বলাতো যায় না কখন কি ঘটে যায়!


রহস্য খোলার রেঞ্চ
.............
হাত থেকে পড়ে গেলো ইস্পাতের রেঞ্চ ঝনঝন শব্দ করে
মেঝে মেঘলাতে
এমন সময় সোনা গাভী এসে মুখ দিলো হীরের ঘাসে
ওয়ার্কশপে যন্ত্রপাতির কাছে
আমি ঘষে যাই লোহার কবিতা
একা একা

কবে থেকে
টুকটাক ধাতুখন্ডদের সাথে কথা বলি
গল্প বলি নেবুলার বড়ো হয়ে ওঠা
মহাকাশযানের আজীবন একা থাকা
চতুর্মাত্রায় অনন্ত জীবন
কোয়ার্ক নাম ধরে ডাকি, ওগো দরোজা খোলো, জানালা খোলো
আমার কথা শোনো
কিউব, ট্যাপার আর গিয়ারের ফুলেরা

আজ কি যে হলো আমার
হাত থেকে কেন যে পড়ে গেলো ঝনন করে
রহস্য খোলার রেঞ্চ
সোনার গাভী এসে মুখ দিলো আমার
বাগানের হীরের ঘাসে
অচেনা ধাতুর এক গাভী এসে।


বায়োলজী ক্লাশে
.............
প্যারাফিন ট্রে’র গায়ে পিন দিয়ে গেঁথেছি
হাত
পা
এইবার যিশুর সাথে আমি ও এই সোনাব্যাঙ
পরস্পরের জীবন বদলাবো।


কেওয়াটখালি লোকোশেড
...............
রোদের জিহ্বা বেরিয়ে পড়েছে। কেওয়াটখালি লোকোশেডে
নীল মোচা রঙের রেল।
একটি ডিজেল বাবুইঞ্জিন টিনের টুপির নিচে
আরাম করছে। ঠেলে ঠুলে ঘাম ঝরাতে ঝরাতে
বয়লার ফেঁটে যাওয়া কয়লা ইঞ্জিনকে
আনা হলো। ঘি রঙের টুপি পরা ঠিকাদারের
লোক ভুড়ি ফুটিয়ে ছাতা মাথায় গোঁফ
নাড়িয়ে হুকুম দিলো ‘ভাঙো’।

অক্সিজেন শিখা জ্বললো। কালো রঙের আগুণ
ফোঁপালো।
টন টন ইস্পাত।
মিটার মিটার পাইপ।
তামা। দস্তা।
বিকেল হতে হতে লাইনের উপর রইলো শুধু চাকা।
চারটি।
একটি বাছুর সন্ধ্যের দিকে
হাওয়া খেতে চাকার উপর উঠলো।


একরামপুরের দুপুর
............
নদী ও রেললাইনের মাঝামাঝি মহকুমাজেলায়
একসার ওয়ার্কশপের কাছে
খালি পিপার পাহাড়।
ঘড়ঘড় শব্দে ধুলো ওড়ে শীতের মধ্যাহ্নে।
এক ঝলক কান্না কাতর নীল আলো
গভীর নলকুপের পাইপে ফিল্টার বদলানো সময়কার ঝালাই থেকে
মাশরুম লিঙ্গের মতো উঠে আসে।
আশেপাশেই এক প্রস্ত শিরিষ সবুজ, এক প্রস্ত জমানো নি:শ্বাস।

মালা বদল লেনায় দেনায়
দেশী কারখানায় শুরুর সাথে হাত ধরাধরি
এক পা ছায়ায় ধরে চৌকো বুনো পাতা
এক পা অগ্রগতির রুরাল জনসভায়
তানানা নানানা তানা নানা নানা
মাছের বুকের কাছে লেদের বিছানা
উবু হয়ে পা ছোঁড়ে ক্লান্ত ওয়াগন
আত্মনিবেদিত আধো নাগরিক মন
আমার এ সাম্প্রতিকের কান্না - ক্রমবিস্ফারিত গতি
একরামপুরের দুপুর একদিন পাবে পরিনতি।


গারো ও ইহুদীরা
............
ভারী যন্ত্র আমি ইহুদীদের পরম কল্যাণে ভারী
সাদাসিধে উচ্চমার্গীয় এক ইন্দ্রিয় যন্ত্র।

মহিলা এবং নিষ্ঠুর আর্তনাদ পছন্দ করি
আর আবিষ্কার করি যে রাস্তয় ভ্রমণে যাই
তা ব্যবহৃত হয়েছে বহুবার।

একমাত্র রাসায়নিক ভাবে অনুভব করে
মহিলার কৌমার্য বিষয়ে দ্বিধাহীন হওয়া যায়
গারোদের সে সুযোগ নেই বলে ওদের পুরুষেরা গুম্ফহীন।

ভারী শিল্প বাঁচে তূলনারহিত ইহুদীদের হাতে
একেকটি দীর্ঘ অপেক্ষা মহাযুদ্ধ শেষে
উচ্ছৃঙ্খল হয়ে স্বীকার করা ভালো
পুরুষ ও মহিলার মিলনেই ভারীশিল্প বেঁচে থাকে।


হেরোইন
.......
তাবুর ভেতর মরা রোদের ঘোর লাগা বিষন্ন ছেঁড়া পর্দা
টগবগে চৌবাচ্চা, উপচে পড়ে যাচ্ছে সবুজ খেলার মাঠে ট্রেন
একা একা চলেছি আলোর স্টেশন থেকে
বৃষ্টির ভেতরে, সবুজ ট্রেনে আজ কামরায় দুলুনি - ঝিরঝির ঝিরঝির

একটা হাত নদীর উপর পড়ে আছে, আরেকটি হাতে
নক্ষত্রের বাঁশী কোলের ওপর টেনে এনেছি
বরফের ঘরবাড়ি, মাছের ধনুকের প্যারাবোলা
হঠাৎ জায়গা বদল জুতোর সাথে হাঁস,
চোখের সামনে নিশিন্দা গাছে মোরগের দীর্ঘশ্বাস
কামরার সাথে কোনো এক আয়ুর্বেদিক ওষুধের আলমারি
লতাগুল্ম, ঢেকিশাক, ফার্নেসে উত্তাপ,
শব্দগুলো রঙিন সুতো, রক্ত ঝরছে, উজ্জ্বল আলোর নিচে ওপেন হার্ট সার্জারী।
দু’হাটুতে মাথা, আত্মদর্শনের গোলার ভেতর গোলা
ধরে আছি শক্ত করে হলুদ রোদেলা
পাখির নখ দিয়ে পড়ো-পড়ো অমৃতের ডাল
সাদা দেয়াল, শাদা দেয়াল - কিছুটা বেখেয়াল
ছবির সারি, ছবি থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম - যেন সবুজ ঘাস
সোজা মানুষগুলোর চোখ ভরা কালো সন্দেহ, নির্মম অবিশ্বাস
তুল্যমূল্য, তুল্যমূল্য হিসাব, কালো পিঁপড়ের সারি
ঘাস, শুধু ঘাস আজ বিকেলের আততায়ী বাড়ি
থেকে রাতের ক্ষয়ে যাওয়া নখের নেবুলা।


ভালোবাসার দানো
.............
তোমার নাক, মুখ, চোখ, ঠোঁট - তোমার স্তন, যোনী, নাভী, নখ
সব ভালোবাসার সেবা করার জন্য
সব ভালোবাসার ডাক টিকিট, ভালোবাসার লোমকুপ, ভালোবাসার মুদ্রা।

প্রাকৃতিক আর সব ভোগ্যপণ্যের মতো তুমি;
তোমার জিহ্বার লালায় ক্লোরোফিল, স্তনে ডায়াজিপাম
নাভীতে চালতা ফুলের সৌরভ
সমুদ্রের সূর্যাস্তের মহিমা ঐ তোমার স্লিপারের ঝলকানি।

তুমি মাদী ঘোড়ার উজ্জ্বল কোমলতায় বর্ণিত
তরুণ মোষের নম্রতায়
বাষ্পরুদ্ধ বয়লারের মতো ছটফটে তোমার তরল চোখ
কোয়েলার মতো দুষ্প্রাপ্য, বিভারের মতো দামী
তুমি জানো সারস ও ষাঁড়ের হত্যারহস্য
শিকার ও শিকারীর মনস্তত্ব,
শুধু ভাঙচুরের কারসাজি।

সন্ধ্যার শ্যাওড়া কাঁপিয়ে চলাচল তোমার
তুমি ভালোবাসার দানো।

মহারাণীর বেতের চেয়ারে রাজসম্রাজ্ঞীর শিরদাঁড়া টান করে বসে থাকো
আনবিক ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি সেই দৃশ্য নিয়ে
আমিও যে বড়লোকের স্নানের দৃশ্য লুকিয়ে দেখেছি।


দাঁত
......
কবরের ভিতর চেনা বলতে শেষ পর্যন্ত রইলো দু’পাটি হাড়ের দাঁত।

এই দাঁতগুলো ছিলো উৎসবে চিবানোর জন্য
ভোঁজে ছেঁড়ার জন্য আর লৌকিকতায় মধুর হাসির জন্য
ছিলো ঘুম থেকে উঠে দিনের খোলা হা-এর ভিতর লাফিয়ে পড়ার আগে
সকালের পানি ও পেষ্টে ধুয়ে ফেলবার জন্য
কথা বলতে গিয়ে ভুল হয়ে গেলে জিভ কামড়ানো জন্য
চুমুতে সাহায্য করবার জন্য।

আজ বুকের লাল তিল, বুড়ো আঙ্গুলের ডগায় ছোট্ট পোড়াদাগ
এমনকি শরতের মসৃন নীলের সদৃশ চার আঙ্গুল কপাল
সবই মাটি ও উদ্ভিদের ভালোবাসার বিষয়।

চেনা বলতে রয়ে গেলো অবশেষ দু’পাটি দাঁত।

সাজানো, এলোমেলো, কোণা ভাঙা, একটির ওপর আরেকটি ওঠানো
শাদা বা ঘোলা
হৈ চৈ করা অথবা নি:শব্দ।


আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী
..........................
আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী, বাংলাভাষা, বামরাজনীতি,
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ভালোবাসি
তাই আজ বেছে নিতে হয় এলোমেলো জীবনযাপন, লম্বাচুল, অনিশ্চয়তা
হাতে তুলে নিই হেরোয়িন গুড়া, সুঁই ও সিরিঞ্জ, নাজু ওয়ার্ক্সের সিস্টেম,
পাতিরাম, বয়রার চরশ

আমরা ক’জন ইটের রাস্তার উপর পিচ দিতে ভালোবাসি তাই মরাখোলা যাই
খুঁজে বের করি দাগীলোক
সূর্যাস্তের দৃশ্য ছেড়ে বেড়ার ঘরে বসে থাকি

আমাদের কাছে কৃষক শব্দের মূল অর্থ ‘কৃশ’,
মাস্তান ‘বিদ্রোহী অসহায়তা’
তরুণীরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে ভুল করে, বলি, বিছানায় যাও
তোমাদের অন্ধকার খুব ভালো আছে, শুকতারা ভালো আছে,
ছাদ আজো ভালোবাসে শিউ-চন্দ্রিমা হাত
যাও, আর দেরী করো না, শুতে যাও খুকু।

আমার কখনো পালকিবাহক, ঝিকঝিক লা লা করে পুরনো গ্রামের আলপথে
বাউল রমা-পারুলের সংসারে যেতে ভালোবাসি
চিলে কোঠা ছেড়ে মাটি-কোঠা খুঁজি, ভালোবাসি কবিতা
তাই সমস্ত কুৎসিতের উপর প্রবল ঘৃণা উগরে দিয়ে
হা হা করে হাসতে হাসতে অপ্রকৃতস্ত হয়ে যাই।



কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিরিজ
..............

শরৎকাল
.....
থিরথির করে কাঁপছে শরৎযন্ত্র শিশিরের আঘাতে
সারারাত চলেছে, তাই হিমায়িত নলে কুয়াশা
গাছপালার নাক-মুখ থেকে গলগল করে বেরোচ্ছে।
বিশাল থার্মোফ্লাক্স থেকে গলা বের করে
বেরিয়ে আসছে নদীর ঐ পাড়ের সূর্য হঠাৎ দাঁড়ি কামাতে কামাতে।


অনেকগুলি লেক
.........
কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের পাশ দিয়ে গেলে বর্ষাকালে
ষাঁড়ের গোবরের গন্ধ এসে ঝাপটা দেয়
কিছুদুরে শহীদ মিনার এর ওভারহেড পানির ট্যাংক
দুটি ভাই ওরা কিছুকাল হাত ধরে আছে
ঐ দিকে তাকালে আকাশ দেখা হয়ে যায়
লেকের পাশে চুপচাপ বসে থাকলে
পাশাপাশি কোথাকার অনেকগুলি লেকের কথা মনে হয়।


কর্মশালার পাশে রেললাইন
..............
আমাদের এখানে কর্মশালার পাশ দিয়ে
দিগন্তের মাফলার হয়ে রেললাইন চলে গেছে বহুদূর
আসামের নুড়িখন্ড আর গর্জন কাঠের স্লিপারের উপর দিয়ে।
দীর্ঘজীবী দিনের হাতে এইটুকু অবকাশ আমাদের
কর্মমুখর গবেষণা খামারের ভেতর।


জরিপ
.....
নারকেল গাছগুলো সাক্ষী সেই সব দুপুরে
কি করেছি আমি একরাশ অবিন্যস্ত ভাবনার
উড়োখুড়ো চুল উড়িয়ে মুখশুকনো সঙ্গীদের সাথে
পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সীসারঙ পানির উপর থেকে
উঠে আসা রোদ নিয়ে
টি.এস.সি’র দোতলায়, বোটানিকেল গার্ডেনে
বৃষ্টিভেজা অন্তরীণ অবস্থাগুলোকে কি সব ভেবে
লুকিয়ে ফেলেছি বর্তমান থেকে
শাদা কাগজের স্তুপ তা জানে
জানে লেকব্রীজের তারাগুলো, গভীর রাতের কাছে
আমার আকুল অন্বেষণ, কি খুঁজেছিলাম
ধুলোর সাথে মিশে যেতে চেয়ে ঐ সব
নির্জন মুহূর্তগুলোয় -


লেকব্রীজ
.......
বাস্তবে লেকব্রীজ নিচে তার পানিছায়া
সামান্য বাতাসের রাতে ঝাউয়ের পাতায়
পুরনো দিনের জন্য সে কি শো শো উচ্ছ্বাস মায়া!
খেজুরে অশ্বত্থে যুগল জোড়াঞ্জলী
কান্নার নির্জন রাতে গাছগুলো পঙ্গু ঘোড়ার পিঠে বিপন্ন অশ্বারোহী।


বাহাদুর
.......
প্রতি সন্ধ্যায় দেখি তাকে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে যেতে, চলে যায় কোথায় যেন
লাল টানেলের করিডোর ঠেলে প্রেমিক প্রেমিকার মাঝ দিয়ে
লাইব্রেরীর কাঁচ ভেদ করে এলামন্ডার উজ্জ্বল হলুদ পাপ ছুঁয়ে
সে যেন কোনো এক অসীম বলবান শক্তিশরীর হয়ে
অদৃশ্য হয়ে যায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে।
এইতো ছিলো সে এই অন্ধকারে, খুঁটে খাচ্ছিল
ভিটামিন, শর্করা, সেলুলোজ, খনিজ কিছু কিছু
পরক্ষণেই সিমেন্টের ঢেউ ভেদ করে অন্যদিকে রাজপথে
খুট খুট করে হাঁটছে একাকী একা একা
সারারাত মাঠময় ঘুরে ঘুরে হাঁটে, দু’এক কদম
থমকে দাঁড়ায় লেভেল ক্রসিংয়ে, দূর থেকে দেখে
নতুন স্টেডিয়ামের হংশবলাকা ছাদ, ধীরে ধীরে হাঁটে
হাঁটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে আহত করা
অপারেশন শেখার গিনিপিগ ঘোড়া
রাত শেষে পেরিয়ে যায় তুঁত গাছ, আকাশের তারাদের দিকে।

আরো একবার ফিরে আসে
যেন ভালোবাসার লোভ হয় অপারেশন ঘরে...


লিরিকগুচ্ছ
..........

ছেলেটি ও মেয়েটি
...........
ছেলেটি পড়েছে তারপুলিন
শ্লোগানে বসে গেছে গলা -
ছেলেটি কি চায় আজ নিজের কাছে?
মেয়েটি যে নিস্ফলা!


ভালোবাসার ক্ষুধা
............
আসলে ভালো করে তোমাকে খাওয়াই হয়নি
তাই ভালোবাসার চোঁয়া ঢেকুর উঠছে
তোমাকে বলেছিলাম, আরেকটু ঠোঁটের ভাত আর ঘাড়ের ব্যঞ্জন দাও
অম্নি দেখালে জোড়া কবুতর উড়ে যাওয়া
মুঠো মুঠো গম দানা বরাদ্দ ওদের জন্য, আমার জন্য নয়
আমার যে রয়েছে ভালোবাসার ক্ষুধা, আর্তনাদ, ঈর্ষা ও পরাজয়।


ফাঁকি
......
যা দিয়েছো সব কি তোমার ভালোবাসার দান
এসব ভেবে দিনরাত হয়রান
হয়তো কিছু ফাঁকিও আছে বন বাদাড়ের মতো
ওরা যতো ঘন জমাট
শুন্য কি নয় ততো?


শংকা
........
দিন দিন কেবল শংকা বাড়ে তোমাকে নিয়ে
আছো কি নেই
তুমি কি ঠিক আগের মতোই
চুলে আটকে গেলে সরু চিরুনী
আমার কথা ভেবে খামাখাই শংকায় ভরে ওঠো?
----------------------------------------------

জলমগ্ন পাঠশালা : কাজল শাহনেওয়াজ। প্রচ্ছদ: কাজল শাহনেওয়াজ। স্বত্ব: সুরাইয়া সিদ্দিক। প্রকাশক: শিল্পতরু প্রকাশনী, ২৯০ সোনারগাঁও রোড, ঢাকা-১২০৫। প্রকাশকাল: ফাল্গুন, ১৩৯৫/ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯।
মূল্য: বিশ টাকা মাত্র। উৎসর্গ: আবিদ আজাদ করকমলেষু

রহস্য খোলার রেঞ্চ


কাজল শাহনেওয়াজ


'জলমগ্ন পাঠশালা' পর্ব অতিক্রমের পর এই কবিতাগুলি আমি লিখেছিলাম, পাশাপাশি 'কাছিমগালা' পর্বের গল্প লেখাও চলছিল। সব কবিতাই লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা বা না-ছাপা। ক্ষীণ কলেবরের সেই গ্রন্থিকাটির কথা ভাবি... সের দরে ছাট কাগজ কিনে কভার হয়েছিল, কয়েক রকম ছিল প্রচ্ছদ। রানিং কম্পোজ... সুলভ করার জন্য কোন আতিশয্য ছিল না...
-কা.শা.


কবিতাসূচি
----------
চিড়িয়াখানা/ পুরুষ মানুষের বিভিন্ন রকম সাইজ / আগুনের কি হবে/
শীতে পত্রমোচি কোনো এক গাছের উদ্দেশ্যে/ চিরন্তন সরল রেখা/ পশু পালনের দিন/ একদিন আনারস/
কুয়াকাটার সূর্যাস্ত কেনো লাল হয়ে ওঠে/ রাধুনী রাধা/ উপমার জগৎ/ স্মরণাঞ্জলী/ বিগত/ কপালের চোখ/ পানিদেশ ভ্রমন/ দৃশ্যতত্ব/ খোলামিল/ জীবনসড়ক থেকে কবিতারাস্তা - সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবে না/ জাফলং বিষয়ে একটা কবিতা কিভাবে লেখা যায়


চিড়িয়াখানা

আমার সাথে মুন্সিগঞ্জের সেনেটারি ইন্সপেক্টর, গোপালগঞ্জের স্বাস্থ সহকারি, পিরোজপুর পৌরসভার দুজন ভদ্রলোক ঘুরে ঘুরে চিড়িয়াখানা দেখছে। পিরোজপুরের সহকারি সাহেব তার কালো জুতা থেকে মিরপুরের লালমাটি সরাতে সরাতে বলে, ‘সুন্দরবনে এ রকম হরিণ আমার নিজের হাতে বহুবার মেরেছি, জানেন, হরিণের মাংশ খুব ভারি’ - আমি শ্রদ্ধায় আবেগআপ্লুত হয়ে পড়ি তার লালচের কথা শুনে। যে মুখে বলল বিগত প্রায় সেই সব হরিণের কথা - হরিণের রান্না করা লালচে গোশত এ মুখেই বহুবার খেয়েছে নিশ্চিতভাবে বলা যায় -
এরা সবাই বিভিন্ন জেলা শহরের পাদপিঠ থেকে এসেছেন তা বলে কোন গর্ব নেই কারো চোখে মুখে -
নতুন মেহমান যেমন করে থাকে। গত দশদিন শহরের ট্রেনিং একাডেমির ডর্মে কাঁচা তরিতরকারির বাসী চেহারার মত দিন ও রাত কাটিয়ে আজ বিকালে এরা ধনেশের নকল গাম্ভীর্য নিয়ে ছুটছে।
লক্ষ্য করে শুনি নিজেদের মধ্যে জানোয়ারের কথাবার্তা ছেড়ে ওরা অন্য একটি বিষয় নিয়ে খুব তৎপর হয়ে পড়লো। গোলাপগঞ্জের গোপালবাবু মুন্সিগঞ্জের চল্লিশোর্ধ উঁচু হিল পরা নিতান্ত নিরীহ রাজ্জাকুর রহমানকে বলছে, ‘ভাই রেজ্জাক, ঐ মেয়ে ভাল্লুকটার শাড়ির বাহার দ্যাখছেন, ইশশরে...’। এই সময় একটি অতিকায় জলহস্তি ঝামাইটের রোদে শুয়ে নাক ডাকছিলো। একজন কে যেনো নিতান্ত তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বলে, ‘দ্যাখেন, মইষ’।
শুক্রবারের বিকালে জানোয়ার দেখতে কত বিচিত্র রকম মানুষ এসেছে। চাঁদপুরের হাই ব্লাডপ্রেসারে কাতর ইনসান আলী, সিরাজগঞ্জের খোদাবক্স মৃধা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুরউদ্দিন, হবিগঞ্জের গোলবার হোসেন। সবাই চাকুরে, সবাই নিজের বাড়িতে থেকে চাকরি করেন -
জিরাফ দেখতে দেখতে নবুরউদ্দিন বিষ্ময়ে বলে ওঠে ‘রাতে এরা কি ঘুমায়?’ উট পাখির গোলাপি রান দেখে আমুরউদ্দিন মুর্চ্ছা যেতে চান, না জানি রোষ্ট হলে কত জনে এটা খেতে পারবে?
কাকাতুয়ার সাতরঙা ঝিলকানো সাদা পালক দেখে কিশোরগঞ্জের তারকেশ্বর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, বিষ্ফারিত চোখে শুধু পাখিটিকেই দেখতে থাকে একা একা, আর আমরা দেখি - দুটি হাত কপালে ঠেকিয়ে বিরবির করে কি যেন বলছে তারকেশ্বর। দেখে আমাদেরও একটুখানিক ভাব মতো হয়, আমরা তার চতুর্দিকে গোল করে দাঁড়াই।
একটু দূরে বাঘের খাঁচায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার লেজের চাবুকে মধ্যবিত্ত জনকজননীর শিশুকে ভয় পাওয়াচ্ছে।
তারকেশ্বরকে কেন্দ্র করে আগৈলঝারা হয়ে আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম তের রকমের তেরটা লোক। দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভাবলাম তুচ্ছ একট জীবনের মোটা চালের ভাতের ভেতর দিয়ে বড় হয়ে এসে হঠাৎ এই বিকেলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছি কেন?
তারকেশ্বরের বাঙালি নোনাধরা চোখ কাকাতুয়া দেখতে দেখতে উপচে পড়ছে। আমরা দেশলাই থেকে সিগারেট ধরাচ্ছি - সবার হাতেই দেশলাই, তেরটা ম্যাচ বাক্সের তেরটা কাঠি ঘষছি তের জন লোক - নিঃশব্দে ঠান্ডা ভাবে, যেনো ম্যাচের বারুদ নিবিড়তা ভেঙ্গে চিৎকার করে না ওঠে।



পুরুষ মানুষের বিভিন্ন রকম সাইজ

তার জুতার সাইজ ৫। মোজা ৯।
প্যান্ট ৩২। এন্ডি ৩৪।
বেল্ট দেড়। এক্সএল সার্ট।
গেঞ্জি ৩৪। লেন্স -১.৭৫।

জুতার রং কালো। মোজা ছাই লাল।
প্যান্ট ধুসর। অ্যান্ডি ডোরা কাটা।
বেল্ট কালচে খয়ের। সার্ট ফেডি পোড়ামাটি।
গেঞ্জি চাঁপা সাদা। চশমা পরীদের সোনালী।

জুতা ও বেল্ট পশুত্বকের। মোজা প্যান্ট
এন্ডি সার্ট ও গেঞ্জি বিভিন্ন ধরনের
কার্পাস তন্তুতে বোনা।
শুধু চশমাটি খনিজ ধাতুর।

মোজা বেল্ট এন্ডি সার্ট ও গেঞ্জি দেশে বানানো
জুতা প্যান্ট ও চশমা বিদেশে বানানো।

এই সমস্ত কিছু তার শরীরে সেলাই করে ও স্ক্রু বল্টু দিয়ে আটানো।

পুরুষ মানুষের কতো রকমের সাইজ।
যত সাইজ ততো মাত্রা।


আগুনের কি হবে

একদা যা ছিলো টানাটানি করা বিকেল
দিনের দু:সহ চাপে টলে উঠেছে তার নিকেল
দীর্ঘশ্বাসের ঘন্টা কি যে টলোমলো
আজ এই বিকেলের কি যে হলো

আমার সিল্কের ঘর ভরে গেলো গিজ গিজ করা অদ্ভুত ভিড়ে
কুৎসিত ছাপমারা হাড়গিলে বামন
হাসতে হাসতে বিঁধে নিচ্ছে নিজেদের মরমি তীরে
উদ্ভিদ বিষয়ক যতো বই, শৈশবের পেরেক,
আমার উভচর বৃষ্টি প্রপাত,
কাগজের ফাঁকে জমিয়ে রাখা নির্ঘুম রাত্রিদিন।
আমার গল্পের জুতা মোজা কঠিন জীবনের জয়গান।

আমার ময়দানের আলফা প্রক্সিমা আর আটপৌরে চাঁদ
সব নাকি কবেই নিলামে উঠেছে।
দেখি গোল হয়ে সেজেছে ঋণের মাকড়শা রানি
আমি যা ধরে আছি সব যেন ধরনীর সমর্থনহারা ফাঁদ
দেখি তাকিয়ে দেখি চোখ মেলে দেখি আর্তনাদ করে দেখি
লম্পটের চাঁদোয়া তলে আমি কি বিশুদ্ধ পাখি

সব টেনে নিচ্ছে সব হারিয়ে যাচ্ছে কতদিনের পাওনাদারের হাতে
যত করেছি দেরি মনমাতানো আলাপ ভালবাসার সাথে
একজন দরজি এগিয়ে এসে জানিয়ে গেল সবই বাকির খাতায়
সে বলল আরো
যে কোন সময় হঠাৎ ধরে নিতে পারো
আমি খুলে নেব তোমার ডান হাত
ওদের কথার বাতাসে আমি কাঁপি থরথর
তারপর কপালে ভাজপড়া সুপ্রাচীন কালো ইটের ব্যাপারি
কাছে এসে দাঁড়ালো
এলো মগজ ব্যবসায়ী। হৃদপিন্ড ভিখারি, চোখের খাতক
এলো তালাঅলা রাত্রির সুতার পথের মিস্ত্রী
ঋণ ঋণ ঋণ তুমি নিজেই আজ নিলামে উঠেছ
হিক হিক করে ওদের কন্ঠে শয়তান শাসাল
আমার জাল স্বাক্ষর ওদের হাতে, ওদের হাতে আমার টিপসহি

দেউলিয়া হবার আগে দেখি, ওরা
আমার হাত পা নখ লিঙ্গ চুল দাড়ি নাড়ি ও মগজ
সব খুলে খুলে পলিথিনে - চামিচে চামিচে তুলে নিল

জগতের অদ্ভুত অচেনা অজানা সেই সোনার মৌমাছি
হা হা করে উড়ে উড়ে চেঁচিয়ে চলেছে:
ধনতন্ত্রের ব্যাপকতর শীতল সংগ্রামে হায়, প্রকৃত আগুনের কি হবে?


শীতে পত্রমোচি কোনো এক গাছের উদ্দেশ্যে

আমাদের করুণাঘন শীতের কেমন মাথা ঘামছে আজ ঐ দেখো
কুয়াশায় ফর্সা হয়ে যাচ্ছে কপাল জামা কাপড়ের নিচে
ভিজে যাচ্ছে বুক পিঠ কুচকি ও রান
জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে তার ডিউটি শেষে ঘরে ফেরা গার্মেন্টসের ক্লান্ত মেয়েগুলিকে দেখে
গুড়িগুড়ি আবছা ভাবনা ঝাপসা বেদনারাশি খেলা করে উঠছে
মুখ থেকে বেরোনো হালকা কুয়াশার সাথে।

সব কিছুর মধ্যে ঝিনুকের অবতল ভাগের মতো ফকফকা শাদা এক উদ্দেশ্য রয়েছে
তাই পৃথিবীতে মানুষের চোখে শাদা শাদা ভাব ফুটে থাকে।

শক্তির ব্যবহার যেখানে বেশি সেখানেইতো পরস্পরকে হত্যার কথা মনে আসে
কিন' সব জ্বালানির মধ্যেই রয়েছে চরম ক্লান্তি
আর অজ্ঞতা দানা বেঁধে উঠলে বুদ্ধির ডালে বিষফল পেকে ওঠে।

খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হতে শেখো দেখবে আলো এসে তোমাকে খুঁজে নিচ্ছে
যখনই অন্ধকার হাতছানি দেয় নিজের কথা ভাব
রাতের আকাশের নিচে দাঁড়াও
দেখবে কিছু তারা মুহূর্তে মুহূর্তে রং বদলাচ্ছে
যে দাঁড়িয়ে গেছে তাকে জিজ্ঞেস করো না কিছু
নিজের কথা বলতে বলতেই সে আটকে গেছে।

তোমার জন্মই হয়েছে লক্ষ লক্ষ ব্যর্থতার মধ্যে।
তোমার চারিদিকে ঘাসের জন্য গাভীর ব্যর্থতা
ফুলের জন্য প্রজাপতির ব্যর্থতা
ভুগর্ভস্ত পানির জন্য গভীর নলকুপের ব্যর্থতা
ব্যর্থতা জ্বালানির জন্য যন্ত্রের, সুঁইয়ের জন্য সুতার,
রংয়ের জন্য কাপড়ের
দেহের জন্য আর্ট কলেজের ছাত্রদের আঁকা নির্ঘুম জলরংয়ের

যে সব ব্যর্থতার কথা বললাম তা বিশ্বাসে অকুন্ঠ থাকার জন্যই ঘটছে
বিশ্বাসের জন্য আছাড় খাচ্ছে যারা অবিরাম
বুঝে দেখো ওরাই তোমার বন্ধু
ওরা হলুদ পাতার মতো অকাতরে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে
দেশে দেশে নগরে মফস্বলে
শীতেই এসব টের পাই।

আজ পরম অযত্নের ভেতর শীত এসে আমাদের পায়ে পায়ে ঘুরছে
বনভূমি কই সখা, সন্ধ্যা হতেই টায়ার পুড়িয়ে শীত ফেরানোর চেষ্টা করছো
দিনের শরীরে খন্ড খন্ড অবসন্ন রাত, রাতের পেটের ভেতর কর্মহীন দিনের শুন্যতা
তুমি এসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে গেলে
ঝড় ও ভূমিকম্পের মুখোমুখি হবে
দেখবে রাস্তাঘাটে অসংখ্য লোক একটা অদৃশ্য কিছুকে ধরার চেষ্টা করছে
কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়।

বলার আগে একবার দম নাও
তাহলে নিজের ব্যর্থতাকে হলুদ পাতার মতো উড়িয়ে দেবার স্বস্তি পাবে
শুরু করার আগে যদি একবার ভাবো দেখবে একটি লোক
হাসপাতাল থেকে ভালো হয়ে বাড়ি ফিরছে
ভাবতে ভাবতে কল্পনার ষাঁড়ের কুঁজের মাংশ আর
কবুতরের জরায়ু দিয়ে বানানো চপ খেতে খেতে
ভাবনা উড়িয়ে দাও, দেখবে তোমার ভাবনা অকাতরে ফলে যাচ্ছে
তোমার আশে পাশে যারা আছে তারা প্রত্যেকেই খুব ভিতর থেকে আশাবাদী হতে চায়
কিন' ওরা বস'ত পক্ষে হতাশ, ওরা একটি দম ফেলতে চায় তোমার শিকড়ে
যেখানে মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাসের জন্ম, যেখানে বিধ্বস্ত হাহাকারের চাপ
সেই জায়গায় একটি টোকা দিতে চায়
যাতে তুমি কেঁপে ওঠো তুমি আর্তনাদ করে ওঠো ওদের বেঁচে থাকার
প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখে
ওরা চায় তোমার পায়ের শিকড়ের চারদিকে গোল একটি চলমান রেখা
ফুটে উঠুক যেখানে বিগত দিন থেকে আনা সমস্ত
গল্প গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে

ঝড়াও শীতের পত্রমোচি গাছ সমবেদনার পাতা
মৃত্যুর জন্মদিন পর্যন্ত যেন ধান ক্ষেতের দৃশ্য মনে থাকে
হাতল খুঁজতে খুঁজতে বন্ধ দরোজায় যেনো মাথা খুঁড়তে পারি
মাথা খুঁড়তে খুঁড়তে যেনো বন্ধ দরোজার হাত বেরিয়ে আসে।


চিরন্তন সরল রেখা

শরীরে বাকল পড়ে দাড়িয়ে রয়েছে একটি একাশিয়া
ছোট্ট সে একেবারে কিশোর পাতাগুলি ছাগল ছানার মতো লাফাচ্ছে
নিচে তার আলো করে দুটি ছোট্ট চকচকে পোকা

সমস্ত গাছপালা ঝুঁকে আছে আনন্দে কলিজা রঙের পাতায়
দখিনা বাতাসের ঘন ডাক, মাথা কাত করে মুসান্ডা
এলামন্ডার সাথে ফিসফিস করে হাসাহাসি করছে,
কানে হাওয়া লাগাচ্ছে ঘাসেরা, বিনোদনের, ব্যক্তিগত পাতায়
প্রতি পৃষ্ঠায় সমান বর্ণনা
প্রতিটা গাছই আজ একই সমাজের

পোকা দুটির একটি হলুদ কামিজ আর একটি কালো ট্রাউজার পড়েছে
ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা সরল রেখার জন্ম দিচ্ছে।
একটা চিরন্তন সরল রেখা।
পাশের পিপুল স্বাক্ষী, স্বাক্ষী গর্জন।

পশু পালনের দিন

আমারতো ছিলো না পাহাড়ে চড়ার বিদ্যা
তখন আমি নৌকা বাইতে পারতাম
নিজের জন্য একটি খাল খনন করতে করতে
দিন যেতো

আমি বৈঠা তুলে মাঝে মাঝে গান গাইতাম
কয়লা দিয়ে ভুতের ছবি এঁকে বশীকরণ চর্চা করতাম
রাতের বেলা পথে নামতাম পরির পাখা কুড়াতে।
একদিন আমি উটের পিঠে চড়তে শিখবো বলে ঠিক করি।

উটের জন্য চাই মরুভূমি যেমন গরুর গাড়ির জন্য হারিকেন।
পড়শির বাড়িতে নাই বাবলার গাছ।
হরিণ পালতে দেখি কেওড়া গাছের প্রয়োজন।
কুমিরের জন্য দরকার চোখের পানি।
তিলে ঘুঘুর জন্য এক বিঘা জংগল।
সাপের জন্য তীব্র যৌন ফুল।

ঘুঙুরে রোচেনা মন তবু বুক ভরা ছোট্ট একটা পা খুঁজি
কিছুতেই দেবে না জানি তবু তার আঙ্গুল কখানি খুলে নিতে
রহস্য থেকে নামি, পকেটে রেঞ্চ, হাতে সৌখিন আঙ্গুলদানি।

প্রান্তরের ডাকবাংলায় খুঁজি শিশিরের নিশিথ
হঠাৎ হঠাৎ পাহাড়ি বরফের ডাক, চিলের চিৎকার
কিন্তু কোথায় প্রকৃতির মুখ চেপে ধরার ক্লোরোফর্ম ভেজানো কাপড়
যাতে শে না চেঁচায়?
শক্ত পাকস্থলি কই যাতে পাথরের গিঁট আর ফুলের তীক্ষ্ণ কামড় হজম করতে পারে?

ক্ষুধার চেয়ে গোল, ক্রোধের চেয়েও আন্তরিক
আনন্দের চেয়েও স্বচ্ছ, ভিখারীনির চেয়েও কপালহারা
কি সে কল্পনা ঘোর গাঢ় জ্যামিতি?
জীবনের কালো উচ্চারণ নিহিত কোন প্রতিতূলনায়?

পাহাড় থেকে যা সহজ উঁচু পাহাড় থেকে তা সহজেই দেখা যায়।
আমি আজো পাহাড়ে চড়িনি
নৌকা বেয়ে বেয়ে
চলে যাই - যেখানে নৌকা নাই সেখানে।
যেখানে আমি নাই সেখানে গিয়ে ঘুরে আসি।


একদিন আনারস

নির্জন যায়গা দেখে আমি একদিন আনারস ক্ষেতে ঢুকে
চুপ করে একটা আনারস হয়ে গেলাম
অনেকগুলি চোখ দিয়ে এক সাথে অনেক কিছু দেখবো বলে।

অনেকগুলি বেদনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি অনেকগুলি সম্ভাবনা
দেখছি এগারোটার সূর্য একদিকে টগবগ করে ফুটছে
দেখছি একদিকে বাতাস বইছে ফুলের রেণু নিয়ে
একদিকে শালের অরণ্য। এক দিকে শব্দ। শো শো। কিসের যেন।
সাবলীল বেদনা যখন সৃষ্টিশীল হয়েছিল
নিশ্চয়ই অনেক কিছু মিলে এমন একটা
মহান একাকীতার জন্ম হয়েছিল
বহুদিকে তাকাতে তাকাতে আমি কেবল একের কথাই ভাবলাম।

মনে হয় আমার অনেকগুলি চোখ হলেও একটাই মাত্র চোখ
অনেকগুলি সংবেদন হলেও একটাই মাত্র অনুভব।

দেখি উপরের সাথে নিচের কোন মিল নেই।
কাছের সাথে দূরের কোনো তূলনা হয় না।
দিনের থেকে রাত পুরাটাই আলাদা।
অনেকগুলি চোখ দিয়ে আনারসের মত দেখলে
অনেক রকম ভাবনাকে রূপ নিতে দেখা যায়।
অনেক রকম দেখা যায়। অনেক কিছু দেখা যায়।


কুয়াকাটার সূর্যাস্ত কেন লাল হয়ে ওঠে

সাগর পাড়ে লোকটা করছে কি
তো দাউ দাউ করে জ্বলছে কেনবা পূবের পানি?
নারকেল বনে বাতাস নতুবা জেলেদের গানে
গলদা চিংড়ির রেণু ধরছে কে ঐ গগণে!

বালির উপর পা ছড়িয়ে বসেছে যে ভোরে
একনিষ্ঠ মেকানিক সে যেনরে
খুলছে বসে বসে ঢেউয়ের তরঙ্গে, বাবুইয়ের বাসা সে খুলছে
উড়ছে এঁকেবেঁকে সোনালি খড় কত রকমের
বুদ্ধের মন্দিরের সামনে বসে সোনার সুঁই তার আশা।

সিগাল চমকায়, রুদ্ধশ্বাসে দেখে
একে একে সুন্দরী কিশোরীর শরীর থেকে
লেহাঙ্গা ছুড়ে ফেলে সে যে
উরুসন্ধির হালকা রোমের উপর চুমু খেতে খেতে
অস্ত গেলো কি যে ভালোবেসে

কুয়াকাটা কি ভোর? কুয়াকাটা কি কালো?
পশ্চিম দিগন্তে লাল রক্ত ছিটিয়ে
একই ফ্রেমে যেন সূর্যাস্ত হলো!


রাধুনী রাধা

সকালে এসে দেখতাম তুমি রান্না করছ।
চুলার উপর কিছু একটা চড়ানো, আনন্দে তা ফুটছে।
পাশের ঘরে সেই ঘ্রাণ আমার বসার আয়ু বাড়িয়ে দিত।

আমাকে বসিয়ে রাখতে অপেক্ষার ঘরে
অনেকগুলি আমি বসে থাকতে থাকতে তাসের মতো এলোমেলো হয়ে যেতাম
কালো সাতের উপর লাল আট বসানোর ধৈর্যের খেলা খেলে
রহস্যময় থিমগুলি পাশাপাশি দাঁড় করাতাম, সাথে এসে মিশতো
ধুধুসর অতীত কাল কতক্ষণ এসেছি অথচ দেখা নেই
রঙিণ হৃদয়হীনতা কি যে করছ অত দূরে
ছাই দিয়ে মেঝেতে লিখছ বুঝি আমার নাম
পানির ধারার নিচে কার লাফানোর শব্দ
গোসল সেরে তুমি বাইরে এসে দাঁড়ালে কি
আমাকে ডাকলে নাকি বললে: এসে দেখ!

কমলা লেবু তুমি সারাসকাল কি নিজেকেই রেঁধেছ
আমার সামনে আসবে বলে?
প্লেটে করে নিয়ে এলে তোমার শাদা গোল চোখ দুটি!

কোন এক উনুনের শিখা এখনও ভাপ ছড়াচ্ছে গুনগুন করে
তোমার গালে ও কপালের লালে
আমি তোমার সামনে বসে
চুপচাপ সুঘ্রাণ নিতে গিয়ে
একটু একটু করে চোখ দুটির দিকে আগাচ্ছি।


উপমার জগৎ

সাবধান তোমরা কবিতা বাণী ঐশী মনে করো না
তাহলে পাঠকের গজব তোমাদের ওপর।
তোমার মাতৃভাষাতে সমগ্র জাতির বৈশিষ্ট নিহিত।
আমরা আবারো বলছি, অতীতের বহু কবি নিজেকে চেনাতে পারেনি
শুধু মাত্র ভাষাকে না বোঝার জন্য,
ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের হাহাকার
পুস্তক প্রকাশের দিকে নিজেকে ব্যস্ত রেখো না
আত্মপ্রকাশের পূর্বে বারবার ভাব নিজেকে।

নতুন বিষয় উদ্ভাবন করো পুরানো কোন বিষয় শরীরে অনুভব করে
দেখবে নতুন দাঁত পেয়ে ম্লান উপমা কেমন খলখল করে হেসে উঠেছে

যার সাথে অন্তরঙ্গতা হয়নি, অতঃপর সেই সব বিষয়
তোমার জন্য নিষিদ্ধ করা হলো
নিষিদ্ধ বস্তুকে মাত্র জ্ঞান দিয়েই উন্মোচন করা যায়
আর তখন তা হয়ে ওঠে রক্তের আলো।
যা রৌদ্র দগ্ধ দিন পেরিয়ে এসেছে অথচ ম্লান হয়নি, তার খোঁজ করো
যেমন কিছু কিছু উপমা - এ এক আশ্চর্য জগৎ - পৃথিবীর সব
বিজ্ঞানী বা রাজনীতিকও সারা জীবন একটা ভালো উপমার অন্বেষণ করে

কিন্তু কবিই প্রকৃত পক্ষে এর সৌন্দর্যে চিৎকার করে ওঠে
ভাল কবিতার প্রথম গুণ উন্মোচন।
ভাল কবিতার প্রথম লক্ষণ বিদ্রোহ।


স্মরণাঞ্জলী

সভ্যতা সৃজনে পশু পাখী গাছ জলাশয়
খনি অথবা মেঘের অবদান অনস্বীকার্য

সভ্যতা চেয়েছে বহু অন্ধকার বহু বহু ইচ্ছার মৃত্যু
যুদ্ধাস্ত্রের জন্য অনেক খনিজ
অনেক নদী হারিয়ে গেছে বাঁধ দেখে

যে পাতা ফলের দাবীতে হলুদ হয়েছে
তাপের ঢেউ দিতে গিয়ে নক্ষত্রের ওজন কমেছে যেখানে
বালিতে পরিনত হয়েছে যে সব বিব্রত পাথর
মানুষের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সমর্থনে

ওরা সবাই সভ্যতার শহীদ
হঠাৎ কোন কোন বিশেষ মুহূর্তে ওদের জন্য আমার বুক টনটন করে

আমার মাথা ভারী হয়ে নামে ওদের কথা ভেবে।


বিগত

আরে এটা কে? তোমার শিশুপুত্র বুঝি? তাহলে তো ওর
নতুন দিনের থুতনি নেড়ে
মোহনার কাছে বেড়ী বাঁধের উপর গজানো আকন্দ পাতার পাশে
দাঁড়ানোর একটু অনুভূতি নিতে হয়!

এসো এসো
ভালই হল
আমার সেই শেলাই করা চেরা যায়গাটা আজ ড্রেসিং করার দিন

দেখতে পাচ্ছি ও যেন নিজেই রহস্য খোলার রেঞ্চ
খরগোসের মতো নিখুঁত চোখ দুটিতে
নিমফুলের পিঙ্গল নীল দুফোঁটা মধূ বুঝি
হাসছে মৌরি ফুলের মত
ওর মুখে কি আমার তোমাকে ভালবাসার কোন চিহ্ণ আছে?

না না আমাকে দেখে তুমি এতোদিন পর কেঁপে উঠো না
সত্য বিনষ্টকারী শিশুটিকে আমি ভালো করে দেখি
যার জন্য তোমাকে আসতে হয় নীল পোকার ছদ্মবেশে
আমার ঘুমের ভিতর
অজানা সাঁকোর দিকে গেলেও
নিষিদ্ধ পারদঘন সোনালী বিহ্বল মদ আমার
আজ তুমি বিগত প্রাণ

তোমার মুখখানি যেন ভেজা ভেজা খুব কান্না পায় বুঝি?
বৈশাখের বিকাল ভরে ওঠে প্রাচীন চৈত্রের ধুলায়?

তুমি যা বলতে পারলে না, তা বলে দিল তোমার ছেলেটি
গালের ওপর দুষ্টুমির কাটা দাগে একটু হেসে উঠে!


কপালের চোখ

নগরীর প্রধান ফোয়ারায় একটি ব্যাঙ সোডিয়াম আলো দেখে
বলেছিল: দিনেও এমন আলো দেখি নাই ভাই
অন্য ব্যাঙটি আহলাদে ভাবে: তাইতো তাইতো তাই
এমন মহৎ কাজ যার মাথা থেকে এলো
চোখ কপালে তুলে তাকে সালাম জানাই

সেই থেকে ব্যাঙের দুচোখ কপালে। ফোয়ারা
দেখলেই বালকদের উচিৎ সেখানে ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া।


পানিদেশ ভ্রমন

হাইল হাওড় থেকে এক মুঠো পিট মাটি তুলে নেই হাতে
এরকমই পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে বরিশালে - সাতলা আর বাগদা নদীর কাছে
এমনই কালো মাটি - হালকা - যেন স্পর্শ সেই হাহাকার হাতের
যার ত্বক বাদামি হয়েও রোগা নীল
নক্ষত্রের বারান্দা রাতের বাড়ি আমি এখনো পার হতে পারি
অযুত চিন্তার নদী - যার নাম মধুমতি চন্দনা কুমার চিত্রা
আত্রাই গোপলা লংলা মনু ঘাঘর সন্ধ্যা
নোনা আর আধো স্বাদু পানিতে চোখ ধুয়ে দেখি
তুমি নীলিমার কেবিন সুদ্ধ চলেছো কোথাও

আকাশের নিচে তোমার মেঘলা সবুজ পেট - একটু উপরে লাল টিলা
নীল পুকুর
লজ্জাস্থান ঢাকা আম বাগানে কুহেলি অপরাহ্ণ
শর্ষের একটি ঝলক
সিসার নদীতে

তোমার পানি যে কতো রকম - কতো রকম
নদী হয়ে বয়ে চলেছো তুমি পানি পরি
আমি জানি - জানি - তবু ভেবে দেখি চেয়ে দেখি শুনি
সমুদ্রের পানি আর মোহনার পানি একই রকম প্রায়
রয়েছে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা, হাত পা দাঁত
ক্রোধের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে ভেঙ্গে ফেলে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে
তারপর ফিক করে হেসে ওঠে শে
আমার মত


দৃশ্যতত্ব

হাফপ্যান্টের একটি বালক ঢিল ছুঁড়ে দোকান পার হয়ে গেলে
রাস্তার মোড়ের সেই যুবকের মনে হয়েছিল
মুদি দোকানগুলো যেনো চুপচাপ শান্ত কিশোরী

কাপড় শুকাচ্ছে কে ওখানে উঠানের তারে - সেখানে
দুটি কাক স্তব্ধ হয়ে কেন যে মুখোমুখি
নইলে কি সম্পূর্ণ হত না এইদিন!
দৃশ্যটাকে পরিপূর্ণতার দিকে পাঠিয়ে দেবার জন্য
পাথর গড়িয়ে পড়েছিল যেন

প্যান্টের পকেট থেকে হাত টেনে বের করে
বাতাস কেটে কেটে জানালার পাকা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে
মনে হল এ শুধু স্মৃতি স্মৃতি
বহুযুগ আগে এরকম হয়েছিল তখন আমাদের খুব ছেলেবেলা
আবার বহুযুগ পরে হয়ত বা এরকম হবে
আজ এর কোন অর্থ কোথাও পাব না।


খোলামিল

দরোজাটা খুলছে আর লাগছে আর খুলছে বারবার
খুলতে পারার মধ্যে
বীজের সাথে গাছের
পুকুরের সাথে মাছের
তীরের সাথে হাঁসের
গাভির সাথে ঘাসের যেমন মিল
সেই রকম লাগাতে পারার মধ্যে
তোমার আমার মিল করে ঝিলমিল!


জীবনসড়ক থেকে কবিতারাস্তা
সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবে না

ছিলিমপুর থেকে জীবনসড়ক। তা থেকে একটা রাস্তা
কবিতার দিকে গেছে।
ভ্রমনের কালি থেকে রাস্তাটার জন্ম - পাড়াগাঁর রস
আর কোড়ালের গল্প শুনে শুনে
পুরানা গাছের ছায়া বড় হয়ে উঠেছে।

এই রাস্তার ওপর প্রথম দাঁড়িয়ে ছিল যে মানুষটা
আমি তারই কথা ভেবে খুব আপ্লুত হই
এর উত্তরদিকটা ছেলে দক্ষিণদিকটা মেয়ে
একটাদিক ছড়িয়ে গেছে শীতে
একটাদিক হারিয়ে গেছে বসন্তে

অতিপ্রাচীনতা থেকে আজকের দিনের দিকে আসতে গিয়ে
চলে এসেছি খুব সন্নিকটে
এসে দেখছি আমার ভিতরটা একেবারে শুকিয়ে গেছে ভয়ে
সামরিক তিষি ক্ষেতে আমরা
সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবেনা

মানুষ কি এক জায়গায় দাড়িয়ে থাকবে?
পেন্সিলের দাগের মতো
বিস্মৃতির রবারের সামনে থরথর করে কাঁপবে?


জাফলং বিষয়ে একটা কবিতা কিভাবে লেখা যায়

জাফলং যেতে পাথরটিলা বাজারের কাছে গাড়ি থামাতে হল।
তাকিয়ে দেখি দূরে দুটি টিলার মধ্যে মাকড়শার আঁশের
একটি ঝুলন্ত হাসি-খুশী ব্রীজ। ব্যাঙের ছাতার মত
মাটির টিলার গায়ে শিশুদের ছোট ছোট ঘরবাড়ি।
পুরানো টাইপড়া সাহেবমত লোকটা
ট্রাক থেকে নামল।
আবার চরাই উৎরাই, স্থানীয় নিসর্গ ও তাতে সম্পাদনার ছাপ।

সকালেই পাখিগুলি ডাকছে।
খুব নামকরা এই জায়গাটা নিয়ে লেখা পাহাড়ে ঘর বাঁধবার মতই।
যে কোন ঘরই শিশুদের ঘর হয়ে যায়।
বিশালতা নয়, গভীরতা দিয়েই নিসর্গ জেগে ওঠে।

জাফলং এর কাছাকাছি হাফলং কোথায় পালিয়ে আছে?
একটা জায়গার মতো আরেকটা কি দেখা যায়?
প্রকৃতি কি দ্বৈত সত্তার পক্ষে?

একটা মানুষের মত আরেকটা মানুষ কোথায়?
একটা কবিতার মত আরেকটা কবিতা?

শীতকালীন জাফলং বিষয়ে লিখতে গেলে দুটি কবিতা লিখতে হবে
শীতকাল ও জাফলং। তারপর লিখে কেউ যদি মনে করে আমি একটি লিখবো
তখন দুটির কিছু কিছু লাইন বাদ দিতে হবে কাঠুরের মতো।
মাঝারী আকারের একটা ক্ষেত দাঁড়িয়ে গেলে যদি মনে হয় এটা ফসলের তুলনায় ছোট হয়ে
গেছে তাহলে শেষ কয়েকটা লাইনের আগে ঢুকাতে হবে এমন কিছু শাকসব্জী
যাতে পাঁচশ বছর আগেকার জাফলংকে এক ঝলক বোঝা যায়।
যদি আকারে বড় হয়ে গেছে বলে মনে হয় তবে কবিতার দশ থেকে তিরিশতম পংক্তির
সব কিছুকে সাজিয়ে নিতে হবে এমন করে যাতে বেশি কথা না বলে।

কবিতার ছন্দ হবে খাসিয়া ছন্দ অর্থাৎ যে ছন্দ
গড়াগড়ি খাওয়া কমলা এবং নদীর বুক ভর্তি
পাথরের রূপ ভেদ করবে।


----------------------------
স্বত্ব: ঋণা শাহনেওয়াজ
প্রচ্ছদ: শিবনাথ বিশ্বাস
প্রকাশকাল: ফাল্গুন ৮, ১৩৯৮, ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৯২


বিকল্প কবিতা প্রকাশনী
৯, ফ্রীস্কুল ষ্ট্রীট, ঢাকা-১২০৫
মূল্য: বার টাকা
----------------------------

আমার শ্বাসমূল

কাজল শাহনেওয়াজ


দুইটা প্রাচীন গাছ ও একটা দাদাকাছিম
........................
ঐ গ্রামে প্রাচীন দুইটা অক্ষয়গাছ আছে।
সেই গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে নিতে
বহু বছরের পূরানো একটা কাছিম
আকাশের দিকে তাকায়ে তাকায়ে গাছ দুইটারে নিয়া অনেক ভাবিছে:
কিভাবে এতোদিন ধরে বাঁচি আছে এরা?
চারিদিকে এতো ছোট গাছের মধ্যে?

একশ বছর, দুইশ বচ্ছর? কে জানে কতদিন?

গ্রামের লোকেদের মধ্যে সবচে শাদা চুল যাদের তারা বলে:
আমরাই তো বাঁচায়ে রাখছি গাছ দুইটারে
নাহলে ধরেন যখন লোকজন কুড়াল নিয়ে আসছিল,
আমরা কি তাদের ফিরাই নাই?

ভাবতে ভাবতে শ খানেক বছর কাটি গেছে মহাপিতামহ গজকচ্ছপের,
কিন্তু এখনো তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেন নাই,
গাছকে কে বাঁচায়ে রাখে - মাটি আর আকাশ?
কচ্ছপকে কে বাঁচায়? পানি আর শ্যাওলা?
তা হলে মানুষের এই কথার মানে কি?

ঐ গ্রামে মাঝে মাঝে আমি যাই,
ঘুরে ফিরে গাছ দুইটাকে সালাম জানায়ে আসি,
দিঘিটার পানিতে নেমে কাছিমদাদাকে কদমবুচি করি

ওঁরা আশির্বাদ করে: বেঁচে থাকো।

অতোদিনতো অসম্ভব,
আমার যে আর একটা দিনও বাঁচতে ইচ্ছা করেনা।


কবিতার জন্য
..........
নতুন কবিতার জন্য নিজেকে বদলায়ে বদলায়ে চলি
বহুদিন থাকি পাউরুটি খাই
কাঁটা চামচ পকেটে ঢুকাই
লাইবেরিয়া না গিয়া লাইব্রেরীতে ঘুমাই।

হো হো হো হা হা
কবিতাযে কতো রকম দেখি তাকাইয়া
দিনে দিনে কতোবার পাল্টায় কবিতার রকম সকম!

মানুষ বদলায়, কবিতাযে বদলায় আরো বেশি
মানুষ মরে, কবিতা হয় এলোকেশি।

নতুন কবিতার জন্য নিজের কান নিজেই পরিষ্কার রাখি,
পরিষ্কার করি নাক, জিহবা
লালন ফকির গেয়ে এক কলি পরীক্ষা করি ঠিক শুনতে পাচ্ছি কিনা,
একটা কামড় দেই অর্জুনের ছালে।

একটা কামড় বাংলাভাষার একহাজার বছরে,
চর্যায় এক কামড়, মঙ্গল কাব্যে একটা
পুঁথির আনন্দে কাটাই কিছুকাল
কিছুকাল উপনিবেশের ঝাপটা

ধান চাষের তিন হাজার বছর
শুঁকতে শুঁকতে আমার নাক হয়ে যায় বুনো শুয়োরের
সৌর বছরগুলি ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে বাংলা বছর হয়ে যায়

রসের ইক্ষুদন্ড চিবাইলে জিহবার আর কোনো সমস্যা থাকে না!
কবিতার জন্য জিহবা পরিষ্কার করার কায়দাটাও
নতুন শিখছি ভারতচন্দ্রের কাছে
আর কে না জানে,
হরেক রকম কবিতার জন্য নতুন স্বাদ অতি প্রয়োজন!


তাকায়ে আছে
........
ঐ দেখো কাজের খোঁজে আসা মানুষেরা বসে আছে

ওদের কারো হাতে টুকরি ও কোদাল, কারো হাতে কর্ণি,
কিন্তু যার হাতিয়ার নাই সে নিজের হাত সামনে সাজিয়ে বসে আছে

রাস্তারার পাশে কাজের খোঁজে আসা কোদাল তাকিয়ে আছে টুকরির দিকে,
দা কাঁচির দিকে,
করাত বাটালির দিকে,
কর্ণি তাকিয়ে আছে যোগালির তাওয়ার দিকে
সবাই থাকতে থাকতে অসহ্য হয়ে গেছে
কাজের লোক এভাবে বইসা থাকতে কি আর পোষায়!

মধ্য প্রহরের সূর্য তাতায়ে উঠছে নাকি?
কেউ তাকায়ে দেখছেনা

হালায় একটা রাম টুকরি : হাতের কোদাল কয়
হালায় ভোদাই করাত : বাটালি টাটায়
হউরের পো’র বিচি নাই : যোগালি চেঁচায়

কাজের সন্ধানে আসা মানুষগুলি
কোদাল, করাত, কর্ণি, টুকরি লইয়া বসা
কেউ তাকাইয়া দেখে না


এই শরতে আমাদের নামাবাজার
...................
দু কদম গেলেই ট্রাকদের অফিস, একটা ছোট বট,
হুরহুর করে মানুষ আসা যাওয়া করছে

নামাবাজার পোকায় খাওয়া একটা হলুদ ফল
বাজার করে ভুখানাঙ্গা গরীব করণিক, টেম্পু, হলার, বেরী বাঁধ
নাস্তা খাওয়া ১২ নম্বর বাস

সবাই যখন ভোরের আজান ফাঁকি দিয়ে গভীর ঘুমে
নামাবাজার তখন জেগে ওঠে,
ভাদ্র মাসের তালের দোকানী ভোর না হতেই দুয়ারখোলে
স্বপ্ন দেখে পথের ব্যাপারী বাকী খাতায় সস্তা দেবে কে

দোকানগুলি পুরানদিনের ছোট্টছোট্ট টিনের হিন্দিছবি
সারা দিনের বাছাই করা স্বপ্ন ধার করে ঘরে ফেরার সময়
কাল্পনিক সুপার মলে রিজেক্ট ষ্টোরে ফ্যাশন হাতরায় খুচরা কাস্টোমার
সোনার কাচে রূপার ফিতা পঞ্জের হাইহিল, হাতে ধরে ছোট্ট বোনটাকে
দুচোখভরে রাপাপ্লাজার আধপাকা পেলাস্টিকের সখে
রাজ্যহারা স্বপ্ন থেকে ব্যস্ত হয়ে
ভাতের হোটেল পার হয়ে যায় ছিড়া ছাতির ঘর
সারি বাধা লুঙি সেলাই মেসিনে এখন ব্লাউজের মাপ

হঠাৎ ফুলকি এসে পড়ে কামারখানা থেকে উড়ে আসা আরিচার খিদার আগুনে
আলু ভর্তা ঢেঢ়শ ভাজি চিচিংগার ঝোল
কুঁচা চিংড়ি পুঁই শাক ডিম ভুনা জাটকা ইলিশের পেটি
আল্লাগো তোমার পেটে এতো খিদা, বানাইছো কত খাদ্যখাবার
গরুর ভুনা চাপিলার চচ্চরি পাঙ্গাসের বিরান
তোমার হাত কত মিঠা, বাবুর্চি তুমি এক পালোয়ান
তোমার ইশারায় কাচকির তরকারী কি সুন্দর ডাক দিয়া যায়
তোমার চোখ কত না সুন্দর,
কি সুন্দর তোমার দাঁতফুল
তোমার চুল মেঘের কাশফুল
সামান্য প্লাস্টিক তোমার হাতে পড়ে হয় যে নাক ফুল
তোমার জুলুসে পচা মাটি বানায় কাঁঠাল
তোমার জ্বসনে চাঙারি ভরা ভাঙা কাঁচ ফ্যাক্টরী আলো করে
তোমার আদরের ছোঁয়ায় মিষ্টি হয় কাউফল

সবই ঠিক আছে, যেখানে যা যা তুমি দিয়াছো নিজ হাতে
তবে কেন তুমি বানাইলে এ শহরে আমাদের জন্য নামাবাজার?
দুনিয়ার যত রং দেখি চোখে নিত্য পথে যাতায়াতে
আমাদের ফলপাকুর, মাছগোস, তরিতরকারী, পোলাপানের ভিডিও গেমে
পাই না তাতো
তোমার সবই তো সুন্দর, কিন্তু হাত দুইটা কেনো এতো ছোটো?


মাডস্কিপার
.......
কাদামাখা মাডটাকি তুমি কি জোয়ারের না ভাটার দলের?
কোটি কোটি বছর ধরে আন্ধারমানিক নদীতে তুমি কি আওয়ামি লীগ না বিএনপি করেছো
আমাকে বলবে কি?

তখন আমাকে একটা আশ্চর্য ঘটনা দেখালো:
আমি দেখলাম প্রতিটা মানুষই এক একটা মাডটাকি
আবার বললো, এবার দেখো:
দেখলাম আমাদের মানুষেরা না না প্রকার পশুপাখিদের মতো

মাডটাকির কাছে মানুষ কি ভিন গ্রহের প্রাণি
তারা কাদার বদলে কাপড় পড়ে থাকে
কোথাও যেতে লাগে ট্রেন বা উড়োজাহাজ

আমরা নিজেরাই আমাদের ভুলছি
তারপরও স্বীকার করি, সকল মাড চায় মানুষের মতো দুটি হাত
কানকো দিয়ে হাটতে চায় না কাদায় কাদায়
মাডস্কিপারীনি নাচতে চায়

তোমরা ভাই আমাদের ডাকো
আমাদের সাথে নাও
মাছকে ডাকো, কুমিরকে ডাকো, ডলফিনকে ডাকো
গ্রামের মানুষদের সাথে নাও

কুকুরকে যেমন পুলিস বাহিনীতে নিয়েছো
বানরকে নিয়েছো কেবল টিভিতে
তোমাদের জন্মদিনে যেমন রয়েছে
স্টারফিসের ভাগ
তোমাদের অংক করছে হাতি
টিকটিকি দিচ্ছে একলা দিনের সংগ
বক হচ্ছে ভাষা বিজ্ঞানী
টিয়া ইংরাজির শিক্ষক
তেমনি আমাদের মতো সাধারনকে দলে নাও
তোমাদের দলে

বকবক করা মাড রাজকুমার
হঠাৎ জোয়ারের আগে থামে

আমরা স্বপ্নের ভিতর থেকে বের হয়ে আসি
মাড টাকি ওখানেই ঘুরঘুর করে


আমাদের রউফ
...........
আমরা ধাঙ্গর বস্তিতে যেতাম শুধু মাত্র চোলাই চাখতেই নয়, কিঞ্চিত পানোন্মত্ততায় যার যা প্রাপ্য তা অকাতরে বিলিয়ে দেবার জন্যেও বটে: যে অর্জন করেছে ইতোমধ্যে তরুণ হৃদয়ের ভালোবাসা অর্থাৎ সংবেদনা ও শ্রদ্ধা যার রয়েছে আর কিছুটা স্বপ্নছুট তরমুজ লাল হয়েছে তারায় তারায় আমরা তাকে মাথায় নিয়ে ধেই ধেই করে নাচতাম যেন ওই ধাঙ্গর এখনো টিকে থাকা আমাদের প্র-প্র-প্র-পিতামহ

তখন রউফ আমাদের দলে সহজেই মিশে গেল : সেদিন পার্টির সদ্য লাল গ্লামারের সদস্যপদ মোড়ানো প্রাপ্তির আনন্দে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছিল ও

কেন মানুষ হেরে যায়?
হাসতে হাসতে এ ধরনের প্রশ্ন ও সহজেই করতো

কিন্তু ও ছিল নির্বিকার
তিরাশীর পহেলা বৈশাখের তপ্ত বেলা এগারোটায় যখন আমরা চুলা থেকে সদ্য নামানো উষ্ম দোচোয়ানি মগকে মগকে হল্লা করে করে গিলছিলাম তখন রউফ এক ফাজিল নেতার মতো উসকে দিচ্ছিল আমাদের প্রেম ও ক্রোধের বিষয়গুলি, আমরা আল মাহমুদ আর শহীদ কাদরীকে তাদের প্রাণনিষ্ঠা আর গ্রাম ও নগর বেদএর জন্য আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠষাঁড়ের কুঁজে একটু হাত বোলাতে দিচ্ছিলাম আর আমরা পায়ের কাছ থেকে শুয়োরের বিষ্ঠা মাখান আঠাল মাটি তুলে লেপে দিচ্ছিলাম তাদের নাম ফলকে যারা প্রথম পুস্তকের সাথেই আমাদের প্রতারিত করেছে

আর আমাদের মনে হয়েছিল : কেন মানুষ হেরে যায়?
হাসতে হাসতে এ ধরনের প্রশ্ন ও সহজেই করত

আমরা সেরকম নেতাদের পাছায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁসের স্প্রিং-লিঙ্গ ঢোকাচ্ছিলাম, সেরকম সমরনায়কদের ঘিলু বের করে চুবিয়ে রাখছিলাম পোড়া মবিলের মধ্যে যাতে তা কিছুটা হলেও চালু হয়; আমরা সেরকম হতভাগ্য সরকারগুলিকে অভিষাপ দিচ্ছিলাম আর হাতের কাছে যে ঝাঁটাগুলি পড়েছিল দুহাতে শক্ত করে ধরে ইতিহাস থেকে বিদায় দিচ্ছিলাম তাদের ঝেঁটিয়ে

আমাদের উসকে দিচ্ছিলো রউফ, যে ওর মায়ের সম্মানে ছিলো বদ্ধপরিকর

আমরা সবাই ক্রোধে অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম; একে একে ধাঙ্গর পল্লীর সকল মহিলাকে মা বলে ডাকছিলাম, নাকি আমরা কেবলই এই মহিলাদের অপমান করছিলাম পহেলা বৈশাখের বাংলা গেরূয়া শাড়িকে? ওরা যে পড়েছে ভাটিখানার গরম চোলাই সে কথা না ভেবে রিফাত এক মহিলাকে ভগ্নিজ্ঞানে দ্রবীভূত হতে গিয়ে দ্রুত-চুম্বন চেয়েছিল বলে হঠাৎ পুরো ধাঙড় পাড়া ক্ষেপে গেল,
বুড়োরা হলুদ চোখ তুলে যুবকদের বললো : ওদের বলি দে!

বৈশাখ দুপুরের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলাম এইভাবে।
একপ্রকার শান্তি প্রক্রিয়ায় দেখলাম,
কবিকে চুম্বন প্রস্তাব করতে নাই, করা ঠিক না,
বিশেষত নিরাপত্তা নিরাপদ নয় যখন -


রঙের সন্তান
........
কোন স্বপ্ন সত্যি দেখি নাই রূপায়িত হতে
কি ভাবে বলবো যে তুই আমারই রঙের সন্তান

এই ভালো
তোর জন্মদাতা : হাওয়া
হাওয়া-ই তোকে মানুষ করবে

চল বাছা তোকে তোর প্রকৃত বংশ চেনাই :

এই যে বনস্পতি, এ তোর পিতা
এই যে মাটি, ইনি হলেন মাতা
আর তুই ঘাসফুল

সূর্যের দুধ খেয়েছিলি বলে
তুই চঞ্চল

নদীতে ঘুমিয়ে ছিলি
তাইতো একটু একটু করে মনে তোর বড়ো হবার ঢেউ জাগছে

আমার হাতে মিথ্যার দুধ
আর বিষের কলম
তুই তাকিয়ে থাকলে
পুড়ে যাবি
তাই লিখবো না তোকে।


চন্দ্রবিন্দু ও শ এর কবিতা
................
পটিয়া বাজারে সারি সারি পাঁঠা বাঁধা, আজ পাঁঠা বাজার, শুক্রবার, ২১ শে শ্রাবণ, ১৪০১ শাল, মহাশড়কের দুপাশে দলে দলে হো চি মিনের শশ্রুমণ্ডিত চিবুক, টান টান শিরদাঁড়া, গর্বে খানিক পরপর কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে কচি পাঁঠাগুলি

স্বত:স্ফুর্ত পাঁঠা গন্ধ মসৃন বিচিগুলি ঢেকে রেখেছে হালকাভাবে তবুও চোখ চলে যায় বারবার। পাঁঠার তো ওটাই গর্ব।
নিম পুরুষের হাত বারবার পকেটে যাচ্ছে আর ইর্ষায় পতপত করছে ওদের পতাকা।

বান্দরবানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেরাবার সময় পাঁঠার তাকদ চাই
যেন পাহাড়ে চড়তে পারি, নামতে পারি পাহাড় থেকে।


কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোটগ্রহে

কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোটগ্রহে
কেন যে দেখতে হয়
মানুষের চোয়ালে রূপার লাগাম তাতে অফুরন্ত হাসি হাসি ভাব

বাকপটুতার অনাবিল যত্ন সাজ

কেন যে আজ সংখ্যালঘুরাই আন্তর্জাতিক।


শামুক মা
........
শামুক মা শামুক মা আমি যে তোর মুক ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকিস না
তোর সোয়েটার বোনার কাঁটা আমার চোখে ঢুকে রয়েছে
আজ আমি যে কিছুই দেখিনা।

কেঁচো মা কেঁচো মা স্বপ্ন কী তোর আজ
আজান শুনে তাকাস, আমি তো আর বিশ্বাসীটি নইরে পাগলি

ঘড়ির গোল মুখটা নাই আর যে তোকে দেখবো
আমার বোতামও আর ছিঁড়ে না, তোর ঐ সুঁই লাগবে কিসে?

আমি বাদুড় পুষি তার খাঁচা নাই কোন
বধির মন্ত্রে প্রহর কাটাই আটটাই
তুমি যাতে লজ্জা না পাও আমি আশ্রয় হারালে

মা তুমি দেখে নিও, ঠিকই খুঁজে পাবো আমি বিচার বসার আগে তোমার চরণ

তোর ছেলে যে ফোঁপায় ভোররাত্রি দিনের ভয়ে
আমার কালো ডেরায় ও মা তুই কই তোকে যে দেখতে পাই না।


সঙ্গীত পরিবারে সতীদাহ
..............
উচ্চারণে ত্রুটি ছিল, তবু শে গেয়েছিল ঠিক রবীন্দ্রনাথ।

পা টেনে টেনে ক্লান্ত সারাদিন শেষে
সামনে একটা শুকনা দেহের নদী
তারপর ইতিহাসের সর্বশেষ সতীদাহ মাঠ।
কলকাতায় ব্রিটিশদের আইন লেখা হলেও
গণ্ডগ্রামে খবর পৌঁছায় নাই বলে
দাউ দাউ করে চিতায় পুড়েছিল শে
জীবন্ত, শ দুয়েক বছর আগে।

নরসুন্দার পাড়ে বহু পুরানো গ্রাম
জংলা টংলা সরিয়ে এখনো ভ্যাপসা নৈ:শব্দে
কয়েক ঘরের লোকালয়
কেবলই বলে না না না না না।

পড়ো পড়ো বাড়ি, জাম্বুরা গাছ অবনত টকফলে
নিয়তির অনুরোধে দীঘি আজ মজা বিষপুকুর
বড় ভিটায় ছোট ছোট ঘর
দিনের বেলায়ই রাত দেখে যারা রোজ
মস্ত উঠান, লম্বা অন্ধকার
একটা বালিকা ঝাঁটায় রৌদ্র তুলে
এই বাড়িটার অসুখ সারাতে রত।

আমরা কোন খবর দিয়ে আসি নাই
তবু কাকাবাবু তার হুকাটা নামায়ে
কিছুক্ষণ বসে থাকেন, উঠানটার দিকে তাকায়ে বলেন :
গান শুনতে এসেছেন... মজা পুকুরে মাকড়শার বুদবুদি...
গান তো সব আপনাদের ঘরে... এ বাড়িতে গৌরিকে উঠান ঝাঁট দিতে হয়
... খোলের কিরন চটা, তাছাড়া হাঁপানি হার্মনিয়ামের...
বলে আবার জাম্বুরা গাছের দিকে তাকান।

কফিল যখন চর্যাপদে সুর বসায়ে গাইল,
মনে হল ও কেন আজ যুদ্ধ ডেকে আনছে?
গৌরি তখনো ব্যস্ত, অস্থির হাতে চা বানায়...
আর সেই ফাঁকে লুঙ্গি পড়া পাশের বাড়ির ছেলেটা গাইছিল
ঠিক যেমন করে গায় আর সকলে
অতুল রজনী কাজী নজরুল।

অবশেষে গৌরি গাইতে এল
খালি-পায়ে-হাটতে-হাটতে-ছড়িয়ে-যাওয়া পা দুটা
কোন রকম লুকিয়ে রেখে বসে
হার্মনিয়ামে শ্যামলা হাওয়া দিল।

উচ্চারণে ত্রুটি ছিল কিন্তু শে গাইল ঠিক-রবীন্দ্রনাথই
বর্ষাদিনে বিকালবেলা সংখ্যালঘু পরিবারের ক্ষয়ে যাওয়া মেয়ে
সোপেনহাওয়ার টোনে গাইলো শ্যামা নাট্টের সেই দুখানা গান...।

ফেরার সময় তখন প্রায় সন্ধ্যা
ঘন্টা বাজো বাজো। গৌরি বিদায় দেবে
আমাদের এক প্রবীণ কবি বললো:
তোমার সবই তো ভাল শুধু উচ্চারণটা ঠিক করা চাই।

অপমানটা ভাসল ওর চোখে
শক্ত হাতে বিদায় ভা-ররী হয়
কবি তো কী হয়েছে, এক্কেবারে মাথা কেটে নেবে?
থামরে কুলাঙ্গার, এক্ষুণি তুই আত্মহত্যা কর!
আমরা দাঁড়ায়ে যাই।
দাঁড়াও গৌড়ি! তোমাকে অপমানের ফল
ভুলের কবি চিত্ত থেকে কেমন করে প্রায়শ্চিত্ত করে, দেখো!

ঠিক হলো কেদো পুকুর পাড়ে ইঁটের উপর মাথা রাখবে বৃদ্ধ কবি
আমাদেরই কেউ আরেকটা ইটে যতক্ষণে পারে
গুড়াগুড়া করে উড়িয়ে দেবে ওর নিরেট মাথাটা।

গৌরি তখন বলে:
চাইনা যে একা যেতে দিতে কবিকে কোথাও, অপমানে
সাজাও চিতা, সাথে যাবো আমি!

ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক, অগাষ্টের প্রথম সপ্তাহে, ১৯৯৬ শালে
কিশোরগঞ্জের সাকিন করিমগঞ্জ।


কেওড়া গাছের বাড়ি
............
নোনা বাদাবন সৃজনে
মা বাবাদের রেখে ফরেস্টবিটে
নেচে নেচে তারা বেরোয়ে পড়েছে সুন্দরবন থেকে
ওরা কী নিৎসের মর্মবাণী নিজ কানে শোনে নাই?

নুনের পানিতে পলির ছড়াছড়ি
এখানে অতিকায় সবুজ পনিরে
কেওড়া গাছের বাড়ি
শাবাজপুর মোহনায়
নোনাগন্ধ তার শীতের পাখিরা টের পায়

ভোলা থেকে বাংলাবাজার, তারপর খায়েরহাট, বোরহানুদ্দি, উদয়পুর,
কুঞ্জেরহাট, ডাওরি, লালমোহন, কর্তারহাট, চরফ্যাসন

সব শেষে চর শশীভূষন
মোটরের শেষ চাকা লেতরা ঘাটে
আকাশ হাটুর কাছে আসতে শুরু করেছে
হাসির শব্দ মুছে গেছে বদন থেকে
কপাল থেকে চন্দ্রবিন্দু গড়াতে শুরু করেছে
হাত ভরা বেরী বাঁধ
অনন্ত সমুদ্রের বিপদে বুক গুরু গুরু
ঐ যে বিন্দু বিন্দু দ্বীপ দেখা যায়।

পড়ে ছিল বুঝি এলোচুল
কচ্ছপিয়াঘাটে বাংলা আকাশ
চওড়া কাকড়ার ডাকে
গলা ধরে অচেনা দুয়েন্দে
বুক ঝালে বসে থাকি
প্লেটে নিয়ে চুলেরডাটি ঝোল।

শ্যালো নৌকায় ছাতি ধরে কোথায় হে মন মাঝিরা
আমায় নিয়ে চল্লে কোন টেম্পোতে
টুস্ট্রোক শব্দে যে কিছু বোঝার উপায় নাই।

বনেরও লম্বা হাতছানি
সন্ধ্যায় বাচ্চা বাচ্চা দ্বীপের চি চি চেঁচামেচি কান্না
বড় দ্বীপগুলি কতদূরে
কার কোলে উরুখোলে গাঙুরি গুঙুরি
ঐ যে কারা যায়, ওটা সমুদ্র পরীর ঝাঁক না?

পকেটেতো ছিল মন চিনি, তাই এখানেতে আজ দিনমনি
পথ থেকে তুলে নিল পিছুটান
কপালেতে বিষ তিল তিষি নাই, চোখে নাই আর কোন উদ্বেগ
ইঞ্জিনের মনটা কি ফুরফুরে, নিৎসের নাই কোন ডালভাত।

হাবাগঙ্গারাম চর কুকরি
দিনভোর ডাক দেয় চিলদের
মহিষের সৎ বোন দুধ দেয়
পনিরের হাঁক ডাক তাই তোলে গোয়ালে
গতকাল যারা ছিল উজানে
আজ তারা ঝিঁকিমিকি তারাদের হাত পা রাত জেগে গুনেগুনে ক্লান্ত।

গোলপাতা গোল নয়, চ্যাপটাও নয়
দূর থেকে মনে হয় চিনি উহারে
বাদা বনে ছৈলা দাঁত তার সবজে
সে নাকি বুদ্ধের নাম শোনে নাই।

ছোট চর কুকরি মুকরি
জেগে উঠে চোখ মেলে ছয় ঘন্টা পর পর
ভাটা রেখে যায় পলি মাটি,
বাড়ছে বাংলার পরিসীমানা।

প্রথমে ধানশী, হারগোজা তারপর
পাখিরা বেড়ায় সকালে আর বিকালে
মাছেরা দেখেনা কি করে তার জেলে
খুব ভোর যদিও, কুয়াশা কার্তিকেয়
ঘুমন্ত বনের মন্দ ফাঁকে
হাঁসেরা ডাকছে কিয়ের্কেগার্দ কিয়ের্কেগার্দ।

কুয়াশাটা নুন ছিল না কিন্তু খালটা ভরা নুন
ফর্সা হতে দেখা গেল সবুজ আগুন
ছৈলাগাছের গোল মনোরম ফল গো
উদবিড়ালের সাঁতার দেখে শ্বাসমূল তার জাগলো।

খালের ঢালু পাড় না তো জীবনানন্দের বাড়ি
তোমাকে কী দরকার আজ জাঁ পল সার্ত্র।

নোনা আশ্বিনের ম্যানগ্রোভ আজ
মুচমুচে আর সকালবেলাডা ঝিকিমিকি
কুকড়ির ভোর ভাইয়া তুমি একাকীকির কিকি কিকি
আজ তা হলে চল যে চই নীল চখাদের চুচকি হাচাই
আয়তনে বাড়বো আর কান চিচুরাই আশনাই।

আমার বর্ষাকাল - কবিতাগুচ্ছ

কাজল শাহনেওয়াজ


আমাকে তছনছ করে
.............
আমাকে তছনছ করে দিলে, আমাকে থমকে দিলে আজ
মাত্র দশ মিনিটের দর্শন আমার সারাটা দিনকে পথে বসিয়ে দিল
উত্তর থেকে দক্ষিণে বাসে চরলাম,
পূর্ব থেকে পশ্চিমে রিকসায় চরলাম, হাওয়ার উড়িয়ে দিলাম হাতপাখা
মনে হচ্ছে আমার দেহের ভিতরে এই গ্রীষ্মের তপ্ত হাওয়া ঢুকে পড়েছে।
দোকানের ছোট ছোট জেনারেটরগুলি আমার ভিতরে চলতে শুরু করেছে
ঢাকা থেকে আমি চলে গেছি সিচুয়ানের ভূমিকম্পে
ছোট ছোট শহরগুলি দেবে যাচ্ছে

সকাল না হতেই
..........
সকাল না হতেই, জ্যৈষ্ঠ মাসের পাখিরা ডাকছে ‘থ্যাঙ্কিয়্যু’
ঢাকার পাখিরা শিখলো করে ইংরেজী
পাখিগুলি সব ভদ্রপাখি
যদিও কাকেরা ডাকছে হায় হায়
যেনবা ওরা খবর পেয়েছে
মিয়ানমারে চিনে মানুষের খুব দিন অসহায় সাইক্লোন আর ভূমিকম্প

তুমি কি বিশ্বাস করো, পাখিরা মানুষের মনের কথা বোঝে?
নইলে কেনো সে বলছে থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ,
তোমাকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ তোমাকে
আমাকে তুমি দিয়েছো যে তোমার অমূল্য মন
যার তুলনা নই এ পৃথিবীতে
দেখো কিযে শিউরে উঠছে আমার ত্বক
শুধু ভাবতেই তোমার প্রসঙ্গ এই বেলা।
আজকাল প্রায়ই প্রত্যুষে

আজকাল প্রায়ই প্রত্যুষে উঠে বসে থাকিদ
দেখতে দেখতে রাস্তা ও গাছ ভেসে ওঠে অন্ধকার থেকে
আকাশে লুকায় প্রতিপদের চাঁদ লজ্জার
ছেলেটি যেনবা বাড়ি ফেরে নাই রাতে
পথে পথে আর এখানে সেখানে দেরী করে
সূর্য ওঠার আগেই ফিরছে আজ ঘরে

বলতো এসব দেখে কি মনে পড়ে যায়?
কৃষ্ণ ফিরছে সারারাত পরে রাধার আঙ্গিনায়
কলংকিত চাঁদ সে কারণ শত সখীর ব্যস্ত বিবিএ
আমি বলি, খেলে আমার মাথাটি চিবিয়ে
সারা দুপুর আর বিকাল সন্ধ্যা
ক্লান্ত আমাকে দেখাচ্ছে খুব অফিস ফেরতা
আসলে কি হয়েছে তোমার সঙ্গে সে কথা কাউকে বলা কি যায়?
খুবতো হাসছো মন খুলে
এদিকে আমাকে বাসায় ঢুকতে হচ্ছে মুখ শুকনো করে।


পাশাপাশি অনেকগুলি দালান
...............
পাশাপাশি অনেকগুলি দালানের মধ্যে
দাঁড়িয়ে আছে একটা মাত্র গাজর রঙের দালান
আমি দেখতে থাকি তাকেই
মাঠ ভর্তি কোলাহল, যেন তুমি খেলছো ছোটবেলাকার ছেলেমেয়েদের মিশ্র ফুটবল
সূক্ষ্ণ কলাকৌশল যার ছিল না
সূর্যাস্তের দিকে পিঠ দিয়ে বসে থাকায়
দালানগুলির ওপর শেষ আলোকচ্ছটা ঠিকরে পড়ার শব্দ বেশ টের পাচ্ছি

এই বিকালটা যেন একটা ক্ষুধার্ত কাছিম
জবা ফুলগুলি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে
তার পাশে বসে, তোমার নাম মিশেল,
তুমি পূরানো ও নতুন দিনকে চঞ্চল স্রোতে বেঁধে দিচ্ছ

একটা ছাতার মত আকাশের নিচে
একটা কাপের মত আলো অন্ধকারে
পাষানের সাথে ঝর্নাকলমের বিয়ে হচ্ছে


তোমার ক্রিকেট পিচে
.............
তোমাকে স্পর্শ করে বাতাস ও বইতে পারে না
তোমার কাছে এসে পুলিসের বাঁশি থেমে যায়
সেই প্রায় আয়তাকার মাঠটি থেকে সবার চোখ এসে
তোমার ক্রিকেট পিচে একবার করে বল করে যাচ্ছে

তোমাকে স্পর্শ করে যাচ্ছে পুরানো পাখিরা
তোমাকে দেখে যাচ্ছে কার্নিশের ছায়া
তোমাকে স্পর্শ করে করে গেল অনেক গাছের ভিড়ে
দেয়াল ঘেঁষা একটা ছোট্টো চারা

তোমাকে ঘুরে গেল একটা বদমাশ মাছি
কার যেন রেকর্ড করা এস্রাজের সুর
তোমার বাহুর সোনালী হলদে ত্বকের নিচ থেকে এমন
মরমী শিরাগুলি ছুঁয়ে গেল আমার জন্মদিন
যেন পৃথিবীতে কোন কালে ক্ষুধা তৃষ্ণা ক্ষমতার কোন সমস্যা ছিল না
আমরা শুধু চুপচাপ বসে ছিলাম।


কেমন ভেজে রেখেছে ফুলগুলি
.................
কেমন ভেজে রেখেছে ফুলগুলি, কেমন সাজানো টবে গাছ
বাটি ভর্তি পদ্মার ইলিশ, থোকা থোকা অন্ধকার, স্বচ্ছ পানির দেশি সরপুটি
সবাই খাচ্ছে সবাইকে, কেউ বন্ধুর চাঁদামাছ
সহপাঠির উষ্ণ ভাজা
সম্পর্কের আম জাম, নতুন পরিচয়ের তালশাস
গল্পের রসালো লিচু থেকে খোসা ছাড়িয়ে
অনেকেই টুকটাক আলাপ করছিল

কিন্তু তোমাকে আমার খেতেই ইচ্ছা করল না
মনে হলো একদিনে না খেয়ে
বহুদিন একটু একটু করে দেখেই থাকিনা!


তোমাকে নিয়ে হেটে আসি
...............
চলো তোমাকে নিয়ে হেটে আসি মানিকদি’র মাঠ
যেখানে ঢাকা শহর তলিয়ে যেতে যেতে একটু ভেসে উঠছে
সামরিক ছাউনির রাগ থেকে বাঁচার জন্য আমরা কতকিছুই না করতে চাই

রাত এখন মুক্তি পাবে কি?
বিছানার নিচে নড়ে উঠছে শর্ষের বিচি
আষাঢ় মাসের রাতে কান পেতে শুনতে পাচ্ছি
চিড়িয়াখানার অচেনা পশুদের দীর্ঘশ্বাস

তুমুল বৃষ্টির রাস্তায় আছড়ে পড়ার শব্দে
শুনতে পাচ্ছি তোমার ফোঁপানোর শব্দ
তুমি গুচ্ছগুচ্ছ ভোরের শিশুদের জন্ম দেবে বলে কি
এমন রাতগুলিতে একা থাকা বেছে নিলে
যখন ক্রুদ্ধউরু ভালবাসতে চায়
তখন এলোমেলো হচ্ছে বকুলের ঝরে যাওয়া

মানিকদি’র আকাশে আমরা খেলনা হেলিকপ্টার ওড়াতে গিয়ে
হাতে পেলাম ব্যাটারী শেষ হবার লাল সংকেত
ভিজে যাবার পরেও দরজাটা খোলা রইল
তোমার গলার সাথে আমার গলার মিল হবার জন্য


হাতে গোনা কয়েকটা দিন
................
হাতে গোনা কয়েকটা দিন। গ্রীষ্মের পর বর্ষাকাল।
তীব্র সূর্যের দিনগুলি ভিজা দিনে প্রবেশ করছে।

আমি বসে বসে কাঁদি, কিন্তু কোন কান্নার চিহ্ণই তো আমার নাই।
হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র দিন বাস্তব
আর সব আমার কল্পনার রংয়ে ছন্দে বোনা
তোমার একটা কানের ছবি তোলা
তোমার একটা কানফুল মেঝেতে কুড়িয়ে পাওয়া
তোমার একটা অল্প লালচে চুল আমার ঘরে

হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র বাস্তব দিন নিয়ে
আমি জুয়া খেলায় নেমেছি কল্পনার সাথে
তুমুল বৃষ্টিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি আর
নিজেকে তুলে দিচ্ছি হুড তোলা রিকসার
একটুকরা পলিথিনের পর্দার পিছনে
কি গাদাগাদি করেই না বসেছি আর
কি চেষ্টা করেই না স্পর্শ বাঁচানোর কষ্ট করে যাচ্ছি
যাতে তুমি কোন ভুল সংকেত আমার কাছ থেকে না পেয়ে যাও

তাহলে বাস্তব কি ঐ তোমার স্পর্শ বাঁচানো?
আর কল্পনা হলো শক্ত করে তোমার বা হাতের পাঁচটা আঙ্গুলের মধ্যে
আমার ডান হাতের পাঁচটা আঙ্গুল খুব জোর দিয়ে চেপে ধরা?


ঢাকা শহরে
........
ঢাকা শহরে কোন মাঠ নাই।
ঢাকার ছাদগুলি হচ্ছে মাঠ।
সরু সরু রাস্তাগুলি অন্ধকারে ডুবে আছে।
তুমি তোমাদের ছাদের ছোট মাঠটাতে দাঁড়িয়ে
তাকিয়ে আছো শ্রাবন মাসের পূর্নিমার চন্দ্রোদয় দেখবে বলে।

মনে পড়ছে কি আষাঢ়ের প্রথম দিনের কথা?
আকাশ ভর্তি কালো উড়ে যাওয়া মেঘগুলিতে
শহরের আলো পড়ে সাদা দেখাচ্ছিল
মাঝে মাঝে ফাঁকা, সেখানে অনেক দূরের মহাশুন্য পর্যন্ত শুন্য আকাশ

তুমি কথা বলতে বলতে
মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে
যেন আমি তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি
তুমি প্রায় আমার সমান উচ্চতায় থেকে
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে
কিছুটা ঘোরলাগা কন্ঠে বললে, আমি ভালবাসি তোমাকে...
আমি তোমাকে চাই আমি তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে চাই
তারপর বললে তারপর বললে বললে তারপর
বিরবির করে শুন্য মুহূর্তের দিকে বললে
যা বোঝা গেল আবার বোঝা গেল না

শ্রাবন মাসের আকাশ ঢেকে ফেলা কাঁচা পাকা মেঘ
কেমন গম্ভীর, বয়স্ক আর দুষ্টুমির ভিতর থেকে
পূর্নিমার চাঁদকে তোমার চোখ থেকে লুকিয়ে রেখেছে

কিন্তু আমি জানি, তোমার দুচোখ ভিজে আসছে কান্নায়
সেদিন যে কথাটা বলেও শেষ করতে পারনি
আমরা মুখোমুখি আসতে পারিনি বলে
সেটাই প্রতিনিয়ত তুমি বলে যাচ্ছ

চাঁদ উঠুক না উঠুক
বৃষ্টি হোক না হোক
চোখ ভিজে ওঠে শ্রাবন মাসে।


ঢাকায় কোন
........
ঢাকায় কোন শ্রাবন মাস নাই।
বছর বছর শুধু বন্যার কষ্ট
ঢাকার কোন হৃদয় নাই।

মিরপুরে হৃদয় নাই। কচুক্ষেতে হৃদয় নাই। বাড্ডায় হৃদয় নাই।
হৃদয় নাই শ্যাওড়াপাড়ায়, যাত্রাবাড়ি, উত্তরখানে।
ক্যান্টনমেন্টের হৃদয়হীনতা সারা শহরে।

যখন কেউ মধ্যরাতে আর্তনাদ করে ওঠে
সেই আর্তনাদ ঘরের এককোনায় আটকে থাকে,
যখন কেউ গুমরাতে থাকে বিরহে
তখন তা এক চিলতে বারান্দার মধ্যে বসে থেকে।

একরুম থেকে আরেক রুমে পায়চারী
রান্নাঘর থেকে পানির জগ ভরে নেবার চেষ্টা
টেবিলে কাগজ পড়ে থাকে, কলমের অভাবে তোমাকে লেখা হয় না।

শ্রাবন মাসে তুমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে
উঠানের কাদায় পা ডুবিয়ে গভীর রাতে ফোন করে যাচ্ছো
আর আমি নেটওয়ার্ক বিভ্রাটে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!

সত্য সত্যই কি আমার ষাটভাগ বাস্তবতার মাঝে
তুমি চল্লিশভাগ কল্পনা কোথাও আছো?

গতসপ্তাহে আমিওতো গিয়েছিলাম পাহাড়ে
তুমি ছিলে রাজধানীর বিছানায়
আমি যত আবেগে, সেই মধ্যরাতে
সাপ আলিঙ্গন আর ব্যাঙের পাহারায়
ঘরের বাইরে, নিরালায়
তোমাকে চেয়েছিলাম ফোনের ইশারায়
প্রায় সারারাত নিষিদ্ধ আগ্রহে
তোমাকে টেনে বের করেছিলাম
নির্ঘুম নীল রাতের পোষাকে

আজ একি হলো
তুমি গেলে নীল যমুনার পাড়ে
যেখানে গ্রাম টাঙ্গাইলের শ্রাবনে
নৌকায় করে তোমাকে টানার কথা
সেখানে নাকি শুকনা খটখটে
নদীর বুকে ঘনঘটা নাই ঢেউয়ের

তুমি ফিরে এলে ঝগড়ার ছলনায়
পাশের ঘরে শাশুড়ির নাক ডাকা
জেগে থেকে পার করে দিলে নিশি ভোর
অথচ দেশে ফিরে এলো খুব ভোট
নির্বাচিত, পুরানো যত চোর

কিছুই বদলায় না, অন্তত বদমাস,
বদলায় শুধু আমাদের যা হবার কথা
আমরা যখন রাত জেগে থাকি শ্রাবনেপ্রেমের দেবতা রাস্তায় নামে মাগনে!