শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০০৯

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম



বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাহানারা ইমামের নাম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ৷ একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনি 'শহীদ জননী'র মযার্দায় ভূষিত হন ৷

অতীতে তিনি রাজনীতি সচেতন হলেও রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ভবিতব্যই তাঁকে রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে৷ স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ ঘাতক-দালালদের পর্যায়ক্রমিক পুনর্বাসনে অপমানিত ও ক্ষুদ্ধ হয়ে জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি' গঠন করেন। তিনি এর আহবায়ক ছিলেন৷ এছাড়া তিনি এ বিষয়ে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে পুণরায় কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন৷ মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক দল ও কর্মীবৃন্দ, দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজ এবং প্রজন্ম '৭১ তাঁর আহবানে এগিয়ে আসেন৷

জাহানারা ইমামের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবার বলতে যা বোঝায়, সেরকম একটি পরিবারেই তিনি জন্মেছিলেন। তাঁর পুরো নাম জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ু। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পরে জুড়�কে জাহান নামে ডাকা হতো।

জাহানারা যখন কিশোরী, তখন খুব পর্দা মানতে হতো মেয়েদের। কোথাও যেতে হলে বাহন ছিল গরুর গাড়ি। বিশাল পরিবার ছিলো তাঁদের। একান্নবর্তি না হলেও শব-ই-বরাত থেকে রোজা-বকরী ঈদ-টানা তিন চার মাস গ্রামে দাদার বাড়িতে গিয়ে থাকতে হতো সবাইকে। দশ থেকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত জাহানারার কেটেছে কুড়িগ্রামে। কুড়িগ্রামে থাকাকালীন জাহানারা ফ্রক পরে রীতিমতো সাইকেল চালিয়ে হুল্লোড়ে মেতে থাকতেন। জাহানারার বয়স বারো পেরোতেই সাইকেল চালানো বন্ধ হয়ে গেলো। নিষিদ্ধ হয়ে গেলো বাড়ির বাইরে পা ফেলা। বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে জায়গা বদল করতে হয়েছে বহুবার- কখনো সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁ, কখনো খেপুপাড়া।

বয়ঃসন্ধিকালে জাহানারার প্রধান আশ্রয় ছিলো বই। নভেল। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট বাবার কল্যাণে বাড়িতে নিয়মিত আসতো পত্রপত্রিকা। জাহানারার পাঠতৃষ্ণাকে উসকে দিয়েছিল দৈনিক আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, আজাদ, ষ্টেটসম্যান, সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠি, ইলাষ্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া, মাসিক ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বসুমতি আর মোহাম্মদী। বাড়িতে কলের গান ছিলো। আর ছিলো হারমোনিয়াম। সপ্তাহে দু�দিন গানের মাস্টার এসে গান শিখিয়ে যেতেন।

এ সময় জাহানারার সকাল দুপুর সন্ধ্যা ছিলো মাস্টার দিয়ে ঠাঁসা। একজন মাসলা-মাসায়েল শরা শরীয়তে হেদায়েত করেন তো আরেকজন আসেন উর্দু পড়াতে। পাঠ্য বইয়ের মাস্টার তো আছেনই। এ সময় জাহানারার জীবনে বিনোদন বলতে শুধু কলের গান। তাঁর বাবা হিজ মাস্টারস ভয়েস-এর একটা গ্রামোফোন ও রেকর্ড কিনে আনবার পর আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমলা ঝরিয়া, আব্বাসউদ্দনি আহমদ, কনক দাস, শাহানা দেবী, যুথিকা রায়ের গান হয়ে উঠলো বিনোদনের সঙ্গী।

গ্রামের দুরন্ত কিশোরী জাহানারাকে মটকা চাচা (বাবার বন্ধু) বেছে বেছে এমন সব বই উপহার দিতেন যেগুলো তাঁর মেধা ও মননের জগৎকে আলোকিত করেছে। দৃষ্টিকে করেছে দিগন্তবিস্তৃত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী শিক্ষা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের জাগরণের প্রচেষ্টা, বেগম রোকেয়ার সাধনা- এসব বিষয়ের ওপর রচিত বইগুলো মটকা চাচাই নিয়ে আসতেন জাহানারার জন্যে। আর বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে জাহানারার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একজন গৃহশিক্ষক। জাহানারা তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব ছিলো ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল আর ইতিহাস পড়ানোর। এই মাস্টারমশাই ছিলেন সাহিত্যপাগল। এই মাস্টারমশাই-এর কল্যাণেই, ওই বয়সেই টলস্টয়, ডস্টয়েভস্কি, ভিকটর হুগো, সেলমা লেগারলফ, শেক্সপীয়র, বার্নাড শ, ন্যুট হামসুন-এর অনেক বইয়ের বাংলা অনুবাদ জাহানারার পড়া হয়ে গিয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়েও জাহানারাকে প্রবলভাবে আগ্রহী করে তুলেছিলেন মাস্টারমশাই। জাহানারার স্বপ্ন ছিলো- বড় হয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাবে। কিন্তু সে স্বপ্ন তাঁর সফল হয়নি। মটকা চাচা বাবাকে বলে কয়ে রাজিও করিয়ে ফেলেছিলেন। ডাকযোগে শান্তিনিকেতনে ভর্তির প্রসপেকটাসও এসে পড়েছিলো। কিন্তু ১৯৪১ সালের ৯ আগস্ট পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর খবর পড়ে জাহানারার শান্তিনিকেতন যাবার স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটলো।

বাড়িতে বাবার কাছেই তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু। শিক্ষা জীবনে তাঁর বাবা সব ধরনের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। পড়াশোনা করতে জাহানারার ভালো লাগতো না। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়তেই তিনি অস্থির- আর পড়বেন না এরকম একটা সিদ্ধান্ত যখন প্রায় পাকা, তখনই মটকা চাচার (বাবার বন্ধু) কাছে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর উচ্চশিক্ষিতা, সভা- সমিতিতে বক্তৃতা দিতে পটু এবং সাহেব-সুবোদের সঙ্গে কথাবার্তায় চৌকস বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের ছবি দেখে মুগ্ধ জাহানারা সিদ্ধান্ত পাল্টালেন- 'আমিও বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের মতো লেখাপড়া শিখব।' -এভাবেই একজন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত গাঁয়ের দুরন্ত কিশোরী জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ুর জীবনে প্রেরণার উৎস হয়ে তাঁর চিন্তায় মননে ও মেধায় জ্বেলে দিয়েছেন আলোর প্রদীপ।

জাহানারা ষষ্ঠ শ্রেণীর দরোজা উতরে গেলেন। তারপর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কারণ, তখন কুড়িগ্রামে মেয়েদের স্কুল ছিল না তাই ছেলেদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে জাহানের নাম থাকবে। সময়মতো তিনি পরীক্ষাও দেবেন; কিন্তু ক্লাস করতে হবে না। বাড়িতে অবশ্য টিচার নিয়োগ করা হলো। দু�জন টিচার। তারা দু�বেলা এসে জাহানারাকে পড়িয়ে যান। ১৯৪১ সালে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে তাঁরা চলে এলেন লালমনিরহাটে। লালমনিরহাটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার সেন্টার ছিলো না। জাহানারা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন রংপুর থেকে। দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করলেন জাহানারা ১৯৪২ সালে। ম্যাট্রিক পাস করে জাহানারা ভর্তি হলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে।

সেখান থেকে আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বিএ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানডিয়াগো স্টেট কলেজ থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমএ পার্ট ওয়ান পাশ করেন ১৯৬২ খ্রিঃ।

জাহানারা ইমামের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মাধ্যমে। সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ১৯৪৮-১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ- এর বিদ্যাময়ী গার্লস হাই স্কুলে কর্মরত ছিলেন। বিয়ের পর ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে সরাসরি প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে আসীন ছিলেন৷ এরপর তিনি বুলবুল একাডেমির কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী সহ আরও দুইটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলার জাহানারা ইমাম আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এসময় জাহানারা ইমাম নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন৷ তিনি বাংলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিষদে জুলাই ১৯৮০ সাল থেকে জুলাই ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলেন। ক্যান্সার অপারেশনের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটে খন্ডকালীন চাকরি করেছেন। এছাড়াও জাহানারা ইমাম ১৯৬০ সালে এডুকেশনাল বোর্ডের প্রতিনিধি হয়ে সিলেবাস সেমিনারে যান পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ারে। পাকিস্তান অলিম্পিক গেমস্-এ খেলোয়ড়দের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন।

জাহানারা ইমাম 'গার্লস গাইড', 'পাকিস্তান উইমেন্স ন্যাশনাল গার্ড', 'খেলাধুলা', 'অল পাকিস্তান উইমেন্স এসোসিয়েশন' এবং বিভিন্ন সমাজকল্যানমূলক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ঢাকা বেতারে উপস্থাপিকা হিসেবে অনেক দিন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। জাহানারা ইমাম বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। তিনি 'ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি মঞ্চে' শেক্সপিয়ারের একটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।

রংপুরের মুন্সিপাড়ার মোহাম্মদ আলী উকিলের কনিষ্ঠ ছেলে শরীফ। এই শরীফের সঙ্গে জাহান-এর একসময় হৃদয় বিনিময় হয়ে যায়। সেকালে দুজন তরুণ-তরুণীর প্রেম ভালোবাসা ব্যাপারটি এখনকার মতো এতোটা সহজ স্বাভাবিকভাবে দেখা হতো না। বিষয়টি উভয় পরিবারে আলাপ আলোচনার পর শরীফ-জাহানারার প্রেম অবশেষে পারিবারিক স্বীকৃতি পেলো। শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা বেগমের বিয়ে সম্পন্ন হলো ১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট। শরীফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।

১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ জাহানারা ইমামের কোল জুড়ে আসে শাফী ইমাম রুমী। এই রুমীই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন দুঃসাহসী গেরিলার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করে শাহাদৎ বরণ করেন। স্বাধীনতার পর শহীদ রুমী বীরবিক্রম (মরণোত্তর) উপাধিতে ভূষিত হন। প্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে ঘিরেই জাহানারা ইমাম রচনা করেন অমর গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি'। জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফ ইমামকেও পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মম নির্যাতন করে আহত অবস্থায় মুক্তি দেয়। বিজয়ের মাত্র তিনদিন আগে শরীফ ইমাম হৃদরোগে ইন্তেকাল করেন। জাহানারা ইমামের জীবিত একমাত্র সন্তান সাইফ ইমাম জামীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর। জামী বর্তমানে বিদেশিনী স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অঞ্জলি নামের একটি মেয়ের কথা। কলেজে জাহানারা ইমামের সহপাঠী অঞ্জলি। এই অঞ্জলির মাধ্যমেই কমিউনিজমের পাঠ নেন জাহানারা ইমাম। অঞ্জলি তাঁকে এ সংক্রান্ত বইপত্র পড়তে দিতো। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট যথেষ্ট উদার হলেও 'কমিউনিস্টদের পত্রিকা 'জনযুদ্ধ' দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্ৎসনা করেছিলেন। মেয়ে রাজণীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকুক এটা তাঁর বাবা চাননি। শরীফও চাননি। তাই জাহানারা রাজনীতির পথ ত্যাগ করেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেড়ে নিলো তাঁর বুকের মানিক রুমীকে। প্রিয়তম স্বামী শরীফকে। পুত্র এবং স্বামী হারানোর কষ্টকে বুকে ধারণ করে বেঁচে ছিলেন তিনি। আশির দশকের শুরুতে, ১৯৮২ সালে তিনি আক্রান্ত হলেন দুরারোগ্য ব্যাধি ওরাল ক্যান্সারে। প্রতি বছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো তাঁকে। এভাবেই যাচ্ছিলো তাঁর দিন। মুখের ক্যান্সার কেড়ে নিয়েছিলো অপরূপ লাবণ্যময়ী এই নারীর মুখশ্রীর অনিন্দ্য সৌন্দর্য।

মরণব্যাধি ক্যান্সারের সংগে লড়াই করতে করতে অন্য আরেকটি লড়াইয়ের জন্যে মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিলেন জাহানারা ইমাম। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের লোভ এবং অদূরদর্শিতার কারণে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র একাত্তরের ঘাতক দালাল রাজাকার আলবদরদের ক্রমশঃ উত্থান তাঁকে বিচলিত করে তুলেছিলো। ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী- মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির এই উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন জাহানারা ইমাম, আশ্চর্য সাংগঠনিক দক্ষতায়। মাতৃত্ব থেকে অবলীলায় তিনি চলে এলেন নেতৃত্বে।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি' গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি' গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। দেশের লাখ লাখ মানুষ শামিল হয় নতুন এই প্লাটফর্মে।

এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ 'গণআদালত'-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেন : সর্বজনাব এডভোকেট গাজিউল হক, ডঃ আহমদ শরীফ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বেগম সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী নূরুউজ্জামান, লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিষ্টার শওকত আলী খান। সেদিন পুলিশ ও বিডিআরের কঠিন ব্যারিকেড ভেঙ্গে বিশাল জনস্রোত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে পড়েছিলো। সেই বিশৃঙ্খল পরিবেশে বর্ষীয়ান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও কথাশিল্পী শওকত ওসমানকে গণআদালত মঞ্চে (ট্রাকে) উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি বলে মাওলানা আবদুল আউয়ালকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে গণআদালত সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবী সংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। চিন্তায় চেতনায় মননে ও মেধায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালনকারী ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করলে আন্দোলনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সংসদে ৪ দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। তবে এ চুক্তি কার্যকর হয়নি আজও।

২৮ মার্চ ১৯৯৩ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম। তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান রাজপথে। সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে যান পিজি হাসপাতালে। ক্যান্সার আক্রান্ত বর্ষীয়ান শ্রদ্ধেয়া জননেত্রী চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবায় সেরে ওঠেন। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্রপত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিসবে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৬ মার্চ ১৯৯৪ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাসেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন : সর্বজনাব শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহউদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শাফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়।

এ সময় খুব দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২ এপ্রিল ১৯৯৪ চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন জাহানারা ইমাম। ২২ এপ্রিল ওখানকার চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছেন তিনি। মৃত্যুশয্যায় শায়িত থেকেও মনোবল হারাননি জাহানারা ইমাম। হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় শায়িত থেকেও কাঁপা কাঁপা অস্পষ্ট হাতে ডায়রি লিখতেন। বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাঁর। এ সময় ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। সুলিখিত চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন আন্দোলন বিষয়ে। রসিকতাও করতেন ঐ চিরকুটের মাধ্যমেই। ২২ জুনের পর থেকে শহীদ জননীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। অবশেষে দেশবাসীকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়ে ২৬ জুন ১৯৯৪ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্রয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

৪ জুলাই বিকেলে শহীদ জননীর মরদেহ বাংলাদেশে আসে এবং ৫ জুলাই সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদ জননীর কফিন রাখা হয় জনগণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যে। দুপুরে যোহরের নামাযের পর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাযে জানাযা শেষে শহীদ জননীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে সমাহিত করা হয় এ সময় মুক্তিযুদ্ধের ৮জন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লেখক জাহানারা ইমামের আত্মপ্রকাশ। প্রথমে তাঁর পরিচয় ছিলো একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। ছোটদের জন্যে খুব প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই তিনি অনুবাদ করেন। বইগুলো পাঠক সমাদৃত হয়। তবে 'একাত্তরের দিনগুলি' রচনা করে তিনি পৌঁছে যান পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে। তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে-

১। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের 'লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরীর' সিরিজের অনুবাদ 'তেপান্তরের ছোট্ট শহর'।
২। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় একই সিরিজের 'অন দ্য ব্যাঙ্ক অব প্লাম ক্রীক' এর অনুবাদ 'নদীর তীরে ফুলের মেলা'।
৩। ১৯৬৭ সালে সাতটি কিশোর গল্পের সংকলন 'সাতটি তারার ঝিকিমিকি' প্রকাশিত হয়।
৪। ১৯৬৮ সালে কনরাড রিক্টার-এর 'দ্য টাউন'-এর অনুবাদ 'নগরী' প্রকাশিত হয় ।
৫। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় কিশোর উপন্যাস 'গজকচ্ছপ'।
৬। ১৯৮৩ সালে বিদেশীদের বাংলা শেখার বই 'এ্যান ইনট্রোডাকশন টু বেঙ্গলী ল্যাংগুয়েজ এ্যান্ড লিটারেচার' (পার্ট ওয়ান) প্রকাশিত হয়।
৭। ১৯৮৩ সালে 'ডালাস' অনুবাদ করেন।
৮। ১৯৮৫ সালে শৈশব এবং যৌবনের স্মৃতিকথা 'অন্য জীবন' প্রকাশিত হয়।
৯। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ৭জন বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে জীবনী গ্রন্থ 'বীরশ্রষ্ঠ'।
১০। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় 'বুকের ভেতর আগুন'।
১১। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় ডায়েরি আকারে লেখা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় স্মৃতিকথা 'একাত্তরের দিনগুলি' । এই গ্রন্থটির কারণে জাহানারা ইমাম দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন ।
১২। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্পের বই 'জীবন মৃত্যু' প্রকাশিত হয় ।
১৩। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় 'একাত্তরের দিনগুলি'-র কিশোর সংস্করণ 'বিদায় দে মা ঘুরে আসি'।
১৪। ১৯৮৯ সালে শেক্সপীয়ারের 'ট্রাজেডি'-র কিশোর সংস্করণ 'চিরায়ত সাহিত্য' প্রকাশিত হয়।
১৫। ১৯৯০ সালে 'নাটকের অবসানে' প্রকাশিত হয়।
১৬। ১৯৯০ সালে 'দুই মেরু' প্রকাশিত হয়।
১৭। ১৯৯০ সালে 'নিঃসঙ্গ পাইন' প্রকাশিত হয়।
১৮। ১৯৯০ সালে 'নয় এ মধুর খেলা' প্রকাশিত হয়।
১৯। ১৯৯০ সালে একাত্তরের দিনগুলির ইংরেজি অনুবাদ 'অব ব্লাড এন্ড ফায়ার' প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেন প্রয়াত পররাষ্ট্র সচিব মুস্তাফিজুর রহমান।
২০। 'মূল ধারায় চলেছি' ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়।
২১। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'ক্যান্সারের সাথে বসবাস'।
২২। ১৯৯২ সালে ডায়েরি আকারে লেখা স্মৃতিকথা 'প্রবাসের দিনলিপি' প্রকাশিত হয়।

সংসার জীবন এবং লেখক জীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জাহানারা ইমাম নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। সাংবাদিকতার সংগেও যুক্ত ছিলেন। কলাম লিখতেন দৈনিক বাংলায়। টিভি সমালোচনা লিখেছেন সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে দর্শকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন মিষ্টভাষী সুদর্শনা জাহানারা ইমাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে অর্থাৎ পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রায় নিয়মিতই টিভি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন; কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে জাহানারা ইমাম আগ্রহ বোধ করেননি।

জাহানারা ইমামের জীবন দর্শন ও সাহিত্য বৈশিষ্ট্য : তিনি তাঁর নিজের জীবনকে দূর থেকে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে অবলোকন করবার ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে নিজেকে অবলোকন করার অনন্য দৃষ্টান্ত 'অন্যজীবন' ও 'ক্যান্সারের সাথে বসবাস' বই দুটি। মুক্তিযুদ্ধের দলিল 'একাত্তরের দিনগুলি'-তে রুমী শুধু প্রতীক, মা জাহানারা কেবল প্রতিনিধি। এটি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কাহিনী, সমগ্র বাংলাদেশের পুত্রহারা জননীদের বেদনার ইতিহাস। জাহানারা ইমামের জীবন দর্শন ছিল, বাংলাদেশকে রাজাকারমুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়া। জীবনবোধ ছিল অসাম্প্রদায়িক। আমরা সবাই মানুষ, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত জীবনবোধ শান্তির পারাবত। একতাই বল, এটা তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি জানতেন সকল শক্তির উৎস জনতা। জনতার রায় কখনো মিথ্যা হতে পারে না। তাই তিনি জনতার সাথে রাজপথে নেমে গিয়েছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর জীবন দর্শন থেকে, জীবনের আদর্শ থেকে একচুল সরে যাননি। জনতার হাতে তাঁর সংগ্রামের ভার সঁপে দিয়ে গেছেন।

জাহানারা ইমাম বিভিন্ন সময় নিম্নোক্ত পুরস্কার /পদকে ভূষিত হন-

১। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার - ১৯৮৮ সালে।
২। কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার - ১৯৮৮ সালে।
৩। বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার - ১৯৯১ সালে।
৪। আজকের কাগজ হতে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার - ১ বৈশাখ, ১৪০১ সনে।
৫। নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা - মার্চ, ১৯৯৪ সালে।
৬। স্বাধীনতা পদক - ১৯৯৭ সালে।
৭। রোকেয়া পদক - ডিসেম্বর, ১৯৯৮ সালে।
৮। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার - অক্টোবর, ২০০১ সালে।
৯। ইউনিভার্সাল শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার - ২০০১ সালে।
১০। শাপলা ইয়ূথ ফোর্স
১১। কারমাইকেল কলেজ - গুণীজন সম্মাননা
১২। মাস্টারদা সূর্যসেন পদক
১৩। মুক্তিযুদ্ধ উৎসব-ত্রিপুরা সাংগঠনিক কমিটি
১৪। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
১৫। রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
১৬। বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার - ২০০১ সালে।
১৭। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংঘ
১৮। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

তথ্যসূত্র-
১. শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মারকগ্রন্থ, লুৎফর রহমান রিটন, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৫ সাল।
২. শত বছরের বাংলাদেশের নারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, নারী গ্রন্থ প্রর্বতনা, ২০০৩ সাল।
৩. স্মরনীয় ব্যক্তিত্ব, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশক - আশি বছর পূর্তি উদযাপন কমিটি, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৮ সাল।
৪. জাহানারা ইমাম (জীবনী গ্রন্থ)- তাহমীদা সাঈদা।

গবেষক : গুণীজন দল

রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০০৯

জাহানারা ইমাম : যাঁর মৃত্যু নয়, জীবনটাই সত্য


ইফতেখার আমিন

(০১)

বেদনার মতো নীল আকাশে স্বপ্নের মতো ভাসছিল ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। অসংখ্য মানুষের বিষন্ন চোখ তার মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল একটি বিমান। দীর্ঘক্ষণ থেকে রোদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। তারপর সূর্য যখন হেলে পড়েছে, ম্লান হয়েছে রোদ, আকাশের গায়ে ভাসতে দেখা গেল বিমানটিকে। আপেক্ষমান মানুষের মধ্যে তখন স্তব্ধ-গম্ভীর উত্তেজনা। ক্রমশই বড় হয়ে উঠছিল বিমানের অবয়ব। একসময় স্পষ্ট দেখা গেল বিমানের রং টি আকাশের মতোই সাদা আর নীল।

বিকেল চারটা পঞ্চাশ মিনিটে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ বিএ-১৪৮ নম্বর ফ্লাইটের ৭৪৭ বিমানটির চাকা স্পর্শ করল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে। তারপর দৌড়ে এসে থামলো রানওয়ের ঠিক উত্তর মাথায়। কান ফাটানো গর্জন থামতেই দরজা খুলে গেল বিমানটির। জুড়ে দেয়া হলো সিঁড়ি। যাত্রীরা নামতে শুরু করলেন একে একে। হয়তো তাদের অনেকেই জানেন না তাদের সঙ্গে আরো একজন ফিরে এসেছেন চিরতরে তাঁর আপনার মাতৃক্রোড়ে। কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না সিঁড়ির মাথায় হাত উঁচিয়ে দাঁড়াতে। যাবে না আর। তার এখন অন্য পথে আগমন, অন্য গৃহে শয্যা।

উল্টোদিকে, বিমানের ডানপাশে খুলে গেল সেই দরজা। নীল রঙের কনটেনার বেরিয়ে এলো বিমানের পেট থেকে। অপেক্ষমান মানুষের দৃষ্টি এই দ্বিতীয় দরজায়। প্রথমে ছোট আকারের তিন-চারটা কনটেনারের পর বেশ লম্বা বড় একটা কনটেনার বেড়িয়ে এলো বিমান থেকে। নড়েচড়ে উঠলো অপেক্ষমনাদের দল, তবে কি এই সেই প্রতিক্ষার ধন। এই দীর্ঘকায় কনটেনারে চড়েই কি প্রথম আর শেষ বারের মতো নিজ ভূমে ফিরলেন সকলের পরম শ্রদ্ধেয়া, বাংলার শহীদ জননী জাহানারা ইমাম! তারিখটা ৪ঠা জুলাই ১৯৯৪। যদিও দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে বিরুদ্ধ বসবাসে অবশেষে অবসিত হলেন ১৯৯৪ সালের ২৬শে জুনে লক্ষ হাজার মাইল দূর পরদেশে।

(০২)

জুড়ু– ওরফে জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩মে মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে ,ত্রিশ-চল্লিশ দশকের রক্ষণশীল বাঙালী পরিবার বলতে যা বোঝায় তেমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জুড়ু–র বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক। কিন্তু জুড়ু–র দাদা ছিলেন সেকালের আমলের বিশ্বাসে বিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মেয়েদের বাংলা পড়াটা ছিল গুনাহ্ -র কাজ। তাই তাদের বাড়িতে কেবল কোরান শরীফ পাঠ করানো হতো। স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি বলে ডেপুটি সাহেব তার চার মেয়েকে ঠিক ঠিক শিক্ষিত করে তোলেন সমস্ত পারিবারিক আর সামাজিক সংস্কারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
পড়াশোনা করতে জুড়ু–র ভালো লাগতো না। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়তেই সে অস্থির- আর পড়বে না এমন একটা সিদ্ধান্ত যখন প্রায় পাকা, তখনই মটকা চাচার ( বাবার পুরনো বন্ধু) কাছে জওহরলাল নেহেরুর বোন – উচ্চশিক্ষিতা, সভা সমিতিতে বক্তৃতা দিতে পটু এবং স্টেটম্যান পত্রিকায় হাতাকাটা ব্লাউজ আর ববছাঁট চুলের- বিজয়লক্ষী পন্ডিতের ছবি দেখে মুগ্ধ জুড়ু সিদ্ধান্ত পাল্টালেন- আমিও বিজয়লক্ষীর পন্ডিতের মতো লেখাপড়া করব!

সেই যেন শুরু। তারপর আমৃত্যু যিনি নিজের সাথে নিজেও আপোষ করেননি। জীবনের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যিনি থেকেছেন পাহাড়ের মতো অটল। ভবিতব্যের মুখোমুখি হবার অপার সাহস নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

জাহানারা ইমাম ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট অন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. করেন। তারপর টানা ১৪বছর শিক্ষকতা করেছেন ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুল ও ঢাকা সিদ্ধেরশ্বরী গার্লস স্কুল সহ তিনটি স্কুলে। দু’বছর অধ্যাপনা করেন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে।

(০৩)

স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিলো জীবন। রাজনৈতিক মতবাদ থাকলেও তার বাবা চাননি মেয়ে রাজনীতি করুক, চাননি আরও একজন-শরীফ ইমাম। ফলশ্রুতিতে শরীফ-জাহানারা জুটিও পারিবারিক বিধিনিষেধের গ্যাড়াকলে আটকে গেলো। এরকম টানাপোড়েনে পরে জাহানারা ইমাম অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন-

“আমি অনেক বিভ্রান্ত চিন্তাভাবনা ও নিঃসঙ্গ অশ্রুজলের ভেতর দিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম যে আব্বাকে অসন্তুষ্ট করে ,শরীফকে অসুখী করে অনিশ্চিত রাজনীতির পথে পা বাড়ানোর আদর্শ আমার নেই। আমি আমার প্রেমকে ত্যাগ করতে পারলাম না, আমি আমার অস্ফুট, অপরিনিত রাজনৈতিক মতাদর্শকেই ফিরিয়ে দিলাম।”

কলেজ জীবনে নেয়া এই সিদ্ধান্তে আজীবন অটল থাকতে পারেননি জাহানারা ইমাম। তাঁর মাঝে আগুন ছিলো, সে আগুন বরাবরই ছিলো নাকি একাত্তরে প্রতিদিন একটু একটু করে সংগৃহীত হয়েছে সমাধি- তারপর তা ধিকিধিকি জ্বলেছে আগুনে, আর দাবানলের মতো দেখা দিয়েছে বিশ বছর পর। “একাত্তরের দিনগুলো” যিনি পড়েছেন তিনি জেনেছেন জাহানারা ইমাম থেকে শহীদ জননীতে তাঁর রূপান্তরের ইতিহাস।
স্বামী, দুই পুত্রসন্তান,আত্মীয়-পরিজন নিয়ে সুখে আর স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার ছিলো তাঁর। একাত্তর এসে উপড়ে নিল তার শান্তি আর স্বস্তির ভিত। ছেলে যুদ্ধে যাবে। ছোট ছেলে জামীকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি নিজে। পেছনে শরীফ আর রুমী। কতটা ইস্পাত কঠিন মনোবলের আধিকারী হতে হয় এই স্বদেশের জন্য যাত্রায়। সেক্রেটারিয়েটের সেকেন্ড গেটের কাছে এয়ারব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমে গেলো সূর্যের মতো পুত্র রুমী। পেছনে তাকাতে নিষেধ ছিলো । রিয়ারভিউ মিররে তাকে দেখার চেষ্টা সফল হলো না। জনস্রোতে ততক্ষণে সে মিশে গেছে।

লোহার সাঁড়াশি যেন পাঁজরের দু’পাশে চেপে ধরে মায়ের, নিশ্বাস আটকে আসে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার উপায় নেই। রুমী ফিরে আসে অল্পক্ষণের জন্য, আবার চলে যায়। মার্কিণ নভোচারীদের চন্দ্রাভিযান দেখে মায়ের মনে হয় আহা! তিনি যদি একটা টুটো-ফুটো আকাশযান পেতেন তাহলে কয়েক মাইল দূরে মেলাঘরে গিয়ে এক পলক দেখে আসতেন ছেলেকে। কিন্তু তা হয়না। মা নিজেই নেমে পড়েন কাজে। খবরা-খবর আনা নেয়া, কাপড় চোপড় ওষুধপত্র সংগ্রহ আরো কতো কি! তারপর আসে সেই ভয়াল দিন – ২৯শে আগষ্ট। বাড়ি ঘেরাও করে পাকিস্তান বাহিনী, ধরে নিয়ে যায় রুমী,জামী, শরীফ কে। দুদিন পরে ফিরে আসে জামী আর শরীফ অত্যাচার সয়ে। আসেনা কেবল রুমী। বাবা ফিরে এলেও প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। এমপি হোস্টেলে তার বুক থেকেই তো কেড়ে নিল রুমীকে জল্লাদের দল! তারপর রুমীকে কিভাবে হত্যাকরা হয় তা কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই পিতার। সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হার মানলেন শরীফ ইমাম।

১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১, আর এক ঝড় এলো জাহানারার জীবনে। হার্ট এ্যাটাক করলেন শরীফ। অনেক কষ্টে তাঁকে হাসপাতালেও নেয়া হলো। তার কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল পিজির কর্তব্যরত দুজন ডাক্তার শরীফ ইমামের দু’পাশে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিচ্ছেন। জাহানারা জানতে চাইলে- আপনারা মেশিন লাগাচ্ছেন না কেন? একজন ডাক্তার হাত দিয়ে শরীফ ইমামের বুকে চাপ দিতে দিতে বললেন- “লাগাবো কি ভাবে। হাসপাতালের মেইন সুইচ তো বন্ধ। আজ তো ব্ল্যাক আউট!” সেই ব্ল্যাক আউট সত্য করে জাহানারার জীবন থেকে চলে গেলেন শরীফ ইমাম। তাঁর কুলখানির দিন রেসকোর্স এ আত্মসমর্পন করলো পাক বাহিনী। কেবল সে বিজয় দেখা হলো না পিতা-পুত্রের।

১৭ই ডিসেম্বর ফিরে এলো রুমীর সহযোদ্ধারা। কেবল ফিরল না রুমী। যে সত্য কে মেনে না নিতে রোজ নিজেকে সাহস যুগিয়েছেন জাহানারা, তা তাকে মানতেই হলো অবশেষে। শহীদ হয়েছেন রুমী আর জাহানারা হলেন শহীদ জননী। বিশ বছর পর সঞ্চিত দুঃখ, ক্ষোভ, বেদনায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন-

যাহারা তোমার বিষাইছে বাযু, নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,তুমি কি বেসেছ ভালো?

(০৪)

দেশ স্বাধীন হলো। কেটে গেলো অনেকটা বছর সময়ের যান্ত্রিক নিয়মে। কিন্তু আবার কুচক্রীমহল সক্রিয় হয়ে উঠলো। ১৯৯২ সালের ২৯শে ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধীতার অপরাধে যার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছিল সেই নাগরিকত্বহীন গোলাম আযম কে করা হলো যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দলের আমীর। যা একটি স্বাধীন দেশের জনসাধারণের স্বপ্ন, বিশ্বাস, অস্তিত্ব এবং আবেগের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সামিল। এই ধৃষ্টতাকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূল (ঘাদানি)কমিটি হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। একটি বিশেষ প্রয়োজনে যেমন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তেমনি একটি বিশেষ প্রয়োজনে, বিশেষ ক্ষণে নেত্রী হিসেবে তাঁর আবির্ভাব ।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস- যে গোলাম আযমের বিচার দাবি করায় জাহানারা ইমাম কে করা হলো রাষ্ট্রদ্রোহী!

তবু থেমে থাকেননি জাহানারা ইমাম। মামলা মাথায় নিয়ে চালিয়ে গেলেন আন্দোলন। কিন্তু আবার ভাগ্য যেন উপহাস করলো তাঁকে। আশির দশকের প্রথম দিকে, ১৯৮২ সালে আরো এক শত্রু বাসা বাঁধল শরীরে। তিনি আক্রান্ত হলেন ওরাল ক্যান্সারে। কিন্তু ভেঙ্গে পরবার মানুষ নন তিনি। মনের জোর দিয়ে লড়লেন ব্যাধির সঙ্গে। কতো নির্মোহ, স্থিরচেতা, ধৈর্যশীল হলে পরেই তা সম্ভব! ’ক্যান্সারের সাথে বসবাস’-তার অবিশ্বাস্য বয়ান।

কিন্তু শরীর মনের সাথে একাত্বতা করলনা। এ সময় দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২রা এপ্রিল ১৯৯৪, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে মিশিখান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করলেন। ডাক্তার এবার জানালেন আর সম্ভব নয়। এবার শুধু অপেক্ষা মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়ার। মৃত্যু শয্যায় থেকেই কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতেন আন্দোলনের পরামর্শ। শেষের দিকে ডাক্তাররা বন্ধ করলেন ওষুধ এমন কি সকল প্রকার খাবারও। শেষ মূহুর্তের যন্ত্রনায় একবার শুধু লিখলেন- “আর কতদিন কষ্ট পেতে হবে!”

(০৫)

অতি দুঃসময়ে আমরা তাঁকে পেয়েছিলাম। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে নির্মাণ করা হলো প্রতিরোধের শেষ সীমান্ত- ঘাতক দালাল নির্মূল (কমিটি) কমিটি। চলমান কাল কোন ক্ষণে বাঁক নেয়। অতঃপর এখানে থেকেই আমাদের উঠে দাঁড়াবার, প্রতিঘাতের এবং এগিয়ে যাবার অভিযানের নিঃশঙ্ক সূচনা। ইতিহাস সাক্ষী, জোয়ান অফ আর্করা চিরঞ্জীব। মানুষের মুক্তির মূল্যবোধ কদার্প নিশ্চিহ্ন হয় না।

আমাদের জন্যও মুক্তির মূল্যবোধের একটি সবুজ ডাল পুঁতে রেখে গেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম- এবং আমরা জানি সে আছে কোথায় পোঁতা। আমরা যেন সে চেতনা ভুলে না যাই, আমরা যেন সে সন্ধান থেকে পিছিয়ে না আসি। একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার এখনো হয়নি কিন্তু জাহানারা ইমাম অন্তত সন্তুষ্টি নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন যে, তাঁর বাণী দেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে, একাত্তরের চেতনা নতুন প্রজন্মকে নাড়া দিয়েছে। এবার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশই হোক জাহানারা ইমামের জন্য নতুন প্রজন্মের শ্রদ্ধার্ঘ।

( অসংখ্য মানুষের লেখা আর আইরিন সুলতানা’র শ্রম এর কাছে এই লেখা কৃতজ্ঞ)