মুস্তফা আনোয়ার
(রচনাকাল: ১৯৭৯-১৯৮১)
লাশ
...
তেলচে-চটের ফাঁকে খসখসে চাঁদনি নড়ে মাকড়সার বুকের
ডিমে, চিকমিক করে মরা ডালের সরু হাড়, জটপাকানো
শিকড়, সেকস খোবলানো একটা সুরের ঝিঁঝি খুট খুট
করে কাটে ছমছমে আলজিভ তার কিৎকিতে ড্রেনের
ঢাকনি খুলে পুঁতে ফেলে কেউ কোনো লোক?
ভাঙা-পাঁচিল, ল্যাটরিন টপকে লোকটা চলে যাচ্ছে, পালাচ্ছে
তার মে-লোক ছেড়ে চিরতরে, মে-টি চুল ছিড়তে ছিড়তে ভাবল:
ইস্ লাশটা যদি এই নোংরা পেট চিরে লুকিয়ে রাখতে পারতাম।
লোকটা যদি চটে-ঘেরা আমার বিছনায় শুয়ে থাকতো
কালচে-রাতগুলোতে জন্তুর কাটাহাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে
চিরকাল।
বিদায়
......
আলকাৎরার রাতে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকব কবে, এমনি-দিনে,
বৃষ্টিতে, আ! সে ঘর-কাতর সিঁড়িপথ, অজগর লম্বা।
রাতের ময়লা গাছের ছায়া দিয়ে তৈরি করব গাদ্। কথা
দিচ্ছি, এক-দাগে ভুলে ভুলে যাবে চিরকাল, এক খাটে
শোওয়ার বোকামী, পাপ।
এতোদিন রসায়ন লেখাপড়া শিখলাম খামাখা, চল্লাম,
বিদায়। এখন কি করব আমি অভিশপ্ত পাপী আত্মা দিয়ে?
তুচ্ছ ছলাৎ ছলাৎ শব্দটাকে টিক-টিক করে কাটব, কাটা -
মাথার লকেট পরিয়ে দেব তোমার লিকলিকে সাপের ফণাতোলা
গলার মালায়। কাটামাথা নিয়ে তোমার জানলায় উঁকি
দেব রোজ চাঁদনি রাতে, চিনতে পারবে তো? হা-ভুলে
যাবে, ভুলে যাচ্ছো, ভুলে গেছ তুমি অনন্তকালের জন্য।
হা-হা, পৃথিবীর মাগীদের ভালোবাসাতে কী এতই মধুর
গাঢ়তা ছিল।
চুমু
..
কবরখানায় ঘুর-ঘুর করছিল, একটা জটপাকানো ছায়া-ডাল,
সিফিলিস রুগীনী শুয়ে আছেন, তাঁর চর্বি চটচট করছে
চেকনা ঘাসে, দাহ দাবানল, সমুদ্র সৈকত, একটা ব্যাথার চিল
ডাকছিল, ভূতে-পাওয়া বাজ খাওয়া পাতলা ঝাউগাছ ফাঁপা
কাঠগোড়া, ব্যাকগ্রাউন্ডের আগুনের তেলরং, যে আলোছায়ায়
পুতুল খেলছিল নিয়তি রাতদিন ভুলে। রাগী নখে
ডেকেছিলে তাকে কোনোদিন আত্মার কাছ ঘেঁষে?
করোটিতে কি চুমুর দাগ থাকবে চিরকাল, দাঁতহীন লোলজিভে
ঠোঁটের নুন? হতভাগা পর্নোর রাতগুলো?
ফণা তুলে সময় গুনছে ঘড়ির কাঁটা। পরমা বধ্যভূমিতে নিয়ে
যাচ্ছে তাঁকে, চোখ বাঁধা, (ঘন্টার ধ্বনি, হৈ-চৈ, ডাকাডাকি,
হৃৎপিণ্ডে ঘোড়ার ডাক, তড়পড়ানি) পৃথিবীর তালা খোঁড়া
হলো শুকনো ঘাস উপড়ে। এইই তবে নরক ছিল,
জিভের লালাক্ষরা চুমু?
ধূলোহাওয়া
.........
এক যে ছিলো পুরাতন হাওয়া
গিয়েছিলো সমুদ্রের সাথে কথা বলতে
খাদের নিচুতলায় চুল ছিঁড়তে-ছিঁড়তে
শুকনো পাতা হেলিয়ে-দুলিয়ে,
গোলপাতা, কুঁড়েঘর, - রইলো
কেরোসিন, কুপি, একতারা, আড্ডা
সবই রইলো চিরকাল পড়ে, পথপ্রান্তে।
আর এক যে ছিল কর্নেটবাদক, শুধু
শুকনো হাওয়াই খেতো সে!
পাতা কুড়োনি, ঘরনী তুমি কার?
পাতার ঝালর আর একটু ওঠাও না
চোখে কিছু ধুলো-টুলো দাও।
পথচাওয়া
.......
এসো, একপয়সার চোখে বাঁশপাতায় কেরোসিনের তেলরঙ
ছিটিয়ে, খসখসে ঘাড়ে ফড়িংকে চুমু খেতে দিও। বুনো
ধুতুরার নাচে, সমুদ্রের পোকার ঘোলা চাকনিতে আরশি
আত্মা এনে দিবে তুমি? নোনতা-হাড়ে দৌড়ে-দৌড়ে
আসবে ও তোমার বিজলি পা, হুড়কো খোলা মরচে পড়া
দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে আবছা টোকা দেবে। পোষা
মাকড়সা ছাড়া এ-ঘরে আর কেউ নেই। এসো, যখন খুশি,
এতিম আমি থাকবো।
একলা বহুকাল, আকাশ গাছ দিগন্ত পোড়াবাড়ি দেখেছি
নতুন পাতার মুখ ধুলোয় থুবড়ে পড়া, নখে খোঁচানো
ছেঁড়া কানের পর্দা কি করে শুনবে তোমার গলায় বসানো
দা-এর কোপ।
একলাপথ
.........
তোমাকে দেখলেই শুধু
মরচে পড়া পেতলের তার বাজে,
পাতার কংকাল উঠে দাঁড়িয়ে - পাগলী হাওয়ায়
ভরা বৃষ্টির সিরিঞ্জ ফুটো করে শিরা।
তোমাকে দেখলেই ঝিঁ ঝিঁ বাজায় একতারা,
চাঁদের ছাতার নিচে, মুসকি হেসে, ফড়িং গল্প
ফাঁদে কাঁটাবনের : একলাপথের।
কাফকা
......
কাফকা, পোড়া মুরগীর চেরা পা খেলো,
তার হাতে উড়ছে মুখ মোছার মোষলড়াই,
আঙ্গুলের ফাঁকে দুখণ্ড চাঁদের এক চিলতে ঢেলা
মুখে দিতেই, হাততালি বেজে চলল,
অন-বিহীন পথের মোড়ে।
কাফকা হেঁটে-হেঁটে এলো, বসল বুকে,
কাদামাখা বুট খুলে উড়িয়ে দিল
আস্তাবলের গাড়ায়; চট্চটে মে-লোক নিয়ে
কয়লার মত শুয়ে রইল, খড়ে।
পরবাস
.......
সেদিন বেরিয়ে ছিলাম
বগলদাবা করে পোয়াতি
পেটউঁচু বোতল,
কাদামাখা প্যান্ট-জুতো;
কিন্তু সবচে মজার কথা
আফিমখোর পাখিটা
বাঁশ পাতার হাওয়ায়,
একই সুর ভাঁজে:
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে; খোঁড়ায়;
তড়পায় এ পরবাসে।
যৌবন
......
যদি যৌবন ফিরে পেতাম
হাড়ে খোদাই করা গয়না
ঝলমল
পরিয়ে দিতাম, শান দেওয়া
গলায় ঝিলিক দিত রূপ,
যদি যৌবন ফিরে পেতাম।
যদি যৌবন ফিরে পেতাম
লুট করে আনতাম সুখের মহাদেশ,
ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতি,
আকাশে সোনার খনি,
যদি যৌবন ফিরে পেতাম।
যদি যৌবন ফিরে পেতাম
অধরের কলসি থেকে
আঁজলা ভরে চুমু নিতাম,
যদি যৌবন ফিরে পেতাম।
মালঞ্চ
.....
তোমার মালঞ্চে আমি উটকো লোক
এসে গেছি,
পাতার ঝুনঝুনি কুড়িয়ে অর্কেষ্ট্রা বানিয়ে দেব, তোমার
ডালে ঝরে যায় পাতা, ঝরে যায়।
তোমার মালঞ্চে আমি বদলোক,
জমে গেছি
বালির খাদ পেরিয়ে, সমুদ্রের দৈত্য-দানো
এবার পা উঁচু করে পড়বো ঘুমিয়ে, তোমার
ডালে ঝরে যায় পাতা, ঝরে যায়।
চোখ
......
মানুষের চোখকে ভয় করতে শেখো
মানুষীর চোখকে ভয় করতে শেখো
শিশুদের চোখকে ভয় করতে শেখো।
মাকড়শার চোখকে ভয় করতে শেখো
টিকটিকির চোখকে ভয় করতে শেখো।
বাঁশবনের জোনাকির চোখ দেখে
চোখ বন্ধ করতে শেখো।
মৃত্যু
.....
(ফজল মওলার এপিটাফ)
কুছু চাঁদনি দিন, তুঁত পিবে
গরমা-গরম চোলাই
খাবে - নিশাদল গুঁড়া -
আপনি কেমন আছেন
ছোট-সাব?
তুঁত খাবে হামি
একটু - কুছু তামা দিন;
আমরা আনন্দ করিবে, আল্লা
ভালা করিবে, আপনার।
টাটকা তুঁত খাবে একমগ
নিশাদল পিতে পিতে
মারা যাবে
একদিন হামি এইখানে;
এক-গিলাস পিলা ডিয়ার,
হামারা পিয়ারা
ছোট-সাবজি;
একমগ তুঁত পিয়ে
মারা যাবে -
ইল্লাল্লা ফজল মওলা।
যুদ্ধ
...
হঠাৎ গুলির শব্দে
সিগনেচার বদলে যায় -
শুধু থাকে মুখ
ছোবড়া, ন্যাকড়া, ছাই,
ধুকপুক-কেরাসিন।
ঠিক আছে সবকিছু
কিচ্ছু বদলায় না।
নেশা
...
হাড়গোড়তো দিলাম
কাদামাখা জানোয়ারটাকে
খেতে - মাথাভরা বাবড়িচুল -
চোখ দুটোও।
যদি শেকড় বেরোয়,
পাতা আসে কোনোদিন -
দুই-হাড়ে মাথা গুঁজে ঝিমোচ্ছি
কী তখনও।
না
...
আমরা মাতৃভাষা বলি,
কেউ-কাউকে বুঝিনা।
আমরা একঘরে থাকি,
খাট-টুকরো।
চাঁদ টুকরো হোক, কী আসে?
নদী টুকরো হোক, কী আসে?
ভালোবাসা টুকরো টুকরো হোক -
পচা-চিঠি ডাকবাক্সে যাবে না।
বাঁচা
....
টপকে মরা বেড়ালটা,
মাড়িয়ে মাছের কানকা,
কর্নেটবাদককে লাথি মেরে
ম্যাকাবার নাচে পারদর্শিনী
মাকড়সার সংগে
থাকি, স্যাঁৎসেঁতে টিনে
কুপি জ্বলছে, পা তুলে
বুকে-চোখে, মদ গড়াচ্ছে।
মরা খুব খারাপ -
অমর কুকুর ভালো।
লোমওঠা বেড়ালটা শহীদ হতে পারতো,
কেউ মাছের কানকা চিবিয়ে বাঁচতে পারতো।
তা-ছাড়া কি?
ভালো সে বাসে যদি
............
ভালো সে বাসে যদি -
বালতি কৈ বালির?
এ জোয়ান মন্দ লাশ
লুকোবো কি করে।
ভালোবাসা জানলো না সে
বলে কারে?
কানের ভেতরে ঢেলা -
মাথায় ঘাম ওঠে।
ভালোবাসা সবাই চায় -
স্যাঁৎসেতে ঘর ও খড়।
ধুলোকাদা
.........
চোখে ধুলো শোকায় না
কত কাঁদলে তুমি -
শুকনো কাঠ শুধু কয়লা হয়;
ভাত সেদ্ধ করো তা দিয়ে।
ভাঙা নদীর স্রোত কাদায়
উথলে উঠলে তৈরী থেকো।
জানোই তো আমি লুচ্চা,
দুরের পথ
পাড়ি দেবো।
জাল
.........
নষ্ট হলে মন ও মাথা
আমাদের মনে রেখো,
যারা নষ্ট হয়েছি।
নষ্ট হওয়া কি মজার খেলা
রাতে তারা দেখা,
ভোরে চাঁদ
খড়কুটো এনে রাখি,
নাভির জাল বুনে
সংসার করি।
না, হ্যাঁ হয়না
..........
কোনোদিন যা দেখিনা
সে নরক আমি
কোনোদিন যা দেখব না,
সে বাগান তুমি?
রোজ দেখি যা,
ঝোপঝাড়, অলিগলিপথ,
এই ঘরকন্না, তুমি -
কোনোদিন দেখিনা।
সবকিছু অপরিচিত, কিচ্ছু চিনিনা।
নৌকো
.....
পথে-পাওয়া
তিনটে পয়সা
তিনটে নৌকো
আমরা ভাসিয়েছিলাম কাদায়।
চাঁদ ছিল
আকাশে
ছুরি-কাটা
ছায়া ফেলেছিল ডাল
পাখির বাসা ও চোখ।
সংগী সেই
পুরাতন কুকুর
ভেউ-ভেউ
কান্নাকাটি
হাউ-কাউ
লাফ-ঝাঁপ
দৌড়।
পথে-পাওয়া
তিনটে পয়সা
তিনটে নৌকো
আমরা ভাসিয়েছিলাম কাদায়।
বুড়োহাবড়া তুঁত
...........
তুঁতের তলায় থাকি,
আমার নাম মুস্তফা -
আমার চেহারাটা বড় বিশ্রী
গোলগাল কেমন যেন চ্যাপ্টা আলুর মতো
চোখ দুটো ইঁদুরের মতে কুৎকুতে, ছোট্ট ছোট্ট, লাল;
চেহারাটা মে-মে,
শুধু একটা শুকনো ডালের মতো শিশ্ন ঝুলে আছে,
আমার চুলগুলো ইঁদুরের ল্যাজের মতে নোংরা -
আমি তুঁত গাছের তলায় থাকি,
আমার নাম আনোয়ার,
অন্তরঙ্গরা ডাকে আনু -
আর এই আনু নামটার ওপরেই আমার যত ঘেন্না;
আয়নার সামনে দাঁড়ালেই নিজেকে ঘেন্না হয়;
কি করি - উপায় নেই;
কিছুতেই নিজের চেহারা ভালোবাসতে পারি না,
একটুও প্রেম হয় না।
আমার পূর্বপুরুষেরা হয়তো মেথর ছিল, ডোম ছিল;
আমার রক্তের মধ্যে মেথর মেথর গন্ধ রয়ে গেছে।
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে মেথর পট্টিতে মদের দোকান দিই -
তুঁতের পাতা পিষে পিষে কষ বার করে
মদের সাথে মিশিয়ে দিই;
তাতে করে তেতো ও ঝাঁঝ দুটোই পাবে আমার খদ্দেরবৃন্দ;
ওদেরকে ঠকিয়ে বেশ দু-পয়সা বানাতে পারবো,
একটা ক্যামোফ্লেজ করতে পারবো
এটাই আমার লোভের একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গপথ।
সুড়ঙ্গের ওপারে তুঁত গাছের পাতায় পাতায় গুটিপোকা ধরেছে,
হ্যাঁ, আমি এখানেই একটা মদের দোকান খুলবো
আর ডাকবো দুই রফিককে,
আয়, খেয়ে যা - একটু মদ খেয়ে যা, চেটে যা।
এই তুঁত গাছের তলায় আমি একটা মদের দোকান দেবো,
এই গাছের পাতার মতো আমার অনেক টাকা হবে,
আমি অনেক টাকা পাবো, আমি বড়লোক হবো;
টাকা হলেই আমি বড়লোক হবো, অভিজাত হবো -
শুধু আমার গদ্য-পদ্যর ব্যবসা জমে উঠলেই হয়।
আশা করছি তুঁত আমাকে বড়লোক করবে, সভ্য করবে;
আমার গায়ে যে মেথরের গন্ধ লেগে আছে, তা ঢেকে দেবে,
মানুষকে ঠকাতে এই তুঁত পাতা আমাকে সাহায্য করবে,
আমি আশা করি - আশা করি আমার মদের দোকান চলবে
যদি ঠিক মতো তুঁতের পাতা রসের জোগান দেয়
ঠিক মতো গাঢ়ো কষ ও গাদ বের করে দেয়,
তবে আমাকে আর পায় কে?
হে আল্লা, আমার মেথর পট্টির মদের দোকান জমে উঠুক।
শুধু তুমি যদি একটু সহায় হও
শুধু তুমি তোমার চাঁদ ও সুরুযকে বলে দাও
তোমার বৃষ্টিকে বলে দাও, তোমার কুয়াশাকে বলে দাও,
তোমার শিশিরকে বলে দাও, ওরা যেন আমার তুঁত গাছের পাতাগুলো
কষে কষে মোটা করে দেয়, দিনে দিনে।
আমার চেহারার ক্যামোফ্লেজ তো চাই একটি -
হে তুঁত আমাকে বাঁচাও,
আমাকে একটু মাস্তানি করতে দাও।
আমার এই ঘৃণ্যতম আলু আলু চোহারাকে
থেঁৎলে থেঁৎলে পাতা কর।
কিন্তু একি - হায় আল্লা একি করলে
হ্যাঙওভার ভাঙতে না ভাঙতেই
চোখ খুলতে না খুলতেই,
আমার সব তুঁতপাতা ঝরে গেছে;
আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছি;
আমার ধুলো, আমার মাটি, আমার পাতা।
মেথর পাট্টিতে দোকান করার লোভ কেন হয়েছিল
বলতে পারো?
হে পাতাঝরা বুড়ো তুঁত গাছ
বলতে পারো?
বুড়োহাবড়া তুঁত গাছ বলতে পারো?
তোমার উত্তর শুধু ভেঙে পড়া শুকনো ডাল -
হা, বুড়োহাবড়া তুঁত।
জেমস জয়েস
...........
জয়েস কবিতা বেচে কিছু টাকা পেয়ে
সাদা মদের দোকানে গেল
এক পা ডুবিয়ে দিল পিপেতে
ঈশ্বরের দিকে অন্য পা।
শব্দের চামড়া, ছাল, নাড়িভুড়ি,
হাড়গোড়, খুলিতে আঁটানো জিভ,
ভাঙা হাঁটু, দু’তালা পাছায়
চৈতন্যের ছলাৎ ছলাৎ বীচি
বয়ে চলে নিরবধি।
দুজন ঈশ্বর। দু’জনের দিকে পা উঁচিয়ে
বৈপরিত্যে চল্লো অন্য কোথাও।
কোথায়?
১৯৫৪
.........
জেলখানা থেকে বেরিয়েই
আমি ধরেছিলাম চাঁদকে,
কষ্ট পেলে কি বেচারী খুব?
মনেই ছিলো না চুমু খেতে।
জীবন গিয়েছে চলে তিরিশ তিরিশ
বড্ড চেঁচিয়ে মেচিয়ে
ছিলো নুন, ভাতের দোকান,
বাংলা মদ, খুপরি, চট ও কেরোসিন।
চাঁদ ধরি, চুমু খাই,
বসি; কিন্তু
জেল ফেরৎ চুমুটি, যা আমারই ছিলো
একাধারে -
হলো না, আজো হলো না।
হবে না -।
প্রেমের কয়লা
...........
ভয় করে প্রেমের কয়লা যদি হীরকের খনি
কল্পনার হাঁস সব মাথার জ্যোৎস্না ঢেলে দেয়
ভয় করে যমজ গম্বুজে যদি হলুদ পাথর
যদি প্রেম দেখা দেয় মোমের করোটি হে চুম্বন
ভয় করে অচেনা ওষুধ যদি জিভেতে হঠাৎ
হৃদয় রাঙায় যদি আতসের বারুদের ফুল
ভয় করে সহসা প্রসন্ন মুখ তুলে চাও যদি
কুটিল ভ্রুকুটি মুছে প্রেমে পড় প্রথম দেখায়।
ভয় করে প্রেমের কয়লা যদি হঠাৎ তোমাকে
ভয়ে ভয়ে মদের দোকানে যাই তোমাকে ভুলতে
একা একা রাতের আঁধারে ঘুরি নিঃসঙ্গ মাতাল
চোখের তলায় যদি কয়লার খনি জ্বলে ওঠে।
মুস্তফা আনোয়ার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুস্তফা আনোয়ার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০০৯
কবিতা নাটক : কোনো ডাকঘর নেই

কবি মুস্তফা আনোয়ার
সুধা:
আচ্ছা বলতো অমল,
আমাদের যদি বিয়ে না করেই কেটে যেতো জীবন
তবে কেমন হতো।
অমল:
ভালোবাসা না ডুবলে কি চাঁদ ওঠে
আকাশে এতো তারা কি ফুটতো;
এতো দুঃখ; এতো বিষাদ -
এতো হাসি, এতো ডালপালার ভালোবাসাবাসি;
এসব হয়তো কিছুই হতো না।
সুধা:
কিন্তু তুমি যে অসুস্থ লোক -
নিউরোটিক; ড্রাগএডিক্ট।
ছোটবেলা থেকেই তুমি অদ্ভুত
খারাপ কথা চিন্তা করতে।
আর আমি সেই বালিকা বয়স থেকেই,
যখন আমার মধ্যে কোনো নারী আসেনি;
তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।
কি করে সম্ভব হয়েছিলো তা;
হয়তো তখন আমি নিজেই অসুস্থ ছিলাম;
হয়তো আমার রোগ ছিল চোখে।
আজ আমার চোখে কোনো রোগ নেই
কোনো অসুখ নেই, অথচ তুমি
সেই অসুস্থ, অসুস্থ-অসুস্থ-অসুস্থ ।
তুমি কোনোদিন আর ভালো হবে না অমল?
আমি তোমাকে কিছুতেই ভালো করতে পারলাম না।
অমল:
কিন্তু সুধা - আমিতো জানতাম তুমি এক
অসুস্থ লোককেই ভালোবেসেছো,
তুমি সেই অসুস্থ লোকটাকেই ভালোবাসবে চিরকাল।
কে জানতো তোমার মধ্যে এক অজগর লুকিয়ে আছে
আমাকে ভালো করার লোভ নিয়ে; কে জানতো তা।
তবে হয়তো আমি বন্ধঘরে, জানলার কাছে
বসে, আকাশ দেখে-দেখে
আর দশ বিশটা বছর কাটিয়ে দিতে পারতাম।
সুধা:
তবে আমার এসে কি লাভ হলো তোমার কাছে,
তবে আমার কি লাভ হলো তোমার কাছে এসে।
আমি যদি তোমাকে ভালোই না করতে পারলাম,
তবে আমি কেন
আমি সুধা কেন
মিসেস অমল হবার কি দরকার।
আমারওতো কোনো মিশন থাকতে পারে
আমারওতো কোনো গোল থাকতে পারে
আমারওতো কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে;
এসবের কোনো দাম তুমি দেবে না অমল?
অমল, তুমিতো ইচ্ছে করলেই পারো
ভালো হতে, তবু কেন হও না অমল?
অন্তত আমার জন্য হও লক্ষ্মী
লক্ষ্মী অমল আমার; দুষ্ট ছেলে।
অমল:
কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না সুধা
তুমি কি করে চল্লিশ বছরের বুড়োহাবড়াকে
তোমার চোখের জলে ধুইয়ে দিতে পারবে,
কি করে তাকে পরিষ্কার করতে পারবে -
কি করে তাকে
এ-যে অসম্ভব - এ-যে অসম্ভবের পায়ে
মাথা খুঁড়ে রক্ত বার করা -
কেন তুমি চেষ্টা করছো, তুমি বরং -
সুধা:
বরং আমি চলেই যাই এইতো,
এইতো বলবে, দরজা খোলা, বেরিয়ে যাও, আমার
ঘর থেকে চলে যাও। এইতো বলবে।
ব্রুট, হিংস্র বদমাশ লোক,
অসুস্থতার ভান করে, অসুস্থতাকে একটা পুঁজি বানিয়ে
আর কতোদিন মানুষকে ঠকিয়ে বেড়াবে অমল।
এসো আমরা আকাশের নিচে দাঁড়াই।
এসো আমরা কথা বলি বাতাসের সঙ্গে।
এসো আমরা আকাশের খনি থেকে ভালোবাসা
লুঠ করে নিয়ে আসি।
তুমি ভালোবাসার খনি খোঁড়ো আর আমি
ঝুড়ি-ঝুড়ি মাথায় তুলে নিয়ে আসি।
এসো, আমরা শ্রমিক হই।
এসো, আমরা মানুষ হই।
এসো, অমল এসো, আমার হাত ধরো
এ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে, চলো আমরা
বাইরে আলোতে যাই।
অমল:
এতো বড় চল্লিশ বছর ধরে যা ঘৃণা করে এসেছি,
তুমি সেখানে আমাকে ডাকছো।
এটা ঠকানো ছাড়া আর কি?
আমাকে ঠকাবার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে।
আমিতো শুধু ভালোবাসার অধিকার দিয়েছিলাম।
সুধা:
বুঝেছি, বুঝেছি, তুমি আমাকে তাড়াতে চাও - এইতো?
বেশতো না-হয় চলেই যাবো,
একেবারে চলে যাবো।
হ্যাঁ, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট অনেক
কি যেন সেই -
মনিহার ছেঁড়ার কষ্টের মত;
তবু, যাবো। যাবো।
অমল:
আমি জানতাম তুমি যাবে, থাকবে না
এই নিউরোটিক পেশেন্টের কাছে কেউ
থাকতে পারে না। কোনো মে-লোক পারে না
সুধা:
আসলে তুমি প্রতারক
তুমি অন্যকোথাও অন্যকোনো নতুন কচি
ভালোবাসায় মজে গেছো;
আমি টের পেয়েছি।
অমল:
হয়তো তাই। কিন্তু আমি সিংহ বা কর্কটকে বশ
করার জন্য আঙুলে কোনো পাথর পরবো না।
আমি এই বন্ধঘরে অসুস্থ থাকবো,
আমাকে প্রতারক বলো, আমাকে ভণ্ড বলো
আমাকে ঘৃণা করো, যা খুশি তাই করো;
আমি; আমিই। আমি আর কোথাও যাবো না
আমি এখানেই থাকবো, কেন না এখানে
কোনো ডাকঘর নেই।
এখানে কোনোদিন কোনো ডাঘর হবে না,
সেই জন্যে আমি আর কোথাও যাবো না
আমি এখানেই থাকবো,
তুমি
যাবে
যাও।
সুধা:
যাবোই তো। একশোবার যাবো। কেন থাকবো।
আমার এতো কান্না যখন তোমার
বুকের ফার্নেসে ক্রিস্টাল হলো না, আমি কেন থাকবো।
যাবো। যাবো।
অমল:
তবে - তোমার কোনো খোঁজখবর কিছুই পাবো না আমি?
সারা জীবন একটা চিঠিও না;
এখানো কোনো ডাকঘর নেই; এখানে
কোনো চিঠি পৌঁছাবে না - তবে, তবে -
সুধা:
তবে কিছুই নয়;
তুমি তোমার জানলায় দাঁড়িয়ে থেকো
আর ঐ নিচের মিস্টিক বুকলগাছটার দিকে চেয়ে থেকো,
কান পেতে শুনো -
শুনতে পাবে, একটা মে’ চেঁচাচ্ছে -
শোনো, পাড়ার লোকেরা শোনো,
তোমরা অমলকে বোলো, সুধা তাকে ভুলে গেছে।
সুধা তাকে একেবারে ভুলে গেছে।
অমল:
আজকাল আর কেউ মনে রাখে না।
সবাই ভুলে যায়,
তুমিও ভুলে যাবে, বালিকা বয়সের সুধাকে,
প্রেমিকা সুধাকে, স্ত্রী সুধাকে,
ভুলে যাবো সুধাকে,
আমিও একেবারে ভুলে যাবো।
কিন্তু শুধু ভুলতে পারবো না;
একটা ছোট্ট ফুটফুটে কচি মেয়ে কেন এক অসুস্থ বালককে
ভালোবেসেছিলো। কেন এক খারাপ লোককে ভালোবেসেছিলো।
টান ছিলো। কেন ছিলো।
এই বন্ধঘরে একা বসে-বসে
এই অসুস্থ শরীর নিয়ে, এই প্রবলেম-এর মীমাংসা করতে-করতে
একদিন মরে যাবো;
ঘরে কতগুলো হাড় জমে থাকবে।
এইতো অমল ও সুধার ঘটনা, জীবন -
একটা চিঠি - যা কোনোদিন কারো হাতে পৌঁছায় না;
যেহেতু পৃথিবীতে কোথাও কোনো ডাকঘর নেই।
সুধা:
তবে চলি হে সিউডোফিলোসফার চলি;
শাঁওলীও যাচ্ছে আমার সাথে।
অমল:
এটাই চেয়েছিলাম আমি হয়তো।
তবে এ বৃষ্টিভেজা রাতে না গেলেই কি নয়?
বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, শব্দ শোনা যায় না,
কিন্তু বৃষ্টি-তো -
মনে পড়ে-এ বৃষ্টির রাতেই শাঁওলী তোমার রক্তে এসে
মিশেছিল, তার পরেই - আমরা বিয়ে করেছিলাম।
সুধা:
আমি এক সুস্থ মহিলা -
ইমোশান আমাকে সংক্রামিত করতে পারে না।
আমার সামনে এখন অনেক বড়-বড় পথ বাকী -
এই রাত বা এই যে বল্লে বৃষ্টি
এটা কিছু না, একটা ভাঁওতা।
রাতে বা বৃষ্টিতে আমাকে চলাফেরা করতে হয়,
করে এসেছি এতোদিন; আমি টিভিতে অভিনয় করি -
আমি রেডিওতে অভিনয় করি - আমি মঞ্চে অভিনয় করি -
আমি চাকরি করি। আমি একলাই চলি;
আমি একলা। আমি একলা।
কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা,
শাঁওলীকে মানুষ করতে হবে -
তোমার কাছে থাকলে, ও অসুস্থ হয়ে যাবে,
ওরও হাড়েহাড়ে পোকা ধরে যাবে,
ওর এখন ষোলো বছর বয়স, ওর রক্তে
এখন যৌবনের টগবগে প্রতিভা।
ও তিনটে ভাষা গড়গড় করে বলতে পারে;
ইংলিশ ফ্রেঞ্চ জার্মান,
ও রবীন্দ্রসংগীতে ফার্স্ট হয়েছিলো;
ও খুব ভালো ভায়োলিন বাজাতে পারে।
ওকে আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না, আর
আমাকেও আমি নষ্ট করতে পারি না।
আমরা দু’জন সুস্থ নারী, সুস্থ মানুষ।
(শাঁওলী এসে অমল ও সুধার মুখোমুখি দাঁড়ালো।)
শাঁওলী:
বাবা, তুমি নাকি মাকে অপমান করেছো
তুমি নাকি মাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারোনি
তুমি নাকি চিরকাল তাকে ঠকিয়েছো, ভণ্ডামি করেছো।
অমল:
শাঁওলী, এটা আমাদের ব্যক্তিগত গল্প;
তুমি কেন এর মধ্যে এসেছো?
তুমিতো আমাদের দু’জনের - আলাদা
তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো।
শাঁওলী:
হ্যাঁ, সেটাই সুখের হতো।
কিন্তু, তুমি আমার মা;
তোমার স্ত্রী; মিসেস অমলকে ঠকিয়ে
আমাকেও ঠকিয়েছো।
তুমি শুধু পিতার পার্ট করেছো,
তুমি আমার বাবা হতে কোনোদিন পারোনি।
মা বলছে, তুমি তা কোনোদিন পারবে না -
তোমার মধ্যে ভালোবাসার শক্তি নাকি ফুরিয়ে গেছে,
তোমার সমস- কথায় পিঁচুটি জড়িয়ে থাকে,
ঝরা পাতা নড়ে,
তুমি নাকি একটা ভেঙে-যাওয়া ডাল,
তুমি নাকি একটা কৃত্রিম মরুভূমি।
সুধা:
শাঁওলী, তোর বাবা এক রাজা প্রতারক;
ও-যে তোকে ভালোবাসে, সেটা ওর নষ্ট চোখ,
ও তোর বয়সের সব মে-কেই ভালোবাসে,
ও একটা পোকার চেয়েও ক্ষুদ্র; কিন্ত বৃহৎ খারাপ -
একেবারে পচা গলা নষ্ট হয়ে-যাওয়া শুয়োরের মাংস।
অমল, আমাদের দু’জনকেই ঠকিয়েছে,
দুই-নারী আমরা, দুই-নারীকে ঠকিয়েছে।
শাঁওলী:
বলো, বাবা কিছু বলো।
অমন ভাস্কর্য হয়ে যেও না,
কিছু বলো - আমি কিছু শুনতে চাই,
আমি সত্যি কথা শুনতে চাই,
বলো, মা যা বল্লো সব সত্যি। সব সত্যি।
অমল:
পৃথিবীতে কিছুই সত্যি নেই শাঁওলী,
কিছুই সত্যি নেই।
সুধা:
সিউডোফিলোসফার, ভণ্ড, ভাঁড়।
শাঁওলী:
আ, মা চুপ কর, দোহাই তোর চুপ কর্,
আমাকে কথা বলতে দে; আমার বাবার সাথে -
আমার জন্মের সাথে।
অমল:
আমার কথা তুই ডালপালার মধ্যে শুনতে পাবি,
আমার কথা তুই ঘাসের মধ্যে শুনতে পাবি,
আমার কথা তুই মেঘের মধ্যে শুনতে পাবি।
আমার কাছে কি শুনবি।
শাঁওলী:
আ, বাবা কাব্য করো না। কবিতা বাদ দাও।
সত্যি কথা বলো। সত্যি কথা।
অমল:
সত্যি কথাই তো বলছি,
আমরা তো কাব্যই করছি,
কাব্য ছাড়া আর কি?
আমরা যা কিছু বলি না কেন,
সবি তো বাতাস, সবি তো পদ্য - সবি তো, সবি তো।
এই যে তোদের চলে-যাওয়া
বা সুধার মিসেস অমল হওয়া
এই ঘর; জল নড়া; পাতা পড়া;
এ সবি তো পদ্য,
কাব্য আমি কী করবো, আমার ভাষাই তো এই রকম।
তবে তোর মা, অর্থাৎ আজকের মিসেস অমল
অনেকদিন আগের সুধা
যা বলছে - সব সত্যি।
সবকিছু আপেক্ষিক, তাই সত্যি; সেই জন্যেই শুধু সত্যি।
অথচ আমার কাছে সব মিথ্যে। সব মিথ্যে।
আমি লোকটা খুব খারাপ এটা সত্যি -
এর চেয়ে বড় সত্যি আর কিছু নেই।
শাঁওলী:
তবে তুমি আমার বাবা নও।
তুমি তোমার রক্ত ঢেলেও বাবা হতে পারলে না -
এ-পরাজয় শুধু তোমার একার, আমাদের নয়।
হ্যাঁ, আমাকেও যেতে হবে তবে তোমাকে ছেড়ে,
যেতে একটু কষ্ট হবে -
তোমার চোখে এখন ছানি পড়েছে,
তুমি কম দেখতে পাও;
এটা-ওটা কে দেবে তোমাকে হাতের সামনে তুলে।
তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হবে, বাবা,
কিন্তু - তুমি আমার মাকে অপমান করেছো -
যাক, সেটা একটা ব্যক্তিগত গল্প তোমাদের।
কিন্তু তুমিতো আমাকেও অপমান করেছো, করলে।
তুমি কেন হঠাৎ ঋষি হয়ে উঠলে,
ভালোলোক হয়ে গেলে - সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে।
হয়তো যা-যা বলেছে তা সত্যি,
আমার জন্যে তোমার ভালোবাসাটা একটা নষ্ট-টান,
আমার পরগাছা যৌবনকে তুমি ভালোবেসেছো
আত্মা নয়, মন নয়, রক্ত নয়,
আমার নুন নয়, আমার জল নয়,
আমার অন্য একটা কিছু, অশ্লীল কিছু।
হ্যাঁ, আমাকেও যেতে হবে তোমাকে ছেড়ে,
কেন না আমাকে অনেক বড় হতে হবে,
অনেক শিখতে হবে - অনেক কিছু করতে হবে।
তুমি বলেছিলে বাবা, পৃথিবীতে অনেক কিছু করতে হয়।
তোমরা দু’জনে মিলে ষড়যন্ত্র করে
আমার রক্তের প্রতিটা কণায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছো
কিছু একটা করার জন্যে - একে তোমরা প্রতিভা বলেছো -
আমি জানি না, এটা কি? কিন্তু এক অর্থহীন কিছু করা।
তাই আমারও সামনে লম্বা পথ।
তোমাকে ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি,
বাবা, চলে যাচ্ছি।
জানি, তুমি আর কিছু বলবে না,
এখন তোমার ইজিচেয়ারে
পাথরের মতো শুয়ে থাকবে,
তোমার চোখে পিঁচুটি জমবে,
তুমি আর কোনো কথা বলবে না -
আমি জানি, বাবা,
আমি জানি।...
যাই, রাত বাড়ছে,
রাস্তায় আমাকে নিয়ে কোনো এ্যাডভেঞ্চার হয়ে যেতে পারে।
যাই।...
চিঠি দেবো।...
ও, এখানে কোনো ডাকঘর নেই।
সুধা:
এখানে কোনোদিন কোনো ডাকঘর হবে না -
এখানে ডাকঘর নেই।
অমল:
কোনো ডাকঘর নেই।
...............................................................
জন্ম ১০ অক্টোবর, ১৯৪০ সালে, পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার দত্তপুকুর মহকুমার নিবাধুই গ্রামে। পড়াশোনার আনুষ্ঠানিক প্রথমপাঠ কোলকাতার হেয়ার স্কুলে, দশম শ্রেণী পর্যন্ত। দেশ ভাগ হয়ে গেলে ১৯৫৩ বা ’৫৪ সালে চলে আসেন বাংলাদেশে, যশোরে। মা আবেদা বেগম, বাবা ডা. আওলাদ হোসেন।
কোলকাতার স্কুল পাল্টে ভর্তি হন যশোর জেলা স্কুলে। এখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশনের পর ইন্টারমিডিয়েট পড়েন মাইকেল মধুসূদন কলেজে। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে। এখানে তিন বছর পড়ার পর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে বাংলা বিভাগে।
১৯৬৮ সালে রেডিও পাকিস্তান এ যোগ দেন, অনুষ্ঠান বিভাগে প্রযোজক হিসেবে। ১৯৭১এ মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে দশ শব্দসৈনিকের হাতে, তিনি তাদের একজন। আঞ্চলিক পরিচালক হিসাবে অবসর নেন বাংলাদেশ বেতার থেকে।
৬ এপ্রিল, ২০০৬ সালে ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রকাশনা:
ক্ষুর (গল্পকবিতা), প্রথম প্রকাশ ২৬ মার্চ, ১৯৭৯, চৈত্র ১৩৮৫।
পরবাসে বসবাস (কাব্যনাটক), রচনাকাল: ১৯৭৯। প্রথম প্রকাশ: মে ১৯৮০
কোন ডাকঘর নেই (কবিতা), রচনাকাল: ১৯৭৯-৮১। প্রথম প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮১
তুঁত (কবিতা), রচনাকাল: ১৯৭৯-১৯৮১। প্রথম প্রকাশ: অক্টোবর ১৯৮৩।
ভিন্নচোখে (প্রবন্ধ ও অনুবাদ), প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৫
রসাতল ও মরিয়ম (কবিতা), প্রথম প্রকাশ: একুশের বইমেলা ১৯৯৮, ফাল্গুন ১৪০৪।
কি করি কোথায় যাই (অপ্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ)
সম্পাদিত পত্রিকা:
সিদ্ধার্থ, সাহিত্য সংকলন : ৬ টি সংখ্যা (১৯৮৩ - ১৯৮৬)
কুঁড়েঘর, সাহিত্য সংকলন : ১৯৮২-৮৩
============================================
কোনো ডাকঘর নেই
গ্রন্থ: কোনো ডাকঘর নেই
রচনাকাল: ১৯৭৯-৮১। প্রথম প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮১। প্রকাশক: ফরিদ নীরদ, সিদ্ধার্থ,২৮৫/এ, মগবাজার, ঢাকা-১৭। মুদ্রণ: বাংলা একাডেমী প্রেস। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : কাজী হাসান হাবিব। প্রচ্ছদ মুদ্রণ : পদ্মা প্রিন্টার্স এন্ড কালার লিমিটেড। পরিবেশনায় : জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ৬৭/ক পুরানা পল্টন, ঢাকা-২। দাম: পনেরো টাকা। পৃষ্ঠা: ৬৮। স্বত্ব: নাজমা আনোয়ার। উৎসর্গ: মানুষের দুঃখজনক স্বাধীনতাকে।
============================================
তার আরো কবিতা পড়ুন:
http://www.facebook.com/note.php?created&&suggest¬e_id=87697768788
লেবেলসমূহ:
কবিতা নাটক,
মুস্তফা আনোয়ার,
মুস্তফা আনোয়ারের কবিতা নাটক
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
