কবিতা আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১০

(অ)কবির (অ)কবিতাচারন...


অমি রহমান পিয়াল


ক. আমার বাবা মিথ্যা একটা আত্মতৃপ্তি নিয়া কবরবাসী হইছেন। মৃতু্যর আগ পর্যন্ত তার ভূলটা ভাঙ্গাই নাই- কারণ সেটা তার প্রতি অতি অবিচার করা হইত। ঘটনাটা আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখনকার। 'একের ভিতর পাঁচ' নামে ইয়া মোটা একটা বই ছিল বাসায় যা আমার মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছোট খালা ব্যবহার করতেন। সেই বইটার শেষ দিকে একটি ইংরেজি কবিতা ছিল, যার সারটা এরকম- সন্তানকে অযথা শাসন করে যে, সেই বাবা-মা তার সৃজনশীলতার পথটাও রুদ্ধ করে দেয়। এ যেন চলমান একটা নদীকে আটকে দেওয়া। যাই হোক বাবা তখন ইরানে। চিঠিতে আমি কবিতাটা তাকে পাঠাই। উনি সেটি নিয়ে পুরো দুটো ঘণ্টা আনন্দে কেঁদেছেন। সহকর্মীদের দেখিয়েছেন- দ্যাখেন আমার বড় ছেলে কীরকম জিনিয়াস। এই বয়সে কী লিখছে! উনি সেটি ফার্সিতে অনুবাদ করে ইরানের বেশ কটি পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। স্যরি বাবা, জীবনে তোমাকে অশান্তিতেই রেখেছি। যেটুকু তৃপ্তি ও গর্ব তোমার আমাকে নিয়ে করার সৌভাগ্য হয়েছিল তা মিথ্যের ইটপাথরে গড়া হলেও প্রাসাদটা ভাঙতে দিইনি।
খ. তাই বলে কবিতার সঙ্গে দোস্তি কী ছিল না। সে বড় পুরানো দোস্তি। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় ছোটবেলায় এক অনুষ্ঠানে আবৃতি করে একটা পাউডার রাখার কৌটা গিফট পেয়েছিলাম মনে আছে। এরকম টুকটাক আবৃত্তি করেছি খেলাঘর করার সময়। স্কুল ও কলেজের সাময়ীকিতে 21 ফেব্রুয়ারি, 26 মার্চ বা 16 ডিসেম্বর নিয়ে আবেগময় কথার মালা গেথেছি প্রচুর। এই দিনগুলোতে পাড়ার বন্ধুরাও সাময়ীকি বের করে কিছু পয়সা কামাতাম। তো লিখতাম। হাত খুলেই, পদ্যগদ্য সবই। কিন্তু মানের বিচারে সেগুলো ছিল একদমই কাঁচা হাতের আনাড়িপনা।
গ. মেডিকেলে পড়ার সময় আমার দ্বারা কবিতা সম্ভব এই বোধটা জাগিয়েছিল তিতাস (মার্কিন প্রবাসী ডাঃ মোশতাক মাহমুদ, মমতাজউদ্দিন আহমেদ স্যারের ছেলে)। তার আগ পর্যন্ত আমার যা কিছু ছিল সবই টুকলিফাই। মানে আমি তখন প্রচুর মেয়েকে প্রচুর প্রেমপত্র লিখতাম এবং শুরুটাই হতো কবিতার কোনো চরণ দিয়ে। আমার সংগ্রহে এরকম দ'ুলাইন চার'লাইন প্রচুর ছিল। খ্যাত-অখ্যাত সবার। তো একদিন ক্যাফে রোজে খেতে গেছি দুপুরে। ভাত আসতে দেরি হচ্ছে। টেবিলে তিতাস আর আমি রাজা-উজির মারছি। বাইরে খুব মেঘ ছিল, হঠাৎ দেখি ঝলমলে রোদ। আমি খাতায় লিখে ফেললাম, 'মেঘটা ছন্নছাড়ার মতো টুকরো টুকরো হয়ে গেল/ অথচ আমি প্রচণ্ড আশায় ছিলাম এক পশলা বৃষ্টির।' নিতান্ত সাধারণ ক'টা লাইন। তিতাস এতই মুগ্ধ হলো যে আমাকে নিয়মিত লেখার জন্য উৎসাহ দিয়ে আবেগময়ী একটা বক্তৃতাও দিয়ে ফেলল।
গ. ক্যাম্পাসে কবি কম ছিলেন না। রোকনের কথা আগেই বলেছি- সেই ছিল সেরা। বড় ভাইদের কয়েকজন ছিলেন, ডাঃ জিল্লুর রহমান এখনো লেখেন। আর আমাদের তিতাস, আতিক, রোমেল- এদের লেখনী ছিল দুর্দান্ত। বাংলাদেশের প্রথমসারির পত্রিকার সাহিত্য পাতাটা এখন যিনি দেখেন (দেখেনই, কারণ তার ওপর ওয়ালা আছেন একজন, এমনকি ব্রাত্য রাইসু পর্যন্ত তাকে হুজুর হুজুর করেই চাকরি করেছে), তাকে অহরহ ধর্ণা দিতে দেখেছি রোকনের কাছে। কীনা লেখা চাই! আর আমি কদিন আগে তার কাছে যখন লেখা নিয়ে গেলাম- অবলীলায় বলে দিলেন, 'আপনারা যারা প্রথম আলো ছেড়েছেন তাদের লেখা সম্ভবত ছাপানো যাবে না।' হরি বোল!
ঘ. একবার পায়ে ব্যথা পেয়ে (আসলে খাবার খরচ বাঁচাতে) স্টুডেন্ট ওয়ার্ডে ভর্তি হলাম। বারান্দায় বসে গাঞ্জা খেতাম, আর তারপর কবিতা ভর করত। একদম অখাদ্য হতো তা নয়, তবে উচ্চাঙ্গেরও নয়। 1986 সালের 20 ডিসেম্বর কবি রফিক আজাদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক রোববারের কবিতার পাতায় আমার একটি কবিতা ছাপা হয় 'বিস্মরণ' নামে। এক মেয়েকে নিয়ে ভাবছি তার চেহারাটা মনে আসছে না- এই নিয়ে কবিতাটা। শেষ লাইনগুলো ছিল- আমি যেন স্মৃতির সুন্দরতম পোট্রেটটার সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে পারিপাশ্বর্িকতাকে উন্মোচন করেও মডেলটা তার ঘোমটা টেনে নামিয়েছে।'
ঙ. আরেকটা চিটিং এই সময় করেছি। ডেবোনিয়ার নামে ভারতীয় এক ম্যাগাজিন রাখতাম। মিমি সুপার মার্কেটের বিখ্যাত বই দোকান লায়সিয়ামের মালিক খোকন ভাই আমার জন্য একটা রেখে দিতেন। এতে টপলেস ইন্ডিয়ান মেয়েদের ছবি ছাপা হতো। কিন্তু পড়ার মতোও ছিল অনেক কিছু। এখান থেকে এক উড়িয়া কবির কবিতা আমি অনুবাদ করি আমার মতো করে। মেডিকেলের সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় 2য় স্থান পায় সেটি! কিন্তু লেখালিখি চলেছে। '91তে আমি আর ডাঃ শাহাদত হোসেন রোমেল আমাদের 28তম ব্যাচের শেষবর্ষপূর্তির স্মৃতিতে একটি বই বের করি। আয়তাকার চটি বই। দুজনের মোট 14টা করে কবিতা (ইমদাদুল হক মিলন ও আফজাল হোসেনের দুই যুবক নামের উপন্যাসটার আদলে)। আমারটার নাম ছিল 'প্রেম চতুর্দশী'। যাই হোক পুশিং সেলে সেবার 12 হাজার টাকার মতো কামাই- আমার টার্গেট সিনিয়ার আপারা। একটা বই 500 টাকায়ও বিক্রি করছি।মজার ব্যাপার হচ্ছে ধুলো বালির কেচছা' নামের একটি ক্যাসেটে আমার দুটো কবিতা আবৃত্তি হিসেবে ঠাই পায়!
চ. কবিতার সঙ্গে আড়ি এরপর দীর্ঘদিন। তবে নিজে না লিখলেও পড়ি, প্রচুর পড়ি, পড়েছি সময়টাতে। হঠাৎ এবছর 14 ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে একটা লিখলাম পরিস্থিতি-4 নামে। এটাই পত্রিকা অফিস রিজেক্ট করেছে। অথচ ইরাজ ভাই, শিবব্রত বর্মন কিংবা কামরুজ্জামান কামু বা আমাদের সঞ্জীব দা (দলছুটের) বেশ প্রশংসা করেছিলেন। আমার তাদের কাছে একটিই প্রশ্ন ছিল- কবিতাটা ছাপার যোগ্য কীনা, মানে তারা সাহিত্যপাতার সম্পাদক হলে ছাপাতেন কীনা। উত্তর ছিল ইতিবাচক। পরে রোহন কুদ্দুস তার অনলাইন ম্যাগাজিন 'সৃষ্টি'তে কবিতাটি ছেপে দেয়। তো ওর অ্যাসেসমেন্ট হচ্ছে যদি লেখা লেখি চালিয়ে যাই, আগামী 5 বছর পর হয়তো ভালো কবিদের একজন হয়ে যাব। ব্রাত্য অবশ্য আমার ব্যাপারে আগে থেকেই ডিসাইসিভ- আমার দ্বারা কবিতা লেখা অসম্ভব।
ছ. কিন্তু লেখকের কী আর এত ভাবলে চলে। আমি লিখি মনের আনন্দে। সেটা পদ্যই হোক আর গদ্য। সামহোয়ার ইন ব্লগে চার-পাঁচটা লিখেছি। প্রিয়মানুষরা প্রিয় বলেই হয়তো প্রশংসা করেছে। সর্বশেষ কানসাটে নিহত কিশোর আনোয়ারকে নিয়ে একটা কবিতা লিখলাম। মনে হয়েছিল হয়তো জাতের হয়েছে। কিন্তু বড় বড় সম্পাদকরা এর ভুল ধরলেন। আরে তাতে থোড়াই কেয়ার আমার। আমি লিখে যাই মনের আনন্দে। ছাপা হলে 500 টাকা বিল পাব, এই আশায় চটির ছাল তুলে সাময়ীকির সম্পাদকদের পেছনে হাত কচলে হাটা আর জি্ব হুজুর হবে না আমাকে দিয়ে। হবে না আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে এবই সেবই মুখস্ত করে উগড়ে নিজের জ্ঞান জাহির করা। অগত্যা কী আর করা। এই (অ)কবি এভাবেই লিখে যাবে তার (অ)কবিতাসমগ্র।

কবিতাসমগ্র : অমি রহমান পিয়াল













[নীলাঞ্জনা নামে একজন সহ-ব্লগার হঠাৎই মন্তব্য করে পুনরুজ্জীবিত করেছেন আমার একদম প্রাচীন পোস্টটিকে। একটা অনুরোধও করেছেন। আমার পুরনো কবিতাগুলি রিপোস্ট করার জন্য। খুজেপেতে দেখি বহু কবিতা লিখে ফেলেছি। সেগুলি একসঙ্গে রাখলাম এই পোস্টে। অবশ্য নির্বাচিত কবিতাগুলোই। ধন্যবাদ নীলাঞ্জনা। এই পোস্ট আপনাকে]


এক.
পরিস্থিতি - চার
..............

(মুক্তা, মুই তোরে খুব খুব কুচপাং)

ক.
তোর তো তবু বন্ধু আছে- গান শোনাবার,
কবিতা বা গল্প বলার;
আমি ছাড়াই দিনগুলো তোর ভালোই কাটে, কাটার কথা।
আমিই কেবল একলা থাকি
জগৎ জীবন সবই ভুলে
আমার যাপন মগ্ন কেবল স্বপ্ন বোনায়,
মগ্ন আমি একটু ছায়ায়, একটি কায়ায়
সঙ্গী যে তোর প্রতিকৃতি।


খ.
জানিসই তো মল্লে আমি কেমন কাঁচা!
তবু কেন উস্কে বেড়াস পাঞ্জা নিতে,
ওদের সাথে? চোখে মুখে ভীষণ খিদে
এক লহমায় এক পলকেই সব দেখে নেয়
পাহাড়-নালা, ভাঁজ-খাঁজ আর চোখের আড়াল মানচিত্র।
আমার প্রণয় খুব প্লেটনিক, তোর স'বে না তোর স'বে না
গদ্য-পদ্য ছত্র টুকে রোমান বাঙাল ওই এসএমএস
মোর আসে না। পারি না তাই জ্যোতিষ সেজে
হাত বুলোতে। এই বে-গুণে পোষাবে না, পোষাবে না
যদি বলিস! দু' পায়েতেই সরতে রাজি- বিঘ্ন চিতে।

গ.
কেঁদেকেটে কেন মিছেই বুক ভাসালি?
ভালোই জানিস- নাকের ডগা লাল করে তোর
ফোঁপানো জল, এই বুকেতেও আঁচড় কাটে তীব্রতর।
হৃদয় মাঝে তাল মিলিয়ে ক্ষরণ চলে, নিক্তিতে তোল
সমান সমান- একচুলও নয় এদিক-ওদিক। হয়তো
তবু অনিচেছ বা ইচেছ করেই, আত্মঘাতী হামলা চালাই
রক্তিম হই তোর নোনাজল-উৎস ধরে। তুমুল দামাল
ভালোবাসার ঘাত-প্রতিঘাত একেই বলে- নে জেনে নে।


দুই.
প্রণয় প্রলয়
...........
প্রলয় মাতম, উথাল-পাথাল
ঢ্যাম কুরকুর শুনছি মাদল
নরমসরম, শরম শরম
প্রশ্বাসে ঝাঁঝ, বড্ড গরম;
আগুপিছু, ওপর-নিচু
তাল কাটে না, ছন্দশীলা।
তার আকুতি মরণ-বাঁচন
কাম-সুরসুর তুমুল রমণ,
আন্দোলিত ক্লান্ত শরীর
প্রকম্পিত পাহাড়-নালা,
ভেবেছিলাম প্রলয় বুঝি!
ভূল বকেছি- প্রণয় লীলা।


তিন.

পরিস্থিতি- পাঁচ
............
ঠোট দুটো তোর চক্ষু মুদে স্বপ্ন দেখায়,
ফিরব কবে বাহুডোরে- আলিঙ্গনে!
সেবার তুই ছাড়বি না যে জানি আমি,
আকড়ে র'বি জাপটে ধরে, বাহুর জোরে
-জানি আমি। আর কতটা রাখবি আড়াল,
থাকবি আড়াল? সাহস করে একটু নাহয়
নিলিই ঝুঁকি! হারা জেতা পরের কথা,
ভালোবাসায় যাদব বাবু ব্রাত্য ভীষণ,
অংক কষে কার কবে কোন প্রেম হয়েছে!
লাল পলাশে ফাগুন হাওয়ায় কোকিল ডাকে,
সময় যখন ভালোবাসার,
তাতেই না হয় ডুবিভাসি।।


চার.

পক্ষীকাল
.......
(মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন
তাইরে নাইরে নাইরে গেল সারাটি জীবন...)

যখন ডানা গজালো, ইচেছ ছিল ঈগল হব।
প্রথম আসমানের উঁচুতেই হবে বিচরণ;
উড়ানকালে পাখা তেমন জোর পায়নি
চিলের মতো তবুও মেলেছি দুটোকে
কাক-চড়ুই থেকে একটু ওপরে;
যৌবনে আমি বাঁজ,
তীক্ষ চোখে খুজে বেড়াই সাপের ফনা!
হোক সে রোদেলা মরু, কিংবা পাহাড়ি ঢাল-ক্লান্তিহীন।
যোদ্ধা হতে গিয়েই গৃহস্থ হওয়া হলো না আমার,
গোধুলীতে নিড়ে ফিরে ডানা ঝাপটাই- একেলাই।
এখন আর ভোর বা ভরসন্ধ্যার কোনো বিভেদ নেই,
শুকনো ডাল আকড়ে ঠায় বসে রই
শিকারেও আসেনা রুচি কদাচিৎ।
শকুন, কিংবা পেঁচার মতো ঠায় বসে রই
চেয়ে দেখি, দেখে যাই- সুখের গেরস্থালী।


ছয়.
আনোয়ারের শার্ট
............
(কানসাটের বিদ্রোহী শহীদ এক বারো বছরের কিশোরের স্মৃতিতে)

মা'রে, তোরে দিনমান জ্বালাইছি খুব
তোর পাতের ভাগ খাওয়াবি বইলা 'আনুরে...'
ডাকটা ডাইনে-বামের সবাইর শোনা।
তারপর চোর-পুলিশ খেলা-তুই আর আমি।
কিন্তু সেইদিন তুই ছিলি না,
ছিল পুলিশ আর আমি।
আমার ডোরাকাটা লাল জামাটা ওগো পছন্দ হইছিল খুবই,
এর থাইকা ভালো চাঁদমারি তো হয় না!
তোর পোলার বুক ছেদা কইরা বাইরাইছে ছররা;

কিন্তু 'আনুরে...' কইয়া সেইদিন তুই মাতম তুলছ নাই।
কানছস। ঠিক কানছস।
মানুষ দেখে নাই, শোনে নাই
তোর বুকের গহীনের ক্ষরণ
খালি চোখে দেখে সাধ্যি কার!
তারা কাগজের পাতায় দেখছে-
ডোরাকাটা লাল শার্ট নিয়া প্রস্তর মূর্তি এক মা;
যেই রক্ত দিয়া দশ মাস পেটে পালছস
তাতেই ভেজা ডোরাকাটা লাল শার্ট, ছিদ্র ছিদ্র।

মা তুই শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়াছিলি, কান্দস নাই
তুই শহীদের মা- কান্দন তোরে তো মানায় না।
আশ্চয্য! এইডাও তোর মতো অশিক্ষিতরে
কেউ শিখাইয়া দেয় নাই!
আমাগো একচালা ছাপড়ার ঘর,
বিদ্যুৎ দিয়া কী কাম!

বাজান যখন কয় 'দোকানে বয়'- আমি মিছিল দেখি।
ডোরাকাটা লাল শার্ট পইড়া
সবার আগে যাই-গুলি খাই।
আমার একটা ফটু তুলার শখ আছিল মা,
ফটু উঠছে, তাতে আমি নাই!
এই ফটু ঝুলবনা আমাগো বেড়ার কঞ্চিতে
এই ফটু, আমার গরবিনী মা'র দ্রোহের আগুনে হেম
ঝুলুক বাংলার প্রতিডা বিপ্লবীর অন্তরে।


সাত.

দেয়াল
.......
দেয়ালটা'মি ভাঙতে পারি!
'ভালবাসি ওকেই ভীষণ'-
বিবৃতিতে, একতরফা সীমানাটা
দিলে তুলে; করতে আড়াল
সরতে নাগাল- দিলে তুলে।
তবু আমি ভাঙতে পারি!
ম্যাটাডরের লাল চাঁদোয়া
ওই সে দেয়াল, চুন-সুড়কির
আস্তরে মোর যায় আসে না।
সিংয়ের গুতোয় ধরবে ফাটল
কিংবা নাহয় দড়াবাজের মতোই
টপকে যাব, ডিগবাজিতে।
তখন তুমি কই পালাবে?
গনগনে এই হৃদয়টাতে সলতে দিলে
এক নিমেষেই উড়ে যাবে দূর্গ তোমার;
তখন তুমি কই পালাবে?
কিন্তু আমার ক্ষত্রিয় প্রেম
অহম জাগায়, দেয়ালটা'মি
ভাঙতে পারি- ভাঙব কেন!


আট.

পাণি গ্রহনের নেপথ্য কথন
..................
ঐ সবল কাঠামোয় উদ্ভিন্ন যৌবন খুজি না নারী!
খুজে ফিরি অন্য অনুষঙ্গ।
আজনম একেলা পুরুষ আমি,
এই নিষ্ফলা ভূমিতে আবাদের প্রয়াস নিরন্তর।

'মেঘ দে পানি দে'তে গলেননি ঈশ্বর
তাকে ভোলাতে তাই প্রচেষ্টা নাই
তবু আমায় ভোলাতেই কী তুমি 'প্রেরিতা নারী'!

এই শরীর সঙ্গম কাতর ছিল না কোনোদিন
বহু লড়াইয়ে শ্রান্তক্ষত শুশ্রষাও খোঁজে না;
সঙ্গী খোঁজে, সবল- প্রবল সঙ্গী
তোমার নারীত্ব তাই কোনো বাধা নয়
ধাঁধাও নয় নারী
এই নিস্ফলা ভূমে আদম-হাওয়ার মতো প্রজনন
আমাদের এজেন্ডা হবে না।

খোক্কসের হানা অবিরাম- দিনরাত
ক্যালেন্ডার বা ঘড়ির কাটা মেনে চলে না;
আমি হাঁপালে তুমি তুলে নেবে তরোয়াল আমার।
তাই তোমার সবল কাঠামো দেখি
বাহু দেখি- কতখানি জোর
চোখ দেখি-কতখানি ক্রোধ
তোমার বুকের গড়নে আমি শক্তিশালী ফুসফুসের অস্তিত্ব খুঁজি
স্তনের কোমলভাব না
তোমার জঙ্ঘায় আমি পেশব উরুর প্রান্তমুখ খুঁজি
যোনীর গহীনতা না

পাঁজর হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করি
কতখানি ব্যাপ্তি ওই অলিন্দ-নিলয়'র;
পায়ের গঠন স্পর্শে মাপি
কতটা পথ পাড়ি দিতে পারবে অনায়াস।

আমার স্পর্শে কাম নেই প্রেম আছে,
সেইটুকু সতীর্থ যোদ্ধার।
বোঝাপড়া আর লড়াকু মননের তুমুল মিশেল
এই নিষ্কাম প্রেম।

সুলতানের তুলিতে উঠে আসা
ক্যানভাসের জমাট বুননে পলাতকা
সবল ও প্রবলা নারী,
চলো এবার যুদ্ধে ঝাঁপাই।


নয়.

ভামকথন
...........
ভামের ছোকছোক যতখানি
তড়পানি তারচেয়ে বেশী

বাধভাঙা যৈবনের যুবতীরা
তাহাদের পায়াভারি হয়
উপজাত চঞ্চলতায়
তারা ছোকছোক চোখ খুঁজে
আ মলো যা- ছিনালিতে
তুষ্ট যুবকেরা গদগদ হয়

ভামেরা ঘামে
তড়পায়

এই বুঝি কোল ছেড়ে নেমে যায় সখী
এত কড়ি এত তেল
রূপটান উপটানে
লেসফিতা কাজলে
তারা যুবকেই যায়

ভামেরা ঘামে
তড়পায়



দশ.
আয় মন প্যাচ খেলি...
..................
কৃতজ্ঞতা ও উৎসর্গ : চোর (এই স্টাইলে তার একটা পইদ্য পড়ছিলাম মনে পড়ল)


দুর্বাঘাস দুর্বাতাস দুর্বাসা মন
হ্যান ত্যান ফ্যান নিয়া হই জ্বালাতন
কী বিষয় সমাচার মন নাহি জানে
শুধু জানি ত্যানাখানি টেনে টেনে বানে
হিংটিংছট দিয়া কাম নাহি হয়
কামভাবে কামাখ্যায় করি বরাভয়
বাড়ামাঝে বাড়াখানি বাড়াদেরও বাড়া
ক্যানো শুধু টানাটানি নাই যদি সাড়া
বেলতলে বেলপাতা পুংশক যম
ছ্যাচে ম্যাচে খ্যাচেও তো হইবে না ওম
ইস তুই ফিসফিস করে বলে মন
এই ভবে কর্মতো নইলো সাধন
এইভবে এইভাবে এইভাবে নয়
বনপথ খুলে দাও যদি চাও হয়
হলো নাকি হয় নাই বলে দিবে কারা
চোখ মুদে ঠেসে দিয়ে আরা পাবে যারা
আয় মন প্যাচ খেলি বলে যায় কবি
কবে আর কবে তুই যৈবতী হবি!



এগারো.

সাপ
......
গর্ত ছেড়ে বেরিয়েছি বহুদিন,
হাইবার নেশন শেষ
খোলস বদলে নতুন চামড়াটা এখন চকচকে খুব
সজীবও বড্ড, প্রোপালশনেই টের পাই।

লকলকে জিভে ইতিউতি
ফনাটায় ফোস ফোস
পিচ্ছিল গর্তের খোজে আনাগোনা
ফনা তুলে ইতিউতি

মেলে না! মেলে তো
বীনের সুরে নাচের শর্তটাই গোলমেলে বড্ড
বিষদাত লুকিয়ে ফনা দুলাই
অবদমনের ভারে বিচলিত
লকলকে জিবে বড্ড খিদে
ফনা দোলে, হিস হিস

আমি তার সর্বাঙ্গে জড়াই অনেক ভুখ নিয়ে
সে কেনো ওঝা ডাকে!










বারো.

আলিঙ্গন : দ্য স্টোরি অব আ হাগ
.........................
বগল তলে আকশি হয়ে কাঁধ ধরেছো
আমার বেড়ে তোমারো পিঠ
শর্ত কেবল- হাত যাবে না এদিক-ওদিক !
মানছি সেটা। পায়ের ওপর ভার চেপেছো
দুলছি দুজন হাওয়ার দোলন, এদিক-ওদিক।

তোমার চুলে নাক ডুবিয়ে নিচ্ছি সুবাস;
মুখ তুলো না, শর্ত ভুলে একটা চুমু দিতেও পারি
সেই চুমুটা এক'শ হয়ে ছড়িয়ে যাবে এদিক-ওদিক।

আলিঙ্গনের প্রাইমারি রুল, নিষ্কাম তা
কিন্তু আমার বুকে তোমার ধুকপুক চাপ
ঝড় তুলেছে, রিখটারে তা তির-তির-তির
দুলছে কাটা প্রবল বেগে এদিক-ওদিক।

এখন আমার তুমুল দ্বিধা,
তিন পরতের বাধা ডিঙ্গে
আমার দুহাত, দরাজ হয়ে
দেরাজ খোলার ছলের খোঁজে।
বুঝতে পারি, তুমিও ঠিক বুঝতে পারো
চাপ বেড়েছে, কাঁধের ওপর নখের আঁচড়
গরম প্রশ্বাস বুকে নিয়ে দ্বিধায় আমি
শর্ত ভেঙ্গে বেড়েরো ঘের কমিয়ে দেব?
নাড়ছো মাথা ধীরে-বেগে, এদিক-ওদিক।

বুকে আমার মুখ ঘষছো, নাক ঘষছো
উতর-চাপন; সন্ধিটাতো ভাঙ্গলে নিজেই!
এবার আমি আক্রমণে যেতেই পারি,
যাব নাকি? (ধ্যাততেরিকা!
একটেলের এই লাইনগুলো না ভীষণ বাজে,
মিনিট ত্রিশের সময়সীমা, কেটে দিলো!!)



তেরো.

সর্বংসহা
.......
অবিরাম ঠকাই তারে পুরুষালী চালে। এবং বোলে;
'তোমাকে শক্ত হতে হবে নারী, যোদ্ধা হতে হবে
সবল শরীর শুধু নয়, সবল মনও চাই যে'!
শীলনটা ঠিকঠাক করে, অন্য পুরুষেতে
তারা বিচলিত ও বিপন্ন ঠিকরানো বিভাতে।

সুদীপ্তা সে নারী আমাতেই বিপন্না বারবার
আমি ও আমার পুরুষালী চালে, বোলে
মায়াবতী সে নারী আমাতেই লাঞ্ছিতা বারবার
আমি ও আমার পুরুষালী চালে, বোলে

আমি ষোলআনা শুষে নিই প্রবল-প্রতাপে
অধিকারবোধ কিসের? না সে জানে, না আমি
শুধু আমি ও আমার পুরুষালী চালে
সে বিপন্না-লাঞ্ছিতা বারবার। এবং বোলে

অথচ ভিন্ন তেপান্তরে
আমার গমন অন্য পরে
তবু সে অপেক্ষা করে,
উপেক্ষা উপেক্ষা করে;
যদি মন ফেরে!
ভিন নারীর ভালোবাসার গল্প শুনে
রাত এবং দিন কাটে তার,
উপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়
যদি মন ফেরে!

হতাশা কী ছোঁয় না এই সর্বংসহাকে!
উপেক্ষা কি পোড়ায় না এই তুমুল বেহায়াকে!
কেন ফিরে ফিরে ঝাপায় সে
ভুল দীপের ফাঁদে!
জ্বলে পুড়ে ছাই হয়, রাত জাগা রোদনে
অজানা অধিকার বোধ, আমার শোষণে
ছাই হয়, জ্বলে পুড়ে, কাঁদে
তবু ঝাপায় বারবার, ফাঁদে

উপভোগ করি আমি এই জালিয়াতি
মন নিয়ে চালাক চালিয়াতি
তবুও দিনরাত, ঠকে সে অবিরাম
আমার পুরুষালী চালে, এবং বোলে

আমার কী আসে যায় তাতে!
কিছু কি আসে যায় তার বেদনাতে?

শুধু জানি বিপন্ন আমার নিরাপদ ঠাঁই আছে একখানা
শীতে জুবুথুবু হলেও অপেক্ষায় গরম বিছানা
তুমুল খিদেয় আছে পরম যত্নে সাজা থাল-বাটি
শোকে ও সন্তাপে ভালোবাসার দুর্ভেদ্য ঘাটি

তবু সে বিপন্না বারবার, লাঞ্ছিতা
আমি ও আমার পুরুষালী চালে, এবং বোলে
পরম মমতায় সে সব সয়ে যায়
প্রগাঢ় ভালোবাসায় সে সব ভুলে যায়
সয়ে যায়, ভুলে যায়; আর ঠকে বারবার
আমি ও আমার পুরুষালী চালে, বোলে।।



চৌদ্দ.

সভায় বসেছ কবি রুহানি জগতে
.....................
(শামসুর রাহমানের মৃত্যুতে)

(একজন কবির প্রয়াণে
শহরের পথঘাট গমগম করে না মিছিলে
সে সংবাদ কেউ কেউ শোনে কম বেশি;
কারো শ্রুতির আড়ালে থেকে যায়।
গাছপালা স্তব্ধ হয়, ফুরায় ফুলের আয়ু
আর নদীনালা কালো মেঘ রাখে বুকে...
একজন কবির প্রয়াণে : শামসুর রাহমান)

মিছিলে দেখিনি তো মুষ্ঠি তোমার
প্রুফও কেটে দাওনি লাজুক চিরকুটের
তবু অনুভবে ছিলে সহজাত- যুদ্ধ ও প্রেমে।

দুঃখিনী বর্নমালা আজ আবারো কালো
তোমারই সন্তাপে,ব্যানার শিরোনাম, শোক মিছিল
এবং বচনামৃত ঝরছে খুব;
আনুষ্ঠানিকতায় খামতি নেই কোনো।

আমি হব না শরিক ওই শোকের কফিনে
তুমিই তো কাঁদতে ভুলিয়েছ!
ঘাতকের ছুরিতে ফালাফালা হয়েও
কালো ফ্রেমের চশমায় জলকণা পাইনি খুজে

কালচে জমাট রক্তের বিছানায় শুয়ে অবাক বিস্ময়
এবং মুচকি হাসি ছিল অটুট।
অটোগ্রাফ বইয়ে গুরুর দক্ষিণা-
'শানিত যৌবন আজ টেনে সূর্য নামায়'

আমার নিয়তি তো তুমিই ঠিক করে দিয়েছিলে সেদিন
সেই মুহূর্ত থেকেই নির্বাণ, অনির্বাণের পথে।

তোমার আনুষ্ঠানিকতা চলছে কেমন!
জমিনের নিচে মুনকির নুকিরের সওয়াল জবাব;
মুজলিম আদিব কী ফের নির্যাতিত আযাবে!

জেরা শেষে ফিরবে কোথায় জানিইতো।
কবিসভায় যোগ দিতে উদগ্রীব তুমি;
স্বপনে আসছি তাই আজ রাতেই
দেখব নতুন কী লিখলে আজ কবি
গড়তে আমার নতুন প্রভাত।।

(মৃত্যুর সময় আল্লাহ রূহ কবয করেন এবং যারা জীবিত তাদের রূহও কবয করেন ওরা যখন নিদ্রিত থাকে। অতঃপর যার জন্য মৃত্যু অবধারিত তিনি তার রূহ আটকে রাখেন এবং অন্যদের রূহ এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সমপ্রদায়ের জন্য- সূরা আয-যুমার : আয়াত -৪২)



পনের.

'আমার রোদটা তোমাকে পাঠাচ্ছি...'
..........................
কথা ছিল রোদ পাঠাবে
ঝকঝকে রোদ
গনগনে রোদ
বিষাদ মেঘে ভিজছি আমি কখন থেকে!
দুঃখ জলে ভিজছি আমি তখন থেকে,
কালো ছায়ায় আকাশ ঢাকা
সূর্য্য কোথায়? রোদ মেলে না
ভিজছি আমি তখন থেকে
ক-খ-ন থেকে !
ঝকঝকে রোদ, কই? আসে না।
মিছেই তবে কেন আমায় ভুল বোঝালে!
ভুল শোধালে,
ভুল স্বপনে ডুব দে'য়ালে?
কখন থেকে বসে আছি-
সারা গায়ে রোদ মাখাবো!
তোমার লাজুক বার্তাটিতে গা ডোবাবো
রোদ আসে না, রোদ এলো না!!



সম্পর্ক
.........
(ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি
হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব ভূয় এবাভিবর্ধতে।।)

তোমার মন খারাপ- জানতেই
আমার সপ্তাহ পার হয়ে যায়
শেভ করিনি, কিংবা উড়ুক্কু চক্রাবক্রায়- দেখতে
তুমিও তাকাও ভিন্ন চোখের শার্সিতে
আমাদের কুশলাদী থেকে সবকিছু
এইভাবে পরজীবি
বাহকের মর্জিতে ওঠে নামে খবরের দাম

অথচ প্রবল নৈকট্যের তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ
তুমি আমি বিলক্ষণ বুঝি তা
তবুও রাধা মলাট বন্দী থাকে
মোহন বাঁশীতে আকুল কুঞ্জবনে ধায়

গতিহীন জলাশয়ে শ্যাওলা-পানা
সমুদয় চাওয়া পাওয়া ঢোকে গিলে
আমরা প্রান্তিক থেকে যাই
প্রাকৃত নই, প্রকৃত হই না।।


সাপ
.....

গর্ত ছেড়ে বেরিয়েছি বহুদিন,
হাইবার নেশন শেষ
খোলস বদলে নতুন চামড়াটা এখন চকচকে খুব
সজীবও বড্ড, প্রোপালশনেই টের পাই।

লকলকে জিভে ইতিউতি
ফনাটায় ফোস ফোস
পিচ্ছিল গর্তের খোজে আনাগোনা
ফনা তুলে ইতিউতি

মেলে না! মেলে তো
বীনের সুরে নাচের শর্তটাই গোলমেলে বড্ড
বিষদাত লুকিয়ে ফনা দুলাই
অবদমনের ভারে বিচলিত
লকলকে জিবে বড্ড খিদে
ফনা দোলে, হিস হিস

আমি তার সর্বাঙ্গে জড়াই অনেক ভুখ নিয়ে
সে কেনো ওঝা ডাকে!


পাণি গ্রহনের নেপথ্য কথন
.................
(উৎসর্গ : আমি যারে পেয়েও হারাইরে)

ঐ সবল কাঠামোয় উদ্ভিন্ন যৌবন খুজি না নারী!
খুজে ফিরি অন্য অনুষঙ্গ।
আজনম একেলা পুরুষ আমি,
এই নিষ্ফলা ভূমিতে আবাদের প্রয়াস নিরন্তর।

'মেঘ দে পানি দে'তে গলেননি ঈশ্বর
তাকে ভোলাতে তাই প্রচেষ্টা নাই
তবু আমায় ভোলাতেই কী তুমি 'প্রেরিতা নারী'!

এই শরীর সঙ্গম কাতর ছিল না কোনোদিন
বহু লড়াইয়ে শ্রান্তক্ষত শুশ্রষাও খোঁজে না;
সঙ্গী খোঁজে, সবল- প্রবল সঙ্গী
তোমার নারীত্ব তাই কোনো বাধা নয়
ধাঁধাও নয় নারী
এই নিস্ফলা ভূমে আদম-হাওয়ার মতো প্রজনন
আমাদের এজেন্ডা হবে না।

খোক্কসের হানা অবিরাম- দিনরাত
ক্যালেন্ডার বা ঘড়ির কাটা মেনে চলে না;
আমি হাঁপালে তুমি তুলে নেবে তরোয়াল আমার।
তাই তোমার সবল কাঠামো দেখি
বাহু দেখি- কতখানি জোর
চোখ দেখি-কতখানি ক্রোধ
তোমার বুকের গড়নে আমি শক্তিশালী ফুসফুসের অস্তিত্ব খুঁজি
স্তনের কোমলভাব না
তোমার জঙ্ঘায় আমি পেশব উরুর প্রান্তমুখ খুঁজি
যোনীর গহীনতা না

পাঁজর হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করি
কতখানি ব্যাপ্তি ওই অলিন্দ-নিলয়'র;
পায়ের গঠন স্পর্শে মাপি
কতটা পথ পাড়ি দিতে পারবে অনায়াস।

আমার স্পর্শে কাম নেই প্রেম আছে,
সেইটুকু সতীর্থ যোদ্ধার।
বোঝাপড়া আর লড়াকু মননের তুমুল মিশেল
এই নিষ্কাম প্রেম।

সুলতানের তুলিতে উঠে আসা
ক্যানভাসের জমাট বুননে পলাতকা
সবল ও প্রবলা নারী,
চলো এবার যুদ্ধে ঝাঁপাই।

শনিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১০

কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ
সৈয়দ আফসার

কুড়ি বছর পর
.............
কিসে যেন রেগে গেলে... তার মানে
হারানো কান্নাও হতে পারে গোপনে
আরো তিন-তিনটি বছর পর...
সবই বুঝি মৃদু ত্রুটি কাঁচা মাংশের ঘ্রাণে
ওই মুখ! ‘বর্ণিত হবার লোভে’ লাজুক বাগানে
মনে ও বনে

এসব ঘটনাপ্রবাহ কুড়ি বছর পর কবিকে চেনে
শেষ দিবসে আমি যখন কিছু কথা জমিয়ে রাখি
কাঁধেপিঠে ধূলির নগরে
কাঁপা হাতের আড়াল থেকে সর্বস্ব দাও
অতি-গোপনে



বাসমতি ঘ্রাণ
...........
কপাল বলে কথা! যা ভোলা যায় না
কখনো স্থির অথবা অভিশপ্ত অস্থির
ভাগ্য সেও পথিপার্শ্বে একার-
পথভোলা... অভিযুক্ত যাযাবর
যদি তিরস্কার করো, তাতেও অহংকার
ইর্ষা যথারীতি সদয়, হৃদয় পুড়বার
কারণ-
তোমার অঙ্গুরীর স্পর্শ তাজ্জব ব্যাপার!
ভেজা হাতে চাল ধোঁয়ার তরতাজা ঘ্রাণ
পাচ্ছি-
ধোঁয়া ওঠা বাসমতি ভাতের উপর


ফেরারি পর্ব ৪
............
আর ক’টা দিন পর পূর্ণতা পাবে, পূর্ণ হবে ষোলকলা; সেদিন তোমার হাসির উপর দাঁড়িয়ে রবে আমার কান্না... কথা বলার আগে গাথা-গল্পকথা শুনে শুকিয়ে যাচ্ছে গলা। যদি বলি পুরোটাই ভুল টার্মের হাত ধরে ঘুরে আসা লতানো কথা-টথা। অন্য ধারাবাহিকতা। আর ক’টা দিন পর আমিও হারাবো পাঁচ-দশ-বিশ পয়সার মত অঙ্গের সচলতা। তুমি তাকালেই দেখবে জল থেকে উড়ে আসা হিমেল বাতাস, তিন টুকরো সিগারেটের ছাই, অঙ্গে চেপে ধরা অসুখ-বিসুখ কিংবা ঘুমের রেনেসাঁ... ভিনদেশে মায়ের কথা আজ বেশি মনে পড়ছে। কারণ নিরানন্দে সময় কাটে প্যান্ট পকেটে চাবিশব্দের গান শুনে, হবো অধিকার বিনয়! মূল্যবান নিঃসঙ্গতায়... তাই মনগড়া শরীর ঘেঁসে বসা প্রগল্ভ সমঝোতা। আর ক’টা দিন পর আসা-যাওয়া পশ্চাত ব্যাকুলতা।

আয়না
.....
আয়না নিজের সৌন্দর্য যাচাই করতে শিখায়
আয়না নিজেকে জানতে, জানাতে শুদ্ধির পথ দেখায়
এ-বিশ্বাসে সংকোচ ছাড়াই আলোড়িত! বিলোড়িত কল্পনা
মর্মগ্রহণতা তোমার চোখে... চোখ রেখে যদি বলি-
চোখ মনের আয়না

লুকোচুরিতে হারাতে চাই না বলে এতটা নৈর্কট্য
এতটা সৌহার্দ্য ছুঁতে পারা গেল; কিন্তু প্রতিসত্য
প্রতিদিন আয়নার মুখ দেখার কথা মনেই থাকে না
এরূপ কথা বা রচনা অন্য একটি হাওয়ায় উড়ে গেল
তুমি কারো এসেন্সটুকু ভুলে খুলে নিলে

সারাদিনের পাপগুলো যখন মনের আয়নায় খুলে খুলে দেখি
পাপে-তাপে আয়না আর নিজের ছবির কাছে দূর্বল হতে থাকি


একশ্বাসে দীর্ঘশ্বাস
............
স্মৃতির করাঘাতে অসংখ্য মুখ দেখে
চাপা ক্রোধে নিজেই পুড়ি, কিছুই জানলে না
পাঁজরের নিধি
শেষ অংশে পরাজিত করে বললে- এভাবে
চলতে পারে না; তারচে’ বসো একশ্বাসে
দীর্ঘশ্বাস শুনি

আমাকে ব্যবহার করো চঁওকি; দিবস রজনী


অশ্রুকথা
........
নিজের ভেতর হরদম ওঠা-নামা ফ্রকের ছায়া
তাকে চিনতে পারিনি, তুমি রক্ত নিয়ে এসো খামাখা
দেখো আমি ক্রমাগত গুটিয়ে নিচ্ছি নিজেকে
সারারাত জেগে থাকল ঘুম... দেখে যাও
সঙ্গ দাও
ওহো তিরিশের সুপ্তকাঙ্খা শোকার্ত!
বলছি মমতাবশত
দৃষ্টি মেললেই দেখি বুকপকেটে কম্পন কুড়াচ্ছো
কথা বলার আগে অধীর বুকে জমিয়ে রাখছো
কী কথা! কার কথা
গোপনে যত আনন্দ-ব্যর্থতা
আসক্তি একই রকম প্রায়; দেহসুদ্ধ অশ্রুকথা


স্বস্থি
...
শীত রাতে তোমার খোটা খেতে খেতে
স্বস্থি এমন সর্বভূক হলো
যত ভাবছি ততই ভাল লাগছে, কলঙ্ক!

ভাবছি নামমাত্র চোখ বন্ধ করে, পার্কে

প্রকাশ্যে আমার জিজ্ঞাসা শ্বাসরূদ্ধ হলে
বলার অপেক্ষা, কিছুই থাকে না...
কথকতা তাও অকার্যকারিতা

শীতরাতে তোমার খোটা খেতে খেতে
শীতের তীব্রতা সেও চায় দেওয়ালে শোতে



পাপড়ি
.....
মিশে যাচ্ছো অনেক দূরে, স্তব্ধতায়-গোপনে
স্পর্শ-লোভে-প্রাপ্তি কিছুই পাইনি কুশলচক্রে
তিনটি পাপড়ি সাবলীল ভঙিমায় নাড়ালে একাকি
স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারে না অনুভূতি... এতোদিনে
তারাও জেনে গেছে-
একই বৃন্তে ঘুরে নিজগৃহকোণে মৃত প্রায় আমি

বলছি পরাগ রেণু, কোথায় পাবে এতো এতো
মৌমাছি?
সে কথা শুনলে তুমি হাসো
হাসতে হাসতে কিছু একটা বলো
কাঁধে রেখে হাত, বাকিটুকু থামাও

নিজের তাগিদে বীথি ছড়ালে আশে-পাশে চিরদিন
আমাকে কোন দোষে জড়াতে চাও? ফেলে আসা দিন



বিষদাঁত
......
সে দিনের পর বলছি লঘু-শোকে
অনেক দূরে দাঁড়ালেও নেই নিষ্কৃতি
সব নিষেধ ভেঙে সঙ্গ দাও
দিনশেষে বিষদাঁত নাড়াও
আজ তবে পাঠ হউক, অন্য কিছু
অন্যান্য কথা
উত্তরে খুলছো অসহায়,দক্ষিণের
বাতাসে আমি তত ভাল নয়

আজ তবে কিছু রোদ ঝড়ু–ক ছদ্মবেসে
জড়িয়ে থাক্ সদাসর্তক সূর্য ওঠার আগে



অভিযোগ পত্র
.........
একত্রে হেঁটে ‘যত পারো চুমো খেয়ো’
এই শীতের দেশে ভিন্নরূপ আদ্রঠোঁটে
পুর্নবার অর্ধেক দ্বিমত তোমার লোকচক্ষু সম্মানে
বিগত দিনের মতো অশ্রুপতন চকিতভ্রমে
অবশ্য নাও হতে পারে সঘন সঙ্গমে

স্পর্শে কোন অভিযোগ নেই, সেও বলছে
কাঙ্খা যত তাও বুঝো; খুঁজো পুরো দশ আঙুলে
নিজ দেহে চেপে ধরি শোক আশ্রয় দেওয়ালে
সন্দেহ সাড়া পেতে পেতে শেষরাত্রি নিকটে রাখছি
শুন্যডিগ্রি উত্তাপে ঘুম-বড়ি খেয়ে

চকিতভ্রমে একাগ্রতা আমাদের সঙ্গমতৃপ্তি
জোড়া চোখে ইচ্ছে মরে গেলে চাই না সম্মতি


ছায়াস্বপ্ন
.......
পুনরায় ফেরার আগে কি এমন
ছোট্ট-ছোট্ট কথা বলার থাকে যে
তোমাকে বারবার বলতে ইচ্ছে করে
অর্ধেক হৃদয়!
হিয়ার ভেতর আমাকেও জাগাও কান্নায়
হারানো দিনে পুরনো কথাও সন্দেহ জাগায়

পথে ঘুরিফিরি সহস্র মুখ ভালো লাগে ছায়ায়
পুনরায় ফেরার আগে তুমি বলো
সব ছায়া কি আর একসাথে ভালোবাসা যায়?


আর্তনাদ
.....
বন্ধু যারা দুঃখ পেয়েছো রূপাদের কথায়
দুঃখকে করুণা করো না, হাড়ে-র ভাষায়
মিশে যাচ্ছো সম্পর্কে তৎক্ষণাত...
অল্পই তফাৎ
এই যা পান করা তামাকপাতা; শুশ্রুষা আহা!
সুখের ভেতর দুঃখকে শেখানো হচ্ছে চোখের প্রণয়

ওভাবে আমরা ভাবলে দেখতো কেমন হয়?
গাছের ছায়াগুলো হাসে পাখির ডানায়
রূপাদের ছায়া মিশে যাচ্ছে ঘাসের পাতায়

বন্ধু যারা দুঃখ পেয়েছো সম-বেদনা তোমাদের
পোড়াবাড়ির, রূপাদের, চক্ষুর... তারপর

আর্তনাদ কেঁদো না আর!



মন
....
মন কেটে কেটে মুখস্থ করছি লঘুশোক
তাকে মনে রেখে উড়তে দিয়েছি
আকাশের ওপারে
কতটা ওজন ওই আর্ত-বাতাসের!
জানা হলো না হিমালয় পাড়ে
বলছি সম্ভাবনা-দ্বিধা-ক্ষুধা আঁকার ভেতর
নিজের জন্য গোপন রাখছি কিছু
ঘূর্ণন, ঘর্ষণ
কাঁটা মনে কল্পনা, ঠিক সন্ধ্যায়
আমার জন্য ঝুলিয়ে রাখুন ভাবনায়


নির্বাসন লিপি
........
পাতাঝরা দিনে জল থেকে উঠে প্রথম প্রণাম
মৃদু বাতাসে লাফিয়ে ওঠা কিছু মাটির ঘ্রাণ
ঢলা হাতের শ্বাস নাকে-মুখে টেনে
মায়ের কোলে প্রতিদিন ঘুমপাড়ানি গান
ও-মা তোমার আঁচলে বাইন্ধা রাখছি
প্রাণ, জন্মের ঋণ

২.
কি আশ্চর্য! স্মৃতিকথা; বিগত বছরের
আশা ও ব্যর্থতা
রূপছদ্মবেশ তার কাছে আছে
বিগত দিনের মতো জমা
আমারও আছে; থাকবে নিজের সন্দেহ
সে সব দু’বারের বেশি কখনো ভাবিনি
বিব্রত-শ্বাসরোধি
তাকে চিনিনি... কিছু বলতে গিয়েও পারিনি
সেদিন তোমার বারণ শুনে হারালাম ভয়!
কিছুই জিজ্ঞেস করিনি

৩.
তোমার শাড়ির আঁচলে আমার কিছু দেনা বাকি
পেয়েও যেতে পারো নিদিষ্ট দিনে অনির্দেশে
মর্ম ও রীতি
কিন্তু পার্থক্য যা দেখি বির্তকের হাতছানি
স্পর্শমাত্র আকর্ষনহীন, আততায়ী; অস্থায়ী
সঙ্গমক্লান্তি
স্কুল জীবনের স্মৃতি মানে, রাফ-খাতায় আঁকা
একটি ফুলে; দুটি পাতা কেবল তুমি আর আমি
আমাকে যদি প্রশ্ন করো রূপ বৈচিত্রের সৌন্দর্য কী?
কিছু না ভেবেই বলবো ভোরের আলো-
যা চোখ খুলে দেখি, যা লক্ষ্য করি...
কারণ, স্পর্শের আগে দেখার আনন্দ-ই বেশি

৪.
যদি প্রশ্ন করো এমন ঠান্ডার দেশে দেহের উত্তাপ
কেমন; বলছি শোন তবে এক্স-ওয়াই-জেড
তীব্রতার ভেতর নড়ছি-চড়ছি কখনও নিরুদ্দেশ
আর কী কহিব তুমি প্রাজ্ঞনারী; দেহের বিপ্লব
নিজেও জানি না কেন প্রত্যেকবার তোমায়
দ্বিতীয়দর্পনে রাখছি, লিপষ্টিক, আইলিনার
মাশকারা...
আর কত কি?
পারফিউম কোন ব্যান্ডের তাও জানিনি

৫.
মাকে দূরে রেখে ক্ষুদ্র মনে জমছে কথকতা
বাল্যসখা আশা-র মতো আনন্দ দেয়
যেমন আনন্দ মায়ের বুকে মাথা রাখলে
দোয়া-মায়া-মমতা লুকানো মায়ের আঁচলে
ও-মা তুমি দোয়া করো, ভালো থাকা সারাক্ষণ
আর ক’টা দিন যাক, তারপর সবঠিকটাক
শীতে-প্রীতে পুড়ছি আমি ওহো কার্তিক-বর্ষা-শ্রাবণ
ব্যর্থতাই কি জীবন? জিজ্ঞাসা না-করাই ভালো
সে যে স্বেচ্ছায় হয়েছে নির্বাসন!

_____________♣_____________
কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হলো :
নি স র্গ
শিল্প সাহিত্য বিষয়ক খুদে পত্রিকা
বর্ষ ২৪ সংখ্যা ১ নভেম্বর ২০০৯

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০০৯

কবিতা হলো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয়

কবিতা হলো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয়
অন্যসব ক্ষমতা মোকাবেলার শক্তি চার্লস সিমিক

মার্ক ফোর্ড : আপনার বাল্যকাল কেটেছে বেলগ্রেডে। বলবেন কি দিনগুলো তখন কেমন ছিল? আপনার বাবা-মা সম্পর্কেও জানতে চাই। তারা কেমন ছিলেন, কী করে তাদের সাক্ষাৎ হয় এসব আর কী।
চার্লস সিমিক : বাবা ছিলেন অভিজাত বংশোদ্ভূত। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাবাই প্রথম বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে যান। অন্যদিকে মা ছিলেন বেলগ্রেডের ঐতিহ্যবাহী পরিবার থেকে আসা। মায়ের পূর্বপুরুষরা অন্তত ২০০ বছর ধরে বেলগ্রেডে বসবাস করছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকেও তাদের প্রাচুর্য ছিল, পরে সর্বস্বান্ত হন। আমার নানা ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক। অবসরে যাওয়ার পর তিনি জুয়া খেলে সব অর্থবিত্ত ছাইয়ের মতো উড়িয়ে দেন।
আপনার পরিবারের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা একত্রিত হলো কী করে?
চার্লস সিমিক : সত্যি কথা বলতে কী, তারা পরস্পরকে বরং ঘৃণাই করতেন। বাবার আত্মীয়দের পছন্দ করতেন না মা। চোখ পাকিয়ে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। এ কাজে বাবার জ্ঞাতিরা ছিলেন আরো সরাসরি। তারা আকণ্ঠ পান করতেন, হৈ-হল্লার মাস্টার ছিলেন একেকজন। আমার পরিচয় তাদের সঙ্গেই মিলে যায় বেশি।
মায়ের পরিবার ছিল অনেকটা ভীতু টাইপের, কেমন যেন অপ্রকৃতস্থ, গূঢ়চারী। তাদের সব শৌর্যবীর্য, বিত্ত-বৈভব হারিয়ে গেছে, অস্তিত্ব সংকটে সদা আতঙ্কিত। লোকগুলোর মধ্যে রসবোধ বলে কিছু ছিল না। সব বিষয়ই তাদের কাছে ঠেকতো রসকসহীন। বাবার আত্মীয়রা ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী, সদা প্রফুল্ল, খাবার টেবিলে জড়ো হলে তাদের মুখে খই ফুটতো। তাদের সঙ্গ আমার মায়ের কেমন লাগতো আশা করি কল্পনা করতে বেগ পেতে হবে না।
নাৎসি ও কমিউনিস্ট মতবাদের ™^›™^ সম্পর্কে ওই বয়সে কতটা সজাগ ছিলেন?
চার্লস সিমিক : যথার্থ। তাত্ত্বিক বিবেচনায় নয়, আমি সচেতন ছিলাম এই অর্থে যে, আমার চারপাশের সবাই তখন প্রায় সবসময়ই রাজনীতি নিয়ে তোলপাড় করতেন। বাবার দরদ ছিল রাজা-রানীর পক্ষে।
প্রথম বিশ^যুদ্ধে নানা ছিলেন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার দায়িত্বে। এই সেই ভদ্রলোকÑ যিনি তার পারিবারিক ধনসম্পদ জুয়া খেলে শেষ করেনÑ বিশ^াস করতেন, আমাদের যুদ্ধ থেকে তফাতে থাকাই উচিত ছিল। যতক্ষণ না মিত্ররা ইয়াল্টা কনফারেন্সের মতো আমাদের মুক্তির সনদ নিয়ে হাজির হয়।
মা সারাজীবন বিশ^াস করতেনÑ তিনি তার বিশ^াসের ঢোল প্রকাশ্যে পিটাতেন সব সময়Ñ যে সার্বীয়রা মূঢ়। রাজনৈতিক বুদ্ধিশুদ্ধি তাদের নেই বললেই চলে। অতএব তারা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন ভুল হবে, তাতে মা শতভাগ নিশ্চিত।
বাবার পরিবারের দিক থেকে, অপেক্ষাকৃত তরুণরা সবাই ছিলেন বামপন্থী, কমিউনিস্টদের প্রতি অনুরক্ত। তারা বলতেন, আমাদের মুক্ত করতে রাশিয়ার বীর সেনানিরা আসছে। মায়ের পরিবারের মতো লোকদের কচুকাটা করবে। একবার ভেবে দেখলেই পরিষ্কার হবে, এরপর অনেক চিৎকার-চেচামেচি হতো, গড়াতো অশ্রু, দড়াম করে দরোজা বন্ধের আওয়াজ শোনা যেত।
বছরগুলো আপনার জন্য কতটা দুঃসহ ছিল?
চার্লস সিমিক : আমাদের পরিবারে একটা গল্প চালু ছিল। ১৯৪৫ সালের ৯ মে বিশ^যুদ্ধ শেষ হয়, দিনটি ছিল আমার জš§ দিন। আমি সেদিন রাস্তায় খেলছিলাম। যাহোক, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে মা ও তার প্রতিবেশীরা রেডিও শুনছিলেন। একটু পানি পান করতে সেখানে ঢুকলাম, তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, যুদ্ধ শেষ। তাদের মুখ কেমন পা-ুর মনে হলো। আমি বললাম, ‘মজা করার দিন ফুরালো!’ যুদ্ধের সময় বাবাদের খবরদারি ছিল না। বড়রা তাদের জীবন বাঁচাতে ছিল সদা ব্যস্ত। সেই সুযোগে শিশুরা ইচ্ছে মতো যেদিক খুশি ছুটে বেড়াতে পারতো। কয়েক বছর আগে, দুটি বই পাই, যেগুলো ঠাসা ছিল বসনিয়ার যুদ্ধের ছবিতে। ছবির মুখগুলো কী অসুখী। সারজেভোর কয়েকটি শিশুর ছবি চোখে পড়লো, ওদের চোখেমুখে হাসির স্ফুরণ। যেন শিশুরা বলছেÑ এটাই কি মহৎ নয়, আর ওইটা ভয়ানক! হাসিখুশি মুখগুলো দেখে মনে হলো, এগুলো আমি ও আমার বন্ধুদের মুখচ্ছবি।
যুদ্ধ শেষে আমাদের মজা কিন্তু ফুরোয়নি, চলতেই থাকে। হ্যাঁ, আমাদের দরিদ্রতা ছিল, ছিল কমিউনিস্ট অনুশাসন, কিছু মার্কিন চলচ্চিত্রও ছিল, মার্কিন সেনাদের রেডিও থেকে প্রচার করা জাজ সংগীত, আর ছিল রাস্তাজুড়ে দুরন্ত শিশুর দঙ্গল। আমরা তখন থাকতাম বেলগ্রেডের কেন্দ্রবিন্দুতে, প্রতিবেশী বেষ্টিত। ফলে আমাদের দিনগুলো বিষণœতায় ভরে ওঠেনি, বরং আনন্দে কেটেছে। ইশকুলে প্রত্যেকটি ব্ল্যাকবোর্ডের ওপরে টানানো থাকতো টিটো, স্ট্যালিন ও লেনিনের ছবি। ছবিগুলো আমাদের স্কুলের পাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতো।
স্কুল টিচাররা বলতেন, ছবির লোকগুলো খুবই জ্ঞানী, তারা সারা দুনিয়ার তোমাদের মতো শিশুদের জন্য আনন্দ বয়ে আনছেন। আমি পড়ি মুশকিলে। কার কথা বিশ^াস করি? বাড়ির লোকেরা বলেন, অন্য কথা। তারা বলেন, ছবির তিন লোক বদের হাড্ডি, তাদের জন্যই তোমার বাবাকে পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে দূরে থাকতে হচ্ছে।
আপনি ফ্রান্সে পৌঁছলে, ফরাসি কর্তৃপক্ষ আপনাকে উ™^াস্তু শ্রেণীতে বিবেচনা করে। বাস্তুচ্যুতি, নির্বাসনের একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল?
চার্লস সিমিক : হ্যাঁ, আমি মনে করি তা ছিল। ফরাসিদের আমার পছন্দ হয়ে যায়; কিন্তু ফরাসিরা কী করতো, আমাদের অপমান করে মজা পেত। কয়েক মাস পর পর আমাদের পারমিট নবায়ন করতে হতো। নবায়ন করতে গিয়ে দেখা যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কর্তৃপক্ষ বললো, তোমার ওই কাগজটা কোথায়, ধরা যাক আমার নানীর মায়ের জš§ সনদ নেই। যুগোসøাভিয়া থেকে অনেক চেষ্টা করে তা জোটানো গেল, তখন হয়তো কর্তৃপক্ষ বলে বসলো, ওইটার আদৌ দরকার ছিল না। আমরা এক বছর প্যারিসের একটা হোটেলে ছিলাম। তখন বাবা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। তার পাঠানো অর্থে আমাদের খাওয়া খরচ চলতো। আমরা জানতাম না ভিসা পেতে আর কতকাল তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে। ওই সময় আমরা প্যারিসের পথে পায়ে হেঁটে চক্কর দিতাম। ছবি দেখতাম আর শিখতাম ইংরেজি। মা কিনে আনতেন ‘লাইফ’, ‘লুক’ ধরনের ম্যাগাজিন। আমার ভাই আর আমি ম্যাগাজিনের পাতা উল্টেপাল্টে দেখতাম স্নানের পোশাক পরা নারী মডেল, বাহারি রঙের নতুন মডেলের গাড়ি আর খাবার ভর্তি রেফ্রিজারেটরের ছবি। এ কাহিনী করতাম প্যারিসের স্কুলে যাওয়ার দিনগুলোতে। ওই সময়ই কিন্তু প্রথম মজি কবিতায়। ইশকুলে যা হয় আর কীÑ বোদলেয়ার, ভার্লিন, র‌্যাবোর কবিতা মুখস্থ করো, ক্লাস ভর্তি ছেলেমেয়ে আবৃত্তি করে শোনাও। ভেবে দেখ কী দশা আমার হতো তখন। ফরাসি উচ্চারণ কতটা কঠিন ছিল। তারপরও কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমার চোখে জল এসে যেতো।
আপনি প্রায়ই বলেন, নিউইয়র্ক আপনার পছন্দের শহরÑ প্রথম দর্শনেই কী শহরটির প্রেমে পড়ে যান?
চার্লস সিমিক : ঠিক তাই। নিউইয়র্কে প্রথম পা রাখি ১৯৫৪ সালে। তখন ইউরোপ ছিল একেবারে ধূসর আর নিউইয়র্ক ঝকমারিÑ বাহারি রঙের ছড়াছড়ি, চোখ তাতানো বিজ্ঞাপন, হলুদ ট্যাক্সিক্যাব। তখন ফ্রান্স থেকে জাহাজে চড়ে নিউইয়র্ক আসতে সময় লাগতো মাত্র ৫ দিন। কিন্তু তখন মনে হতো বহু দূরের পথ। আজকাল চীনকে যতটা দূরের ঠেকে। নিউইয়র্ককে তখন মনে হতো, কার্নিভাল উৎসবেÑ যেখানে রয়েছে দাড়ি লাগানো রমণী, তলোয়ারবাজ কিংবা সাপুড়ের পোশাক পরা লোকজন আর জাদুকরেরাÑ সুসজ্জিত।
দশ বছর পর আপনার বাবার সঙ্গে দেখা হলো, তখন ক্যামন অনুভূতির জš§ হয় আপনার মনে?
চার্লস সিমিক : অবিশ^াস্য। বাবা আর দশজনের মতো ছিলেন না। তথাকথিত পিতা-পুত্রের সম্পর্কে তার আস্থা ছিল না, যদিও ব্যাপার মোটেও অতটা সহজ ছিল না। তিনি আমাদের নিয়ে বাইরে বেরুতে পছন্দ করতেন, যেতেন বারে, রেস্তোরাঁয়, জাজ ক্লাবে। নিউইয়র্কে আমার প্রথম জাজ ক্লাবে যাওয়া বাবার সঙ্গেই। বাবা ভালো ভালো অনেক গল্প জানতেন। তাই তার সঙ্গে আলাপ করে খুব মজা পেতাম, সবসময়ই দারুণ লাগতো। উপরি পাওনা হতো, বাবার পাঠ। ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি, প্রাচ্যের ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, মিস্টিসিজম, রহস্য গল্প, পত্রিকায় খেলার পাতা এমনকি গসিপের কলামে তার উৎসাহে কমতি ছিল না, বিপুল আয়োজনে মনোনিবেশ করতে পারতেন তিনি, পড়তেন সবকিছুই। তার আরেকটা গুণ ছিল। তিনি শুনতেও পছন্দ করতেন। কেউ কিছু বললে বাবা আগ্রহ ভরে শুনতেন, কাজেই তার সঙ্গ সহজ হয়ে উঠতো, ভালো লাগতো। অনেক বছর পর আমার কবি বন্ধু জেমস ট্যাইট এবং মার্ক স্ট্রান্ডের সঙ্গে বাবার সাক্ষাৎ হওয়ার পর আমার বন্ধুরা নিশ্চিত করে, বাবার সঙ্গে কথা বলে তাদের ভালো লেগেছে। তারাও সাক্ষ্য দিল বাবার সঙ্গ উপভোগ্য।
কিন্তু আপনার মায়ের সঙ্গে তার খুব একটা বনিবনা হয়নি, তাদের ভালো কাটেনি?
চার্লস সিমিক : না। তাদের পুনরোকেত্রীকরণের দুই বছর যেতে না যেতেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। দশ বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তাদের দেখা। ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে এসেছি, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের সাযুজ্য ছিল না। কিচ্ছু না। দুজন ছিলেন দুই ভুবনের বাসিন্দা। মা ছিলেন অবিশ^াস্য রকমের সাহসী ও সৎ ব্যক্তি। তার রাজনৈতিক দৃৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাবার চেয়ে বেশি স্বচ্ছ। হলে কী হবে, দিনকে দিন তিনি রস হারাতে থাকলেন। হয়ে উঠলেন শঙ্কাগ্রস্ত। আমাকে হয়তো বাসার খুব কাছের মুদির দোকানে পাঠালেন কোনো সদাই কিনতে, আমাকে পাঠিয়ে দিয়ে রাজ্যের যত খারাপ কল্পনা তার মাথায় ভিড় করলো, দুর্ভাবনায় কাতর হলেন তিনি, আমি সহিসালামতেই ফিরে এলাম, মা বলে ডাকও দিলাম, তার ঘোর তখনো কাটে নাÑ তিনি অবাক হয়ে আমার প্রত্যাবর্তন দেখেন। যুদ্ধের বীভৎসতা আমাদের কারো ওপরই মায়ের মতো এমন প্রকটভাবে পড়েনি। তিনি প্রায়ই অভিযোগ তোলেন, তোমার বাবা সিরিয়াস লোক নন। তিনি বুঝতেই চেষ্টা করছেন না আমাদের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে। মা নিজেকে পরাস্ত সাব্যস্ত করলেন; কিন্তু তিনি কিছুতেই পরাজয় মানতে প্রস্তুত ছিলেন না; তিনি ভাবতে শুরু করলেন, ইতিহাস তাদের জীবনকে অর্থহীন করে দিয়ে গেছে।
আর আপনি? কখনো কি ভেবেছেন ইতিহাস আপনাকে নিপীড়ন করেছে?
চার্লস সিমিক : ছোটবেলায় এরকম কখনো ভাবিনি; কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত নই। শৈশবে যেধরনের ক্ষেপাটেরা পৃথিবীকে বিষিয়ে তুলেছিল, তারা এখনো আমাদের চারপাশে রয়েছে। তারা আরো যুদ্ধ চায়, চায় আরো আরো লোককে বন্দি করতে, হত্যা করতে। এসব ভয়ানকভাবেই পরিচিত, ক্লান্ত করে আমাদের, সন্ত্রস্ত তো করেই।
শিকাগো কেমন লাগলো?
চার্লস সিমিক : শিকাগোকে মনে হলো, কমিউনিস্ট ইস্তেহারের কফি-টেবিল সংস্করণ, যার বাইরেটা চকচকে, হ্রদমুখো বাহারি ভবন; কিন্তু শহরের ভেতরে বস্তি। এর একপাশে মিশিগান এভিনিউ, যেখানে বিলাসী হোটেল আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কয়েকটা অ্যাপার্টমেন্ট দূরে দেখা যায়, কারখানার ধোঁয়া কু-লি পাকিয়ে উঠছে আকাশে, আর রাস্তায় ঝুলকালি মাখানো শ্রমিকরা বাসের প্রতীক্ষা করছে। শিকাগোকে বলতে পারেন, অভিবাসীদের স্বর্গ। বহু কারখানা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সরগরম থাকে। সেখানে সবারই কাজ জুটে। ধারে-কাছেই রয়েছে চমৎকার সব সমুদ্র সৈকত, যেখানে সুন্দর যুগলেরা বালুর ওপর বসে কামু ও সাত্রের লেখা পড়ে। সুইডিশ, জার্মান, ইতালীয়, ইহুদি, কালো সব ধরনের বন্ধু জুটেছিল, তারা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা করে আমাকে শোনাতো। আমি শিকাগো ছিলাম মাত্র ৩ বছর। শিকাগোই আমাকে প্রথমবারের মতো মার্কিন নাগরিকত্ব দেয়। তাই ওখানের সব ঘটনাই আমার কাছে বেশ চিত্তাকর্ষক ছিল।
সেটা কিরকম?
চার্লস সিমিক : সেখানকার সব কিছুই আমার কাছে ছিল অভিনব। কাজ খুঁজতে যাওয়া, কাজে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন মুখের দেখা পাওয়া, তাদের সঙ্গে বন্ধুতা, সব কিছুই
ছিল একেবারে নতুন। নতুন মুখগুলোর অধিকাংশই কিন্তু বয়সে আমার বড় ছিলেন। তারপরও চুটিয়ে গল্প করতাম, প্রত্যেক রাতে দল বেঁধে যেতাম বারে, মদমাতাল হয়ে তারা তাদের জীবনের বিচিত্র সব গল্প বলে যেত।
সেখানেই কী প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করেন?
চার্লস সিমিক : প্রথমত আমার কিন্তু গোপন অভিলাষ ছিল চিত্রশিল্পী হওয়ার।
কী ধরনের চিত্রশিল্পী হতে চেয়েছিলেন?
চার্লস সিমিক : পোস্ট ইম্প্রেসনিস্টদের অনুকরণ করে যাত্রা শুরু। পরে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের দিকে ঝুঁকি।
আঁকাআঁকি ছেড়ে দিই আমার ৩০ বছর বয়সে। ততদিনে আমি হয়ে উঠেছি পুরোদস্তুর বিমূর্ত এক্সপ্রেশনিস্ট। সত্যি কথা বলতে কী, চিত্রশিল্পী হওয়ার মতো প্রতিভা আমার সামান্যই ছিল।
আপনি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করেন কখন?
চার্লস সিমিক : ওক পার্ক হাইস্কুলের শেষ বছরে আমি লিখতে শুরু করি, সিরিয়াসলি বলা ঠিক হবে না। তখন মাঝে মধ্যেই কবিতা রচনায় বসি। আগ্রহ কিন্তু তখনো পেইন্টিংয়ের প্রতিই বেশি।
ওক পার্কে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর শিকাগো সান-টাইমসে অফিস বয়ের চাকরি পান। এরপর পড়াশোনা চালানোর ব্যাপারে কী কথা হয়েছিল?
চার্লস সিমিক : অনেক কথা হয়েছে। নিউইয়র্ক বিশ^বিদ্যালয় ও শিকাগো বিশ^বিদ্যালয় আমার ভর্তির আবেদন গ্রহণ করে; কিন্তু আমার দিক থেকে পড়া চালিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। খরচ জোগানোর প্রশ্নে বাবার ওপর আর নির্ভরের সুযোগ থাকে না। তখন তার আয় কমে এসেছিল, স্যালারি যা পেতেন নিমেষেই ফুরিয়ে যেত।
বাড়ি ছাড়েন কবে?
চার্লস সিমিক : আমার ১৮ বছর বয়সে। লিংকন পার্কের একটা এপার্টমেন্টে উঠি। আমার প্রতিবেশী ছিলেন সান-টাইমসের এক সহকর্মী। তিনি তখন শিকাগো বিশ^বিদ্যালয় থেকে দর্শনের ওপর একটা ডিগ্রি শেষ করছিলেন। তিনিই হয়ে ওঠেন আমার কবিতার প্রথম সিরিয়াস পাঠক। কল্পনাকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। জোর দিতেন যুক্তির ওপর, অধিবিদ্যায় নয়। মিশিগান লেকের তীরে বসে আমি তাকে ‘প্রুফ্রক’ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, তিনি জিজ্ঞেস করেন, সন্ধ্যাকে কি করে টেবিলে শোয়া অক্সিজেন লাগানো রোগীর সঙ্গে তুলনা করা যায়? আমি যুক্তি দিতাম তিনি পাল্টা যুক্তি দিয়ে তা খ-নের চেষ্টা করতেন। কবিতা সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে তিনি বল প্রয়োগ করতেন। তখন তিনি আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। আমরা ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভালো বন্ধু ছিলাম।
তখন কোন ধরনের কবিদের কবিতা পড়ছিলেন?
চার্লস সিমিক : আধুনিকতাবাদী, ইউরোপীয় ও মার্কিন কবিদের কবিতা। এলিয়ট, পাউন্ড, উইলিয়ামস, স্টিভেন্স, অ্যাপলিনেয়ার, ব্রেতো, রিলকে, প্রমুখের কবিতা। ঔপন্যাসিকদের মধ্যে নেলসন আলগ্রেন, শিকাগোতে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। একদিন রবার্ট লয়েলের একটা বই পড়তে দেখে তিনি বললেন, সিমিক এসব ভুষিমাল পড়া ছাড়ো! নিজেকে শিশু বানিয়ে রেখো না। বরং পড়ে ফেলো কার্ল স্যান্ডবার্গ ও ভ্যাশেল লিন্ডসের রচনাগুলো!
মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে একটা জনপ্রিয় চল ছিল তখন, পূর্বাঞ্চলের এলিট বুদ্ধিজীবীদের দেখা হতো সন্দেহের চোখে, খুব একটা পছন্দও করা হতো না তাদের।
যতদূর মনে পড়ে, হার্ট ত্রেক্রনকে কবি হিসেবে আমার প্রথমে খুবই মনে ধরে। তিনি ছিলেন অনেকটা গুপ্ত, তাই আমার মধ্যে তার আবেদন লক্ষ্য করি। তার দুর্ভেদ্য কবিতাগুলোর সুর তখন অনেকটা উত্তুঙ্গ বলে মনে হতো।
ক্রেনের অল্প অনুকরণ করে তখন বহু কবিতা আমি লিখেছি। একেবারে তার শব্দ বন্ধ হুবহু উঠিয়ে এনেছি আমার কবিতায়, সেসব কবিতা পাঠক তো দূরে থাক, আমি নিজেই মর্ম উদ্ধারে প্রায়ই হিমশিম খেতাম। আমার সৌভাগ্য যে, ওই ধরনের লেখা সব নষ্ট হয়ে গেছে।
আপনার অধিকাংশ কবিতা অকর্মা, নৈঃসঙ্গ্যপীড়িত লোক, বেপরোয়া দুর্বৃত্ত, পথে ঘুরে বেড়ানো মরমি, সস্তা নোংরা হোটেলের স্থায়ী বাসিন্দাদের... জীবনযাপনকে উপজীব্য করে লেখা। আপনার কুড়ি বছর বয়সে নিউইয়র্কে দেখা লোকজনের জীবনালেখ্যর সঙ্গে এদের একটা যোগসাজশ আছে, তাই না?
চার্লস সিমিক : ঠিক বলেছেন। আমি নিউইয়র্ক আসি ১৯৫৮ সালের গ্রীষ্মকালে। তখন খুব নিঃসঙ্গ বোধ করি।
অথচ শিকাগোতে আমার বহু বন্ধু ছিল, যারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেÑ কোন দুঃখে তুমি নিউইয়র্ক যেতে চাও বন্ধু? শিকাগোতে অনেক কিছুই ছিল আমার পছন্দেরÑ সিনেমা, জাজ ক্লাব, বইয়ের দোকান। রাতের বেলা ক্লাসে যেতাম, দিনে কাজে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে শার্ট বিক্রি করেছি, ঘর রঙ করেছি, বই বিক্রেতাও ছিলাম, কেরানিগিরি করেছি এই টাইপের কত কাজ যে তখন করতে হয়েছে! কাজ কিংবা ক্লাস না থাকলে যেতাম মদ খেতে কিংবা সিনেমা দেখতে। সেই সময়টায় ঘুমাতাম কম, পড়তাম অনেক বেশি, আর প্রায়ই প্রেমে পড়তাম।
যতদূর মনে পড়ে, তখন খুব একটা সুখী কিংবা বিষাদগ্রস্ত কোনোটাই ছিলাম না। স্কুলে যাওয়ার পথে মানুষকে ল্যামপোস্টে ঝুলে মরে থাকতে দেখে যে লোকগুলো বেড়ে ওঠে তাদের দশ সুবিধার একটা হলো, জীবন সম্পর্কে তাদের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
আপনার প্রথম দিকের অপ্রকাশিত সব লেখা নষ্ট করে ফেলেছিলেন বলে জেনেছি। কিন্তু এ কাজ আপনি কেন করলেন?
চার্লস সিমিক : ঘটনা ১৯৬১ সালের। তখন আমি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন করতে ফ্রান্সে গেলাম। বছর খানেক পর আমার ভাই জুতার বাক্সে ভরে আমার প্রথম দিকের কবিতাগুলো পাঠায়। পড়ে মাথা বিগড়ে যায়। কী সব রদ্দিমাল। আমি এতদিন ভুষিমালের কারবারি করেছি! নিজের সৃষ্টির কাছে জীবনে আর এত লজ্জায় পড়িনি আমি। রাতে বাক্স ভর্তি কবিতা বগলদাবা করে ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ছুড়ে মারলাম সেগুলো।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় বসবাসরত সবাই এক ধরনের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট শুরু হলে নিশ্চয়ই আপনারা সম্মুখ সমরের জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়েন?
চার্লস সিমিক : হ্যাঁ। আমরা তখন সদা সতর্ক অবস্থায় ছিলাম। কারণ আশঙ্কা করছিলাম যেকোনো সময় যুদ্ধ বাধবে, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিউবা সংকট তখন প্রকট হয়ে উঠেছে। আমাদের কমান্ডিং অফিসাররা সতর্ক করে দিলেন। যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বিরাজ করছে, অফিসারদের মুখ থেকেও কথা সরে না। এমন একটা অবস্থা। আমরা সশস্ত্র ছিলাম। অস্ত্রটা যেকোনো মুহূর্তেই গর্জাতে পারতো। ভাগ্যিস সংকট মোচন হলো, আমাকে মানুষ খুন করতে হয়নি।
এ সময় কি কবিতা লিখছিলেন? এমন যুদ্ধাবস্থায় কি লেখা চালানো সম্ভব?
চার্লস সিমিক : সম্ভব ছিল, কিন্তু আমার নিজেরই তখন কবিতা লেখার মতো কোনো ইচ্ছা ছিল না। ওই অবস্থায় একটা নোট খাতায় কিছু মন্তব্য লিখে রাখি, তখনকার সময়ে পড়া বইগুলোর সম্পর্কে আমার মতামত টুকে রাখি, এসব কয়েক মাস চালিয়ে যাই, এর বাইরে আর তেমন কাজ নেই।
আপনার নির্বাচিত কবিতার সংস্করণে শুরুতেই দেখা যায় ‘কসাইয়ের দোকান’ কবিতাটা প্রথমেই রাখেন, আপনি কি মনে করেন এই কবিতাতেই নিজের কণ্ঠস্বর প্রথম ফোটে, এ কবিতা আপনার কাব্যসৃষ্টির তোরণ™^ার?
চার্লস সিমিক : আমার লেখা প্রথমদিকের কবিতাগুলোর মধ্যে এটাকেই প্রথম সংরক্ষণের কথা মনে হয়। কবিতা লিখে ফেলি সেই ১৯৬৩, তখন থাকতাম ইস্ট থার্টিন্থ স্ট্রিটে। আমার আস্তানার আশ পাশে তখন বেশ কটা পোল্যা-ীয় ও ইতালীয় কসাইয়ের দোকান ছিল, যেগুলোতে শূকর, ভেড়া, হাঁস-মুরগি মেরে চমৎকার করে ঝুলিয়ে রাখা হতো। কসাইখানার সামনে গিয়ে একটুখানি থামি, দোল খাওয়া গোস্তের দিকে তাকাই, এটা আমার একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। কসাইখানার সামনে দিয়ে যেতে যেতে আমি আমার শৈশবে প্রত্যাবর্তন করি, ইউরোপে। সেই ছেলেবেলায়, আমি কিনা কসাইদের মতো হাঁস-মুরগির গলা কেটেছি কত! তারপর শূকর...। স্মৃতির মধ্যে ডুব দিই।
যদি বলি আপনার এই কবিতার মূল সুরে সৃষ্টিশীলতা ও সহিংসতার কোথাও একটা যোগসূত্র আছে, ভুল বলা হবে কি?
‘সেখানে রয়েছে প্রকা- এক গাছের গুঁড়ি আর ভাঙা হাড়গোড়
রগড়ানোÑ আর একটা নদী মরে পড়ে আছে বিছানায়
সেখানে খাবার খাই
গভীর রাতে অচেনা ডাক শুনতে পাই।’
চার্লস সিমিক : আমারো তাই মনে হয়, কিন্তু কবিতাটি লেখবার সময় এ ব্যাপারে সচেতন ছিলাম কিনা আজ আর মনে পড়ে না। আমি যে একটা কসাইখানায় বেড়ে উঠি ব্যাপারটা বুঝে উঠতে অনেক বছর গড়িয়ে যায়, আমার বেলগ্রেডবাসী শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক বছর পর দেখা হলেই তা পরিষ্কার হয়। আমাদের ভূসম্পত্তি শুধু যে দখল করা হয় তাই নয়, আমার শৈশবে গৃহযুদ্ধ বাধে, নানান গোষ্ঠীর মধ্যে চলে সংঘর্ষ। রাস্তায় রাস্তায় রক্ত গড়াগড়ি খায় আমি কতবার যে এদৃশ্য দেখেছি! নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে খুন হতে হয়Ñ এটাই ছিল আমার প্রথম পাঠ। ‘স্রেফ যুদ্ধের’ কোনো ঘটনা পড়তে গিয়ে টের পাই, হাজার হাজার নিষ্পাপ লোক মারা পড়ছে এবং তারা মরতেই থাকবে, আমার অন্তরাত্মা চামড়া ছিঁড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
আপনার বহু কবিতায়Ñ ‘কোকরোচেস’-এর কথাই ধরি না কেন, দেখা যায় এমন সব লোকের আনাগোনা, যাদের কোনোমতেই কাব্যিক বলা যায় না।
চার্লস সিমিক : এই কবিতাটাও প্রথম দিকে লেখা। নিউইয়র্কে থাকার সময় আমার চারপাশে তেলাপোকারা গিজ গিজ করতো। তেলাপোকাদের সঙ্গে আমার উঠবস ছিল নিত্যদিনের। এরাই ছিল আমার একমাত্র সম্মানিত মেহমান, যারা সারাক্ষণ ঘুরঘুর করতো। আমিও ভদ্র আচরণ করতাম, সতর্ক থাকতাম, যাতে আমার মাননীয় অতিথিদের স্বাস্থ্য হানি, অঙ্গহানিও বলা যায়Ñ না ঘটে।
পোকামাকড়ের চরিত্র আপনার কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে। পিঁপড়ার প্রতিও আপনি বেশ অনুরক্ত, বিশেষ করে ‘জ্যাকস্ট্রস’-কাব্যে এ ধরনের মন্তব্যের পক্ষে নজির পাওয়া যায়।
চার্লস সিমিক : জানি আমার বন্ধুরা কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করার সময় বলে, সিমিক তুমি কি আজকাল মদ একটু বেশিমাত্রায় গিলছো? সব দেখি ছারপোকা! আসলে আমি কিন্তু বরাবরই ক্ষুদে সব পোকামাকড়ের কাজ-কারবার বিপুল আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করি। ওরা সব দল বেঁধে বরযাত্রী যাচ্ছে, নানা কাজে সদা ব্যস্তÑ তা তাদের কাজ যাই হোক না কেন। মাছিরা শঙ্কাগ্রস্ত, বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ আছে যেগুলো ক্ষেপাটে, কিন্তু প্রজাপতি কী সুন্দর, নকশা করা ডানা তাদের, ওদের সৌন্দর্য কিন্তু তাদের প্রতি তোমাকে সদয় করে তুলবে, তুমি কোনোভাবেই প্রজাপতি মারতে উদ্ধত হবে না। পিঁপড়েরাও কিন্তু দেখতে চমৎকার। ছোটবেলায় খেলার ছলে পিঁপড়েদের পায়ে পিষতাম; কিন্তু আজ এই বয়সে, কোনো ভিমরুল যদি আমাকে হুল ফোটাতে থাকে, আমি ওই বেটাকেও মারতে পারি না।
অনেক সমালোচক মন্তব্য করেছেন, আপনার কাব্যসৃষ্টিতে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রভাবের ঘুটমিশেল আছে। আপনিও কি আদৌ তাদের মতো করে বিবেচনা করেন?
চার্লস সিমিক : এ প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেয়া যায় আমার ঠিক জানা নেই। ইউরোপীয় কবিদের বিপুল কবিতা পড়েছি আমি; আমার সাময়িক মার্কিন কাব্যের কোনোটাও বাদ দিইনি। আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে পাঠাভ্যাস আর দশজনের মতো ছিল না।
অনেকে হয়তো বলবেন সিমিকের কবিতার সুর কেমন বিদেশি। এখানে অনেককে রাগ আর হতাশা মেশানো অনুযোগ করতে শুনেছি, ‘সিমিক আমাদের একজন নয়।’ টের পাই আমার কেইসটা জটিল, আমাকে শ্রেণীকরণে বেশ সমস্যা, আমি না নির্বাসিত, না অভিবাসী; কিন্তু এ ব্যাপারে আমার সত্যি কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি ইচ্ছে করে এ জীবনে চলে আসিনি কিংবা এমনতর কবি হতে চাইনি। বলা যায় ঘটনাটা এভাবেই ঘটে গেছে।
আপনার মাতৃভাষা নয়, ছোটবেলায় এ ভাষায় কথা বলেননি, এমন একটা ভাষায় লিখতে কেমন বোধ করেন?
চার্লস সিমিক : জানি না এ প্রশ্নের কী জবাব হয়। আমি কখনোই মাতৃভাষায় কবিতা লিখিনি। আমার ভেতরে ভাষা নিয়ে কোনো লড়াই ছিল না।
কবিতা লেখার প্রস্তুতির জন্য কোনো কিছু পড়ার পরামর্শ আছে কি?
চার্লস সিমিক : কবিতা লিখতে কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই। খুব ভালো একটা কবিতার সংকলন কিংবা দর্শনের বই পকেটে নিয়ে ৪ বছর ঘুরে বেড়ালে, তা তন্ন তন্ন করে পাঠ করলে, বিশ^বিদ্যালয় পাসের জন্য হয়তো কাজে দেয়; কিন্তু কবিতা রচনায় নয়।
আপনার কবিতাকে ঐতিহ্যবাহী এবং নিরীক্ষাধর্মী দুই-ই আখ্যা দিয়ে সমালোচক ও কবিরা প্রশংসা করেন। এই যে ™ি^ধারার লড়াই, এ ব্যাপারে আপনি কতটা সজাগ ছিলেন?
চার্লস সিমিক : এতক্ষণ ধরে তো একথাই বলছিলাম। বিটস ও চার্লস ওলসনের প্রকল্প কবিতা তো ছিলই, আবার দেখ রবার্ট ব্লাই তার ‘দ্য সিক্সটিস’ ম্যাগাজিনে মার্কিন কবিদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত প্রেসক্রিপশন দিতেন। আমার ঝোঁক ডব্লিউ এস মারউইন, জ্যামস রিট ও ব্লাইয়ের প্রতিই একটু বেশি ছিল। কারণ তাদের কবিতাগুলো ছিল অনেকটা পরাবাস্তববাদী। তারপরও কাব্যশৈলী এবং কবিতার আইডিয়া খুঁজে ফিরেছি অন্য কোথাও। কোন গুণ কবিতাকে মহত্তর করে এ রহস্য উদ্ঘাটন আমার কাছে বরাবরই কঠিন মনে হয়েছে। গত একশ বছরের সাহিত্যের ইতিহাস যদি কিছু প্রমাণ করে, তাহলে এ সত্যকেই সমর্থন করে। রবার্ট ফ্রস্ট, রবার্ট ক্রিলি, গেরট্রুড স্টেইন এবং ডোনাল্ড জাস্টিসের কবিতা আমার ভালো লাগে। তথাকথিত ভাষাবাদী কবির দল আর নতুন প্রজšে§র কবিরা যারা কবিতার শরীর নির্মাণের ব্যাপারে মোচড়া-মুচড়ি করেন, আজকাল মনে হয় তাতে সময়ের অপচয় ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয় না।
আপনার কবিতায় গল্প বলার ভঙ্গির সঙ্গে অসম্ভব শক্তিশালী চিত্রকল্পের অদ্ভুত সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। এটা আপনার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যের একটি। আগে থেকে কল্পনা করা যায় না এমন সব চিত্রকল্পে থাকে গল্পের সারকথা, প্রচ্ছন্নভাবে হাজির হয় সময়, এক ধরনের টানটান উত্তেজনা; কীভাবে এসব কবিতায় ছড়িয়ে দেন?
চার্লস সিমিক : কার্লোস উইলিয়াম কার্লোস আমার ওপর বেশ মুগ্ধতা তৈরি করেন। আর আমার রচনাশৈলী গড়ার ক্ষেত্রে শুরুর দিকে ক্র্যান ও স্টিভেনস-এর অনুকরণে কাব্যচর্চাও অংশত একটা ভূমিকা রাখে। পাঠকদের চমকে দেয়ার একটা চেষ্টা আমার মধ্যে তখন ছিল। অন্য কথায় বলি আমি চাইতাম আমার কবিতা একটা কুকুরও বুঝতে পারুক। এখনো তাই, কিছু অচেনা অদ্ভুত শব্দ কবিতায় চালান করি, বিস্ময়কর চিত্রকল্প নির্মাণের প্রয়াস রাখি, চমক সৃষ্টিকারী অধিবিদ্যার ™^ারস্থ হই। এক সন্ন্যাসীকে ঢুকিয়ে দিই বেশ্যার ঘরে। মদ্যপানরত কিংবা অন্তর্বাস পরা নারীদের কুচকাওয়াজ দেখতে দেখতে কেউ একজন শুকনো রুটিতে অনবরত কামড় বসাচ্ছে অতি অনায়াসে লিখে দিই।
যুদ্ধোত্তর মার্কিন কবিতার মানচিত্রে আপনার সমগোত্রীয়দের শনাক্ত করতে বললে আপনি নিশ্চয়ই চার্লস রিট এবং জ্যামস ট্যাইটের নাম বলবেন। ঠিক বলেছি?
চার্লস সিমিক : নিশ্চয়ই। তাদের আমি চিরকালের মতো চিনি। চার্লস রিটের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৩ সালে ফ্রান্সে, তখন আমি সেনাবাহিনীতে ছিলাম। তারপর আমরা বন্ধু হয়ে যাই, এখনো আছি। আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমাদের গায়ে নয়াপরাবাস্তববাদী কবির লেবেল এঁটে দেয়া হয়, আমাদের কবিতা আত্মপ্রচারণামূলক, অর্থহীন শব্দের ফুলঝুরিতে ভরা, প্রতি-বুদ্ধিজীবীবাদী বলে আক্রমণ চালানো হয়, সত্যি বলতে কী, ওই ধরনের লেবেল ছিল শূন্যগর্ভ। পরাবাস্তববাদী কবিতার এক সময় জাঁকজমক ছিল, কিন্তু সে তো অনেক বছর আগের কাহিনী এত দিনে মরে গেছে, সেই কবে গত হয়েছে। স্বীকার করি আমাদের কবিতায় চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি ছিল, ছিল অননুমেয় উল্লম্ফন, সেটাই শেষ কথা ছিল না। ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে নিউইয়র্ক লাইব্রেরিতে আমি মার্কিন লোকসাহিত্য খুব মনোযোগ সহকারে পড়েছি, বহু। তখন জাদুকরি ভাষায় কথা বলার প্রতি আমার আগ্রহ জšে§, আগ্রহী হয়ে উঠি ছন্দোবদ্ধ লম্ফঝম্ফে, প্রবাদ বাক্যে। আমাদের লোকসাহিত্যে পরাবাস্তববাদী চিত্রকল্পের উপস্থিতি নেহায়েৎ কম নেই। একবার তো নোট নিতে শুরু করি, ওইসব চিত্রকল্প সংগ্রহ করে একটা বই প্রকাশের চিন্তা-ভাবনা করি।
বহির্বিশ^কে দেখানোর কথা ভাবি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রণে ভঙ্গ দিই। নোটবইটা কানায় কানায় ভরে গেলে একদিন তা হারিয়ে যায়। ব্যাপারটা হয়তো কাউকে প্রমাণ করতে পারতাম না, কিন্তু নিজের জন্যই একটা বড় দলিল ছিল।
আপনার কবিতায় চলচ্চিত্র, নগর জীবন ঘুরে ফিরে আসে। কবে চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়েন?
চার্লস সিমিক : আমার ১০ কী ১১ বছর বয়স। বেলগ্রেডে, যেখানে আমার শৈশব কেটেছে, ভয়াল অন্ধকার ছিল, যুদ্ধের বছরগুলো তারও পরের কয়েক বছর ছিল বিপজ্জনক। তখনকার আমার বিনিদ্র রাত কাটানোর সঙ্গী ছিল চলচ্চিত্র। বিশেষ করে মার্কিন চলচ্চিত্র আমার মনে কবিতার রস সঞ্চার করে, বৃষ্টিঝরা রাতে জানালার পর্দা তোলার সাহস জোগায়, আমি দেখি রাস্তা শুয়ে আছ, স্নান করছে। আমার বন্ধুদের অনেকেই ওইসব চলচ্চিত্র পছন্দ করতো না, বিষয়টি আমাকে আহত করতো, ভাবতাম এও সম্ভব!
একবার সাক্ষাৎকারে অ্যালেন গিন্সবার্গকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কেন তার মতো লেখেন, উত্তরে তিনি বলেন, ‘একমাত্র কারণ হলো আমি লিখি!’ কেন কবিরা তাদের মতোই লিখেন, এর বাইরে কি কিছু বলার নেই?
চার্লস সিমিক : সম্ভবত নেই। আমি লিখি ঈশ^রকে রাগাতে আর মৃত্যুকে হাসাতে। আমি লিখি কারণ আমি তা ঠিকভাবে পাই না।
আমি লিখি কারণ আমি চাই এই পৃথিবীর সব নারী আমার প্রেমে পড়ুক। কেউ হয়তো এরকম চালাকি করতে পারেন, কিন্তু শেষমেষ গিন্সবার্গের কথাই সত্য হয়ে যায়।
গত ৪০ বছরে আপনার কবিতাশৈলী, নিজস্ব স্টাইল, কিভাবে রূপান্তরিত হলো?
চার্লস সিমিক : আমার শুরুর দিকের কবিতায় জোর দিতাম চিত্রকল্পের ওপর, শ্রুতির প্রতি যতœবান ছিলাম না, আটপৌরে শব্দ ব্যবহার করতাম। ইতিমধ্যে আমার কবিতার ভাষা ও সংগীতের ব্যবহারের প্রতি সচেতন হয়ে উঠেছি। আরো আত্মজীবনীমূলক উপাদান, আরো বর্ণনাধর্মিতার ব্যবহার করছি। আমি হয়ে উঠেছি লোক ও নাগরিক কবি। আমার আছে আবিষ্টতা, বাজে স্বভাব ও অন্ধ খুঁত। এতদিন ধরে যে কবিরা লিখে চলেছেন তাদের দশজনের মতোই আমার কবিতায় পুনরাবৃত্তি আছে। উত্তরণের চেষ্টা করি না এমন নয়, তারপরও রাতের পর রাত একই আচ্ছন্নতা পেয়ে বসে, পুরনো আমাতেই দোল খাই।
আপনি সরাসরি ইতিহাস লিখতে না চাইলেও এটা নিশ্চিত যে, ৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে লেখা আপনার ‘রিডিং হিস্টরি’ কিংবা ‘এম্পায়ার্স’ কবিতায় বলকান যুদ্ধের ইতিহাস কথা কয়।
চার্লস সিমিক : ব্যাকগ্রাউন্ড তাই ছিল, আমি নিশ্চিত। ভারতীয় এবং চীনের ইতিহাসের ওপর বেশ কয়েকটি বই পড়ার পর আমি লিখে ফেলি রিডিং হিস্টরি। কয়েকটা পাতার মধ্যেই, অবশ্যই গণহত্যার কথা থাকতো, সংঘর্ষের কথা, হাজার হাজার লোকের মৃত্যু বার্তা। তাতে আমার চিন্তা ঘুরপাক খেত। এম্পায়ার্স কবিতাটি আমার নানিকে উপজীব্য করে লেখা। তিনি ১৯৪৮ সালে আমার বয়স যখন ১০ বছর, মারা যান তিনি। আমার শিশুবেলাটা কিন্তু তার নিবিড় সান্নিধ্যে। বাবা-মা কাজে চলে গেলে নানিই আমার দেখাশোনা করতেন। নানি তখন রেডিওতে হিটলার, স্ট্যালিন, মুসোলিনির বক্তব্য শুনতেন। নানি কিন্তু বেশ কয়েকটা ভাষা জানতেন। কাজেই হতাশ হতেন। মিথ্যা ভাষণের ওপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না তিনি। পৃথিবীর সংকটটা কী? এ প্রশ্ন তিনি জনে জনে জিজ্ঞেস করতেন। ভালো প্রশ্ন, যার উত্তর আমার এখনো জানা হয়নি। আমার এই বয়সেই কত যুদ্ধ হলো, কত কত মানুষের প্রাণহানি! আমিও নানির মতোই হতাশ। মানুষ হত্যা আমাকে বিচলিত করে, বিস্মিত হই। মানুষ খুন করে পৃথিবীর উন্নয়ন সম্ভব, মার্কিন বুদ্ধিজীবী মহলে এ ধারণা বেশ জনপ্রিয়; কিন্তু ইতিহাস এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না। এ ব্যাপারে আমি সব সময় ভাবি।
অডেন ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার ‘টু আনডু দ্য ফোল্ডেড লাই’ কবিতায় লিখলেন, সর্বসাকুল্যে আমার আছে একটা কণ্ঠস্বর। অডেন অবশ্য পরে এ কবিতাটি অগ্রাহ্য করেন... কিন্তু আমার মনে হয়, এ কবিতার অন্তর্নিহিত আহ্বানের সঙ্গে আপনার কবিতার কোথাও সাযুজ্য রয়েছে। অন্তত রাজনীতিবিদ ও প-িতদের নানা ভড়ংবাজির মুখোশ উšে§াচনের ক্ষেত্রে আপনার কবিতা তৎপর।
চার্লস সিমিক : আমার বিবেচনায় কবিতা হলো কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় অন্য সব ক্ষমতা মোকাবেলার শক্তি। প্রত্যেকটা ধর্ম, আদর্শ এবং চিন্তার প্রথা ও পন্থা ব্যক্তি মানুষটাকে পুনঃশিক্ষা দিতে চায়, তাকে ভিন্ন একটা মানুষে রূপান্তর করতে চায়। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নিজের জন্য ভাবেন না, তারা তোমাকে এ কথাই বলবে। আমি লক্ষ্য করেছি, কবিতার একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য হলো, ক্ষমতা সম্পর্কে সত্য কথা বলতে বিরত থাকা। আমার মধ্যে এই ধারণাকে লালন করতে চাইনি।
অন্যদিকে আপনার কবিতার একটা বড় আনন্দদায়ক বৈশিষ্ট্য হলো, আমার বিবেচনায় অন্তত, জীবনের সবধরনের সাদামাটা আনন্দ উপভোগে আপনার কবিতা আমন্ত্রণ জানায়। এমনকি চিংড়ি ভাজা, টমেটো, রোস্ট, রেড ওয়াইন...
চার্লস সিমিক : সস নিতে ভুলে যেও না, আলু আর পিঁয়াজও নিও! দুই-একজন দার্শনিককেও হাতে নিয়ে নেয়ার বিশেষ উপদেশ রইলো। এক বোল স্পাগেটি খেতে খেতে প্ল্যাটোর কয়েকটা পৃষ্ঠা ও ভিটগেনস্টাইনের ‘ট্র্যাকট্যাটাস’।
বিপরীতধর্মী দুটি বস্তুর সম্মিলনকে আমরা সেরা মনে করি, সবকিছুকে বাস্তব বলে মানি, একের ভিতর আরেক, কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। এভাবেই কবিতা ও দর্শনের সহাবস্থান আমাদের মনে বিস্ময় জাগায়। আমার বিবেচনায়, আটপৌরে জীবনের আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ‘সত্য’ মূল্যহীন। প্রত্যেকটি মহা থিওরি ও সেন্টিম্যান্টকে প্রথমে রান্না ঘরে এবং পরে বিছানায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

প্রথম দশকের কবিতা

চঞ্চল আশরাফ

আশির দশকের শেষদিকে বাঙলা কবিতায় যে-চিন্তা ও শিল্পমনস্কতা ফিরে এসেছিল, নব্বইয়ে তার বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে; তারই পথ ধরে চলছে বর্তমান শতাব্দির প্রথম দশকের কবিতা। ফলে, এখনকার কবিতা বুঝতে হলে নব্বইয়ের কবিতার প্রবণতা চিনে নেওয়া বিশেষ জরুরি।

সংক্ষেপে তা এই :
১. তাৎণিক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির প্রকাশ;
২. বিমূর্তায়ন;
৩. গদ্যভঙ্গি;
৪. নৃতাত্ত্বিক অনুষঙ্গের ব্যবহার;
৫. কোলাজরীতি;
৬. লোকজ উপাদানের প্রয়োগ;
৭. স্যাটায়ার;
৮. আবেগের চেয়ে বুদ্ধির সরল প্রাধান্য;
৯. বিবৃতিধর্মিতা বর্জনের চেষ্টা;
১০. চিত্রাত্মকতা;
১১. আখ্যানরূপকের ব্যবহার;
১২. ছন্দমনস্কতা ইত্যাদি।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিটিই যে এখনকার নবীনরা গ্রহণ করেছেন, তা নয়। ছন্দে তাঁরা তেমন লিখছেন না; এমন অনেক কবিকে পাওয়া যায়, যাঁরা একটা কবিতাও লেখেন নি ছন্দে; বেশ ক’জন কবির পুরো বই গদ্যে লিখিত এবং তাতে একটি স্তবকেও নেই প্রবহমান গদ্যরীতির জন্যে সবচেয়ে মানানসই অক্ষরবৃত্তের প্রয়োগ। একে আপাতত দুঃসাহসই বলা যায়, কেননা, কোনও কবির অজ্ঞতা সম্পর্কে চটজলদি সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়; যদিও প্রথম বই বুঝিয়ে দেয় কবির প্রস্তুতিটি কেমন, তার সামর্থ্যরে সীমা, ভবিষ্যতের জন্য তার যে রসদ, সেটি তাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। শখের বশে লিখে থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। আমরা জানি, ছন্দ কবিতার খুব প্রাথমিক একটা শর্ত। আর ছন্দে লিখতে না-চাওয়া কোনও শর্তই নয়; কিন্তু ছন্দের ঊর্ধ্বে ওঠার মালিকানা একজন কবি তখনই দাবি করতে পারেন, যখন তার অন্তত তিনটি কবিতা তিন রকম (আরও একটা আছে, সেটা কোনও এক সময় লিখলেই চলবে) ) ছন্দে পড়ার অভিজ্ঞতা পাঠকের হয়েছে।

প্রথম দশকের কোনও কবি ছন্দনিষ্ঠ নন, এমনটি বলা যায় না। শুভাশিস সিনহা ছাড়া, (আরও দু-তিনজন থাকতে পারেন) আর কারও মধ্যে ছন্দনিষ্ঠা দেখা যায় না। তবে অনেকের মধ্যেই ছন্দবোধটি আছে; তাদের কবিতায় সৃষ্ট সাঙ্গীতিক বহির্স্বর থেকে এটা বোঝা যায়। অতনু তিয়াস, অনন্ত সুজন, ঈশান সামী, নওশাদ জামিল, আমজাদ সুজন, জাকির জাফরান, ফেরদৌস মাহমুদ, রাশেদুজ্জামান, রাজীব আর্জুনি, নির্লিপ্ত নয়ন, সুমন সাজ্জাদ, জাহিদ সোহাগ, আফরোজা সোমা, মাদল হাসান, মামুন খান, মাহমুদ সীমান্ত, মানস সান্যাল, তারিক টুকু, সফেদ ফরাজী, সজল সমুদ্র, জুন্নু রাইন, আসমা বীথি সহ অনেকের নাম এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। এঁরা অরবৃত্তের কম-বেশি চর্চা করেছেন।

এটা শোচনীয় যে, বাঙলা কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে ছন্দ নিয়ে আজও কিছু বলতে হয়, কবিতার এই প্রাথমিক শর্ত কে কতটা পূরণ করতে পেরেছেন, তা নিয়ে আলোচককে মাথা ঘামাতে হয়। অর্থাৎ বাঙলা কবিতায় আজও ছন্দ একটা টেনশনের স্তরে রয়েছে। সবার কবিতায় যদি ছন্দনিষ্ঠা থাকত, ছন্দ নিয়ে আলোচনার দরকারই পড়ত না। কিন্তু আমাদের আলোচনায় এটি অবধারিত; যেন বাঙলা কবিতায় ডজন-ডজন ছন্দ আছে! আর এই তিন-চারটা নিয়েই কবিদের কী-যে অবস্থা!

নব্বই দশকের যে-প্রবণতা প্রথম দশকের কবিরা গ্রহণ করেছেন সবচেয়ে বেশি, তা হলÑ তাৎণিক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি; এর পর গদ্যভঙ্গি, বিমূর্তায়ন, চিত্রাত্মকতা। অর্থাৎ তাঁদের মধ্যেও এক ধরনের সিলেকশন বা গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপার ঘটেছে। বলে রাখা দরকার, নব্বইয়ের কবিতার যে-প্রবণতাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর জন্যে দশকটির বাহাদুরির কিছু নেই; কেননা, এসব নিয়ে এই সময়পর্বের কবিদের মধ্যেও আছে চোরাগলি, ফাঁকি, চালাকিসহ নানা ধরনের গোলমাল। যদিও এর আগের চল্লিশ বছরের যে-কোনও সময়ের তুলনায় এই দশকে ভালো কবিতার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। প্রথম দশকেও কিছু ভালো কবিতা লেখা হয়েছে। হলেও, পূর্ববর্তী কবিতায় জীবনদৃষ্টির যে-দারিদ্র্য ছিল, তা এখনকার কবিতায় আরও প্রকট হয়েছে। তীব্র হয়েছে জীবনবোধ ও শিল্পচেতনার সমন্বয়ের শূন্যতাও। এমনটি হলে তাৎণিক অনুভব প্রকাশই হয়ে পড়ে কবিতার নিয়তি; বিমূর্তায়ন (রহস্যীকরণ নয়) অবধারিত হয়ে যায়, খণ্ড-খণ্ড চিত্র উপহার দেয়া ছাড়া কবির কোনও উপায় থাকে না। তা না-থাকুক, তাৎণিক অনুভবের প্রকাশও হয়ে উঠতে পারে কবিতা; অনেক ভালো কবিতা এই জায়গা থেকে শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়েছে অন্যতর তাৎপর্যে পাঠককে পৌঁছে দিয়ে। অর্থাৎ যে-অনুভব নিয়ে কবি লিখতে বসেছেন, তা অন্যতর অভিব্যক্তিতে উত্তরণ চাইছে, উৎসবিন্দুতে থেমে থাকতে চাইছে না; অন্তত একটা ভাববলয়ের দাবিতে বিন্দুটিকে প্রদণি করতে-করতে পরিধি নির্মাণ করছে। সমগ্রতার অভিপ্রায় এই সংগ্রামের মূলে। চেষ্টাহীনভাবে এটি ঘটে, যদি কবির অভিজ্ঞতা ও অনুভবের রসদের সঙ্গে জীবন ও শিল্পবোধের যৌথ সমর্থন থাকে। নইলে, তাৎণিকতা একটা আকস্মিকতার চেহারায় পাঠককে চমকে দিয়েই বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়, অন্যতর অর্থ ও সৌন্দর্য বা নৈঃশব্দ্য সৃষ্টি তাতে হয়ে ওঠে না; হলেই তো বলা যেত, সমগ্রতার অভিপ্রায় এতে আছে; এর রচয়িতা অন্তত খণ্ডিত অনুভব প্রকাশে সন্তুষ্ট নন।

প্রথম দশকের কবিতা এই সন্তুষ্টিকেই যেন বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে। দেখতে পাই, চমকে-দেয়া একটা প্রসঙ্গ নিয়ে কবিতা শুরু হয়েছে এবং একে প্রসারতা দিতে দিতে, প্রসঙ্গটি যে-আবেদন নিয়ে শুরু হয়েছে তা-ও ফুরিয়ে গেছে। অথবা, পাঠক ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন যে, চমক সৃষ্টি ছাড়া এ-রচনার কোনও দাবি নেই। অধিকাংশ েেত্র এই ভাবনারও সুযোগ মিলছে না। কেননা, প্রসারতা দিতে গিয়ে উত্থাপিত প্রসঙ্গটি শেষ পর্যন্ত চমকের বাহাদুরি হারিয়ে পাঠকের জন্যে (যিনি কবিতার মননশীল পাঠক) একটা মামুলি বা নিরীহ অভিজ্ঞতায় এসে ঠেকেছে। দুটি দৃষ্টান্ত :

রাতের নিজস্ব গান আছে, শিল্পিগোষ্ঠী আছে
তোমার শরীরে বাজে উদগ্র ঝুমুর
তোমার স্তনে বাজে অপরূপ দুধের সরোদ :
প্রেমিকের রাত্রিকালীন আচরণ অনেকটাই
অসামাজিক। মধ্যরাতে তুমিও এক বিড়ালিনী
কপট কান্নায় পাড়া ভাসাও ; রাতের রূপ
আর কদর্যতা দু-ই দেখি তোমার দেহে ফুটে।
(সুজাউদ্দৌলা : রাতকাব্য-৩৬)

ইঁদুরে ছেয়েছে আকাশ
নাকি ইঁদুরের মতো মেঘে!
এখন বেলা শুয়ে আছে মাঠে, শূন্যের বিছানায়
তাঁর শীত পেতে আছে
ইঁদুর মেঘেরা তাই লেপ হয়ে থাকে;
নত্র নামের নিকটসম্পর্কের বোনেরা
উষ্ণতা রেখে যায় তার পদানুক’লে

আমি ভাবি পৃথিবীটা কোথাও
এভাবে মরে পড়ে আছে না তো!
(বিল্লাল মেহদী : অশেষ ভাবনা)

এই দুই কবিতার শুরু চমক দিয়ে, যা কোনও অন্যতর অর্থের দিকে না-গিয়ে পাঠের মাঝখানেই দম হারিয়ে ফেলেছে। গোলমালটি দু’কবিতায় ঘটেছে দু’ভাবে : প্রথমটি কোনও রকম যোগসূত্র ছাড়াই অন্য একটি প্রসঙ্গ হাজির করেছে এবং জবরদস্তি করে ‘রাতের নিজস্ব গান’কে প্রেমিকের আচরণ, ‘কপট কান্না’ আর নারীদেহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো হয়েছে। অধিকন্তু, কবিতাটির শেষে ‘ফোটে’-র জায়গায় অশুদ্ধ ‘ফুটে’ ব্যবহৃত হয়েছে, যা কোনও কবির জন্যে প্রীতিকর হতে পারে না। দ্বিতীয় কবিতা এলিয়টীয় চমক দিয়ে শুরু হয়েছে; কিন্তু এর মৃত্যু ঘটেছে ‘পৃথিবীটা কোথাও’ ‘মরে পড়ে’ থাকার ভাবনা দিয়ে, যার সঙ্গে ইঁদুরকে মেঘ মনে করার কোনও সম্পর্ক নেই। যিনি লিখেছেন, তিনি অবশ্য একটা চালাকি করেছেন। রচনাটির নাম দিয়েছেন ‘অশেষ ভাবনা’। ভাবনা ‘অশেষ’ হলে কবিতায় এমনটি ঘটতে পারে, সেই ইঙ্গিত তিনি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কবিতা হিসেবে এভাবে একটা রচনাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কবির অসহায়তাকেই প্রকাশ্য করে।

কবিতায় চমক অন্য জিনিস; সরকার আমিনের চার পাঁচ হাজার পিঁপড়ার দুঃখ কবিতাগ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে সম্ভবত লিখেছিলাম যে, চমক কবিতার জন্যে জরুরি নয়; জরুরি তখন, শুরুতেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ কবির যখন কাম্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সব কবিতায় এমনটি কাম্য হওয়া ঠিক নয়; নিরাপদও নয়; এটি নির্ভর করে প্রতিপাদ্যের ওপর, একে ব্যাখ্যা বা বিবৃত করার েেত্র কী দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব কাজ করছে, তার ওপর। চমকের আদর্শ উদাহরণ টিএস এলিয়ট; তিনিও কিন্তু সব কবিতায় চমকের ব্যবহার করেন নি। করেছেন তখন, প্রতিপাদ্য যখন তা দাবি করছে এবং সেই দাবির সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনটিও মিলছে। একটা নাটকীয়তার চেহারায় তিনি হাজির করেছেন একে; কবিতা পড়তে পড়তে সেই চেহারা সরে গিয়ে মূল ভাব বা অর্থটি প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। কৌশলটি বেশ কাজের, কিন্তু চমক সম্পর্কে মধ্য-আশি থেকে যে ভুল ধারণার চর্চা হয়ে আসছে কবিতায়, তা এখনকার কবিদের বিপজ্জনকভাবে পেয়ে বসেছে। ফলে, চমকের খোলস ভেদ করে কিছুই পাওয়া যায় না; কবিতা হয়ে পড়ে কখনও কোলাহল, কখনও মর্মবস্তুহীন কিছু বাক্য মাত্র!

এরপর গদ্যভঙ্গির প্রসঙ্গ। বাঙলা ভাষায় অরবৃত্তে এর চর্চার বয়স প্রায় সত্তর বছর হয়ে গেছে। তারও অনেক আগে, ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে, ইউরোপে এর শুরু। এটি এতই পরিচিত যে, নতুন করে চিনিয়ে দেবার দরকার পড়ে না। নবিশিদের বেলায় এর চেয়ে সহজ আর সুবিধাজনক আঙ্গিক আর নেই। কেননা, এতে প্রচলিত ছন্দ জরুরি নয়, বাঁধা-ধরা কোনও ছক এতে না-মানলেও চলে। এই স্বাধীনতাকে প্রথম দশকের কবিরা পুঁজি করেছেন আগের যে-কোনও সময়ের চেয়ে বেশি। অঞ্জন সরকার জিমি, অপূর্ব সোহাগ, অবনি অনার্য, অশোক দাশগুপ্ত, আপন মাহমুদ,আবু তাহের সরফরাজ, আহমেদ ফিরোজ, ইকতিজা আহসান, ইমরান মাঝি, এমরান কবির, গৌতম কৈরী, চন্দন চৌধুরী, চ্যবন দাশ, জাহানারা পারভীন, জাহেদ আহমদ, জুয়েল মোস্তাফিজ, তারিক টুকু, তুষার কবির, নিতুপূর্ণা, নির্লিপ্ত নয়ন, পান্থজন জাহাঙ্গীর, পিয়াস মজিদ, বিল্লাল মেহদী, মনিরুল মনির, মাজুল হাসান, মামুন রশীদ, মাসুদ হাসান, মাহমুদ শাওন, মাসুদ পথিক, মিঠুন রাকসাম, মুয়ীয মাহফুজ, মৃদুল মাহবুব, যিশু মুহাম্মদ, রাকিবুল হক ইবন, রাশেদুজ্জামান, রুদ্র অনির্বাণ, রুদ্র আরিফ, শাবিহ মাহমুদ, শিশির আজম, শুভাশিস সিনহা, সরফরাজ স্বয়ম, সিদ্ধার্থ শংকর ধর, সুজাউদ্দৌলা, সুমন সুপান্থ, সেজুল হোসেন, সৈয়দ আফসার, সোহেল হাসান গালিব, স্বরূপ সুপান্থ সহ অনেক কবি এই আঙ্গিক গ্রহণ করেছেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ এই আঙ্গিকে এত বেশি লিখেছেন যে, তাঁদের নামোল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে রীতিটির চেহারা এসে যায়। সিদ্ধার্থ শংকর ধর, ইমরান মাঝি, গৌতম কৈরী এক্ষেত্রে আপাতত অগ্রগণ্য।

খুব বেশি বিমূর্তায়ন ঘটেছে প্রথম দশকের কবিতায়। ফলে, কবিতা শেষ পর্যন্ত কী বার্তা হাজির করল, বা, এর সম্ভাব্য প্রতিপাদ্যটি কী, কিংবা কী মর্মবস্তু এর কেন্দ্রে, বুঝে ওঠা মুশকিল। কখনও-কখনও মনে হয় মর্মবস্তু আদৌ কবিতাটিতে নেই; আবার এ-ও মনে হয়, সেটি আড়ালের সমস্ত চেষ্টা এতে করা হয়েছে এবং কবি সফল হয়েছেন। এই বিমূর্তায়ন এক ধরনের বিপজ্জনক চালাকি; পথটি প্রথম দেখিয়েছিলেন ফরাসি প্রতীকবাদীরা। তাঁরা অবশ্য কবিতায় মর্মবস্তুর তিন-চতুর্থাংশ আড়াল করতেন; বাকি একভাগ থেকে পাঠককে বুঝে নিতে হতো কবিতাটি আসলে কী বলতে চাইছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভব হতো না। না-হলেও, প্রতীকবাদী কবিরা সৃষ্টি করেছিলেন সৌন্দর্য। এর উৎস ছিল রহস্যময়তা। কবিতার অনেকান্ত ব্যাখ্যার সুযোগ তাঁরাই প্রথম সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁদের হেঁয়ালিটা যদি শুধু থাকত এখনকার কবিতায়, তা হলেও বুঝতে পারা যেত কবির অভিপ্রায়টি কী, কেমন করে তা ব্যাখ্যার দাবি নিয়ে আমাদের সামনে আসতে চাইছে। কিন্তু প্রথম দশকের অধিকাংশ কবি তো বোধগম্যতার সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছেন! ফলে, বিমূর্তায়ন গেছে অপচয়ের দিকে; এক রকম চালাকি ও ফাঁকির নামান্তর হয়ে এসেছে। চার-পাঁচজন বাদে সবার মধ্যে এই বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায়।

বিমূর্তায়নের একটি প্রধান আশ্রয় চিত্রাত্মকতা। আর একেই চিত্রকল্প ভেবে দশকের পর দশক আলোচনা হয়ে চলেছে। কিন্তু চিত্রকল্প কবিতার জন্যে জরুরি কিছু নয়, চিত্রাত্মকতাও নয়। আধুনিক হতে গেলে চিত্রকল্প খুব দরকার; কেননা, এটি শুরু থেকেই, আধুনিকতার একটা অংশ হয়ে আছে। যে ক্যাটাস্ট্রফি আধুনিকতার সমার্থক, তার প্রসারিত অর্থ বিপর্যয়কারী বহুমুখি চিন্তার জটিল প্রকাশ; অন্যদিকে, ইমেজিস্ট মুভমেন্টের ইশতেহারে ইমেজ বা চিত্রকল্প হলো__বুদ্ধি ও আবেগগত জটিলতার আনকোরা প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় চিত্রকল্প নেই, নজরুলেরও নেই। কারণ, আবেগ ও বুদ্ধিগত জটিলতা এঁদের কবিতায় নেই। যত আধুনিক হোক বাঙলা কবিতা, এই জটিলতা সৃষ্টি করা খুব কম কবির পে সম্ভব হয়েছে। বিষ্ণু দে-ও এই দিক থেকে আধুনিক নন। সব মিলিয়ে আধুনিকতা কী জিনিস, তা না-বুঝে আধুনিক হতে চেয়েছেন বাঙলা ভাষার অধিকাংশ কবি; ফলে, আধুনিকতার অবিকশিত ও নিরীহ একটা চেহারাকে পুরনো ভেবে তা বাতিল করার জন্যে একদল ‘উত্তর আধুনিকের’ আবির্ভাব ঘটেছে। নব্বইয়ের শুরুতে এদের সক্রিয়তা দেখা গেছে; এখন নেই। কিন্তু উত্তর-আধুনিকতার উচ্ছিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছে লোকজ অনুষঙ্গ নিয়ে কবিতা রচনার মৃদু প্রবণতা। প্রথম দশকে কবিদের কেউ কেউ এর অনুগামী হয়েছেন। তবে প্রথম দশকে যে-কবি এসবের বাইরে থাকতে চাইছেন, তিনি পলাশ দত্ত। সাধু ও মৌখিক ক্রিয়াপদের ব্যবহার তিনি করেন, কবিতার সংবৃত সমাপ্তি তাঁর পছন্দ; শ্লেষ-বিদ্রƒপের প্রতিও ঝোঁক তাঁর আছে। মনে হতে পারে, তিনি ব্রাত্য রাইসুর ধারাটি গ্রহণ করেছেন; কিন্তু রাইসুর কবিতা বেশ লিরিক্যাল, আক্রমণাত্মক ও পরিহাসপ্রবণ।

উল্লেখ প্রয়োজন, প্রথম দশকের কবিরা সাহিত্যের ইতিহসের এমন এক পর্যায়ে লিখছেন, যখন আঙ্গিকগত প্রায় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়ে আছে। এটি তাদের জন্যে প্রীতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রীতিকর এইজন্য যে, কেউ কবিতা লিখতে চাইলে ভাষা কিংবা আঙ্গিক সন্ধানের জন্যে তাকে মরিয়া হতে হবে না। কেননা, আয়োজনটি পূর্ববর্তী, বিশেষত তাঁদের নিকট-পূর্বসূরি নব্বইয়ের কবিরা নানাভাবে করে রেখেছেন। ফলে, সা¤প্রতিক ও সমকালীন কবিতা-পাঠের মধ্যে যিনি আছেন, তার পে আট-দশটা প্রকাশযোগ্য কবিতা লিখে ফেলা কঠিন কোনও কাজ নয়। এই সময়ে এত কবির আবির্ভাবের কারণ সম্ভবত এটাই। অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ এজন্যেই যে, এই পাঠ-অভিজ্ঞতা কবিতা সম্পর্কে দেয় বিচিত্র ও গোলমেলে ধারণা, তাতে যে-কোনও নবীন ধাঁধায় পড়ে যেতে পারেন; পড়ে গেলে, সিলেকশনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কঠিন হয়ে উঠতে পারে পূর্ববর্তী ও সমকালীন কবিতার পরাগায়ন রোধ করা।

শুরুতে প্রথম দশকের কবিতায় এই সমস্যা ছিল ব্যাপক। এখন অনেকেই তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ সফল হচ্ছেন বলে মনে হয়। বোধ করি সাহিত্যের জন্যে এটা বেশ প্রীতিকর ও স্বাভাবিক যে এঁরা লিখছেন একটা ধারাবাহিকতার মধ্য থেকে।

বড় কথাটি হল, কবিতা সম্পর্কে অভিজ্ঞানের দিক থেকে এঁরা পিছিয়ে নেই। প্রয়োগরুচিতে তো নয়ই।

২১. ০৩. ০৯

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

রাধারমণের গানে নারী, তার রূপক ও বাস্তব


মোস্তাক আহমাদ দীন


ভাবুক ও রসরাজ হিসেবে রাধারমণের স্থান যে-শিখরে, তাতে, এ-পর্যন্ত
তিনি যতটা মূল্যায়িত তা একদমই সামান্য, তবে আশার কথা, তাঁর গানের নানাবিধ সংকলন প্রকাশের পর থেকে গানের ভাবব্যঞ্জনার দিকে এখনকার রসিক-গবেষকের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। এই আগ্রহীদের বেশির ভাগই রাধারমণের পদ-অন্তরিত বৈষ্ণব-রসের দিকটাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যগ্র। এমন নয় যে তার পদে সেই রস নেই, বরং, আমাদের অজানা নয়, তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন বৈষ্ণব রঘুনাথের কাছে, নলুয়ার হাওরসংলগ্ন আশ্রম স্থাপনের ব্যাপারটিও তো তারই প্রমাণবহ। আমাদের অনুযোগ/আপত্তি সেই জায়গায় যেখানে আলোচকেরা তাঁদের লক্ষ্য মূর্ত করতে গিয়ে পদকারকে তাঁর সত্তার মানব-অনুভূতিগত দিক থেকে খারিজ করে দিতে চান, এবং তা কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে-আলোচক, পদকারকে তত্ত্বলীন করে দিয়ে তাঁকে অতিমানবের স্তরে নিয়ে যেতেও এতটুকু কুণ্ঠিত হন না। তাঁরা ভাবেন, প্রেমপ্রকাশের এই যা কিছু-সে রাধাই হোক বা কৃষ্ণ-সবসময়ই রূপক। আর গোলটাও বাধে সেখানে। অথচ তাঁদেরও অজানা থাকবার কথা নয়-সৌন্দর্য্য বা সত্য যাই হোক-তার মর্মে পৌঁছাতে গেলে হলে, বাস্তব-রূপক-উপমান-উপমেয়সহ একযোগে না গেলে সে-যাত্রা পূর্ণ হয় না, পূর্ণ হওয়ারও নয় : কারণ, রূপকে তো ছড়িয়ে থাকে পদকারের জীবনাভিজ্ঞতারই চিহ্ন-ফলে, তাকে ছাড়া মূল্যাঙ্কনটা যে একমুখী হয়ে পড়বে এ আর আশ্চর্য কী। দান্তে কবে তাঁর একটি চিঠিতে দি ডিভাইন কমেডি বিষয়ে লিখেছিলেন :


এ কথা বোঝা উচিৎ এই রচনার অর্থ কেবল একরকম নয়; বরং এর অনেকগুলি অর্থ রয়েছে, প্রথম অর্থ সঞ্চারিত হয় অক্ষর-শব্দ ভিত্তি করে আর তার পরের অর্থ নির্ধারিত হয় অক্ষর-শব্দের তাৎপর্য অনুযায়ী; প্রথমটিকে যদি বলি অভিধাত্মক তাহলে দ্বিতীয়টিকে বলে রূপকাশ্রিত... সম্পূর্ণ গ্রন্থটির বিষয়, অভিধাত্মক অর্থ ধরলে বেশ শুদ্ধ আর সরল-তা হলো মৃত্যুপরবর্তী কালের অবস্থা।...যদি রূপকের দৃষ্টিকোণ থেকে এ রচনার ব্যাখ্যা করা হয়. তাহলে এর বিষয়-মানুষ, যে তার স্বাধীন চেতনার অনুশীলনের ত্রুটি-নির্ভুলতা অনুযায়ী বিচারের নিক্তিতে শাস্তি বা পুরষ্কার পায়।


দান্তে তাঁর ধ্রুপদী মহাকাব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার একাধিক অর্থগত ব্যঞ্জনার মধ্যে রূপকাশ্রিত অর্থের যে-সম্ভাবনার কথাটুকু বললেন, তা এখনকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করে এসে দেখছি, এইরকম রূপক-ই কীভাবে ইতিহাসের অবলম্বন হয়ে ওঠে। আজকের সাবলটার্ন স্টাডিজ-এ রাজ-রাজড়ার বাইরের যে-ইতিহাস-অনুসন্ধান চলে, সেই প্রান্তপৃথিবীর মধ্যে সেই তত্ত্ব/রস/লক্ষ্য অভিমুখী বাস্তবের রূপকাশ্রিত বিষয়টুকুর অন্তর্ভুক্তিটাও জরুরি; কারণ, এই রূপকের মধ্যে যে জীবন-অনুভব স্পন্দমান, তার পরিচয় তো নিরন্তরই পেয়ে থাকি আমরা। আজ রাধারমণের পদের রূপকাশ্রিত বাস্তবের দিকটাকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে না-দেখলে সে-দেখা টাকে কেউ ‘খণ্ডিত দর্শন’ বললে তাকে অযৌক্তিক উক্তি বলা যাবে না কিছুতেই।




শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-উক্ত রাধাকৃষ্ণ লীলার পরবর্তী পর্যায়ে কৃষ্ণ যখন মথুরায় তখনকার রাধার যে-অনুভব, রাধারমণের অনেক গান সেই অনুভবের; এই অনুভব বিরহের, তাতে কখনও-কখনও অভিমানের সুর বাজলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আকুতিটাই প্রবল। তাই বলে এ-কথা বলা যাবে না যে তার গানে কৃষ্ণ-অনুভব একেবারেই দুর্লভ। লোকশ্রুতি রয়েছে-এই গানগুলো গাইবার সময় দিব্যোন্মাদ হয়ে যেতেন রাধারমণ-এ নিশ্চয়ই রস-অভিভূতিরই পরিচায়ক; আমাদের আগ্রহ রাধা-অনুভব-এর সেই গানগুলোর দিকে যেখানে রাধারমণ শুধু বৈষ্ণব রসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং তা চিরায়ত বাঙালি নারীর অনুভবকেই ধারণ করে। এই অনুভব কখনও বেদনার, কখনও বিরহের, আবারও কখনও তা স/নী-রব দ্রোহেরও বটে;-কথিত দিব্যোন্মাদনা সত্য হলে এই পরিগ্রহণ কিছুটা বিস্ময়েরই ঠেকবে। তবে এ-পরিগ্রহণটা সত্য এবং এই ধারণা যে স্বকপোলকল্পিত নয়, তা তাঁর নারীভাবনার গানগুলোর মধ্যে মূর্ত রয়েছে; এ-ছাড়াও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেকের অভিজ্ঞতাসম্পৃক্ত ব্যাপারও। যেমন বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত রাধারমণ-গীতিমালা সম্পাদনা করতে গিয়ে শ্রীনন্দলাল শর্মা তাঁর ভূমিকায় জানাচ্ছেন :


কৈশোরের দিনগুলোতে নিজবাড়িতে প্রবিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে রাধারমণের গান বিভিন্ন পালাপার্বণে শুনতাম। তার গানের বাণী ও সুর আমার কিশোর মনকে আন্দোলিত করতো। গ্রামের বসন্তরাম মালাকার (প্রয়াত) আমাদের বাড়িতে আসলে আমার ফরমায়েশ মতো রাধারমণ গেয়ে শুনাতেন। ধামাইল নৃত্যে সম্মিলিত নারীকণ্ঠে রাধারমণের গান সম্মোহন সৃষ্টি করতো।


নন্দলাল শর্মার যে-কৈশোরক অভিজ্ঞতা, তা আরও অনেকের থাকবার কথা, বিশেষত যারা রাধারমণের পড়োশি তাদের অভিজ্ঞতা যে আরও প্রবল ও ঘনিষ্ট হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই সত্তর-আশির দশকেও যারা ওই অঞ্চলে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন তাঁরা দেখেছেন-হিন্দু মহিলারা ধর্ম-ভাবে গান গাইতেন ঠিকই, কিন্তু এর বাইরেও হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মহিলারা ব্যক্তিগত দুঃখ বিরহ আর দুর্দশাজড়িত নানা বেদনায় গেয়ে উঠতেন রাধারমণের গান। এর কারণ কী?...বৈষ্ণব-রসের আড়ালে তাঁর গানে এমন কী বিষয় রয়েছে যে এদের একাত্ম হয়ে পড়তে হয়? সমাজে নারীর যে অবস্থান-নানা প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে ধর্মের বিধিনিষেধের সূত্রে বঞ্চনা চলে, তারই রূপকায়ত বাস্তবটুকু ধারণ করে বলেই যে এই একাত্মতার ব্যাপারটি ঘটে তাতে সন্দেহ কিছু নেই।






নারীদের বিষয়ে মনু বলেছেন :


পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে।

রক্ষতি স্থবিরে পুত্রা স্ত্রী স্বাতন্ত্র্য মর্হতি \’ (নবম অধ্যায় শ্লোক ৩)...


অর্থাৎ নারীকে কুমারী অবস্থায় রক্ষা করবে পিতা, যৌবনে রক্ষা করবে স্বামী, বার্ধক্যে রক্ষা করবে পুত্র, স্ত্রীদের কখনোই স্বাতন্ত্র্য দেওয়া যাবে না।


অন্যত্র :


পতি সদাচারহীন, পরদাররত বা গুণহীন হলেও সাধ্বী স্ত্রী পতিকে দেবতার মতো পূজা করবে।...স্ত্রীদের স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, পতির অনুমতি ছাড়া কোনো উপবাস নেই। শুধু স্বামী সেবার সাহায্যেই নারী স্বর্গে যাবে। (৫ : ১৫৪-১৫৫)


মনুর শ্লোকগুলির রচনাকাল-নির্ণয়ের দুরূহতা স্বীকার করেও পণ্ডিত মানে অনুমান করছেন- এর বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টপূর্ব ২০০থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দে। এর পাশাপাশি সপ্তম খ্রিস্টাব্দে ইসলাম ধর্মের মূলগ্রন্থ কুরানে পাই :


পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ তাদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এজন্যে যে পুরুষ ধনসম্পদ ব্যয় করে।...স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের সজ্জা বর্জন করো এবং তাদের প্রহার করো। (সুরা নিসা : ৩৪)


অন্যত্র :


তোমাদের স্ত্রী তোমাদের শস্যক্ষেত্র; তাই তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছে প্রবেশ করতে পারো। সুরা বাকারা : ২২৩)


একই সময়কার হাদিসগ্রন্থে পাই :


যদি আমি অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ দিতাম তাহলে নারীদেরই বলতাম তাদের স্বামীদের সিজদা করতে। (মিশকাত, ১৯৭৯, ১৮১)



মনুশ্লোক, কুরান ও হাদিস প্রচারের পর আরও কয়েক শতক চলে গেল, কিন্তু কতদূর এগুলো মানুষ? নাকি পিছাল? নারী-প্রসঙ্গে আমরা কি ঋগ্বেদে পড়িনি : সম্রাজ্ঞী শ্বশুরে ভব সম্রাজ্ঞী শ্বশ্রাং ভব।/ননান্দরী সম্রাজ্ঞী সম্রাজ্ঞী অধি দেবৃষু \ ১০.৮৫.৪৬ (শ্বশুর শ্বাশুড়ী ননদ দেবর সকলেরই কাছে তুমি সম্রাজ্ঞী হও); অন্যদিকে ইসলামপুর্ব যুগের কবিতা ও গল্পে আমরা কি পড়িনি যে ওই সমাজের অনেক নারীই ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন, সমাজ মাতৃতান্ত্রিক ছিল বলে সন্তানরাও পরিচিত হতো মায়ের পরিচয়ে? এরপরও বেগম রোকেয়াকে আজীবন ওই সমাজের লড়াই করতে হয় আর রাধারমণের গানে দেখা যায় মনুশ্লোক-এর উল্লিখন। তার কারণ মনুশ্লোক-উক্ত ধারণার নির্মূল আজও হয়নি? রাধারমণ যে-সমাজে বেড়ে উঠেছেন সেখানে নানা অনাচার রোধের জন্যে নারীর স্বাতন্ত্র্য লোপ করার ক্ষেত্রে একটা স/অ-চেতন মানসিকতা তো ছিলই, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নারীরাও তো ততোটা কুণ্ঠিত ছিলেন বলে মনে হয় না। রাধারমণ জন্মেছেন ১৮৩৪ সালে, ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স তখন চোদ্দ; এরপর ঈশ্বরচন্দ্রের চেষ্টায় ১৮৫৫ সালে বিধবা বিবাহ আইন বলবৎ হবে ঠিকই কিন্তু তার সহগামীর সংখ্যা তখনও থেকে যাবে একেবারেই হাতে-গোনা। ওই সময় সোমপ্রকাশ নামক সাময়িকপত্রটিতে প্রখ্যাত ব্যাক্তি দ্বারকানাথ মিত্রকে অভিযুক্ত করে ছয়জন বিধবা মহিলা তাঁদের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন :


বাবুর স্ত্রীবিয়োগ হইলে দুইবার বিবাহ করিলেন ছয়মাস অতীত হইল না। জজবাবুর সন্তান-সন্ততি বর্তমান। আমরা যে আদৌ পতি কেমন তাহা জানিলাম না। বাবু কি আমাদের দুঃখ একবারও অনুভব করিয়া দেখিলেন না?’


কিন্তু এ তো বিশেষ ছয়জন বিধবার আকুতি মাত্র, আরও কেউ-কেউ এই দুঃখ উপলব্ধি করেছেন হয়ত, কিন্তু তারা কি প্রকাশের ভয়/সংস্কার কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন? এমন অবস্থায় বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ আইন বাস্তবায়িত করলেন ঠিকই কিন্তু সমাজে তার সুব্যাপক প্রভাব যে পড়েছিল এমন পরিচয় ইতিহাসে নেই, বরং আমরা দেখেছি অনেক জায়গায় বিধবা-বিবাহ দিতে গিয়ে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করতে-করতে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। আমরা এখানে শেষবয়সে-লেখা একটি চিঠিতে বিদ্যাসাগর যে-মন্তব্য করেছিলেন, তা পড়লে ওই সময়টাকে মোটামুটি বুঝে-উঠতে পারব। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত একটি চিঠিতে লিখেছিলেন :


আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্ব্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না। তৎকালে সকলে যেরূপ উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন তাহাতেই আমি সাহস করিয়া এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম নতুবা বিবাহ ও আইন প্রচার পর্যন্ত করিয়া ক্ষান্ত থাকিতাম। দেশহিতৈষী সৎকর্মোৎসাহী মহাশয়দিগের বাক্যে বিশ্বাস করিয়া ধনেপ্রাণে মারা পড়িলাম।’


দেশহিতৈষী ও সৎকর্মোৎসাহী-এই দুটি বিশেষণের অধিকারী কারা যাদের নিয়ে বিদ্যাসাগর সক্ষোভ শ্লেষোক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন? বিনয় ঘোষের মতে, এরা হলেন সেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণী, বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার শিক্ষাসংস্কার যাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিনয় ঘোষের মার্কসীয় বীক্ষণের প্রতি কারও-কারও ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের সংস্কার-চেষ্টা যে অন্তেবাসীদের নিকট গিয়ে পৌঁছাতে পারেনি, তা তো ভুল নয়। রাধারমণ এরকমই এক প্রান্তপাড়ার অধিবাসী। যেখানে বিদ্যাসাগরের সমাজ ও শিক্ষা-সংস্কারের প্রভাব গিয়ে পৌঁছয় না সেখানে একজন লোকায়ত রাধারমণের গান ঠিকই পৌঁছে যায়, কারণ রাধারমণ দেহ-মনে সেই প্রান্তের বাসিন্দা, তাঁর ভাষাও সেখানকার নানারকম বিভঙ্গ ধারণ করতে সক্ষম। তত্ত্বের আবরণ থাকলেও তার গান এমনভাবে সেখানকার বিষয় ধারণ করে, যে-কারও মনে হতে পারে তিনি অন্যের, বিশেষ করে রাধা/নারীভাব-বাস্তব অর্থে তিনি নিজেও বুঝি যাপন করে চলেন। তাই তাঁর গানে রাধাকে দেখা যায় কখনও বিদ্রোহী, কখনও বিরহী, আবার কখনও অতিশয় সমর্পিতপ্রাণা। রাধারমণের গানে পাই -


আমায় নারীকূলে জন্ম কেন দিলায় রে দারুণ বিধি

নারীকুলে জন্ম দিয়া ঘটাইলায় দুর্গতি রে \


শিশুকালে পিতার অধীন, যৌবনেতে স্বামীর অধীন রে

ওরে বৃদ্ধকালে পুত্রের অধীন আমারে বানাইলায় রে \



যদি আমি পুরুষ হইতাম মোহন বাঁশি বাজাইতাম রে

কত নারীর মন ভুলাইতাম বাজাইয়া মুরলী রে \


ভাইবে রাধারমণ বলে নারীজনম যায় বিফলে রে

না লাগিল সাধের জনম বন্ধুয়ার সেবায় রে \


যারা রাধারমণের অঞ্চলের অধিবাসী তারা জানেন, প্রচলিত সংকলনগুলিতে যুক্ত না-হলেও এটি তাঁর খুবই পরিচিত একটি গান; বিভিন্ন আসরে তো গাওয়া হয়ই, এছাড়া, সাধারণত ঘরোয়া (মেয়েলি) আসরে এটি যে গীত হয়, তার সামাজিক কারণ উপরে আলোচিত। আমরা যে মুসলিম বিধবার কাছ থেকে এই গানটি সংগ্রহ করেছি তাঁর নাম আফিয়া বেগম, বয়স আনুমানিক ৬০, সাকিন ইসহাকপুর, ডাক ভবের বাজার, থানা জগন্নাথপুর, জেলা সুনামগঞ্জ, তিনি অন্য একটি ধর্মজীবন পালন করে থাকলেও নারী হিসেবে যাপন করে চলেছেন দলিতার যৌথ সমাজজীবন, ফলে মনু আবু হানিফা-এই দুই শাস্ত্রীর বিধিনিষেধের তাবৎ বিড়ম্বনা যে তার জীবনের উপর দিয়ে বয়ে গেছে, সে-বিষয়ে তাকে সচেতন মনে হলো না, কিন্তু তিনি যখন গানটি গেয়েছিলেন তখন মনে হয়েছিল, তাঁর সারাজীবনের দলনবিরহযন্ত্রণাআক্ষেপঅভিযোগ সবকিছু একাকার হয়ে গানের ভিতর দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। এমনিতেও গানটি পড়লে আমরা দেখতে পাব ধুয়াপদের প্রথম পঙ্ক্তিটি প্রশ্নের মতো শুরু হয়ে দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটিতে এসে অভিযোগের রূপ পায়; এই অভিযোগ কীসের জন্যে, তা আলোচনা করার আগে নারীকুলে জন্ম হওয়ায় কী ঘটেছে, তা দেখা যেতে পারে; এর জন্যে তাকে শিশুকালে পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বৃদ্ধকালে পিতার অধীন থাকতে হলো। নারীকে এই রূপে রাখবার বিধান মনুর বেঁধে-দেওয়া; রাধারমণ যখন রাধার মুখ দিয়ে এই কথাগুলো বলান/বলেন, তখন বোঝাই যায় যে এ-বিধানে তার শ্রদ্ধা নেই। প্রথম অন্তরার দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটিতে ‘বানাইলায়’ ক্রিয়াপদটি আক্ষেপ ধারণ করছে, আর পুরো অন্তরাটিই বলছে অধীনতা-বিষয়ে তার এন্তার আপত্তির কথা; দ্বিতীয় অন্তরাটি রাধা/রাধারমণ, পুরুষ/কৃষ্ণ হলে কী করতেন সেই বিষয় : মোহন বাঁশি বাজিয়ে নারীদের মন ভোলাতেন। তা কি আক্রোশমূলক? তা হয়ে থাকলে, সে-আক্রোশ-রাধা না কৃষ্ণবন্ধুয়ার প্রতি? তা স্পষ্ট নয়; বিশেষ করে শেষ অন্তরায় গিয়ে যখন গানটির বিষয়ে মোটামুটি মীমাংসায় যেতে পারি, সেখানে দ্বিতীয় অন্তরাটিকে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয়। (এর একটি ভিন্ন পাঠ থাকায় সন্দেহ আরো গাঢ় হয়ে ওঠে।) ধুয়াপদে নারীজন্মজনিত যে-দুর্গতির কথা বলেন রাধারমণ, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শেষ অন্তরায় এসে- বলছেন, ‘নারীজনম যায় বিফলে’; বিফল, কারণ এই জনম বন্ধুয়ার সেবায় লাগছে না, তাতে বাধা একটাই : পিতা-পতি-পুত্রজনিত অধীনতা। ফলে, ধুয়াপদে উল্লিখিত অভিযোগ-বিদ্রোহাভাস যে-টুকু মেলে, তা শেষ অন্তরায় এসে অনুযোগ/আফসোস-এর রূপ নেয়। কিন্তু গন্তব্যবিন্দুতে আসবার আগে ধুয়াপদে উক্ত ‘ঘটাইলায়’ ক্রিয়াপদ এবং বিশেষত ‘দুর্গতি’ শব্দটি বঞ্চিত নারীদের যে-চিত্র তুলে ধরে, তা আমাদের বঞ্চনার ইতিহাসকেই মনে করিয়ে দেয়। এ-প্রসঙ্গে অন্য আরেকটি গান পড়া যেতে পারে :


মান ভাঙ রাই কমলিনি চাও গো নয়ন তুলিয়া।

কিঞ্চিত দোষের দোষী আমি চন্দ্রার কুঞ্জে গিয়া \


এক দিবসে রঙ্গে ঢঙ্গে গেছলাম রাধার কুঞ্জে।

সেই কথাটি হাসি হাসি কইলাম তোমার কাছে \


আরেক দিবস গিয়া খাইলাম চিড়া পানের বিড়া।

আর যদি যাই চন্দ্রার কুঞ্জে দেওগো মাথার কিরা \


হস্ত বুলি মাথে গো দিলাম তবু যদি না মান।

আর কত দিন গেছি গো রাধে সাক্ষী প্রমাণ আন \


নিক্তি আন ওজন কর দন্দলে বসাইয়া।

অল্প বয়সের বন্ধু তুমি মাতি না ডরাইয়া \


ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া।

আইজ অবধি কৃষ্ণ নাম দিলাম গো ছাড়িয়া \


তত্ত্বধারার গানে বিশেষত দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব কখনো-সখনো গুরুতত্ত্বেও নারীদেরকে সাধনপন্থের নানারকম অন্তরায়রূপে দেখা যায়; কারণ তাদের সৌন্দর্য মোহবিস্তারক, ছলনাযুক্তও বটে, ফলে মায়াজালরূপে উপস্থাপন করলে, যেহেতু এই রূপকের বাস্তবটাও মিথ্যে কিছু নয় তাই তার যুক্তিটা দাঁড়ায় ভালো। কিন্তু এখানে রাধারমণের রূপকটা অন্যরকম-তিনি এই জাযগায় পুরুষকে নিয়ে এসে সমাজে অবস্থানকারী কিছু পুরুষের যে-চরিত্র চিত্রিত করেন, তা এককথায় অনবদ্য। গানটির ধুয়াপদের প্রথম পঙ্ক্তিতে রাইকে মান ভাঙার কথা বলে দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে গিয়ে কৃষ্ণ বলছে-‘কিঞ্চিত দোষের দোষী আমি চন্দ্রার কুঞ্জে গিয়া’। পঙ্ক্তিটিতে কিঞ্চিত শব্দের ব্যবহারটাই পুরুষচরিত্রের আবরণটা খুলে ফেলে-যেখানে পুরুষ/কৃষ্ণ তার এই অন্যচারিতাকে স্খলনই মনে করছে না। ধারণা করা যায় এটা পুরুষতন্ত্রের প্রতি রাধারমণের একধরনের ব্যঙ্গ এবং এর পরে কৃষ্ণের যে অজুহাত-ফিরিস্তি, তার মধ্য দিয়েই সে দারুণ হাসির পাত্রও বটে। কিন্তু এসব তো রূপকের আর সমাজের বাস্তব; রাধারমণকে যেতে হচ্ছে তার নিজের বাস্তবে, ধরতে হচ্ছে রাধাভাবের সাজ; ফলে, গানের প্রথাগত বয়ন ভেঙে যেখানে আগের অন্তরাগুলির পরম্পরা-অনুযায়ী ভণিতা-পদে কৃষ্ণের কথা-বলার রীতি সেখানে তিনি নিজে অভিমানী রাধার রূপে হাজির-‘ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া/ আইজ অবধি কৃষ্ণ নাম দিলাম গো ছাড়িয়া।’ তাঁর এই অভিমান মিলনাকাঙ্ক্ষারই দ্যোতক নয় শুধু, এর মধ্যে দ্রোহবীজও উপ্ত-এই ভাবনাকে কেউ-কেউ অতিকল্পন হিসেবে অভিযুক্ত করে হয়ত বলতে পারেন, এতে কৃষ্ণের মতি-ফেরাবার গোপন আকাঙ্ক্ষাও তো থেকে যেতে পারে; কিন্তু আশা করি, একথা সকলেই স্বীকার করবেন যে এর মাধ্যমে কোনও-কোনও দলিতার, বা অনেক অভক্ত/অবৈষ্ণব-এরও তো আকাঙ্ক্ষাপূরণ ঘটে। রাধারমণের গানের এই বহুমুখী আবেদনের কারণে তাঁর গানের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এই সূত্রে আরও তিনটি গান পড়ে, এই কথার বাস্তবতা খোঁজার মধ্য দিয়ে এই লেখাটি শেষ করা যেতে পারে :




কৃষ্ণ আমার আঙিনাতে আইতে মানা করি।

মান ছাড় কিশোরী \


যাও যাও রসরাজ, এইখানে নাহি কাজ

যাওগি তোমার চন্দ্রাবলীর বাড়ি \


চন্দ্রাবলীর বাসরেতে সারারাত পোহাইলায় রঙ্গে

এখন বুঝি আইছ আমার মন রাখিবারে \


ভাবিয়া রাধারমণ বলে দয়ানি করিবে মোরে

কেওড় খোলো রাধিকা সুন্দরী \




কার কুঞ্জে নিশি ভোর রে রসরাজ রাধার মনচোর

সারা নিশি জাগরণে আঁখি হইল ঘোর \


হাসিয়া ঢলিয়া পড়ে যেমন নিশা ঘোর

কোন কামিনী দিল তোমার কপালের সিন্দুর \


নিশি ভোরে আসিয়াছ নিদয়া নিষ্ঠুর

পথহারা হইয়া নাকি আইলায় এতদূর \


মিটিমিটি চাও বন্ধু রাধার মনচোর

রমণ বলে রাধার হাতে বিচার হবে তোর \




অউত যারায় গিয়া-বন্ধুরে, আমায় পরাণে বধিয়া।

আরে সত্যি করি কওরে বন্ধু আইবায়নি ফিরিয়া রে \


আর চূড়া-ধড়া মোহন বাঁশিরে, বাঁশি যাও নিকুঞ্জে থইয়া।

ওরে, অবশ্য আসিবায় তুমি-ওই বাঁশি লাগিয়া রে \


আর ভাইবে রাধারমণ বলে রে-বন্ধু শুনো মন দিয়া।

ওরে, নারী যদি হইতায় তুমি-জানতাম প্রেমজ্বালা রে ‍‍/

বৈশাখী পূর্ণিমার আলো-অন্ধকার : কবি মোহাম্মদ রফিক


মোস্তাক আহমাদ দীন


পাঠ্যতালিকাভুক্ত লেখার কথা বাদ দিলে, কবিতা-পড়ার সূত্রপাত নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মধ্য দিয়ে, তখনও শামসুর রাহমানের কোনও কবিতাবই এককভাবে পড়া হয়নি¬¬; এর পর, একদিন কিনে পড়া হয়ে গেল জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন ; পড়ার পর, ‘হাওয়ার রাত’, ‘কুড়ি বছর পরে’, ‘ঘাস’, ‘নগ্ন নির্জন হাত’ প্রভৃতি কবিতা হৃদয়ে স্থান করে নিলেও, কাব্যসংস্কারহেতু বইয়ের কয়েকটি ক্রিয়াপদ ও অনুষঙ্গকে মনে হয়েছিল অনাধুনিক, এবং গতানুসারী। জীবনানন্দকে না-বোঝার কারণে সেকালের সজনীকান্ত দাসকে দোষ দিয়ে কী লাভ, একালের আমি নিজেও তখন প্রত্যক্ষত রাহমান-সুনীল-গুণ আর পরোক্ষত মান্নান-সিকদারপন্থী, এবং নিজের গ্রহণদৌবল্যহেতু জীবনানন্দের প্রতি দ্বিধাশীল। তখনই কারও লেখায় পড়ে থাকব, আধুনিক কবিতায় পথ-এর বদলে রাস্তা, সাথে ব্যবহার না-করে সঙ্গে ব্যবহার করা উচিৎ¬-এই সময় বইয়ের দোকানে ধুলোর সংসারে এই মাটি, মেঘে এবং কাদায় চোখে পড়ে থাকবে, যা ছুঁয়ে-দেখে আবার রেখে দিতে মনে এতটুকু কুণ্ঠা জাগেনি; তারও কিছু পরে, কপিলা নামটি শুনে মনে হয়েছিল একটি উপন্যাসের চরিত্রের নামে নাম রাখার মানেটা কী? এই নাতিবিরক্তিই পরে চরমে পৌঁছয় যখন দেখি তাঁর আরও একটি কবিতাবইয়ের নাম-যেটি তাঁর প্রথম বইও বটে-বৈশাখী পূর্ণিমা, সেদিন- এখন বলতেই লজ্জা লাগছে যে-খাঁটি রবীন্দ্রপন্থী বলে তাঁকে উপেক্ষা করে নিজেকে গর্বিতই মনে হয়েছিল এবং নিরভিজ্ঞ ছিলাম বলে তাঁকে একবারের জন্যেও গৌতম বুদ্ধের অনুরাগী মনে হয়নি।

দুই
কীভাবে মনে হবে, তখন বৈশাখী পূর্ণিমা চেখে দেখা তো দূরের কথা, চোখে দেখাও হয়নি, তবে ইতোমধ্যে পড়া হয়ে গেল মান্নান সৈয়দের পরাবাস্তব মায় সচিত্রসংবাদী/প্রতীকী কবিতা, সিকদারের পার্স/পাজ-প্লাবিত ঠান্ডা পাথরের মদির জগৎ, আর ঘোরা হয়ে গেল রাহমানের চিড়িয়াখানাও; পড়ে, ঘুরে কখনও-সখনও ক্লান্ত হলেও-রফিকের সশব্দ পদচারণা সত্ত্বেও-পড়া হয়ে ওঠেনি তাঁর কবিতা। তখন মোহাম্মদ রফিক পড়ব কি, ইন্দ্রিয়-সুখকর আর মগজ-উত্তেজক নয় বলে রবীন্দ্রনাথও তো পড়া হয়নি; এবং প্রাসঙ্গিক কারণে স্বীকার করা উচিৎ, তখনও পড়া হয়নি বুদ্ধের জীবনীও। তবে, তখন ঠিকই পড়ছি বোদলেয়ার-র‌্যাঁবো আর মনে-মনে খুঁজে চলেছি সেই রকমেরই কবিতা, কিন্তু তখনও এই কথাটি মনে জাগে¬নি যে-জীবনকে পা-মাথা-কাঁধ বুক-পিঠ যেদিকেই দেখা হোক না কেন, চোখের অধিকারীকে শেষপর্যন্ত দাঁড়াতে হয় তার নিজের জলমাটিআগুনের মধ্যেই।

তিন
নতুন শিং-ওঠা এই আধুনিক পড়–য়ার একদিন বোধোদয় হলো, অথবা বলা যেতে পারে বোধিলাভ ঘটল কীর্তিনাশা, খোলা কবিতা বা গাওদিয়া পড়ে নয়, বৈশাখী পূর্ণিমা পড়ে। ইতোমধ্যে বুদ্ধচরিত পড়ে জানা হলো, বুদ্ধের জন্ম যেমন বৈশাখী পূর্ণিমায় তেমনই তাঁর নির্বাণও ঘটে একই দিনে; কিন্তু মোহাম্মদ রফিকের কবিতার বইয়ের নাম বৈশাখী পূর্ণিমা কেন? বইয়ের নামকবিতার যে-বিষয় তার সঙ্গে কি বুদ্ধের জন্ম বা তাঁর নির্বাণ-এর কোনও গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে? খুঁজলে, সম্পর্ক-দুঃসম্পর্ক কিছু একটা পাওয়া যাবে হয়ত, কিন্তু এই সবকিছু পেরিয়ে সেই ভাবনাটাই জাগে : একজন কবি, যিনি বহুদূরের যাত্রী, তাঁর প্রথম বইয়ের নামের আড়ালে কবিজীবনের কোনও বিশেষ সূচনাবিন্দুর নির্দেশ দিয়ে যান কি না? এই প্রকারের চিন্তা যখন অনেকদিন ধরে তাড়িত করছিল, তখনই একদিন চোখে পড়ে মোহাম্মদ রফিকের একটি লেখা ‘আমার প্রথম বই : বৈশাখী পূর্ণিমা’, যেখানে তিনি লেখেন :

কেউ হঠাৎ করে শুধু অকারণ উৎসাহেও জিজ্ঞাসা করে বসতে পারেন, কাব্যগ্রন্থটির কেন নাম দিয়েছিলাম ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’। আমি কৈশোর-যৌবনের সেই টালমাটাল দিনগুলোতে গৌতম বুদ্ধের ভীষণ অনুরক্ত হয়ে পড়ি। অমি বিশ্বাসী নই, অবিশ্বাসীও নই। এমনই আমার চৈতন্যের ধারা সেই কাল থেকে। ...সেই অর্থে আমার তো অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাওয়া হলো কই। কিন্তু বেশ কয়েক যুগ হয়ে গেল ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে গ্রন্থটির যথারীতি অন্তর্ধানও ঘটে গেছে অলক্ষ্যে।

এরপর একই লেখার বি. দ্র. অংশে লিখেছেন :

২৫ মার্চের আগে স্বল্পসংখ্যক বই-ই দোকানপত্তরে গোছানো গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে লেখক-প্রকাশক উভয়েই নিয়োজিত ছিল অন্যত্র যুদ্ধসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজকর্মে। বইগুলো সমগ্র জাতির সঙ্গেই মুক্তির দিন গুনছিল বন্দিগুমোটে, গুদামে। সেখানেই পঞ্চত্ব্প্রাপ্তি ঘটে ক্ষীণায়ু বৈশাখী পূর্ণিমার।

পুরো লেখাটি-বিশেষত উদ্ধৃত অংশ দুটি-পড়ে, যে-কোনও পাঠকের মনে হতে বাধ্য যে, তাঁর কাব্যপরিক্রমার শুরুতে বৈশাখী পূর্ণিমা বইয়ে কোনও সম্ভাব্য যাত্রার এমন কোনও সূচনাবিন্দু ছিল; কারণ, তাঁর লেখায় পাচ্ছি : যে-সময়ে তিনি বুদ্ধের অনুরক্ত, চেতনায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব তখন সেই ধারায় তাঁর ‘অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল’ কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি; কারণ, মুক্তিযুদ্ধে লেখক-প্রকাশক দু-জন যুদ্ধসংক্রান্ত নানা কাজে জড়িয়ে-পড়ার কারণে বন্দিগুমোট গুদামের মধ্যেই বৈশাখী পূর্ণিমার কপিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এরপর তিনি লেখেন :

যা ঘটে সবসময় ভালোর জন্যে না ঘটলেও, অবশ্যই যা ঘটার, তা-ই ঘটে। সে-ই যে বলে না, এরপর একযুগ শেষ, অন্যযুগের শুরু। এবং সর্ব অর্থেই।

‘যা ঘটার তা-ই ঘটে’-এই বাক্যে তিনি নিয়তির কথাই বললেন যেন; মুক্তিযুদ্ধের-কারণে-ঘটা এই ঘটনা আর খোদ মুক্তিযুদ্ধই তাঁর বৈশাখী পূর্ণিমার যুগকে শেষ করে দিয়ে তাঁকে অন্য যুগের দিকে ঠেলে দেয়; বৈশাখী পূণিমা-পরবর্তী কবিতার মধ্য দিয়ে বাঙালি এখন যে-রফিককে চেনে, (অথবা বলা যায় রফিক যে-বাংলাকে চেনান) যার কথা আলোচক তাঁদের আলোচনায় নিয়ে আসেন, তা তাঁর ‘অন্যযুগের’ কবিতার মাধ্যমেই। কবি নিজেই বলেছেন, অন্যযুগের শুরুটা ছিল ‘সর্ব অর্থে’।

কিন্তু, এরপরও কথা থেকে যায় : যে-চেতনা ধারণ করার কারণে কবির মনে হয়,‘অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল', হঠাৎ-করে তাঁর জীবনে/চেতনায় সর্ব অর্থে অন্যযুগের শুরু হতে পারে না, তাতে পূর্ব-যুগের রেশ তো থাকেই, এমনকি প্রভাব থেকে-যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়; বৈশাখী পূর্ণিমা ও ধুলোর সংসারে এই মাটি -এই বই দু-টির বিষয়-বিবেচনা করলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। তারপরও এমন মন্তব্য কেন করলেন রফিক? সময় বিচার করলে আমরা দেখব, মোহাম্মদ রফিক তাঁর এই স্মৃতিধর্মী লেখাটি লিখেছেন প্রায় তিন যুগ পরে, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে, ইতোমধ্যে তাঁর অন্যযুগের চিহ্নায়ক কবিতাগুলি লিখিত হয়ে গেছে, আলোচকেরাও তাঁর লেখায় ‘বাংলাদেশ’কে আবিষ্কার করে ফেলেছেন, পাঠকসাধারণেরাও সেই পরিচয় পেযে যাচ্ছেন-এই সব মিলিয়ে মোহাম্মদ রফিকের যে-ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে, তা কবি পাঠক উভয়ের জন্যে কম গর্বের নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে এ-কথা উঠতে পারে যে কবিজীবনের এই বড় ঘটনাটি তাঁকে এমন কথা বলায় প্রলুব্ধ করল কি না। এই কথা তোলায়, আশা করি কারও মনে হবে না যে, যে-সব কারণে আমাদের সামনে তাঁর মূর্তিটি দাঁড়িয়েছে তাতে কোনও আপত্তি আছে; আমাদের আপত্তি সেখানে, যেখানে রফিকের কবিতার আলোচকেরা তাঁর প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ দিকটিকে বিবেচনায় না এনে তাঁর মূর্তিটি দাঁড় করিয়েছেন, যার ফলে তাঁর তাঁর স্বাতন্ত্র্য-লক্ষণ এতদিনে আড়ালে পড়ে গেছে। মোহাম্মদ রফিকের এই স্বাতন্ত্র্য-লক্ষণ প্রথম বই বৈশাখী পূর্ণিমা ও তার সেই সময়কার কিছু গদ্যে ধৃত; কিন্তু আশ্চর্যের কথা, আলোচকরা যখন তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তখন বৈশাখী পূর্ণিমা বিষয়ে কবির মনোভাবকে গুরুত্ব দিলেও, বইটির অন্তর্গত ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও গদ্যভাবনাকে গুরুত্ব দেননি।

রফিক তাঁর প্রথম বইটি নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন কিছু জায়গায়- ‘আমার প্রথম বই : বৈশাখী পূর্ণিমা’ শিরোনামক লেখার কথা তো উপরে আলোচিত, মোহাম্মদ রফিক রচনাবলি ১-এর ভূমিকায় কবি লিখেছেন : ‘প্রথম খণ্ড রচনাবলির অন্তর্গত বৈশাখী পূর্ণিমা অতি দুর্বল কবিতা নির্মাণের প্রয়াস হিসাবে টিকে রইল। এখন তো আর তাকে ছেঁটে ফেলা চলে না, চলে না অস্বীকার করাও। তাছাড়া কবিতা কর্মের ক্ষেত্রে সক্ষমের দুরাচারের চাইতে অক্ষমের দুর্বলতা শ্রেয়তর।’ অরুণ সেনকেও কবি তাঁর অস্বস্তির কথা জানিয়ে থাকবেন, না-হলে তিনি একথা লিখতেন না : “বইটির নাম ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’- বেরিয়েছিল ১৯৭০-এ, ১৯৬২ থেকে ৬৮ সালের মধ্যে লেখা। অর্থাৎ প্রায় গোটা ষাটের দশক জুড়ে। অনেক তল্লাসি করে পেতে হয়েছে। কবি নিজেও খুব লজ্জিত এই ‘কাঁচা’ বইটিকে নিয়ে।’’ প্রথম বইটি বিষয়ে শুভাশিস সিনহা লিখেছেন, ‘এ কবিও তাঁর তারুণ্যে প্রকৃতির রোমান্টিক আবহের ভিতর ছিলেন’ আর এতে তিনি ‘জিজ্ঞাসার অনন্যতা’ দেখতে পেলেও বলেছেন, ‘তখনও তাঁর সেই চোখ ফুটে ওঠেনি। যে চোখ সকল জীবন্ত বাস্তবতা থেকে স্পন্দনের সম্ভাবনার কথা ছড়াতে পারে, কাঠিন্যের সত্যে সহজতার চিরায়ত রূপ চেনাতে পারেন, তাঁর নিজের কথায় দারিদ্র্যের হাহাকারকে নিয়ে অন্তর্গত ক্ষোভ ও বিপ্লবের রসায়নে গড়ে তুলতে পারেন অধিবাস্তবতার কাব্যিক নন্দনে, যা ধীরে ধীরে রচিত হতে থাকবে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ থেকে।’ আহমদ মিনহাজ তথ্য হিসেবে একবার মাত্র বৈশাখী পূর্ণিমা-র কথা উল্লেখ করলেও তাঁর আলোচনায় বইটির কবিতা-বিষয়ে কোনও মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন। মোহাম্মদ রফিকের অস্বস্তির পাশাপাশি বইটি বিষয়ে তিনজন আলোচকের সমভাব দেখে এই প্রশ্নটিই জাগে যে, এরা সকলেই আলোচনা করার সময় কবির অস্বস্তির কথাটি ভুলতে পারেননি। অথচ বইয়ের কবিতাগুলি যেসময়ে রচিত হচ্ছিল সেই সময়-যুগস্রোতের বাইরে-কবির ব্যক্তিত্ব এমন স্বতন্ত্র আভায় ফুটে উঠেছিল যার প্রচ্ছন্ন চিহ্ন কবিতাগুলিতে তো আছেই, গদ্যেও রয়েছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু বিস্ময়ের কথা , মোহাম্মদ রফিকের এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি এখনপর্যন্ত অশনাক্ত, তাই এ-বিষয়টিকে এখানে বিবেচনার দাবিদার।

ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে বোদলেয়ার ও বুদ্ধদেবপ্রীতির ব্যাপারটি তো প্রায় সর্বজনবিদিত; আবদুল মান্নান সৈয়দ ও সিকদার আমিনুল হকের একাধিক গদ্যেও তাঁর প্রমাণ অস্পষ্ট নয়, কিন্তু এ-কথার পক্ষে সবচেয়ে বিশ্বস্ত বিররণ আছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভালোবাসার সাম্পান-এ। তিনি লিখেছেন, বুদ্ধদেব বসুকৃত বোদলেয়ারের চিত্ররূপশালী অনুবাদবইটি কীভাবে তাঁদের মাতাল করে রেখেছিল। তাঁর ভাষায় :

যে-ব্যক্তিটি আমাদের জীবনে এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটালেন তিনি কেবল ফরাসি কবি বোদলেয়ার নন, কেবল বুদ্ধদেব বসুও নন, তিনি বুদ্ধদেবীয় বোদলেয়র; বুদ্ধেদেবের দ্বারা আবিস্কৃত ও তাঁরই অসাধারণ ও সজীব অনুবাদে আমাদের চোখের জীবন্ত করে তোলা বোদলেয়ার। ...
দেখতে দেখেছেন বোদলেয়ার আমাদের রাজা হয়ে উঠলেন। বোদলেয়ারের প্রভাব প্রায় আপাদমস্তক গ্রাস করে ফেলল আমাদের।...
আমার ধারণা যেসব প্রভাব প্রথম ষাটের কবিতাকে ভিন্ন পথের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদেলেয়ারের প্রভাব তার একটি।

বোদলেয়ারের প্রসঙ্গটি ছাড়াও, ষাটের দশকের লেখকদের আরো যে-কয়টি বৈশিষ্ট্যর কথা তিনি তাঁর পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন সেগুলো মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় অভিব্যক্ত হয়েছে বলে মনে করেননি। তিনি স্পষ্টই লিখেছেন, ‘ষাটের কবিরা আমাদের কবিতা-শরীরে যে-একটি নতুন সুরের সংযোজন করেছিল এ নিয়ে অনেকেই এযাবৎ বলেছেন। রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, ফরহাদ মজহার, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন কবির, মুহম্মদ নূরুল হুদা-মোটামুটি এদের হাতেই ধারার উন্মোচন ঘটেছে।’ এই তালিকায় মোহাম্মদ রফিকের নাম না-থাকার অর্থ এ নয় যে, তিনি কবি হিসেবে উল্লেখযোগ্য নন, বরং এই বইয়ের অন্যত্র রফিক-বিষয়ে সায়ীদের সংপ্রশংস উল্লেখ রয়েছে : ‘অনেক ভালো কবিতা লিখেছে রফিক। সেগুলো কবিতাপ্রেমিকদের মন ছুঁয়েছে’ ইত্যাদি; আমাদের ধারণা, এখানে তাঁর নাম অনুল্লেখের কারণ, যাটের মূর্তিমান বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্যে তাঁর বৈশিষ্ট্য ধরা না-পড়া। ষাটের অন্যান্য কবির মানস-প্রবণতার বিবরণ দিয়েছেন সায়ীদ, আর ১৯৬২ সালে কি তার কাছাকাছি সময়ে, মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর লিখছেন, ‘ধ্র“পদী ইয়োরোপীয় সাহিত্যের বড় বড় লেখকদের জগতে পাল উড়িয়ে ছুটছে তখন ও’। তারও প্রায় এক দশক পরে, ১৯৭২ সালে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর-এ ‘আমরা ও আমাদের ক্লাসিকস চর্চা’ নামে যে-প্রবন্ধটি লিখলেন তাতে একদিকে যেমন সায়ীদের কথার সত্যতা মেলে তেমনি যাটের অন্য কবিদের থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য-লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রবন্ধে রফিক বলেছিলেন, আমাদের সাহিত্য থেকে থেকে ক্লাসিকস চর্চা প্রায় উঠে গেছে, তাই আমাদের কবিতা আজ নিঃপ্রাণ, আমাদের চিন্তন ও চেতনা অস্বচ্ছ; একসময় মাইকেল বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ অতুল গুপ্ত শশাঙ্কমোহন সেন অজিত চক্রবর্তী পর্যন্ত তার চর্চা ছিল, এরপর তিরিশের যুগ থেকে তা ছিন্ন হয়ে গেছে। এই জায়গায় অর্থাৎ তিরিশের যুগ-সম্পর্কে এই অভিযোগটি ব্যাখাযোগ্য মনে করায় রফিক এর সঙ্গে একটি পাদটীকা যুক্ত করেছেন আর এতে, বুদ্ধদেবপ্রীতির যুগে তাঁর সম্পর্কে যে-কথা কটি লিখেছেন তা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক। তিনি লিখেছেন :

বুদ্ধদেব বসুর সমস্ত সমালোচনা সাহিত্যে বিদেশী কবি ও কবিতার
অনুষঙ্গ কারণে ও অকারণে অহরহ এসে পড়লেও গ্রিক ও রোমান
কবিদের প্রসঙ্গ তিনি সযতেœ এড়িয়ে গিয়েছেন।

লক্ষ করার বিষয় এই যে, তার প্রায় বছর দেড়েক আগে বেরিয়েছে বৈশাখী পূর্ণিমা, যার রচনাকাল ১৯৬২ থেতে ১৯৬৮-এই বিবেচনায় এই অনুমানের সুযোগ আছে যে, এই প্রবন্ধের ভাবনার সঙ্গে ওই বইয়ের কাব্যদর্শনের মিল আছে। শুধু অনুমান কেন, চিরায়তের সঙ্গে যোগ ছিন্ন হওয়ার কারণে যে-কবি তাঁর গদ্যে দুঃখপ্রকাশ করেন তাঁর কবিতায় সেই যোগ-স্থাপনের আকাক্সক্ষা থাকা স্বাভাবিক। অন্তত বৈশাখী পূর্ণিমা-য় যে আছে, তার প্রমাণ বইয়ের কবিতা পড়লেই বোঝা যাবে।

চার
বৈশাখী পূর্ণিমা-র প্রথম কবিতার অন্তরঙ্গ-বহিরঙ্গ বিবেচনায় আনলে রবীন্দ্রনাথের শেষপর্যায়ের কবিতার কথা পড়ে যেতে পারে। বইটি বহুলপঠিত নয় বলে এখানে এই ছোট্ট কবিতাটি উদ্ধৃত করছি :

আবেগ

প্রস্ফুট আবেগ আসে
নম্র পদে
সত্তার বিরলে
যেখানে সে বাস করে কিছুক্ষণ
এবং অন্তিমে দিয়ে যায়
অনন্য উপহার :
বৈরাগ্যে প্রবাহে আর্দ্র
অস্থির ক্রন্দন

রবীন্দ্রনাথের কবিতার সঙ্গে এই কবিতার বিষয়গত দূরত্ব থাকলেও, ভাবগত দূরত্ব কম, ফলে এ-কথা বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথের সমাপ্তিবিন্দু থেকেই মোহাম্মদ রফিকের সূচনা। প্রভাবগত বিচারে এখানে দোষের ব্যাপার যতটা, গুণের ব্যাপারটি তার চেয়ে অনেক বেশি। বৈশাখী পূর্ণিমা-য় রবীন্দ্র-যোগের যে-পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল, এখনও তা অক্ষুণ; তিনি তাঁর ভালোবাসার জীবনানন্দ বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘এ-কথা আজ আর কিছুতেই অস্বীকার করার প্রশ্নই উঠে না যে বাংলা কবিতার যথার্থ আধুনিকতার মূল সূত্রটি রবীন্দ্রনাথেই নিহিত’।
বইয়ের দ্বিতীয় কবিতাটি সেই পুরাণচরিত্র ক্ল্রিওপেট্টাকে নিয়ে, মোহাম্মদ রফিকের বয়ানে যাকে মানুষের যৌনতার স্রোতে ভাসতে হয়; কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তি, ‘লীন হয় অন্ধকার অসীম সৈকতে’। কবিতাটি জটিল নয়, আবার নির্দ্বন্দ্বও নয়-প্রথম স্তবক পড়ার পর শেষ পঙ্ক্তির গতিমুখ সাধারণ পাঠকের কাছে বিপরীতস্রোতা মনে হওয়া অবাস্তব নয়। এ-ই হচ্ছে মরমিয়া, এখানে যা রবীন্দ্রকাব্য-দর্শন ছুঁয়ে প্রকাশিত, আর অন্যত্র বুদ্ধের দুঃখবোধে আক্রান্ত হয়ে।
এই বইয়ের কয়েকটি কবিতায় নানা ভাবে কান্নার প্রসঙ্গ এসেছে, যা দুঃখবাদেরই নিকট/সূদূর বিস্তার। যেমন :

১. বৈরাগ্যে প্রবাহে আর্দ্র
অস্থির ক্রন্দন

২. প্রান্তরে প্রান্তরে কাঁদে যেখানে ছড়িয়ে থাকে
অনন্ত গোধূলি আর শোকাহত নীরবতা

৩. যারা শুধু ভ’রে তোলে
দিগন্ত কান্নার মৃদু লয়ে

৪. বেদনার কতোনা চৈতালী
দয়িতার আবেদন, বিজন ক্রন্দসী

৫. তমসায় ঢেকে দেয় সব স্মৃতি সব কান্না

৬. শুধুই দাঁড়িয়ে বাইরে ভিজেছি বৃষ্টির ধারাজলে
ভিজেছি কান্নায় ঘামে আকণ্ঠ সে রৌদ্রের গহনে

৭. ভালো লাগে দেখে যেতে নির্জনে এই
রাস্তার আলো ঘিরে বৃষ্টির ধারা
শুনে যেতে বাতাসের চাপা ক্রন্দন

এই ভাবে তালিকা করে গেলে তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে, এর সঙ্গে আছে বিষাদ, মৃত্যু ও তদসম্পর্কিত নানা প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ; আছে বৈদেহ-কথা, নানারকম অশরীর মরমি আহ্বান প্রভৃতি। এখানে সর্ববিধ মিছাল টেনে না এনে নামকবিতা থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

আজ রাতে দেখি আমি তন্দ্রায় বিবশ সবে,
পাখিদের কোলাহল বৃক্ষের মর্মর
কি এক বৈদেহী সুরে
বিভাসিত চরাচর চাঁদ আর তারার প্রণয়ে;
... ... ... ... ... ...
তবু কি দেখিলে তুমি নীরব নির্জন
সেই ক্ষণে রাতের দুপুরে? সেদিনও এমনি
সবকিছু শুনেছিলে;- মৃত্যু জরা প্রেম
মানুষের ব্যর্থতার হাসি, বাতাসের স্রোতে!

এই পঙ্ক্তিগুলো গৌতমের জীবন আর বৌদ্ধ-অনুষঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেলে এ-নিয়ে কথা না বাড়ালেও চলত, কিন্তু এই উদাহরণগুলো তো বটেই, এ-ছাড়া বৈশাখী পূর্ণিমার আরও কয়েকটি কবিতায় মূর্ত ও অমূর্ত রূপে চিরায়তের যে-অনুভব ব্যক্ত হয়েছে তা সকল কবির ক্ষেত্রে সচরাচর ঘটে না।
কিন্তু, এরপরও যারা ওই কবিতাগুলি সম্পর্কে রফিকের অস্বস্তি যেমন- ‘কাঁচা’ ‘দুর্বল’ প্রভৃতি দোষের কথা তুলবেন তাদের জন্যে রূপসী বাংলা (বাংলার ত্রস্ত নীলিমা) নিয়ে জীবনানন্দের অস্বস্তিজড়িত দৃষ্টান্তই যথেষ্ট; এ-ছাড়া প্রথম কবিতাবই হিসেবে এর যে-গঠনশৈথিল্য, কোনও-কোনও স্থানে তৎসম শব্দের বাহুল্য, কোথাও কোথাও যথোচিৎ শব্দ-নির্বাচনের ব্যর্থতা-প্রথম বই হিসেবে এগুলো খুব দোষের ব্যাপার নয়।
বরং এই বইয়ের যে-অভিব্যক্তি, তা তার সমকালের কবিদের থেকে ছিল ব্যতিক্রম। এবং এ-প্রসঙ্গে একটু বিশেষ কথা বলবার আছে যে-বুদ্ধ ও রবীন্দ্রনাথের মহাজগৎ থেকে যে-কবির যাত্রা শুরু, তাঁর পরিক্রমণ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মধ্যে কিছুতেই সীমাবদ্ধ হতে পারে না। অরুণ সেন তাঁর মধ্যে বাংলাদেশের স্পর্শ পেয়েছেন (পেতেই পারেন), আহমদ মিনহাজ তাঁর মধ্যে সেই বাংলাদেশে পৌঁছনোর চেষ্টা দেখেছেন (দেখতেই পারেন)-এই দুই আলোচকের আলোচনার আগে পরে, এই ভাবমূর্তি গড়ে উঠবার পেছনে, তাঁর নিজেরও কিছু সশব্দ অবদান আছে, তাই, আমাদের মনে হয়, এই মূর্তি ভাঙবার জন্যে এখন নিজেকেই হাতুড়ি নিতে হবে, কারণ এখনও তিনি সক্রিয় ও সজীব আর কব্জিতেও রয়েছে একজন যুবকের ক্ষমতা।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্তিত্ব আয়োজিত তিন দিন ব্যাপী মোহাম্মদ রফিক বক্তৃতামালার সমাপনী দিন ২৮ জুন ২০০৯-এ প্রবন্ধটি পঠিত হয়েছে