তাপস গায়েন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তাপস গায়েন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০০৯

কবি তাপস গায়েন-এর অপ্রকাশিত পদ্য

(এক)

প্রগাঢ় ভালোবাসায় বেঁধে রাখি তাকে
তবু কেন মিছে এতো ধূলো ওড়াওড়ি
আমি তো জন্মান্ধ কবি, বালিয়াড়ি জুড়ে
মগ্ন আমি, কেন খুঁজি সেতু পারাপার

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ৮, ১৯৮৯


(দুই)

বীর্যহীন রাত নামে হীম কুয়াশায়
চাঁদ শিশুর হাড়ের লাবণ্য ছড়ায়
জেনেছি আমার চুল ঈশ্বর-বিহীন
তবে কেন এতো রাতে নিয়ন-প্রণয়

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ২৮, ১৯৮৯


(তিন)

রঙ ও রেখায় আঁকি সমুদ্র তুমুল
তবু হাতে রয়ে যায় বিষণ্ন লেগুন
নীল রঙে আঁকি যদি নম্র জল, তবে
শঙ্খের গভীরে ঝরে জলের অনল

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ৩০, ১৯৮৯


(চার)

অন্ধ আত্নমগ্নতায় খুঁজে ফিরি নারীর শরীর
সুবাতাস ফিরে যায় ; ব্যর্থ হয়ে ফিরে ফিরে যায়
থির গাঙের শুশুক ব্যাকুল ভাদ্রের ভরা জলে
এ কী অস্থির কৌতুক নিরন্তর আমাকে ভাবায়

বুয়েট, ঢাকা ; জানুয়ারি, ১৯৮৯


(পাঁচ)

শুধু ব্যর্থ দগ্ধ সিগারেট । এ কী দাহ না উৎসব
না কী রঙধনু ছুঁয়ে ক্রমাগত স্মৃতি পারাপার
তোমার নিশ্চুপ হাতে ঝরেছিল আলোর সরণী
দেহ আর দ্রোহ নিয়ে নিঃশব্দ আমার করতালি

বুয়েট, ঢাকা ; জুন- ১৯৮৯


(ছয়)

কোথাও ঠিকানা নেই, নম্র নীল নিরাবেগ জল
তবে কিসের সংসার গড়ে তুলে মানুষে মানুষ
ফিরে আসি স্মৃতির উৎসবে, কোন মানুষের ভ্রমে
দর্পণে চিত্রিত নই, স্বপ্নে শুধু নিরাবেগ জল

বুয়েট, ঢাকা ; আগস্ট ৩- ১৯৮৯


(সাত)

জলের প্রবাহে আছি । এই নগ্ন-রূপে বহুদিন
শূণ্যে ভেসে গেছে ঘুড়ি । এইভাবে কে কী নিয়ে যায়
যৌবন মেধাবী জানি । জলে শুধু নিরন্তর ঢেউ
দেহের পূরাণ আছে । কেন আমি নিশ্চল পাথর

বুয়েট, ঢাকা ; আগস্ট ১০, ১৯৮৯


(আট)

বরফ হয়েছ তুমি ? কেন, তরল দেখোনি বলে
এসো, ভাসি অবেলায় । এইভাবে হাত রাখো হাতে
জলে ঠোঁট রেখে বুঝি আমি নই সহজ সরল
খুব বৃষ্টি শেষে বলে ওঠো তুমি - হয়েছি তরল

বুয়েট, ঢাকা ; আগস্ট ১৫, ১৯৮৯


(নয়)

শব্দের কিনারে আছি । দূর সমুদ্রে জাহাজের ভোঁ
ফাৎনায় মুহূর্ত কাঁপে । ঝরে পড়ে অস্থির সময়
ব্যর্থ বায়ু ফিরে যায় । খুঁজে যায় ব্যথিত বলয়
প্রবল বাতাসে ঈশ্বর কী কাঁপে ফাৎনার ডগায়

বুয়েট, ঢাকা ; সেÌটম্বর, ১৯৮৯


(দশ)

ইতিহাসের মূঢ়তা শিখেছে কি একাকী মানুষ
তবে জটিল জল্পনা কেন বুনো জলের সারল্যে
বুর্জোয়া স্বভাবে নেই কোন জলজ বৃত্তের ভঙ্গী
মুক্তির আনন্দ লিখে রেখো দেহের গোপন ভাঁজে

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ২৭, ১৯৮৯


(এগারো)
দেহ নিয়ে খেলা; আছি এইভাবে লুপ্ত বহুদিন
স্তন যোনি জানু ছুঁয়ে আজ এই উন্মুল জীবনে
অনতি অতীত থেকে উঠে আসে সাহসী মানুষ
আর আমি পোড়াকাঠ; ভেসেছি দূরতর অতীতে

বুয়েট, ঢাকা ; আগষ্ট, ১৯৮৯


(বারো)

লিখো নাম অবিরাম সহজ জলের কলস্বরে
দাও উড়িয়ে বুদ্বুদে জরা, দাহ, দেহের সন্তাপ
ছোট বড় ঢেউ সব মুছে দেয় নাম অবিরাম
খুব বেশী নগ্ন হয়ে ভাবি - শৈশব কী শুধু স্মৃতি

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ৮, ১৯৮৯


(তেরো)

তছ্নছ করেছো ছায়া; নিগুঢ়-ও তার প্রতিশ্রুতি
ঈশ্বর-বিহীন তুমি দাঁড়াবে কোথায়, ভেবেছ কী
প্রবল মাধ্যাকর্ষণ টানে আছো আজ মানুষের
ভীড়ে । তবু জেনেছ কী তুমি নিজে কতোটা ঈশ্বর

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৮৯


(চৌদ্দ)

কোথায় দাঁড়াব আমি, অনাসক্ত এক মুঠো জল
সমস্ত পৃথিবী জুড়ে একই বিদায় সম্ভাষণ
মানুষের পায়ে পায়ে খুব বেশী মগ্ন আমি ; তবু
রঙধনু ছুঁয়ে বুঝি - এই নয় আমার জীবন

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৮৯


(পনের)

বৃষ্টি হয়েছিল । তাই সারাদিন আনমনে খুব
স্মৃতির শিকড় ছুঁয়েছিল বুঝি সরব প্রপাত
উঠোনের জলে মৃদু দুলেছিল শীর্ণকায় চাঁদ
বস্তু কেন ভেঙ্গে যায় ঘন নীল মনের ছোঁয়ায়

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ২৭, ১৯৮৯


(ষোল)

শব্দের সীমানা ভেঙে চলে যাব দূর কোন দেশে
ত্রস্ত বিকালের রোদ মেখে নিও শাড়ির আঁচলে
খুব ধূলো যদি ওড়ে, কান রেখো জলের আভাষে
বুঝে নিও এ জীবন শুধু মিছে ধূলো ওড়াওড়ি

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ২৮, ১৯৮৯


(সতের)

নৌকা ছেড়ে গেলে বুঝি - একদিন আমিও ছিলাম
কার আঁচল ছায়ায়, কবে কার দ্রাবিত যৌবনে
পড়ে আছে ভাঙ্গা সাঁকো, বহু অর্থহীন প্রতিশ্রুতি
আজ চারিদিকে জল । সাঁকোহীন, শুধু এলোমেলো

বুয়েট, ঢাকা ; অক্টোবর ৫, ১৯৮৯


(আঠারো)

শব্দের আদলে নারী; ভাঙ্গি তার জটিল যৌবন
অজস্র শব্দের মুখোমুখি ফেরারী আসামী আমি
মেঘ-বৃষ্টি-জল আনে অবিরল শব্দ কোলাহল
শব্দ ভেঙ্গে দেখি শুয়ে আছে নারী, বিমুগ্ধ নয়ন

বুয়েট, ঢাকা ; অক্টোবর ১০, ১৯৮৯


(উনিশ)

ঘাসে ঘাসে বেজেছিল বিচূর্ণ সূর্যের গান, আর
লুদ্ধক নক্ষত্র ঘিরে মানুষের নিঃসঙ্গ জীবন
গভীর রাতের শেষে মন্থর শরীর ঘিরে থাকে
নিহিত কুয়াশা আর বাদুড়ের ঘরে ফেরা তান

বুয়েট, ঢাকা ; অক্টোবর ২০, ১৯৮৯


(কুড়ি)

রাতের জরায়ু ছিড়ে পৌঁছে যাই পৃথিবীর পথে
ভাঙ্গে বার্লিন প্রাচীর । ফেরারী যৌবন কিছু জানে
দেহের পরিধি জুড়ে জাগে আজ অলীক প্রণয়
নগরী নিয়ন ছেড়ে অকারণ কে আর হারায়

বুয়েট, ঢাকা ; নভেম্বর ৪, ১৯৮৯


(একুশ)

পড়ে আছি শব্দহীন, চৌরাস্তায় মোড়ে ক্রুশবিদ্ধ
সারারাত খুব আলো কুড়ালেন নগ্নপ্রায় যীশু
দেহের প্রতিভা নিয়ে আমি এক ঈশ্বর সাধক
নগ্ন হতে গিয়ে ভাবি- যীশু আজ কতোটা উন্মুল

বুয়েট, ঢাকা ; নভেম্বর ৪, ১৯৮৯


(বাইশ)

অসম্পূর্ণ বৃত্ত । কেন খুঁজি আমি একান্ত ঈশ্বর
রঙ ও রেখায় আঁকি নদী, তার লীলায়িত ভঙ্গী
মুছে গেলে রঙধনু হারায় নদীর সব বাঁক
ধূলোয় দেখেছি আমি নগ্নপ্রায় আদিম ঈশ্বর

বুয়েট, ঢাকা ; নভেম্বর ২৫, ১৯৮৯


(তেইশ)

ঠোঁট ও পালক, ইভা- ঠোঁট ও পালক, ছায়া কই
আগুন দিয়েছ খড়ে । নগ্ন হয়ে দেখেছ আগুন
পথে পথে ধূলো বালি । কেন আমি শুধু মিছে ঘুরি
ডাল কেঁটে ছায়া খুঁজি । বোধি-বৃক্ষে পাখি, কই তুমি

বুয়েট, ঢাকা ; নভেম্বর ২৫, ১৯৮৯


(চব্বিশ)

ছিল ভাঙ্গা গড়া, নিজ অবয়বে জলের উত্থান
তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে প্রতারক দেখেছি ঈশ্বর
নিগুঢ় বিন্যাসে জল তদুপরি নিজের ভাস্কর
আজ রাতে শূণ্য করতলে জেগেছে গোপন ত্রাস

বুয়েট, ঢাকা ; ডিসেম্বর ৩, ১৯৮৯


(পচিশ)

কতো হাত জল মাপি ? মাছ কতো জলের গভীরে
বেলা জুড়ে ছায়া খুঁজি । মেলা ভেঙ্গে গেলে তবু থাকি
অদৃশ্য সঙ্গীত রেখা । ফিরে যাব কার কাছে, ইভা
তোমার চিবুকে সাঁকো । স্তদ্ধ আমি সেতু পারাপার

বুয়েট, ঢাকা ; দিসেম্বর ৯, ১৯৮৯


(ছাব্বিশ)

অসম সঙ্গম আর নিজ বৃত্তে স্বপ্ন ব্যভিচার
বড় পথে গুঢ় টান, ভেঙ্গে ফেলি স্মৃতির ভূগোল
শব্দের মন্থন আনে অবিরল স্মৃতি পারাপার
হঠাৎ তুমুল তালি । চেয়ে দেখি বৃষ্টি অনাচার

বুয়েট, ঢাকা ; ডিসেম্বর ১২, ১৯৮৯


(সাতাশ)
পাথরে প্রহৃত জল । প্রজাপতি জলের বিক্ষোভে
নগ্ন হয়ে উন্মাতাল, আমি কোন উর্ব্বশী যৌবনে
আছি অদৃশ্য প্রবাহে । তবু জন্মান্তর জেনে যাই
এই জলে ও পাথরে, প্রতারিত স্মৃতির ভূগোলে

বুয়েট, ঢাকা ; ডিসেম্বর ১২, ১৯৮৯


(আটাশ)

পালকে আনন্দ জাগে । কেঁপে ওঠে স্মৃতির ভূগোল
ছায়াবৃত্তে ভেঙ্গে যাই; ভেসে যাই বিপ্রতীপ জলে
যুথবদ্ধ শব্দ আনে অবিরল শব্দ ব্যভিচার
রাতের আঁধার জানি ভেঙ্গে যায় শুশুক মায়ায়

বুয়েট, ঢাকা ; জানুয়ারি ৫, ১৯৮৯


(উনত্রিশ)

লুদ্ধক আনন্দে রোদ ঘিরে রাখে বরফ শরীর
করতলে উথ্লে ওঠে বেহুলার পায়ে ভাঙ্গা জল
শরীর কী ছুঁয়েছিল কুমারীর নগ্ন স্তন, তবে
বেহালার ছড় ভেঙ্গে কেন আমি নম্র চুলে থির

বুয়েট, ঢাকা ; জানুয়ারি, ১৯৯০


(ত্রিশ)

উঠোন পেরিয়ে চাঁদ । ঋতুবতী জলের প্রবাহ
বায়ু এসে ভেঙ্গে দেয় জল, শুধু জল অবিরল
হৃদে তবে কেন জাগে অর্থহীন স্মৃতির ভূগোল
রমণীর নাভিমূলে শান্ত হয়ে আসে ঘূর্ণিজল

বুয়েট, ঢাকা ; ফেব্রুয়ারি ১৯৯০


(একত্রিশ)

মৌলের স্বভাবে আছো । আজ তার রূপান্তর জেনো
অজস্র ভাঙ্গনে অণু । উথ্লে ওঠো কিসে, নম্র তুমি
জলের কাঁপনে, নতুন বিন্যাসে, যদি তুমি ভাঙ্গো
অণুর স্বভাবে তবে জানি, মৌলিক মানুষ আমি

বুয়েট, ঢাকা ; ফেব্রুয়ারি ১৯৯০


(বত্রিশ)

হেঁটে যাই আনমনে, নিজের ছায়াকে জানি সঙ্গী
শেষ বিকালের আলো নিভে; ঝরে পাতা অবেলায়
নিয়ন পেরিয়ে ভাঙ্গি বৃত্ত, ক্রমাগত হেঁটে চলি
কাকে যেন খুঁজে ফিরি । নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ১৯৯০


(তেত্রিশ)

ভাঙ্গনের আনন্দে ভেঙ্গেছ । বিপুল ভেঙ্গেছ তুমি
হাত-পা ছুড়ে শুধু কী বাতাসের মগ্নতা কেড়েছ
উৎসব আনন্দে তুমি থৈ থৈ রমণী ভেঙ্গেছ, তবে
আজ চোরা-বালি জুড়ে শুধু কেন নিজেকেই খুঁজছো

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ১১, ১৯৯০


(চৌত্রিশ)

বেভুল মানুষ তুমি । তবে কেন এমন মেতেছ
উস্কো খুস্কো চুলে তুমি কতোটুকু আকাশ ধরেছ
বাদুড়ের সাথে তুমি এলোমেলো অনেক ঘুরেছো
উন্মুল হয়ে কী আজ রাজধানী নিয়নে মজেছো

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ১৫, ১৯৯০


(পয়ত্রিশ)

থাকা না থাকার দ্বন্দ্বে ভেসে যায় ছইহীন নৌকা
লেগে থাকে নারীর শরীরে তার বেগ ও বিস্তার
রঙধনু ছুঁয়ে নগ্ন আমি ক্রন্দনহীন, উন্মাতাল
আকাঙ্খায় বীজপত্র দেখি ছায়াপথ হতে চায়

বুয়েট, ঢাকা ; ফেব্রুয়ারী ১৯৯০


(ছত্রিশ)

মেঘ, মাটি, ও শূণ্যতা । হয়েছে বৃষ্টিতে একাকার
ভিজেছি আমূল আমি; আছি তবু বৃক্ষের স্বভাবে
থিতিয়ে এসেছে তাপ যদি মাটির গভীরে, তবে
দেহের পরিধি জুড়ে জল কেন বাষ্প হয়ে ভাসে

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ১৯৯০


(সাইত্রিশ)

ঘুম- দেহের আবেগ । লগি মেরে আর কতোদূর
স্বপ্ন- পাল তোলা নৌকা । ভেসে যায় অনিকেত জলে
জাগরণ- শব্দের আদলে জাগে রাতের নিয়ন
ঘুম-স্বপ্ন-জাগরণ : বাতাসে হিল্লোল তুলে থির

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ২০, ১৯৯০


(আটত্রিশ)

পলি- নারীর শরীর । গুঢ় অভিমানে খুব গাঢ়
শিলা- শরীরের ভার । নগ্ন শরীরের রূপান্তর
পালক- দেহের ছায়া । পলি ও পাথরে কোন ভেদ
পলি-শিলা-পালক : জেনে যাই প্রকৃতি অভেদ

বুয়েট, ঢাকা ; মার্চ ৩০, ১৯৯০


(উনচল্লিশ)

এই মেয়ে রোজ তুমি জল নিয়ে ফিরে গেছো বাড়ি
তবু কখনো বুঝোনি, কলসের কাঁধ ছুঁয়ে ঢের
হয়েছো বয়সী । আজ কলস ভরে না । খুব ব্যর্থ
তুমি । বিংশ-শতাব্দীর মেয়ে, কেন ছেনালি শিখোনি

বুয়েট, ঢাকা ; এপ্রিল ৮, ১৯৯০


(চল্লিশ)

দর্পণ তো নই আমি; নই কোন এলেমী পাথর
আলো তবু খেলে যায় দেহের ভিতরে অবিরল
পৃথিবীর অক্ষ ঘুরে যদি আসে কালো রাত, তবে
নারীর শরীরে খুঁজি দর্পণের বিচূর্ণ উৎসব

বুয়েট, ঢাকা ; মে ৬, ১৯৯০


(একচল্লিশ)

ইভা, আজ তুমি শুশুক আনন্দে ডুবে আছো খুব
দেহের গভীরে লুফে নাও জলে ভরা মেঘ, কিন্তু
নিয়নের রেণু মেখে যেই আমি নদীর কিনারে
দেখি, আকাঙ্খায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে তুমি অজস্র অনেক

বুয়েট, ঢাকা ; এপ্রিল ২২, ১৯৯০


(বিয়াল্লিশ)

সত্তার গভীরে ঘুম । তবু ঝিলে ছুঁড়ে দেই ঢিল
জলে জেগে ওঠে বৃত্ত । বৃত্তে শুধু ভাঙ্গনের ধুম
স্বপ্নের নেশায় নেমে পড়ি শান্ত ঝিলের গভীরে
জলের বিভঙ্গে- ইভা, তুমি আজ কামুকী শুশুক

বুয়েট, ঢাকা ; মে ১৯৯০


(তেতাল্লিশ)

খুব নুয়ে আসে জলে ভরা মেঘ, আরও কাছে এলে
আল্তো ঠোঁট রেখে বলি - মেঘ তুমি, অবোধ কিশোরী
সবুজের কাছে এসে ভাবি- আমিও পেয়েছি নারী
অলীক ঈথারে দেখি- মেঘ ও সবুজে জড়াজড়ি

বুয়েট, ঢাকা ; মে ১৫, ১৯৯০


(চুয়াল্লিশ)

জরায়ু ছিঁড়েই জানি- পৃথিবীতে আমি একা, তবু
পালকের খোঁজে কেটে গেছে আমার সময়, আজ
আমার এ দেহ ঝরে পড়ে তুলসী পাতায়, শুধু
পূজা আয়োজনে নারী একবার আমাকে ধোয়ায়

বুয়েট, ঢাকা ; জুন ১, ১৯৯০


(পয়তাল্লিশ)

ভেসে যাবে মেঘ, তার মেদুর ছায়ার প্রতিশ্রুতি
মেঘের মণ্ডনে তবু আছি । লতা, গুল্মে কিছু স্মৃতি
নীরব প্রশ্রয়ে তাকে রাখি । ইভা, তুমি যদি ভাসো
নগ্ন হয়ে ভাসমান শুধু তোমাকেই আমি দেখি

বুয়েট, ঢাকা ; জুন ১৬, ১৯৯০


(ছিচ্ল্লিশ)

কোলাহল শূণ্য জল । তাতে ধরা পড়িয়াছে ছায়া
তবু ছায়া কেন কাঁপা কাঁপা ? নগ্ন দেহে শুধু মায়া
রাত বুঝি অন্ধ কায়া ? দর্পণে বিম্বিত হয়ে দেখি
জলমগ্ন স্মৃতির মুকুরে সেতুহীন আসা-যাওয়া

বুয়েট, ঢাকা ; জুন ২৭, ১৯৯০


(সাতচ্ল্লিশ)

চাঁদে মুখ ঘষে মেঘ চলে যায় দূর অজানায়
ভূগোলে বাহিত মেঘ কোন টানে ফিরে ফিরে যায়
আমার এ দেহ ভাঙ্গে, ভাসে; ব্যাপ্ত মেঘের ছায়ায়
দেহের সীমানা ছুঁয়ে মেঘ আর কতোদূরে যায়

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ২৩, ১৯৯০


(আটচ্ল্লিশ)

পথিক ছিলাম । গভীর পরিখা ছিল পথে । শত্রু
ফিরে গেছে কবে । ধ্বংসস্তুপে আজ প্রেতাত্মারা ঘুরে
নির্জন একাকী চাঁদ । তার পাশে এসে অনুক্ষণ
ভাবি, পরিখার কাছে মানুষ কতোটা আর ঋণী

বুয়েট, ঢাকা ; জুলাই ২৭, ১৯৯০


(উনপঞ্চাশ)

ফিরে গেছে নদী । পদমূলে রয়ে গেছে তার চুমু । ঢের
ঝরেছে শেফালি । ফেরারী যৌবন আজো খুঁজে নদী
স্রোতে স্রোতে বয়ে গেছে বেলা । দেখি শুধু তার ক্ষয়
সময় হারিয়ে বুঝি, জলস্রোত সেও আজ বাঁকা

বুয়েট, ঢাকা ; আগষ্ট ২৯, ১৯৯০


(পঞ্চাশ)

বর্ষায় প্লাবিত গ্রাম । দশদিক ঘন অন্ধকার
গরুর গাড়ীতে মরা । তাকে দূরে নিয়ে যায় চাষা
ঘিরে থাকে অন্ধ ভয় শরীরের মগ্ন চারিধার
রাতের গভীরে আজো বেজে যায় গান বেহুলার

বুয়েট, ঢাকা ; সেপ্টেম্বর ২৭, ১৯৯০


(একান্ন)

কেউ এসে ফিরে গেছে । কেউ কেন ফিরে ফিরে আসে
জোয়ার ভাটায় সেই গান আজো বারে বারে বাজে
রঙ ও তুলির টানে গোল-গাল রমনীরা সাজে
রাত শেষে শরীর কী আর শরীরকে ধরে রাখে

বুয়েট, ঢাকা ; অক্টোবর ৩০, ১৯৯০


(বায়ান্ন)

বৃক্ষকে ভেবেছি ছায়া । আজীবন স্মৃতি স্বপ্নে ভুল
চলো সাঁচীস্তুপে ডেকে যান বুদ্ধ- ভীষণ বেভুল
কিশোরী তুমি তো কেটে যাওয়া ঘুড়ি দূর অজানায়
ছায়াপথ জুড়ে অশান্ত স্বপ্নের নদী বয়ে যায়

বুয়েট, ঢাকা ; নভেম্বর ৭, ১৯৯০


(তেপ্পান্ন)

জলের অতলে জল পতনের শব্দ । খুব ঘুম
জরায়ু গভীরে । জাগে পরী-নাচ জলের ভঙ্গীতে
শুশুক শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে মগ্ন জল উতরোল
রাত জুড়ে দেহ কোষে মন্দ্রিত সঙ্গীত অবিরল

বুয়েট, ঢাকা ; ডিসেম্বর ১৮, ১৯৯০


(চুয়ান্ন)

শূণ্য দশদিক । দিগন্ত ব্যথিয়ে ডাকে ঘন ছায়া
রোদের গভীরে স্বপ্ন হয়ে কালো দেহে খুঁজি মায়া
সীমানা ডিঙ্গিয়ে ডাগর কিশোরী আজ ভরা নদী
অনিকেত জলে লিখি নাম- যাযাবর খেয়া তরী

বুয়েট, ঢাকা ; ডিসেম্বর ২৯, ১৯৯০


(পঞ্চান্ন)

ছিল কোন পরিচিত গাছ, চক-খড়ি দিয়ে আঁকা
কোন নারী ? তুমুল বৃষ্টিতে আজো রয়ে গেলে
ভ্রমন বিলাসী । বৃত্তের পরিধি চক্রমণ শেষে
দেহ জুড়ে বেজে ওঠে নাম গান সংকীর্তন ধ্বনি

বুয়েট, ঢাকা ; জানুয়ারি ১২, ১৯৯১


(ছাপান্ন)

আমার অশান্ত ভগিনীরা কী আমারই ছিল, তবে
শৈশব হারিয়ে কেন আজ ছায়াপথ খুঁজি
উজ্জ্বল রোদের মাঝে ওরা দেহ নিয়ে চলে গেলে
অনাদরে নিজেকেই ক্রমাগত ভেসে যেতে দেখি

হবোকেন, নিউজার্সি; জানুয়ারি ২১, ১৯৯২

(সাতান্ন)
শূন্য হতে চাই যতোক্ষন পর্যন্ত না আছি
অবয়ব খুঁজে দেখেছি সময় অশ্বগামী
ছিল যারা কাছে তারাও উধাও ছায়াপথে
বোধি-বৃক্ষ তলে দোতারাটি ভগ্ন পড়ে আছে

হবোকেন, নিউজার্সি; এপ্রিল ২৬, ১৯৯২


(আটান্ন)

প্রকৃতির মূলে হাত রাখি, নিজেকে গুটাই আর
ভাবি- পাখি কি বৃক্ষের মতো আলো অভিসারী
গোধূলির সীমারেখা ধরে পিতা-পুত্রী চলে গেলে
জলের জরায়ু জুড়ে মানুষের যাওয়া-আসা দেখি

পাথ-ট্রেন, নিউজার্সি; জুন ২০, ১৯৯২


(উনষাট)

প্রবাহের দিকে গিয়ে স্তদ্ধ, অখণ্ড পাথর যেন
শূন্য সময়ের দেহ জুড়ে নগ্ন-প্রায় যীশু আমি
আমার স্বপ্নের অবয়বে কোন এক বৃক্ষ আজ
পাতা ধরে, যদিও এখন সাদা বরফের দিন

মার্লবোরো, নিউজার্সি; মার্চ ১৯, ১৯৯৩


(ষাট)
কোন অভিষেক নেই, দিনগুলো শুধু পুড়ে যায়
প্রজাপতি মৃত, বল্গাহীন সময়ের এই শুরু
রঙধনু বিভ্রম নিয়ে কোন দেহ নেই, আছে দ্রুতি
এই স্বাভাবিক, গাধার কানের মতো ঝুলে আছি

মার্লবোরো, নিউজার্সি; মে ২০, ১৯৯৩


(একষট্টি)
নিরালম্ব পাতা, আঁকো বনভূমি শূন্য এই দেহে
লালা, শুক্ররস ধরে রাখে সময়ের বীজকণা
উঠে গেছি টাওয়ারের শীর্ষে, পারদ প্রবাহ যেন
জলের প্রবাহে সময়ের সিড়িগুলো দেখি লুপ্ত

নিউজার্সি-নিউইয়র্ক ট্রানসিট; মে ২৫, ১৯৯৩


(বাষট্টি)
দূরত্বে উধাও এ পৃথিবী । স্বভাবের পিপীলিকা
মৃত । দ্রুতযানে ছায়ার আতঙ্ক নামে এই দেহে
নির্বাক ছবির মতো মানুষেরা থম্কে আছে, তবু
শিশ্নের আনন্দে আত্মহারা শিশু আজ ফিরছে ঘরে

অপ্টিক্যাল ওয়েভ-গাইড ল্যাব, এন-জে-আই-টি; মে ২৭, ১৯৯৩


(তেষট্টি)

নিবিড় জলের তলে আর কতোকাল
রোদের পিপাসা নিয়ে পাড়ে উঠে দেখি
গভীর আঁধার । নিবিড় বৃষ্টির মাঝে
সৃষ্টির বেদনা, হাতে হাত অনুপম

কলাবাগান, ঢাকা; জুন ১৫, ১৯৮৯


(চৌষট্টি)

প্রতিটি সকাল পৃথিবীর ভরকেন্দ্র ধরে
রাতের আঁধার তাকে করে নিরালম্ব পাতা
নির্বাক ছবির দৃশ্যে এইভাবে বহুদিন
যদিও পাথর ভেঙ্গে আজ জলের প্রবাহ

মার্লবোরো, নিউজার্সি; মে ২৮, ১৯৯৩



(রচনাকালঃ ১৯৮৯-১৯৯৩)

রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০০৯

যে ভাষা বজ্রের, যে ভাষা সরীসৃপের : নেটিভ আমেরিকান কবি জয় হার্জো’র কবিতায় আমেরিকার আত্মা দর্শন






তাপস গায়েন


“সমুদ্র গর্জন শুনি, আছড়ে পড়ে অতলান্তিক এবং
প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ এবং কলম্বাসের অবতরণ দেখি পুনরায়-
উপর্যুপরি, বারবার।”

কবি জয় হার্জো’র কবিতায় ইতিহাস এক দুঃস্বপ্ন। এই দুঃস্বপ্নের নাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস, যে নাম নেটিভ আমেরিকানদের চৈতন্যে এখনো ক্রিয়াশীল, ইতিহাসে যার পুনরাবৃত্তি আছে, এবং এ পুনরাবৃত্তি যেন দুঃস্বপ্ন ; সেই অর্থে ইতিহাস, দুঃস্বপ্ন, এবং পুনরাবৃত্তি বাহ্যত এক। এখানেই ঐতিহাসিক চেতনা হয়ে ওঠে আধিবিদ্যক এবং আধিবিদ্যক ধারণা হাত রাখে ঐতিহাসিক চেতনার কাঁধে। নোয়াম চমস্কি, ১৯৯৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ, ইয়ার ৫০১-এ বয়ান দিচ্ছেন, “১৯৯২ খ্রীষ্টাব্দের ১১ই অক্টোবর পুরাতন বিশ্ব ব্যবস্থার ৫০০ বছরের ক্রান্তির কাল নির্দেশ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসে কলাম্বিয়ান অথবা ভাস্কো দ্য গামা যুগ নামে অভিহিত হয়েছে।”১ অবশ্য এ অভিধা কার প্রাপ্য তা নির্ভর করছে ইতিহাস ভাষ্যকারের ওপর,
অর্থাৎ তিনি কোন বিশেষ আবিষ্কারককে/লুণ্ঠনকারীকে ইতিহাসের নায়ক হিসেবে দেখতে আগ্রহী। যাহোক, গত কয়েক শতাব্দী ধরে বিজয়ী এবং বিজিতের বিশ্বব্যাপী যে দ্বন্দ্ব, যা-কিনা পুরাতন বিশ্ব ব্যবস্থার মৌল বিষয়, ইতিহাসের চাকায় তারই বিবিধ প্রকাশ এবং বিভিন্ন নাম-উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সামরিক সাম্রাজ্যবাদ, মিডিয়া সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ, কেন্দ্র বনাম প্রান্তিক, ইত্যাদি। সহজ অর্থে, এ হলো ইউরোপীয়ানদের পৃথিবী দখল। অ্যাডম স্মিথ জানাচ্ছেন, “...আমেরিকা আবিষ্কার এবং ইস্ট ইণ্ডিজে যাবার যাত্রাপথ পেয়ে যাওয়া মানব ইতিহাসের দু’টি মহাকীর্তি, দু’টি সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী। এবং এ দুই মহাকীর্তি সঙ্ঘটনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর তাবৎ মানুষের ভবিষ্যৎ কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তখন সে বিষয়ে ভবিষ্যৎ বাণী যে কোনো মানুষের প্রজ্ঞার বাইরের বিষয় ছিল।”১,২ তবে বিভ্রমহীন সৎ চোখ দিয়ে দেখলে, তখন কী ঘটছিল, প্রকৃত প্রস্তাবে এখন তা হয়ত বুঝে নেয়া অত শক্ত নয়। অ্যাডম স্মিথ অবশ্য অনেক আগেই জানিয়েছেন, “আমেরিকা আবিষ্কার...প্রকৃত অর্থেই ‘ইউরোপীয় রাষ্ট্র সমূহের’ জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল, যা কিনা ‘অবারিতভাবে উন্মুক্ত করেছিল এক নতুন, অনিঃশেষ বাজার’ যা সূচনা করেছিল ‘উৎপাদন শক্তি’, ‘রাজস্ব এবং সম্পদ’-এর অভূতপূর্ব বিস্তৃতি।”১,২ নতুন এই পৃথিবী আবিষ্কার দু’টি ব্যাপক ডেমোগ্রাফিক বিপর্যয় এনেছিল, বিশ্ব ইতিহাসে যা’ নজিরবিহীন। প্রথমত, পশ্চিম গোলার্ধে আদিবাসী মানুষদের প্রায় নিশ্চিহ্নকরণ এবং দ্বিতীয়ত, ক্রীতদাস প্রথার মধ্য দিয়ে আফ্রিকার কবর খনন। ইয়ার ৫০১ গ্রন্থের সাবটাইটেল, ‘দ্য কন্কোয়েস্ট কন্টিনিয়ুজ’, অর্থাৎ ‘বিজয়ের যাত্রা অব্যাহত।’ এই যাত্রার বিপরীতে যেখানে রয়ে গেছে বহু শতাব্দীব্যাপী অগুনতি মানুষের ধ্বংস, তাদের বাস্তুচ্যুতি এবং ক্রন্দন, তাদের বীরত্বগাথা এবং ভীরুতা, এবং পৃথিবীর সকল মানুষের সাথে মিলিত হবার গান, সেখানে উৎসারিত হয় ‘রেড ইণ্ডিয়ান’/‘আমেরিকান ইণ্ডিয়ান’/‘নেটিভ আমেরিকান’ কবি জয় হার্জো’র কবিতা “এখানে মৃতরা এখনও বিস্মৃত নয় (“উই মাস্ট কল্ এ মিটিং”/ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার)” এবং তাঁর প্রার্থনা “আমাদের ভালোবাসায় বিদ্ধ করো (“দ্য ক্রিয়েশন স্টোরি”/দ্য উম্যান হু ফেল ফ্রম দ্য স্কাই)।”

কবি জয় হার্জো’র কবিতায় এই ‘মৃত’ কারা এই প্রশ্ন এবং তার উত্তরের মধ্যে নিহিত আছে এই নিবন্ধের শুরুর জায়গাটি। এবং আলোচনার শেষে এসে আমরা বুঝতে চেষ্টা করব কেন কবি ভালোবাসায় বিদ্ধ হ’তে আগ্রহী। হার্জো’র কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এই নিবন্ধের বিষয় নয়, কিংবা নয় তাঁর কবিতার জগৎ-কিংবা তাঁর চিন্তার জগতের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট নির্মাণ। বরং নিজের সুবিধার্থে, এই আলোচনাকে আমি একটি ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক পুরাণ’ হিসেবে দেখতে চেষ্টা করেছি, যদিও জয় হার্জো এমন একটি আলোচনাকে প্রশ্রয় দিতেন কী না, জানি না। কারণ, নিজের চেতনার জগৎ সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি এক প্রবন্ধে লেখেন, “আমি ভ্রাম্যমাণ অনেক বিশ্বে,”৩ এবং সেই চিন্তাকে তিনি আরও বিস্তৃত করেন এক সাক্ষাৎকারে, “আমি জানি প্রতিদিন আমি ভ্রাম্যমাণতায় বিভিন্ন জগতে ঢুকে পড়ি এবং আবার বেরিয়ে আসি। কোন কোন জগৎ একে অপরের উপর প্রতিস্থাপিত হয় এবং কোনগুলি কখনোই হবে না, কিংবা অন্তত সঙ্গতিপূর্ণভাবে নয়।”৪ তিনি ‘বহু বিশ্ব’ সম্পর্কে তাঁর ভাবনাটি আরও বিস্তৃত করেন এভাবে :

আমি গভীরভাবে অনুভব করি যে সকল উৎস, যা আমাকে আমি করে তোলে, তাদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আছে। দায়বদ্ধতা আছে আমার সকল পূর্বপুরুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি ; আমার নিজের দেশ, এবং যে ভূগোলে আমি গিয়েছি তার প্রতি, কারণ আমি তো তাই ; সকল কণ্ঠস্বরের প্রতি, সকল নারীর প্রতি, আমার তাবৎ গোত্রের প্রতি, সকল মানুষ, সব পৃথিবী, সব শুরুর এবং সব শেষের গণ্ডীর বাইরের প্রতি। আশ্চর্যরকমভাবে, এ বিষয়টি স্বাধীনভাবে আমাকে বিশ্বাস করতে শেখায় ; আমাকে কথা বলতে অনুপ্রাণিত করে, আমাকে আমার কণ্ঠস্বর দেয়, কারণ এ তো আমার দায়বদ্ধতা। ৫

জয় হার্জো কবির এই দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ। কারণ, একজন সাবঅলটার্নকে অবশ্যই কথা বলতে হবে তাঁর মানুষের পক্ষে। তাঁর এই ভাষ্যকে নিতান্তই রাজনৈতিক মনে হতে পারে, কিন্তু সে অভিধায় তাঁর কোন আপত্তি নেই। রাজনীতি সম্পর্কে হার্জো’র দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার এবং তিনি বলেন, “পলিটিক্স ইজ এ গ্রেট মুভার, কারণ, রাজনীতি বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আমাদের চৈতন্য এবং সজ্ঞানতাকে বদলে দেয়।”৬ একথা অবশ্যই মান্য যে, নিরঙ্কুশ পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তরে সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোচনা রাজনৈতিক-অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে এবং রাজনৈতিক-অর্থনীতির আলোচনা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে প্রায়শই অপর্যাপ্ত থেকে যায়।”৭ এটি হলো তত্ত্বের বিবৃতির দিক। কিন্তু শুরুতেই যে ব্যাপারটি জেনে নেয়া দরকার সেটি হলো কোন্ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভিতরে জয় হার্জো বেড়ে উঠেছেন।

নেটিভ আমেরিকান রেনেসাঁস, যার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে স্কট মোমাদে, জেম্স্ ওয়ালেস্, এবং লেসলি সিল্কোর হাত ধরে, জয় হার্জো সেই সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র। বিষয় এবং আঙ্গিকের দিক থেকে এইসব নেটিভ আমেরিকান সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম অসামান্যভাবে নতুন এবং প্রাতিস্বিক। তাদের মাধ্যমে যে বৈচিত্র্যময় জগতের সৃষ্টি হয়েছে, যা এই ভূমি থেকে উদ্ভুত, যা সাদা মানুষের সাহিত্যকর্ম এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। জয় হার্জো’র বক্তব্য, “কবিতা নির্মাণের সাথে টিকে থাকার প্রসঙ্গটি সরাসরি যুক্ত। ব্যক্তিগত জীবনে, এটি আমাকে যেমন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে ; সমষ্টিগত অর্থে, আমার কবিতা আমার গোত্রের সপক্ষে সরব থাকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘আমাদের নিশ্চুপতা আমাদেরকে রক্ষা করবে না’ (অদ্রে র্লোদ)।”৮ তাঁর কবিতার ওপর যাঁরা গভীরভাবে প্রভাব রেখেছেন তাঁরা হলেন : নেটিভ আমেরিকান কবি লেসলি সিল্কো, সীমন অর্টিজ ; আফ্রিকান-আমেরিকান কবি এবং লেখক জুন জর্ডান, অদ্রে র্লোদ, এবং এলিস ওয়াকার ; অন্যদের মধ্যে আছেন পাবলো নেরুদা এবং আমেরিকার মূলধারার কবি গলওয়ে কিনেল প্রমুখ। আমেরিকান ইণ্ডিয়ানদের বিভিন্ন গোত্রের জটিল এবং যন্ত্রণাময় অতীতের পুনর্নির্মাণ, সাদা মানুষের সভ্যতার সাথে প্রবল বিরোধ, নেটিভ ঐতিহ্যে মিশ্র রক্তের প্রবহমানতা, ইত্যাদি নিয়ে গত তিন দশক ধরে যে সাহিত্য ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে, কবি জয় হার্জো সেই ঐতিহ্যের এক প্রধান রূপকার।

কবি জয় হার্জো’র জন্ম ওক্লাহোমার তুলসায়, ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে। তিনি তাঁর কিশোরী মাতার সন্তান, যাঁর ধমনীতে চেরোকি এবং ফরাসি
রক্ত প্রবহমান, এবং ক্রীক পিতার, যিনি অসামান্য যোদ্ধা এবং বাগ্মীতার ঐতিহ্যবাহী পরিবার থেকে এসেছেন। এই মিশ্র রক্তের ঐতিহ্য নিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। মিশ্র ঐতিহ্য যেমন তাঁর মধ্যে ধ্বংসের প্রবণতা সৃষ্টি করেছে, আবার এর মধ্যেই তিনি নিজেকে ইতিহাসের ক্রিয়াশীল সত্তা হিসেবে দেখতে পেয়েছেন। তাঁর এই ক্রীক নাম ‘হার্জো’র অর্থ ‘তুমি এত সাহসী যে তুমি উন্মাদ’। এই উন্মাদনা এখন আর সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে নেই, তবে সৃষ্টিশীল এক উন্মাদনা তাঁর চৈতন্যে সর্বদা সক্রিয় এবং তাঁর কবিতায় লিপ্ত। এই অনুভূতি উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে, “অনেক প্রতিকূলতা এবং প্রায় আত্মহনন অবস্থার ভিতরে অনেক আগেই জেনেছি যে আমার মিশ্র রক্তে যে দ্বৈত সত্তা আছে, তার বিরোধ দিয়ে আমি কখনোই আমাকে ধ্বংস হতে দেবো না। ... জাতিগত এবং আত্মপ্রতিকৃতির বিভাজন অন্য একপ্রকার পদ্ধতি যার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের ধ্বংস করে।”৯ এই উপলব্ধিতে পৌঁছতে তাকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। কবি জয় হার্জো’র কবিতা আলোচনা মূখ্যত এই পথেরই আলোচনা, যে পথ দীর্ঘকালব্যাপী প্রতিকূলতায় এবং কষ্টে আকীর্ণ। অতি অল্প বয়সে তিনি মা হয়েছেন দু’সন্তানের, অর্থনৈতিক সমস্যা তাকে পীড়িত করেছে, বহু কষ্ট স্বীকার করেছেন। তিনি তাঁর প্রথম কবিতা লেখেন বাইশ বছর বয়সে, যখন তিনি ভর্তি হয়েছেন নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরবর্তীতে বি.এ. ডিগ্রি নিয়েছেন, আরও পরে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইাটং-এ এম.ফ.এ. ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত তথ্য নিতান্তই বস্তুগত ; তবে, তাঁর শৈশব, তাঁর কৈশোর, বিশেষ করে যে ভূগোলে তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং যাদের সাথে বেড়ে উঠেছেন, তার প্রভাব বোধকরি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায় ঃ
আমার মনে হয়, এই জীবনে, আমি কেবলি গমনেচ্ছু, উড়ছি নিয়তই এই পৃথিবীর ওপর, যেখানে অনেকের বাস। আমি ইণ্ডিয়ান, একজন নারী, এবং ক্রীক নেশনের শিল্পী। আমার স্মৃতির রেখা ধূসর হয়ে আসে। অনতি দূরে আমি দেখি আমাকে, কিশোরী যে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে, যে তখনো মৃদু নেশাতুর, এবং হাত নাড়িয়ে বন্ধুদের বিদায় জানাচ্ছে। আমরা জেগে আছি সারারাত, গান গাইছি অন্ধকারে, এবং নক্ষত্রদের সংযোগ করছি ইণ্ডিয়ান শহর, আল্বাকারকির পশ্চিমে। (“দ্য সাইকলজি অব্ আর্থ অ্যাণ্ড স্কাই”/এ ম্যাপ টু দ্য নেক্সট্ ওয়ার্ল্ড)।

কবি জয় হার্জো’র ‘আমি’ হয়ে ওঠে অনন্ত স্তরের। প্রথমত, তাঁর শরীরে মিশ্র রক্তের ঐতিহ্য-ক্রীক, চেরোকি, আমেরিকান, আইরিশ, এবং ফরাসি। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ নেটিভ আমেরিকানদের মতো তাঁর শৈশব রিজার্ভেশনে কাটেনি, বরং তিনি বেড়ে উঠেছেন তুলসা শহরের উত্তরে এমন এক পরিবেশে, যেখানে নেটিভ আমেরিকানদের বিভিন্ন গোত্রের মানুষদের বাস : এর পাশাপাশি আছে সাদা এবং মিশ্র রক্তের ঐতিহ্যের মানুষ, অর্থাৎ এক কথায় অনেক গোত্র তথা গোষ্ঠীর বাস। পরবর্তীকালে তিনি হয়তো নিউ মেক্সিকোর আল্বাকারকিতে বাস করে থাকবেন, এমন সাক্ষ্য তাঁর কবিতায় আমারা ইতিমধ্যে দেখেছি। কবির পিসি, ল্যুই হার্জো বল-এর প্রভাব পড়েছে কবির উপর। হার্জো বল ছিলেন একজন তুলি শিল্পী এবং অসামান্য গল্প-কথক, যাঁর স্মৃতিতে শ্র“তির মাধ্যমে লিপিবদ্ধ রয়ে গেছে অ্যাণ্ড্রু জ্যাক্সনের সাথে মোনাহির রেডস্টিক যুদ্ধের অসামান্য বৃত্তান্ত, আলাবামা থেকে ওক্লাহোমা পর্যন্ত ক্রীক গোত্রের মানুষদের অশ্র“সিক্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার অবর্ণনীয় কাহিনী। জয় হার্জো কবিতার মধ্যে গল্প বলার প্রবণতা যেমন অর্জন করেছেন একটি বিশেষ ট্রাইবাল প্রবণতা হিসেবে, একইভাবে তাঁর পিসি হার্জো বল্ হয়ত তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকবেন। তৃতীয়ত, তাঁর শরীরে মিশ্র রক্তের প্রবাহ, তবু তিনি নিজেকে নেটিভ আমেরিকান ভাবতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন, যদিও তিনি তাঁর গোত্রের ভাষা বলতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি, বরং ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন এবং লেখেন। তিনি মনে করেন যে পিতৃ-ঐতিহ্য (ক্রীক) তাঁর সচেতনতায় অধিকাংশ সময়েই উপস্থিত। জয় হার্জো দ্রুতই শনাক্ত করেন, ‘ইংরেজি উপনিবেশবাদিদের ভাষা’ অর্থাৎ, ‘শত্র“র ভাষা’ এবং তিনি আরও মনে করেন, “ইংরেজি ভাষাটা খুবই পিতৃতান্ত্রিক এবং এই ভাষায় এমন কোন শব্দাবলি নেই যা’ ধ্বংসের কথা বলে।”১০ কিন্তু এই ভাষা তিনি পরিত্যাগ করেন না, বরং তাকে পুনর্নির্মাণ করেন। কবি জয় হার্জো’র ভাষায় ‘রিইন্ভেণ্টিং দি এনিমি’জ ল্যাঙ্গুয়েজ’, অর্থাৎ শত্র“র ভাষাকে পুনর্নির্মাণ কিংবা পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বোধকরি শত্র“র বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, “বজ্র আর বিদ্যুতে চিত্রিত আমি এক তীর/ খুঁজে ফিরি নাম শত্র“র/ নির্মাণ করেছে তীর তার নিজস্ব ভাষা/ যে ভাষা বজ্রের, যে ভাষা সরীসৃপের...(“উই মাস্ট কল্ এ মিটিং”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার)।” গ্লোরিয়া বার্ড এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় ‘রিইনভেণ্টিং দি এনিমি’জ ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামে একটি বই সঙ্কলন করেছেন ১৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে যেখানে সঙ্কলিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন গোত্র এবং আদিবাসী লেখকদের লেখা, যাঁরা মূলত নারী, যদিও এই বইয়ের চিন্তার বীজ বপন হয়েছিল ১৯৮৬ খ্রীষ্টাব্দে, যখন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে আন্তর্জাতিক সভায় জড়ো হয়েছিল পৃথিবীব্যাপি আদিবাসী লেখক এবং সাহিত্যিক, যাঁদের মধ্যে আর্টিক সার্কেল থেকে প্রতিনিধি পর্যন্ত ছিল, এমনকী ছিল নরওয়ে থেকে ‘সামি’ জনপ্রতিনিধি, সাউথ প্যাসিফিক থেকে ‘মাওরি’ জনপ্রতিনিধি। কিন্তু কে এই শত্র“, যাদের বিরুদ্ধে কবি জয় হার্জো’র চেতনা সব সময়ই উচ্চকিত ? জয় হার্জো’র কবিতা থেকে তার সাক্ষ্য তুলে দেয়া যাক ঃ
... আমরা যেন অপহৃত, বস্তাবন্দী যেন সাদা মানুষের কাঁধে, যারা ভান করে পৃথিবী এবং আকাশ তাদের দখলে। ... আমরা পেয়েছি আমাদেরকে সভ্যতার কোন এক নিঃশেষ বিন্দুতে, যা বাজিকরের চাতুরির ব্যাগ থেকে নয় বহু দূরে...। (“এ পোস্টকলোনিয়াল টেল”/দ্য উম্যান হু ফেল্ ফ্রম দ্য স্কাই)


এই গদ্য-কবিতার শেষে কবি পাদটীকা সংযোজন করেছেন। পাদটীকা সংযোজনে দেখি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসক তথ্য :
.....................................................................
বিংশ শতাব্দীর অন্তিমকালে এদেশের ভৌগোলিক মানচিত্র আমাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহে ভরে গেছে। কয়েক শতাব্দী আগে এ দেশের জনসংখ্যার একশ’ ভাগ ছিল নেটিভ মানুষ। আমরা এখন জনসংখ্যার দু’শ ভাগের একভাগ মাত্র। ইতিহাসে নৃশংসতা এই জনপদের প্রবলতর এক বিষয়।
কিন্তু এই মৃতদেহ কার ? এ যেন জয় হার্জো’র প্রিয়জনদের, যেন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের ; বৃহৎ অর্থে, নেটিভ আমেরিকানদের, যাদের সাথে তিনি ঐতিহাসিকভাবে একাত্মবোধ করেন বেশি, যদিও তাঁর শরীরে মিশ্র রক্তের ধারা প্রবহমান। মানুষের শরীর যেন আরেক ভূগোল ; সম্ভবত সেখানেই তাঁর কবিতায় বহুমাত্রিক জগতের কোন কোন জগৎ একে অপরের উপর বিন্যস্ত হয়, প্রতিস্থাপিত হয়। ল্যাণ্ড, অর্থাৎ জমি, অর্থাৎ ভূগোল, অর্থাৎ ভৌগোলিক মানচিত্র তাঁর কবিতায় এক অনিবার্য বিষয়। জয় হার্জো’র বিভিন্ন কবিতার বইয়ে/কবিতায় এই বিষয়টি বৃত্তাকরে ঘুরেফিরে আসে ; তিনি ও সমগ্র নেটিভ আমেরিকান সেই অর্থে ‘বিদেশী’, উদ্বাস্তু’, ‘পলাতক’, ইত্যাদি :
...এবং আমাদের শত্রু, যারা আমাদের মাথায় বন্দুক ধরে আমাদের বাধ্য করেছে ওক্লাহোমা ত্যাগ করতে, সেই স্মৃতি আজও মানুষের চৈতন্যে প্রবল, অস্থির...। (“রিটার্নিং ফ্রম দি এনিমি”/ এ ম্যাপ টু দ্য নেক্সট ওয়ার্ল্ড)

এমন কী দু’বছর বয়সেই আমি জেনেছি যে আমরা পৃথক। এই পুণ্য ভূমিতে, আগন্তুকের চোখে দেখেছি, আমরা যেন বহিরাগত, যেন সীমা লঙ্ঘনকারী। রাষ্ট্র অতি শীঘ্রই চোরদের মহিমান্বিত করলো। প্রত্যেকেই যেন ইণ্ডিয়ান এবং যেন কেউ নয় ইণ্ডিয়ান। বিস্মৃতিই যেন সর্বোত্তম...। (“অটোবায়োগ্রাফি”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার)
...হাঁটতে হাঁটতে আমি ফিরে গেছি আমার অ্যাপার্টমেণ্টের পশ্চাৎদিকে। আমরা সবাই, এই শহরের, কোথাও কোন এক পশ্চাৎভাগে বাস করেছি, এবং নিজেদেরকে ইণ্ডিয়ান সংজ্ঞায়িত করতে ব্যস্ত থেকেছি ব্যাপক উপনিবেশের কালে।...(“দ্য সাইকোলজি অব্ আর্থ অ্যাণ্ড স্কাই”/ এ ম্যাপ টু দ্য নেক্সট্ ওয়ার্ল্ড)

মানুষের বাস্তুচ্যুতি, আত্মপরিচয় নিয়ে সংশয় এক কঠিন মানসিক দৈন্যদশা, এক ভয়ঙ্কর আত্মবিচ্ছেদ। এ বিষয়টিকে ফ্রান্স ফ্যানন দেখেন এভাবে, “উপনিবেশিকতায় আবদ্ধ মানুষের কাছে সবচে’ মূল্যবান, সবচে’ বস্তুগত হলো তার জমি, কারণ, এই জমি তার জন্য নিয়ে আসে তার আহার, এবং সর্বোপরি তার মর্যাদা। (ফ্রান্স ফ্যানন, দ্য রেচেড অব্ দি আর্থ।”১১ ভূমির সাথে প্রান্তিক, অর্থাৎ ক্ষেত্রজ মানুষের সম্পর্কের যেমন একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক আছে, একইভাবে এই সম্পর্কের একটি আত্মিক দিকও রয়ে গেছে।

চৈতন্যে সময় এবং স্থান যেভাবে কাজ করে, তার ভিত্তিতে পৃথিবীর সাথে মানুষের যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারই অন্য নাম আধ্যাত্মিকতা। ইউরোপীয়ানদের (অবশ্য ইদানিং সকল আধুনিক, অর্থাৎ যৌগিক মানুষ এবং একেশ্বরবাদীদের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য) চিন্তা কাঠামোয় এবং আধ্যাত্মিকতার সময় চেতনাকে অধিকৃত করে রাখে ; অন্যদিকে, আমেরিকান ইণ্ডিয়ানদের কাছে ভৌগোলিক অবস্থান, আরও সঠিক অর্থে তার জন্মভূমি তার সকল ভাবনার, সকল আধ্যাত্মিকতার মূল উৎস। “একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তা যতোটা না আত্মিক, তার থেকে অনেক বেশি পার্থিব, অনেক বেশি রাজনৈতিক,” এমনটি দাবি করেন ভাইন দেলোরিয়া তাঁর ‘গড ইজ রেড’১২ গ্রন্থে (পৃঃ ৬৬)। জয় হার্জো’র কবিতা স্থান কাঠামোর অধিবিদ্যায় পাঠ জরুরি হয়ে পড়ে, কারণ ভৌগোলিক মানচিত্রের পবিত্রতা এবং সেই ভূগোলে লিপ্ত থাকার বিষয়টি তাঁর কবিতার মৌল বিষয়। হার্জো’র ভাষায়, “এই ভূমি হলো কবিতা যা উৎসারিত গৈরিক মাটি এবং তপ্ত বালু থেকে, যা আমি কখনো লিখতে পারতাম না, যদি না এই কাগজ হয়ে উঠত আকাশের পবিত্র দলিল এবং কালি হয়ে না উঠত দূর দিগন্তে ধাবমান বন্য ঘোড়ার ভগ্ন সারি।”১৩ কারণ, ইণ্ডিয়ানদের কাছে সময়ের ধারাবাহিকতার ঘটনার পারস্পর্যের থেকে অনেক বেশি অর্থবহ তার পবিত্র ভূমি, হোক তা একটি নদী কিংবা একটি পাহাড়, অথবা একটি উপত্যকা। সেই ভূগোলের মানুষ একমাত্র প্রতিভূ নয়, বরং হরিণ, চিতাবাঘ, সরীসৃপ, ঘোড়া, অর্থাৎ প্রতিটি প্রাণের সাড়া মেলে এখানে এবং সেই স্পন্দনে পৃথিবী এখানে জাগ্রত। সেই জাগৃতির গান জয় হার্জো’র কবিতা জুড়ে।

বাইরে একটি হরিণ, তাকে আমি শুনতে পাই ; দৃশ্যাতীত তার কাচের কণ্ঠস্বর/ আমাকে ডাকে, জাগ্রত করে আমার হৃদয়, এবং আমাকে কাঁদায় এই ভঙ্গুর শহরে। (“ডীয়ার ঘোস্ট”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার)

আছে স্বর্গের এক চিতাবাঘ যে পৃথিবীর প্রান্ত ছাড়িয়ে, তার পরিধি অতিক্রম করে উঁকি মারছে এই ভোরে। সে শুনতে পায় সূর্যের সাথে নক্ষত্রের আলাপ এবং দেখে চাঁদ তার ক্ষীণ অন্ধকার ধুয়ে নিচ্ছে প্রার্থনায় উজ্জীবিত পৃথিবীর এই জলে। তাবৎ পৃথিবী জুড়ে আছে সেই প্রাণ, যারা ঘুমাতে পারে না, আর যারা কখনোই উঠেনি জেগে। (“ইন্সমনিয়া অ্যাণ্ড দ্য সেভেন স্টেপ্স টু গ্রেস্”/ দ্য উম্যান হু ফেল্ ফ্রম দ্য স্কাই)
এই নারী ছিল এক রূপকথা, যে কিনা স্বপ্নের মধ্যে চলে গেছে। ...আর সেই হরিণ অভিশাপের গ্রন্থি পেরিয়ে যেন আমাদের খুঁজে ফিরছিল। ...তার পরনে ছিল না কোন বিবর্ণ লাল জামা, তার গোড়ালিতে ছিল না কোন ফিতে ; বরং সে ছিল এক হরিণ, যে এক তুষার শুভ্র সকালে আমাদের স্বপ্নে করেছে প্রবেশ, পাইন বৃক্ষে ছড়িয়ে দিয়েছে নিঃশ্বাসের কুয়াশা ... যার পূর্বপুরুষ কখনো ছেড়ে যায়নি এই ভূমি। “ডীয়ার ড্যান্সার”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার)

জয় হার্জো’র কবিতায় উদ্ভাসিত সেই আধ্যাত্মিকতা যার উদ্ভব প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে প্রাণময় উত্তর আমেরিকায়, যে ভূখণ্ডের পূর্বে অতলান্তিক আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর। এই দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী মহাপ্রান্তরে, প্রিকলাম্বিয়ান যুগে, একমাত্র ইণ্ডিয়ান নেশনের প্রায় তিনশ’ গোত্রের বাস গত ত্রিশ হাজার বছর ধরে। সেই অখণ্ড সময়ে পাহাড়, নদী, সাগর, মরুভূমি, ইত্যাদি ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে নেটিভ আমেরিকানদের গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত আত্মিক সম্পর্ক, যেখানে এই ভূখণ্ডের আদি মানুষ প্রতিটি বস্তুকে পেয়েছে তাদের কল্পনার অস্তিত্বে। পৃথিবী এবং নক্ষত্র, প্রতিটি প্রাণী এবং পাতাও এই ভূখণ্ডের আদি মানুষদের সাথে কল্পনা করেছে। যেহেতু “প্রতিটি প্রাণীর মতো কল্পনাও আকাক্সক্ষা করে প্রশংসার। গল্প আর গান সেই প্রশংসারই সাক্ষ্য” (এ পোসটকলোনিয়াল টেল”/ দ্য উম্যান হু ফেল্ ফ্রম দ্য স্কাই)। সেমেটিক ধর্ম-ভিত্তিক মনোকাঠামো নয়, যেখানে ঐশী গ্রন্থের অনুশাসন এবং নৈতিকতাই ধর্মের ভিত্তি, বরং সকল প্রাণের সাথে হৃদয়ের যে সম্পর্ক এবং যে সম্পর্কে কোন প্রাণ বাদ যায়নি, এমনই এক আধাত্মিকতা যা নেটিভ আমেরিকানদের, তাই মূর্ত হার্জো’র কবিতায়। নেটিভ আমেরিকানদের বিভিন্ন গোত্র একে অপরের আচার অনুষ্ঠানে পৃথক হয়েও গভীর এক আত্মিক সম্পর্কে আবদ্ধ, লীন, এবং তথাগত ; কারণ প্রতিটি বস্তুকে তাঁরা পেয়েছেন তাঁদের কল্পনার অস্তিত্বে। জয় হার্জো’র কবিতা ইতিহাসের রক্তাক্ত পথে যাত্রা শুরু করে সমগ্র মানবের মধ্যে এক ঐক্যের অন্বেষণ করে ফিরছে। এই সন্ধানের মধ্যেই ঘটেছে তাঁ চৈতন্যের ব্যাপ্তি, তাঁর কবিতার দীর্ঘ রূপান্তর।

রূপান্তর যা নিতান্তই একটি শব্দমাত্র নয়, বরং কীভাবে এই রূপান্তরের ভিতরে কবিতা কথা ক’য়ে ওঠে, ভাষার বিবর্তন যেখানে শব্দসমূহের অন্তর্গত ক্রোধকে পবির্তনের মধ্যে দিয়ে এবং তাকে না ভুলে গিয়ে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়, সেখানেই জয় হার্জো স্মরণ করেন গান্ধীকে, “...আমাদের ক্রোধ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পরিবর্তিত হ’তে পারে এমন এক শক্তিতে যা এই পৃথিবীকে করতে পারে গতিশীল, সঞ্চারমান।”১৪

নেটিভ আমেরিকানদের সংগ্রামের যে ধারাবাহিকতা আছে, তেমনি আছে বিশ্বের তাবৎ বস্তুজগতের মধ্যে সম্পর্ক, ঘটনাসমূহের বৃত্তাকারে আবর্তন, জীব এবং জড়ের ভিতরে অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, এবং সর্বোপরি ব্যক্তিক এবং ব্যষ্টিক সম্পর্ক প্রবাহের যৌথ যাত্রা। কবি জয় হার্জো’র কবিতায় অতীত এবং বর্তমানের সার্বক্ষণিক মিথস্ক্রিয়া, মিথিক মোটিফের উপস্থিতি, এবং কবিতার গল্প হয়ে ওঠার প্রবণতা যেন আরও তীব্রভাবে তাঁকে বাঁধে নেটিভ ঐতিহ্যে, যেখান গল্প-পুরাণ প্রবাহিত এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে, যেখানে অতীত অখণ্ড সত্তায় এসে সাক্ষ্য রাখে বর্তমানের কাছে। অর্থাৎ, স্মৃতি শুধুমাত্র অতীতচারিতা নয়, যেখান থেকে পরিত্রাণের পথ নেই, বরং একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে জন্ম দেয় নতুন পথের :
স্মৃতি, তাকে আমি যে অর্থে বুঝেছি তা হলো শব্দের প্রকৃতি যা বলে, অর্থাৎ অতীতচারিতা। কিন্তু একে আমি অন্য অর্থেও বুঝেছি। তাকে আমি নিতান্তই পিছন ফিরে তাকানো হিসেবে দেখি না, বরং দেখি ঘটমান বর্তমান হিসেবে, যা কিনা এখন ঘটছে, এবং দেখি ভবিষ্যৎ ঘটনা হিসেবে...১৫

ইউরোপীয় দর্শন এবং অধিবিদ্যায় ইতিহাস চেতনার মর্মশ্বাস, যা সময়কে একরৈখিকভাবে দেখতে অভ্যস্ত এবং যার সাথে প্রগতির ধারণা সম্পৃক্ত, তার সাথে নেটিভ আমেরিকানদের আত্মিকতার কোন সম্পর্ক নেই। কারণ তাদের চৈতন্যে ইতিহাস এবং ভৌগোলিক সীমারেখা নির্মাণ করে ‘পবিত্র ভূমি’ যার সাথে মিশে আছে অসংখ্য গল্প, দীর্ঘ যাত্রাপথ, পরিভ্রমণশীলতা, এবং প্রত্যাদেশ। নেটিভ আমেরিকানদের চেতনায় ইতিহাস কী তার সবচে শুদ্ধ উচ্চারণ বোধকরি চীফ সিয়াটোলের বক্তৃতায়, যখন তিনি ওয়াশিংটনে ‘মেডিসিন ক্রীক চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে। তিনি দেখেন তাঁর ‘ডুয়ামিশ’ গোত্র যুদ্ধে পরাজিত এবং তাঁর গোত্রের অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যত, কিন্তু এর মধ্যেই বিবৃত হয়েছে নেটিভ আমেরিকানদের ইতিহাস ধারণা এবং চীফ সিয়াটোলের আত্মার এবং ইতিহাসকে উপলব্ধির অসামান্যতা :

আমাদের অবশিষ্ট দিনগুলি আমরা কোথায় যাপন করি, সেটি মামুলি বিষয়। অবশ্য তাদের সংখ্যা অনেক নয়। আরও কিছু চন্দ্রমাস ; আরও কিছু শীতকাল। পরাক্রান্ত অতিথি সেবক, ভ্রাম্যমাণ ছিল যারা এই বিস্তৃত ভূগোলে, ছিল যাদের সুখের বসতি, প্রতিরক্ষা পেয়েছে যারা মহাপ্রাণ থেকে, উত্তরাধিকারে তাদের হয়ত কেউ থাকবে না যে তার বিলুপ্ত জনগোষ্ঠীর কবরে নিজের শোক এবং কান্না উৎসর্গ করতে পারে, যারা একদিন তোমাদের থেকে শক্তিশালী ছিল, তোমাদের থেকে আশান্বিত ছিল। কিন্তু আমি কেন আমার মানুষের অসময়ের দুর্ভাগ্য নিয়ে শোক করব ? সমুদ্র তরঙ্গের মতো গোত্র অনুসরণ করে গোত্রকে, জাতি অনুসরণ করে জাতিকে। প্রকৃতির এই তো বিন্যাস এবং শোক নিতান্তই অর্থহীন। তোমাদের বিলুপ্তির কাল হয়ত বহুদূরে, কিন্তু এ বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী, এমন কী সাদা মানুষ-যাদের দেবতা তাদের সাথে হেঁটেছে, যেমন বন্ধু হাঁটে বন্ধুর সাথে-তারাও এই একই ভাগ্য থেকে মুক্ত নয়। শেষাবধি, আমরা হয়তো একে অপরের ভাই হয়ে উঠব। আমরা অপেক্ষায় থাকবো, আমরা দেখবো। (গড ইজ রেড, পৃঃ ১০১)

চীফ সিয়াটোলের বক্তৃতায় বোধকরি ইতিহাস ধারণার চেয়ে বেশি উচ্চকিত হয়ছে প্রকৃতি বিষয়ক ভাবনা, যে প্রকৃতি প্রাণময় এবং যার আবর্তন অনন্তকাল ধরে, যেখানে প্রগতির ধারণার চেয়ে অস্তিত্বের আকুতি অনেক বেশি প্রবল। এবং একই সাথে তাঁর বক্তৃতা নির্দেশ করে সমগ্র মানবের ঐক্য এবং তার অন্তিম পরিণতি। জয় হার্জো’র কবিতা সেই ঐতিহ্যেরই শব্দাকৃতি :
আমরা মানুষ হিসেবে সবাই জ্ঞান সৈকতে সমবেত। এক ঈশ্বর আমাদের সবাইকে এখানে সমবেত করেছেন, কারণ তিনি আত্মীয় চেয়েছিলেন।

......................................................................
আমরা গান গাই, যে গানের কোন শুরু নেই কিংবা যার কোন শেষ নেই, এমনই প্রতিশ্রুতি ছিল এই গানের।
......................................................................

আমরা প্রাণগ্রন্থি থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব তন্তু জড়ো করি। এইসব তন্তু আমাদের ভালোবাসায় কম্পমান, যখন তাদেরকে আমাদের আত্মীয়দের নামে ডাকি এবং তাদের নিয়ে যাই আমাদের গৃহে, যা নির্মিত চারটি দিক দিয়ে এবং আমরা উৎসর্গ করি গানে...। (রেকন্সিলিয়েশন : এ প্রেয়ার/ দ্য উম্যান হু ফেল্ ফ্রম দ্য স্কাই)
গৃহ যখন উন্মুক্ত অবারিত পৃথিবীর দিকে, আত্মিকতা তখন সকল প্রাণের প্রতি। আজকের আমেরিকা, যা অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে সকল গোত্রের, সকল জাতির, সকল ধর্মের মানুষের বাস, সেই ঐশ্বর্যময় ভূগোলের রাজনৈতিক মালিকানা আজ অব্দি যদিও সাদা মানুষদের হাতে, তবে তার আত্মিক মালিকানা বোধকরি এখনও রয়ে গেছে রেড ইণ্ডিয়ানদের কাছে। উত্তর আমেরিকার ভৌগোলিক মানচিত্রে, জয় হার্জো সেই সর্বপ্রাণ, সকল আস্তিকতার, সকল আত্মিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান কবি।

..............................................................
[ কবি জয় হার্জো’র কবিতার ভূগোল দীর্ঘ, বিস্তৃত, এবং গভীর। এই নিবন্ধে চিন্তা যেভাবে বিন্যস্ত হয়েছে, তার সাথে পারস্পর্য রেখে এই নিবন্ধকারের করা কিছু অনুদিত কবিতা এখানে সন্নিবেশিত হলো অগ্রবীজ-এর পাঠকের জন্য। ]


এ পোস্টকলোনিয়াল টেল
..............
প্রতিদিন যেন সৃষ্টি কাহিনীর এক পুনরাভিনয়। আমরা বেরিয়ে আসি অসম্ভব এক ঘন বস্তু থেকে, স্বপ্নময় বস্তুর কম্পমান অতি উজ্জ্বল দীপ্তি থেকে।
এইতো প্রথম পৃখিবী এবং বোধকরি শেষ।

একদিন আমরা টেলিভিশনের জন্য আমাদেরকে নির্বাসন দিয়েছি। এ এমনই এক বাক্স, যা স্বপ্নদর্শীকে বিচ্ছিন্ন করে তার স্বপ্ন থেকে। আমরা যেন অপহৃত, বস্তাবন্দী যেন সাদা মানুষের কাঁধে, যারা ভান করে পৃথিবী এবং আকাশ তাদের দখলে। পৃথিবীর সকল মানুষ ছিল এই বস্তার ভিতরে। বস্তায় ছিদ্র না হওয়া অব্দি আমরা যুদ্ধ করেছি।

পতনের কালে জানিনি আমরা পড়ে যাচ্ছি। আমরা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম কাজে অথবা শপিং মলে। শিশুরা বন্দুক হাতে শিখছিল অঙ্কে বিয়োগ, যদিও আপাত মনে হবে ক্লাসেই ছিল তারা।

আমরা পেয়েছি আমাদেরকে সভ্যতার কোন এক নিঃশেষ বিন্দুতে, যা বাজিকরের চাতুরির ব্যাগ থেকে নয় বহু দূরে।
প্রতিটি বস্তুকে পেয়েছি আমাদের কল্পনার অস্তিত্বে। পৃথিবী এবং নক্ষত্র, প্রতিটি প্রাণী এবং পাতা আমাদের সাথে কল্পনা করেছে।
প্রতিটি প্রাণীর মতো কল্পনাও আকাক্সক্ষা করে প্রশংসার। গল্প আর গান সেই প্রশংসার সাক্ষ্য।

বৈপরীত্যে কল্পনা আমাদেরকে উদ্ভাসিত করে, আমাদের সাথে কথা বলে, গান করে।
গল্প আর গান মানুষেরই মতো ; তারা ধ্বংসযোগ্য নয়, যখন তারা হাসিতে উদ্ভাসিত।
কোনো গল্প আর গান পতনের কিংবা বিপ্রতীপভাবে উড্ডয়নের পূর্ণমাত্রা প্রকাশিত করে না।
উদ্ভাসিত করে না উড্ডয়ন।
“এ পোস্টকলোনিয়াল টেল”/দ্য উম্যান হু ফেল ফ্রম দ্য স্কাই

অটোবায়োগ্রাফি
..............
বুটলেগারদের পাশের দরজায় আমরা বাস করতাম এবং আমরা ছিলাম ভাগ্যবান। ত্রাসের রাজত্ব ছিল বুটলেগারদের। আমরা ছিলাম অধিকৃত দেশের অপহৃত মানুষ। ‘ওক্লাহোমা’র অর্থ পরাজয়। কিন্তু এই পুণ্য ভূমির নিজস্ব পরিকল্পনা আছে, যা’ কিনা চুঁইয়ে পড়ে মাদকাসক্ত মানুষের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে। কিছুই বিস্মৃতির নয়, যেন নিতান্তই পশ্চাতে ফেলে আসা।

গত সপ্তাহে প্রবহমান নদীর পাড়ে আমি হিকরি গাছকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। এই মাতৃভূমি উত্তরাধিকার হিসেবে সুবৃহৎ মল এবং হোটেলের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। গ্লাস কিংবা স্টিল দিয়ে স্বপ্ন তৈরি নয়, বরং হরিণের হৃৎপিণ্ড এবং ঘূর্ণায়মান চিতাবাঘের জ্বলন্ত চোখ নির্মাণ করে এই স্বপ্ন। এর অর্থ পুনরুদ্ধার হলো বুঝতে পারা-আলাবামায় অসংখ্য মৃত্যু, প্রপৌত্র/প্রপুত্রীর ধ্বংস, আর গল্পের দুর্ভিক্ষ। আমার মনে হয় না যে আমি এসব সহ্য করতে পারতাম। পারতেন না আমার পিতা, যিনি হয়েছেন হত এবং একজন যোদ্ধার প্রতিহিংসা নিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যুকে খুঁজে ফিরেছেন। এসবই উজ্জীবিত আমাদের রক্তে।

এমনকী দু’বছর বয়সেই আমি জেনেছি যে আমরা পৃথক। এই পুণ্য ভূমিতে, আগন্তুকের চোখে দেখেছি, আমরা যেন বহিরাগত, যেন সীমা লঙ্ঘনকারী। রাষ্ট্র অতি শীঘ্রই চোরদের মহিমান্বিত করলো। প্রত্যেকেই ইণ্ডিয়ান আবার যেন কেউই ইণ্ডিয়ান নয়। বিস্মৃতিই যেন সর্বোত্তম, বরং দাবি করো একটি সাদা নক্ষত্র।

ইশ্বর মানুষ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। তিনি প্রথম ব্যাচ চুল্লীতে রাখলেন নির্দিষ্ট সময়ের থেকে অনেক বেশি। তারা পুড়ে গেল। তারা হলো কালো মানুষ। ঈশ্বর দ্বিতীয় ব্যাচ রাখলেন নির্দিষ্ট সময়ের থেকে অনেক কম। তারা ঠিকমত পুড়লো না, নির্মাণ অসম্পূর্ণ থেকে গেল। এরাই হলো সাদা মানুষ। এর পরবর্তী ব্যাচ ঠিক উষ্ণতা পেল। আমরা হচ্ছি সেই মানুষ, যারা ইণ্ডিয়ান, নিতান্তই তোমার মতো।
এরই মধ্যে আমি হয়েছি দ্বিধান্বিত। পাঁচ বছর বয়সে, কিণ্ডারগার্টেনে, আমাকে পুঁতির মালা গাঁথতে দেয়া হয়েছে। সাত বছরে আমি শিখে গেছি কিভাবে চিকেন সাজতে হয় এবং খেলায় জিততে হয়। এবং চৌদ্দ বছর বয়সে আমি পান করতে শিখে গেছি। একুশে আমি আমাকে আবিষ্কার করেছি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে, যখন আমার অতীত আমার কাছে ধরা দিল। তখন মধ্য রাত। আমরা বাসায় ফিরছিলাম এবং তাকে সেখানেই দেখি, সাইডওয়াকে, বরফের মাঝে, সে আছে কুণ্ডলীকৃত, এই সেই মানুষ যে এসেছে হেমেস্ থেকে। আমরা সকলেই প্রতারিত হয়েছি। সে তার লজ্জা শীতল, ডাউনি ব্ল্যাঙ্কেটে আবৃত করেছে ; আর আমরা লজ্জা ঢাকি আমাদের কবিতায়। আমরা তাঁকে বাসায় নিয়েছি। সে সারারাত ঠাণ্ডায় কেঁপেছে এবং বিক্ষুব্ধ ঝড়ের মতো কেঁদেছে। আর ভোরে সে যখন উঠেছে, সে ভুলে গেছে তার সবই। পরে আমি তাঁকে রাস্তায় দেখেছি, এখন আমার যে বয়স সেরকমই ছিল তাঁর। আমার লম্বা চুল ছিল কন্যার বিনুনীর মতো। এবং আমি তাঁর সাথে এমন শ্রদ্ধার সাথে কথা বলেছি যেন সে আমার পিতা ; এমনই ছিল সে শ্রদ্ধা, এমনই তীব্র অনুভব।

হেমেস্ থেকে সেই মানুষ, যে কিনা আমার পিতা, তাকে আমি হারিয়ে আজও বেঁচে আছি এবং আমার অনিশ্চিত দিনগুলিতে সেই বিধ্বস্ত সত্তাকে আমি খুঁজে ফিরেছি। আমি তাদেরকে বয়ে বেড়াই, যেভাবে এই শরীর একটি ড্রামের হৃৎপিণ্ডকে বয়ে বেড়ায়। গতকাল বৃষ্টি বয়ে গেছে পূর্ব থেকে আমার বাড়ির দিকে। একটি হামিংবার্ড কথা কয়ে উঠেছে। এই ছিল সঙ্গীতের আদি কর্টেক্সে অদৃশ্য স্মৃতির উজ্জ্বল খণ্ডাংশ। আমি জেনেছি যে এই হলো ক্ষমার মাস্কোগী সীজন, নতুন শস্যের সময়, সময় ঘূর্ণায়মান নৃত্যের।
“অটোবায়োগ্রাফি” / ইন ম্যাড লাভ এ্যাণ্ড ওয়ার

ডীয়ার ড্যান্সার
...........
এই মধ্য শীতে প্রায় প্রত্যেকেই ফিরে গেছে যে যার গন্তব্যে ; অপেক্ষায় আছে শুধু পানশালার মাতাল প্রেমিক। সেই রাত ছিল বছরের তীব্রতম শীতের। আমরাই আছি খোলা, অন্যসব পানশালা বন্ধ হয়ে গেছে। যখন সে এসেছে অবশ্যই আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি তাকে। ধ্বংসাবশেষ আমরা ইণ্ডিয়ানদের। মাধুর্যের শেষ জেনেছি সেই নারীর ভিতরে। কেউ তাকে জানেনি, কিন্তু আগন্তুককে জেনেছি আমরা তার গোত্রের পরিচয়ে ; ‘হরিণ গোত্রে’র সাথে সম্পর্কিত তার পরিবার। এবং এই যদি সে হয়ে থাকে, তবে এই নারী সেই জনগোষ্ঠীর যারা গান শুনতে অভ্যস্ত পাইন বৃক্ষে, এবং সঙ্গীতকে বাঁধে যারা হৃদয়ের তারে।

নারীর ভিতরে যে নারী, নগ্ন যাকে নাচতে হবে অদ্ভুত এই পানশালায়, সে বাজিয়েছিল হরিণ-সঙ্গীত। হেনরি জ্যাক এই নারীকে দেখে ভেবেছিল যে ফিরে এসেছে ‘বাফেলো কাফ উম্যান’। এরই মধ্যে পানাহারে হেনরি অজ্ঞান হয়েছে এবং তার মাথা এখন টয়লেটে। সারারাত ধরে যে স্বপ্ন সে দেখেছে, এখন সে তার কিছুই মনের করতে পারছে না। পরদিন সকালে সে টাকা ধার করেছে, ফিরে গেছে বাড়ি, এবং ফিরিয়ে দিয়েছে আমাকে তার দেনা। আর এ পৃথিবীতে আছে এক অলৌকিক ঘটনা : কিছু মানুষের অন্তর্দৃষ্টি জাগে পুড়ে যাওয়া রুটির ভিতরে, কারও নারীর অবয়বে।

এই পানশালা শ্রান্ত যুদ্ধাহত সৈনিকের, শট্গানের, ছুরিতে বিক্ষত মানুষের, এবং বিষাক্ত সংস্কৃতির। আমরা শিখেছি বিয়ার পান করে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে না তাকাতে। খেলোয়াড়রা তাদের বিলিয়ার্ড লাঠির যাদুতে মগ্ন। হতাশার নাস্তিতে জিউক-বক্সে কেউ ঠুকেছে কোয়ার্টার। রিচার্ডের স্ত্রী ছুটে গেছে খুন করতে সেই নারীকে। আমরা তাকে রোধ করেছি, ছুরি এবং ডাইপার পিনে ভর্তি তার পকেট করেছি খালি, তাকে স্থির রাখতে তার জন্য কিনেছি দুই গ্লাস বিয়ার, আর রিচার্ড এরই মধ্যে সুন্দরীর জন্য কিনেছে পানীয় তরল।

কিভাবে আমি বলি ? এ ভাষায় কোন শব্দাবলি নেই, যা বাস্তব পৃথিবীর ধ্বংসের কথা বলে। আত্মমগ্ন আমি নিজের সাথে কথা বলি। পবিত্র টিলা আমার মগ্নতায় এসে ধরা পড়ে। কিন্তু আমি তাকে নিতে পরিনি এই বিবর্ণ এনভেলোপে। তাই আমি তাকাই দূরবর্তী নক্ষত্রের দেশে, হিমায়িত এই আকাশের পিছে, একমাত্র অর্থপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।

আমার ভগ্নীপতি হোয়াইট মানুষদের সাথে ঘুরত, পার্ফেক্ট রেকর্ড নিয়ে আইনশাস্ত্রের উচ্চতর বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল ; কিন্তু সে সবকিছু পরিত্যাগ করেছে। সে বলেছে তোমাদের আইন, তোমাদের ভাষা তোমাদেরই থাকুক। রাস্তায় হাতহাতি, মারামারির মাধ্যমে সে আইনের চর্চ্চা করেছে। (সে কিংবদন্তীর নারীর কাছে গেছে, চন্দ্রতুল্য যার মুখাবয়ব, যখন খেলোয়াড়রা জুড়েছে নতুন খেলা।) সে আমাদের কাছে অহঙ্কার করেছে, সেই নারীকে অলৌকিকতার কথা বলেছে এবং সেই নারী বিস্রস্ত, যখন রিচার্ড মানবিক।

কিন্তু তখনই আমরা শুনেছি পানশালায় তার প্রাতিস্বিক কণ্ঠস্বর : তোমার মতো মেয়ে এই পরিবেশে কি করছে ? আমরাও তো জানতে চাইছি যে আমরা সকলে এখানের মতো এই পরিবেশে কি করছি ?

তুমি হয়তো জানো যে সেই নারী নিতান্তই তাই শুনেছে যা সে শুনতে চেয়েছে। সবাই কি আমরা তাই করি না ? সেই নারী পানশালায় রিচার্ডের কেনা সেই বিশ্বাসঘাতকতার পানীয় গ্রহণ করেনি। তবে সে কি খুঁজে ফিরছিল ? আমরা সবাই কিছু না কিছু সন্ধান করে ফিরি। জিউক-বক্সে আমরা একটি সিকি ছুড়ে দিয়েছি। আমরা সবাই ক্ষীণ বাতাসে দাঁড়াতে এসে ঝুঁকি গ্রহণ করি। আমাদের উৎসব এসবের কিছুই পূর্ব-ঘোষণা করেনি। কিংবা আরো যেন বেশি কিছু আশা করেছিলাম আমরা।

আমাকে এসবই বলতে হচ্ছে সেই শিশুর জন্য, আছে যে শিশু এই নারীর ভিতরে আশার ক্ষীণ সল্তে জ্বালিয়ে আর সাঁতার কাটছে জাতিসমূহের স্তুতিতে। প্রশস্ত নয় এই বাড়ি, তবু কিন্তু শীতের স্বপ্ন আসে এবং আসে সেই হরিণ যে আঁকে আগন্তুকের স্বজনদের। ফিরে যাওয়া যেন তুষারাচ্ছাদিত জানালায় হরিণের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস।

পরবর্তী নাচ যেন কেউ আশা করেনি। স্বর্গের সিঁড়ির জন্য বোধকরি সে চেয়ে নিয়েছিল একটি চেয়ার এবং নামাঙ্কিত এক টেবিলে দাঁড়িয়ে সে নাচছিল ঘরভর্তি পাদুকাবিহীন একদল শিশুর মাঝে।

আমাকে ত্যাগ করতে তুমি ভালো সময় বেছে নিয়েছ, লুসিল।
চলে গিয়েছ তুমি চারটি ক্ষুধার্ত সন্তান এবং ক্ষেতের শস্য নিয়ে।

এরপরই সে খুলে ফেলেছে তার পোশাক। ঝেড়ে ফেলেছে তার অবিশ্রস্ত স্মৃতি, এবং নেচেছে হৃদয়হীন প্রেমিকদের সামনে, যা কিনা হয়ে উঠেছিলাম আমরা সকলে।

এই নারী ছিল এক রূপকথা, যে কিনা স্বপ্নের মধ্যে চলে গেছে। ভোজের প্রতিশ্র“তি যে আসছে, সবাই আমরা এমনই ভাবছিলাম। আর সেই হরিণ অভিশাপেরে গ্রন্থি পেরিয়ে যেন আমাদের খুঁজে ফিরছিল। সে কোন সঙ ছিল না এবং আমরাও ছিলাম না ; কিন্তু আমরা শুধু দেখছিলাম।
গান হলো শেষ। এবং সেইসাথে গল্পের যবনিকা। আমি সেখানে ছিলাম না। কিন্তু তাকে আমি এইভাবে ভেবেছি ঃ তার পরনে ছিল না কোন বিবর্ণ লালা জামা, তার গোড়ালিতে ছিল না কোন ফিতে ; বরং সে ছিল এক হরিণ, যে এক তুষার ধবল সকালে আমাদের স্বপ্নে করেছে প্রবেশ, পাইন বৃক্ষে ছড়িয়ে দিয়েছে নিঃশ্বাসের কুয়াশা, আর তার শাবক ছিল যেন মাংসের এক আশীর্বাদ, যার পূর্বপুরুষ কখনো ছেড়ে যায়নি এই ভূমি।

“ডীয়ার ড্যান্সার”/ ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার

ডীয়ার ঘোস্ট
...........
এক.
বাইরে একটি হরিণ, তাকে আমি শুনতে পাই ; দৃশ্যাতীত তার কাচের কণ্ঠস্বর
আমাকে ডাকে, জাগ্রত করে আমার হৃদয়, এবং আমাকে কাঁদায় এই ভঙ্গুর শহরে।
ঋতু বদলে গেছে আরও একবার, কারা যেন ছিনতাই করেছে আমার শৈশব,
চুরি হয়ে গেছে যখন সিংহের স্বপ্ন পলাতক এইসব পুরাতন বাড়ি থেকে, যা আমার
পূর্বপুরুষেরা নির্মাণ করতো মাটি আর খড় দিয়ে, প্রশমিত করতে দহন উৎসের।
নক্ষত্রের কাঠামো ঘিরে রাখে কুয়াশাচ্ছন্ন এই পৃথিবী এবং তাকায় বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে নির্ণিমেষ।
আর কোন পলায়ন নেই, এবং রহস্য এমনই ত্বক, যা কখনো ঠিক মানানসই নয়।
এই রাতে ভূতের ঘুরে বেড়ানোর, এবং এই ভূমি দুঃস্বপ্নের মতোই নামহীন, যা আমার
বাম হাতের মাংসপেশী মনে রাখে।

দুই.
আমি আবারও হয়েছি ব্যর্থ এবং অগ্নিকে নির্বাপিত হতে দিয়েছি। ভুল বুঝেছি আমি
এবং দেবদূতের কস্তুরিময় ডানায় ভর করে ছেড়েছি এই পৃথিবী। তোমার অগ্নি করেছে দগ্ধ
আমার ঠোঁট, কিন্তু সে ছিল মধুর, এক তিক্ত কবিতা। তোমার জন্য যে বাড়ি
ছেড়েছি আমি, সেই পরিত্যক্ত বাড়ির ভূমিতে তোমাকে আস্বাদে গ্রহণ করতে পারি,
যখন আমি এই ভূমিতে উবু হয়ে বসি। বীর এক গোত্রের নামে এই রাস্তা, বীরত্বগাথায় উৎকীর্ণ।
আমার শিরদাঁড়া থেকে যে আগুন নেমে আসে দেবতাদের প্রতি, যেখানে এক টুকরা কয়লা
সমবেত হয় আমার বোনের অগ্নিদাহ থেকে। এইভাবে আমার নাম উচ্চারিত
যেভাবে আমার মানুষেরা আবার ডেকেছে আমাকে। এই হরিণ শুধু জানে
আর ঘুরে বেড়ায় রাস্তায়-উদ্দেশ্যহীন, বিক্ষিপ্ত ; যে কখনো ভুলেনি এই গান।

তিন.
তোমরা কি বলো, এই নিয়ে আমার তেমন কোন ভাবনা নেই। তুমি চলে গেছ বলে
এই হরিণ কোন কল্পকাহিনী নয় যা দিয়ে আমি পূর্ণ করেছি আমার গৃহ। এই পৃথিবীতে
আরও অধিক কিছু আছে যা আমি তোমাকে বলেছি কিংবা বলি অন্য কাউকে।

“ডীয়ার ঘোস্ট” / ইন ম্যাড লাভ এ্যাণ্ড ওয়ার
.............................
দ্য সাইকলজি অব্ আর্থ অ্যাণ্ড স্কাই

ভোরের ঠিক আগে। বিক্ষুদ্ধ বাতাসের তীব্র ঝাঁকুনিতে সাড়া দেয় আম্র-বৃক্ষ। একটি মোরগ কর্কশ চিৎকারে ভোরের আলোকে স্বাগত জানায়। আমরা সতর্ক হয়ে উঠি এবং আমাদের সত্তা, বিপ্রতীপ গতিতে, রাত্রি এবং জাগ্রত নক্ষত্রের মধ্য দিয়ে সঞ্চারমান এক ভূগোলের মাঝে, যার নাম হনলুলু। বৃষ্টির বার্তা নিয়ে মেঘ শহরের উপর দিয়ে দ্রুত ধাবমান। শহরের জঞ্জাল তুলতে একটি ট্রাক বীপ শব্দ তুলে ব্যাক-আপ করছে। যতোই থাকুক না কেন রাত্রির উজ্জীবিত সংগ্রাম, যতোই দীর্ঘ হোক না কেন এই রাত, তবু ভোর আসে।
আমরা আদি গল্পের এক ভগ্নাংশ। এই গল্পে ভ্রাম্যমাণতা আছে বাতাস এবং সমুদ্র তরঙ্গের, আছে ভ্রাম্যমাণতা বীজ এবং বংশ পরম্পরায় জাতিসত্তাসমূহের।

আমার মনে হয়, এই জীবনে, আমি কেবলি গমনেচ্ছু, উড়ছি নিয়তই এই পৃথিবীর ওপর, যেখানে অনেকের বাস। আমি ইণ্ডিয়ান, একজন নারী, এবং ক্রীক নেশনের শিল্পী। আমার স্মৃতির রেখা ধূসর হয়ে আসে। অনতি দূরে আমি দেখি আমাকে, কিশোরী এক, যে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে, যে তখনো মৃদু নেশাতুর, এবং হাত নাড়িয়ে বন্ধুদের বিদায় জানাচ্ছে। আমরা জেগে আছি সারারাত, গান গাইছি অন্ধকারে, এবং নক্ষত্রদের সংযোগ করছি ইণ্ডিয়ান শহর, আল্বাকারকির পশ্চিমে।
“হৃদয়ের মধুর ভগিনী, নাচ শেষ হলে এক চোখ অন্ধ ফোর্ড গাড়িতে আমি তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাব। ওয়ে-ইয়ো-হে-য়া হে-য়াহ্-হাহ্। হে-য়াহ্-হাহ্।”

সেই গান ক্লাসিক হয়ে উঠবে, এ ছিল এমনই এক নিশ্চিতি।

গাড়ির দরোজা বন্ধের প্রতিধ্বনি জাগে, জেগে ওঠে, এবং এসে ভীড় করে এখানে। আমি যখন ফিরে যাই সেই স্মৃতিতে, তখোন আমি শুনতে পাই সেই দরোজা বন্ধের ধ্বনি। এ যেন হলোগ্রাফিক একো, যেন ফিরে আসে বারবার নিজেরই কাছে। আমি চলে যাচ্ছি। আমি ফিরে আসছি।
হাঁটতে হাঁটতে আমি ফিরে গেছি আমার এ্যাপার্টমেণ্টের পশ্চাৎদিকে। এই শহরের আমরা সবাই কোথাও কোন এক পশ্চাৎভাগে বাস করেছি, এবং নিজেদেরকে ইণ্ডিয়ান সংজ্ঞায়িত করতে ব্যস্ত থেকেছি ব্যাপক উপনিবেশের কালে। এ ছিল আমাদের প্রাতিক্ষণিক কৌতুক ; গৃহ-অভ্যন্তরের কৌতুক। হঠাৎ পৃথিবী ঘনীভূত হয়ে আসত দরোজা বন্ধের মধ্যে, গাড়ি চলে গেলে তার সুমিষ্ট র্গর্গ আওয়াজের মধ্যে, চড়–ই পাখির শশব্যস্ত শব্দের মাঝে যে নিঃশব্দতা তার মাঝে, ঘুঘুর ওওহহিং শব্দের ভিতরে। আমি এখনও তার গন্ধ পাই। এ বেঁচে থাকার এমনই এক সজ্ঞানতা যেন সূর্যোদয়-সঙ্ঘটনের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আমি প্রায়শই বাস করেছি সমন্বয়ের মুহূর্তের জন্য, যেখানে দিন আর রাত্রি এসে মেলে। এটি বড় কোন বিষয় ছিল না যে আমি জানতাম না কিভাবে আমি আমার টিউশান এবং বাসা ভাড়া জোগাড় করব, গ্রোসারি এবং বই কিনব, এবং শিশু রাখার টাকা জোগাড় করব। কীভাবে আমি আমার অতীত থেকে অর্থোদ্ধার করব, যা কেবলি উদ্যত হয়েছে আমাকে ধ্বংস করতে, যখন আমি দ্বিধান্বিত থেকেছি এই ভেবে পৃথিবীতে বাঁচার আমার কী অধিকার আছে। যে গান আমরা সারারাত ধরে গেয়েছি, তাই আমাকে পূর্ণ করেছে প্রতিজ্ঞায় এবং আশ্বাসে। এবং একটি জনপদ তার অস্তিত্বের গভীরে বুঝতে পেরেছে যে এই পৃথিবী ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে চুক্তির থেকে অতিরিক্ত আরও কিছু।

এবং এই সকালে, যখন ভোর প্রতিভাত হচ্ছিল এবং আমি যখন বাসায় ফিরছিলাম, তখনই আমি জেনে গেছি যে সূর্যের প্রয়োজন আছে আমাদের, প্রয়োজন আছে আমার ছোট্ট বোনের যা’ সৃষ্টি হয় আমার ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্রে রক্তের ঘূর্ণনের মধ্য দিয়ে। রক্তের এই প্রবাহের মধ্যে জন্ম হয়েছে আমার পুত্র এবং কন্যার। আমার জন্ম হয়েছে এমনই পিতা-মাতার মধ্য দিয়ে, যাঁরা তাঁদের কোর্টশিপের মাঝে প্রায়শই প্রত্যুষকে অভিবাদন জানিয়েছেন তাঁদের অসামান্য হৃদয়াবেগের মাঝে, যা ভালোবাসায় তাড়িত, এবং পরবর্তীতে যা ভগ্ন হৃদয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

আমার মা এবং বাবার বিবাহের পর, তাঁদের চার সন্তানের জন্মের পর, আমার পিতাকে প্রায়ই খুব প্রত্যুষে আসতে দেখেছি, যখন তাঁর বন্ধুরা তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে, যখন তাঁর মুখ থেকে ধোয়া, বিয়ার, এবং বিচিত্র গন্ধ বেরিয়ে আসত। এবং আমি তাঁর কন্যা। চলার পথে আমাদের পদযাত্রা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তার কী বা বলার আছে ? এ কি ‘ডি-ন-এ’ স্ট্র্যাণ্ডের বাঁকের সাথে সম্পর্কিত, যা কিনা ভালোবাসার ইচ্ছা এবং উড্ডয়নের সাথে সংযুক্ত ? আমার পরিবার বেঁচে গেছে, এমনকী ক্রমাগত সমৃদ্ধির পথ দেখেছে, যা কিনা ইণ্ডিয়ানদের পরাজয় এবং অবলুপ্তি, এই জনশ্র“তির বিপরীতে কাজ করেছে।

আমার মেয়ের বাড়ি আল্বাকারকির ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সন্নিকটে, যা কিনা শহরের এক মাইলফলক, যাকে দেখতে পাই প্রত্যুষে, যখন আমি বিমান দিয়ে নামি। সে এখনও ঘুমে তার বাহুতে আবদ্ধ তার কনিষ্ঠ কন্যা। তার সবচে বড় মেয়েটি মুখ খুলে রেখে শুয়ে আছে আরও তিন সুন্দরীর পাশে, যারা সবাই আমার মেয়েকে ‘মা’ বলে ডাকে। আমার মেয়ে, যখন সে বড় হয়ে উঠছিল, আমার সকল প্রস্থানে গভীরভাবে আমাকে হারাতো। এমনকী এখনো যখন আমি আকাশে উড়ছি, আমি অনুভব করি তার হৃদয়ে রশির টান, যা কেবলি প্রশ্ন করে আমি আবার কখন ফিরে আসব। এ এমনই প্রত্যয় যে আমি তাকে তার স্মৃতির কোন এক বিন্দুতে ফেলে এসেছি যে আমি আর কখনই ফিরে যাইনি। আমি তাকে বলতে চাই যে আমি তাকে কখনই ফেলে যাব না, এবং এই কবিতা তার এবং তার কন্যাদের উদ্দেশ্যে, যেন গার্ডিয়ান এঞ্জেল।

“দ্য সাইকলজি অব্ আর্থ অ্যাণ্ড স্কাই” / এ ম্যাপ টু দ্য নেক্সট্ ওয়ার্ল্ড
..............................................
ইন্সম্নিয়া অ্যাণ্ড দ্য সেভেন স্টেপ্স্ টু গ্রেস্

আছে স্বর্গের এক চিতাবাঘ যে পৃথিবীর প্রান্ত ছাড়িয়ে, তার পরিধি অতিক্রম করে উঁকি মারছে এই ভোরে। সে শুনতে পায় সূর্যের সাথে নক্ষত্রের আলাপ এবং দেখে চাঁদ তার ক্ষীণ অন্ধকার ধুয়ে নিচ্ছে প্রার্থনায় উজ্জীবিত পৃথিবীর এই জলে। তাবৎ পৃথিবী জুড়ে আছে সেই প্রাণ, যারা ঘুমাতে পারে না, আর যারা কখনোই উঠেনি জেগে।

আমার নাতনি, মুখে দুধের আর্দ্রতা নিয়ে, ঘুমিয়ে আছে তার মায়ের বুকে। একটি মাছি ল্যাক্টোসের মাধুর্যের ভাবনায় বিভোর।
আার আছে তার পিতা, দুঃস্বপ্নের চাদরে মোড়া। পরিত্রাণের আশায় সে এগুচ্ছে থরোর লাল পাহাড়ের দিকে। মানুষেরা তাকে চিনতে পেরে তার উদ্দেশ্যে গান করে।


বিশৃঙ্খলার বাড়িতে তার মা’র আছে অনেক কাজ। সে এক প্রফেট, যে কিনা তরুণী মাতার ছদ্মবেশে চাকরি খুঁজে ফিরছে। সে আমার স্বপ্নের করিডোরে এসে দাঁড়ায় এবং আমরা বাড়িটিকে বাঁধি একসাথে।
চিতাবাঘ দেখে যখন মেঘ এসে মানুষ আর প্রাণীদের আত্মা সুন্দর বজ্রপাতে অংশগ্রহণের জন্য নিয়ে যায় ঊর্ধ্বমুখী স্বর্গে।
অন্য সকলে হরিণ আর কৃষ্ণসারমৃগদের অনুসরণ করে ঐকান্তিক সময়ে পৌঁছে যায় তাদের পূর্বপুরুষদের গ্রামে। সেখানে তাঁরা ভূট্টার সাথে বেরি মিশিয়ে রান্না করে, যা খাবার পরে তাঁদের ঠোঁট হয়ে ওঠে রক্তিম-বেগুনি, যখন জীবন-বৃক্ষ কেঁপে ওঠে সূর্যে।

এখন অক্টোবর, তবু সকালের আগে এই সময়কে শীত বলে মনে হয়। হলুদ নিয়নের আলোয় মরুভূমি সদৃশ এই শহরে আগন্তুকেরা খুঁজে ফিরছে তাদের বাড়ি।

কেউ কেউ পান করছে এবং আগন্তুকদের সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠছে। অন্যরা নাইট-শিফ্ট্ থেকে ফিরছে, নাতিশীতোষ্ণ কফিতে চুমুক দিচ্ছে, আর অন্ধকারের বিপ্রতীপ দিকে তাদের গিয়ার শিফ্ট্ করছে।
একজন নারী রেড লাইটে এসে দাঁড়ায়, একটি মলিন টেপ উল্টে দেয় ; বেজে ওঠে হুইস্পারী ব্লুজ, টেপের শেষ গানটি। আরও একদিন বাঁচবে বলে সে সিদ্ধান্ত নেয়।

নক্ষত্রেরা লক্ষ্য করে, যেমন করে অর্ধ-ঘুমন্ত ফুল, প্রিক্লি পিয়ার, এবং চায়নাবেরী বৃক্ষ শুষে নেয় জল মাটি থেকে, নিঃশেষে।
সে আলো ফেলে বাসায়, যেখানে তার শিশুরা নিদ্রায় এবং তারা হয়ত কখনো জানবে না যে সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে। তাদের ভাগ্য এমনই এক বাঁক নিয়েছে যে দুঃস্বপ্নের এই দেশে, সূর্যের দিকে বলয়িত জ্ঞান রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
এ এক মধুর শব্দ।

চিতাবাঘটি হাই তুলে এবং মাথা রাখে তার দুই থাবার মাঝে। সে চিতাবাঘের আবাস-গৃহের স্বপ্ন দেখে এবং ভাবে মাধুর্যের সাতটি পথকে।
“ইন্সম্নিয়া অ্যাণ্ড দ্য সেভেন স্টেপ্স্ টু গ্রেস্” / দ্য উম্যান হু ফেল ফ্রম দ্য স্কাই

রিটার্নিং ফ্রম দি এনিমি
..................
(পিতার উদ্দেশ্যে)
১.
আরম্ভের এখনই সময়। আমি এইসব জানি এবং স্মৃতির গ্রন্থিতে ভীষণ আতঙ্কিত হয়েছি, যখন আমার অন্ত্রে স্মৃতির গ্রন্থি আল্গা হয়ে আসে।
আমার পিছনে নদী বহমান এবং নদী জেটিকে জল দিয়ে নম্রতায় মাখে। বাতাস ঘাসে মৃদু আওয়াজ তুলে।
ইতিহাসের জাগৃতি যেন আমার পিছনে টানা এক রজ্জু। আমি আমার পিতা, আমার পুত্র, এবং আমার কন্যার সাথে গ্রথিত। আমরা আত্মীয় এক গভীর জলের।

এমনকি ভূতুড়ে কাঁকড়া, যা সন্তর্পণে সাদা নুড়ির ভিতরে হারিয়ে যায়, সেও এই ভার অগ্রাহ্য করতে পারে না। তার অস্থিসন্ধির খড়খড় শব্দ বিপরীতে প্রাতিস্বিক শব্দ তুলে।

এমনকি আমার পাশে আমারই এক বন্ধু এই বিপদসঙ্কুল যাত্রায় জ্ঞানের মসৃণতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
এবং আমাদের শত্র“, যারা আমাদের মাথায় বন্দুক ধরে আমাদের বাধ্য করেছে ওক্লাহোমা ত্যাগ করতে, আজও মানুষের মাথায় ঘোরাফেরা করে।
কিন্তু এই যখন আমরা একত্রিত হই প্রায়শ্চিত্ত করতে, আমি বাতাসে আমাদের আত্মীয়দের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। আমি আগুন বহন করে নিয়ে যাই জলের সমীপে।

এবং আমরা ক্রমাগত এই বিশ্বাস করে যাব যে আমরা রক্তের প্রবাহ অতিক্রম করে শত্র“ থেকে ফিরে আসার অনুষ্ঠান উদ্যাপন করব।

২.
সময়ের অস্থির দর্পণে, সকল ঘটনা কেঁপে ওঠে বিবিধ স্তরে।
প্রতিটি গাছ, ঘাসের প্রতিটি অভিক্ষেপ,
ছোট এবং বড়-জলের সকল অভিঘাত প্রকাশ করবে আদি গল্প।
আমরা উঠছি এবং কেবলি উঠছি, আর আমাদের সন্তানেরা
নিজেদের উষ্ণ রাখতে বসন্ত রোগের কম্বলে আচ্ছাদিত রাখে।
মাকড়সা আমাদের শিখায় কীভাবে শত্র“র জটিল অভিশাপ থেকে
বয়ন করতে হয় স্টিকি প্যাটার্ণ, যা আমাদের নিরাপদে নিয়ে যাবে ছায়াপথে।
আমাদেরকে ফেলে আসতে হয়েছে আমাদের বাড়ি-ঘর।
যেভাবে প্রগতি রয়ে গেছে আমাদের পশ্চাতে,
আমরা তোমাদের দেয় প্রগতি চাই না।
প্রগতির আরও অনেক প্রকার, এমনই বলে মাকড়সা, যে তার জাল
সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করবে বলে তার ‘বিডার’ খুঁজছে না
বরং সে তার জাল বুনে চলছে এবং ভাবছে
এবং তার গল্পে আমাদের রাখছে।

“রিটার্নিং ফ্রম দি এনিমি” / এ ম্যাপ টু দ্য নেক্সট্ ওয়ার্ল্ড

উই মাস্ট কল এ মিটিং
................
আগুনে ধূমায়িত আমি এক ভঙ্গুর মৃৎপাত্র
নক্শা যেখানে আমারই দুঃস্বপ্ন
বজ্র আর বিদ্যুতে চিত্রিত আমি এক তীর
খুঁজে ফিরি নাম শত্র“র।

নির্মাণ করেছে তীর তার নিজস্ব ভাষা-
যে ভাষা বজ্রের, যে ভাষা সরীসৃপের, এবং
রাতের গভীরে করেছি সংলাপ শুরু আমাদের।
কাজ করি না আমি ; ভুলে যাই পানাহার।
সন্তানরা আমার ক্ষুধার্ত, এবং বাড়ির পিছনে
খাদ্যহীন গোয়ালে গবাদি পশু, এবং
আমি আঁকি গতিপথ নক্ষত্রের।
আমার পুর্বপুরুষ, যারা দূর অতীতের এবং অনতি দূরের,
ভর করে আমারই কাঁধে।
আমার প্রার্থনা পাখির পালকে স্বচ্ছ পাথরের,
বসবাস দেবতার কাছাকাছি যাদের।

এইসব হলুদ পাখি, যারা ধূমায়িত আগ্নেয়গিরির ওপর
চক্রাকারে ঘুরে, তাদের সংলাপে জেগে ওঠে গান
এই পাথরের।

পাখির পালক নিয়ে যায় এ প্রার্থনা ঊর্ধ্বে এবং দূরে
আমিও চেষ্টা করি উড়তে, কিন্তু পড়ে থাকি সিগ্ন্যালের ক্রসফায়ারে
আর আমার উদ্দীপনা পড়ে থাকে ধূলিময় এই পৃথিবীতে
হারিয়েছি পথ, তবু খুঁজে ফিরছি তোমাকেই
যে আমাকে নিয়ে যাবে জীবিত আর মৃতের
মাঝ দিয়ে ধাবমান এই ক্ষীণ পথ ধরে।
দুঃস্বপ্নের মৃৎপাত্রে তুমি এক কুণ্ডলিকৃত সাপ, এক স্বপ্নময় প্রাণ,
যে আমার মস্তিষ্কে সঞ্চরমাণ ; সামনে আর পিছে।
আমরা অবশ্যই ডাকব এক সভা।
ফিরিয়ে দাও আমার ভাষা,
তারই ভিতরে তৈরি করো আমার উন্মাদনার বাড়ি,
যেখানে মৃতরা এখনও বিস্মৃত নয়।

এবং বাড়ির ওপর দিয়ে সোপান বেয়ে উঠছে আকাশ,
এবং সূর্য,
এবং চন্দ্র,
এবং নক্ষত্র যা’ আমাদের পথ দেখায় প্রতিশ্র“তিময় স্বপ্নের।


“উই মাস্ট কল এ মিটিং” / ইন ম্যাড লাভ অ্যাণ্ড ওয়ার
..................................
টু হর্সেস

আমি ভেবেছি ‘সাংরে দে ক্রিস্তো’ পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সূর্যের প্রকাশ
যথেষ্ট ছিল, এবং আমার শরীরের
সেই কস্তুরীময় গন্ধ,
যা দীর্ঘতর রাতে স্বপ্নের পরিশেষে
আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে।
আমি ভেবেছি বৈসাদৃশ্য এবং অদ্ভুত সব গ্রহ, যাদের সাথে কারও পরিচয় ছিল না
সেইসব গ্রহের মাঝে একমাত্র আমার নাচ আমাকে ধারণ করবে। অর্থাৎ
শেষাবধি, আমি ভ্রাম্যমাণতা শিখেছি
এবং সবচে পরিচিত কণ্ঠস্বরের বাইরের স্বরকে চিনতে পেরেছি।
কিন্তু বোধকরি হাজার বছরের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে
তোমার জন্ম হয়েছে
যা কখনো আমি কল্পনায় আনতে পারিনি।
তুমি সম্ভবত
আরেক আকাশ ভেঙ্গে এসেছ এইখানে
কারণ
আমি তোমাকে আরও বহু লক্ষ মহাবিশ্বের অংশ ভেবেছি যা
কখনোই এই নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে হ’তে পারত না।
আমি তোমাকে আমার মতোই ভ্রাম্যমাণ জানি
তোমার চোখেই নক্ষত্রের অজস্র কলোনি
এবং এইসব নক্ষত্র প্রদক্ষিণ করছে গ্রহ
এবং তোমার আঙ্গুল, চুলের সুমিষ্ট গন্ধ, এবং
তোমার মসৃণ, পেটানো পেট।
আমার হৃদয় নিয়ে গেছো তুমি
এবং এইসব সকাল, কারণ আমি এক অশ্ব, দ্রুত ধাবমান
ভাঙ্গা আকাশের দিকে, যেখানে অজস্র ভোর
ভেঙ্গে পড়ছে একই সাথে।
দিগন্তে দুইটি চাঁদ
এবং তোমার জন্য
আমি হয়েছি দিগি¦দিক।


“টু হর্সেস” / শী হ্যাড সাম হর্সেস
..........................
লেট সামার লিভিং

আমি জেগে উঠেছি এবং জ্বালিয়েছি আলো
তুমি স্বপ্নে ছিলে বিভোর
সাদা পাখিদের.
যারা শীতনিদ্রায়।
তোমার অবয়ব ঝুঁকে পড়েছিল আলোর প্রতি,
সূক্ষ্ম কোন এক কোণে।
এমন কী
ঘুমেও তুমি অনুভব করো দিক।
আলোর উজ্জ্বলতায় তোমার চোখ বন্ধ
কিন্তু সূর্যমুখী ফুলের মতো
তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস সূর্যের গভীরে।
(আলোর অনুভূতি যেন ভিন্ন কোরো স্পর্শ,
জল এবং হাওয়া যেমন জাগে ত্বকে।)
আমি এখন পোশাকে আচ্ছাদিত এবং আমি দেখি আমাকে হাঁটতে
তোমার থেকে দূরে
কোন এক বৃত্তের খণ্ডাংশে।
আমি দেখি যুদ্ধবর্ম দেয়ালে
গোলাকার এবং তার থেকে খসে পড়ছে পালক।
উত্তর দিকে সন্তরণশীল রাজহংস
দক্ষিণ দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিতে
নিজেদের ডানার পরিচর্যায় ব্যস্ত
এবং আমি তোমাকে শুনতে পাই
স্বপ্নের গভীরে, তোমার কণ্ঠস্বর পাখিদের মতো
যারা ঘরে ফিরবে বলে আলাপচারিতায় মগ্ন।
তুমি ঘুরাও তোমার মাথা
আমার চলে যাবার আগে আর একবার
নৌকার মতো তোমার শরীর আবর্তনশীল
ক্রান্তিবৃত্তে অদ্ভুত সাগরে।
তুমি পূর্বমুখী।
নক্ষত্রের কালে সূর্য শান্দিয়াসে এসে দাঁড়ায়।
এখন আরেক বছর,
আরেক সকাল।
তোমার গভীরে তাকে আমি ফিরে আসতে দেখি
এবং নিজস্ব গৃহে ফিরবে বলে উদ্যাপন করো অন্তিম এক গান।


“লেট সামার লীভিং” / শী হ্যাড সাম হর্সেস
..............................
দ্য ক্রিয়েশন স্টোরি

আমি নই ভীত ভালোবাসায় কিংবা
দ্যুতিময় তার উদ্ভাসে।

এই কথা কিংবা অন্য যে কোন কথা
সহজ নয়, যখন আমার নাড়িভুঁড়ি
জট পাকিয়ে ফেলে স্বর্গ আর
ত্রাসের ভিতরে।

আমি লজ্জিত, কারণ
আমার আয়ত্তে কোন শব্দ ছিল না,
যা আমার বন্ধুকে নিয়ে যেতে পারত
তার মৃত্যু থেকে নক্ষত্রের দিকে,
সঠিকভাবে।
কিংবা শব্দগুচ্ছ যা
খরা কিংবা বন্দুকের গুলি থেকে
আমার গোত্রের মানুষকে
নিরাপদে রাখতে পারত।

সেইসব নক্ষত্র, শব্দের মধ্যে যাদের উন্মেষ,
এখন ঘূর্ণায়মান এই বাড়ির ওপর,
যা তৈরি অস্থি এবং রক্ত দিয়ে।

ভয়ের পাথরে বিদ্ধ
এই বাড়ি, যা এখন
ভেঙ্গে পড়তে উদ্যত।

যদি এই শব্দগুচ্ছ কিছু করতে পারে,
তবে এই হোক উচ্চারণ,
নক্ষত্রে আশীর্বাদ প্রাপ্ত হোক এই বাড়ি।

ভালোবাসায় আমাদের বিদ্ধ করো, স্থিরীকৃত করো।

“দ্য ক্রিয়েশন স্টোরি” / দ্য উম্যান হু ফেল ফ্রম দ্য স্কাই

.

সূত্র :
1 .Noam Chomsky, Year 501: the conquest continues (Boston: South End Press, 1993) p. 3-5

2 Adam Smith, The Wealth of Nations (Chicago, 1976; first edition, 1976)

3. Joy Harjo, “Ordinary Spirit,” in I Tell You Now: Autobiographical Essays by Native American Writers, ed. Brian Swann and Arnold Krupat (Lincoln: University of Nebraska Press, 1987), p.266

4. Joy Harjo, interview, in Laura Coltelli, Winged Words: American Indian Writers Speak (Lincoln: University of Nebraska Press, 1990) p.60

5. Quoted in Song from This Earth on Turtle’s Back, ed. Joseph Bruchac (New York: Grenfield REview Press, 1983), p.92

6. Joy Harjo and Gloria Bird. Reinventing the Enemy’s Language, (New York: W. W. Norton & Company, 1997)

7. Azfar Hussain, “Joy Harjo and Her Poetics as Praxis”: A postcolonial Political Economy of the Body, Land, Labor, and Language”: Wicazo SA Review, Fall 2000

8. Laura Coltelli, “The Circular Dream,” in The Spiral of Memory; ed. Laura Coltelli (Michigan: The University of Michigan Press, 1996) p.63

9. Bill Aull et al. “The Spectrum of Other Languages,” in The Spiral Memory; ed. Laura Cortelli (Michigan: The University of Michigan Press, 1996) p.106

10. Joy Harjo, “Bio-Poetics Sketch,” Greenfield Review 9 (1981/1982): p.9
11. Frantz Fanon, The Wretched of the Earth (New York: Grove Weidenfeld, First Evergreen Edition, 1991)

12. Vine Deloria, God is Red: A Native View of Religion (Colorodo: Fulcrum Publishing, 2nd edition, 1994)

13 Joy Harjo in “Secrets from the Center of the World” Stephen Stroms Photographs following the part of In Mad Love and War (Urbino: Quattroventi Press, 1992)

14. Joseph Bruchac, “The Story of All Our Survial,” in The Spiral of Memory; ed. Laura Coltelli (Michigan: The University of Michigan Press, 1996) p.26

15. Ibid., p.24

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০০৯

কবি তাপস গায়েনের কবিতা







ইচ্ছামৃত্যু


বছরের হ্রস্বতম দিনে, এই দেহে লিখে রেখে মুক্তি, আমি যাই শীতনিদ্রায় । সময়ের তীর, প্রেম, আর হারপুন এসে বিদ্ধ করুক আমাকে,কিন্তু আমি থেকে যাব প্রতিরোধহীন নিশ্চুপ জ্যোৎস্নার প্লাবিত দিগন্তে, সেখানে উড়ুক পৃথিবীর সব পরিযায়ি পাখি, উৎসারিত হোক তাদের যাত্রাপথের সকল অভিজ্ঞান । কিন্তু আমি থেকে যেতে চাই মুক ও বধির দক্ষিনায়ণের হ্রস্বতম এই দিনে, বরফ-আচ্ছাদিত পৃথিবীর পথে ।
পরিযায়ি পাখিদের ডানায় আবর্তনশীল সূর্য এখন নিরক্ষরেখার অতি কাছাকাছি, আর আমি আছি তার অধিবিদ্যায় ।পরিভ্রমণ শেষে এখন বিষণ্নতা জেগেছে । অসংখ্য যুদ্ধশেষে, আমার ক্ষত আর অন্যায় যেসকল নারী তাঁদের দীর্ঘ চুলে আর করুণায় মুছে দিয়েছিল একাধিক দিন, সেই উজ্জ্বল নারীরা এখন কোথায় ? বোধকরি, তাঁরা আছেবালিয়াড়িময় কোন গৃহে কিংবা জলাঙ্গীর কোন তটে কিংবা বরফ-আচ্ছাদিত পৃথিবীর কোন পথে । হৃদয়ের বিভূতিতে, বোধকরি, তাঁরা আজো জ্বালে মঙ্গলদীপ অন্য কোন গৃহে । সেখানে ওঠুক জেগে প্রেম, প্রাণের প্রাচুর্য, আর বোধিবৃক্ষ । কিন্তু আমি আছি শীতনিদ্রায় ; পরিযায়ি পাখিদের ডানায়, আবর্তনশীল সূর্যের রথে ।
যদি চাই দেহত্যাগ উত্তরায়ণে, তবে আরও একবার অনুভবে বুঝে নিতে চাই পৃথিবীতে চুম্বকের বেগ, রণনীতি, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নীচে বাতাসের প্রবাহ, পাতাল ট্রেনে অন্ধ গায়িকার গান, আর অভিমুখ সমুদ্র তরঙ্গের । তবু, মাঝে মাঝে ভাবি, কেন এসেছিলাম এই পৃথিবীর পথে । আমাকে করেছে বিদ্ধ যাঁরা অপূর্ব শরশয্যায়, বোধকরি,আমার অপূর্ণ প্রেম থেকে তাঁরা জাত ।
পরিযায়ি পাখি, দক্ষিনায়ণ থেকে উত্তরায়ণে তোমাদের এক যাত্রাপথ শেষ হ’লে, আমি চাই দেহত্যাগ ; যেতে যাই বিস্মৃতির পথে । তবু, ব্যাপ্ত হোক এ পৃথিবী, যেভাবে হয়েছে ব্যাপ্ত রক্তে, প্রেমে, যুদ্ধে, আর মানুষের যৌথ গানে ।

*নিউইয়র্ক
জানুয়ারি ১৭, ২০০৯


বিলাপ : ১

বরফ আচ্ছাদিত এই পৃথিবী এখন মৌন । হরিণের শিঙে উচ্চকিত শূন্যতায় উত্তোলিত এ মৌনতা এখন ঈশ্বরের । কিন্তু তোমার প্রস্থানে আমি নগ্ন, আমি মৌনতর ।
নগ্নতায় একদিন তুমি ছিলে ফেনায়িত- বিস্তৃত, উজ্জ্বল । আমার দেহের উষ্ণতা নিয়ে তুমি চলে গ্যাছো উত্তর মেরুর কোন দেশে কিংবা সূর্য-বলয়িত অন্য কোন ভূগোলে । শরীরের তাপে, আমি জানি, আজও তুমি আছো উষ্ণ, রংধনুময় উজ্জ্বল । আমার আত্মাকে কতোবার ক্ষত-বিক্ষত করেছ ঠোঁটে, দাতে, আর আশ্লেষে । সব আক্রমণে বর্মহীন থেকে গেছি । তবু ক্রন্দন শিখিনি, যেমন কাঁদেনি তীরবিদ্ধ একিলিস কিংবা শরশয্যায় ভীষ্ম । সকল শরীরজুড়ে এখন পরিভ্রমণতাই ব্যাপ্ত ।
বেণুবন, গিজঝ্কুট, জীবকাম্ববন, আর আপনার প্রিয় নগরী বৈশালী ছেড়ে,তথাগত- আপনি চলে গেছেন বর্ষা অতিক্রান্ত, জ্যোৎস্নায় প্লাবিত মল্লদের শালবনে, আপনার অন্তিতম শয়নে । ভন্তে, আমি আপনার শমনদের মতোভিক্ষাবৃত্তি শিখিনি ; শিখিনি সংঘবৃত্তি । অর্ধঘুম আর জাগরণের মাঝে তবু কে আমাকে ডাকে ? বরফ পতনের শব্দে আমি রাতভর জেগে থাকি ।
এই রাতে নিজেকে আবৃত করেছি শীতবস্ত্রে আর অসংখ্য স্মৃতির ব্লাংকেটে । শীত তবু সর্বাশ্রয়ী, ব্যাপ্ত আমার শরীরে। প্রতিরোধহীন আমি, এই বুঝি আমার স্বভাব । একদিন তুমি এসেছিলে বিক্ষুদ্ধ ঝড়ের মতো ক্রন্দনরতসৌম্যময় আমার শরীরে । আমার উষ্ণতা মেখে তোমার শরীর নিয়ে চলে গ্যাছো অন্য এক আনন্দ-বন্দরে । আমারত্বকে নির্মিত পোশাকে তুমি আবৃত করেছো নিজেকে, কিন্তু আমি আছি নগ্ন, বরফাচ্ছাদিত, মৌন ।

নিউইয়র্ক
ডিসেম্বর ২০, ২০০৮


বিলাপ : ২

ছেড়ে যাই শরীরের পুরানো বাকল, দেহভষ্ম, পূর্বজন্মের স্মৃতি ; তীর, হারপুন ; আর পরিশেষে বেদ ও বাইবেল । যে মমীর প্রাণে হাত রেখে এতোদিন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, সেই হাতে আজ সবুজ ঘাসের স্ফুর্তি, আর সেই অন্ধ কুঠুরিতে এখন গুঞ্জরণরত আবর্তনশীল সূর্যের মৌমাছি । বিষণ্নতার বিরুদ্ধে জেগেছি নগ্নতায়, সমুদ্র ফেনায় উজ্জীবিত আমি ।
যে অনিঃশেষ ক্রন্দন ছিল তোমার, তাকে একদিন আমি এই দেহে গ্রহণ করেছি,এবং তোমার ক্রন্দন হলো আমার । বিষণ্নতা যদিও ক্রন্দনের অবশেষ, অনুভবের শেষ তাম্রলিপি, তবু তাকে আমি কীভাবে এড়াই ? তাই পরিভ্রমণ শিখেছি, কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করিনি । তথাগত, আপনার নারীরা চলে গেছে প্রব্রজায় নয়তো অন্য এক আনন্দ-বন্দরে, যেখানে শিশ্নতার অভিষেকই মূখ্য । ভন্তে, দিনশেষে আমার গৃহে জ্বলেনি মঙ্গলদীপ । আমার মন্দির তাই নগরীর পানশালা- সময়ের অস্থির বুদ্বুদ । দেখেছি এখানে সাম্যের ভিত্তি, যদিও চিন্তার ভ্রান্তিই আমার মৌল সত্তা এবং আমার দেহের শেষ অভিজ্ঞান । এখন সমুদ্র ফেনায় উজ্জীবিত আমি ।
এ নগরীর প্রতিটি ধুলিবিন্দু ছিল তোমার দেহের ছায়ায় আচ্ছাদিত । অস্তিত্বের প্রগাঢ় আলোয় আমি খুঁজেছি তোমাকে একদিন । এখন উজ্জ্বল দিন, ফেনায়িত মানুষের অনন্ত প্রবাহে আমি আছি শুশুক আনন্দে । ভন্তে, জন্মান্তরে নির্বাণ যদি সত্য, তবে একদিন আমিও তথাগত । আপাতত চলে গেছে আমার প্রেয়সী, কিন্তু আজও আছে অন্ধ গায়িকার সঙ্গীত আর সাবওয়ের ধাতব চিৎকারে সেই সঙ্গীতের অশেষ বিচূর্ণি । প্রভু, আমি জন্মান্তর বুঝিনি । নারী, যে ছিল আমার প্রেয়সী, প্রকৃত প্রস্তাবে সে কখনো ছিলোনা আমার । মনে নেই পূর্বজন্মের স্মৃতি । আমি আছি এই রাতেরগভীরে, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নীচে, উচ্ছ্বসিত অগুনিত সমুদ্র-তরঙ্গে, সন্তরণরত হাঙ্গরের সাথে ।

*নিউইয়র্ক
ডিসেম্বর ২৭, ২০০৮


আত্মপ্রতিকৃতি : ১

.....এবং আমার মা’র মৃত্যু ছিল জলের স্রোতের মতো স্বাভাবিক, তাঁর কান্নার মতো শব্দহীন । যে অবিশ্বাস্য পতনের কাছে আমি মূক আর বধির, সে তো নির্ভার পতন যা ধরে রাখে গোধূলির রং, অনন্তেতর ধ্বনি । মৃত্যু সে তো শব্দহীন, যা ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো রহস্যময় এবং ভালোবাসার মতো ভ্রান্তিহীন । জোয়ারের জলে মা’র মুখচ্ছবি ভাসে, তবু বীরশ্রেষ্ঠ কর্ণের মতো আমি আমার প্রমিতিকে প্রত্যয় করে উৎসর্গ করতে পারিনি ; যুদ্ধক্ষেত্রে অমিমাংসিত থেকেছি । নদীকে কেবলি বিস্তৃত হ’তে দেখেছি সমুদ্রের দিকে, বোধ থেকে গেছে বোধিহীন । অনুভবে সমুদ্রকে জেনেছি, আর দেখেছি নদীর অবগাহনের বেগ, রংধনুময় তার ব্যাপ্তি, আর ব্যাপ্তির উচ্ছ্বাস । বাতাসের প্রবাহ আর মানুষের সঙ্গীত সেই উচ্ছ্বাসেরই দৃশ্যাতীত প্রকৃতি । বরফ আচ্ছাদিত পৃথিবীর পথে স্থাণুর মতো বাইসনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি দীর্ঘকাল ; মনে হয় এইভাবে থম্কে গেছে মহাকাল একবার, উদ্ভ্রান্তিতময় আমার কান্নায় । আমি তো নই কোন প্রেমিক, যে খুঁজে ফিরছে একটি নদী কিংবা একজন নারী কিংবা বৃক্ষছায়ায় আচ্ছাদিত একটি বাড়ি । তবু পাতার বিন্যাস নিয়ে পৃথিবীর এক গৃহকোণে আমার জন্ম । বোধকরি, মা’র পুনর্জন্ম আমার জন্মেরই আর এক ব্যাপ্তি, ব্যাপ্তির প্রত্যয় । কিন্তু আজকাল মা’কে আর দেখিনা ; এবং পথের দিকে তাকালে পথকেও আর দেখা হয়ে ওঠেনা, কেবলি মানুষের মুখাবয়ব ভাসে । মনে হয়, একদিন রথের মেলায় আমিও ছিলাম । এখন রথ চলে গেছে বহুদূর, যেন ধূলিধূসরিত সৌরজগতের আরেক ধূসর বিন্দু । ভোর কী সৌরজগতেরই এক অনিবার্য প্রকাশ না কী মৌমাছির গুঞ্জনে আহ্লাদিত এক পৃথিবী যার সাথে কখনো আমাদের ভ্রান্তির পথে দেখা হয় । পাখিদের ঠোঁটে পৃথিবীর যে জাগৃতি, মানুষের পায়ে যে কোলাহল, বাতাসে যে ব্যাপ্তি, কোন আনন্দে তার অশেষ বিলুপ্তি ? রাত আরও দীর্ঘতর হোক, এই প্রার্থনায় মাঝে মাঝে উজ্জীবিত হয়ে উঠি ; ভাবি : ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠার চেয়ে অনেকটা সময় ওয়াশিংটন স্কয়ারে ল্যাম্পপোষ্ট হ’য়ে দাঁড়িয়ে থাকি । আমার চোখের পাতায় যদি জাগে কুয়াশা, তবে কুয়াশা হয়ে উঠুক বরফ একদিন, আর বরফ হয়ে উঠুক জল আর জলের প্রবাহ, চেতনায় জাগ্রত কোন বিশ্বে । তবু ভোর হ’লে দেখি কাজের প্ররোচণা আছে । বোধকরি, প্রয়াসও আছে কিন্তু নেই কোন অনুপ্রেরণা । সূর্যের পাখনায় গুনগুন কর্ছে কাল, গোধূলির স্মৃতিতে থেমে আছে মহাকাল । বাতাস ডেকে নিয়ে যায় আমাকে ইউনিয়ন স্কয়ার থেকে ব্যাটারি পার্কের দিকে । এরই মাঝে ভূগর্ভ-ট্রেনের আমি যাত্রি ; আর যখন হাঁটি, আমি তখন নিউইয়র্কের অলীক মেয়র, অবয়বহীন । আর এইখানে, হাডসন আর ইষ্ট রিভারের সঙ্গমস্থলে, গাঙচিল ভাসে বারোমাস, ক্লান্তিহীন । বাতাস এবং জলের শব্দ নগ্নতাকে নাড়ে ; জেগে ওঠে ভ্রাম্যমান মানুষের হৃদয় । একদল সফল ইঁদুর চলে গেছে ফেরী দিয়ে অন্য কোন দ্বীপে। আরও আছে অনেক ইঁদুর ম্যানহাটানের রেস্তরাঁয়, বইঘরে, আর যত্রতত্র যৌনতায়। নির্ঘুম আমার চোখে জাগে রাত : রাতভর জাগে জল, জলের প্রবাহ, নক্ষত্র, আর সৌরঝড় । শিশুদের ঘুমের গভীরে মনে হয় ডুবে আছে নিউইয়র্ক : অমাময়ী আমার নগরী ; কিন্তু রাতকে বিদীর্ণ করে আম্ব্যুলেন্সের আর্তি আর সেইক্ষণে আমার মৃত্যুর নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি শুনি ।

*নিউইয়র্ক
জানুয়ারি ১৫, ২০০৮


আত্মপ্রতিকৃতি : ৩

মৃত্যুর আগে মানুষ কী খুব কাঁদে, জলপ্রপাতের নিচে দাঁড়িয়ে এই সাদৃশ্যের কথা ভাবি, কিন্তু বয়ে যায় জল । সতী নির্মাণের জন্য কতোবার জেগেছে শ্মশান ! পুড়েছে ফুল, বেলপাতা, চন্দনকাঠ, আর শিশুকণ্যার কোমল অস্থি ! অগ্নি এসে নিয়ে গেছে মানুষের একান্ত প্রত্যয় আর তাঁর প্রকৃতির পরম আকৃতি। অগ্নি ও বায়ুর অশেষ মৈথুন শেষে দেখেছি আকৃতির নব উদ্বোধন, নবতর বিন্যাস । ভাঙ্গা কলসি, কালো ছাই, অর্ধদগ্ধ কাঠ, ইত্যাকার নিয়ে পরিত্যক্ত শ্মশানে যে উত্তাপ, সে উষ্ণতা মেখে ফিরেছে যে একাকী মানুষ, মুখে তার ভাসে কালো ছাই । এখন নিশ্চল রাতের নীচে ক্ষীণকায়া নদী বয়ে যায়, আর দাঁড়িয়ে থাকে ভাঙ্গা সাঁকো, যেন শ্রান্ত জনপদ । শীতের দীর্ঘ রাত, স্বপ্নে জেগে ওঠে ঘুড়ি, অনুভবে আসে দীর্ঘ সুতার টান। কে আমাকে টানে, কেন টানে,চলেছি দৃশ্যাতীত কোন ধূলিঝড়ের সন্ধানে ? ভেসে ওঠে পিতৃমুখ, মৃত্যুপূর্ব তাঁর মৃদু কণ্ঠস্বর শুনি। অভিমানী মা চলে গেছে বহুদিন, যেন শব্দহীন বরফ পতন । তুষারাচ্ছাদিত পৃথিবীর এ পথকে নিতান্তই স্বপ্ন মনে হয় । এ পৃথিবী কী এক, না কী একাধিক, না কী ক্রম প্রসারমান কোন এক আত্মার গান ? কোন সাদৃশ্যের ভূমিতে জেগে ওঠে রংধনুময় আমার শরীর ? দিগন্তে প্রতিধ্বনিত যে গান, সে কী আমারই চিৎকার না কী পরাজিত
কোন সৈনিকের অমিমাংসিত ক্রন্দন ?
অশেষ ক্রন্দন শেষে ম্যানহাটানের পথে জেগেছি আবার : দেখি কর্মযোগ, প্রেমের আবাহন, শশব্যস্ত ইঁদুরের ভীড় । বিবিধ ভূগোলে বাস আমার প্রতিদিন, যদিও কোথাও নেই আমার তেমন প্রত্যয় । ভ্রমণের কোন অভিপ্রায় নেই; তবু দেখি নিজেকে বইঘরে, কফিহাউসে, পানশালায়, আর সমুদ্রসৈকতে । সঙ্গীহীন কতোবার হারিয়ে গেছি মধ্যরাতে, ইতস্তত টুকরো কাগজের ভীড়ে, নি:সঙ্গ মানুষের গানের একান্তে । সমুদ্রের যে উচ্ছ্বাস তাকে কেবলি বিম্বিত হতে দেখেছি হারিয়ে যাওয়া মানুষের গভীর নিভৃতিতে, বুদ্বুদময় মদের দীর্ঘ গ্লাসে । মানুষের পদযাত্রায় মগ্ন আমি ; তবু ফিরে আসি নিজ গৃহে, যেখানে রাতের গভীরে জাগে স্বপ্ন ; আর বয়ে যায় জল, জলপ্রপাতের ।

নিউইয়র্ক
ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০০৮


ব্রুকলীন ব্রিজ

‘...আই ওয়াজ ওয়ান অফ এ ক্রাউড’ ।*১ ইষ্ট রিভারে আজকাল নেই কোন ফেরী পারাপার এবং আমি নই তার কোন যাত্রী । ব্রুকলীন ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখি হৃদয়ে জেগেছে জলের প্রবণতা, জেটীতে কোলাহল, আর নৌকায় মাস্তুল । পাড়ি দিতে চাই নদী ও নারী, কিন্তু শেষাবধি ম্যানহাটানের ভীড়ে হাঁটি অবয়বহীন, আমি যেন আরেকহুইটম্যান, আবেগের যাত্রী । এখানে, ইষ্ট রিভারের আকাশে গভীর স্থিরতার ভিতরে গাঙচিল ভাসে বারোমাস ।শেষ বিকালের রোদ আর তার গভীর প্রমিতির ভিতরে ডুবে আছে শুভ্র ডানার চাঞ্চল্য আর দ্যুতিময় তার পাখনার উদ্ভাস । নদীর প্রবাহ আছে ; আছে তার বিপুল বেগ ও অবিশ্বাস্য আবেগ, জোয়ারে তার সুপ্রচুর স্ফীতি । আজও সুউচ্চ ভূমি নিয়ে জেগে আছে বৃক্ষাচ্ছাদিত ব্রুকলীন, কর্মপ্রেরণা নিয়ে ম্যানহাটান, আর এই দুই নগরীর মাঝে ইষ্ট রিভারের জলে ভাসে দূরগামী জাহাজ, যেন কোন সুদূর বন্দর অভিমুখী আমার শরীর । নেই শ্মশ্রুমণ্ডিত ইয়াংকি কবি হুইটম্যান : আমেরিকার বাল্মীকি, তবু রয়ে গেছে তাঁর অমিত প্রত্যয় : জলের শরীরে উৎকীর্ণ আছে জীবনের ফেরী। তবু শতাব্দী পেরিয়ে দেখি, জেগে উঠেছে আমাদের দেহের কংকাল, ‘ব্রুকলীন ব্রিজ’ । জলের শরীরে নয়, ব্রুকলীন ব্রিজে লেখা আছে ইয়াংকি জীবনের ফেরী ।
‘দ্য সীগাল’স উইংস শ্যাল ডীপ এ¨ পিভট হিম’ ।*২ গাঙচিল তার পাখনায় বাঁধে এই সেতু আর তার পাখনা থেকে সাদা বৃত্তে ঝরে পড়ে অস্থিরতার আলো । আরও কোন গভীর উত্তেজনা, অশেষ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আত্মহননের দিকে চলে গেছেন হার্ট ক্রেন- ‘ব্রুকলীন ব্রিজ’-এর কবি । শতাব্দী পেরিয়ে যায়, বরফ এসে আচ্ছাদিত করে ব্রিজের গথিক আকৃতি । তবু রাত উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এই ব্রিজের বাহুতে, জেগে ওঠে নক্ষত্রের সারি, আর নদী বয়ে যায় অনন্ত সময়ের দিকে, যেখানে হয়ত অনুপস্থিত থেকে যাবে উচ্চকিত আজকের এই বৈসাদৃশ্যময় চিন্তা । কিন্তু মিমাংসিত হবে কী আমার ক্রন্দন, আমি কী থেকে যাব নামহীন, গোত্রহীন ? উন্মাতাল বাতাসে এই ভাবনা প্রবল, কিন্তু প্রবলতর হ’য়ে ওঠে রয়েবলিং,*৩ তাঁর পুত্র, পুত্র-বধূ, আর শ্রমজীবি মানুষের কথা : তাঁদের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর উন্মাদনায় নির্মিত এই ব্রুকলীন ব্রিজ । আর এর অনেক গভীরে প্রেরণা হয়ে আছে হেগেলের ঐতিহাসিক চিন্তা, তাঁর দ্বান্দ্বিক দর্শন, যা একদিন উজ্জীবিত করেছিল তরুণ রয়েবলিং-এর চৈতন্য । সেই চৈতন্যের সাকার ঈশ্বর এই ব্রুকলীন ব্রিজ, যেখানে দুই বিপ্রতীপমুখী সেতু হয়ে ওঠে একক ঈশ্বর, এই সন্ধ্যায় আমি যার সাকার পূজারী । কিন্তু দেখি সন্ধ্যার এই গভীরে সেতুর কাছাকাছি ফুলবনে ঘুমিয়ে আছে এক বহুবর্ণ প্রজাপতি ।
ব্রুকলীন ব্রিজ, তবে সে কী অস্থির গ্যালাক্সির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র না কী আমার সত্তায় নিদ্রিত এক বহুবর্ণ প্রজাপতি ?

*নিউইয়র্ক
মার্চ ১৫, ২০০৮

*১‘ক্রসিং ব্রুকলীন ফেরী’, ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২)
২‘টু ব্রুকলীন ব্রিজ’ , হার্ট ক্রেন (১৮৯৯-১৯৩২)
৩জন রয়েবলিং (১৮০৬-১৮৬৯) : ব্রুকলীন ব্রিজের মূল স্থপতি ; আমেরিকায় দেশান্তরী হবার আগে জার্মানিতে
দার্শনিক হেগেলের ছাত্র ছিলেন । জন রয়েবলিং-এর অকাল মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র এবং পুত্রবধুর তত্ত্বাবধনে
ব্রুকলীন ব্রিজের কাজ সম্পন্ন হয় ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে ।


নির্বাসন

‘পিছন ফিরে তাকালেই জেগে ওঠে নির্বাসন :’।*১ তাই আমি নির্বাসন শিখিনি । বৎসর অতিক্রান্ত এখনআরেক বছর । ধুলোয় লেখা আমার নাম ইতোমধ্যে বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে । তাই বোধকরি তুমি এখনআমাকে আর খুঁজে পাওনা । কর্ম্মময় দিনের শেষে আমিও আর তোমাকে খুঁজি না । অনেক পরিযায়ি পাখির মতো তুমিও এক যুগ থেকে আর এক যুগে প্রবেশ করেছ ; চলে গ্যাছো এক মহাদেশ থেকে আর এক মহাদেশে । তোমার অভিধানে বদলে গেছে সমুদ্র-সৈকত আর কফিহাউসের নাম । কিন্তু আমি আছি এইখানে, ক্রমশ হ্রস্বমান এই দিনের শেষ প্রান্তে, যখন সুউচ্চ টাওয়ারের শীর্ষে শেষ বিকালের আলো নিভে আসে । আমার পরিচিত পথ কেয়োটিক, দীর্ঘ এবং জনাকীর্ণ, কিন্তু হাঁটি আমি একাকী । তবু, আমি নির্বাসন শিখিনি । পাণ্ডবদের সাথে আমার কোন পরিচয় ছিল না ; কারণ, আমি নই ক্ষত্রিয়।
তুমি আর এখন আমার অনুপস্থিতিতে ব্যথিত নও, সাবওয়ের প্লাটফর্মে একজোড়া উৎসুক চোখ আমি আর দেখিনা । দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর আমি ক্লান্ত, কিন্তু পানশালায় নির্জন একাকী আমার মুখাবয়ব এখন শান্ত । সময় এখন শূন্যতায় গুঞ্জরনরত ।
এই গভীর রাতে বাঘের চোখ এখনও উজ্জ্বল, কিন্তু তার হৃদয়ে জেগেছে রাজহংসীর নীরবতা, যেন রাতের জলাশয় আমাদের আত্মার দর্পণ, যা বাতাসে কেবলি আন্দোলিত হ’তে উন্মুখ । শূন্যতার মাঝে বাতাসের যে গুঞ্জন, সেখানেই জেগে থাকে আমার প্রত্যয়, কর্মক্লান্ত আমার শরীর ।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী । আর যুদ্ধশেষে যোদ্ধারা চলে গেছে যে যার গন্তব্যে । তোমার দৃষ্টির লাবণ্যে এখন জেগেছে শ্মশান, আর আমি আছি তার চিতাকুণ্ডে - অনিঃশেষ এই বর্তমানে । কারণ, আমি নই ক্ষত্রিয় ; পাণ্ডবদের মতো আমি নির্বাসন শিখিনি ।

*নিউইয়র্ক
সেপ্টেম্বর ১৪, ২০০৮
*১মাহমুদ দারবীশ (১৯৪২- )



অভিমন্যু

চক্রব্যূহে আমি : অভিমন্যু - মাতৃহীন, বর্মহীন । তোমাদের কণ্ঠস্বরে ভেঙ্গে পড়ে আমার সকল প্রতিরোধভুলে যাই এ জীবন নিতান্তই কুরুক্ষেত্র ; ভুলে যাই কবে বৃষ্টি হয়েছিল বাংলায়, কবে ওঠেছিল জেগে বিষণ্ন কদমের ফুল । সাবওয়ে ট্রেন চেপে গ্রীষ্ম অতিক্রান্ত এখন সুবর্ণ সময়ের কাল, সময়ের গুঞ্জনে মুখরিত এখন আত্মায় নগ্নতার গান ।
কী অবলীলায় তোমরা বলে যাও তোমাদের কোমরের পরিধি, নিতম্বের বেধ, আর স্তনের স্ফীতি । জেনেছি তোমাদের অন্তর্বাস হালকা গোলাপি কিংবা গাঢ় লাল কিংবা উজ্জ্বল জাফরানি । মন্ত্রমুগ্ধ আমি, এইসব মনে রাখি । পূর্বজন্মে - বোধকরি- তোমরা ছিলে পাখি ; একারণেই তোমাদের কণ্ঠস্বরে সারল্যের এতো কোলাহল, লাবণ্যের এতো প্রমিতি ।
দিনের বৈভব ছেড়ে গোধূলি অতিক্রম করেছি । দূর উপকুলে দাঁড়িয়ে থাকুক ঝাউবীথি, আকাশে জেগে ওঠুক নক্ষত্রের সারি ; তোমাদের কণ্ঠস্বরে মন্ত্রমুগ্ধ, এখন উজ্জীবিত আমি । মস্তিস্কে জাগ্রত হ’তে থাকে নিঃসঙ্গতায় ভরা দিনের বৈভব, পাতাভরা বৃক্ষের দশদিক উজ্জ্বল বিস্তৃতি । আগে কখনো জানিনি জীবনের সব অভিষেক যৌনতারই বিস্তৃতি : তোমাদের কণ্ঠস্বর জাগায় উন্মাদনা, বিপুল বিক্ষোভে রক্তে আনে ঝড়ের জাগৃতি, আর অলৌকিক বাগান থেকে বহুবর্ণ পাতা ঝরে অন্ধকারে, অবিরল আমারই রক্তের প্রবাহে ।
তোমাদের নাম, হ’তে পারে রাধা কিংবা খাদিজা কিংবা মারিয়া, ফিকে হ’য়ে আসে আমার মস্তিস্কের উজ্জ্বল কর্টেক্সে, নিভু হ’য়ে আসে আমার দীপ্ত চোখ, আর অবিরল ধারায় প্রবাহিত হ’তে থাকে জীবনের বেগ, আর অনিঃশেষ আবেগ । ভিজে যায় জাহাজের পাটাতন, জলমগ্ন হ’তে থাকে স্মৃতি, আর রঙের ফানুস ।
সেইক্ষণে মনে হয়- তোমাদের কাছে আমি বর্মহীন : আমি অভিমন্যু।

*নিউইয়র্ক
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০০৮


একলব্য

‘শূদ্রের অলক্ষ্যভেদে নিহত আমার ভগবান’ ।*১ যে জলস্রোত নিয়ে যায় পূর্বপুরুষদের দেহভষ্ম, তোমার প্রতীক্ষা, আর আমার একান্ত প্রত্যয়, সে কী সময় না কী আমার সত্তার অনন্ত বিস্তৃতি ? সূর্য অস্ত যাবার মুহুর্তে সমুদ্র উপকুলেআমার যে অসীম প্রতীক্ষা, সেই বালু-বিন্দু-কালে কে ব্রাক্ষ্মণ আর কে শূদ্র আর কেইবা ভগবান ? শ্রীকৃষ্ণের মন্ত্রণা আর অর্জুনের বাণে বিদ্ধ রক্তাক্ত এই পৃথিবী এখন বৈশ্যের । মহাদেশব্যাপী মানুষেরা বাস্তুচ্যুত, তারা উদ্দালক,তারা পলায়নরত । ধর্ম, জ্ঞান, বেদ-বিভাজন : এসবই চাতুর্য, যুদ্ধ জয়ের কৌশল ।
ছিলাম একদিন অরণ্য গভীরে ; নির্জন, একাকী ; ব্যাপৃত শরনিক্ষপণে, মহাকালের গর্ভে । আমি যদি শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, তবে কেন এই গুরু-দক্ষিণা, কেন এই দক্ষিণ-অঙ্গুষ্ঠ ছেদন ? বস্তু অতিক্রান্ত আমার দু’চোখ এখন ভরে ওঠে রক্তে আর কুয়াশায়। আমি কী আজন্ম নিষাদ না কী জন্মান্তরে তথাগত ?
রাতের শরীর ফুঁড়ে জেগে ওঠে ভোর আর দ্রৌপদীরা জাগে নগ্নতায় । আমার শরীরে জমে ওঠে ধুলো : এঁকে দেয় বস্তুর নিভৃতি আর দেহের বিস্তৃতি । পুণ্ড্রবর্দ্ধন, হস্তিনাপুর, শ্রাবস্তী, চম্পক ইত্যাদি নগর পাড়ি দিয়ে আমি আজ আরেক নগরে, অন্য এক জনস্রোতে । সেই জনস্রোতে আমি হাঁটি প্রেমহীন, জ্ঞানহীন, বোধ- আর বোধি-হীন । এখন আমার তীর করেনা বিদ্ধ সময়ের অভিমুখ কিংবা কোন নারীর শরীর ; দেখি বৃক্ষের পাতারা ঝরে, অবিরল । জীবন ও কর্মের সকল প্রেরণা লুপ্ত ; আমি কী নিষাদ না কী উদ্যমহীন ক্ষত্রিয় ?
চাই প্রস্থান : প্রয়াসহীন, ঘুমের গভীরে । স্বপ্নে ও জাগরণে দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ-বিহীন আমি হেঁটে যাই কুরুক্ষেত্র অতিক্রান্ত সীমাশূন্য সময়ের গর্ভে, ম্যানহাটানের জনস্রোতে । তীব্র শীতের এই রাতে, ঠান্ডা বাতাসের অনুপ্রেরণায়, প্রাণহীন আমি যদি পড়ে থাকি মানুষবিহীন কোন এক চৌরাস্তার মোড়ে, তবে আমার নিথর দেহ কে মুড়ে দিবে লালনের গানে ? আমি নই শূদ্র কিংবা ব্রাক্ষ্মণ কিংবা যবন । আত্নোৎসর্জিত : আমি একলব্য ।

*নিউইয়র্ক
নভেম্বর ২২, ২০০৮
*‘কাল’, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০)


রাত্রিগাথা

ঝরে, বৃক্ষের পাতার মতো মানুষের মুখ- উন্মাদের, শ্রমণের । আর ভ্রাম্যমানতায় জেগে ওঠে গান, বেদনা ও বিলুপ্তির । সময়ের অতল প্রবাহে কীভাবে হারিয়ে যায় কবি ও কথক ? আমাদের কথা অসংলগ্ন, ঝড়ো হাওয়ায় যেন উড়ো পাতা, বিলুপ্তির পথে তার মৃদু অভিঘাত - জাগে জলের প্রবাহে আর কান্নার গভীরে । রাতের অন্ধকার এসে আমাকে জাপ্টে ধরে, যেন ধ্বংসই ভবিতব্য, আমার মুক্তির একমাত্র পথ । তবু অন্ধকারের সুড়ঙ্গ বেয়ে কে যেন আমাকে নিয়ে আসে প্রাচীন বৈশালী থেকে বর্তমান এই পৃথিবীর নাভিমূলে, আলোক-উজ্জ্বল টাইমস্ স্কয়ারে- এই নিউইয়র্ক নগরীতে ! ঘুম ভেঙ্গে গেলে জল পতনের শব্দে সারারাত উন্মুখ আমি, জাতকের উৎসমুখে কান পেতে রাখি, কিন্তু নির্বাণের কোন ধ্বনি-উচ্চারণ নেই । শুধু চাঁদের আলো ইঁদুরের মতো আমার পায়ের ওপর এসে খেলা করে ।
এ কী উটের পিঠে মরুযাত্রা না কী পতনের আগে পৃথিবীর সাথে আমার শেষ কোলাহল ? মানুষের উৎসব আর সময়ের হীমপ্রবাহ- এই যৌথ যাত্রার মাঝে আমি নির্বাক, যেন ট্রেন চলে গেছে আমাকে সাবওয়ের প্লাটফর্মে রেখেনিঃসঙ্গ একাকী, এই শেষ রাতে, কুয়াশা গভীরে । তোমাদের নগ্নতা মনে হয় গ্রেকো-রোমান শিল্পীদের কাজ, লম্বমান ছবি হয়ে আছো পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে কিংবা আছো তোমরা অন্য কোন পুরুষদের আনন্দ-বন্দরে। এই রাত আমাকে করে ভয়ার্ত, শীতল, যদিও ইষ্ট-রিভারের প্রবাহ চলে গেছে বহুদূর ।
আমি কী পৃথিবীকে দেখি, না কী পৃথিবী জেগে ওঠে ইষ্ট-রিভারের জলে, মৃত কোন মাছের চোখে ? কোলগেট টাওয়ারের ঘড়ির কাঁটা ভেসে গেছে শেষ জোয়ারের জলে । জেগে আছে নক্ষত্র, দিকভ্রষ্ট কোন গাংচিল, আর বিশৃঙ্খল জলে উন্মাদ হাওয়ার গোঙানি ।

নিউইয়র্ক