মাসুদা ভাট্টি
(ঘোষণাঃ বর্তমান নিবন্ধটি লেখকের নিজস্ব বক্তব্য এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বই-পুস্তক থেকে গৃহীত তথ্য থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত। তাই একটি বিবলিওগ্রাফির’র বাইরে নির্দিষ্ট কোনও পুস্তক কিংবা পৃষ্ঠার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কারও পুস্তক থেকে ধার করে নিজের সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠার তাত্ত্বিকতায় আমি বিশ্বাসীও নই। অতএব, লেখাটি আমার নিজস্ব মতামত এবং চিন্তাভাবনার ফসল হিসেবে ধরে নিয়ে পাঠ করলেই খুশি হবো)
কথা দিয়েছিলাম দ্বি-জাতিতত্ত্ব নিয়ে লিখবো, কিন্তু লিখতে বসে সিদ্ধান্ত বদলালাম, কারণ আসলে দ্বি-জাতিতত্ত্ব বলে কিছু নেই, মূল কথা হচ্ছে এক-জাতিতত্ত্ব। যেহেতু এর মূল নির্যাস হচ্ছে ধর্মবাদ তথা ইসলাম সেহেতু একটি ধর্মগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় প্রাধান্য পাইয়ে দেওয়ার যে তত্ত্ব বা বাদ তাকে দ্বি-জাতিতত্ত্ব বলার কোনও কারণ দেখি না। ভারত ভাগের প্রেক্ষিতে জিন্নাহ্ যদিও বা দ্বি-জাতিতত্ত্বের ধূয়া তুলেছিলেন কিন্তু তা বিভাজিত পাকিস্তানে এসে আর দ্বি থাকেনি, পরিণত হয়েছিল একত্বে। আমাদের ভুললে চলবে না যে, ইসলাম একত্ববাদী ধর্ম এবং এটাই যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এর বাইরে যে আর কিছু আছে বা থাকতে পারে ইসলাম সেটা স্বীকারও করে না। যেখানে পালিত ধর্মটি অন্য কোনও ধর্ম বা বিশ্বাসকে স্বীকৃতিই দেয় না সেখানে ধর্মবিশ্বাসীরা কি করে অন্য কোনও ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রে স্থান করে দেবে? এটা তো খুব সহজ এবং সাধারণ একটি হিসেব।
ভারত-ভাগ ও তার এপাশে-ওপাশে দশ বছর কালকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই একটি পক্ষ ইংরেজ শাসক শ্রেণীর হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করার লক্ষ্য নিয়ে ছুটছে, আর অপর পক্ষটি কখনও ইংরেজের দালালি করে, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতার অংশীদারীত্বেই খুশী থেকেছে। এই দ্বিতীয় পক্ষটিই যখন বুঝতে পেরেছে যে, স্বাধীনতা আসন্ন তখন ভেবেছে যে কোনও মূল্যেই হোক না কেন, তাদের অংশটি সম্পূর্ণটাই তাদের একার হতে হবে, নইলে ধর্মবিশ্বাসের মতোই তাদের একত্ববাদে হানি ঘটবে। নইলে যে পরিস্থিতি এবং সময়ে জিন্নাহ্ সাহেব দ্বি-জাতিতত্ত্বটি প্রকাশ্যে আনেন তখন কারুর পক্ষেই স্বাধীনতা-ভিন্ন অন্য কোনও কিছু চিন্তায় আনা সম্ভব নয়। অথচ দেখুন, এই পক্ষটি কিন্তু ভারত-ভ’মে বহিরাগত, অন্ততঃ তাদের ধর্মতো বটেই।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, ভারতবর্ষে ইসলাম এসেছে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্তরে, কিন্তু কোনওটাই যে খুব একটা শান্তির প্রক্রিয়ায় ঘটেছে তা বলা যাবে না। বরং বার বার সোমনাথের মন্দির লুটের ঘটনা থেকে শুরু করে দিল্লি বিজয়, বঙ্গ বিজয় ইত্যাদি ঘটনাবলী রক্তপাতহীন ভাবাটা এক ধরনের বোকামিই। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী কথিত সতের জন সৈন্য নিয়ে লক্ষণ সেনের প্রাসাদে ঢুকে বঙ্গ-বিজয় করেন Ñ এটা মিথ, আসল সত্য খুঁজে পাবেন আদিনা মসজিদ কিংবা সোনা মসজিদের মতো পুরোনো মসজিদগুলির দেয়ালে যেখানে দেখা যায় হিন্দু মন্দিরের পাথর, দেবতাদের পাথুরে-পট। শাহ্জালাল সিলেটের গোবিন্দ-রাজাকে পরাজিত করেন জালালী-কবুতর পাঠিয়ে এই সত্য যারা বিশ্বাস করবেন তাদেরকে কোনও সত্য দিয়েই বোঝানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই যে বহিরাগত মুসলিম শাসক, তারা এদেশে মিশে গিয়েছেন কিংবা এদেশেই স্থিতু হয়েছেন সে সত্যও অনেকটাই পরের দিকের ঐতিহাসিকদের মনগড়া তথ্য। কারণ বঙ্গ থেকে দিল্লি হয়ে আফগানিস্তানের দিকে যে পথ চলে গেছে, যা বিখ্যাত উত্তরা-পথ নামে ইতিহাস-খ্যাত, মুসলিম শাসকগণ সর্বাগ্রে সেই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন যাতে ওই পথে ভারতবর্ষ থেকে লুটের মাল সরানো সহজ হয়। হ্যাঁ, তারা যৌধবাঈ কিংবা উদয়পুরের রাজকন্যাকে বিয়ে করেছেন সত্য, কিংবা বাঙালি কন্যার কমনীয়তায় ভুলে এখানে একটি ঘর বেঁধেছেন সত্য কিন্তু সে ঘর যে তাদের মূল-ঘর নয় তার প্রমাণ হচ্ছে তাদের ভারত-বংশকে শিক্ষিত করতে কোনও মুসলিম শাসকই ভারতবর্ষে একটি বিদ্যাপীঠও স্থাপন করেননি। অবশ্য ইসলামে বিদ্যাশিক্ষাকে একটু দূরে সরিয়েই রাখা হয়েছিল কারণ তাতে মানুষের জ্ঞানচু খুলে যেতে পারে, তারা সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারে Ñ হতে পারে একারণেও তারা কোনও বিদ্যাপীঠ স্থাপনের দিকে হাত বাড়াননি।
যাহোক, দীর্ঘ মুসলিম শাসনের পরাজয় ঘটিয়ে ইংরেজ শাসনভার নেওয়ার আগে যে বিদ্রোহ ভারতবর্ষে দেখা দেয় তাতে হিন্দু-মুসলিম উভয়েই কিন্তু অংশ নিয়েছে সমানভাবে। আমরা স্মরণ করতে পারি শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর দিল্লিতে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তাতে হিন্দু সেনাপতিরাই নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, ইংরেজ ভারতবর্ষের শাসনভার তুলে নিয়েছে নিজ হাতে, এবং হিন্দুরা ভেবেছে অন্ততঃ মুসলিম শাসনের চেয়ে খ্রীস্ট শাসন ভালো হবে। তবে এই চিন্তায় বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে বর্ণহিন্দুর আধীক্যই ছিল, এবং মুসলিম আতরাফ-শ্রেণীও কিন্তু খানবাহাদুর খেতাব আর ক্ষমতার খুঁদকুড়োর জন্য কম লালায়িত থাকেনি। কিন্তু কালান্তকে ইংরেজ শাসনকে বুড়ো অঙ্গুলি দেখানোর ধৃষ্ঠতা যদিও শুরু করেছে হিন্দুরাই, তাও বর্ণহিন্দুরাই। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের তালিকা থেকেই তা সহজে বোঝা যায়। এবং আরও মজার ব্যাপার হলো, এই বিপ্লবীদের একটি বিশাল অংশ হচ্ছে পূর্ব বাংলার অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের। বীর প্রসবিনী বাংলা - এমনি এমনিই নাম হয়নি। কেউ যদি ব্রিটিশ সরকারের বেঙ্গল গেজেট-এ চোখ রাখেন তাহলে দেখতে পাবেন, বাংলার এমন কোনও এলাকা ছিল না যেখান থেকে ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা রিপোর্ট আসেনি কোনও একজন বিপ্লবীর নামে, এবং এই নামগুলির পদবীও বিস্ময়কর।
(ক্রমশঃ)
মাসুদা ভাট্টি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাসুদা ভাট্টি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
রাষ্ট্র ও সমাজের যে ভাঙন ব্যক্তি-মানসে ধস নামায়
মাসুদা ভাট্টি
প্রতিটি মানুষই তার জীবদ্দশায় বার বার ভাবতে বাধ্য হয় যে, সে একটি ভয়ংকর দুঃসময় অতিক্রম করছে। এ এক ভয়াবহ অনুভব, আমি নিশ্চিত সবারই এই অভিজ্ঞতা রয়েছে। কি ব্যক্তি জীবনে, কি সামাজিক, কি রাষ্ট্রীক, প্রতিটি পর্যায়েই এমন ভাবনা মানুষকে আচ্ছন্ন করে যে, এই ভয়ংকর ও দুঃসহ অবস্থা থেকে বুঝি পরিত্রাণের আর উপায় নেই। এই-ই বুঝি শেষ, এই-ই বুঝি সবকিছু ভেঙে পড়লো হুড়মুড় করে। মানুষের এই যে বোধ, এই যে চিন্তার ঝড়, এ শ্বাশ্বত এবং যুগে যুগে এই চেতনার টানাপড়েনই আজকের পৃথিবীকে তথাকথিত আধুনিক, অথবা বলা ভালো বাসযোগ্য করে রেখেছে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সৃষ্ট এই সমাজের, রাষ্ট্রের নিয়মিত ভাঙন-গঠনও আজকের আধুনিক মানুষের জীবন বাস্তবতায় অত্যন্ত দৃঢ় বাঁধনে আবদ্ধ।
যে কথা বলার জন্য এতো ঢাকঢোল পেটানো, তাহলো বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার কি মনে হয় না যে, ওহ্ ঈশ্বর, এ কী সময় পার করছি আমরা? রাষ্ট্রের প্রতিটি খুঁটি একের পর এক গুড়িয়ে পড়ছে। ভেঙে পড়ছে কাঠামো, শেকড়-বাকড় শুকিয়ে রাষ্ট্র একটি ফাঁপা গোলকের মতো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি এবং মানুষের সম্পর্ক যদি দেয়া-নেয়া, ভালোবাসা বিনিময়ের হয়ে থাকে তাহলে একই কথা প্রযোজ্য রাষ্ট্র-সমাজ এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রেও। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এখন এক বন্ধ্যা জমিন, আমি কোনও বৃহন্নলাকে খাঁটো না করেই বলছি, তার বন্ধ্যাত্বকেও হার মানিয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঊষরতা। যদিও রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র, এবং এর পরিচালকগণ মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই মানুষ খুব দ্রুত বদলে গিয়ে এমন এক প্রাণীতে পরিণত হয় যে, পৃথিবীতে এমন কোনও প্রজাতির প্রাণী খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। প্রকৃতির যে কোনও প্রাণীর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালক-শ্রেণীর তুলনা টানা হলে সাধারণ প্রাণীর শুধু অবমাননাই হয় না, রীতিমতো তাদেরকে অপমান করা হবে বলে সেই চেষ্টা থেকে বিরত থাকলাম।
কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি বর্তমান পরিস্থিতির, যদিও এসব সবই চর্বিত চর্বন, সবারই জানা এবং বোঝা। রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে, গণতান্ত্রিক, নাকি সেনাতান্ত্রিক, নাকি একটা জগা-খিচুড়ি কিছু একটা তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। আমার ধারণা সকলেই তাকিয়ে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে, সেই নির্বাচনের ফলাফলের পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র চরিত্রেরও ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তবে সেটাও অনুমান মাত্র। আমাদের উপদেষ্টারা প্রতিদিন টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কাশেম বিন আবু বক্করের দুর্বল সাহিত্যের ভাষায় কথা বলেন। আমার সাংবাদিক বন্ধুরা তাই-ই ক্যামেরায় ধারণ করে প্রতি ঘন্টার সংবাদে সাউন্ড বাইট হিসেবে প্রচার করেন। আমার বিশ্বাস, এটা উপদেষ্টারাও জানেন, সাংবাদিক বন্ধুরাও জানেন, আপনি-আমি সবাই জানি যে, এই যে দুর্বল সাহিত্যের ভাষায় বচনমালা, তার আসলে কোনও অর্থ নেই। শুধু সময় ক্ষেপণ এবং সময়টাকে তাড়িয়ে নেওয়ার বিনোদন ছাড়া। একটি রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতা কতোটা নিম্নস্তরের হলে এরকম প্রতিদিন এসব বচন গ্রহণ-প্রচার-পাচন প্রক্রিয়া ঘটে এবং জনগণকে তা নির্বিকার ভাবে হজম করতে বাধ্য হতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু এই ফাঁকা, কার্যক্ষমতাহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই কিন্তু চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে উগ্র মৌলবাদ। ধর্মভিত্তিক শাসন-ব্যবস্থা চালুর নামে মধ্যযুগীয় ভোগতন্ত্র কায়েম করার প্রক্রিয়ার কাছে রাষ্ট্রের দৌর্বল্য পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আবারও একটি নিম্নস্তরের উদাহরণ দিতে হচ্ছে বাধ্য হয়েই।শিক্ষা ও আধুনিকতার আলো বঞ্চিত কোনও
নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে) পুরুষটি নানা শারীরবৃত্তিয় অত্যাচারের ফলে যখন তার পৌরুষ-ক্ষমতা হারায় তখন নারীটি হয়ে ওঠে যথেচ্ছ, পুরুষটিরে এই অক্ষমতার সুযোগে ব্যক্তি নারীর এই দ্বিধাহীন হয়ে ওঠার প্রবণতা তবু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের এই বীর্যহীনতা কতোটা গ্রহণযোগ্য? খুব কৌশলে সংখ্যাধিক্য শ্রেনী গড়ে তোলা হয়েছে যাতে গণতন্ত্রের ধূয়া তুলেও এদের হাত থেকে নিস্তার না মেলে। আমি মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আর প্রচলিত বাংলা মাধ্যমের শিক্ষিতদের সংখ্যাসাম্যের কথা বলছি। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাদের নিয়ন্ত্রণ কতোটা শক্তিশালী হবে এই দ্বন্দ্বই কি বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র-সংকটের মূল বিষয় নয়? অবশ্যই এর সঙ্গে আরও কিছু বিভাজন, কিছু অপ্রাপ্তি এবং সেই সঙ্গে তুমুল স্বার্থের দ্বন্দ্ব (জিয়া-এরশাদ সৃষ্ট নতুনতর কোটিপতি শ্রেনীর)ও বিরাট একটা গহ্বরের জন্ম দিয়েছে যা দিয়ে অনায়াশেই মূল শত্রুরা টেরাকোটা আর্মির মতো ঢুকে পড়েছে রাষ্ট্রের শিরায় শিরায়। আর এতে ইন্ধন জুগিয়েছে অবশ্যই আমাদের জাতীয় সুবিধাবাদী চরিত্রের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত (পড়ুন সুশীল সমাজ) শ্রেনী। মুড়ো না লেজ – এই দড় কষাকষির পরিণাম আপনি আমি সবাই প্রত্যক্ষ করছি।
আরও একটি বড় উদাহরণ দেওয়া যেতো বিচার তথা আইনী ব্যবস্থার কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। আপনারা সবাই এই তথাকথিত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পশ্চাৎদেশ দেখতে পাচ্ছেন নিজামী-মুজাহিদের নূরানী চেহারায়। এর বেশি আর কি বলবো?
আসলে রাষ্ট্রের এই পরাজয়, অবক্ষয়, নপুংশকতা, নোংরামি এবং আবালহোসেন ধরনের কার্যকলাপ যে ব্যক্তি মানসে কতো বড় প্রভাব ফেলতে পারে তার উদাহরণ দেখা যাবে সমাজে ব্যক্তি মানুষের ননা অসংগতিপূর্ণ কার্যকলাপ দেখে। আমি বলছি না যে, কার্যকর এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এসব ঘটে না বা ঘটছে না। কিন্তু দিনের আলোয় রাজপথে আইনজীবীর কাটা-মাথা নিয়ে দৌঁড়ে বেড়ানো কিংবা শোবার ঘরে রাজনৈতিক নেতাকে গিয়ে কুপিয়ে কিংবা সরাসরি খুলি উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাবলী কি রাষ্ট্রের অকার্যকারিতার ফলস্বরূপ ব্যক্তির অক্ষম ফুঁসে ওঠা নয়? রাষ্ট্র যেখানে অক্ষম ব্যক্তি সেখানে অতিরিক্ত সক্রিয় হতে বাধ্য। মজার কথা হচ্ছে, ধর্ম কখনওই ব্যক্তির এই অতিরিক্ত সক্রিয়তা দমাতে পারে না, পারেনি, সৌদি কিংবা আরও দু’একটি ধর্মরাষ্ট্রের দিকে তাকালেই আমরা সেই সত্যটিও জানতে পারি। কিন্তু তাতে কি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তো এখন এক ধ্বজভঙ্গ অবকাঠামো মাত্র।
যদিও আমি নৈরাশ্যবাদী নই, তারপরও আমার সময়ের এই অস্থিরতাকে আমি এভাবেই দেখছি। হয়তো তাই লেখাটাও সেরকমই এক অস্থির লেখা হলো। কিছু করার নেই।
প্রতিটি মানুষই তার জীবদ্দশায় বার বার ভাবতে বাধ্য হয় যে, সে একটি ভয়ংকর দুঃসময় অতিক্রম করছে। এ এক ভয়াবহ অনুভব, আমি নিশ্চিত সবারই এই অভিজ্ঞতা রয়েছে। কি ব্যক্তি জীবনে, কি সামাজিক, কি রাষ্ট্রীক, প্রতিটি পর্যায়েই এমন ভাবনা মানুষকে আচ্ছন্ন করে যে, এই ভয়ংকর ও দুঃসহ অবস্থা থেকে বুঝি পরিত্রাণের আর উপায় নেই। এই-ই বুঝি শেষ, এই-ই বুঝি সবকিছু ভেঙে পড়লো হুড়মুড় করে। মানুষের এই যে বোধ, এই যে চিন্তার ঝড়, এ শ্বাশ্বত এবং যুগে যুগে এই চেতনার টানাপড়েনই আজকের পৃথিবীকে তথাকথিত আধুনিক, অথবা বলা ভালো বাসযোগ্য করে রেখেছে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সৃষ্ট এই সমাজের, রাষ্ট্রের নিয়মিত ভাঙন-গঠনও আজকের আধুনিক মানুষের জীবন বাস্তবতায় অত্যন্ত দৃঢ় বাঁধনে আবদ্ধ।
যে কথা বলার জন্য এতো ঢাকঢোল পেটানো, তাহলো বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার কি মনে হয় না যে, ওহ্ ঈশ্বর, এ কী সময় পার করছি আমরা? রাষ্ট্রের প্রতিটি খুঁটি একের পর এক গুড়িয়ে পড়ছে। ভেঙে পড়ছে কাঠামো, শেকড়-বাকড় শুকিয়ে রাষ্ট্র একটি ফাঁপা গোলকের মতো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি এবং মানুষের সম্পর্ক যদি দেয়া-নেয়া, ভালোবাসা বিনিময়ের হয়ে থাকে তাহলে একই কথা প্রযোজ্য রাষ্ট্র-সমাজ এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রেও। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এখন এক বন্ধ্যা জমিন, আমি কোনও বৃহন্নলাকে খাঁটো না করেই বলছি, তার বন্ধ্যাত্বকেও হার মানিয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঊষরতা। যদিও রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র, এবং এর পরিচালকগণ মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই মানুষ খুব দ্রুত বদলে গিয়ে এমন এক প্রাণীতে পরিণত হয় যে, পৃথিবীতে এমন কোনও প্রজাতির প্রাণী খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। প্রকৃতির যে কোনও প্রাণীর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালক-শ্রেণীর তুলনা টানা হলে সাধারণ প্রাণীর শুধু অবমাননাই হয় না, রীতিমতো তাদেরকে অপমান করা হবে বলে সেই চেষ্টা থেকে বিরত থাকলাম।
কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি বর্তমান পরিস্থিতির, যদিও এসব সবই চর্বিত চর্বন, সবারই জানা এবং বোঝা। রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে, গণতান্ত্রিক, নাকি সেনাতান্ত্রিক, নাকি একটা জগা-খিচুড়ি কিছু একটা তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। আমার ধারণা সকলেই তাকিয়ে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে, সেই নির্বাচনের ফলাফলের পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র চরিত্রেরও ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তবে সেটাও অনুমান মাত্র। আমাদের উপদেষ্টারা প্রতিদিন টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কাশেম বিন আবু বক্করের দুর্বল সাহিত্যের ভাষায় কথা বলেন। আমার সাংবাদিক বন্ধুরা তাই-ই ক্যামেরায় ধারণ করে প্রতি ঘন্টার সংবাদে সাউন্ড বাইট হিসেবে প্রচার করেন। আমার বিশ্বাস, এটা উপদেষ্টারাও জানেন, সাংবাদিক বন্ধুরাও জানেন, আপনি-আমি সবাই জানি যে, এই যে দুর্বল সাহিত্যের ভাষায় বচনমালা, তার আসলে কোনও অর্থ নেই। শুধু সময় ক্ষেপণ এবং সময়টাকে তাড়িয়ে নেওয়ার বিনোদন ছাড়া। একটি রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতা কতোটা নিম্নস্তরের হলে এরকম প্রতিদিন এসব বচন গ্রহণ-প্রচার-পাচন প্রক্রিয়া ঘটে এবং জনগণকে তা নির্বিকার ভাবে হজম করতে বাধ্য হতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু এই ফাঁকা, কার্যক্ষমতাহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই কিন্তু চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে উগ্র মৌলবাদ। ধর্মভিত্তিক শাসন-ব্যবস্থা চালুর নামে মধ্যযুগীয় ভোগতন্ত্র কায়েম করার প্রক্রিয়ার কাছে রাষ্ট্রের দৌর্বল্য পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আবারও একটি নিম্নস্তরের উদাহরণ দিতে হচ্ছে বাধ্য হয়েই।শিক্ষা ও আধুনিকতার আলো বঞ্চিত কোনও
নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে) পুরুষটি নানা শারীরবৃত্তিয় অত্যাচারের ফলে যখন তার পৌরুষ-ক্ষমতা হারায় তখন নারীটি হয়ে ওঠে যথেচ্ছ, পুরুষটিরে এই অক্ষমতার সুযোগে ব্যক্তি নারীর এই দ্বিধাহীন হয়ে ওঠার প্রবণতা তবু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের এই বীর্যহীনতা কতোটা গ্রহণযোগ্য? খুব কৌশলে সংখ্যাধিক্য শ্রেনী গড়ে তোলা হয়েছে যাতে গণতন্ত্রের ধূয়া তুলেও এদের হাত থেকে নিস্তার না মেলে। আমি মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আর প্রচলিত বাংলা মাধ্যমের শিক্ষিতদের সংখ্যাসাম্যের কথা বলছি। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাদের নিয়ন্ত্রণ কতোটা শক্তিশালী হবে এই দ্বন্দ্বই কি বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র-সংকটের মূল বিষয় নয়? অবশ্যই এর সঙ্গে আরও কিছু বিভাজন, কিছু অপ্রাপ্তি এবং সেই সঙ্গে তুমুল স্বার্থের দ্বন্দ্ব (জিয়া-এরশাদ সৃষ্ট নতুনতর কোটিপতি শ্রেনীর)ও বিরাট একটা গহ্বরের জন্ম দিয়েছে যা দিয়ে অনায়াশেই মূল শত্রুরা টেরাকোটা আর্মির মতো ঢুকে পড়েছে রাষ্ট্রের শিরায় শিরায়। আর এতে ইন্ধন জুগিয়েছে অবশ্যই আমাদের জাতীয় সুবিধাবাদী চরিত্রের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত (পড়ুন সুশীল সমাজ) শ্রেনী। মুড়ো না লেজ – এই দড় কষাকষির পরিণাম আপনি আমি সবাই প্রত্যক্ষ করছি।
আরও একটি বড় উদাহরণ দেওয়া যেতো বিচার তথা আইনী ব্যবস্থার কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। আপনারা সবাই এই তথাকথিত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পশ্চাৎদেশ দেখতে পাচ্ছেন নিজামী-মুজাহিদের নূরানী চেহারায়। এর বেশি আর কি বলবো?
আসলে রাষ্ট্রের এই পরাজয়, অবক্ষয়, নপুংশকতা, নোংরামি এবং আবালহোসেন ধরনের কার্যকলাপ যে ব্যক্তি মানসে কতো বড় প্রভাব ফেলতে পারে তার উদাহরণ দেখা যাবে সমাজে ব্যক্তি মানুষের ননা অসংগতিপূর্ণ কার্যকলাপ দেখে। আমি বলছি না যে, কার্যকর এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এসব ঘটে না বা ঘটছে না। কিন্তু দিনের আলোয় রাজপথে আইনজীবীর কাটা-মাথা নিয়ে দৌঁড়ে বেড়ানো কিংবা শোবার ঘরে রাজনৈতিক নেতাকে গিয়ে কুপিয়ে কিংবা সরাসরি খুলি উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাবলী কি রাষ্ট্রের অকার্যকারিতার ফলস্বরূপ ব্যক্তির অক্ষম ফুঁসে ওঠা নয়? রাষ্ট্র যেখানে অক্ষম ব্যক্তি সেখানে অতিরিক্ত সক্রিয় হতে বাধ্য। মজার কথা হচ্ছে, ধর্ম কখনওই ব্যক্তির এই অতিরিক্ত সক্রিয়তা দমাতে পারে না, পারেনি, সৌদি কিংবা আরও দু’একটি ধর্মরাষ্ট্রের দিকে তাকালেই আমরা সেই সত্যটিও জানতে পারি। কিন্তু তাতে কি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তো এখন এক ধ্বজভঙ্গ অবকাঠামো মাত্র।
যদিও আমি নৈরাশ্যবাদী নই, তারপরও আমার সময়ের এই অস্থিরতাকে আমি এভাবেই দেখছি। হয়তো তাই লেখাটাও সেরকমই এক অস্থির লেখা হলো। কিছু করার নেই।
লেবেলসমূহ:
আলোচনা,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির আলাচনা
রাষ্ট্রের খামতি ও নতঃশির এই বেঁচে থাকা
মাসুদা ভাট্টি
১৯৭১ আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছিল, তবে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি ঘুমন্ত বাঙালি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতের আঘাত থেকে পেয়েছিল তাহলো, ধর্ম আসলে কোনও বড় আচ্ছাদন নয়, কোনও দখলদারী মনোভাবকেই ধর্মের ঐক্য দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না, তা কোনও না কোনও সময় কখনও না কখনও প্রবল ও প্রচণ্ড হয়ে নেমে আসে। নইলে ১৯৪৭-এ যে বাঙালি মুসলমানকে ধর্ম দিয়ে জিন্না সম্মোহিত করে গোটা একটি দেশ হাসিল করে নিলেন, মাত্র ২৫ বছরের মাথায় কি করে সেই সম্মোহন একেবারে মৃত্যুবাণ হয়ে বাঙালির ওপর নেমে এলো তা সত্যিই গবেষণার বিষয় হলেও সাদা কথায় এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, যখন স্বার্থে আঘাত পড়ে এবং নিজের ভাগে কম পড়ে তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বার্থহীনতা দেখানোর উদারতা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশেও তার ব্যত্যয় হয়নি।
ওপরের এই কথাগুলি যে আমার মনে আসেনি তা নয়, কিন্তু তা আমার ভেতরে আরও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন এমন একজন, যার কথা আজকের এই দিনে স্মরণ না করলেই নয়। তবে দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, আমি তার নামোল্লেখ করতে পারবো না। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল ইউরোপের একটি দেশে।এই লেখাতে আমি তাকে আনা হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। যদিও একসময় তার একটি চমৎকার বাঙালি নাম ছিল। কিন্তু একাত্তরের পর তিনি সেই নামটি ছেড়ে এসেছেন, চোখ ছল ছল করে বললেন তিনি।
২৬শে মার্চের কথা বলুন, জানতে চাইলাম। বললেন, সে রাতের কথা কী বলবো আর? রাত ভোর হবার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু সেই কালরাত কি আর ভোর হয়? নাকি হতে চায়? সন্ধ্যের কতোক্ষণ পর বলতে পারবো না, হঠাৎ করেই হলের ভেতর মিলিটারি, চারদিকে গুলির শব্দ মেয়েরা চিৎকার করছে। কেউ কেউ দেয়াল টপকে বেরুনোর চেষ্টা করছে, কেউ বা দরোজা বন্ধ করে রেখে নিজেদের বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু ওভাবে যে বাঁচা যায় না সে বোধটি আমাদের তখন কারোরই হয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা তো তখন সবেমাত্র বেরুতে শুরু করেছে, এতো বোধগম্মি কি তখন হয়েছে?
কথা শুরু হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাত নিয়ে, ২৬ মার্চের সকালে চলে গেলেন আনা।ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে এলো ওরা। আমরা কয়েকজন, দু’একজন মুখ চেনা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না। কোথায় এলাম বুঝিনি, ঢাকার শহরতো ভালো করে চিনি না। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে করে কোরআন শরীফ নিয়ে এসেছে।থর থর করে কাঁপছে। কাঁদছে অঝোরে, শব্দহীন। আসলে আমরা সবাই কাঁদছিলাম, অথচ কেউই শব্দ করে নয়, আমরা মনে হয় শব্দ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
তারপর যেখানে এলাম, সেখানে লাইন ধরে অনেকগুলো রুম।আমাদের একই রুমে রাখা হলো। তখন দুপুর হবে মনে হয়, তখন ওরা এলো, একের পর এক। কিছু বলার সুযোগ দেয়নি, একের পর এক, আমরা মাত্র ছয় কি সাতজন। আর ওরা সংখ্যায় কতো ছিল এখন আর মনে করতে পারি না, তবে চাইও না। আপনি ছাব্বিশে মার্চ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, এই যে, এইতো আমার কাছে ছাব্বিশে মার্চ ১৯৭১। তারপর আর দিনক্ষণ, সময়ের ঠিক ছিল না আমাদের কারোই। আমরা ওই রুমে ছিলাম, মড়ার মতো পড়ে থাকতাম। ওরা আসতো যেতো, শুধু মাঝে মাঝে খেতে পেতাম, পরনে কাপড় ছিল না। কি শোনাচ্ছে না গল্পের মতো? কেউ আপনারা বিশ্বাস করবেন বললে, এসব কথা? মনে হয় না। যাহোক, আর বলবো না। সরি, দয়াকরে আমায় আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।
আনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। জানতে চাইনি, কবে ছাড়া পেয়েছিলেন? কি করে এলেন এই দেশে? এইসব সাতপাঁচ, কী হবে জানতে চেয়ে? আমরা কফি খেলাম দীর্ঘ নীরবতা নিয়ে। তারপর আনা আমার দিকে তাকালেন, বললেন, “জানেন, আমরা প্রতিদিন কোরআন পড়তাম।ওরা তাও মানতো না। ছুঁড়ে ফেলে দিতো। পরে শুনেছি যে, ওরা নাকি মসজিদে ঢুকেও মানুষ হত্যা করেছে। জানেন, আমার আর কোনও আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নেই।এরপর নিজেকে আমি ধর্ম থেকে সরিয়ে নিয়েছি”।
কি বলবো আনাকে? ভাবছিলাম। এসব কথার কোনও উত্তর হয় না। মনে মনে ভেবেছি, শুধু কি বাংলাদেশে? ধর্মের নামে এই ইতরামি কোথায় হয়নি? ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। আজকের ইসলামি সাংগ্রি-লা ইরানে ধর্মের নামে যা হচ্ছে তাতে এই লন্ডনে এমন সব ইরানির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে যারা তাদের আনুষ্ঠানিক ধর্মের খোলশ ছেড়েছে কেবলমাত্র ধর্মের নামে ঘটে যাওয়া সব অনাচার দেখে দেখে, তার শিকার হতে হতে।১৯৭১ সালে যেসব পাকিস্তানী সৈন্য বাংলাদেশে লুটতরাজ, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তারা তো কেউই ধর্মে অবিশ্বাসী ছিল না, বরং তারা সকলেই ছিল ধর্মপ্রান মুসলিম। ১৯৭১ সালের নয়মাস ধরে চলা যুদ্ধে একটি মাস ছিল রমজান মাস। সেই মাসেও কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ধর্ষণের মতো গর্হিত কাজ করেছে, কি করেনি? তখন কিন্তু ধর্ম তাদের এই অনাচার থেকে রুখতে পারেনি। তার মানে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যা করছে তা আসলে ইসলামকে রক্ষায়। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে, ১৯৭১ আসলে আর কিছুই নয়, ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা আর নারী ধর্ষণের চূড়ান্ত উদাহরণ। একই কথা আমরা তুলতে পারি আফগানিস্তানের তালিবান শাসনামল সম্পর্কে। সেখানেও ধর্মের নামে একই ঘটনা ঘটেছে।
আনাও প্রশ্নটি আমায় করেছিলেন, ওরা কি ধর্ম রক্ষায় এতোবড় অধর্ম করেছিল? প্রশ্নটি আমায়ও ভাবিয়েছে ব্যাপক। আমার কাছে যা মনে হয়েছে তাহলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে রাজনীতির বর্মে মুড়ে তারপর যুদ্ধে নেমেছিল। যদিও এটা নতুন কিছু নয়, ১৯৪৭-এ যে দেশভাগ এবং দেশভাগকে কেন্দ্র করে যে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ তাও সেই একই ধর্মের বর্মে মোড়া পোড়া ক্ষত। সেই ক্ষত শুকোতে না শুকোতেই আবার এলো একাত্তর। এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো, যদিও ১৯৪৭-এ যা ছিল জনগণের একাংশের লোভ আর লালশার সঙ্গে ধর্মের মিশেল, ১৯৭১-এ তাই-ই হলো একটি সুশৃঙ্খল সেনা বাহিনীর রিরংসা এবং সেটাও ধর্ম দ্বারা সিদ্ধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সকল ইসলামপন্থী দলই কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে সমর্থনই শুধু নয়, বাংলাদেশের জামায়াত ইসলামী সরাসরি তাকে এই ধর্ষণ, খুন ও রাহাজানিতে সহযোগিতা করেছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা এতে অংশও নিয়েছে।পরবর্তীতে তারা আবার রাষ্ট্র ক্ষমতাও পেয়েছে, তাও আবার তথাকথিত এক মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা সৃষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের ঘাড়ে চেপে। সে অন্য কথা। আজকে আনার কথা বলি শুধু।
আনা কথা বলেন কম। নার্সের চাকরি করতেন, ছেড়ে দিয়েছেন।চোখে-মুখে এখন আর তার কোনও ক্লান্তি নেই, থাকবে কেন? তিনি তো সেই দুঃসহ স্মৃতি, যেখানে পরতে পরতে সাজানো নির্যাতন, বঞ্চণা, স্বজনদের কাছে ফিরতে চেয়েও ফিরতে না পারা, সামাজিকতার দোহাই দিয়ে পরিবারের কাছে অগ্রহণযোগ্য হওয়া, এবং তারপর রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জন্মভূমি থেকে বেরিয়ে আসা – সবই তার স্মৃতিতে এতোদিনে ফিকে হয়ে আসার কথা। আনা বললেন, “মনে রেখে কি হবে ওসব? মনে রাখতে চাই না।মনে রাখতাম, যদি ফিরে যেতে চাইতাম। কিন্তু কোথায় ফিরে যাবো? দেশটাতো আমি ভুলে গেছি, ভুলে গেছি, কারণ দেশ আমাকে মনে রাখেনি। এটা তো আমার একার দায়িত্ব নয়, দেশেরই দায়িত্ব বেশি”। বলতে চাইলাম, “কি বলছেন আনা, আপনাকে মনে রেখেছে দেশ, মনে রেখেছি আমরা। এই যে দেখুন, আমি আপনাকে খুঁজে বের করেছি”। পরে ভাবলাম, এসব কথা তার কাছে কোনও মানে রাখে না। আসলেই রাখে কি?
ছোট করে ছাঁটা চুল, সামান্য পাক ধরেছে। পরে আছেন কালো রঙের একটি স্কার্ট, ইউরোপের উজ্জ্বল গ্রীস্মের মতো শর্ষে রঙের একটি টি-শার্ট। পায়ে আঁটো-জুতো।বললেন, “এবার উঠি। দয়া করে আমার কথা কাউকে বলবেন না। আমি চাই না কেউ এসে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করুক, কী হয়েছিল? কী করে মুক্তি পেলেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না।কী হবে বলুন? উঠি কেমন?”
চমৎকার বাংলা বলেন আনা। উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে মিশে গেলেন ভিড়ের মধ্যে। আমি বসে রইলাম। তাকিয়ে থাকলাম পেছনে ফেলে যাওয়া আনার পথের দিকে।মনে মনে ভাবছিলাম, আনার মতো এরকম অনেক মেয়ে, একাত্তরে যাদেরকে পাকিস্তানীরা “গণিমতের মাল” হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে, স্বাধীন দেশে আমরা তাদেরকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেছি। আমি নিশ্চিত ১৯৭১ যদি তখন না হয়ে এই ২০০৯ সালেও হতো আর একই ঘটনার শিকার হতো বাঙালি নারী, আমাদের মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম না। আনার মতো বাংলার শেফালি, রতœা, চম্পা বা অন্য যে কাউকেই এরকম বিদেশে এসে নাম পরিবর্তন করতে হতো, নয়তো দেশেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো। যতোদূর জানি, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন পাকিস্তানী বাহিনীর ধর্ষণের শিকার এরকম হাজারো নারী স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মহত্যা করে তাদের ত্যাগের চরম মূল্যটি দিয়ে গিয়েছেন। একবার ধর্মের নামে তাকে হতে হয়েছে ধর্ষিতা, আবার পরিবার তাকে সমাজের কাছে পরিচয় দেবার ভয় দেখিয়ে পথ দেখিয়ে দিয়েছে আত্মহত্যার।
আজকে ২৬শে মার্চের এই দিনে তাই আমি স্মরি সেইসব বাঙালি নারীকে।শ্রদ্ধা জানাই আনার মতো বিদেশে অবস্থানকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী, যারা নিজেদেরকে আর বাঙালি বলে পরিচয়ও দেন না, নাকি দিতে পারেন না? আনার ভেতরে বাঙালিত্বের বোধ বিদ্যমান বলেই আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে, আমারতো মনে হয়েছে, আনাকে যদি রাষ্ট্র কখনও বলে, তাহলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যেতেও রাজি হবেন।কিন্তু রাষ্ট্র কি বলবে? রাষ্ট্র যদি বলে তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালি এই নারী-বীরদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ আমাদের মতো কেউ না কেউ গ্রহণ করতে পারে।রাষ্ট্র তাদেরকে এনে সর্বোচ্চ সম্মান্ননা দিয়ে, গত ছত্রিশ বছরে জমা হওয়া অস্বীকৃতির পাপ খন্ডাতে পারে এই সুযোগে।
আমি আনার কথা বলেছি, এই স্বাধীনতা দিবসে, এরকম নারীর বীরত্ব গাঁথা এতো দুঃখ নিয়ে বলার কথা আমার ছিল না। আজকে আমার অন্য অনেক সুন্দর কথায় সাজানো একটি নিবন্ধ লেখার কথা ছিল না। কিন্তু আজকে, স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমাকে আনার কথা লিখতে হলো দুঃখের সঙ্গে।অথচ আনা হতে পারতো আমাদের জাতীয় প্রতীক, বীরোত্তম বা বীর প্রতীক খেতাবধারী।আমার মনে হয়, এখানেই রাষ্ট্রের খামতি। এই খামতি আমাদের নতঃশির করে, আর নতঃশির বেঁচে থাকাকে কি জীবন বলা যায়?
১৯৭১ আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছিল, তবে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি ঘুমন্ত বাঙালি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতের আঘাত থেকে পেয়েছিল তাহলো, ধর্ম আসলে কোনও বড় আচ্ছাদন নয়, কোনও দখলদারী মনোভাবকেই ধর্মের ঐক্য দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না, তা কোনও না কোনও সময় কখনও না কখনও প্রবল ও প্রচণ্ড হয়ে নেমে আসে। নইলে ১৯৪৭-এ যে বাঙালি মুসলমানকে ধর্ম দিয়ে জিন্না সম্মোহিত করে গোটা একটি দেশ হাসিল করে নিলেন, মাত্র ২৫ বছরের মাথায় কি করে সেই সম্মোহন একেবারে মৃত্যুবাণ হয়ে বাঙালির ওপর নেমে এলো তা সত্যিই গবেষণার বিষয় হলেও সাদা কথায় এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, যখন স্বার্থে আঘাত পড়ে এবং নিজের ভাগে কম পড়ে তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বার্থহীনতা দেখানোর উদারতা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশেও তার ব্যত্যয় হয়নি।
ওপরের এই কথাগুলি যে আমার মনে আসেনি তা নয়, কিন্তু তা আমার ভেতরে আরও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন এমন একজন, যার কথা আজকের এই দিনে স্মরণ না করলেই নয়। তবে দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, আমি তার নামোল্লেখ করতে পারবো না। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল ইউরোপের একটি দেশে।এই লেখাতে আমি তাকে আনা হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। যদিও একসময় তার একটি চমৎকার বাঙালি নাম ছিল। কিন্তু একাত্তরের পর তিনি সেই নামটি ছেড়ে এসেছেন, চোখ ছল ছল করে বললেন তিনি।
২৬শে মার্চের কথা বলুন, জানতে চাইলাম। বললেন, সে রাতের কথা কী বলবো আর? রাত ভোর হবার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু সেই কালরাত কি আর ভোর হয়? নাকি হতে চায়? সন্ধ্যের কতোক্ষণ পর বলতে পারবো না, হঠাৎ করেই হলের ভেতর মিলিটারি, চারদিকে গুলির শব্দ মেয়েরা চিৎকার করছে। কেউ কেউ দেয়াল টপকে বেরুনোর চেষ্টা করছে, কেউ বা দরোজা বন্ধ করে রেখে নিজেদের বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু ওভাবে যে বাঁচা যায় না সে বোধটি আমাদের তখন কারোরই হয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা তো তখন সবেমাত্র বেরুতে শুরু করেছে, এতো বোধগম্মি কি তখন হয়েছে?
কথা শুরু হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাত নিয়ে, ২৬ মার্চের সকালে চলে গেলেন আনা।ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে এলো ওরা। আমরা কয়েকজন, দু’একজন মুখ চেনা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না। কোথায় এলাম বুঝিনি, ঢাকার শহরতো ভালো করে চিনি না। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে করে কোরআন শরীফ নিয়ে এসেছে।থর থর করে কাঁপছে। কাঁদছে অঝোরে, শব্দহীন। আসলে আমরা সবাই কাঁদছিলাম, অথচ কেউই শব্দ করে নয়, আমরা মনে হয় শব্দ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
তারপর যেখানে এলাম, সেখানে লাইন ধরে অনেকগুলো রুম।আমাদের একই রুমে রাখা হলো। তখন দুপুর হবে মনে হয়, তখন ওরা এলো, একের পর এক। কিছু বলার সুযোগ দেয়নি, একের পর এক, আমরা মাত্র ছয় কি সাতজন। আর ওরা সংখ্যায় কতো ছিল এখন আর মনে করতে পারি না, তবে চাইও না। আপনি ছাব্বিশে মার্চ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, এই যে, এইতো আমার কাছে ছাব্বিশে মার্চ ১৯৭১। তারপর আর দিনক্ষণ, সময়ের ঠিক ছিল না আমাদের কারোই। আমরা ওই রুমে ছিলাম, মড়ার মতো পড়ে থাকতাম। ওরা আসতো যেতো, শুধু মাঝে মাঝে খেতে পেতাম, পরনে কাপড় ছিল না। কি শোনাচ্ছে না গল্পের মতো? কেউ আপনারা বিশ্বাস করবেন বললে, এসব কথা? মনে হয় না। যাহোক, আর বলবো না। সরি, দয়াকরে আমায় আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।
আনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। জানতে চাইনি, কবে ছাড়া পেয়েছিলেন? কি করে এলেন এই দেশে? এইসব সাতপাঁচ, কী হবে জানতে চেয়ে? আমরা কফি খেলাম দীর্ঘ নীরবতা নিয়ে। তারপর আনা আমার দিকে তাকালেন, বললেন, “জানেন, আমরা প্রতিদিন কোরআন পড়তাম।ওরা তাও মানতো না। ছুঁড়ে ফেলে দিতো। পরে শুনেছি যে, ওরা নাকি মসজিদে ঢুকেও মানুষ হত্যা করেছে। জানেন, আমার আর কোনও আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নেই।এরপর নিজেকে আমি ধর্ম থেকে সরিয়ে নিয়েছি”।
কি বলবো আনাকে? ভাবছিলাম। এসব কথার কোনও উত্তর হয় না। মনে মনে ভেবেছি, শুধু কি বাংলাদেশে? ধর্মের নামে এই ইতরামি কোথায় হয়নি? ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। আজকের ইসলামি সাংগ্রি-লা ইরানে ধর্মের নামে যা হচ্ছে তাতে এই লন্ডনে এমন সব ইরানির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে যারা তাদের আনুষ্ঠানিক ধর্মের খোলশ ছেড়েছে কেবলমাত্র ধর্মের নামে ঘটে যাওয়া সব অনাচার দেখে দেখে, তার শিকার হতে হতে।১৯৭১ সালে যেসব পাকিস্তানী সৈন্য বাংলাদেশে লুটতরাজ, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তারা তো কেউই ধর্মে অবিশ্বাসী ছিল না, বরং তারা সকলেই ছিল ধর্মপ্রান মুসলিম। ১৯৭১ সালের নয়মাস ধরে চলা যুদ্ধে একটি মাস ছিল রমজান মাস। সেই মাসেও কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ধর্ষণের মতো গর্হিত কাজ করেছে, কি করেনি? তখন কিন্তু ধর্ম তাদের এই অনাচার থেকে রুখতে পারেনি। তার মানে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যা করছে তা আসলে ইসলামকে রক্ষায়। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে, ১৯৭১ আসলে আর কিছুই নয়, ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা আর নারী ধর্ষণের চূড়ান্ত উদাহরণ। একই কথা আমরা তুলতে পারি আফগানিস্তানের তালিবান শাসনামল সম্পর্কে। সেখানেও ধর্মের নামে একই ঘটনা ঘটেছে।
আনাও প্রশ্নটি আমায় করেছিলেন, ওরা কি ধর্ম রক্ষায় এতোবড় অধর্ম করেছিল? প্রশ্নটি আমায়ও ভাবিয়েছে ব্যাপক। আমার কাছে যা মনে হয়েছে তাহলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে রাজনীতির বর্মে মুড়ে তারপর যুদ্ধে নেমেছিল। যদিও এটা নতুন কিছু নয়, ১৯৪৭-এ যে দেশভাগ এবং দেশভাগকে কেন্দ্র করে যে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ তাও সেই একই ধর্মের বর্মে মোড়া পোড়া ক্ষত। সেই ক্ষত শুকোতে না শুকোতেই আবার এলো একাত্তর। এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো, যদিও ১৯৪৭-এ যা ছিল জনগণের একাংশের লোভ আর লালশার সঙ্গে ধর্মের মিশেল, ১৯৭১-এ তাই-ই হলো একটি সুশৃঙ্খল সেনা বাহিনীর রিরংসা এবং সেটাও ধর্ম দ্বারা সিদ্ধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সকল ইসলামপন্থী দলই কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে সমর্থনই শুধু নয়, বাংলাদেশের জামায়াত ইসলামী সরাসরি তাকে এই ধর্ষণ, খুন ও রাহাজানিতে সহযোগিতা করেছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা এতে অংশও নিয়েছে।পরবর্তীতে তারা আবার রাষ্ট্র ক্ষমতাও পেয়েছে, তাও আবার তথাকথিত এক মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা সৃষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের ঘাড়ে চেপে। সে অন্য কথা। আজকে আনার কথা বলি শুধু।
আনা কথা বলেন কম। নার্সের চাকরি করতেন, ছেড়ে দিয়েছেন।চোখে-মুখে এখন আর তার কোনও ক্লান্তি নেই, থাকবে কেন? তিনি তো সেই দুঃসহ স্মৃতি, যেখানে পরতে পরতে সাজানো নির্যাতন, বঞ্চণা, স্বজনদের কাছে ফিরতে চেয়েও ফিরতে না পারা, সামাজিকতার দোহাই দিয়ে পরিবারের কাছে অগ্রহণযোগ্য হওয়া, এবং তারপর রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জন্মভূমি থেকে বেরিয়ে আসা – সবই তার স্মৃতিতে এতোদিনে ফিকে হয়ে আসার কথা। আনা বললেন, “মনে রেখে কি হবে ওসব? মনে রাখতে চাই না।মনে রাখতাম, যদি ফিরে যেতে চাইতাম। কিন্তু কোথায় ফিরে যাবো? দেশটাতো আমি ভুলে গেছি, ভুলে গেছি, কারণ দেশ আমাকে মনে রাখেনি। এটা তো আমার একার দায়িত্ব নয়, দেশেরই দায়িত্ব বেশি”। বলতে চাইলাম, “কি বলছেন আনা, আপনাকে মনে রেখেছে দেশ, মনে রেখেছি আমরা। এই যে দেখুন, আমি আপনাকে খুঁজে বের করেছি”। পরে ভাবলাম, এসব কথা তার কাছে কোনও মানে রাখে না। আসলেই রাখে কি?
ছোট করে ছাঁটা চুল, সামান্য পাক ধরেছে। পরে আছেন কালো রঙের একটি স্কার্ট, ইউরোপের উজ্জ্বল গ্রীস্মের মতো শর্ষে রঙের একটি টি-শার্ট। পায়ে আঁটো-জুতো।বললেন, “এবার উঠি। দয়া করে আমার কথা কাউকে বলবেন না। আমি চাই না কেউ এসে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করুক, কী হয়েছিল? কী করে মুক্তি পেলেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না।কী হবে বলুন? উঠি কেমন?”
চমৎকার বাংলা বলেন আনা। উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে মিশে গেলেন ভিড়ের মধ্যে। আমি বসে রইলাম। তাকিয়ে থাকলাম পেছনে ফেলে যাওয়া আনার পথের দিকে।মনে মনে ভাবছিলাম, আনার মতো এরকম অনেক মেয়ে, একাত্তরে যাদেরকে পাকিস্তানীরা “গণিমতের মাল” হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে, স্বাধীন দেশে আমরা তাদেরকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেছি। আমি নিশ্চিত ১৯৭১ যদি তখন না হয়ে এই ২০০৯ সালেও হতো আর একই ঘটনার শিকার হতো বাঙালি নারী, আমাদের মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম না। আনার মতো বাংলার শেফালি, রতœা, চম্পা বা অন্য যে কাউকেই এরকম বিদেশে এসে নাম পরিবর্তন করতে হতো, নয়তো দেশেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো। যতোদূর জানি, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন পাকিস্তানী বাহিনীর ধর্ষণের শিকার এরকম হাজারো নারী স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মহত্যা করে তাদের ত্যাগের চরম মূল্যটি দিয়ে গিয়েছেন। একবার ধর্মের নামে তাকে হতে হয়েছে ধর্ষিতা, আবার পরিবার তাকে সমাজের কাছে পরিচয় দেবার ভয় দেখিয়ে পথ দেখিয়ে দিয়েছে আত্মহত্যার।
আজকে ২৬শে মার্চের এই দিনে তাই আমি স্মরি সেইসব বাঙালি নারীকে।শ্রদ্ধা জানাই আনার মতো বিদেশে অবস্থানকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী, যারা নিজেদেরকে আর বাঙালি বলে পরিচয়ও দেন না, নাকি দিতে পারেন না? আনার ভেতরে বাঙালিত্বের বোধ বিদ্যমান বলেই আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে, আমারতো মনে হয়েছে, আনাকে যদি রাষ্ট্র কখনও বলে, তাহলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যেতেও রাজি হবেন।কিন্তু রাষ্ট্র কি বলবে? রাষ্ট্র যদি বলে তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালি এই নারী-বীরদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ আমাদের মতো কেউ না কেউ গ্রহণ করতে পারে।রাষ্ট্র তাদেরকে এনে সর্বোচ্চ সম্মান্ননা দিয়ে, গত ছত্রিশ বছরে জমা হওয়া অস্বীকৃতির পাপ খন্ডাতে পারে এই সুযোগে।
আমি আনার কথা বলেছি, এই স্বাধীনতা দিবসে, এরকম নারীর বীরত্ব গাঁথা এতো দুঃখ নিয়ে বলার কথা আমার ছিল না। আজকে আমার অন্য অনেক সুন্দর কথায় সাজানো একটি নিবন্ধ লেখার কথা ছিল না। কিন্তু আজকে, স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমাকে আনার কথা লিখতে হলো দুঃখের সঙ্গে।অথচ আনা হতে পারতো আমাদের জাতীয় প্রতীক, বীরোত্তম বা বীর প্রতীক খেতাবধারী।আমার মনে হয়, এখানেই রাষ্ট্রের খামতি। এই খামতি আমাদের নতঃশির করে, আর নতঃশির বেঁচে থাকাকে কি জীবন বলা যায়?
লেবেলসমূহ:
আলোচনা,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির আলাচনা,
মুক্তিযুদ্ধ
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
মাসুদা ভাট্টি
এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে, মুখে চুন, কালি, চুন-হলুদ মিশিয়ে লাল রং বানিয়ে সেটা মেখে, পাটের “ফেউসা” দিয়ে দাঁড়ি-গোঁফ বানিয়ে, ছেঁড়া কাপড় বা চটের আলখাল্লা পরে এ বাড়ি থেকে ওবাড়ি যাচ্ছে, তাদের মাঝে এক কুমারী, কলাপাতা দিয়ে মোড়া, পাড়ার বউঝিরা আগে থেকেই তাদের চালের কোণায় কুলো গুঁজে রেখেছে, সবাই জানে, আসবে “দ্যাওয়া-নামানিরা”।
উঠোনের কোণে রাখা এক হাড়ি জল, দুষ্প্রাপ্য জল, চৈত্র মাস। গ্রামের পুকুরগুলো প্রায় সবই শুকিয়ে আসছে প্রায়, আর না শুকুলেও প্রচণ্ড রোদে তলা থেকে দলা দলা বুদ্বুদের সঙ্গে শ্যাওলা ভেসে উঠছে, দুর্গন্ধে পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যায় না। শুধু দু’একটি পুকুর, যেগুলো অনেক গভীর, সারা বছর সেখানে কচুরি-দাম পোষা হয়, যাতে রোদে পানি পঁচে না ওঠে, কচুরির লম্বা দাঁড়ি পানির তলায় আটকে রাখে শীতলতা। সেই সব পুকুরের জল ধরা যাবে না, কেবলমাত্র খাওয়ার জন্য তা। যে সময়টার কথা বলছি সেটা খুব বেশি দূরের নয়। মাত্রই পঁচিশ বছর আগের, আবার সেই অর্থে পঁচিশ বছর সিকি শতাব্দীও বটে।তখন আমাদের গ্রামে মাত্র দু’টো চাপকল ছিল। তারমধ্যে একটিতে পানির সঙ্গে গিজগিজে বালি উঠতো বলে, একটার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তো। বেচারা চাপকল চাপ খেতেই থাকতো, খেতেই থাকতো, সূর্য ওঠা-ডোবার আগে-পরে সব সময়।
দ্যাওয়া-নামানি’রা এসেছে। উঠোনের কোণে এসে দাঁড়িয়েছে, সুর ধরেছে,
একজন বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
তারপর সমস্বরে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”।
এরপর দলনেতা একেকটি লাইন বলে আর সমস্বরে সবাই সেই লাইনটি শেষে বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
এই বাড়ির বিটিরা ঘামে জর জর
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির বিটাগো, পিঠি নুন জাগে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ঝিয়েরি নাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ছাওয়ালডা সাঁতরাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির মুরগিডা ট্যাও ট্যাও করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির হাঁসটি জল-বিনে মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির গাইডা ঘাস না পাইয়া মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির দামড়াডা ছট্ফট্ ছট্ফট করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ি বাছুরডা হামলাইয়াগো মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির কুত্তাডা তৃষায় ফাইডা যায়
ওরে দ্যাও এই বাড়ি আয়
এভাবে বাড়ির প্রতিটি জীবিত প্রাণীর কথা বলা শেষ হলে বাড়ির হাঁড়ি-কুড়ি, এমনকি ধান রাখা ডোল, গোলা; গুড় রাখার জ্বালা এবং শেষাবধি বাঁশের চটি দিয়ে বোনা পেঁয়াজ রাখার “চাঙ”-এর জন্যও বৃষ্টি কামনা করে
তারপর “দ্যাওয়া” তাকে কি কি দেয়া হবে তার ফিরিস্তি হতো।
যেমন
দ্যাওয়া তোরে দুধ দিবো
দ্যাওয়া তোরে ত্যাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে সিন্দুর দিবো
দ্যাওয়া তোরে ধান দিবো
দ্যাওয়া তোরে পান দিবো
দ্যাওয়া তোরে আম দিবো
দ্যাওয়া তোরে কাঁঠাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে শাক দিবো
দ্যাওয়া তোরে মাছ দিবো
দ্যাওয়া তোরে সোনা দিবো
দ্যাওয়া তোরে রূপা দিবো
এরকম দীর্ঘ ফিরিস্তি থাকতো “দ্যাওয়া”র জন্য। সবশেষ যে বাক্যটি বলা হতো তা আমাকে এখনও দারুণ ভাবে নাড়া দেয়।
বলা হতো,
দ্যাওয়া তুই রাইতি আসিস
দ্যাওয়া তুই বিয়ানে আসিস
দ্যাওয়া তুই যহনই আসিস পাবি যুবতী।
এরপর ঘরের চালে গুঁজে রাখা কুলোর ওপর হাঁড়িতে রাখা জল উঁচু করে ঢেলে দিতেন বাড়ির কত্রী। সেই জল কলাপাতা দিয়ে মোড়া কিশোরীর ওপর পড়তো, এবং সেই জলের সঙ্গে আরও জল মিলে উঠোনে কাঁদা করা হতো, এবং সেই কাঁদায় পড়ে গড়াগড়ি যেতো দলের বাকিরা।এরপর বাড়ির কত্রী একমুঠ বা কখনও তার চেয়ে বেশি কিছু চাল এনে দলের কেউ একজনের হাতে থাকা বেতে তৈরি “ধামা”য় ঢেলে দেন। একে পাড়ার প্রতিটি বাড়ি যাওয়া হতো। একেবারে শেষ বাড়ি থেকে যখন দলটি বেরুতো তখন তাদের চেহারা হতো দ্যাখার মতো। কাউকেই ঠিক চেনা যেতো না। কাঁদা গড়াগড়ি দিতে দিতে শরীরে ওপর পুরু কাঁদার স্তর পড়তো। কিন্তু সেদিন দত্ত বাড়ির বিশাল দীঘিটি, যদিও তখন আর দত্ত বাড়ি ছিল না, তার মালিকানা গিয়েছিল রহিম শেখের হাতে, রহিম শেখ শশী দত্তের লাঠিয়াল ছিল এক সময়, ১৯৫০ সালে রহিম শেখের লাঠি শশী দত্তের মাথাটি দু’ভাগ করে দিয়েছিল।
বৃষ্টির কথায় যাই।বৃষ্টির আকুতি শুরু হতো মাঘের শেষ কিংবা ফালগুনেই। ফালগুনের কোনও এক শনি-মঙ্গল বারে বাড়ির বউ “জলি দুধের শিন্নি” দিতেন জলে। সেদিন সকালে উপোষ, শুধু উপোষ নয়, কারো সঙ্গে কথাও বলা যাবে না। খুব ভোরে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে “আগলা চুলোয়” এক দাম দিয়ে কিনে আনা (দোকানী প্রথমেই যে দাম চাইবে সে দাম দিয়েই কিনতে হবে) মাটির ছোট্ট “চৌরা”য় করে একমুঠ আতপ চাল আর এক হাঁড়ি (আমাদের ওখানে দুধ বিক্রি হয় মাটির হাঁড়ি বা পেতলের বদনা মেপে) দুধ দিয়ে শিরনি রান্না করে সেই মাটির পাতিলটি হাতে নিয়ে বউ জলে নেবে যাবে, এক ডুবে শিরনিশুদ্ধ পাতিলটি বসিয়ে দিয়ে আসবে পুকুরের তলায়। জলকে “জলি দুধ” (যে দুধে আর কিছুই মেশানো যাবে না)দিয়ে তুষ্টু রাখা, যদি চৈত্র মাসে কখনও আগুন লাগে তাহলে যেনো হাতের কাছে জল থাকে। অনেকেই হয়তো একে হিন্দু রীতি, কুসংস্কার বলবেন কিন্তু এমনটাই দেখেছি গ্রামের বেশিরভাগ মুসলমান বউকে করতে। আর আগুনের ভয়? সে এক ভয়ঙ্কর রূপ, চৈত্রে যদি কোথাও আগুন লেগেছে, তাহলে সেই গ্রামের আর একটি বাড়িও আস্ত থাকতো না, সে জন্য আগের দিনে দুই বাড়ির মাঝখানে খালমতো কেটে দূরত্ব বাড়ানো হতো বলে শুনেছি।
আর চৈত্রে আরেক ভয় ছিল কলেরার। আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে প্রায় প্রতি বছরই এই কলেরায় গ্রামের কয়েকজনকে ওপারে যেতে হতো। আমার খেলার সাথীদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি হারিয়েছি এই কলেরায়। বৃষ্টির জন্য আকুতির সঙ্গে এই কলেরা থেকে মুক্তির ব্যাপারটিও তাই একীভূত। আসলে কি রেখে কীসের কথা বলবো? এই বৃষ্টির সঙ্গে ফসল বোনা, বিশেষ পাট বোনা, আউশ ধান বোনা এইসব জড়িত। আসলে বৃষ্টির সঙ্গে জীবন জড়িত, আজ বৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে আমি তাই জীবনের ঘ্রাণ পাচ্ছি।
নিজেকে আমার মাঝে মাঝে প্রাগৈতিহাসিক মনে হয়। মনে হয় কারণ, প্রতিবার বৃষ্টির জন্য কলাপাতায় মোড়া হতো আমাকে। আমি কলাপাতার ভেতর ভিজে চুপচুপে হয়ে থাকতাম যতোক্ষণ না পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে “দ্যাওয়া” নামানো শেষ হতো। খুব বেশি খর না হলে বৈশাখেল শেষ দিকে এমনিতেই বৃষ্টি আসে। মাঝে মাঝে দেরি হয় কিছুদিন, কিন্তু প্রতিদিনই বিকেলে আকাশ ভারী হতো। আর আমরা “দ্যাওয়া-নামানি”রা ভাবতাম আমাদের জন্যই বৃষ্টি আসছে। আমরা আনন্দে দাঁড়িয়ে থাকতাম আকাশমুখো হয়ে, বৃষ্টি এলে চাতক হবো, জল খাবো। একদিন ঠিকই বিকেলমুখো রোদ কালো হয়ে যেতো, উত্তর পশ্চিম কোণ থেকে প্রথমে গরম হাওয়া আসতে আসতে এক সময় ঝপাত করে আরামদায়ক ঠাণ্ডা বাতাস আসতো।অবশ্য বাতাসের যে গতি, তাকে ঝড় বলতেই হতো। কিন্তু তাতে কি? ঝড়ের সঙ্গে জলওতো আসতো বৃষ্টি হয়ে। আর সেই বৃষ্টিতে আমি, কলাপাতা পরা মেয়েটি “বৃষ্টিদেবী” হয়ে যেতাম। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বউঝিদের বৃষ্টিতে নামিয়ে সাদা ঠোঁট লাল চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। আমার দেবীত্ব কে কেড়ে নিলো? বয়স? সময়? আধুনিকতা?
আমি বৃষ্টিদেবী ছিলাম, আজ আমার দাওয়া শুষ্ক খটখটে ইঁট-পাথর।
(লেখাটি আমার বালিকাবেলা নিয়ে বিশাল লেখার একটি ক্ষুদ্রাংশ)
এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে, মুখে চুন, কালি, চুন-হলুদ মিশিয়ে লাল রং বানিয়ে সেটা মেখে, পাটের “ফেউসা” দিয়ে দাঁড়ি-গোঁফ বানিয়ে, ছেঁড়া কাপড় বা চটের আলখাল্লা পরে এ বাড়ি থেকে ওবাড়ি যাচ্ছে, তাদের মাঝে এক কুমারী, কলাপাতা দিয়ে মোড়া, পাড়ার বউঝিরা আগে থেকেই তাদের চালের কোণায় কুলো গুঁজে রেখেছে, সবাই জানে, আসবে “দ্যাওয়া-নামানিরা”।
উঠোনের কোণে রাখা এক হাড়ি জল, দুষ্প্রাপ্য জল, চৈত্র মাস। গ্রামের পুকুরগুলো প্রায় সবই শুকিয়ে আসছে প্রায়, আর না শুকুলেও প্রচণ্ড রোদে তলা থেকে দলা দলা বুদ্বুদের সঙ্গে শ্যাওলা ভেসে উঠছে, দুর্গন্ধে পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যায় না। শুধু দু’একটি পুকুর, যেগুলো অনেক গভীর, সারা বছর সেখানে কচুরি-দাম পোষা হয়, যাতে রোদে পানি পঁচে না ওঠে, কচুরির লম্বা দাঁড়ি পানির তলায় আটকে রাখে শীতলতা। সেই সব পুকুরের জল ধরা যাবে না, কেবলমাত্র খাওয়ার জন্য তা। যে সময়টার কথা বলছি সেটা খুব বেশি দূরের নয়। মাত্রই পঁচিশ বছর আগের, আবার সেই অর্থে পঁচিশ বছর সিকি শতাব্দীও বটে।তখন আমাদের গ্রামে মাত্র দু’টো চাপকল ছিল। তারমধ্যে একটিতে পানির সঙ্গে গিজগিজে বালি উঠতো বলে, একটার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তো। বেচারা চাপকল চাপ খেতেই থাকতো, খেতেই থাকতো, সূর্য ওঠা-ডোবার আগে-পরে সব সময়।
দ্যাওয়া-নামানি’রা এসেছে। উঠোনের কোণে এসে দাঁড়িয়েছে, সুর ধরেছে,
একজন বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
তারপর সমস্বরে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”।
এরপর দলনেতা একেকটি লাইন বলে আর সমস্বরে সবাই সেই লাইনটি শেষে বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
এই বাড়ির বিটিরা ঘামে জর জর
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির বিটাগো, পিঠি নুন জাগে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ঝিয়েরি নাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ছাওয়ালডা সাঁতরাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির মুরগিডা ট্যাও ট্যাও করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির হাঁসটি জল-বিনে মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির গাইডা ঘাস না পাইয়া মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির দামড়াডা ছট্ফট্ ছট্ফট করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ি বাছুরডা হামলাইয়াগো মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির কুত্তাডা তৃষায় ফাইডা যায়
ওরে দ্যাও এই বাড়ি আয়
এভাবে বাড়ির প্রতিটি জীবিত প্রাণীর কথা বলা শেষ হলে বাড়ির হাঁড়ি-কুড়ি, এমনকি ধান রাখা ডোল, গোলা; গুড় রাখার জ্বালা এবং শেষাবধি বাঁশের চটি দিয়ে বোনা পেঁয়াজ রাখার “চাঙ”-এর জন্যও বৃষ্টি কামনা করে
তারপর “দ্যাওয়া” তাকে কি কি দেয়া হবে তার ফিরিস্তি হতো।
যেমন
দ্যাওয়া তোরে দুধ দিবো
দ্যাওয়া তোরে ত্যাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে সিন্দুর দিবো
দ্যাওয়া তোরে ধান দিবো
দ্যাওয়া তোরে পান দিবো
দ্যাওয়া তোরে আম দিবো
দ্যাওয়া তোরে কাঁঠাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে শাক দিবো
দ্যাওয়া তোরে মাছ দিবো
দ্যাওয়া তোরে সোনা দিবো
দ্যাওয়া তোরে রূপা দিবো
এরকম দীর্ঘ ফিরিস্তি থাকতো “দ্যাওয়া”র জন্য। সবশেষ যে বাক্যটি বলা হতো তা আমাকে এখনও দারুণ ভাবে নাড়া দেয়।
বলা হতো,
দ্যাওয়া তুই রাইতি আসিস
দ্যাওয়া তুই বিয়ানে আসিস
দ্যাওয়া তুই যহনই আসিস পাবি যুবতী।
এরপর ঘরের চালে গুঁজে রাখা কুলোর ওপর হাঁড়িতে রাখা জল উঁচু করে ঢেলে দিতেন বাড়ির কত্রী। সেই জল কলাপাতা দিয়ে মোড়া কিশোরীর ওপর পড়তো, এবং সেই জলের সঙ্গে আরও জল মিলে উঠোনে কাঁদা করা হতো, এবং সেই কাঁদায় পড়ে গড়াগড়ি যেতো দলের বাকিরা।এরপর বাড়ির কত্রী একমুঠ বা কখনও তার চেয়ে বেশি কিছু চাল এনে দলের কেউ একজনের হাতে থাকা বেতে তৈরি “ধামা”য় ঢেলে দেন। একে পাড়ার প্রতিটি বাড়ি যাওয়া হতো। একেবারে শেষ বাড়ি থেকে যখন দলটি বেরুতো তখন তাদের চেহারা হতো দ্যাখার মতো। কাউকেই ঠিক চেনা যেতো না। কাঁদা গড়াগড়ি দিতে দিতে শরীরে ওপর পুরু কাঁদার স্তর পড়তো। কিন্তু সেদিন দত্ত বাড়ির বিশাল দীঘিটি, যদিও তখন আর দত্ত বাড়ি ছিল না, তার মালিকানা গিয়েছিল রহিম শেখের হাতে, রহিম শেখ শশী দত্তের লাঠিয়াল ছিল এক সময়, ১৯৫০ সালে রহিম শেখের লাঠি শশী দত্তের মাথাটি দু’ভাগ করে দিয়েছিল।
বৃষ্টির কথায় যাই।বৃষ্টির আকুতি শুরু হতো মাঘের শেষ কিংবা ফালগুনেই। ফালগুনের কোনও এক শনি-মঙ্গল বারে বাড়ির বউ “জলি দুধের শিন্নি” দিতেন জলে। সেদিন সকালে উপোষ, শুধু উপোষ নয়, কারো সঙ্গে কথাও বলা যাবে না। খুব ভোরে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে “আগলা চুলোয়” এক দাম দিয়ে কিনে আনা (দোকানী প্রথমেই যে দাম চাইবে সে দাম দিয়েই কিনতে হবে) মাটির ছোট্ট “চৌরা”য় করে একমুঠ আতপ চাল আর এক হাঁড়ি (আমাদের ওখানে দুধ বিক্রি হয় মাটির হাঁড়ি বা পেতলের বদনা মেপে) দুধ দিয়ে শিরনি রান্না করে সেই মাটির পাতিলটি হাতে নিয়ে বউ জলে নেবে যাবে, এক ডুবে শিরনিশুদ্ধ পাতিলটি বসিয়ে দিয়ে আসবে পুকুরের তলায়। জলকে “জলি দুধ” (যে দুধে আর কিছুই মেশানো যাবে না)দিয়ে তুষ্টু রাখা, যদি চৈত্র মাসে কখনও আগুন লাগে তাহলে যেনো হাতের কাছে জল থাকে। অনেকেই হয়তো একে হিন্দু রীতি, কুসংস্কার বলবেন কিন্তু এমনটাই দেখেছি গ্রামের বেশিরভাগ মুসলমান বউকে করতে। আর আগুনের ভয়? সে এক ভয়ঙ্কর রূপ, চৈত্রে যদি কোথাও আগুন লেগেছে, তাহলে সেই গ্রামের আর একটি বাড়িও আস্ত থাকতো না, সে জন্য আগের দিনে দুই বাড়ির মাঝখানে খালমতো কেটে দূরত্ব বাড়ানো হতো বলে শুনেছি।
আর চৈত্রে আরেক ভয় ছিল কলেরার। আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে প্রায় প্রতি বছরই এই কলেরায় গ্রামের কয়েকজনকে ওপারে যেতে হতো। আমার খেলার সাথীদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি হারিয়েছি এই কলেরায়। বৃষ্টির জন্য আকুতির সঙ্গে এই কলেরা থেকে মুক্তির ব্যাপারটিও তাই একীভূত। আসলে কি রেখে কীসের কথা বলবো? এই বৃষ্টির সঙ্গে ফসল বোনা, বিশেষ পাট বোনা, আউশ ধান বোনা এইসব জড়িত। আসলে বৃষ্টির সঙ্গে জীবন জড়িত, আজ বৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে আমি তাই জীবনের ঘ্রাণ পাচ্ছি।
নিজেকে আমার মাঝে মাঝে প্রাগৈতিহাসিক মনে হয়। মনে হয় কারণ, প্রতিবার বৃষ্টির জন্য কলাপাতায় মোড়া হতো আমাকে। আমি কলাপাতার ভেতর ভিজে চুপচুপে হয়ে থাকতাম যতোক্ষণ না পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে “দ্যাওয়া” নামানো শেষ হতো। খুব বেশি খর না হলে বৈশাখেল শেষ দিকে এমনিতেই বৃষ্টি আসে। মাঝে মাঝে দেরি হয় কিছুদিন, কিন্তু প্রতিদিনই বিকেলে আকাশ ভারী হতো। আর আমরা “দ্যাওয়া-নামানি”রা ভাবতাম আমাদের জন্যই বৃষ্টি আসছে। আমরা আনন্দে দাঁড়িয়ে থাকতাম আকাশমুখো হয়ে, বৃষ্টি এলে চাতক হবো, জল খাবো। একদিন ঠিকই বিকেলমুখো রোদ কালো হয়ে যেতো, উত্তর পশ্চিম কোণ থেকে প্রথমে গরম হাওয়া আসতে আসতে এক সময় ঝপাত করে আরামদায়ক ঠাণ্ডা বাতাস আসতো।অবশ্য বাতাসের যে গতি, তাকে ঝড় বলতেই হতো। কিন্তু তাতে কি? ঝড়ের সঙ্গে জলওতো আসতো বৃষ্টি হয়ে। আর সেই বৃষ্টিতে আমি, কলাপাতা পরা মেয়েটি “বৃষ্টিদেবী” হয়ে যেতাম। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বউঝিদের বৃষ্টিতে নামিয়ে সাদা ঠোঁট লাল চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। আমার দেবীত্ব কে কেড়ে নিলো? বয়স? সময়? আধুনিকতা?
আমি বৃষ্টিদেবী ছিলাম, আজ আমার দাওয়া শুষ্ক খটখটে ইঁট-পাথর।
(লেখাটি আমার বালিকাবেলা নিয়ে বিশাল লেখার একটি ক্ষুদ্রাংশ)
লেবেলসমূহ:
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির স্মৃতিচারণ,
স্মৃতিচারণ
চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা
মাসুদা ভাট্টি
আমাকে মাঝে মাঝে ভূত-এ পায়, আমার পাশের মানুষটি এই ভূত-এ পাওয়া আমিকে খুব ভয় পান, আমি নিজেও বুঝি যে, তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন এই সময়গুলিতে। এ যেনো চাঁদগ্রস্ততা এক, হাঁটছি ফিরছি সংসার করছি জীবনের ঘানিতে তেল দেয়ার প্রয়োজনেও নিত্য জীবনক্ষয়কারী চাকরিটিও ঠিকই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমি নেই, এই জীবনে কোথাও নেই। তাহলে কোথায় আমি? প্রশ্নটা করি, উত্তর নেই। এ এক অসম্ভব হেঁয়ালিময়তা, নিজেরই সাথে নিজের। এই সময়টা বেশ কষ্টের।
অনেক দিন আগের এক গল্প বলি। কোনও এক কার্ত্তিক মাসের গল্প। তখন আমাদের ওদিকে ইরি চাষ হতো না। ইরি-র চাষকে সবাই তখনও “বোলোক করা” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল পাচেঁক দূরে আমার ফুপু বাড়িতে তখন সবেমাত্র এই ব্লক করা শুরু হয়েছে।তার ফলাফল তখনও অজানা বলে, আমাদের শুধু বিলের নীচু জমিতে বোরো ধান আর তার চেয়ে আরেকটু উঁচুতে আউশ ধান আর বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের পরে (যার নাম বাইন পড়া) আমন ধান বোনা হোত। আমন ধান বলে আমরা অবশ্য তাকে জানতাম না, জানতাম লক্ষ্মী দীঘা ধান হিসেবে। এই ধান পানির সঙ্গে বাড়ে। যতো পানি ততো ধান, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন দক্ষিণ থেকে জল শুধু আসতেই আসতেই থাকে, তখন এক রাতে নাকি এই ধান আধ হাত বাড়ে, জানি না কতোটা সত্যি কতোটা মিথ্যে, এই হাত মাপায়।
আশ্বিনের সংক্রান্তিতে এই ধানে ফুল আসে, আর সেই সংক্রান্ত্রিতে যে “আড়ং” হয় কুমার নদে, সেই আড়ং-এ আসা বাইচ-এর নৌকোর বৈঠার ঘায়ে ফুল ঝরে দুধ-ধান ধরে। জলের ওপর সত্যি সত্যি তখন ধানের ফুলের পাপড়ি ভাসে। আর সাত হাত আট হাত গভীর জলের তলায় সবুজ শ্যাওলা দোল খায়, নৌকোয় বসে সেই জলের ভেতর রোদ ঢুকে যেতে দেখতে কী যে ভালো লাগে, সে বলে বোঝানোর নয়। তবে সবচেয়ে মজা হতো ছোট্ট নৌকোয় করে কোনও ধান ক্ষেতের ভেতর ঢুকে গিয়ে “ঢিমা” দিয়ে পুঁটি মাছ ধরায়।ভাতের সঙ্গে কুড়ো মিশিয়ে একটা মন্ড তৈরি করা হয়, তার সঙ্গে অনেকখানি পাটেনর “ফেউসা” মিশিয়ে শক্ত গোল করা হয় যাতে পানিতে ভিজে ভিজে ঢিমাটি ভেঙে না যায়। একটা মোটা পাটখড়ির মাঝে চিকন দড়ি বেঁধে তার আগায় এই ঢিমা ঝুলিয়ে পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়, মিনিট খানেকের মধ্যে পুঁটি মাছ সেই ঢিমা খেতে আসে আর তার পাশেই তিন চারটি ছোট ছোট বড়শিতে ভাত গেঁথে টপাটপ পুঁটি মাছ শিকার। এই শিকারের হিসেব হয় কুড়িতে, এক কুড়ি কোনও ব্যাপারই না, সাত আট কুড়ি না হলে লোকে তাকে ঢিমা দেওয়া বলে শিকারই করে না। মাঝে মাঝে অবশ্য পুঁটির সঙ্গে ছোট ছোট কই মাছও ধরা পড়ে, কিন্তু সেগুলো সব ‘কাইশ্যা কই’, আমাদের বিলে-অঞ্চলে কই মাছ “দো-সইনা, তে-সইনা” না হলে খায় না কেউ, ছোট কই খেলে নাকি কাশি হয়।
যাহোক, আশ্বিনের শেষেই আমাদের বাড়িতে পদ্মার চর এলাকা থেকে লোকজন আসতো ধান কাটার জন্য। স্থানীয়রা নিজেদের ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো বলে অতো দূর থেকে তারা আসতো ধান কাটতে। যদিও তারা আষাঢ় মাসে একবার এসে জেনে যেতো ধানের কি অবস্থা। আর তখন নিয়ে আসতো কাঁঠাল, ছানার সন্দেশ, দানাদার, আমার অবশ্য গজাই খুব প্রিয় ছিল। ময়দার ছাঁচ ভেজে চিনির শিরায় ডুবোনো গজা। ওহ্ ভুলে গেছি, আশ্বিন সংক্রান্তির আড়ং আসলে বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে, তাই এ সময় মিশ্রি দিয়ে ঘোড়া হাতি শিঙাসহ নানা ধরনের ছাঁচ পাওয়া যেতো, আমি সারা বছরের জন্য সেই সব ছাঁচ জমাতাম, মনে হতো আমি সব দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেই সব ছাঁচ দেবো না, যদিও খেতে কী যে ইচ্ছে হতো। কিন্তু খেতাম না। আমার প্রিয় কুটিকালের প্রেমিক বনি আমিনকেও দিতাম না। উল্টো বনি আমিন সেসব চাইলে ওর পেটের ওপর পা দিয়ে নিজে মা-কালি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বনি আমি শিব, আর আমি কালি। যদিও সে ছিল আমাদের মসজিদের হুজুরের ছেলে।
কার্ত্তিকে ধান পাকলে বাড়ি ভর্তি কিষ্ষান, তারা বিশাল পাতিলে ভাত রাঁধে, বাইর-বাড়ির উঠোনে গর্ত করে চুলো বানিয়ে তাতে ইটেঁর ঝিক্ দিয়ে তাতে রান্না করতো। সেই ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল, মাঝে মাঝে কচুর “গাঠি” দিয়ে মাঝের ঝোল। কেন যে তারা শুধু কচুর মুখি কিনতো কে জানে? সেদ্ধ কচুর মুখি আমি ছিলে দিতাম। যদিও আমার ওদের ওখানে যাওয়া মানা ছিল। কে শোনে কার কথা, আমি রেঁধে দিতাম, বেড়ে খাওয়াতাম। নিজেও খেতাম, চুলোর পাশে গনগনে আগুন (আসলে ছাই) তুলে তার ওপর বড় বড় শুকনো মরিচ ছেড়ে পুড়িয়ে নিয়ে, সামান্য শর্ষের তেল দিয়ে সেই মরিচ ডলে, সেই পাতলা ডাল আর গাঠি ভর্তা দিয়ে লাল লাল লক্ষ্মী দীঘা ধানের ভাত খেতে অমৃত মনে হতো। তখন সন্ধ্যে বলে বনি আমিন থাকতো না, কিন্তু ওকে খাওয়াতে খুব ইচ্ছে করতো। কি আর করা? আমি বনি আমিনের জন্য এক মুষ্টি ভাত চুলোর মধ্যে ফেলে দিতাম।
একেক দিন কিষ্ষানরা একেক ক্ষেতে যেতো। সারাদিন বাড়িতে ধান নিয়ে নানা কাজ হচ্ছে, আগের রাতে মাড়াই করা (আমরা বলি মলন দেয়া) ধান শুকোনো হচ্ছে, বাতাসে ধরে উড়িয়ে ধুলোমুক্ত করা হচ্ছে, তারপর ঝনঝন আওয়াজ হলে শুকনো ধান গোলায় তোলা হচ্ছে। ঠিক এই সময়ই তিনি আসতেন। পরনে আধ ময়লা ধূতি, কোমর থেকে লুঙ্গির মতো করে এক খন্ড, আরেক খন্ড এখনকার ল্যাহেঙ্গার ওড়নার মতো এক পাশ কোমরে গুঁজে অন্য পাশটি গলার দু’পাশে পেঁচিয়ে রাখা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, খালি পা, শিরা দ্যাখা যায়। এসেই বলতেন, “আইলামগো মা, সেই যে গ্যালো বছর আইছিলাম, আর এইবার আইলাম। আইজ কিন্তু চাইড্ডা স্যাবা করবো আপনাগো বাড়ি”।
আমার জন্মের পর থেকে তাকে দেখেছি, চিনি, কোথায় থাকে তাও জানি, কিন্তু বছরের আর কোনও সময় তার সঙ্গে আমার দ্যাখা হতো না। আমাকে দেখেই বলতেন, “যাওতো তাকের উপর বাতাসা রাখা আছে, পেতলের গিলাশটা মেজে জল আনবা, আর তিনটে বাতাসা আনবা, বড্ড তেয়াশ লেগেছে”। আমি “ভুন্নুত” (এটাও সেই মানুষটির থেকে শোনা শব্দ) করে ছুট লাগাতাম, হয়তো তখন ধান নাড়ছিলাম, কিংবা হাতে কোনও কাজ থেকে থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? তখন মনে হতো না, এখন মনে মনে ভাবি, উনি কেমন করে জানতেন যে, তাকের ওপর বাতাসা রাখা আছে? সেই ধানের সময় উদাসীন ময়রা আসতেন, নানা রকমের মিষ্টি নিয়ে, বিশাল এক গামলার মধ্যে অর্ধেক পানি দিয়ে তার ভেতরে আরেকটি গামলায় করে নানা পদের মিষ্টি রাখা থাকতো, আমি সেখান থেকে প্রতিটি পদ একেকটি করে পেতলের থালায় সাজিয়ে, তেঁতুল দিয়ে মাজা গ্লাশে জল ঢেলে নির্মল দা’র বউ মাধবী বউদি যেমন করে পুজোর কোশাকুশি মেজে ঘাট থেকে বাড়ি ফিরতেন, ঠিক তেমন করে ডান হাতটা উঁচু করে তার পাতার ওপর পেতলের থালায় মিষ্টি নিয়ে, বাঁ হাতে জলের গ্লাশ নিয়ে তার সামনে নামিয়ে রাখতাম। তিনি তৃপ্তি করে জল খেতেন, তা দেখে আমার খেতে ইচ্ছে করতো খুব। এটা অবশ্য আমার আজীবনের, কাউকে কিছু খেতে দেখলেই আমার খেতে ইচ্ছে করে।
এই জল খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই শুরু করতেন গান। প্রথম গানটি আমি এখনও মুখস্ত পারি, “আমি পরের জন্য বানলাম রে বাড়ি ঘর” এবং তারপর দীর্ঘ সময় নিয়ে গাইতেন যে গানটি, সেটি আমি এই হঠাৎ একজনের মুখে শুনতে পেলাম, তিনি নাকি কোলকাতা থেকে শান্তি নিকেতন যাওয়ার পথে রেলে এক গাতক-এর গলায় শুনেছেন। কার্ত্তিকের দুপুর, বউঝিরা ধান ওড়াচ্ছে, ঝকঝকে রোদে কেউ ধান নাড়ছে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, সবাই গেছে ধান কাটতে। তখন তিনি গাইছেন, “চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা গো” – আমি সেই বয়সে, তখনও রোহিনী হয়েছি কি না মনে নেই, তখনও সেই চিকন কালার জন্য শরীরে মনে পুলক অনুভব করতাম। এতে কেউ আমায় ইঁচড়ে পাকা বললে, আমার কোনও আপত্তি নেই। একের পর এক গান হতো, কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই, ওইড্যা গাও না?” কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই কালার বাঁশি শুইনা মন জানি কী অয়, ওইড্যা গাও দিহি”।
আমি কার্ত্তিকের গল্প বলি, কতো কার্ত্তিক আসে, আমি কেন যেনো এখনও সেই লোকটির অপেক্ষায় থাকি, নাকি কে জানে আমি সেই চিকন কালার অপেক্ষায় থাকি? যে বেছে বেছে শুধু দুপুরেই বাঁশি বাজায়। আমার খুব মন কেমন করে সেই গোসাঁইয়ের জন্য। মনে হয়, কতো কাল, ক. . তো. . কা. . ল আমার গোঁসাই আসে না।
(বালিকার ঋতু-দর্শণ শীর্ষক রচনার খণ্ডাংশ)
আমাকে মাঝে মাঝে ভূত-এ পায়, আমার পাশের মানুষটি এই ভূত-এ পাওয়া আমিকে খুব ভয় পান, আমি নিজেও বুঝি যে, তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন এই সময়গুলিতে। এ যেনো চাঁদগ্রস্ততা এক, হাঁটছি ফিরছি সংসার করছি জীবনের ঘানিতে তেল দেয়ার প্রয়োজনেও নিত্য জীবনক্ষয়কারী চাকরিটিও ঠিকই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমি নেই, এই জীবনে কোথাও নেই। তাহলে কোথায় আমি? প্রশ্নটা করি, উত্তর নেই। এ এক অসম্ভব হেঁয়ালিময়তা, নিজেরই সাথে নিজের। এই সময়টা বেশ কষ্টের।
অনেক দিন আগের এক গল্প বলি। কোনও এক কার্ত্তিক মাসের গল্প। তখন আমাদের ওদিকে ইরি চাষ হতো না। ইরি-র চাষকে সবাই তখনও “বোলোক করা” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল পাচেঁক দূরে আমার ফুপু বাড়িতে তখন সবেমাত্র এই ব্লক করা শুরু হয়েছে।তার ফলাফল তখনও অজানা বলে, আমাদের শুধু বিলের নীচু জমিতে বোরো ধান আর তার চেয়ে আরেকটু উঁচুতে আউশ ধান আর বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের পরে (যার নাম বাইন পড়া) আমন ধান বোনা হোত। আমন ধান বলে আমরা অবশ্য তাকে জানতাম না, জানতাম লক্ষ্মী দীঘা ধান হিসেবে। এই ধান পানির সঙ্গে বাড়ে। যতো পানি ততো ধান, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন দক্ষিণ থেকে জল শুধু আসতেই আসতেই থাকে, তখন এক রাতে নাকি এই ধান আধ হাত বাড়ে, জানি না কতোটা সত্যি কতোটা মিথ্যে, এই হাত মাপায়।
আশ্বিনের সংক্রান্তিতে এই ধানে ফুল আসে, আর সেই সংক্রান্ত্রিতে যে “আড়ং” হয় কুমার নদে, সেই আড়ং-এ আসা বাইচ-এর নৌকোর বৈঠার ঘায়ে ফুল ঝরে দুধ-ধান ধরে। জলের ওপর সত্যি সত্যি তখন ধানের ফুলের পাপড়ি ভাসে। আর সাত হাত আট হাত গভীর জলের তলায় সবুজ শ্যাওলা দোল খায়, নৌকোয় বসে সেই জলের ভেতর রোদ ঢুকে যেতে দেখতে কী যে ভালো লাগে, সে বলে বোঝানোর নয়। তবে সবচেয়ে মজা হতো ছোট্ট নৌকোয় করে কোনও ধান ক্ষেতের ভেতর ঢুকে গিয়ে “ঢিমা” দিয়ে পুঁটি মাছ ধরায়।ভাতের সঙ্গে কুড়ো মিশিয়ে একটা মন্ড তৈরি করা হয়, তার সঙ্গে অনেকখানি পাটেনর “ফেউসা” মিশিয়ে শক্ত গোল করা হয় যাতে পানিতে ভিজে ভিজে ঢিমাটি ভেঙে না যায়। একটা মোটা পাটখড়ির মাঝে চিকন দড়ি বেঁধে তার আগায় এই ঢিমা ঝুলিয়ে পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়, মিনিট খানেকের মধ্যে পুঁটি মাছ সেই ঢিমা খেতে আসে আর তার পাশেই তিন চারটি ছোট ছোট বড়শিতে ভাত গেঁথে টপাটপ পুঁটি মাছ শিকার। এই শিকারের হিসেব হয় কুড়িতে, এক কুড়ি কোনও ব্যাপারই না, সাত আট কুড়ি না হলে লোকে তাকে ঢিমা দেওয়া বলে শিকারই করে না। মাঝে মাঝে অবশ্য পুঁটির সঙ্গে ছোট ছোট কই মাছও ধরা পড়ে, কিন্তু সেগুলো সব ‘কাইশ্যা কই’, আমাদের বিলে-অঞ্চলে কই মাছ “দো-সইনা, তে-সইনা” না হলে খায় না কেউ, ছোট কই খেলে নাকি কাশি হয়।
যাহোক, আশ্বিনের শেষেই আমাদের বাড়িতে পদ্মার চর এলাকা থেকে লোকজন আসতো ধান কাটার জন্য। স্থানীয়রা নিজেদের ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো বলে অতো দূর থেকে তারা আসতো ধান কাটতে। যদিও তারা আষাঢ় মাসে একবার এসে জেনে যেতো ধানের কি অবস্থা। আর তখন নিয়ে আসতো কাঁঠাল, ছানার সন্দেশ, দানাদার, আমার অবশ্য গজাই খুব প্রিয় ছিল। ময়দার ছাঁচ ভেজে চিনির শিরায় ডুবোনো গজা। ওহ্ ভুলে গেছি, আশ্বিন সংক্রান্তির আড়ং আসলে বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে, তাই এ সময় মিশ্রি দিয়ে ঘোড়া হাতি শিঙাসহ নানা ধরনের ছাঁচ পাওয়া যেতো, আমি সারা বছরের জন্য সেই সব ছাঁচ জমাতাম, মনে হতো আমি সব দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেই সব ছাঁচ দেবো না, যদিও খেতে কী যে ইচ্ছে হতো। কিন্তু খেতাম না। আমার প্রিয় কুটিকালের প্রেমিক বনি আমিনকেও দিতাম না। উল্টো বনি আমিন সেসব চাইলে ওর পেটের ওপর পা দিয়ে নিজে মা-কালি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বনি আমি শিব, আর আমি কালি। যদিও সে ছিল আমাদের মসজিদের হুজুরের ছেলে।
কার্ত্তিকে ধান পাকলে বাড়ি ভর্তি কিষ্ষান, তারা বিশাল পাতিলে ভাত রাঁধে, বাইর-বাড়ির উঠোনে গর্ত করে চুলো বানিয়ে তাতে ইটেঁর ঝিক্ দিয়ে তাতে রান্না করতো। সেই ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল, মাঝে মাঝে কচুর “গাঠি” দিয়ে মাঝের ঝোল। কেন যে তারা শুধু কচুর মুখি কিনতো কে জানে? সেদ্ধ কচুর মুখি আমি ছিলে দিতাম। যদিও আমার ওদের ওখানে যাওয়া মানা ছিল। কে শোনে কার কথা, আমি রেঁধে দিতাম, বেড়ে খাওয়াতাম। নিজেও খেতাম, চুলোর পাশে গনগনে আগুন (আসলে ছাই) তুলে তার ওপর বড় বড় শুকনো মরিচ ছেড়ে পুড়িয়ে নিয়ে, সামান্য শর্ষের তেল দিয়ে সেই মরিচ ডলে, সেই পাতলা ডাল আর গাঠি ভর্তা দিয়ে লাল লাল লক্ষ্মী দীঘা ধানের ভাত খেতে অমৃত মনে হতো। তখন সন্ধ্যে বলে বনি আমিন থাকতো না, কিন্তু ওকে খাওয়াতে খুব ইচ্ছে করতো। কি আর করা? আমি বনি আমিনের জন্য এক মুষ্টি ভাত চুলোর মধ্যে ফেলে দিতাম।
একেক দিন কিষ্ষানরা একেক ক্ষেতে যেতো। সারাদিন বাড়িতে ধান নিয়ে নানা কাজ হচ্ছে, আগের রাতে মাড়াই করা (আমরা বলি মলন দেয়া) ধান শুকোনো হচ্ছে, বাতাসে ধরে উড়িয়ে ধুলোমুক্ত করা হচ্ছে, তারপর ঝনঝন আওয়াজ হলে শুকনো ধান গোলায় তোলা হচ্ছে। ঠিক এই সময়ই তিনি আসতেন। পরনে আধ ময়লা ধূতি, কোমর থেকে লুঙ্গির মতো করে এক খন্ড, আরেক খন্ড এখনকার ল্যাহেঙ্গার ওড়নার মতো এক পাশ কোমরে গুঁজে অন্য পাশটি গলার দু’পাশে পেঁচিয়ে রাখা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, খালি পা, শিরা দ্যাখা যায়। এসেই বলতেন, “আইলামগো মা, সেই যে গ্যালো বছর আইছিলাম, আর এইবার আইলাম। আইজ কিন্তু চাইড্ডা স্যাবা করবো আপনাগো বাড়ি”।
আমার জন্মের পর থেকে তাকে দেখেছি, চিনি, কোথায় থাকে তাও জানি, কিন্তু বছরের আর কোনও সময় তার সঙ্গে আমার দ্যাখা হতো না। আমাকে দেখেই বলতেন, “যাওতো তাকের উপর বাতাসা রাখা আছে, পেতলের গিলাশটা মেজে জল আনবা, আর তিনটে বাতাসা আনবা, বড্ড তেয়াশ লেগেছে”। আমি “ভুন্নুত” (এটাও সেই মানুষটির থেকে শোনা শব্দ) করে ছুট লাগাতাম, হয়তো তখন ধান নাড়ছিলাম, কিংবা হাতে কোনও কাজ থেকে থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? তখন মনে হতো না, এখন মনে মনে ভাবি, উনি কেমন করে জানতেন যে, তাকের ওপর বাতাসা রাখা আছে? সেই ধানের সময় উদাসীন ময়রা আসতেন, নানা রকমের মিষ্টি নিয়ে, বিশাল এক গামলার মধ্যে অর্ধেক পানি দিয়ে তার ভেতরে আরেকটি গামলায় করে নানা পদের মিষ্টি রাখা থাকতো, আমি সেখান থেকে প্রতিটি পদ একেকটি করে পেতলের থালায় সাজিয়ে, তেঁতুল দিয়ে মাজা গ্লাশে জল ঢেলে নির্মল দা’র বউ মাধবী বউদি যেমন করে পুজোর কোশাকুশি মেজে ঘাট থেকে বাড়ি ফিরতেন, ঠিক তেমন করে ডান হাতটা উঁচু করে তার পাতার ওপর পেতলের থালায় মিষ্টি নিয়ে, বাঁ হাতে জলের গ্লাশ নিয়ে তার সামনে নামিয়ে রাখতাম। তিনি তৃপ্তি করে জল খেতেন, তা দেখে আমার খেতে ইচ্ছে করতো খুব। এটা অবশ্য আমার আজীবনের, কাউকে কিছু খেতে দেখলেই আমার খেতে ইচ্ছে করে।
এই জল খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই শুরু করতেন গান। প্রথম গানটি আমি এখনও মুখস্ত পারি, “আমি পরের জন্য বানলাম রে বাড়ি ঘর” এবং তারপর দীর্ঘ সময় নিয়ে গাইতেন যে গানটি, সেটি আমি এই হঠাৎ একজনের মুখে শুনতে পেলাম, তিনি নাকি কোলকাতা থেকে শান্তি নিকেতন যাওয়ার পথে রেলে এক গাতক-এর গলায় শুনেছেন। কার্ত্তিকের দুপুর, বউঝিরা ধান ওড়াচ্ছে, ঝকঝকে রোদে কেউ ধান নাড়ছে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, সবাই গেছে ধান কাটতে। তখন তিনি গাইছেন, “চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা গো” – আমি সেই বয়সে, তখনও রোহিনী হয়েছি কি না মনে নেই, তখনও সেই চিকন কালার জন্য শরীরে মনে পুলক অনুভব করতাম। এতে কেউ আমায় ইঁচড়ে পাকা বললে, আমার কোনও আপত্তি নেই। একের পর এক গান হতো, কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই, ওইড্যা গাও না?” কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই কালার বাঁশি শুইনা মন জানি কী অয়, ওইড্যা গাও দিহি”।
আমি কার্ত্তিকের গল্প বলি, কতো কার্ত্তিক আসে, আমি কেন যেনো এখনও সেই লোকটির অপেক্ষায় থাকি, নাকি কে জানে আমি সেই চিকন কালার অপেক্ষায় থাকি? যে বেছে বেছে শুধু দুপুরেই বাঁশি বাজায়। আমার খুব মন কেমন করে সেই গোসাঁইয়ের জন্য। মনে হয়, কতো কাল, ক. . তো. . কা. . ল আমার গোঁসাই আসে না।
(বালিকার ঋতু-দর্শণ শীর্ষক রচনার খণ্ডাংশ)
লেবেলসমূহ:
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির স্মৃতিচারণ,
স্মৃতিচারণ
জ্বর-বিকার (২)
মাসুদা ভাট্টি
মেয়েটির হাতে ঝিমায়মান একগুচ্ছ ফুল ছিল, হলুদ বিবর্ণ হলে চোখ তাকে সইতে পারে না, তার ঠোঁটে ক্ষীণ সুরও ছিল, কথাহীন সুরও মানুষ নিতে পারে না বেশিক্ষণ, সাধারণ মানুষ কথা আর সুরের মিল চায়, মানুষ গান খোঁজে; মেয়েটির জীবন ছিল, যৌবন নয়, জলের তলায় ওঁৎ পেতে থাকা কুমিরের মতো, আনাকোন্ডাও হতে পারে; তবে ভালোবাসা সবুজ পাতার আভরণে আশ্রয় নেয়া গেছো ব্যাঙের মতো মেয়েটির জীবনে সামান্য সবুজ এনেছিল, একটু নড়াচড়া, একটু দৌড়ঝাঁপ; সবুজ ব্যাঙ আর মেয়েটিকে জীবন্ত মনে হতো বেশ; যখন দেশ খরাক্লিষ্ট হলো সবুজ ব্যাঙের সঙ্গে মেয়েটিও ক্রমশঃ ক্লিশে হতে হতে হতে হতে ….. মেয়েটি এখন একদা হলুদ স্মৃতি।
২.
সবুজ ঘাসের ওপর পাখাভাঙা প্রজাপতি, মরে যাওয়ার অপেক্ষায়; এমন যদি হতো মৌমাছিরা মধুর চেয়ে মানুষের রক্ত চুষতে বেশি ভালোবাসতো, তখন মৌচাকে মধু না হয়ে রক্ত ঝুলে থাকতো- মাছিটিও হঠাৎই আঁটকে গ্যালো ঝুলন্ত গামছায়, গামছাটি কিছুক্ষণ আগেও ভেজা চুলে জড়ানো ছিল, চুলের গন্ধেই টের পাওয়া যায় নারীর বয়স, কোমরের খাঁজের গভীরতা – মাছিটি আঁটকে গেলো, সেও মরে যাওয়ারই অপেক্ষায়।
৩.
ধরে নিচ্ছি আমি সমুদ্রপারের একমাত্র গাছ, বাকি সব ভেঙে-ভেসে গেছে সর্বশেষ ঝড়ে, প্রবল ঝড়, জল আর বাতাসের সে উত্তুঙ্গ মিলন, বাৎসায়ন বেঁচে থাকলে কামসূ্ত্রের নতুন অধ্যায় হতো, আমার চারপাশে এখন স্লেট-রঙা আকাশ, ক্রমশ নেমে আসছে আমার কাছে, ঔদ্ধ্যত তার বিদ্যুৎ-শিশ্ন, টান টান; আমি সমুদ্র পারের একমাত্র গাছ – আজ ঝড়ের রাতে তার বিদ্যুৎ-অভিসার।
৪.
যার জানালার শিক গলে সুর্য আসে, শুপুরি বাগানের একটা একটা গাছ ডিঙিয়ে, গতকালের সব দুঃশ্চিন্তা সরিয়ে পৃথিবীর সব পাতা ছুঁয়ে রোদ আসে, দাঁড়ায় না কোথাও, রোদ মানুষ নয়, মানুষেরই পড়ে যাওয়ার আগে দাঁড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, মানুষই ঘুম থেকে জেগে ওঠে রোদের আগে প্রতিবেশীর মৃত্যু চিৎকারে; নরক না দেখেও মানুষ কল্পনা করে নিয়েছে নরকের, স্বর্গও নির্মাণ করেছে কল্পনায় – যা দ্যাখা যায় না, যা অনুভব করা হয়নি, মানুষের কল্পনায়ও তা নেই; সূর্য রোদ স্বপ্ন মৃত্যু নরক কিংবা স্বর্গ – সবই মানুষের চেনা সত্যই।
৫.
শুনশান রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, দু’পাশের বাড়িঘর সব মৃত, গভীর অন্ধকার মৃত্যু এই সব নেতিবাচক কথা ভাবলেন তিনি; তার মনে হলো তিনি একটি পড়ে থাকা খুলিও দেখলেন, চোখ-কোটর দিয়ে আলো বাতাস জল সব বেরিয়ে আসছে, তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো, তিনি হাঁটলেন, অতিক্রম করলেন দীর্ঘ পথ, তারপর মুখোমুখি হলেন একটি ভাঙা কবরের, নামফলকহীন, তারিখবিহীন, জন্ম এবং মৃত্যুহীনও; তিনি এবার বসে পড়লেন মাটিতে, ছোট্ট সুড়ঙ্গ পথে একটু একটু করে আলোবাতাস ঢুকছে মাটির ভেতর; তিনিও নিজেকে সেঁধিয়ে দিলেন – তারপর শুরু হলো তার জীবন।
মেয়েটির হাতে ঝিমায়মান একগুচ্ছ ফুল ছিল, হলুদ বিবর্ণ হলে চোখ তাকে সইতে পারে না, তার ঠোঁটে ক্ষীণ সুরও ছিল, কথাহীন সুরও মানুষ নিতে পারে না বেশিক্ষণ, সাধারণ মানুষ কথা আর সুরের মিল চায়, মানুষ গান খোঁজে; মেয়েটির জীবন ছিল, যৌবন নয়, জলের তলায় ওঁৎ পেতে থাকা কুমিরের মতো, আনাকোন্ডাও হতে পারে; তবে ভালোবাসা সবুজ পাতার আভরণে আশ্রয় নেয়া গেছো ব্যাঙের মতো মেয়েটির জীবনে সামান্য সবুজ এনেছিল, একটু নড়াচড়া, একটু দৌড়ঝাঁপ; সবুজ ব্যাঙ আর মেয়েটিকে জীবন্ত মনে হতো বেশ; যখন দেশ খরাক্লিষ্ট হলো সবুজ ব্যাঙের সঙ্গে মেয়েটিও ক্রমশঃ ক্লিশে হতে হতে হতে হতে ….. মেয়েটি এখন একদা হলুদ স্মৃতি।
২.
সবুজ ঘাসের ওপর পাখাভাঙা প্রজাপতি, মরে যাওয়ার অপেক্ষায়; এমন যদি হতো মৌমাছিরা মধুর চেয়ে মানুষের রক্ত চুষতে বেশি ভালোবাসতো, তখন মৌচাকে মধু না হয়ে রক্ত ঝুলে থাকতো- মাছিটিও হঠাৎই আঁটকে গ্যালো ঝুলন্ত গামছায়, গামছাটি কিছুক্ষণ আগেও ভেজা চুলে জড়ানো ছিল, চুলের গন্ধেই টের পাওয়া যায় নারীর বয়স, কোমরের খাঁজের গভীরতা – মাছিটি আঁটকে গেলো, সেও মরে যাওয়ারই অপেক্ষায়।
৩.
ধরে নিচ্ছি আমি সমুদ্রপারের একমাত্র গাছ, বাকি সব ভেঙে-ভেসে গেছে সর্বশেষ ঝড়ে, প্রবল ঝড়, জল আর বাতাসের সে উত্তুঙ্গ মিলন, বাৎসায়ন বেঁচে থাকলে কামসূ্ত্রের নতুন অধ্যায় হতো, আমার চারপাশে এখন স্লেট-রঙা আকাশ, ক্রমশ নেমে আসছে আমার কাছে, ঔদ্ধ্যত তার বিদ্যুৎ-শিশ্ন, টান টান; আমি সমুদ্র পারের একমাত্র গাছ – আজ ঝড়ের রাতে তার বিদ্যুৎ-অভিসার।
৪.
যার জানালার শিক গলে সুর্য আসে, শুপুরি বাগানের একটা একটা গাছ ডিঙিয়ে, গতকালের সব দুঃশ্চিন্তা সরিয়ে পৃথিবীর সব পাতা ছুঁয়ে রোদ আসে, দাঁড়ায় না কোথাও, রোদ মানুষ নয়, মানুষেরই পড়ে যাওয়ার আগে দাঁড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, মানুষই ঘুম থেকে জেগে ওঠে রোদের আগে প্রতিবেশীর মৃত্যু চিৎকারে; নরক না দেখেও মানুষ কল্পনা করে নিয়েছে নরকের, স্বর্গও নির্মাণ করেছে কল্পনায় – যা দ্যাখা যায় না, যা অনুভব করা হয়নি, মানুষের কল্পনায়ও তা নেই; সূর্য রোদ স্বপ্ন মৃত্যু নরক কিংবা স্বর্গ – সবই মানুষের চেনা সত্যই।
৫.
শুনশান রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, দু’পাশের বাড়িঘর সব মৃত, গভীর অন্ধকার মৃত্যু এই সব নেতিবাচক কথা ভাবলেন তিনি; তার মনে হলো তিনি একটি পড়ে থাকা খুলিও দেখলেন, চোখ-কোটর দিয়ে আলো বাতাস জল সব বেরিয়ে আসছে, তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো, তিনি হাঁটলেন, অতিক্রম করলেন দীর্ঘ পথ, তারপর মুখোমুখি হলেন একটি ভাঙা কবরের, নামফলকহীন, তারিখবিহীন, জন্ম এবং মৃত্যুহীনও; তিনি এবার বসে পড়লেন মাটিতে, ছোট্ট সুড়ঙ্গ পথে একটু একটু করে আলোবাতাস ঢুকছে মাটির ভেতর; তিনিও নিজেকে সেঁধিয়ে দিলেন – তারপর শুরু হলো তার জীবন।
লেবেলসমূহ:
আলোচনা,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির আলাচনা
চৈতালী-কথা (১)
মাসুদা ভাট্টি
ভর চৈত্র মাস। সেই যে ফাল্গুনের পনের তারিখে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে বসে আছেন, আর নামার নাম নেই। ন্যাড়া চক-পাথার, ফসলহীন। চৈতালী উঠে গেছে। শুধু গম পড়ে আছে, পড়ে থেকে পেকে ঝনঝন করার পর তাদের কেটে আনা হবে। সকালে উঠে আমাদের বাড়ির সামনের বড় উঠোনে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মাইল দেড়েক দূরের ত্রিভাগদি গ্রাম কেমন আবছা দেখা যায়, অথচ এই মাত্র কিছুদিন আগেই শীতের সকালে এই উঠোনে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে একধামা জামরং চোখে হামলে পড়ে, শীতকালে আমার সূর্য ওঠে ত্রিভাগদি গ্রামের মাথা ছাড়িয়ে যে দেবদারু গাছ, ঠিক তার আগ-পাতাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। যদিও পুরো গ্রামটি ঢাকা থাকে কুয়াশায়। কিন্তু চৈত্রে কুয়াশা নেই, তবুও ত্রিভাগদি দ্যাখা যায় না।
ফালগুনের মাঝামাঝিই জলদেবকে তুষ্টু করা হয়ে গিয়েছে। শনিবারের হাট থেকে দোকানি যে দাম চাইবে সেই দামে মাটির পাতিল কিনে এনে তাতে জলি-দুধের শিরনি রেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য সকালে উঠে কোনও কিছু মুখে না দিয়ে, কারো সঙ্গে কথা না বলে পুকুরে ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে এই শিরনি রাঁধতে হয়। প্রায় বাড়িতেই হয়েছে এই ডুব-শিরনি, শুধু অমুদা’র মা “বড় ঠাইরেন”, যিনি এক সময় সমাদ্দার বাড়ির “বউ ঠাকুরুন” ছিলেন, তিনিই তখন বড় ঠাইরেন, সারাদিন আক্ষেপ করে মরেন, “আহারে আমার কেউ নেই বরুণদেবকে তুষ্টু করার, এই চৈতে আগুন ধরলে নিবানোর কেউ থাকপেনানে রে। ওহ্ ভগবান, এতো ভরা বাড়ি ছিল, কোহানে সব হারাইয়া গ্যালো রে”।সত্যিই, আমার জন্মের পর থেকেই দেখছি, সমাদ্দার বাড়ি থেকে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে, শুধু সমাদ্দার বাড়ি কি, আমার জন্মের আগেই পাঠক, দত্ত আর বানারি(ব্যানার্জি) বাড়ি খালি হয়ে গিয়েছিল, আর আমার চোখের সামনে একে একে ভূঁইমালি বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি খালি হতে লাগলো, সেই সব বাড়িতে মান্নান কাকা, খালেক কাকা, হারুন ফুপারা একে একে গিয়ে উঠলেন। সমাদ্দার বাড়িতে তখনও ফাল্গুনে দোল্ হতো, আমি রঙে নেয়ে ভূত হতাম। ঝুলনযাত্রা হতো ঠাকুর বাড়িতে, দূরদেশ থেকে কীর্ত্তনীয়ারা আসতেন, রাতভর কীর্তন হতো। সেইসব কীর্ত্তনীয়ারাও চলে যাওয়ার আগে গ্রামের জন্য আশীর্বাদ করে যেতেন, “এই চত্তিরি মা ওলা তুমি আইসো নাগো, চরণ ধরি তোমার তুমি আইসো না ইদিক পানে”। যাওয়ার আগে কীর্ত্তনীয়ারা চাউল তুলে নিয়ে যেতেন, আমরা মুঠো মুঠো চাল দিতাম, এক মুঠোর বেশি চাল দিলে ওরা নিতেন না, বলতেন, “বলতেন, প্যাডে যেটুকু আঁটে সেইটুকুনই খাইতে হয় দিদি, বেশি খাইতে নাই, চাইতে নাই, আমরা বাড়ি ঘুরি, তোমাগো বাড়ি থিকাই যদি সব নিয়া যাই তাইলে আমাগো নারায়ন দর্শণ হবেনিগো দিদি”।
এই কীর্ত্তনীয়াদের মধ্যে একজন ছিলেন বড়ু গোসাঁই। ছিপছিপে লম্বা, তখনও লম্বা পরিমাপের বোধ হয়নি, এখনকার হিসেবে ছয় ফুটের ওপরে হবেন। একখানি ধুতি দু’টুকরো করে একটুকরো লুঙ্গির মতো করে পরা, আরেকখানি শরীরে জড়ানো। গলায় কন্ঠী। ঠাকুর বাড়ির উঠোনের এক কোণায় স্বপাক খান কীর্ত্তনীয়ারা। আর অবধারিত ভাবেই আমি গিয়ে তাদের পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকি, সন্ধ্যের পর কীর্ত্তন হবে, তাতে কী? আমি দুপুর থেকেই পারলে গিয়ে বসে থাকি। দিনভর যা যা উঠেছে, চাউলকলামুলোকুমড়াডালকলমিহেলেঞ্চা সবই একটি বিশাল মাটির হাঁড়িতে ফুটছে, একেবারে শেষে তিন চারটে দুর্বা ঘাসের ডগা এনে ছেড়ে দেয়া হতো সেই পাতিলে। সমাদ্দার বাড়ি থেকে বড় ঠাইরেন আমার হাত দিয়ে নারকেলের আচায় করে একদলা ঘি দিয়ে দিয়েছেন, আমি সেটি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, কখন রান্না শেষ হবে আর কলাপাতায় সেই খিচুড়িমতো জিনিসটি ঢেলে তার ওপর খানিকটা ঘি ছিটিয়ে বড়ু গোসাঁই এক অদ্ভূত শব্দ করে খাবেন। আমার মায়ের হাতে আমি অনেকবার মার খেয়েছি এরকম মানুষের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি নকল করে। আর বড়ু গোসাঁই আমাকে যেসব কীর্ত্তণ শিখিয়েছিলেন, গলায় সুর না থাকলেও আমি তার প্রতিটির কথা এখনও মনে করতে পারি।
তো সেবারও ফাল্গুনে কীর্ত্তনীয়ারা গেয়ে গেছেন, দোল হয়ে গেছে।আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ হয়েছে, কারণ সূয্যি-ঠাকুর আকাশে পা তুলে বসে আছেন।চারদিক পুড়ে যাচ্ছে, হাঁসমুরগিগরুবাছুরকুকুরবেড়াল সবাই কেমন জিভ বের করে হাঁপায় সারাদিন, দেখলে মায়া লাগে। আমাদের বড় উঠোনের পাশে একমাত্র চাপকলটি অনেকক্ষণ চাপতে হয় জল তুলতে, কারণ জল নেমে গেছে অনেক নীচে, সহজে উঠতে চায় না। বিরাট বড় বড় মাটির ভাসি ভর্তি করে জল রাখা হয়েছে আমাদের ঘরের কোণে, ঠান্ডা থাকবে বলে, আবার খুব প্রয়োজন পড়লে মানে চৈতে যার কথা মুখে আনতে নেই সেই আগুন লাগলে যাতে সহজেই সেখান থেকে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু যেবার আমাদের বাড়িতে আগুন লেগে আমাদের সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সেবার এই ভাসি ভর্তি জল আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। আমার একেবারে এক কাপড়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর আগুনের হল্কা দেখছিলাম, কিছুই করার ছিল না। সেই আগুন দেখে ভয় পেয়ে আমার টাইফয়েড হয়েছিল, প্রায় ছ’মাস ভুগেছিলাম আমি সেই জ্বরে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকতাম শুধু, আগুন আগুন করে চিৎকার করে উঠতাম – পরে শুনেছি এসব।
এমনিতে পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আগে তলা থেকে তাল তাল কাঁদা তুলে এনে টিনের চালের ওপর দিয়ে রাখতেন কেউ কেউ। যাতে কারো বাড়িতে আগুন লাগলে সেখান থেকে গোলা ছুটে এসে চালের ওপর পড়ে আগুন ছড়াতে না পারে। কিন্তু তাতেও কি কিছু হতো? হতো না। গ্রামের একদিকে আগুন লাগলে আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়ি পরবর্তী বর্ষা পর্যন্ত ক্যামন ন্যাড়া দ্যাখাতো, দূর থেকেই বোঝা যেতো এই গ্রামে আগুন লেগেছিল। কতোবার বৈশাখ মাস ধরে চলা নানা জায়গার মেলা দেখতে যেতে যেতে এরকম পোড়া গ্রামের দেখা পেয়েছি।সবচেয়ে খারাপ লাগতো সেই সব পোড়া বাড়ির ছেলেমেয়েদের দেখে, ওরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো করুণ চোখে, তাদের মেলায় যাওয়া বারণ, বাড়ি পুড়ে গেছে, থাকা-খাওয়ারই কী ব্যবস্থা তার নেই ঠিক, তার আবার “আড়ঙ্গে” যাওয়া।
আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে বড় উঠোন পেরিয়ে মাইল খানেক চক দেখা যেতো। আমরা ঘরে বসে বসে দেখতাম মাঠে “বিলাই দৌঁড়ায়”, পরে জেনেছি এর নাম মরীচিকা। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি ফাঁকা মাঠে ক্লান্তিহীন এই বেড়াল দৌঁড়ানো দেখে দেখে আমার চোখে ধাঁধাঁ লাগতো। আমাদের খাবার-দাবারের ব্যাপারে মা খুব সতর্ক থাকতেন। হাত ধুয়ে এসে মুছে তারপর খেতে হবে। এই সব নিয়ম কানুন বছরের অন্য সময় শিথিল। ফ্রকে হাত মুছেই খেয়ে ফেলতে পারি, কেউ দেখলেও কিছু বলে না। শুধু অমুদা’র মা বড় ঠাইরেনের সামনে এমন কিছু করলে, “এ ম্যায়াডা, কতোবার না তোরে কইছি হাত ধুয়া ছাড়া কিছু মুখে দিবি না, আবার দেখলি তোর একদিন কি আমার একদিন”। উনি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেই “তার একদিন কি আমার একদিন” আসেনি, উনি আমাকে শাঁসিয়েছেন, আদর করেছেন, আমার ভেতর ভরে দিয়েছেন সামান্য যেটুকু নম্রতা -যেটুকু আমার ভেতর এখনও আছে সেটুকু, অনেক খানি সৌন্দর্যবোধ, আর চলে যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছেন উনাদের পারিবারিক লাইব্রেরীর সমস্ত বই। সেসব আরেকদিন, আজ চৈত্রের কথাই শুধু। এক চৈত্রকথায়, আরেক চৈত্রের চেয়ে খরতর কাহিনী বড় ঠাইরেনের চলে যাওয়ার গল্প বড্ড বেমানান।
চৈত্রের প্রথম কি দ্বিতীয় শনিবার, হাটের দিন, শনি-মঙ্গলবার হরির হাট বসে, সেরকমই এক সন্ধ্যায় আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় কান্নার রোল ওঠে। ছহেরদ্দি শেখের ছেলে আব্দুল আলি শেখ-এর কলেরা হয়েছে। হাট থেকে আসার পথে জিলাপি কিনে খেতে খেতে আসছিলো কালি সাঁঝের কালে, হঠাৎ পেছনে এক বিরাটাকার কুকুর, কালি সাঁঝের মতোই রং। আব্দুল আলি তাগড়া যুবক, এইসব কুকুর-টুকুর ভয় পাওয়ার লোক নয়। সে কুকুরকে পাত্তা না দিয়ে হাট থেকে বাড়ির দিকে এগোয়, হাট আর আব্দুল আলির বাড়ি মাত্র আধ মাইল দূরত্ব, মাঝে শেলই-খাল। খটখটে শুকনো খাল পার হতে গিয়ে আব্দুল আলি আছাড় খায়। আর টের পায় তার হাত থেকে কলাপাতায় মোড়ানো জিলাপি টেনে নেয় কুকুর। যাওয়ার সময় বলে যায়, “জিলাপি দিলি না, কাইড়া নিলাম, এই বার পুরা গ্রাম খাবার আসফারলাগছি”। পরের দিন সকালে এই গল্প আমরা শুনি ময়না দাদি, মজিরোনের মা, রহিবোন ফুপু সহ নানাজনের মুখে। আমরা যেতে চাই দেখতে আব্দুল আলি ভাইকে, কিন্তু আমাদের যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আমাদের সঙ্গে গল্প করে যায়।
কিন্তু যেই মা বাড়ির পেছন দিকে কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত ওমনি এক ছুটে আমি চলে যাই আব্দুল আলি ভাইদের বাড়ি। গিয়ে দেখি, বাড়িটা কেমন থমথমে। আব্দুল আলি ভাইকে একটা চৌকিতে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। তার পরনে লুঙ্গিটা শুধু লজ্জাস্থান ঢেকে রেখেছে। আগের রাত থেকেই বমি করতে করতে এখন আর বমি করার মতো শক্তিও নেই। নিম্নাংশ থেকে চৌকিতে বিছানো কলাপাতা বেয়ে যে জলের মতো জিনিস বেরুচ্ছে তার গন্ধে সেখানে দাঁড়ানো মুস্কিল। মাছি উড়ছে ভন ভন করে। আব্দুল আলি ভাইয়ের মা চাচি আম্মা তার বোন উজিরোন, লাইলি, লিলি আপারা চারপাশে ঘিরে বসে আছেন। আর ছহেরদ্দি কাকা বাইরে চৌকি পেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারও চারপাশে গ্রামের অনেক মুরুব্বি। ঝিনুক ভর্তি করে লবন পানি তুলে দেয়া হচ্ছে মুখে। বেতের নরোম আগা ছেঁচে তার রস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু “কিছুতেই কিছু হয়নি’।
গ্রামের একমাত্র ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ এসেছিলেন, স্যালাইন দিয়েছেন একটা, কিন্তু আব্দুল আলি ভাই ক্রমশঃ শক্তিহীন হতে হতে নির্জীব হয়ে গিয়েছেন। চৌকির ওপর বিছানো কলাপাতায় শোয়া আব্দুল আলি ভাইয়ের চেহারাটা আমার চোখে এখনও আঘাত করে। মাত্র কিছুদিন আগেই তার বিয়ে খেয়েছি আমরা। কি সুন্দর বউটি, একটু মোটাসোঁটা, আব্দুল আলি ভাই নিরক্ষর কিন্তু তার বউ ক্লাশ ফাইভ অবদি পড়েছেন। বিয়ের পর দ্বিতীয়বার বাপের বাড়িতে গিয়েছেন। তাকে ফিরতে হলো সেদিন রাতেই, কিন্তু ততোক্ষণে বাড়িতে কারবালার মাতম। আব্দুল আলি ভাই মারা গেছেন। আমার জীবনে কলেরায় দেখা প্রথম মৃত্যু। আব্দুল আলী ভাইয়ের স্ত্রী তখন অন্তঃস্বত্তা, তাও জানা গেলো তার মৃত্যুর দিনই। সে কি করুণ দৃশ্য! অথচ কেউই সে বাড়িতে আসতে পারছে না। কলেরার মৃত্যু, বাড়ি ছেড়ে লাশ যায় তবু ওলা যায় না, ওলা পেছন পেছন হেঁটে আসে ওই মৃত্যু থেকে যে যেদিকে যায়, সেদিকে। তাও আব্দুল আলি ভাইকে পরদিন ভোর ভোরে কবর দেয়া হলো, আর কবর দিয়ে আসতে আসতেই শোনা গেলো মারলং কাকার ছেলে ছিরাকে ওলা ধরেছে। আমাদের উঠোনে তখন গনগনে চৈত্র মাস।
ভর চৈত্র মাস। সেই যে ফাল্গুনের পনের তারিখে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে বসে আছেন, আর নামার নাম নেই। ন্যাড়া চক-পাথার, ফসলহীন। চৈতালী উঠে গেছে। শুধু গম পড়ে আছে, পড়ে থেকে পেকে ঝনঝন করার পর তাদের কেটে আনা হবে। সকালে উঠে আমাদের বাড়ির সামনের বড় উঠোনে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মাইল দেড়েক দূরের ত্রিভাগদি গ্রাম কেমন আবছা দেখা যায়, অথচ এই মাত্র কিছুদিন আগেই শীতের সকালে এই উঠোনে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে একধামা জামরং চোখে হামলে পড়ে, শীতকালে আমার সূর্য ওঠে ত্রিভাগদি গ্রামের মাথা ছাড়িয়ে যে দেবদারু গাছ, ঠিক তার আগ-পাতাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। যদিও পুরো গ্রামটি ঢাকা থাকে কুয়াশায়। কিন্তু চৈত্রে কুয়াশা নেই, তবুও ত্রিভাগদি দ্যাখা যায় না।
ফালগুনের মাঝামাঝিই জলদেবকে তুষ্টু করা হয়ে গিয়েছে। শনিবারের হাট থেকে দোকানি যে দাম চাইবে সেই দামে মাটির পাতিল কিনে এনে তাতে জলি-দুধের শিরনি রেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য সকালে উঠে কোনও কিছু মুখে না দিয়ে, কারো সঙ্গে কথা না বলে পুকুরে ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে এই শিরনি রাঁধতে হয়। প্রায় বাড়িতেই হয়েছে এই ডুব-শিরনি, শুধু অমুদা’র মা “বড় ঠাইরেন”, যিনি এক সময় সমাদ্দার বাড়ির “বউ ঠাকুরুন” ছিলেন, তিনিই তখন বড় ঠাইরেন, সারাদিন আক্ষেপ করে মরেন, “আহারে আমার কেউ নেই বরুণদেবকে তুষ্টু করার, এই চৈতে আগুন ধরলে নিবানোর কেউ থাকপেনানে রে। ওহ্ ভগবান, এতো ভরা বাড়ি ছিল, কোহানে সব হারাইয়া গ্যালো রে”।সত্যিই, আমার জন্মের পর থেকেই দেখছি, সমাদ্দার বাড়ি থেকে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে, শুধু সমাদ্দার বাড়ি কি, আমার জন্মের আগেই পাঠক, দত্ত আর বানারি(ব্যানার্জি) বাড়ি খালি হয়ে গিয়েছিল, আর আমার চোখের সামনে একে একে ভূঁইমালি বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি খালি হতে লাগলো, সেই সব বাড়িতে মান্নান কাকা, খালেক কাকা, হারুন ফুপারা একে একে গিয়ে উঠলেন। সমাদ্দার বাড়িতে তখনও ফাল্গুনে দোল্ হতো, আমি রঙে নেয়ে ভূত হতাম। ঝুলনযাত্রা হতো ঠাকুর বাড়িতে, দূরদেশ থেকে কীর্ত্তনীয়ারা আসতেন, রাতভর কীর্তন হতো। সেইসব কীর্ত্তনীয়ারাও চলে যাওয়ার আগে গ্রামের জন্য আশীর্বাদ করে যেতেন, “এই চত্তিরি মা ওলা তুমি আইসো নাগো, চরণ ধরি তোমার তুমি আইসো না ইদিক পানে”। যাওয়ার আগে কীর্ত্তনীয়ারা চাউল তুলে নিয়ে যেতেন, আমরা মুঠো মুঠো চাল দিতাম, এক মুঠোর বেশি চাল দিলে ওরা নিতেন না, বলতেন, “বলতেন, প্যাডে যেটুকু আঁটে সেইটুকুনই খাইতে হয় দিদি, বেশি খাইতে নাই, চাইতে নাই, আমরা বাড়ি ঘুরি, তোমাগো বাড়ি থিকাই যদি সব নিয়া যাই তাইলে আমাগো নারায়ন দর্শণ হবেনিগো দিদি”।
এই কীর্ত্তনীয়াদের মধ্যে একজন ছিলেন বড়ু গোসাঁই। ছিপছিপে লম্বা, তখনও লম্বা পরিমাপের বোধ হয়নি, এখনকার হিসেবে ছয় ফুটের ওপরে হবেন। একখানি ধুতি দু’টুকরো করে একটুকরো লুঙ্গির মতো করে পরা, আরেকখানি শরীরে জড়ানো। গলায় কন্ঠী। ঠাকুর বাড়ির উঠোনের এক কোণায় স্বপাক খান কীর্ত্তনীয়ারা। আর অবধারিত ভাবেই আমি গিয়ে তাদের পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকি, সন্ধ্যের পর কীর্ত্তন হবে, তাতে কী? আমি দুপুর থেকেই পারলে গিয়ে বসে থাকি। দিনভর যা যা উঠেছে, চাউলকলামুলোকুমড়াডালকলমিহেলেঞ্চা সবই একটি বিশাল মাটির হাঁড়িতে ফুটছে, একেবারে শেষে তিন চারটে দুর্বা ঘাসের ডগা এনে ছেড়ে দেয়া হতো সেই পাতিলে। সমাদ্দার বাড়ি থেকে বড় ঠাইরেন আমার হাত দিয়ে নারকেলের আচায় করে একদলা ঘি দিয়ে দিয়েছেন, আমি সেটি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, কখন রান্না শেষ হবে আর কলাপাতায় সেই খিচুড়িমতো জিনিসটি ঢেলে তার ওপর খানিকটা ঘি ছিটিয়ে বড়ু গোসাঁই এক অদ্ভূত শব্দ করে খাবেন। আমার মায়ের হাতে আমি অনেকবার মার খেয়েছি এরকম মানুষের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি নকল করে। আর বড়ু গোসাঁই আমাকে যেসব কীর্ত্তণ শিখিয়েছিলেন, গলায় সুর না থাকলেও আমি তার প্রতিটির কথা এখনও মনে করতে পারি।
তো সেবারও ফাল্গুনে কীর্ত্তনীয়ারা গেয়ে গেছেন, দোল হয়ে গেছে।আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ হয়েছে, কারণ সূয্যি-ঠাকুর আকাশে পা তুলে বসে আছেন।চারদিক পুড়ে যাচ্ছে, হাঁসমুরগিগরুবাছুরকুকুরবেড়াল সবাই কেমন জিভ বের করে হাঁপায় সারাদিন, দেখলে মায়া লাগে। আমাদের বড় উঠোনের পাশে একমাত্র চাপকলটি অনেকক্ষণ চাপতে হয় জল তুলতে, কারণ জল নেমে গেছে অনেক নীচে, সহজে উঠতে চায় না। বিরাট বড় বড় মাটির ভাসি ভর্তি করে জল রাখা হয়েছে আমাদের ঘরের কোণে, ঠান্ডা থাকবে বলে, আবার খুব প্রয়োজন পড়লে মানে চৈতে যার কথা মুখে আনতে নেই সেই আগুন লাগলে যাতে সহজেই সেখান থেকে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু যেবার আমাদের বাড়িতে আগুন লেগে আমাদের সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সেবার এই ভাসি ভর্তি জল আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। আমার একেবারে এক কাপড়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর আগুনের হল্কা দেখছিলাম, কিছুই করার ছিল না। সেই আগুন দেখে ভয় পেয়ে আমার টাইফয়েড হয়েছিল, প্রায় ছ’মাস ভুগেছিলাম আমি সেই জ্বরে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকতাম শুধু, আগুন আগুন করে চিৎকার করে উঠতাম – পরে শুনেছি এসব।
এমনিতে পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আগে তলা থেকে তাল তাল কাঁদা তুলে এনে টিনের চালের ওপর দিয়ে রাখতেন কেউ কেউ। যাতে কারো বাড়িতে আগুন লাগলে সেখান থেকে গোলা ছুটে এসে চালের ওপর পড়ে আগুন ছড়াতে না পারে। কিন্তু তাতেও কি কিছু হতো? হতো না। গ্রামের একদিকে আগুন লাগলে আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়ি পরবর্তী বর্ষা পর্যন্ত ক্যামন ন্যাড়া দ্যাখাতো, দূর থেকেই বোঝা যেতো এই গ্রামে আগুন লেগেছিল। কতোবার বৈশাখ মাস ধরে চলা নানা জায়গার মেলা দেখতে যেতে যেতে এরকম পোড়া গ্রামের দেখা পেয়েছি।সবচেয়ে খারাপ লাগতো সেই সব পোড়া বাড়ির ছেলেমেয়েদের দেখে, ওরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো করুণ চোখে, তাদের মেলায় যাওয়া বারণ, বাড়ি পুড়ে গেছে, থাকা-খাওয়ারই কী ব্যবস্থা তার নেই ঠিক, তার আবার “আড়ঙ্গে” যাওয়া।
আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে বড় উঠোন পেরিয়ে মাইল খানেক চক দেখা যেতো। আমরা ঘরে বসে বসে দেখতাম মাঠে “বিলাই দৌঁড়ায়”, পরে জেনেছি এর নাম মরীচিকা। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি ফাঁকা মাঠে ক্লান্তিহীন এই বেড়াল দৌঁড়ানো দেখে দেখে আমার চোখে ধাঁধাঁ লাগতো। আমাদের খাবার-দাবারের ব্যাপারে মা খুব সতর্ক থাকতেন। হাত ধুয়ে এসে মুছে তারপর খেতে হবে। এই সব নিয়ম কানুন বছরের অন্য সময় শিথিল। ফ্রকে হাত মুছেই খেয়ে ফেলতে পারি, কেউ দেখলেও কিছু বলে না। শুধু অমুদা’র মা বড় ঠাইরেনের সামনে এমন কিছু করলে, “এ ম্যায়াডা, কতোবার না তোরে কইছি হাত ধুয়া ছাড়া কিছু মুখে দিবি না, আবার দেখলি তোর একদিন কি আমার একদিন”। উনি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেই “তার একদিন কি আমার একদিন” আসেনি, উনি আমাকে শাঁসিয়েছেন, আদর করেছেন, আমার ভেতর ভরে দিয়েছেন সামান্য যেটুকু নম্রতা -যেটুকু আমার ভেতর এখনও আছে সেটুকু, অনেক খানি সৌন্দর্যবোধ, আর চলে যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছেন উনাদের পারিবারিক লাইব্রেরীর সমস্ত বই। সেসব আরেকদিন, আজ চৈত্রের কথাই শুধু। এক চৈত্রকথায়, আরেক চৈত্রের চেয়ে খরতর কাহিনী বড় ঠাইরেনের চলে যাওয়ার গল্প বড্ড বেমানান।
চৈত্রের প্রথম কি দ্বিতীয় শনিবার, হাটের দিন, শনি-মঙ্গলবার হরির হাট বসে, সেরকমই এক সন্ধ্যায় আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় কান্নার রোল ওঠে। ছহেরদ্দি শেখের ছেলে আব্দুল আলি শেখ-এর কলেরা হয়েছে। হাট থেকে আসার পথে জিলাপি কিনে খেতে খেতে আসছিলো কালি সাঁঝের কালে, হঠাৎ পেছনে এক বিরাটাকার কুকুর, কালি সাঁঝের মতোই রং। আব্দুল আলি তাগড়া যুবক, এইসব কুকুর-টুকুর ভয় পাওয়ার লোক নয়। সে কুকুরকে পাত্তা না দিয়ে হাট থেকে বাড়ির দিকে এগোয়, হাট আর আব্দুল আলির বাড়ি মাত্র আধ মাইল দূরত্ব, মাঝে শেলই-খাল। খটখটে শুকনো খাল পার হতে গিয়ে আব্দুল আলি আছাড় খায়। আর টের পায় তার হাত থেকে কলাপাতায় মোড়ানো জিলাপি টেনে নেয় কুকুর। যাওয়ার সময় বলে যায়, “জিলাপি দিলি না, কাইড়া নিলাম, এই বার পুরা গ্রাম খাবার আসফারলাগছি”। পরের দিন সকালে এই গল্প আমরা শুনি ময়না দাদি, মজিরোনের মা, রহিবোন ফুপু সহ নানাজনের মুখে। আমরা যেতে চাই দেখতে আব্দুল আলি ভাইকে, কিন্তু আমাদের যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আমাদের সঙ্গে গল্প করে যায়।
কিন্তু যেই মা বাড়ির পেছন দিকে কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত ওমনি এক ছুটে আমি চলে যাই আব্দুল আলি ভাইদের বাড়ি। গিয়ে দেখি, বাড়িটা কেমন থমথমে। আব্দুল আলি ভাইকে একটা চৌকিতে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। তার পরনে লুঙ্গিটা শুধু লজ্জাস্থান ঢেকে রেখেছে। আগের রাত থেকেই বমি করতে করতে এখন আর বমি করার মতো শক্তিও নেই। নিম্নাংশ থেকে চৌকিতে বিছানো কলাপাতা বেয়ে যে জলের মতো জিনিস বেরুচ্ছে তার গন্ধে সেখানে দাঁড়ানো মুস্কিল। মাছি উড়ছে ভন ভন করে। আব্দুল আলি ভাইয়ের মা চাচি আম্মা তার বোন উজিরোন, লাইলি, লিলি আপারা চারপাশে ঘিরে বসে আছেন। আর ছহেরদ্দি কাকা বাইরে চৌকি পেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারও চারপাশে গ্রামের অনেক মুরুব্বি। ঝিনুক ভর্তি করে লবন পানি তুলে দেয়া হচ্ছে মুখে। বেতের নরোম আগা ছেঁচে তার রস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু “কিছুতেই কিছু হয়নি’।
গ্রামের একমাত্র ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ এসেছিলেন, স্যালাইন দিয়েছেন একটা, কিন্তু আব্দুল আলি ভাই ক্রমশঃ শক্তিহীন হতে হতে নির্জীব হয়ে গিয়েছেন। চৌকির ওপর বিছানো কলাপাতায় শোয়া আব্দুল আলি ভাইয়ের চেহারাটা আমার চোখে এখনও আঘাত করে। মাত্র কিছুদিন আগেই তার বিয়ে খেয়েছি আমরা। কি সুন্দর বউটি, একটু মোটাসোঁটা, আব্দুল আলি ভাই নিরক্ষর কিন্তু তার বউ ক্লাশ ফাইভ অবদি পড়েছেন। বিয়ের পর দ্বিতীয়বার বাপের বাড়িতে গিয়েছেন। তাকে ফিরতে হলো সেদিন রাতেই, কিন্তু ততোক্ষণে বাড়িতে কারবালার মাতম। আব্দুল আলি ভাই মারা গেছেন। আমার জীবনে কলেরায় দেখা প্রথম মৃত্যু। আব্দুল আলী ভাইয়ের স্ত্রী তখন অন্তঃস্বত্তা, তাও জানা গেলো তার মৃত্যুর দিনই। সে কি করুণ দৃশ্য! অথচ কেউই সে বাড়িতে আসতে পারছে না। কলেরার মৃত্যু, বাড়ি ছেড়ে লাশ যায় তবু ওলা যায় না, ওলা পেছন পেছন হেঁটে আসে ওই মৃত্যু থেকে যে যেদিকে যায়, সেদিকে। তাও আব্দুল আলি ভাইকে পরদিন ভোর ভোরে কবর দেয়া হলো, আর কবর দিয়ে আসতে আসতেই শোনা গেলো মারলং কাকার ছেলে ছিরাকে ওলা ধরেছে। আমাদের উঠোনে তখন গনগনে চৈত্র মাস।
লেবেলসমূহ:
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির স্মৃতিচারণ,
স্মৃতিচারণ
কাপড়ের কারাগারে নারী
মাসুদা ভাট্টি
ফেসবুক-এ “আমার মনে কী আছে?” এই প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলাম - ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি সে দেশে বুরখা ও চোখ-মুখ ঢাকা হিজাব নিষিদ্ধ করেছেন, খুব শীগ্গিরই আইন করে তা বন্ধ করা হবে। আজকে লন্ডন শহর গলছে, গরমে, এর মাঝে কালো বুরখায় আপাদমস্তক মোড়া মেয়েদেরকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিলো খুব- ধর্ম মানুষকে এভাবে কেন বেঁধে রাখে? চেতনার বিকাশকেই কি ধর্ম এভাবে কালো কাপড়ে ঢেকে রাখে?
আলোচনাটি এই প্রশ্ন রেখেই শুরু করতে চাই। হিজাব বা বুরখা পরা নিয়ে বাদানুবাদ আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক। ধর্মকে ডিফেন্ড করার জন্য মানুষ অনেক কু-যুক্তিও হাজির করবেন। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে আমি মানতে রাজি যে, কেউ ইচ্ছে করলে হিজাব বা বুরখা পরবেন, তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে কেন রাষ্ট্র? কিন্তু একথাও তো ঠিক যে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপেই মানুষ গিলেছে, ইসলাম-এর রাজনৈতিক রূপতো সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষকে হাজারো নিয়মের নিগড়ে বেঁধে রেখেছে, যদিও দোহাই পাড়া হয়েছে পরকালে অপার শান্তির। রক্তপাত, ভয়-ভীতি আর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যদি ধর্ম বিস্তার হয়ে থাকে তাহলে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে কেন “ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ” বলে বলা হবে? আফগানিস্তানে অমুসলিম বা হিটলারের আমলে ইহুদিদের বিশেষ চিহ্ন ধারণ করার রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ছিলো কিন্তু ধর্ম দিয়ে আগাপাশতলা মুড়ে নিজেকে আলাদা করার এই প্রবণতাকে সুস্থ বলে মানতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সভ্যতা এতোটা এগিয়েছে যে, নারী নিজেকে “খোলা খাবার” আর পুরুষকে “মাছি” ভেবে কাপড়ের জালি দিয়ে ঢেকে রাখার এই চিন্তাকে হাস্যকর মনে হয়।
একজন মানুষের সঙ্গে আপনি বসে কাজ করছেন, তার সঙ্গে গল্প করছেন অথচ তাকে আপনি কখনও দেখেননি। তার উপস্থিতি আছে কিন্তু তিনি নেই, ভাষার সঙ্গে বাচনভঙ্গী ও শরীরের ভাষা, পোশাক-আশাক ইত্যাদি বিষয়গুলি জড়িত, সব মিলিয়ে একজন সম্পূর্ণ মানুষকে জানা যায়। কিন্তু যে মানুষ পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে মোড়া তাকে জানাতো দূরের কথা, তার সম্পর্কে ধারণাও তৈরি হবে কি? হয়তো বলবেন, ধারণা তৈরি হওয়ার কী দরকার?
আমার ভাবনার জবাবে একজন বলেছেন, ফ্রান্সের রাস্তায় নাকি নগ্ন হয়ে চলাফেরার অধিকার আছে! তিনি সারকোজির এই ঘোষণাকে স্ট্যান্টবাজি বলেছেন, কী আর বলবো? কিছুই বলার নেই। প্রকৃতির সন্তান বলে নিজেদের নগ্ন করে রাখায় বিশ্বাসীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে তারা দিগম্বর হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতেই পারেন কিন্তু জনগণের মাঝে নগ্ন হয়ে নামলে তাকে নিরাপত্তাকর্মীরা হয় হাজতে, নয় মানসিক চিকিৎসালয়ে নিয়ে যান। এইতো সেদিন, ফ্রেন্স ওপেন টেনিস চলাকালে এমন একজন হঠাৎ নগ্ন হয়ে নেমে গেলেন ময়দানে, ব্যস তাকে ধরে-বেঁধে সরিয়ে নেয়া হলো, নেয়ার সময় তাকে একটা কাপড় দিয়ে ঢাকাও হলো। আসলে এই সব যুক্তি দিয়ে কী হবে? এই উপলব্ধি মনে-মননে তৈরি হতে হয়, কারো মগজে ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। হ্যাঁ, মগজে ঢুকিয়ে দেয়াও সম্ভব, যখন মানুষ শিশু থাকে, হিজাব বা বুরখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, তাদেরকে শেখানো হয়, মাথা না ঢাকলে লম্বা চুল পরকালে সাপ হয়ে তাদেরকে দংশন করবে। কী ভয়ঙ্কর কথা, একটি শিশু বেড়ে উঠছে তার চুলকে ভয় পেয়ে। নিজের শরীরকে এভাবে ভয় পেলে তার বেড়ে ওঠাটাই যে অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে? সে শিখছে, বাইরে সমস্ত পুরুষরা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকে ধর্ষণ করার জন্য, সে জানছে সে একটি লোভনীয় ‘ডিস’, তাকে তাই ঢেকে-ঢুকে থাকতে হবে, নইলে যে কেউ তাকে খেয়ে ফেলবে। বাচ্চা বাচ্চা এই মেয়েগুলোর জন্য কষ্ট হয় খুব, তারা যে ইচ্ছে করে হিজাব পড়ছে তা নয়, তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে। এই গরমে, প্রচণ্ড গরমে হিজাবের নীচে ঘামাচিতে মেয়েটি কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু কিছুই করার নেই। ছোট্ট বেলায় পড়েছিলাম, ইঁট দিয়ে ঘাস ঢেকে রাখলে দিনে দিনে তা হলুদ হয়ে মারা যায়, আর মানুষের শরীর যদি এভাবে সূর্যালোক-বঞ্চিত থাকে তাহলে তাও কি ফ্যাকাসে হয়ে ধীরে ধীরে নানা চর্মরোগের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র হবে না? আচ্ছা শরীরের কথা বাদ দিই, মানুষের মন? শরীর যার কাপড়ের কারাগারে বন্দী, মন-তো তার কতোটা উদার হবে? এই মেয়ে শিশুটি বড় হয়ে যদি বলে সে স্বেচ্ছায় বুরখাকে বেছে নিয়েছে তাহলে তার চেয়ে বড় মিথ্যে আর দুনিয়াতে আছে কি? প্রশ্ন হলো, পৃথিবীতে ক’জন নারী স্বেচ্ছায় বুরখা পরেন আর ক’জন বাধ্য হয়ে তার খতিয়ান না থাকলেও আশেপাশের বা পরিচিতদের কথা বলতে পারি, তারা কেউই স্বেচ্ছায় এই পোশাকের কারাগার বেছে নেননি, ধর্ম দিয়ে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে।
ফেসবুক-এ “আমার মনে কী আছে?” এই প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলাম - ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি সে দেশে বুরখা ও চোখ-মুখ ঢাকা হিজাব নিষিদ্ধ করেছেন, খুব শীগ্গিরই আইন করে তা বন্ধ করা হবে। আজকে লন্ডন শহর গলছে, গরমে, এর মাঝে কালো বুরখায় আপাদমস্তক মোড়া মেয়েদেরকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিলো খুব- ধর্ম মানুষকে এভাবে কেন বেঁধে রাখে? চেতনার বিকাশকেই কি ধর্ম এভাবে কালো কাপড়ে ঢেকে রাখে?
আলোচনাটি এই প্রশ্ন রেখেই শুরু করতে চাই। হিজাব বা বুরখা পরা নিয়ে বাদানুবাদ আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক। ধর্মকে ডিফেন্ড করার জন্য মানুষ অনেক কু-যুক্তিও হাজির করবেন। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে আমি মানতে রাজি যে, কেউ ইচ্ছে করলে হিজাব বা বুরখা পরবেন, তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে কেন রাষ্ট্র? কিন্তু একথাও তো ঠিক যে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপেই মানুষ গিলেছে, ইসলাম-এর রাজনৈতিক রূপতো সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষকে হাজারো নিয়মের নিগড়ে বেঁধে রেখেছে, যদিও দোহাই পাড়া হয়েছে পরকালে অপার শান্তির। রক্তপাত, ভয়-ভীতি আর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যদি ধর্ম বিস্তার হয়ে থাকে তাহলে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে কেন “ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ” বলে বলা হবে? আফগানিস্তানে অমুসলিম বা হিটলারের আমলে ইহুদিদের বিশেষ চিহ্ন ধারণ করার রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ছিলো কিন্তু ধর্ম দিয়ে আগাপাশতলা মুড়ে নিজেকে আলাদা করার এই প্রবণতাকে সুস্থ বলে মানতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সভ্যতা এতোটা এগিয়েছে যে, নারী নিজেকে “খোলা খাবার” আর পুরুষকে “মাছি” ভেবে কাপড়ের জালি দিয়ে ঢেকে রাখার এই চিন্তাকে হাস্যকর মনে হয়।
একজন মানুষের সঙ্গে আপনি বসে কাজ করছেন, তার সঙ্গে গল্প করছেন অথচ তাকে আপনি কখনও দেখেননি। তার উপস্থিতি আছে কিন্তু তিনি নেই, ভাষার সঙ্গে বাচনভঙ্গী ও শরীরের ভাষা, পোশাক-আশাক ইত্যাদি বিষয়গুলি জড়িত, সব মিলিয়ে একজন সম্পূর্ণ মানুষকে জানা যায়। কিন্তু যে মানুষ পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে মোড়া তাকে জানাতো দূরের কথা, তার সম্পর্কে ধারণাও তৈরি হবে কি? হয়তো বলবেন, ধারণা তৈরি হওয়ার কী দরকার?
আমার ভাবনার জবাবে একজন বলেছেন, ফ্রান্সের রাস্তায় নাকি নগ্ন হয়ে চলাফেরার অধিকার আছে! তিনি সারকোজির এই ঘোষণাকে স্ট্যান্টবাজি বলেছেন, কী আর বলবো? কিছুই বলার নেই। প্রকৃতির সন্তান বলে নিজেদের নগ্ন করে রাখায় বিশ্বাসীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে তারা দিগম্বর হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতেই পারেন কিন্তু জনগণের মাঝে নগ্ন হয়ে নামলে তাকে নিরাপত্তাকর্মীরা হয় হাজতে, নয় মানসিক চিকিৎসালয়ে নিয়ে যান। এইতো সেদিন, ফ্রেন্স ওপেন টেনিস চলাকালে এমন একজন হঠাৎ নগ্ন হয়ে নেমে গেলেন ময়দানে, ব্যস তাকে ধরে-বেঁধে সরিয়ে নেয়া হলো, নেয়ার সময় তাকে একটা কাপড় দিয়ে ঢাকাও হলো। আসলে এই সব যুক্তি দিয়ে কী হবে? এই উপলব্ধি মনে-মননে তৈরি হতে হয়, কারো মগজে ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। হ্যাঁ, মগজে ঢুকিয়ে দেয়াও সম্ভব, যখন মানুষ শিশু থাকে, হিজাব বা বুরখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, তাদেরকে শেখানো হয়, মাথা না ঢাকলে লম্বা চুল পরকালে সাপ হয়ে তাদেরকে দংশন করবে। কী ভয়ঙ্কর কথা, একটি শিশু বেড়ে উঠছে তার চুলকে ভয় পেয়ে। নিজের শরীরকে এভাবে ভয় পেলে তার বেড়ে ওঠাটাই যে অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে? সে শিখছে, বাইরে সমস্ত পুরুষরা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকে ধর্ষণ করার জন্য, সে জানছে সে একটি লোভনীয় ‘ডিস’, তাকে তাই ঢেকে-ঢুকে থাকতে হবে, নইলে যে কেউ তাকে খেয়ে ফেলবে। বাচ্চা বাচ্চা এই মেয়েগুলোর জন্য কষ্ট হয় খুব, তারা যে ইচ্ছে করে হিজাব পড়ছে তা নয়, তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে। এই গরমে, প্রচণ্ড গরমে হিজাবের নীচে ঘামাচিতে মেয়েটি কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু কিছুই করার নেই। ছোট্ট বেলায় পড়েছিলাম, ইঁট দিয়ে ঘাস ঢেকে রাখলে দিনে দিনে তা হলুদ হয়ে মারা যায়, আর মানুষের শরীর যদি এভাবে সূর্যালোক-বঞ্চিত থাকে তাহলে তাও কি ফ্যাকাসে হয়ে ধীরে ধীরে নানা চর্মরোগের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র হবে না? আচ্ছা শরীরের কথা বাদ দিই, মানুষের মন? শরীর যার কাপড়ের কারাগারে বন্দী, মন-তো তার কতোটা উদার হবে? এই মেয়ে শিশুটি বড় হয়ে যদি বলে সে স্বেচ্ছায় বুরখাকে বেছে নিয়েছে তাহলে তার চেয়ে বড় মিথ্যে আর দুনিয়াতে আছে কি? প্রশ্ন হলো, পৃথিবীতে ক’জন নারী স্বেচ্ছায় বুরখা পরেন আর ক’জন বাধ্য হয়ে তার খতিয়ান না থাকলেও আশেপাশের বা পরিচিতদের কথা বলতে পারি, তারা কেউই স্বেচ্ছায় এই পোশাকের কারাগার বেছে নেননি, ধর্ম দিয়ে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে।
লেবেলসমূহ:
আলোচনা,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির আলাচনা
গভীর ঘুমের কবিতা
মাসুদা ভাট্টি
পাখি ওড়ে, তার ডানা আছে, আমি পাখি নই, মানুষ, আমার ডানা নেই - আতিয়া ভাবে, ভাবতে ভাবতে ও এক সময় সিদ্ধান্তে আসে, মানুষের ডানা থাকলেও খুব বেশি কিছু হতো না; মানুষকে কেউ পাখি বলতো না।এই গভীর দর্শণের সঙ্গে আতিয়ার গত জীবনকে কেউ যদি মেলাতে যান তাহলে অনেক বড় ভুল হবে।
আতিয়া চোখেমুখে কথা বলা মেয়ে, ওকে ছোটবেলা থেকেই শুনতে হয়েছে যে, ও দেখতে খুব সুন্দরী। স্কুল পেরিয়ে কলেজে ওঠার পর পরই পাড়ায় ওকে নিয়ে নানা কথা। একেতো সুন্দরী, তার ওপর সদা হাসিমুখ, যে ডাকে তার সঙ্গে হেসে কথা বলে, বাছ-বিচার নেই, তাকে নিয়ে কথা রটবে নাতো কি হবে? ও দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে, ও কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, ও রিক্সাওয়ালার সঙ্গে গল্প করে, সেই গল্পের আসলে কোনও মা-বাপ নেই। শুধুই গল্প। কাউকে না পেলে ওদের মফস্বল শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো হাওয়ার গলায় দড়ি বেঁধে বসিয়ে তার সঙ্গে পারলে গল্প করে।
ওর বলার কথার অভাব নেই, কখনও হয় না। ওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “কী রে আতিয়া, সকালে কি দিয়ে ভাত খেলি?” আতিয়া না ভেবেই বলবে, “সকালে উঠতে আজ দেরি হয়েছেগো খুব, মা বকাবকি করে তুললেন, তারপর, মুখ ধুলাম, কী যে বাজে একটা পেস্ট এনেছে না আমাদের নিমু, বেচারাই বা কি করবে? বাজার থেকে তো সহজে পয়সা মারতে পারে না, আর ওকে তো একটা ফুটো পয়সাও কেউ হাতে তুলে দেবে না, তাই বাজার থেকেই দু’চার পয়সা যা হোক মেরে মার্বেল গুলি কিংবা পুরি-সিঙাড়া খায়, এইতো সেদিন নিমুকে নিখিল ওর দোকানে রেখে দিতে চাইলো। নিমু এসে মাকে বললো, খালাম্মা, আমি আর থাকতাম না আপনেগো বাড়িত। মা মুখ ব্যাজার করে জিজ্ঞেস করলেন, ক্যানরে নিমু? থাকবি না কই যাবি? বোকা নিমু ফর ফর করে নিখিলের দোকানে ওর নতুন চাকরির কথা মাকে বলে দিলো। আর যায় কোথায়, মা তখনই বাবাকে বলে নিখিলের দোকানে পাঠালেন। বাবা কিছুক্ষণ পরেই নিখিলকে সঙ্গে করে এলেন বাড়িতে, নিখিল এসে মাকে বলে, মাসিমা ডেকেছেন আমায়? মা কি সহজে নিখিলের সঙ্গে কথা বলে? নিখিল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলে, আমায় ক্ষমা করেন মাসিমা, আমার ভুল হয়ে গেছে, এরকম আর হবে না মাসিমা, নিমুকে দিয়ে এইবার ধোয়া কাপড়গুলো আমার দোকানে পাঠিয়ে দেবেন মাসিমা, আমি ইস্ত্রী করে দেবো, পয়সা দিতে হবে না, আপনি যে মাফ করলেন তার প্রমাণ। নিখিলটা কি বোকা, মাকে চেনে না, মায়ের রাগ কি থাকতো নাকি? কিছুক্ষণ পরেই পড়ে যেতো” – এ পর্যন্ত বলে আতিয়া দম নেয় একটু, তারপর যখন নুতন শক্তিতে শুরু হয় তখন প্রশ্নকারীর ধৈর্যকে সত্যিই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অবাক বিস্ময়ে আতিয়ার চোখের দিকে, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করা থাকে না। নাতি-ফর্সা মুখে টানা টানা গভীর চোখ দু’টো তখন সামনের মানুষটিকে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়, মানুষটি তখন রাগ আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি অনেকক্ষণ থমকে থাকে, থাকতে বাধ্য হয়।
জেলা শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স শেষ করার মাস খানেকের মাথায়ই বিয়ে হয়ে যায় আতিয়ার। এতো মানুষের সঙ্গে কথা বলা শেষে ভালোবেসে বিয়ে করে আতিয়া খোকনকে। ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা, হৃষ্টপুষ্ট শরীরের খোকনকে খেলোয়াড়দের মতো দেখালেও আসলে সে কবি। জীবনে কোনওদিন ফুটবলে পা লাগিয়েছে কি না সন্দেহ, লাগালেও স্কুল পেরোনোর আগে যখন ছেলে কিংবা মেয়ে, যে কেউই পায়ের কাছে ফুটবল পেলে তাতে একটা লাত্থি মেরে দ্যাখে, কতোদূর যায়। খোকন কম কথা বলা বেশ ভার ভারিক্কি মানুষ। কিন্তু আতিয়ার সঙ্গে ওর ভাব-ভালোবাসা হওয়ার মূল কারণ, আতিয়ার ছট্ফটে কথা বলা স্বভাবটিই খোকনকে আকৃষ্ট করেছে। খোকন এই স্বীকারোক্তি বহুজনের কাছেই করেছে, ওরা যে সংগঠনটি করেছিল সেই জেলা শহরের বেশিরভাগ সংস্কৃতিমনা তরুণ-তরুণীদের নিয়ে, যার নামটাও খোকনেরই দেয়া, অনিকেত – সবাই জানতো খোকন কেন আতিয়াকে ভালোবাসে। খোকন পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স শেষ করেই একটা চাকরি পেয়েছে ঢাকায়, তখনই আতিয়ারও অনার্স শেষ হলো, বিয়েটাও হলো। ওরা চমৎকার সংসার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এলো।মোহম্মদপুরের ছোট্ট বাসাটি ওদের দু’জনেরই বেশ পছন্দ, বেশ খানিকটা ভেতরে রিক্সা দিয়ে আসতে হয় যদিও, তারপরও জানালা দিয়ে অনেকখানি খোলা জায়গা, বর্ষায় ভরা জল ছুঁয়ে আসা উদাম হাওয়া, সব মিলিয়ে দারুণ।
খোকন অফিসে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে লোডশেডিং নিয়ে। ও ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই লোডশেডিং, প্রতিদিনকার এই ঘটনায় আতিয়ার একটি কথা প্রায়ই মনে হয়, ও কি খোকনের চেহারা ভুলে যাচ্ছে? অন্যদিকে খোকন তার নতুন চাকরি নিয়ে মহা ঝামেলায়, বাংলাদেশে কর্পোরেট সংস্কৃতির শুরুর দিকটা, অফিসের বসদের গোয়ার্তুমি সামলে, সারাদিন স্যার স্যার করে তিক্ত-বিরক্ত খোকন ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত ভালোই হতো, তার ওপর আবার ছুটির দিনেও তাকে মাঝে মাঝে অফিস করতে হতো। ঠিক সেই সময় ওর মাথায় আতিয়াকে সময় দেয়ার ব্যাপারটা ঠিক আসতো না।পদার্থ বিদ্যার ছাত্র খোকনকে আবার এমবিএ-টা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ওর বস। খোকন খেয়ে না খেয়ে, অফিস সামলে এমবি-এ করে যাচ্ছিলো।বাড়ি ফিরে বিছানায় পড়ে ঘুমোনো আর মাঝে মধ্যে ছুটির দিনে বাড়ি থাকলে বই মুখে করে বসে থাকা খোকনকে তখন আর কবি হিসেবে চেনা যেতো না। একসময় খোকনের কবিতা ছাপা হতো জাতীয় দৈনিকগুলির সাহিত্য পাতায়, তখন ওর সাহিত্য-সাময়িকীর বিরোধী বন্ধুরা ওকে যখন-তখন আঘাত করতো কিন্তু এখন যখন ওর কবিতা ছাপাই হয় না কোথাও, তখন কিন্তু কেউ একবারও জানতে চায়নি, “কিরে শ্লা, তোর কবিতা ছাপায় না ক্যান কেউ আর আজকাল?”
খোকনের ভেতর এই না করা প্রশ্ন নিয়ে কোনও অভিমান নেই, একদমই নেই। কিন্তু আতিয়ার আছে। আতিয়ার অভিমান সারাদিন ঘরভর্তি হু হু করা বাতাসের ভেতর হামলে ফেরে, আতিয়া সকালে ওঠে, খোকনের জন্য নাশ্তা বানায়, বানাতে বানাতে কথা বলে নিজের মনে, খোকন তখনও বিছানায়, ঘড়িতে দেয়া এ্যালার্ম বেজে উঠবে যে কোনও মুহূর্তে। তার সেই মুহূর্ত থেকে ঘড়ি ধরে মাত্র কুড়ি মিনিট আতিয়ার হাতে, তাই ও আগে ভাগে উঠেই নাশ্তা বানাতে শুরু করে। নাশ্তা আর কি? রুটি, ডিম কিংবা আলু ভাজা, আগের রাতের অবশিষ্ট তরকারির ঝোলটা আরও একটু জাল দিয়ে কমিয়ে মাখা মাখা করে বাটিতে ঢেলে দেয়া, খোকনের সবচেয়ে পছন্দের এই খাবারটা। খবরের কাগজ সামনে নিয়ে খোকন তার বড় বড় চোখে পলক না ফেলে একটু একটু করে রুটি ছিঁড়ে তরকারি মাখিয়ে মুখে দেয়, আর চিবিয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আতিয়া বলে, “আমি ভর্তি হতে চাই, মাস্টার্সটা শুরু করবো। কী সে করবো ভাবছি”।
খোকন তখনও খাচ্ছে, ওর দৃষ্টি সংবাদপত্রের পাতায়। এপাশ থেকে আতিয়া সংবাদপত্রের প্রথম পাতা আর শেষ পাতা দেখতে পাচ্ছে। ওর মনে হলো, খবরের কাগজের পাতায় লম্বা একটা লাইন চলে গেছে, টেলিভিশনে যেমন খবর দেখানোর সময় নীচ দিয়ে লেখা চলে যায় সেরকম। আতিয়া তাকিয়ে আছে, পড়া যাচ্ছে না কেন লাইনগুলো? আতিয়া মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ, ততোক্ষণে খোকনের খাওয়া শেষ। খোকন উঠে গ্যালো। বাথরুমে গিয়ে আবার দাঁত ব্রাশ করলো, খাবারের পর দাঁত ব্রাশ করা খোকনের দীর্ঘদিনের অভ্যেস। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে শোবার ঘরে ঢুকে গেলো, মিনিট খানেকের মধ্যে অফিসের পোশাক পরে খোকন আতিয়ার ঘাঁড়ের কাছে, ব্লাউজের বাইরে বেরিয়ে থাকা পিঠ, ঘাঁড়ের অনেকটা, খোকন সেখান মুখ নামিয়ে বলে, “আসি বউ।পাশের বাসার কাজের ছেলেটাকে দিয়ে বাজারটা করিয়ে নিও। টাকা রাখা আছে টেবিলের ড্রয়ারে”। আতিয়া মুখ তুলে কিছু বলার আগেই খোকন দরোজার কাছে, হালকা ক্রীম রঙের শার্ট আর ধূসর ট্রাউজারের সঙ্গে কালো জুতো, টাইটা আরেকটু উজ্জ্বল হলে ভালো হতো, আতিয়ার মনে হয় কথাটা যখন খোকন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছে। আতিয়া তখনও ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে, সামনে রুটি, ডিমভাজা, বাসি তরকারি। আতিয়ার দিন শুরু হলো এবার।
খাও।খাও না, বসে আছো ক্যানো?
না আমি খাবো না।খেতে ইচ্ছে করছে না।
ক্যানো? শরীর খারাপ লাগছে?
নাহ্ আমার শরীর ঠিকই আছে।
তাহলে?
খাবো না, খাবো না, আমার ইচ্ছে – আতিয়া চেঁচিয়ে ওঠে।
এভাবে চেঁচায় না মনা, পাশের ফ্ল্যাট থেকে লোক শুনতে পাবে যে, কী বলবে তখন ওরা বলো তো? ভাববে না, নতুন বিয়ে করলে কি হবে? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একদম ভাব-ভালোবাসা নেই?
ভাবুকগে, আমার কী আসে যায়?
তোমার কিচ্ছু এসে যায় না? আমার চোখে তাকিয়ে বলো তো?
এই তো, তোমার চোখের দিকে তাকিয়েই বলছি, আমার কিচ্ছু এসে যায় না।
তুমি মিথ্যে বলছো। দেখিতো আমাকে ছুঁয়ে বলো তো? এই নাও, আমার হাত ধরো, ধরো না।
নাহ্ ধরবো না।
তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে যে, আমি যখনই হাত চাইবো, দেবে, কখনও না করবে না।
আমি সেসব ভুলে গেছি। স..ব ভুলে গেছি।
না তুমি ভোলোনি, তুমি ভুলতে পারোই না। আচ্ছা তোমার মনে আছে আমরা যে পদ্মার পারে বেড়াতে যেতাম, অনেকক্ষণ ধরে হাঁটতাম, তুমি সারাক্ষণ শুধু কথা বলতে, আমি বলতাম, এই কথা বলো না, একটু চুপ করে থেকে এই ধুসর সৌন্দর্য দ্যাখো। তুমি শুনতে না। তুমি কথাই বলে যেতে। আমি অবশ্য তোমার চেয়ে তোমার কথাকেই বেশি ভালোবাসি, জানো তো?
না তুমি বাসো না, তুমি কিছুই ভালোবাসো না, না আমাকে, না আমার কথাকে। কতোদিন হয়েছে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না, বলোতো?
কেন প্রতিদিনই তো বলি। কিন্তু প্রতিদিনই একটি কথা বলে আমাকে কষ্ট দাও। ক্যানো দাও বলোতো?
আমি তো এই কথা আজ নতুন করে বলছিনে, আমি তো সেই কবে থেকেই তোমাকে বলেছি, তুমিই না শোনো না। তোমার মনে আছে, কবে আমি প্রথম তোমাকে কথাটা বলেছিলাম?
হ্যাঁ, আছে, খুব আছে।
কবে বলোতো?
কেন ওই যে একবার ভরা বর্ষায় আমরা কলেজ থেকে বেরিয়ে পদ্মা দেখতে গেলাম। কী ভয়ঙ্কর পানির চাপ, ঘূর্ণি, ঘোলা পানি ফুলে ফুলে উঠছে। তুমি আমার হাত চেপে ধরলে ভয়ে, সেই প্রথম তোমাকে ছুঁতে পারলাম আমি। আমি আনন্দে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলাম, আর তুমি হঠাৎ করেই আমায় বললে, “এ্যাই চলো না ঝাঁপ দেই, এই যে ঘূর্ণিটা আসছে আমাদের দু’জনকেই টেনে নিয়ে যাবে, আমরা আর উঠতে পারবো না, কী মজা হবে ভেবে দ্যাখো তো?” আমার কেমন যেনো ভয় করছিলো তোমার কথা শুনে। আমি এক টানে তোমাকে সরিয়ে আনলাম পানির কাছ থেকে। তোমার সে কি মন খারাপ হলো, তুমি একটানা তিন দিন আমার সঙ্গে কথা বললে না।
আমি খারাপ কি বলেছিলাম? ভরা বর্ষায় পদ্মার ওই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে তোমার ইচ্ছে করেনি মরে যেতে? ঝাঁপ দিতে? আমার তো ওই যে পদ্মা থেকে বেরিয়ে আসা খালে যে স্লুইস গেইটটা ছিল, বর্ষায় যেখানে জলের শব্দে শরীরে হিম ধরতো সেখানেও ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করতো। তোমাকে তো বলেওছি, কি বলিনি?
হ্যাঁ, বলেছো। কিন্তু কেন? কেন বলোতো? ওহ্, এই সময় আবার কে এলো? যাও তো দেখে এসো।
কে আবার? পাশের বাসার কাজের ছেলেটা, বাজারে যাচ্ছে হয়তো, যাবার আগে জেনে যাচ্ছে, আমাদের কিছু লাগবে কি না?
ওহ্ হ্যা, যাও না লক্ষ্মিটি, ওই যে ড্রয়ারে টাকা আছে, ওখান থেকে ওকে দিয়ে আসো, আর বলে দাও যা যা আনতে হবে। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, আমার না, তোমাকে ছাড়া কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় তোমাকে সামনে বসিয়ে সারাক্ষণ কথা বলি। যাও যাও সোনা।
যাচ্ছি, তুমি একটু বসো। ওহ্ কী আনতে বলবো ওকে? কী কী খাবে আজ?
আজ একটু ভালোমন্দ রান্না হোক না হয়, কী বলো? ইলিশ মাছ পাবে কি না কে জানে? বলে দেখো তো। আর কচু শাক আনতে বলো, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রান্না করবে।হেলেঞ্চা শাকও পারলে, ডাল বেটে বড়া ভাজবে। একটা নারকোল আনতে বলে দাও, বুটের ডাল নারকোল দিয়ে খাওয়া হয় না অনেকদিন। এ্যাই তুমি চালকুমড়ো ভেজে শর্ষে বাটা দিয়ে মাখতে পারবে, ইস্ আমার জিভে জল আসছে। তুমি তাড়াতাড়ি যাও, আজ এসবই আনতে বলে দাও। বেচারা এখনও দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়। ওকে কিন্তু আজ দশটা টাকা দিও।
সে তোমাকে আর বলতে হবে না। ওকে আমি প্রায়ই দিই। ভয় লাগে কখন না পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি আবার রেগেটেগে যান। তার কাজের ছেলেকে দিয়ে বাজার করাই, টাকা পয়সা দিলে যদি আবার ভাবেন ভাগিয়ে নিয়ে আসতে চাইছি। আমার ভয় লাগে।
না, এরকম হয়তো ভাববে না। ওরাইতো বলেছেন তোমাকে ছেলেটাকে দিয়ে বাজার-টাজার করানোর জন্য, তাই না?
হ্যাঁ, তা বলেছেন অবশ্য।
তাহলে আর কি!
এই জানো ছেলেটা কি বললো?
কী?
বললো, “ভাবি, ঘরে কে? কার সঙ্গে কথা কন?” আমি বললাম, খবরদার, কাউকে বলিস না। আমার এক পুরুষ বন্ধু আসছে। বলবি না বল্ কাউকে? তোকে দশ টাকা বখশিস দিলাম আজ, ঠিক আছে? ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে গেলো।
তুমি কি পাগল হয়েছো?
কেনো?
আরে বাবা ছেলেটা একদিন না একদিন এই কথা মুখ ফস্কে বলে দেবে কাউকে আর সবাই তোমাকে সন্দেহ করতে শুরু করবে।
করলে করুক। তাও কিছু একটা করুক। এখন তো কিছুই হয় না। তাও মানুষ আমাকে নিয়ে কথা বলতে পারবে একটু।
তুমি না, তোমার এই পাগলামি তোমাকে কাঁদাবে একদিন, বুঝলে?
তুমি না কাঁদালেই হলো।এ্যাই চলো না, বারান্দায় গিয়ে বসি, বসবে?
চলো। তুমি গাছগুলোতে পানি দাও, আমি বসে বসে তোমায় দেখি।
জানো, একটা বেলি ফুলের গাছটা, যেটা ফরিদপুর থেকে আসার সময় আমাদের বাগান থেকে তুলে এনেছিলাম, এখন অনেক ফুল দিচ্ছে। বেলি ফুল সাদা হয় না? এটার রং গোলাপি।
ইস্ আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে, আমিই না বললাম এই গোলাপি রঙের কথা, ভুলে গেলে?
তুমি বলেছিলে নাকি? জানো, আজকাল না আমার কিছুই মনে থাকে না।
তা থাকবে কেন? ঘরের ভেতর কাকে নিয়ে এসে সারাদিন গল্প করো, আমার কথা মনে থাকবে কেন?
চুপ করবে? আমিতো দুষ্টুমি করেছি ছেলেটার সঙ্গে। আচ্ছা শোনো, তোমার কবিতা শুনিনি অনেকদিন। শোনো আজ?
অবশ্যই শোনাবো, তবে এখন নয়।
কখন?
রাতে খেয়ে-দেয়ে, বাতি নিবিয়ে, শুয়ে শুয়ে, তোমাকে জড়িয়ে ধরে, কবিতা শোনাবো আজ।
তুমি তো বিছানায় ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়ো।
না, আজ ঘুমুবো না। প্রমিস।
সত্যিই তো।
অবশ্যই, তোমাকে একদম তরতাজা কবিতাটি শোনাবো, তোমাকে নিয়েই লেখা। এখনও কোনও কাগজে দেইনি।
আমি কিন্তু জীবনানন্দও শুনতে চাই, শোনাবে?
হুঁ শোনাবো, তোমাকে শোনাবো নাতো কাকে শোনাবো মনা?
ইস্ লক্ষ্মি আমার, তুমি আমার মনা পাখি।
তুমি আমার পাখি।এ্যাই আবার বেল বাজে। এবার কে? তোমার সেই লোকটা নয় তো?
না অসভ্য, এবারও ছেলেটাই, বাজার নিয়ে এসেছে। তোমার পছন্দের সব কিছু এনেছে, আমি যাই দরোজা খুলে দেই গিয়ে। তুমি এখানেই বসো প্লিজ। আমি আসছি।
আচ্ছা, কী আর করা, মহারাণীর জন্য বসে না থেকে উপায় কি? আমার কি আর যাওয়ার জায়গা আছে? মহারাণী ছাড়া। এই অধমকে কৃপা করে কখন মহারাণী দ্যাখা দেবেন, তার ওপর ভরসা করা ছাড়া গতি কি?
ইস্ কী কথা, যাও, চুপ করে বসো।
যো হুমুক মালিকৃ ওহ্ নো নো মালকিন।
শোনো এক কাজ করো, রান্না ঘরে চলে এসো। আমি রান্না করবো, তুমি দেখবে। ঠিক আছে?
জ্বি, মালকিন।
আতিয়া রান্না করে, ইলিশ মাছ অনেক পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মাখা ঝোল; কাঁটাকুটি দিয়ে কচু শাক; আঁধখানা চাঁদের মতো করে চালকুমড়ো কেটে সব মশলা একটু একটু করে মেখে ডুবো তেলে ভেজে তারপর অনেক রসুন আর শুকনো মরিচ মিশিয়ে বাটা শর্ষে দিয়ে মেখে সাজিয়ে রাখে বাটিতে; মুগের ডাল করে মুচমুচে করে আলু ভাজা ফোড়ন দিয়ে; আর ডাল বেটে রাখে রসুন আর কাঁচা মরিচ দিয়ে, হেলেঞ্চা শাকের বড়া করে দেবে খাবার টেবিলে দেয়ার আগে। তারপর নিজে গোসল করতে যায়, ততোক্ষণে অবশ্য সন্ধ্যা হয় হয়। জানালা দিয়ে ঢাকা রক্ষা বাঁধ দেখা যায় বলে ওর ধারণা।তার থেকেও অনেকখানি দূরে সূর্য অস্ত যায়।
এ্যাই, এখন খাবে?
এখনই, মাত্র তো সন্ধ্যে হলো। একটু পরেই খাই, তোমার কি ক্ষিদে পেয়েছে?
না না, পাগল নাকি? তোমাকে রেখে আমি কখনও খেয়েছি?
তা খাওনি, কিন্তু তোমার ক্ষিদে পেতে পারে না? সকালে তো সেই এক খানা রুটি খেয়েছো। সারাদিনতো কিছুই মুখে দিতে দেখলাম না।
আমার অতো খেতে হয় না, তোমার সঙ্গেই বসে খাবো।
ঠিক আছে ম্যাডাম, আমার সঙ্গেই না হয় খাবেন। দেখুনতো ক’টা বাজলো?
এইতো, সাড়ে আট।
তাই? তাহলে আর আধ ঘন্টা। আসছি। তুমি টিভি দ্যাখো, আমি আসছি। ওক্কে?
ঠিক আছে।
টিভিতে নাটকটি শেষের পর্যায়ে, দরোজায় তখনই ঘন্টা বাজলো। আতিয়া উঠে গিয়ে দরোজা খুলে দিলো। ঘাম চকচকে মুখে খোকন ঘরে ঢুকেই টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে গ্লাশে পানি নিয়ে ঢক্ ঢক্ করে খেলো। পানি খেতে খেতেই বললো, “এই খেতে দেবে, প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়েছে”।
আতিয়া খাবার টেবিলে খাবার সাজালো, খোকন অফিসের কাপড় ছেড়ে, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে ওর পছন্দের সব আয়োজন দেখে খুশি হলো। হুড়মুড় করে খেলো। খাওয়া শেষ হলে হাত মুছতে মুছতে শোবার ঘরের দিকে হাঁটা দিতেই লোডশেডিং।অন্ধকার হাতড়ে ও বিছানায় চলে গেলো। আতিয়া মোম বাতি ধরিয়ে খাবার টেবিল গুছিয়ে, বেঁচে যাওয়া খাবার-দাবার ফ্রিজে রেখে, দাঁত ব্রাশ করে বিছানায় এলো। তখনও লোডশেডিং, বিছানায় ওঠার আগে মোমবাতি নিবিয়ে দিলো। তারপর খোকনের পাশে শুয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলে, “কবিতাটা শোনাও, তুমি প্রমিস করেছো আজ”।
খোকন তখন গভীর ঘুমে। আঁধারে সেই ঘুম দ্যাখা যায় না, আতিয়া অনুভব করতে পারে পাশের ঘুমন্ত মানুষটিকে।
সকালে অফিস যাওয়ার আগে নাশ্তার টেবিলে আগের রাতের বাসি তরকারি দিয়ে খোকন রুটি খায়, সামনে খবরের কাগজ, আতিয়া সামনে বসে বলে, “আমি ভর্তি হতে চাই, মাস্টার্সটা করতে চাই”। খোকন তখনও খবরের কাগজের ভেতরের পাতায়, আতিয়ার সামনে প্রথম ও শেষ পাতা, আর সেখানে একটি লাইন টিভির পর্দায় খবরের সময় যেমন ভেসে যেতে থাকে, তেমনই ভেসে যায়।
পাখি ওড়ে, তার ডানা আছে, আমি পাখি নই, মানুষ, আমার ডানা নেই - আতিয়া ভাবে, ভাবতে ভাবতে ও এক সময় সিদ্ধান্তে আসে, মানুষের ডানা থাকলেও খুব বেশি কিছু হতো না; মানুষকে কেউ পাখি বলতো না।এই গভীর দর্শণের সঙ্গে আতিয়ার গত জীবনকে কেউ যদি মেলাতে যান তাহলে অনেক বড় ভুল হবে।
আতিয়া চোখেমুখে কথা বলা মেয়ে, ওকে ছোটবেলা থেকেই শুনতে হয়েছে যে, ও দেখতে খুব সুন্দরী। স্কুল পেরিয়ে কলেজে ওঠার পর পরই পাড়ায় ওকে নিয়ে নানা কথা। একেতো সুন্দরী, তার ওপর সদা হাসিমুখ, যে ডাকে তার সঙ্গে হেসে কথা বলে, বাছ-বিচার নেই, তাকে নিয়ে কথা রটবে নাতো কি হবে? ও দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে, ও কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, ও রিক্সাওয়ালার সঙ্গে গল্প করে, সেই গল্পের আসলে কোনও মা-বাপ নেই। শুধুই গল্প। কাউকে না পেলে ওদের মফস্বল শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো হাওয়ার গলায় দড়ি বেঁধে বসিয়ে তার সঙ্গে পারলে গল্প করে।
ওর বলার কথার অভাব নেই, কখনও হয় না। ওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “কী রে আতিয়া, সকালে কি দিয়ে ভাত খেলি?” আতিয়া না ভেবেই বলবে, “সকালে উঠতে আজ দেরি হয়েছেগো খুব, মা বকাবকি করে তুললেন, তারপর, মুখ ধুলাম, কী যে বাজে একটা পেস্ট এনেছে না আমাদের নিমু, বেচারাই বা কি করবে? বাজার থেকে তো সহজে পয়সা মারতে পারে না, আর ওকে তো একটা ফুটো পয়সাও কেউ হাতে তুলে দেবে না, তাই বাজার থেকেই দু’চার পয়সা যা হোক মেরে মার্বেল গুলি কিংবা পুরি-সিঙাড়া খায়, এইতো সেদিন নিমুকে নিখিল ওর দোকানে রেখে দিতে চাইলো। নিমু এসে মাকে বললো, খালাম্মা, আমি আর থাকতাম না আপনেগো বাড়িত। মা মুখ ব্যাজার করে জিজ্ঞেস করলেন, ক্যানরে নিমু? থাকবি না কই যাবি? বোকা নিমু ফর ফর করে নিখিলের দোকানে ওর নতুন চাকরির কথা মাকে বলে দিলো। আর যায় কোথায়, মা তখনই বাবাকে বলে নিখিলের দোকানে পাঠালেন। বাবা কিছুক্ষণ পরেই নিখিলকে সঙ্গে করে এলেন বাড়িতে, নিখিল এসে মাকে বলে, মাসিমা ডেকেছেন আমায়? মা কি সহজে নিখিলের সঙ্গে কথা বলে? নিখিল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলে, আমায় ক্ষমা করেন মাসিমা, আমার ভুল হয়ে গেছে, এরকম আর হবে না মাসিমা, নিমুকে দিয়ে এইবার ধোয়া কাপড়গুলো আমার দোকানে পাঠিয়ে দেবেন মাসিমা, আমি ইস্ত্রী করে দেবো, পয়সা দিতে হবে না, আপনি যে মাফ করলেন তার প্রমাণ। নিখিলটা কি বোকা, মাকে চেনে না, মায়ের রাগ কি থাকতো নাকি? কিছুক্ষণ পরেই পড়ে যেতো” – এ পর্যন্ত বলে আতিয়া দম নেয় একটু, তারপর যখন নুতন শক্তিতে শুরু হয় তখন প্রশ্নকারীর ধৈর্যকে সত্যিই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অবাক বিস্ময়ে আতিয়ার চোখের দিকে, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করা থাকে না। নাতি-ফর্সা মুখে টানা টানা গভীর চোখ দু’টো তখন সামনের মানুষটিকে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়, মানুষটি তখন রাগ আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি অনেকক্ষণ থমকে থাকে, থাকতে বাধ্য হয়।
জেলা শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স শেষ করার মাস খানেকের মাথায়ই বিয়ে হয়ে যায় আতিয়ার। এতো মানুষের সঙ্গে কথা বলা শেষে ভালোবেসে বিয়ে করে আতিয়া খোকনকে। ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা, হৃষ্টপুষ্ট শরীরের খোকনকে খেলোয়াড়দের মতো দেখালেও আসলে সে কবি। জীবনে কোনওদিন ফুটবলে পা লাগিয়েছে কি না সন্দেহ, লাগালেও স্কুল পেরোনোর আগে যখন ছেলে কিংবা মেয়ে, যে কেউই পায়ের কাছে ফুটবল পেলে তাতে একটা লাত্থি মেরে দ্যাখে, কতোদূর যায়। খোকন কম কথা বলা বেশ ভার ভারিক্কি মানুষ। কিন্তু আতিয়ার সঙ্গে ওর ভাব-ভালোবাসা হওয়ার মূল কারণ, আতিয়ার ছট্ফটে কথা বলা স্বভাবটিই খোকনকে আকৃষ্ট করেছে। খোকন এই স্বীকারোক্তি বহুজনের কাছেই করেছে, ওরা যে সংগঠনটি করেছিল সেই জেলা শহরের বেশিরভাগ সংস্কৃতিমনা তরুণ-তরুণীদের নিয়ে, যার নামটাও খোকনেরই দেয়া, অনিকেত – সবাই জানতো খোকন কেন আতিয়াকে ভালোবাসে। খোকন পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স শেষ করেই একটা চাকরি পেয়েছে ঢাকায়, তখনই আতিয়ারও অনার্স শেষ হলো, বিয়েটাও হলো। ওরা চমৎকার সংসার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এলো।মোহম্মদপুরের ছোট্ট বাসাটি ওদের দু’জনেরই বেশ পছন্দ, বেশ খানিকটা ভেতরে রিক্সা দিয়ে আসতে হয় যদিও, তারপরও জানালা দিয়ে অনেকখানি খোলা জায়গা, বর্ষায় ভরা জল ছুঁয়ে আসা উদাম হাওয়া, সব মিলিয়ে দারুণ।
খোকন অফিসে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে লোডশেডিং নিয়ে। ও ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই লোডশেডিং, প্রতিদিনকার এই ঘটনায় আতিয়ার একটি কথা প্রায়ই মনে হয়, ও কি খোকনের চেহারা ভুলে যাচ্ছে? অন্যদিকে খোকন তার নতুন চাকরি নিয়ে মহা ঝামেলায়, বাংলাদেশে কর্পোরেট সংস্কৃতির শুরুর দিকটা, অফিসের বসদের গোয়ার্তুমি সামলে, সারাদিন স্যার স্যার করে তিক্ত-বিরক্ত খোকন ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত ভালোই হতো, তার ওপর আবার ছুটির দিনেও তাকে মাঝে মাঝে অফিস করতে হতো। ঠিক সেই সময় ওর মাথায় আতিয়াকে সময় দেয়ার ব্যাপারটা ঠিক আসতো না।পদার্থ বিদ্যার ছাত্র খোকনকে আবার এমবিএ-টা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ওর বস। খোকন খেয়ে না খেয়ে, অফিস সামলে এমবি-এ করে যাচ্ছিলো।বাড়ি ফিরে বিছানায় পড়ে ঘুমোনো আর মাঝে মধ্যে ছুটির দিনে বাড়ি থাকলে বই মুখে করে বসে থাকা খোকনকে তখন আর কবি হিসেবে চেনা যেতো না। একসময় খোকনের কবিতা ছাপা হতো জাতীয় দৈনিকগুলির সাহিত্য পাতায়, তখন ওর সাহিত্য-সাময়িকীর বিরোধী বন্ধুরা ওকে যখন-তখন আঘাত করতো কিন্তু এখন যখন ওর কবিতা ছাপাই হয় না কোথাও, তখন কিন্তু কেউ একবারও জানতে চায়নি, “কিরে শ্লা, তোর কবিতা ছাপায় না ক্যান কেউ আর আজকাল?”
খোকনের ভেতর এই না করা প্রশ্ন নিয়ে কোনও অভিমান নেই, একদমই নেই। কিন্তু আতিয়ার আছে। আতিয়ার অভিমান সারাদিন ঘরভর্তি হু হু করা বাতাসের ভেতর হামলে ফেরে, আতিয়া সকালে ওঠে, খোকনের জন্য নাশ্তা বানায়, বানাতে বানাতে কথা বলে নিজের মনে, খোকন তখনও বিছানায়, ঘড়িতে দেয়া এ্যালার্ম বেজে উঠবে যে কোনও মুহূর্তে। তার সেই মুহূর্ত থেকে ঘড়ি ধরে মাত্র কুড়ি মিনিট আতিয়ার হাতে, তাই ও আগে ভাগে উঠেই নাশ্তা বানাতে শুরু করে। নাশ্তা আর কি? রুটি, ডিম কিংবা আলু ভাজা, আগের রাতের অবশিষ্ট তরকারির ঝোলটা আরও একটু জাল দিয়ে কমিয়ে মাখা মাখা করে বাটিতে ঢেলে দেয়া, খোকনের সবচেয়ে পছন্দের এই খাবারটা। খবরের কাগজ সামনে নিয়ে খোকন তার বড় বড় চোখে পলক না ফেলে একটু একটু করে রুটি ছিঁড়ে তরকারি মাখিয়ে মুখে দেয়, আর চিবিয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আতিয়া বলে, “আমি ভর্তি হতে চাই, মাস্টার্সটা শুরু করবো। কী সে করবো ভাবছি”।
খোকন তখনও খাচ্ছে, ওর দৃষ্টি সংবাদপত্রের পাতায়। এপাশ থেকে আতিয়া সংবাদপত্রের প্রথম পাতা আর শেষ পাতা দেখতে পাচ্ছে। ওর মনে হলো, খবরের কাগজের পাতায় লম্বা একটা লাইন চলে গেছে, টেলিভিশনে যেমন খবর দেখানোর সময় নীচ দিয়ে লেখা চলে যায় সেরকম। আতিয়া তাকিয়ে আছে, পড়া যাচ্ছে না কেন লাইনগুলো? আতিয়া মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ, ততোক্ষণে খোকনের খাওয়া শেষ। খোকন উঠে গ্যালো। বাথরুমে গিয়ে আবার দাঁত ব্রাশ করলো, খাবারের পর দাঁত ব্রাশ করা খোকনের দীর্ঘদিনের অভ্যেস। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে শোবার ঘরে ঢুকে গেলো, মিনিট খানেকের মধ্যে অফিসের পোশাক পরে খোকন আতিয়ার ঘাঁড়ের কাছে, ব্লাউজের বাইরে বেরিয়ে থাকা পিঠ, ঘাঁড়ের অনেকটা, খোকন সেখান মুখ নামিয়ে বলে, “আসি বউ।পাশের বাসার কাজের ছেলেটাকে দিয়ে বাজারটা করিয়ে নিও। টাকা রাখা আছে টেবিলের ড্রয়ারে”। আতিয়া মুখ তুলে কিছু বলার আগেই খোকন দরোজার কাছে, হালকা ক্রীম রঙের শার্ট আর ধূসর ট্রাউজারের সঙ্গে কালো জুতো, টাইটা আরেকটু উজ্জ্বল হলে ভালো হতো, আতিয়ার মনে হয় কথাটা যখন খোকন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছে। আতিয়া তখনও ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে, সামনে রুটি, ডিমভাজা, বাসি তরকারি। আতিয়ার দিন শুরু হলো এবার।
খাও।খাও না, বসে আছো ক্যানো?
না আমি খাবো না।খেতে ইচ্ছে করছে না।
ক্যানো? শরীর খারাপ লাগছে?
নাহ্ আমার শরীর ঠিকই আছে।
তাহলে?
খাবো না, খাবো না, আমার ইচ্ছে – আতিয়া চেঁচিয়ে ওঠে।
এভাবে চেঁচায় না মনা, পাশের ফ্ল্যাট থেকে লোক শুনতে পাবে যে, কী বলবে তখন ওরা বলো তো? ভাববে না, নতুন বিয়ে করলে কি হবে? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একদম ভাব-ভালোবাসা নেই?
ভাবুকগে, আমার কী আসে যায়?
তোমার কিচ্ছু এসে যায় না? আমার চোখে তাকিয়ে বলো তো?
এই তো, তোমার চোখের দিকে তাকিয়েই বলছি, আমার কিচ্ছু এসে যায় না।
তুমি মিথ্যে বলছো। দেখিতো আমাকে ছুঁয়ে বলো তো? এই নাও, আমার হাত ধরো, ধরো না।
নাহ্ ধরবো না।
তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে যে, আমি যখনই হাত চাইবো, দেবে, কখনও না করবে না।
আমি সেসব ভুলে গেছি। স..ব ভুলে গেছি।
না তুমি ভোলোনি, তুমি ভুলতে পারোই না। আচ্ছা তোমার মনে আছে আমরা যে পদ্মার পারে বেড়াতে যেতাম, অনেকক্ষণ ধরে হাঁটতাম, তুমি সারাক্ষণ শুধু কথা বলতে, আমি বলতাম, এই কথা বলো না, একটু চুপ করে থেকে এই ধুসর সৌন্দর্য দ্যাখো। তুমি শুনতে না। তুমি কথাই বলে যেতে। আমি অবশ্য তোমার চেয়ে তোমার কথাকেই বেশি ভালোবাসি, জানো তো?
না তুমি বাসো না, তুমি কিছুই ভালোবাসো না, না আমাকে, না আমার কথাকে। কতোদিন হয়েছে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না, বলোতো?
কেন প্রতিদিনই তো বলি। কিন্তু প্রতিদিনই একটি কথা বলে আমাকে কষ্ট দাও। ক্যানো দাও বলোতো?
আমি তো এই কথা আজ নতুন করে বলছিনে, আমি তো সেই কবে থেকেই তোমাকে বলেছি, তুমিই না শোনো না। তোমার মনে আছে, কবে আমি প্রথম তোমাকে কথাটা বলেছিলাম?
হ্যাঁ, আছে, খুব আছে।
কবে বলোতো?
কেন ওই যে একবার ভরা বর্ষায় আমরা কলেজ থেকে বেরিয়ে পদ্মা দেখতে গেলাম। কী ভয়ঙ্কর পানির চাপ, ঘূর্ণি, ঘোলা পানি ফুলে ফুলে উঠছে। তুমি আমার হাত চেপে ধরলে ভয়ে, সেই প্রথম তোমাকে ছুঁতে পারলাম আমি। আমি আনন্দে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলাম, আর তুমি হঠাৎ করেই আমায় বললে, “এ্যাই চলো না ঝাঁপ দেই, এই যে ঘূর্ণিটা আসছে আমাদের দু’জনকেই টেনে নিয়ে যাবে, আমরা আর উঠতে পারবো না, কী মজা হবে ভেবে দ্যাখো তো?” আমার কেমন যেনো ভয় করছিলো তোমার কথা শুনে। আমি এক টানে তোমাকে সরিয়ে আনলাম পানির কাছ থেকে। তোমার সে কি মন খারাপ হলো, তুমি একটানা তিন দিন আমার সঙ্গে কথা বললে না।
আমি খারাপ কি বলেছিলাম? ভরা বর্ষায় পদ্মার ওই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে তোমার ইচ্ছে করেনি মরে যেতে? ঝাঁপ দিতে? আমার তো ওই যে পদ্মা থেকে বেরিয়ে আসা খালে যে স্লুইস গেইটটা ছিল, বর্ষায় যেখানে জলের শব্দে শরীরে হিম ধরতো সেখানেও ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করতো। তোমাকে তো বলেওছি, কি বলিনি?
হ্যাঁ, বলেছো। কিন্তু কেন? কেন বলোতো? ওহ্, এই সময় আবার কে এলো? যাও তো দেখে এসো।
কে আবার? পাশের বাসার কাজের ছেলেটা, বাজারে যাচ্ছে হয়তো, যাবার আগে জেনে যাচ্ছে, আমাদের কিছু লাগবে কি না?
ওহ্ হ্যা, যাও না লক্ষ্মিটি, ওই যে ড্রয়ারে টাকা আছে, ওখান থেকে ওকে দিয়ে আসো, আর বলে দাও যা যা আনতে হবে। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, আমার না, তোমাকে ছাড়া কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় তোমাকে সামনে বসিয়ে সারাক্ষণ কথা বলি। যাও যাও সোনা।
যাচ্ছি, তুমি একটু বসো। ওহ্ কী আনতে বলবো ওকে? কী কী খাবে আজ?
আজ একটু ভালোমন্দ রান্না হোক না হয়, কী বলো? ইলিশ মাছ পাবে কি না কে জানে? বলে দেখো তো। আর কচু শাক আনতে বলো, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রান্না করবে।হেলেঞ্চা শাকও পারলে, ডাল বেটে বড়া ভাজবে। একটা নারকোল আনতে বলে দাও, বুটের ডাল নারকোল দিয়ে খাওয়া হয় না অনেকদিন। এ্যাই তুমি চালকুমড়ো ভেজে শর্ষে বাটা দিয়ে মাখতে পারবে, ইস্ আমার জিভে জল আসছে। তুমি তাড়াতাড়ি যাও, আজ এসবই আনতে বলে দাও। বেচারা এখনও দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়। ওকে কিন্তু আজ দশটা টাকা দিও।
সে তোমাকে আর বলতে হবে না। ওকে আমি প্রায়ই দিই। ভয় লাগে কখন না পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি আবার রেগেটেগে যান। তার কাজের ছেলেকে দিয়ে বাজার করাই, টাকা পয়সা দিলে যদি আবার ভাবেন ভাগিয়ে নিয়ে আসতে চাইছি। আমার ভয় লাগে।
না, এরকম হয়তো ভাববে না। ওরাইতো বলেছেন তোমাকে ছেলেটাকে দিয়ে বাজার-টাজার করানোর জন্য, তাই না?
হ্যাঁ, তা বলেছেন অবশ্য।
তাহলে আর কি!
এই জানো ছেলেটা কি বললো?
কী?
বললো, “ভাবি, ঘরে কে? কার সঙ্গে কথা কন?” আমি বললাম, খবরদার, কাউকে বলিস না। আমার এক পুরুষ বন্ধু আসছে। বলবি না বল্ কাউকে? তোকে দশ টাকা বখশিস দিলাম আজ, ঠিক আছে? ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে গেলো।
তুমি কি পাগল হয়েছো?
কেনো?
আরে বাবা ছেলেটা একদিন না একদিন এই কথা মুখ ফস্কে বলে দেবে কাউকে আর সবাই তোমাকে সন্দেহ করতে শুরু করবে।
করলে করুক। তাও কিছু একটা করুক। এখন তো কিছুই হয় না। তাও মানুষ আমাকে নিয়ে কথা বলতে পারবে একটু।
তুমি না, তোমার এই পাগলামি তোমাকে কাঁদাবে একদিন, বুঝলে?
তুমি না কাঁদালেই হলো।এ্যাই চলো না, বারান্দায় গিয়ে বসি, বসবে?
চলো। তুমি গাছগুলোতে পানি দাও, আমি বসে বসে তোমায় দেখি।
জানো, একটা বেলি ফুলের গাছটা, যেটা ফরিদপুর থেকে আসার সময় আমাদের বাগান থেকে তুলে এনেছিলাম, এখন অনেক ফুল দিচ্ছে। বেলি ফুল সাদা হয় না? এটার রং গোলাপি।
ইস্ আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে, আমিই না বললাম এই গোলাপি রঙের কথা, ভুলে গেলে?
তুমি বলেছিলে নাকি? জানো, আজকাল না আমার কিছুই মনে থাকে না।
তা থাকবে কেন? ঘরের ভেতর কাকে নিয়ে এসে সারাদিন গল্প করো, আমার কথা মনে থাকবে কেন?
চুপ করবে? আমিতো দুষ্টুমি করেছি ছেলেটার সঙ্গে। আচ্ছা শোনো, তোমার কবিতা শুনিনি অনেকদিন। শোনো আজ?
অবশ্যই শোনাবো, তবে এখন নয়।
কখন?
রাতে খেয়ে-দেয়ে, বাতি নিবিয়ে, শুয়ে শুয়ে, তোমাকে জড়িয়ে ধরে, কবিতা শোনাবো আজ।
তুমি তো বিছানায় ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়ো।
না, আজ ঘুমুবো না। প্রমিস।
সত্যিই তো।
অবশ্যই, তোমাকে একদম তরতাজা কবিতাটি শোনাবো, তোমাকে নিয়েই লেখা। এখনও কোনও কাগজে দেইনি।
আমি কিন্তু জীবনানন্দও শুনতে চাই, শোনাবে?
হুঁ শোনাবো, তোমাকে শোনাবো নাতো কাকে শোনাবো মনা?
ইস্ লক্ষ্মি আমার, তুমি আমার মনা পাখি।
তুমি আমার পাখি।এ্যাই আবার বেল বাজে। এবার কে? তোমার সেই লোকটা নয় তো?
না অসভ্য, এবারও ছেলেটাই, বাজার নিয়ে এসেছে। তোমার পছন্দের সব কিছু এনেছে, আমি যাই দরোজা খুলে দেই গিয়ে। তুমি এখানেই বসো প্লিজ। আমি আসছি।
আচ্ছা, কী আর করা, মহারাণীর জন্য বসে না থেকে উপায় কি? আমার কি আর যাওয়ার জায়গা আছে? মহারাণী ছাড়া। এই অধমকে কৃপা করে কখন মহারাণী দ্যাখা দেবেন, তার ওপর ভরসা করা ছাড়া গতি কি?
ইস্ কী কথা, যাও, চুপ করে বসো।
যো হুমুক মালিকৃ ওহ্ নো নো মালকিন।
শোনো এক কাজ করো, রান্না ঘরে চলে এসো। আমি রান্না করবো, তুমি দেখবে। ঠিক আছে?
জ্বি, মালকিন।
আতিয়া রান্না করে, ইলিশ মাছ অনেক পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মাখা ঝোল; কাঁটাকুটি দিয়ে কচু শাক; আঁধখানা চাঁদের মতো করে চালকুমড়ো কেটে সব মশলা একটু একটু করে মেখে ডুবো তেলে ভেজে তারপর অনেক রসুন আর শুকনো মরিচ মিশিয়ে বাটা শর্ষে দিয়ে মেখে সাজিয়ে রাখে বাটিতে; মুগের ডাল করে মুচমুচে করে আলু ভাজা ফোড়ন দিয়ে; আর ডাল বেটে রাখে রসুন আর কাঁচা মরিচ দিয়ে, হেলেঞ্চা শাকের বড়া করে দেবে খাবার টেবিলে দেয়ার আগে। তারপর নিজে গোসল করতে যায়, ততোক্ষণে অবশ্য সন্ধ্যা হয় হয়। জানালা দিয়ে ঢাকা রক্ষা বাঁধ দেখা যায় বলে ওর ধারণা।তার থেকেও অনেকখানি দূরে সূর্য অস্ত যায়।
এ্যাই, এখন খাবে?
এখনই, মাত্র তো সন্ধ্যে হলো। একটু পরেই খাই, তোমার কি ক্ষিদে পেয়েছে?
না না, পাগল নাকি? তোমাকে রেখে আমি কখনও খেয়েছি?
তা খাওনি, কিন্তু তোমার ক্ষিদে পেতে পারে না? সকালে তো সেই এক খানা রুটি খেয়েছো। সারাদিনতো কিছুই মুখে দিতে দেখলাম না।
আমার অতো খেতে হয় না, তোমার সঙ্গেই বসে খাবো।
ঠিক আছে ম্যাডাম, আমার সঙ্গেই না হয় খাবেন। দেখুনতো ক’টা বাজলো?
এইতো, সাড়ে আট।
তাই? তাহলে আর আধ ঘন্টা। আসছি। তুমি টিভি দ্যাখো, আমি আসছি। ওক্কে?
ঠিক আছে।
টিভিতে নাটকটি শেষের পর্যায়ে, দরোজায় তখনই ঘন্টা বাজলো। আতিয়া উঠে গিয়ে দরোজা খুলে দিলো। ঘাম চকচকে মুখে খোকন ঘরে ঢুকেই টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে গ্লাশে পানি নিয়ে ঢক্ ঢক্ করে খেলো। পানি খেতে খেতেই বললো, “এই খেতে দেবে, প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়েছে”।
আতিয়া খাবার টেবিলে খাবার সাজালো, খোকন অফিসের কাপড় ছেড়ে, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে ওর পছন্দের সব আয়োজন দেখে খুশি হলো। হুড়মুড় করে খেলো। খাওয়া শেষ হলে হাত মুছতে মুছতে শোবার ঘরের দিকে হাঁটা দিতেই লোডশেডিং।অন্ধকার হাতড়ে ও বিছানায় চলে গেলো। আতিয়া মোম বাতি ধরিয়ে খাবার টেবিল গুছিয়ে, বেঁচে যাওয়া খাবার-দাবার ফ্রিজে রেখে, দাঁত ব্রাশ করে বিছানায় এলো। তখনও লোডশেডিং, বিছানায় ওঠার আগে মোমবাতি নিবিয়ে দিলো। তারপর খোকনের পাশে শুয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলে, “কবিতাটা শোনাও, তুমি প্রমিস করেছো আজ”।
খোকন তখন গভীর ঘুমে। আঁধারে সেই ঘুম দ্যাখা যায় না, আতিয়া অনুভব করতে পারে পাশের ঘুমন্ত মানুষটিকে।
সকালে অফিস যাওয়ার আগে নাশ্তার টেবিলে আগের রাতের বাসি তরকারি দিয়ে খোকন রুটি খায়, সামনে খবরের কাগজ, আতিয়া সামনে বসে বলে, “আমি ভর্তি হতে চাই, মাস্টার্সটা করতে চাই”। খোকন তখনও খবরের কাগজের ভেতরের পাতায়, আতিয়ার সামনে প্রথম ও শেষ পাতা, আর সেখানে একটি লাইন টিভির পর্দায় খবরের সময় যেমন ভেসে যেতে থাকে, তেমনই ভেসে যায়।
লেবেলসমূহ:
গল্প,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির গল্প
খাঁটি মুসলমান প্রকল্প
মাসুদা ভাট্টি
আজ মারলং কাকার গল্প বলি, উনার নাম মারলং না অন্য কিছু আমি জানি না, উচ্চারণটা কেমন তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করিনি। মানুষটা লম্বায় ছ’ফুট বা তার চেয়েও বেশি হবেন। খুব ছোট্টবেলার কথা, যখন সবকিছু দেখতে বিশাল মনে হতো। মারলং কাকার গায়ের রং “পাটনাই গমের” মতোন; আমাদের ওদিকে কেউ ফর্সা হলে তাকে গমের মতো ফর্সা বলে তুলনা করা হয়। চোখে সুর্মা টানা, লম্বা আলখাল্লা পরনে, কোঁকড়া চুল, পায়ে চামড়ার চটি, সঙ্গে একটি চামরার “মিশক”-এ ভর্তি জল, একটি লম্বা ব্যাগ ভর্তি নানান সামগ্রী – মারলং কাকা আসেন, গভীর রাতে। আমরা তখন গভীর ঘুমে। সকালে উঠে দেখি, আমাদের বাড়ি ভর্তি মানুষ, মারলং কাকাকে ঘিরে বসে আছে। আমরা চোখ ডলতে ডলতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, মারলং কাকার জলদগম্ভীর স্বর, “চোখ ধুইয়ে আইসো”। আমরা দ্রুত সামনে থেকে সরে যাই, চোখ ধুতে গিয়ে, গোটা মুখ ধুয়ে ফেলি।
মারলং কাকা বছরে একবার বা দু’বার আসেন, আমাদের ওখানে। সারা বছর তিনি মক্কা-মদীনা-সিরিয়া’য় ঘোরাঘুরি করেন।তিনি আমাদের দেশে আসেন কোরআন বিলাতে। কেউ কেউ বলেন, মারলং কাকা মক্কাবাসী, কেউ বা বলেন মরোক্কান, কেউ বা বিশ্বাস করেন যে, তিনি সিরিয় বা মিশরীয়। কিন্তু মারলং কাকা যেখানেই যান বিনামূল্যে কোরআন ফেরি করার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিয়েও করেন। আমাদের গাঁয়েও তার একটি স্ত্রী ও সন্তান ছিল। তারা সারা বছর এর ওর বাড়িতে কাজ করে, কিংবা বেশিরভাগ সময়ই আমাদের বাড়িতে এসে থাকতো। আমরা মারলং কাকার স্ত্রীকে ডাকতাম “ছিরার মা”, আসলে তার ছেলেটির নাম রাখা হয়েছিল ছিরাযদ্দি, সিরাজউদ্দিন-এর গ্রাম্য উচ্চারণ। আমাদের ওখানে নাম বিকৃত করার এক অদ্ভূত প্রচলণ আমাকে আশ্চর্য করতো খুব।
যাহোক, মারলং কাকা যে বারই আসতেন, সেবারই তাকে ঘিরে আমাদের বাড়ি ভর্তি হয়ে যেতো মানুষে। কেউ আসতেন কোরআন শরীফ নিতে, কেউ বা আসতেন জল পড়া নিতে, কেউ তাবিজ-কবজ বা সুতো পড়া নিতে। আমাদের বাগানের সামনে কাচারি ঘর, সেই ঘরে মারলং কাকা জমিয়ে বসতেন। আমার বড় কাকার সঙ্গে মারলং কাকার ঘনিষ্ঠতা চরম প্রকৃতির। আমার বড় কাকার যে ছড়িটি ব্যবহার করেন, যে গুলদানি থেকে তিনি নষ্যি নেন, যে চামড়ার খড়মটি তিনি পরেন, যে রুপোর গড়গড়ায় তিনি তামাকু সেবন করেন, যে লোহার ইস্ত্রিটি দিয়ে তার পাজামা-পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করা হয় – সবই মারলং কাকার দেয়া। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো বড় কাকা নিজেও মারলং কাকারই দান বুঝি। আমাদের বাড়িতে আমার বড় কাকার কথার ওপর কথা নেই। আমার পিতা ও বাকি দু’ই খুল্লতাত বড় কাকার কথায় ওঠেন এবং বসেন। তাদের স্ত্রী’রা তো হুকুমের বা’দী।
যাহোক, বড় কাকার সঙ্গে মারলং কাকা সারাদিন বসে গুঁজগুঁজ ফুস ফুস করেন, তিনি এলে ডেক্চি ভর্তি করে রান্না হয়, খাসি জবাই হয়, মারলং কাকা মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। কাবুলিওয়ালার মিনি রামদয়াল কাক-কে “ক্যাওয়া” বলে হেসেছিল, আর আমরা হাসতাম মারলং কাকা মাছকে “মাছ্ছি” বলেন বলে। ততোদিনে যেহেতু কাবুলিওয়ালা পড়া হয়েছিল সেহেতু মারলং কাকাকে আমার কাবুলিওয়ালাই মনে হতো, মক্কী-মাদানী কিছু মনে হতো না। অবশ্য এর পেছনে আমার মায়ের কথাও কানে এসে থাকবে, সেটা একটু পরে বলছি।
মারলং কাকা থাকতেন বড় জোর তিন রাত, কোথাও নাকি তিন রাতের বেশি আতিথ্য নেয়াটা ধর্ম-বিরোধী। এই তিন দিন বাড়ি ভর্তি মানুষজন এবং সেই সঙ্গে কোরআন পাঠের আসর, মারলং কাকার বয়ান, তাও মাত্র এক সন্ধ্যা। এই সন্ধ্যার জন্য অবশ্য যে বিশাল আয়োজনটি হতো তার কথা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। কিন্তু অনেক বড় গল্পকে ছোট্ট করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায় যে, মারলং কাকার আসা উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে যে সব রান্না হতো সারা বছর এমনকি দুই ঈদেও সেরকম রান্না হতো না।
আমার স্মৃতিতে মারলং কাকা বসে আছেন চোখ বন্ধ করে, তার চারদিকে মানুষজন, বেশিরভাগই পুরুষ, আর নারীরা কেউ বাটি হাতে, কেউ সুতো হাতে কেউ বা শুধু শুধুই শরীর থেকে বাড়তি কাপড় বেড় করে তা দিয়ে মুখ ঢেকে। গ্রামের মহিলাদের এই দাঁড়ানোর ভঙ্গীটি আমাকে ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করতো। আমিও এক সময় ওইভাবে দাঁড়াতাম, ক্রমশঃ শহুরে হয়ে আমি এখন হয়তো আর ওভাবে দাঁড়াতে পারবো না। সে জন্য আমার কষ্টের সীমা নেই।
মারলং কাকার দাড়ি নেই, তার মুখ মেয়েদের মতো, মসৃন, ঠোঁট দু’টো বেশ পাতলা। চোখ বন্ধ করলেও তার সুর্মা টানা কোটরে যাওয়া চোখ দু’টোকে আমার কেন যেনো খোলা মনে হতো। যেহেতু আমাদের বাড়িতেই উনি উঠতেন সেহেতু আমরা পেতাম খেজুর, বাদাম, পেস্তা এইসব শুকনো ফল, যার মধ্যে আখরোট খেলে আমার বমি পেতো। এখনও পায়। আর সবচেয়ে খারাপ লাগতো, মারলং কাকার গাল টিপে দেয়া, প্রচণ্ড জোরে উনি গাল টিপে দিতেন, ব্যাথা পেতাম, মাকে গিয়ে বলতাম, মা বলতেন, সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না আর। কিন্তু আমাকে টানতো খুব উনার চারপাশের মানুষজন, উনাকে ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলির মুখ। সবাই আমার চেনা কিন্তু উনি এলে কেমন অচেনা মনে হতো মুখগুলো।
মারলং কাকা আসতেন চৈতালি ফসল অর্থাৎ রবিশষ্য উঠার ঠিক পরে পরে।ফালগুন শুরু হতে হতে। তখনও গরম পড়েনি তেমন, পড়বো পড়বো করছে। কেন যেনো তখন অমাবশ্যাও থাকতো, কিংবা আমার স্মৃতিতে শুধুমাত্র অন্ধকার রাতগুলির কথাই আছে। সেই সব রাতে আমার মা আমাদের তাড়াতাড়ি ঘুমুতে বলতেন। কিন্তু যেহেতু ঘুমুতে বলেছেন, তাই আমার ঘুম আসতো না। এ অভ্যেস আমার আজও গেলো না, কেউ কিছু বলেছে কি সেই কাজটি আর আমাকে দিয়ে হবে না। এমনিতে আমি সন্ধ্যে না লাগতেই ঘুমে ঢলতাম।আর সেই সব রাতে আমাদের বাগানের কাচারি ঘর থেকে এক ভয়ঙ্কর গোঙানির শব্দ আসতো। মাকে জিজ্ঞেস করলে ঠাস্ করে এক চড় দিয়ে মা বলতেন, “তোকে না ঘুমুতে বলেছি? অসভ্য মেয়ে কোথাকার”। এরপর আর প্রশ্ন করা যেতো না, আমি গোঙানি শুনতে শুনতে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তাম ঠিকই।
মারলং কাকা এলে “ছিরার মা” সেই যে এসে আমার মায়ের পাশে বসতেন, আর উঠতে চাইতেন না। বাড়ির অন্যান্য বউ-ঝিরা তাকে নানা খোঁচা দিয়ে আদি-রসাত্মক দুষ্টুমি করতেন, কিন্তু তিনি যেনো ক্রমশঃ চুপসে যেতেন।সবশেষে আমার বড় চাচির শরণ নিতেন।সেখান থেকেও তাকে গভীর রাতে বের হয়ে আসতে হতো মারলং কাকার কাছে। সেসব অবশ্য আমি আরও অনেক পরে জেনেছি। অতো ছোট বেলায় সেসব জানার কথা নয়, কিন্তু গ্রামের বাচ্চারা বড় মুখরা ছিল, তারা পরদিন সকালেই এইসব নিয়ে ছড়া বানাতো, অথবা আগে থেকেই প্রচলিত ছড়া তারা মারলং কাকা চলে যাওয়ার পর ইনিয়ে বিনিয়ে বলতো। সেই ছড়াগুলো ছিল এমন,
“গম্ভীর রাইতে
ছিরার মা কান্দে
ছিরার মা কান্দে ক্যা (আসলে য-ফলা আর এ-কার এর মিশ্রনে অদ্ভূত উচ্চারণ)
বিদেশি বিটায় তারে যাতে ক্যা??”
এরকম ছড়া। তখন বুঝতাম না, পুরোপুরি; আবার কিছুই যে বুঝতাম না তাও নয়।আমি শেষবার যখন মারলং কাকাকে দেখি, তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ি।আরও পরে, বহু রক্তকাণ্ড ঘটার পর বড় কাকার খবরদারি থেকে সংসার আলাদা হওয়ার পর, মায়ের মুখে অনেক কথার সঙ্গে শুনেছিলাম, মারলং কাকার কথাও। মারলং কাকার মতো অনেকেই নাকি বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ইসলাম প্রচার করতেন আর প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিয়ে করে ইসলামের প্রসার ঘটাতেন, বাঙালি নারীর গর্ভে খাঁটি মুসলমান পয়দা-করণ প্রকল্প। তবে দুঃখজনক ভাবে মারলং কাকাকে যে বার শেষবার দেখি, সে বছরই চৈত্র মাসে কলেরায় “ছিরা” মারা যায় ।চৈত্রের এই কলেরার গল্প আমার এই বালিকার ঋতু-দর্শণে বিস্তারিত বলবো, আমার জীবনে তার ছাপ ভয়াবহ বলেই তা আমাকে বলতে হবে।
আর “ছিরার মা” সে বছরই পাগল হয়ে যায়, আমাদের গ্রামের ভাষায় “ডাকের পাগল”; শরীরে কাপড়-চোপড় রাখে না যে পাগল, সেরকম।মারলং কাকার খাঁটি মুসলমান প্রকল্পের বংশধর আমাদের গ্রামে আর নেই, কিংবা থাকলেও তা প্রকাশ্য নয়।
আজ মারলং কাকার গল্প বলি, উনার নাম মারলং না অন্য কিছু আমি জানি না, উচ্চারণটা কেমন তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করিনি। মানুষটা লম্বায় ছ’ফুট বা তার চেয়েও বেশি হবেন। খুব ছোট্টবেলার কথা, যখন সবকিছু দেখতে বিশাল মনে হতো। মারলং কাকার গায়ের রং “পাটনাই গমের” মতোন; আমাদের ওদিকে কেউ ফর্সা হলে তাকে গমের মতো ফর্সা বলে তুলনা করা হয়। চোখে সুর্মা টানা, লম্বা আলখাল্লা পরনে, কোঁকড়া চুল, পায়ে চামড়ার চটি, সঙ্গে একটি চামরার “মিশক”-এ ভর্তি জল, একটি লম্বা ব্যাগ ভর্তি নানান সামগ্রী – মারলং কাকা আসেন, গভীর রাতে। আমরা তখন গভীর ঘুমে। সকালে উঠে দেখি, আমাদের বাড়ি ভর্তি মানুষ, মারলং কাকাকে ঘিরে বসে আছে। আমরা চোখ ডলতে ডলতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, মারলং কাকার জলদগম্ভীর স্বর, “চোখ ধুইয়ে আইসো”। আমরা দ্রুত সামনে থেকে সরে যাই, চোখ ধুতে গিয়ে, গোটা মুখ ধুয়ে ফেলি।
মারলং কাকা বছরে একবার বা দু’বার আসেন, আমাদের ওখানে। সারা বছর তিনি মক্কা-মদীনা-সিরিয়া’য় ঘোরাঘুরি করেন।তিনি আমাদের দেশে আসেন কোরআন বিলাতে। কেউ কেউ বলেন, মারলং কাকা মক্কাবাসী, কেউ বা বলেন মরোক্কান, কেউ বা বিশ্বাস করেন যে, তিনি সিরিয় বা মিশরীয়। কিন্তু মারলং কাকা যেখানেই যান বিনামূল্যে কোরআন ফেরি করার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিয়েও করেন। আমাদের গাঁয়েও তার একটি স্ত্রী ও সন্তান ছিল। তারা সারা বছর এর ওর বাড়িতে কাজ করে, কিংবা বেশিরভাগ সময়ই আমাদের বাড়িতে এসে থাকতো। আমরা মারলং কাকার স্ত্রীকে ডাকতাম “ছিরার মা”, আসলে তার ছেলেটির নাম রাখা হয়েছিল ছিরাযদ্দি, সিরাজউদ্দিন-এর গ্রাম্য উচ্চারণ। আমাদের ওখানে নাম বিকৃত করার এক অদ্ভূত প্রচলণ আমাকে আশ্চর্য করতো খুব।
যাহোক, মারলং কাকা যে বারই আসতেন, সেবারই তাকে ঘিরে আমাদের বাড়ি ভর্তি হয়ে যেতো মানুষে। কেউ আসতেন কোরআন শরীফ নিতে, কেউ বা আসতেন জল পড়া নিতে, কেউ তাবিজ-কবজ বা সুতো পড়া নিতে। আমাদের বাগানের সামনে কাচারি ঘর, সেই ঘরে মারলং কাকা জমিয়ে বসতেন। আমার বড় কাকার সঙ্গে মারলং কাকার ঘনিষ্ঠতা চরম প্রকৃতির। আমার বড় কাকার যে ছড়িটি ব্যবহার করেন, যে গুলদানি থেকে তিনি নষ্যি নেন, যে চামড়ার খড়মটি তিনি পরেন, যে রুপোর গড়গড়ায় তিনি তামাকু সেবন করেন, যে লোহার ইস্ত্রিটি দিয়ে তার পাজামা-পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করা হয় – সবই মারলং কাকার দেয়া। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো বড় কাকা নিজেও মারলং কাকারই দান বুঝি। আমাদের বাড়িতে আমার বড় কাকার কথার ওপর কথা নেই। আমার পিতা ও বাকি দু’ই খুল্লতাত বড় কাকার কথায় ওঠেন এবং বসেন। তাদের স্ত্রী’রা তো হুকুমের বা’দী।
যাহোক, বড় কাকার সঙ্গে মারলং কাকা সারাদিন বসে গুঁজগুঁজ ফুস ফুস করেন, তিনি এলে ডেক্চি ভর্তি করে রান্না হয়, খাসি জবাই হয়, মারলং কাকা মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। কাবুলিওয়ালার মিনি রামদয়াল কাক-কে “ক্যাওয়া” বলে হেসেছিল, আর আমরা হাসতাম মারলং কাকা মাছকে “মাছ্ছি” বলেন বলে। ততোদিনে যেহেতু কাবুলিওয়ালা পড়া হয়েছিল সেহেতু মারলং কাকাকে আমার কাবুলিওয়ালাই মনে হতো, মক্কী-মাদানী কিছু মনে হতো না। অবশ্য এর পেছনে আমার মায়ের কথাও কানে এসে থাকবে, সেটা একটু পরে বলছি।
মারলং কাকা থাকতেন বড় জোর তিন রাত, কোথাও নাকি তিন রাতের বেশি আতিথ্য নেয়াটা ধর্ম-বিরোধী। এই তিন দিন বাড়ি ভর্তি মানুষজন এবং সেই সঙ্গে কোরআন পাঠের আসর, মারলং কাকার বয়ান, তাও মাত্র এক সন্ধ্যা। এই সন্ধ্যার জন্য অবশ্য যে বিশাল আয়োজনটি হতো তার কথা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। কিন্তু অনেক বড় গল্পকে ছোট্ট করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায় যে, মারলং কাকার আসা উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে যে সব রান্না হতো সারা বছর এমনকি দুই ঈদেও সেরকম রান্না হতো না।
আমার স্মৃতিতে মারলং কাকা বসে আছেন চোখ বন্ধ করে, তার চারদিকে মানুষজন, বেশিরভাগই পুরুষ, আর নারীরা কেউ বাটি হাতে, কেউ সুতো হাতে কেউ বা শুধু শুধুই শরীর থেকে বাড়তি কাপড় বেড় করে তা দিয়ে মুখ ঢেকে। গ্রামের মহিলাদের এই দাঁড়ানোর ভঙ্গীটি আমাকে ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করতো। আমিও এক সময় ওইভাবে দাঁড়াতাম, ক্রমশঃ শহুরে হয়ে আমি এখন হয়তো আর ওভাবে দাঁড়াতে পারবো না। সে জন্য আমার কষ্টের সীমা নেই।
মারলং কাকার দাড়ি নেই, তার মুখ মেয়েদের মতো, মসৃন, ঠোঁট দু’টো বেশ পাতলা। চোখ বন্ধ করলেও তার সুর্মা টানা কোটরে যাওয়া চোখ দু’টোকে আমার কেন যেনো খোলা মনে হতো। যেহেতু আমাদের বাড়িতেই উনি উঠতেন সেহেতু আমরা পেতাম খেজুর, বাদাম, পেস্তা এইসব শুকনো ফল, যার মধ্যে আখরোট খেলে আমার বমি পেতো। এখনও পায়। আর সবচেয়ে খারাপ লাগতো, মারলং কাকার গাল টিপে দেয়া, প্রচণ্ড জোরে উনি গাল টিপে দিতেন, ব্যাথা পেতাম, মাকে গিয়ে বলতাম, মা বলতেন, সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না আর। কিন্তু আমাকে টানতো খুব উনার চারপাশের মানুষজন, উনাকে ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলির মুখ। সবাই আমার চেনা কিন্তু উনি এলে কেমন অচেনা মনে হতো মুখগুলো।
মারলং কাকা আসতেন চৈতালি ফসল অর্থাৎ রবিশষ্য উঠার ঠিক পরে পরে।ফালগুন শুরু হতে হতে। তখনও গরম পড়েনি তেমন, পড়বো পড়বো করছে। কেন যেনো তখন অমাবশ্যাও থাকতো, কিংবা আমার স্মৃতিতে শুধুমাত্র অন্ধকার রাতগুলির কথাই আছে। সেই সব রাতে আমার মা আমাদের তাড়াতাড়ি ঘুমুতে বলতেন। কিন্তু যেহেতু ঘুমুতে বলেছেন, তাই আমার ঘুম আসতো না। এ অভ্যেস আমার আজও গেলো না, কেউ কিছু বলেছে কি সেই কাজটি আর আমাকে দিয়ে হবে না। এমনিতে আমি সন্ধ্যে না লাগতেই ঘুমে ঢলতাম।আর সেই সব রাতে আমাদের বাগানের কাচারি ঘর থেকে এক ভয়ঙ্কর গোঙানির শব্দ আসতো। মাকে জিজ্ঞেস করলে ঠাস্ করে এক চড় দিয়ে মা বলতেন, “তোকে না ঘুমুতে বলেছি? অসভ্য মেয়ে কোথাকার”। এরপর আর প্রশ্ন করা যেতো না, আমি গোঙানি শুনতে শুনতে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তাম ঠিকই।
মারলং কাকা এলে “ছিরার মা” সেই যে এসে আমার মায়ের পাশে বসতেন, আর উঠতে চাইতেন না। বাড়ির অন্যান্য বউ-ঝিরা তাকে নানা খোঁচা দিয়ে আদি-রসাত্মক দুষ্টুমি করতেন, কিন্তু তিনি যেনো ক্রমশঃ চুপসে যেতেন।সবশেষে আমার বড় চাচির শরণ নিতেন।সেখান থেকেও তাকে গভীর রাতে বের হয়ে আসতে হতো মারলং কাকার কাছে। সেসব অবশ্য আমি আরও অনেক পরে জেনেছি। অতো ছোট বেলায় সেসব জানার কথা নয়, কিন্তু গ্রামের বাচ্চারা বড় মুখরা ছিল, তারা পরদিন সকালেই এইসব নিয়ে ছড়া বানাতো, অথবা আগে থেকেই প্রচলিত ছড়া তারা মারলং কাকা চলে যাওয়ার পর ইনিয়ে বিনিয়ে বলতো। সেই ছড়াগুলো ছিল এমন,
“গম্ভীর রাইতে
ছিরার মা কান্দে
ছিরার মা কান্দে ক্যা (আসলে য-ফলা আর এ-কার এর মিশ্রনে অদ্ভূত উচ্চারণ)
বিদেশি বিটায় তারে যাতে ক্যা??”
এরকম ছড়া। তখন বুঝতাম না, পুরোপুরি; আবার কিছুই যে বুঝতাম না তাও নয়।আমি শেষবার যখন মারলং কাকাকে দেখি, তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ি।আরও পরে, বহু রক্তকাণ্ড ঘটার পর বড় কাকার খবরদারি থেকে সংসার আলাদা হওয়ার পর, মায়ের মুখে অনেক কথার সঙ্গে শুনেছিলাম, মারলং কাকার কথাও। মারলং কাকার মতো অনেকেই নাকি বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ইসলাম প্রচার করতেন আর প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিয়ে করে ইসলামের প্রসার ঘটাতেন, বাঙালি নারীর গর্ভে খাঁটি মুসলমান পয়দা-করণ প্রকল্প। তবে দুঃখজনক ভাবে মারলং কাকাকে যে বার শেষবার দেখি, সে বছরই চৈত্র মাসে কলেরায় “ছিরা” মারা যায় ।চৈত্রের এই কলেরার গল্প আমার এই বালিকার ঋতু-দর্শণে বিস্তারিত বলবো, আমার জীবনে তার ছাপ ভয়াবহ বলেই তা আমাকে বলতে হবে।
আর “ছিরার মা” সে বছরই পাগল হয়ে যায়, আমাদের গ্রামের ভাষায় “ডাকের পাগল”; শরীরে কাপড়-চোপড় রাখে না যে পাগল, সেরকম।মারলং কাকার খাঁটি মুসলমান প্রকল্পের বংশধর আমাদের গ্রামে আর নেই, কিংবা থাকলেও তা প্রকাশ্য নয়।
লেবেলসমূহ:
গল্প,
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির গল্প
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
