কাজল শাহনেওয়াজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাজল শাহনেওয়াজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০০৯

জলমগ্ন পাঠশালা






জলমগ্ন পাঠশালা : কাজল শাহনেওয়াজ

সূচিপত্র
জলমগ্ন পাঠশালা/ অবান্তব/ কেমন করে বলবো/ একদা অজস্র স্বপ্ন তুমি ও দৃশ্যপট/ থাকতো যদি দীর্ঘকায় পাইন/ পদ্যের বই/ সাইবারনেটিক্স/ হাইড্রলিক/ পরিস্থিতি/ রহস্যখোলার রেঞ্চ/ বায়োলজী ক্লাশে/ হাকুড়দিয়া/ কেওয়াটখালি লোকোশেড/ একরামপুরের দুপুর/ গারো ও ইহুদীরা/ ব্রেনড্রেন/ টেরর ছেলেটি যেভাবে বলেছিল/ হ্রস্বতম জেব্রার রূপকথা/ হেরোইন/ জংশন/ ভালোবাসার দানো/ একটি বিকল্প কবিতা/ দাঁত/ আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী/ নিশার ভাষা/ অতনু/ দুই/ কন্যাকে/ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিরিজ/ লিরিকগুচ্ছ/ মৃত্যু আজ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে মৃতদেহ ছেড়ে



জলমগ্ন পাঠশালা
.............
ডাল ঝুঁকে বর্ষার প্লাবিত মগ্নতাকে
ছুঁয়ে ছিলো অলস, মন্থর গতিতে
দুপুরের কৃষ্ণ আঙ্গিনায় পার হলো উদাস শামুক
আমাদের জ্যৈষ্ঠ মাস গোড়ালীর ঘাসে
এক পা দুই পা করে জলমগ্নতায় অদৃশ্য হলো।

পুকুরের থৈ থৈ কৃষ্ণ কথায় চাঁদের ছায়া হলো থৈ থৈ থালা
হিঙ্গুল পাতার আঠালো থাবায় মগ্ন গ্রাম, মগ্ন দুপুরের পাঠশালা।

যেন অর্ধেক আঁধারে ভরা সরু খালের অন্তর,
প্রাকৃতিক বেঞ্চির তক্তা ভেসে গেছে অন্তপ্লাবনে
মৃত এক টুনটুনির অনুপম দেহ ভেসে যায় স্রোতের সমতলে
আধপাকা হিজল নামে মাছের সন্ধানে।

ওরা মাছ, ওরা দেশান্তরিত একদল মানুষের মতো
টিনের আধডোবা মোরগের পাশে বসবাস করে
ভাঙা বর্ষাকে জোড়া লাগালো-
কি যে দূর আত্মীয়তা মানুষ ও মাছে।

মৎস শিকারীরা এলো, নৌকার ছইএ ছিন্ন হার
ওরা পরিহার করেনি, ওরা তবু মৎস বিনাশী;
মাছের সবজে নীল চোখ ওরা ভালোবাসে,
ওরা জলের ভেতর রূপালী মাছের ঝাঁক ভালবেসে হৃদয়ের জালে তুলে নেয়।

ধান খেতে বাদামী পালকঅলা বক
কালো নৌকা এলে উড়ে যায়
দলছুট মাছ ও পালক পাশাপাশি অনন্তকাল ডুবে যেতে যেতে
নেমে যায়, চলে যায়, যেন হৃদয়ের কাছে ফিরে আসে।

মুঠোবন্দী নিশিন্দা পরীর গল্প, কারা এলো?
পানির ঘূর্ণিতে শ্যাওলার সবুজ চোখ, কারা এলো?
জলমগ্ন ঝিঁঝিঁদের সংসারে কারা এলো -
পেছনে হাটে আর ঝরা শিশিরের গল্পে
চোখ খুলে বর্ষা দেখে!


অবাস্তব
......
কে গেলো? কে? রেলোয়ে স্লীপার ধরে জড়োসড়ো?
আকাশের পথভ্রষ্ট পাখী কোন? ঝরা পাতা সমাজের?
পার্কে রাত্রিতে বহুদূরের আকাশ দেখিয়ে নিজেকেই বলেছিলাম
ঐ দেখো পাহাড় দেখা যায়
ঐ দেখো দূরে বিরাজ করে কেমন শূন্যতা
অবাস্তব দু’ফোঁটা পানিতে চোখ ভরে উঠেছিলো
পায়ের চটির মাঝখানে নখ ঘষে ঘষে
বলেছিলাম - ঐ দেখো নদী, ঐ দেখো
কি এক বিশাল চোখ তাকিয়ে এদিকে
দুটি কৃত্রিম হাতে শরীর জড়িয়ে বিড়বিড় করে এইসব বলেছিলাম।

কে গেলো, কে?
মাননীয় বৃক্ষের আড়ালে, কে গেলো জড়োসড়ো হয়ে
পথহারা পাখী? ঝরা পাতা সমাজের? তুমি?


কেমন করে বলবো
..............
কেমন করে বলবো
আমার হাতে বীজগণিত আর পাটীগণিত, তোমার হাতে ইতিহাসের নোট
আমার গায়ে ধুসর বর্ণের সার্ট আর কীটনাশকের রঙের চোঙা প্যান্ট
তোমার গায়ে আগুন না প্রজাপতির মরা রক্ত, মেরুন রঙের?

‘আমরা খুব আজ ব্যক্তিগত চিনাবাদাম খাবো
বাঁক ছাড়িয়ে যেতে যেতে কুড়োবো খুব
মাশরুমের টুপি, খুঁজে নেবো এমন কিছু ফুল
যারা নিজেরাই অদ্ভুত এবং বলবে সকল কথা!’

‘যেমন?’

‘যেমন কদম, কদম!
বুকের মধ্যে গোল, নিরেট, অনুর্বর
বর্ষাকালে খুলতে থাকে প্রাকৃতিক বন্ধন
নিজে এতো সুন্দর তবু ভেসে ভেসে জীবন কাটায়-’

‘যেমন কদম
একটি বৃত্ত নিজের ভেতর, একটি গণিত সমস্ত গাছের
অনুভবের নিজস্ব গোলক, পুরো জ্যামিতিক;
জটিল গতির সন্ধানে সে নিজেই অনুপস্থিত
দ্রুত ঝরে পড়ে আত্মস্মৃতির ভেতর-’



একদা অজস্র স্বপ্ন তুমি ও দৃশ্যপট
....................
তুমি বললে বনতুলশী, আমি বললাম ভুল
মাঠের মাঝে ফুটলো আমার নন্দনেরই ফুল।

মাঠ কুমড়ো নদী ঘেঁষে অবাক করা চোখ
আকাশ থেকে পড়লো বুঝি অপূর্ব আলোক।
সরু ফিতে কার যে চুলের নিরব অসহায়
আমার বুকের রাস্তা দিয়ে অল্প ঘেঁষে যায়।
পথের পাশে এগিয়ে গেলে অশ্বত্থের পাশে
ঈশ্বরেরই নাকে মতো মঠ এগিয়ে হাসে।
সবুজ জলাভূমি হেঁটে বাঁক ফেরালেই দেখি
বনতুলশী ঝোপে তুমি নিরবতার পাখি।

নিজেই বলি বনতুলশী, আবার ভাবি ভুল
মাঠের মাঠে এ যে আমার নন্দনেরই ফুল।


পদ্যের বই
..........
গুমটি ঘরে লুকিয়ে ছিলাম বেশ কয়েকটি রাত
বুটের লাথির ভয়ে
শালিখ আর চড়ুই এসে ব্যঙ্গ করতো প্রতিটি সকাল
ওরা আজকাল ভয়ই পায় না
মেনে নিয়েছে ফেরারী লোকজন।

বাইরে ঝুলছে তালার গহ্বর
ব্রোঞ্জযুগের নিদর্শনের মতো
দরোজা থেকে এঁকেবেঁকে ঠিক ভেতরের দিকে
একটি গোপন তক্তপোষ।

সঙ্গে ঝোলার মধ্যে রোগা কাব্যগ্রন্থ, হলুদ মলাট
প্রথম পাতা ছেঁড়া
দেশ এখন উপচে পড়ছে আর্তনাদের ফেনায়
বদ্ধ ঘরে টিনের চালে সেই শব্দের কাঁপন লাগে।

নিশানা নেই পথের
বসে আছেন যারা বসে থাকার, হাত তুলছেন, পা তুলছেন
খুলে দেবেন ঈশ্বরের তালা?
কারা, তারা কারা?

হলুদ পাতা থেকে
ক্ষণকালের বিশ্রামের ফাঁকে
ঊর্ধ্বে ওঠে ক্লান্ত চিলের ডানা
গুমোট ঘরে লতিয়ে ওঠে বুনো ধুন্দুল লতা
মেঝেয় ধানী ইঁদুর

আমার রোগা পদ্যের বই
কোথায় তুমি কই
আড়াই হাতের তক্তপোষে চুপচাপ আজকাল
আমি পেতে আমার জাল
শুধুই ভাঙি দিনের কাঠি, রাতের কংকাল।


সাইবারনেটিক্স
..........
তুমি এলে ট্রাক্টরের কলকব্জা নড়ে ওঠে
নি:শ্বাসে কাঁপে ঘাম
তুমি এলে সাইলেন্সার থেকে ভকভক ছোটে

তুমি থাকো যদি চুপচাপ
ধুলো ও কার্বন জমে ইনজেক্টরে
বুঁজে যায় থার্মোষ্ট্যাট ভাল্ব

তুমি না এলে
নড়ে চড়ে ওঠে হিসেবের গভর্নর, বিনা তাড়ায়
ধানখেতে কালো ফড়িং পেশী টানটান করে দাঁড়ায়।


হাইড্রলিক
.......
আমার হাত স্মৃতির পথ চলা থেকে নেমে এসে
কণ্ঠরোধ করছে আমাকেই বিশাল
একজোড়া হাইড্রলিক হাত

ভারী হয়ে উঠছে পা যেন বহুদিন
রোপা আমনের খেতে দাঁড়িয়ে ছিলাম
হতবিমূঢ় একজোড়া কাদামোজা পরে

আজ আমার চোখে কুয়াশা অবিকল
অঘ্রাণের খামার বাড়িতে একজোড়া
পুকুরেরই মতো


পরিস্থিতি
........
আসবে যদি ভাব নিতে তবে পিপা নিয়ে এসো
কালো ওয়েল্ডিং গ্লাস চোখে পরে এসো
সীসার জ্যাকেট পরে এসো
মিলিটারি বুট পায়ে এসো
গ্লাভস নিয়ে এসো

বলাতো যায় না কখন কি ঘটে যায়!


রহস্য খোলার রেঞ্চ
.............
হাত থেকে পড়ে গেলো ইস্পাতের রেঞ্চ ঝনঝন শব্দ করে
মেঝে মেঘলাতে
এমন সময় সোনা গাভী এসে মুখ দিলো হীরের ঘাসে
ওয়ার্কশপে যন্ত্রপাতির কাছে
আমি ঘষে যাই লোহার কবিতা
একা একা

কবে থেকে
টুকটাক ধাতুখন্ডদের সাথে কথা বলি
গল্প বলি নেবুলার বড়ো হয়ে ওঠা
মহাকাশযানের আজীবন একা থাকা
চতুর্মাত্রায় অনন্ত জীবন
কোয়ার্ক নাম ধরে ডাকি, ওগো দরোজা খোলো, জানালা খোলো
আমার কথা শোনো
কিউব, ট্যাপার আর গিয়ারের ফুলেরা

আজ কি যে হলো আমার
হাত থেকে কেন যে পড়ে গেলো ঝনন করে
রহস্য খোলার রেঞ্চ
সোনার গাভী এসে মুখ দিলো আমার
বাগানের হীরের ঘাসে
অচেনা ধাতুর এক গাভী এসে।


বায়োলজী ক্লাশে
.............
প্যারাফিন ট্রে’র গায়ে পিন দিয়ে গেঁথেছি
হাত
পা
এইবার যিশুর সাথে আমি ও এই সোনাব্যাঙ
পরস্পরের জীবন বদলাবো।


কেওয়াটখালি লোকোশেড
...............
রোদের জিহ্বা বেরিয়ে পড়েছে। কেওয়াটখালি লোকোশেডে
নীল মোচা রঙের রেল।
একটি ডিজেল বাবুইঞ্জিন টিনের টুপির নিচে
আরাম করছে। ঠেলে ঠুলে ঘাম ঝরাতে ঝরাতে
বয়লার ফেঁটে যাওয়া কয়লা ইঞ্জিনকে
আনা হলো। ঘি রঙের টুপি পরা ঠিকাদারের
লোক ভুড়ি ফুটিয়ে ছাতা মাথায় গোঁফ
নাড়িয়ে হুকুম দিলো ‘ভাঙো’।

অক্সিজেন শিখা জ্বললো। কালো রঙের আগুণ
ফোঁপালো।
টন টন ইস্পাত।
মিটার মিটার পাইপ।
তামা। দস্তা।
বিকেল হতে হতে লাইনের উপর রইলো শুধু চাকা।
চারটি।
একটি বাছুর সন্ধ্যের দিকে
হাওয়া খেতে চাকার উপর উঠলো।


একরামপুরের দুপুর
............
নদী ও রেললাইনের মাঝামাঝি মহকুমাজেলায়
একসার ওয়ার্কশপের কাছে
খালি পিপার পাহাড়।
ঘড়ঘড় শব্দে ধুলো ওড়ে শীতের মধ্যাহ্নে।
এক ঝলক কান্না কাতর নীল আলো
গভীর নলকুপের পাইপে ফিল্টার বদলানো সময়কার ঝালাই থেকে
মাশরুম লিঙ্গের মতো উঠে আসে।
আশেপাশেই এক প্রস্ত শিরিষ সবুজ, এক প্রস্ত জমানো নি:শ্বাস।

মালা বদল লেনায় দেনায়
দেশী কারখানায় শুরুর সাথে হাত ধরাধরি
এক পা ছায়ায় ধরে চৌকো বুনো পাতা
এক পা অগ্রগতির রুরাল জনসভায়
তানানা নানানা তানা নানা নানা
মাছের বুকের কাছে লেদের বিছানা
উবু হয়ে পা ছোঁড়ে ক্লান্ত ওয়াগন
আত্মনিবেদিত আধো নাগরিক মন
আমার এ সাম্প্রতিকের কান্না - ক্রমবিস্ফারিত গতি
একরামপুরের দুপুর একদিন পাবে পরিনতি।


গারো ও ইহুদীরা
............
ভারী যন্ত্র আমি ইহুদীদের পরম কল্যাণে ভারী
সাদাসিধে উচ্চমার্গীয় এক ইন্দ্রিয় যন্ত্র।

মহিলা এবং নিষ্ঠুর আর্তনাদ পছন্দ করি
আর আবিষ্কার করি যে রাস্তয় ভ্রমণে যাই
তা ব্যবহৃত হয়েছে বহুবার।

একমাত্র রাসায়নিক ভাবে অনুভব করে
মহিলার কৌমার্য বিষয়ে দ্বিধাহীন হওয়া যায়
গারোদের সে সুযোগ নেই বলে ওদের পুরুষেরা গুম্ফহীন।

ভারী শিল্প বাঁচে তূলনারহিত ইহুদীদের হাতে
একেকটি দীর্ঘ অপেক্ষা মহাযুদ্ধ শেষে
উচ্ছৃঙ্খল হয়ে স্বীকার করা ভালো
পুরুষ ও মহিলার মিলনেই ভারীশিল্প বেঁচে থাকে।


হেরোইন
.......
তাবুর ভেতর মরা রোদের ঘোর লাগা বিষন্ন ছেঁড়া পর্দা
টগবগে চৌবাচ্চা, উপচে পড়ে যাচ্ছে সবুজ খেলার মাঠে ট্রেন
একা একা চলেছি আলোর স্টেশন থেকে
বৃষ্টির ভেতরে, সবুজ ট্রেনে আজ কামরায় দুলুনি - ঝিরঝির ঝিরঝির

একটা হাত নদীর উপর পড়ে আছে, আরেকটি হাতে
নক্ষত্রের বাঁশী কোলের ওপর টেনে এনেছি
বরফের ঘরবাড়ি, মাছের ধনুকের প্যারাবোলা
হঠাৎ জায়গা বদল জুতোর সাথে হাঁস,
চোখের সামনে নিশিন্দা গাছে মোরগের দীর্ঘশ্বাস
কামরার সাথে কোনো এক আয়ুর্বেদিক ওষুধের আলমারি
লতাগুল্ম, ঢেকিশাক, ফার্নেসে উত্তাপ,
শব্দগুলো রঙিন সুতো, রক্ত ঝরছে, উজ্জ্বল আলোর নিচে ওপেন হার্ট সার্জারী।
দু’হাটুতে মাথা, আত্মদর্শনের গোলার ভেতর গোলা
ধরে আছি শক্ত করে হলুদ রোদেলা
পাখির নখ দিয়ে পড়ো-পড়ো অমৃতের ডাল
সাদা দেয়াল, শাদা দেয়াল - কিছুটা বেখেয়াল
ছবির সারি, ছবি থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম - যেন সবুজ ঘাস
সোজা মানুষগুলোর চোখ ভরা কালো সন্দেহ, নির্মম অবিশ্বাস
তুল্যমূল্য, তুল্যমূল্য হিসাব, কালো পিঁপড়ের সারি
ঘাস, শুধু ঘাস আজ বিকেলের আততায়ী বাড়ি
থেকে রাতের ক্ষয়ে যাওয়া নখের নেবুলা।


ভালোবাসার দানো
.............
তোমার নাক, মুখ, চোখ, ঠোঁট - তোমার স্তন, যোনী, নাভী, নখ
সব ভালোবাসার সেবা করার জন্য
সব ভালোবাসার ডাক টিকিট, ভালোবাসার লোমকুপ, ভালোবাসার মুদ্রা।

প্রাকৃতিক আর সব ভোগ্যপণ্যের মতো তুমি;
তোমার জিহ্বার লালায় ক্লোরোফিল, স্তনে ডায়াজিপাম
নাভীতে চালতা ফুলের সৌরভ
সমুদ্রের সূর্যাস্তের মহিমা ঐ তোমার স্লিপারের ঝলকানি।

তুমি মাদী ঘোড়ার উজ্জ্বল কোমলতায় বর্ণিত
তরুণ মোষের নম্রতায়
বাষ্পরুদ্ধ বয়লারের মতো ছটফটে তোমার তরল চোখ
কোয়েলার মতো দুষ্প্রাপ্য, বিভারের মতো দামী
তুমি জানো সারস ও ষাঁড়ের হত্যারহস্য
শিকার ও শিকারীর মনস্তত্ব,
শুধু ভাঙচুরের কারসাজি।

সন্ধ্যার শ্যাওড়া কাঁপিয়ে চলাচল তোমার
তুমি ভালোবাসার দানো।

মহারাণীর বেতের চেয়ারে রাজসম্রাজ্ঞীর শিরদাঁড়া টান করে বসে থাকো
আনবিক ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি সেই দৃশ্য নিয়ে
আমিও যে বড়লোকের স্নানের দৃশ্য লুকিয়ে দেখেছি।


দাঁত
......
কবরের ভিতর চেনা বলতে শেষ পর্যন্ত রইলো দু’পাটি হাড়ের দাঁত।

এই দাঁতগুলো ছিলো উৎসবে চিবানোর জন্য
ভোঁজে ছেঁড়ার জন্য আর লৌকিকতায় মধুর হাসির জন্য
ছিলো ঘুম থেকে উঠে দিনের খোলা হা-এর ভিতর লাফিয়ে পড়ার আগে
সকালের পানি ও পেষ্টে ধুয়ে ফেলবার জন্য
কথা বলতে গিয়ে ভুল হয়ে গেলে জিভ কামড়ানো জন্য
চুমুতে সাহায্য করবার জন্য।

আজ বুকের লাল তিল, বুড়ো আঙ্গুলের ডগায় ছোট্ট পোড়াদাগ
এমনকি শরতের মসৃন নীলের সদৃশ চার আঙ্গুল কপাল
সবই মাটি ও উদ্ভিদের ভালোবাসার বিষয়।

চেনা বলতে রয়ে গেলো অবশেষ দু’পাটি দাঁত।

সাজানো, এলোমেলো, কোণা ভাঙা, একটির ওপর আরেকটি ওঠানো
শাদা বা ঘোলা
হৈ চৈ করা অথবা নি:শব্দ।


আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী
..........................
আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী, বাংলাভাষা, বামরাজনীতি,
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ভালোবাসি
তাই আজ বেছে নিতে হয় এলোমেলো জীবনযাপন, লম্বাচুল, অনিশ্চয়তা
হাতে তুলে নিই হেরোয়িন গুড়া, সুঁই ও সিরিঞ্জ, নাজু ওয়ার্ক্সের সিস্টেম,
পাতিরাম, বয়রার চরশ

আমরা ক’জন ইটের রাস্তার উপর পিচ দিতে ভালোবাসি তাই মরাখোলা যাই
খুঁজে বের করি দাগীলোক
সূর্যাস্তের দৃশ্য ছেড়ে বেড়ার ঘরে বসে থাকি

আমাদের কাছে কৃষক শব্দের মূল অর্থ ‘কৃশ’,
মাস্তান ‘বিদ্রোহী অসহায়তা’
তরুণীরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে ভুল করে, বলি, বিছানায় যাও
তোমাদের অন্ধকার খুব ভালো আছে, শুকতারা ভালো আছে,
ছাদ আজো ভালোবাসে শিউ-চন্দ্রিমা হাত
যাও, আর দেরী করো না, শুতে যাও খুকু।

আমার কখনো পালকিবাহক, ঝিকঝিক লা লা করে পুরনো গ্রামের আলপথে
বাউল রমা-পারুলের সংসারে যেতে ভালোবাসি
চিলে কোঠা ছেড়ে মাটি-কোঠা খুঁজি, ভালোবাসি কবিতা
তাই সমস্ত কুৎসিতের উপর প্রবল ঘৃণা উগরে দিয়ে
হা হা করে হাসতে হাসতে অপ্রকৃতস্ত হয়ে যাই।



কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিরিজ
..............

শরৎকাল
.....
থিরথির করে কাঁপছে শরৎযন্ত্র শিশিরের আঘাতে
সারারাত চলেছে, তাই হিমায়িত নলে কুয়াশা
গাছপালার নাক-মুখ থেকে গলগল করে বেরোচ্ছে।
বিশাল থার্মোফ্লাক্স থেকে গলা বের করে
বেরিয়ে আসছে নদীর ঐ পাড়ের সূর্য হঠাৎ দাঁড়ি কামাতে কামাতে।


অনেকগুলি লেক
.........
কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের পাশ দিয়ে গেলে বর্ষাকালে
ষাঁড়ের গোবরের গন্ধ এসে ঝাপটা দেয়
কিছুদুরে শহীদ মিনার এর ওভারহেড পানির ট্যাংক
দুটি ভাই ওরা কিছুকাল হাত ধরে আছে
ঐ দিকে তাকালে আকাশ দেখা হয়ে যায়
লেকের পাশে চুপচাপ বসে থাকলে
পাশাপাশি কোথাকার অনেকগুলি লেকের কথা মনে হয়।


কর্মশালার পাশে রেললাইন
..............
আমাদের এখানে কর্মশালার পাশ দিয়ে
দিগন্তের মাফলার হয়ে রেললাইন চলে গেছে বহুদূর
আসামের নুড়িখন্ড আর গর্জন কাঠের স্লিপারের উপর দিয়ে।
দীর্ঘজীবী দিনের হাতে এইটুকু অবকাশ আমাদের
কর্মমুখর গবেষণা খামারের ভেতর।


জরিপ
.....
নারকেল গাছগুলো সাক্ষী সেই সব দুপুরে
কি করেছি আমি একরাশ অবিন্যস্ত ভাবনার
উড়োখুড়ো চুল উড়িয়ে মুখশুকনো সঙ্গীদের সাথে
পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সীসারঙ পানির উপর থেকে
উঠে আসা রোদ নিয়ে
টি.এস.সি’র দোতলায়, বোটানিকেল গার্ডেনে
বৃষ্টিভেজা অন্তরীণ অবস্থাগুলোকে কি সব ভেবে
লুকিয়ে ফেলেছি বর্তমান থেকে
শাদা কাগজের স্তুপ তা জানে
জানে লেকব্রীজের তারাগুলো, গভীর রাতের কাছে
আমার আকুল অন্বেষণ, কি খুঁজেছিলাম
ধুলোর সাথে মিশে যেতে চেয়ে ঐ সব
নির্জন মুহূর্তগুলোয় -


লেকব্রীজ
.......
বাস্তবে লেকব্রীজ নিচে তার পানিছায়া
সামান্য বাতাসের রাতে ঝাউয়ের পাতায়
পুরনো দিনের জন্য সে কি শো শো উচ্ছ্বাস মায়া!
খেজুরে অশ্বত্থে যুগল জোড়াঞ্জলী
কান্নার নির্জন রাতে গাছগুলো পঙ্গু ঘোড়ার পিঠে বিপন্ন অশ্বারোহী।


বাহাদুর
.......
প্রতি সন্ধ্যায় দেখি তাকে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে যেতে, চলে যায় কোথায় যেন
লাল টানেলের করিডোর ঠেলে প্রেমিক প্রেমিকার মাঝ দিয়ে
লাইব্রেরীর কাঁচ ভেদ করে এলামন্ডার উজ্জ্বল হলুদ পাপ ছুঁয়ে
সে যেন কোনো এক অসীম বলবান শক্তিশরীর হয়ে
অদৃশ্য হয়ে যায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে।
এইতো ছিলো সে এই অন্ধকারে, খুঁটে খাচ্ছিল
ভিটামিন, শর্করা, সেলুলোজ, খনিজ কিছু কিছু
পরক্ষণেই সিমেন্টের ঢেউ ভেদ করে অন্যদিকে রাজপথে
খুট খুট করে হাঁটছে একাকী একা একা
সারারাত মাঠময় ঘুরে ঘুরে হাঁটে, দু’এক কদম
থমকে দাঁড়ায় লেভেল ক্রসিংয়ে, দূর থেকে দেখে
নতুন স্টেডিয়ামের হংশবলাকা ছাদ, ধীরে ধীরে হাঁটে
হাঁটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে আহত করা
অপারেশন শেখার গিনিপিগ ঘোড়া
রাত শেষে পেরিয়ে যায় তুঁত গাছ, আকাশের তারাদের দিকে।

আরো একবার ফিরে আসে
যেন ভালোবাসার লোভ হয় অপারেশন ঘরে...


লিরিকগুচ্ছ
..........

ছেলেটি ও মেয়েটি
...........
ছেলেটি পড়েছে তারপুলিন
শ্লোগানে বসে গেছে গলা -
ছেলেটি কি চায় আজ নিজের কাছে?
মেয়েটি যে নিস্ফলা!


ভালোবাসার ক্ষুধা
............
আসলে ভালো করে তোমাকে খাওয়াই হয়নি
তাই ভালোবাসার চোঁয়া ঢেকুর উঠছে
তোমাকে বলেছিলাম, আরেকটু ঠোঁটের ভাত আর ঘাড়ের ব্যঞ্জন দাও
অম্নি দেখালে জোড়া কবুতর উড়ে যাওয়া
মুঠো মুঠো গম দানা বরাদ্দ ওদের জন্য, আমার জন্য নয়
আমার যে রয়েছে ভালোবাসার ক্ষুধা, আর্তনাদ, ঈর্ষা ও পরাজয়।


ফাঁকি
......
যা দিয়েছো সব কি তোমার ভালোবাসার দান
এসব ভেবে দিনরাত হয়রান
হয়তো কিছু ফাঁকিও আছে বন বাদাড়ের মতো
ওরা যতো ঘন জমাট
শুন্য কি নয় ততো?


শংকা
........
দিন দিন কেবল শংকা বাড়ে তোমাকে নিয়ে
আছো কি নেই
তুমি কি ঠিক আগের মতোই
চুলে আটকে গেলে সরু চিরুনী
আমার কথা ভেবে খামাখাই শংকায় ভরে ওঠো?
----------------------------------------------

জলমগ্ন পাঠশালা : কাজল শাহনেওয়াজ। প্রচ্ছদ: কাজল শাহনেওয়াজ। স্বত্ব: সুরাইয়া সিদ্দিক। প্রকাশক: শিল্পতরু প্রকাশনী, ২৯০ সোনারগাঁও রোড, ঢাকা-১২০৫। প্রকাশকাল: ফাল্গুন, ১৩৯৫/ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯।
মূল্য: বিশ টাকা মাত্র। উৎসর্গ: আবিদ আজাদ করকমলেষু

রহস্য খোলার রেঞ্চ


কাজল শাহনেওয়াজ


'জলমগ্ন পাঠশালা' পর্ব অতিক্রমের পর এই কবিতাগুলি আমি লিখেছিলাম, পাশাপাশি 'কাছিমগালা' পর্বের গল্প লেখাও চলছিল। সব কবিতাই লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা বা না-ছাপা। ক্ষীণ কলেবরের সেই গ্রন্থিকাটির কথা ভাবি... সের দরে ছাট কাগজ কিনে কভার হয়েছিল, কয়েক রকম ছিল প্রচ্ছদ। রানিং কম্পোজ... সুলভ করার জন্য কোন আতিশয্য ছিল না...
-কা.শা.


কবিতাসূচি
----------
চিড়িয়াখানা/ পুরুষ মানুষের বিভিন্ন রকম সাইজ / আগুনের কি হবে/
শীতে পত্রমোচি কোনো এক গাছের উদ্দেশ্যে/ চিরন্তন সরল রেখা/ পশু পালনের দিন/ একদিন আনারস/
কুয়াকাটার সূর্যাস্ত কেনো লাল হয়ে ওঠে/ রাধুনী রাধা/ উপমার জগৎ/ স্মরণাঞ্জলী/ বিগত/ কপালের চোখ/ পানিদেশ ভ্রমন/ দৃশ্যতত্ব/ খোলামিল/ জীবনসড়ক থেকে কবিতারাস্তা - সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবে না/ জাফলং বিষয়ে একটা কবিতা কিভাবে লেখা যায়


চিড়িয়াখানা

আমার সাথে মুন্সিগঞ্জের সেনেটারি ইন্সপেক্টর, গোপালগঞ্জের স্বাস্থ সহকারি, পিরোজপুর পৌরসভার দুজন ভদ্রলোক ঘুরে ঘুরে চিড়িয়াখানা দেখছে। পিরোজপুরের সহকারি সাহেব তার কালো জুতা থেকে মিরপুরের লালমাটি সরাতে সরাতে বলে, ‘সুন্দরবনে এ রকম হরিণ আমার নিজের হাতে বহুবার মেরেছি, জানেন, হরিণের মাংশ খুব ভারি’ - আমি শ্রদ্ধায় আবেগআপ্লুত হয়ে পড়ি তার লালচের কথা শুনে। যে মুখে বলল বিগত প্রায় সেই সব হরিণের কথা - হরিণের রান্না করা লালচে গোশত এ মুখেই বহুবার খেয়েছে নিশ্চিতভাবে বলা যায় -
এরা সবাই বিভিন্ন জেলা শহরের পাদপিঠ থেকে এসেছেন তা বলে কোন গর্ব নেই কারো চোখে মুখে -
নতুন মেহমান যেমন করে থাকে। গত দশদিন শহরের ট্রেনিং একাডেমির ডর্মে কাঁচা তরিতরকারির বাসী চেহারার মত দিন ও রাত কাটিয়ে আজ বিকালে এরা ধনেশের নকল গাম্ভীর্য নিয়ে ছুটছে।
লক্ষ্য করে শুনি নিজেদের মধ্যে জানোয়ারের কথাবার্তা ছেড়ে ওরা অন্য একটি বিষয় নিয়ে খুব তৎপর হয়ে পড়লো। গোলাপগঞ্জের গোপালবাবু মুন্সিগঞ্জের চল্লিশোর্ধ উঁচু হিল পরা নিতান্ত নিরীহ রাজ্জাকুর রহমানকে বলছে, ‘ভাই রেজ্জাক, ঐ মেয়ে ভাল্লুকটার শাড়ির বাহার দ্যাখছেন, ইশশরে...’। এই সময় একটি অতিকায় জলহস্তি ঝামাইটের রোদে শুয়ে নাক ডাকছিলো। একজন কে যেনো নিতান্ত তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বলে, ‘দ্যাখেন, মইষ’।
শুক্রবারের বিকালে জানোয়ার দেখতে কত বিচিত্র রকম মানুষ এসেছে। চাঁদপুরের হাই ব্লাডপ্রেসারে কাতর ইনসান আলী, সিরাজগঞ্জের খোদাবক্স মৃধা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুরউদ্দিন, হবিগঞ্জের গোলবার হোসেন। সবাই চাকুরে, সবাই নিজের বাড়িতে থেকে চাকরি করেন -
জিরাফ দেখতে দেখতে নবুরউদ্দিন বিষ্ময়ে বলে ওঠে ‘রাতে এরা কি ঘুমায়?’ উট পাখির গোলাপি রান দেখে আমুরউদ্দিন মুর্চ্ছা যেতে চান, না জানি রোষ্ট হলে কত জনে এটা খেতে পারবে?
কাকাতুয়ার সাতরঙা ঝিলকানো সাদা পালক দেখে কিশোরগঞ্জের তারকেশ্বর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, বিষ্ফারিত চোখে শুধু পাখিটিকেই দেখতে থাকে একা একা, আর আমরা দেখি - দুটি হাত কপালে ঠেকিয়ে বিরবির করে কি যেন বলছে তারকেশ্বর। দেখে আমাদেরও একটুখানিক ভাব মতো হয়, আমরা তার চতুর্দিকে গোল করে দাঁড়াই।
একটু দূরে বাঘের খাঁচায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার লেজের চাবুকে মধ্যবিত্ত জনকজননীর শিশুকে ভয় পাওয়াচ্ছে।
তারকেশ্বরকে কেন্দ্র করে আগৈলঝারা হয়ে আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম তের রকমের তেরটা লোক। দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভাবলাম তুচ্ছ একট জীবনের মোটা চালের ভাতের ভেতর দিয়ে বড় হয়ে এসে হঠাৎ এই বিকেলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছি কেন?
তারকেশ্বরের বাঙালি নোনাধরা চোখ কাকাতুয়া দেখতে দেখতে উপচে পড়ছে। আমরা দেশলাই থেকে সিগারেট ধরাচ্ছি - সবার হাতেই দেশলাই, তেরটা ম্যাচ বাক্সের তেরটা কাঠি ঘষছি তের জন লোক - নিঃশব্দে ঠান্ডা ভাবে, যেনো ম্যাচের বারুদ নিবিড়তা ভেঙ্গে চিৎকার করে না ওঠে।



পুরুষ মানুষের বিভিন্ন রকম সাইজ

তার জুতার সাইজ ৫। মোজা ৯।
প্যান্ট ৩২। এন্ডি ৩৪।
বেল্ট দেড়। এক্সএল সার্ট।
গেঞ্জি ৩৪। লেন্স -১.৭৫।

জুতার রং কালো। মোজা ছাই লাল।
প্যান্ট ধুসর। অ্যান্ডি ডোরা কাটা।
বেল্ট কালচে খয়ের। সার্ট ফেডি পোড়ামাটি।
গেঞ্জি চাঁপা সাদা। চশমা পরীদের সোনালী।

জুতা ও বেল্ট পশুত্বকের। মোজা প্যান্ট
এন্ডি সার্ট ও গেঞ্জি বিভিন্ন ধরনের
কার্পাস তন্তুতে বোনা।
শুধু চশমাটি খনিজ ধাতুর।

মোজা বেল্ট এন্ডি সার্ট ও গেঞ্জি দেশে বানানো
জুতা প্যান্ট ও চশমা বিদেশে বানানো।

এই সমস্ত কিছু তার শরীরে সেলাই করে ও স্ক্রু বল্টু দিয়ে আটানো।

পুরুষ মানুষের কতো রকমের সাইজ।
যত সাইজ ততো মাত্রা।


আগুনের কি হবে

একদা যা ছিলো টানাটানি করা বিকেল
দিনের দু:সহ চাপে টলে উঠেছে তার নিকেল
দীর্ঘশ্বাসের ঘন্টা কি যে টলোমলো
আজ এই বিকেলের কি যে হলো

আমার সিল্কের ঘর ভরে গেলো গিজ গিজ করা অদ্ভুত ভিড়ে
কুৎসিত ছাপমারা হাড়গিলে বামন
হাসতে হাসতে বিঁধে নিচ্ছে নিজেদের মরমি তীরে
উদ্ভিদ বিষয়ক যতো বই, শৈশবের পেরেক,
আমার উভচর বৃষ্টি প্রপাত,
কাগজের ফাঁকে জমিয়ে রাখা নির্ঘুম রাত্রিদিন।
আমার গল্পের জুতা মোজা কঠিন জীবনের জয়গান।

আমার ময়দানের আলফা প্রক্সিমা আর আটপৌরে চাঁদ
সব নাকি কবেই নিলামে উঠেছে।
দেখি গোল হয়ে সেজেছে ঋণের মাকড়শা রানি
আমি যা ধরে আছি সব যেন ধরনীর সমর্থনহারা ফাঁদ
দেখি তাকিয়ে দেখি চোখ মেলে দেখি আর্তনাদ করে দেখি
লম্পটের চাঁদোয়া তলে আমি কি বিশুদ্ধ পাখি

সব টেনে নিচ্ছে সব হারিয়ে যাচ্ছে কতদিনের পাওনাদারের হাতে
যত করেছি দেরি মনমাতানো আলাপ ভালবাসার সাথে
একজন দরজি এগিয়ে এসে জানিয়ে গেল সবই বাকির খাতায়
সে বলল আরো
যে কোন সময় হঠাৎ ধরে নিতে পারো
আমি খুলে নেব তোমার ডান হাত
ওদের কথার বাতাসে আমি কাঁপি থরথর
তারপর কপালে ভাজপড়া সুপ্রাচীন কালো ইটের ব্যাপারি
কাছে এসে দাঁড়ালো
এলো মগজ ব্যবসায়ী। হৃদপিন্ড ভিখারি, চোখের খাতক
এলো তালাঅলা রাত্রির সুতার পথের মিস্ত্রী
ঋণ ঋণ ঋণ তুমি নিজেই আজ নিলামে উঠেছ
হিক হিক করে ওদের কন্ঠে শয়তান শাসাল
আমার জাল স্বাক্ষর ওদের হাতে, ওদের হাতে আমার টিপসহি

দেউলিয়া হবার আগে দেখি, ওরা
আমার হাত পা নখ লিঙ্গ চুল দাড়ি নাড়ি ও মগজ
সব খুলে খুলে পলিথিনে - চামিচে চামিচে তুলে নিল

জগতের অদ্ভুত অচেনা অজানা সেই সোনার মৌমাছি
হা হা করে উড়ে উড়ে চেঁচিয়ে চলেছে:
ধনতন্ত্রের ব্যাপকতর শীতল সংগ্রামে হায়, প্রকৃত আগুনের কি হবে?


শীতে পত্রমোচি কোনো এক গাছের উদ্দেশ্যে

আমাদের করুণাঘন শীতের কেমন মাথা ঘামছে আজ ঐ দেখো
কুয়াশায় ফর্সা হয়ে যাচ্ছে কপাল জামা কাপড়ের নিচে
ভিজে যাচ্ছে বুক পিঠ কুচকি ও রান
জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে তার ডিউটি শেষে ঘরে ফেরা গার্মেন্টসের ক্লান্ত মেয়েগুলিকে দেখে
গুড়িগুড়ি আবছা ভাবনা ঝাপসা বেদনারাশি খেলা করে উঠছে
মুখ থেকে বেরোনো হালকা কুয়াশার সাথে।

সব কিছুর মধ্যে ঝিনুকের অবতল ভাগের মতো ফকফকা শাদা এক উদ্দেশ্য রয়েছে
তাই পৃথিবীতে মানুষের চোখে শাদা শাদা ভাব ফুটে থাকে।

শক্তির ব্যবহার যেখানে বেশি সেখানেইতো পরস্পরকে হত্যার কথা মনে আসে
কিন' সব জ্বালানির মধ্যেই রয়েছে চরম ক্লান্তি
আর অজ্ঞতা দানা বেঁধে উঠলে বুদ্ধির ডালে বিষফল পেকে ওঠে।

খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হতে শেখো দেখবে আলো এসে তোমাকে খুঁজে নিচ্ছে
যখনই অন্ধকার হাতছানি দেয় নিজের কথা ভাব
রাতের আকাশের নিচে দাঁড়াও
দেখবে কিছু তারা মুহূর্তে মুহূর্তে রং বদলাচ্ছে
যে দাঁড়িয়ে গেছে তাকে জিজ্ঞেস করো না কিছু
নিজের কথা বলতে বলতেই সে আটকে গেছে।

তোমার জন্মই হয়েছে লক্ষ লক্ষ ব্যর্থতার মধ্যে।
তোমার চারিদিকে ঘাসের জন্য গাভীর ব্যর্থতা
ফুলের জন্য প্রজাপতির ব্যর্থতা
ভুগর্ভস্ত পানির জন্য গভীর নলকুপের ব্যর্থতা
ব্যর্থতা জ্বালানির জন্য যন্ত্রের, সুঁইয়ের জন্য সুতার,
রংয়ের জন্য কাপড়ের
দেহের জন্য আর্ট কলেজের ছাত্রদের আঁকা নির্ঘুম জলরংয়ের

যে সব ব্যর্থতার কথা বললাম তা বিশ্বাসে অকুন্ঠ থাকার জন্যই ঘটছে
বিশ্বাসের জন্য আছাড় খাচ্ছে যারা অবিরাম
বুঝে দেখো ওরাই তোমার বন্ধু
ওরা হলুদ পাতার মতো অকাতরে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে
দেশে দেশে নগরে মফস্বলে
শীতেই এসব টের পাই।

আজ পরম অযত্নের ভেতর শীত এসে আমাদের পায়ে পায়ে ঘুরছে
বনভূমি কই সখা, সন্ধ্যা হতেই টায়ার পুড়িয়ে শীত ফেরানোর চেষ্টা করছো
দিনের শরীরে খন্ড খন্ড অবসন্ন রাত, রাতের পেটের ভেতর কর্মহীন দিনের শুন্যতা
তুমি এসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে গেলে
ঝড় ও ভূমিকম্পের মুখোমুখি হবে
দেখবে রাস্তাঘাটে অসংখ্য লোক একটা অদৃশ্য কিছুকে ধরার চেষ্টা করছে
কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়।

বলার আগে একবার দম নাও
তাহলে নিজের ব্যর্থতাকে হলুদ পাতার মতো উড়িয়ে দেবার স্বস্তি পাবে
শুরু করার আগে যদি একবার ভাবো দেখবে একটি লোক
হাসপাতাল থেকে ভালো হয়ে বাড়ি ফিরছে
ভাবতে ভাবতে কল্পনার ষাঁড়ের কুঁজের মাংশ আর
কবুতরের জরায়ু দিয়ে বানানো চপ খেতে খেতে
ভাবনা উড়িয়ে দাও, দেখবে তোমার ভাবনা অকাতরে ফলে যাচ্ছে
তোমার আশে পাশে যারা আছে তারা প্রত্যেকেই খুব ভিতর থেকে আশাবাদী হতে চায়
কিন' ওরা বস'ত পক্ষে হতাশ, ওরা একটি দম ফেলতে চায় তোমার শিকড়ে
যেখানে মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাসের জন্ম, যেখানে বিধ্বস্ত হাহাকারের চাপ
সেই জায়গায় একটি টোকা দিতে চায়
যাতে তুমি কেঁপে ওঠো তুমি আর্তনাদ করে ওঠো ওদের বেঁচে থাকার
প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখে
ওরা চায় তোমার পায়ের শিকড়ের চারদিকে গোল একটি চলমান রেখা
ফুটে উঠুক যেখানে বিগত দিন থেকে আনা সমস্ত
গল্প গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে

ঝড়াও শীতের পত্রমোচি গাছ সমবেদনার পাতা
মৃত্যুর জন্মদিন পর্যন্ত যেন ধান ক্ষেতের দৃশ্য মনে থাকে
হাতল খুঁজতে খুঁজতে বন্ধ দরোজায় যেনো মাথা খুঁড়তে পারি
মাথা খুঁড়তে খুঁড়তে যেনো বন্ধ দরোজার হাত বেরিয়ে আসে।


চিরন্তন সরল রেখা

শরীরে বাকল পড়ে দাড়িয়ে রয়েছে একটি একাশিয়া
ছোট্ট সে একেবারে কিশোর পাতাগুলি ছাগল ছানার মতো লাফাচ্ছে
নিচে তার আলো করে দুটি ছোট্ট চকচকে পোকা

সমস্ত গাছপালা ঝুঁকে আছে আনন্দে কলিজা রঙের পাতায়
দখিনা বাতাসের ঘন ডাক, মাথা কাত করে মুসান্ডা
এলামন্ডার সাথে ফিসফিস করে হাসাহাসি করছে,
কানে হাওয়া লাগাচ্ছে ঘাসেরা, বিনোদনের, ব্যক্তিগত পাতায়
প্রতি পৃষ্ঠায় সমান বর্ণনা
প্রতিটা গাছই আজ একই সমাজের

পোকা দুটির একটি হলুদ কামিজ আর একটি কালো ট্রাউজার পড়েছে
ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা সরল রেখার জন্ম দিচ্ছে।
একটা চিরন্তন সরল রেখা।
পাশের পিপুল স্বাক্ষী, স্বাক্ষী গর্জন।

পশু পালনের দিন

আমারতো ছিলো না পাহাড়ে চড়ার বিদ্যা
তখন আমি নৌকা বাইতে পারতাম
নিজের জন্য একটি খাল খনন করতে করতে
দিন যেতো

আমি বৈঠা তুলে মাঝে মাঝে গান গাইতাম
কয়লা দিয়ে ভুতের ছবি এঁকে বশীকরণ চর্চা করতাম
রাতের বেলা পথে নামতাম পরির পাখা কুড়াতে।
একদিন আমি উটের পিঠে চড়তে শিখবো বলে ঠিক করি।

উটের জন্য চাই মরুভূমি যেমন গরুর গাড়ির জন্য হারিকেন।
পড়শির বাড়িতে নাই বাবলার গাছ।
হরিণ পালতে দেখি কেওড়া গাছের প্রয়োজন।
কুমিরের জন্য দরকার চোখের পানি।
তিলে ঘুঘুর জন্য এক বিঘা জংগল।
সাপের জন্য তীব্র যৌন ফুল।

ঘুঙুরে রোচেনা মন তবু বুক ভরা ছোট্ট একটা পা খুঁজি
কিছুতেই দেবে না জানি তবু তার আঙ্গুল কখানি খুলে নিতে
রহস্য থেকে নামি, পকেটে রেঞ্চ, হাতে সৌখিন আঙ্গুলদানি।

প্রান্তরের ডাকবাংলায় খুঁজি শিশিরের নিশিথ
হঠাৎ হঠাৎ পাহাড়ি বরফের ডাক, চিলের চিৎকার
কিন্তু কোথায় প্রকৃতির মুখ চেপে ধরার ক্লোরোফর্ম ভেজানো কাপড়
যাতে শে না চেঁচায়?
শক্ত পাকস্থলি কই যাতে পাথরের গিঁট আর ফুলের তীক্ষ্ণ কামড় হজম করতে পারে?

ক্ষুধার চেয়ে গোল, ক্রোধের চেয়েও আন্তরিক
আনন্দের চেয়েও স্বচ্ছ, ভিখারীনির চেয়েও কপালহারা
কি সে কল্পনা ঘোর গাঢ় জ্যামিতি?
জীবনের কালো উচ্চারণ নিহিত কোন প্রতিতূলনায়?

পাহাড় থেকে যা সহজ উঁচু পাহাড় থেকে তা সহজেই দেখা যায়।
আমি আজো পাহাড়ে চড়িনি
নৌকা বেয়ে বেয়ে
চলে যাই - যেখানে নৌকা নাই সেখানে।
যেখানে আমি নাই সেখানে গিয়ে ঘুরে আসি।


একদিন আনারস

নির্জন যায়গা দেখে আমি একদিন আনারস ক্ষেতে ঢুকে
চুপ করে একটা আনারস হয়ে গেলাম
অনেকগুলি চোখ দিয়ে এক সাথে অনেক কিছু দেখবো বলে।

অনেকগুলি বেদনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি অনেকগুলি সম্ভাবনা
দেখছি এগারোটার সূর্য একদিকে টগবগ করে ফুটছে
দেখছি একদিকে বাতাস বইছে ফুলের রেণু নিয়ে
একদিকে শালের অরণ্য। এক দিকে শব্দ। শো শো। কিসের যেন।
সাবলীল বেদনা যখন সৃষ্টিশীল হয়েছিল
নিশ্চয়ই অনেক কিছু মিলে এমন একটা
মহান একাকীতার জন্ম হয়েছিল
বহুদিকে তাকাতে তাকাতে আমি কেবল একের কথাই ভাবলাম।

মনে হয় আমার অনেকগুলি চোখ হলেও একটাই মাত্র চোখ
অনেকগুলি সংবেদন হলেও একটাই মাত্র অনুভব।

দেখি উপরের সাথে নিচের কোন মিল নেই।
কাছের সাথে দূরের কোনো তূলনা হয় না।
দিনের থেকে রাত পুরাটাই আলাদা।
অনেকগুলি চোখ দিয়ে আনারসের মত দেখলে
অনেক রকম ভাবনাকে রূপ নিতে দেখা যায়।
অনেক রকম দেখা যায়। অনেক কিছু দেখা যায়।


কুয়াকাটার সূর্যাস্ত কেন লাল হয়ে ওঠে

সাগর পাড়ে লোকটা করছে কি
তো দাউ দাউ করে জ্বলছে কেনবা পূবের পানি?
নারকেল বনে বাতাস নতুবা জেলেদের গানে
গলদা চিংড়ির রেণু ধরছে কে ঐ গগণে!

বালির উপর পা ছড়িয়ে বসেছে যে ভোরে
একনিষ্ঠ মেকানিক সে যেনরে
খুলছে বসে বসে ঢেউয়ের তরঙ্গে, বাবুইয়ের বাসা সে খুলছে
উড়ছে এঁকেবেঁকে সোনালি খড় কত রকমের
বুদ্ধের মন্দিরের সামনে বসে সোনার সুঁই তার আশা।

সিগাল চমকায়, রুদ্ধশ্বাসে দেখে
একে একে সুন্দরী কিশোরীর শরীর থেকে
লেহাঙ্গা ছুড়ে ফেলে সে যে
উরুসন্ধির হালকা রোমের উপর চুমু খেতে খেতে
অস্ত গেলো কি যে ভালোবেসে

কুয়াকাটা কি ভোর? কুয়াকাটা কি কালো?
পশ্চিম দিগন্তে লাল রক্ত ছিটিয়ে
একই ফ্রেমে যেন সূর্যাস্ত হলো!


রাধুনী রাধা

সকালে এসে দেখতাম তুমি রান্না করছ।
চুলার উপর কিছু একটা চড়ানো, আনন্দে তা ফুটছে।
পাশের ঘরে সেই ঘ্রাণ আমার বসার আয়ু বাড়িয়ে দিত।

আমাকে বসিয়ে রাখতে অপেক্ষার ঘরে
অনেকগুলি আমি বসে থাকতে থাকতে তাসের মতো এলোমেলো হয়ে যেতাম
কালো সাতের উপর লাল আট বসানোর ধৈর্যের খেলা খেলে
রহস্যময় থিমগুলি পাশাপাশি দাঁড় করাতাম, সাথে এসে মিশতো
ধুধুসর অতীত কাল কতক্ষণ এসেছি অথচ দেখা নেই
রঙিণ হৃদয়হীনতা কি যে করছ অত দূরে
ছাই দিয়ে মেঝেতে লিখছ বুঝি আমার নাম
পানির ধারার নিচে কার লাফানোর শব্দ
গোসল সেরে তুমি বাইরে এসে দাঁড়ালে কি
আমাকে ডাকলে নাকি বললে: এসে দেখ!

কমলা লেবু তুমি সারাসকাল কি নিজেকেই রেঁধেছ
আমার সামনে আসবে বলে?
প্লেটে করে নিয়ে এলে তোমার শাদা গোল চোখ দুটি!

কোন এক উনুনের শিখা এখনও ভাপ ছড়াচ্ছে গুনগুন করে
তোমার গালে ও কপালের লালে
আমি তোমার সামনে বসে
চুপচাপ সুঘ্রাণ নিতে গিয়ে
একটু একটু করে চোখ দুটির দিকে আগাচ্ছি।


উপমার জগৎ

সাবধান তোমরা কবিতা বাণী ঐশী মনে করো না
তাহলে পাঠকের গজব তোমাদের ওপর।
তোমার মাতৃভাষাতে সমগ্র জাতির বৈশিষ্ট নিহিত।
আমরা আবারো বলছি, অতীতের বহু কবি নিজেকে চেনাতে পারেনি
শুধু মাত্র ভাষাকে না বোঝার জন্য,
ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের হাহাকার
পুস্তক প্রকাশের দিকে নিজেকে ব্যস্ত রেখো না
আত্মপ্রকাশের পূর্বে বারবার ভাব নিজেকে।

নতুন বিষয় উদ্ভাবন করো পুরানো কোন বিষয় শরীরে অনুভব করে
দেখবে নতুন দাঁত পেয়ে ম্লান উপমা কেমন খলখল করে হেসে উঠেছে

যার সাথে অন্তরঙ্গতা হয়নি, অতঃপর সেই সব বিষয়
তোমার জন্য নিষিদ্ধ করা হলো
নিষিদ্ধ বস্তুকে মাত্র জ্ঞান দিয়েই উন্মোচন করা যায়
আর তখন তা হয়ে ওঠে রক্তের আলো।
যা রৌদ্র দগ্ধ দিন পেরিয়ে এসেছে অথচ ম্লান হয়নি, তার খোঁজ করো
যেমন কিছু কিছু উপমা - এ এক আশ্চর্য জগৎ - পৃথিবীর সব
বিজ্ঞানী বা রাজনীতিকও সারা জীবন একটা ভালো উপমার অন্বেষণ করে

কিন্তু কবিই প্রকৃত পক্ষে এর সৌন্দর্যে চিৎকার করে ওঠে
ভাল কবিতার প্রথম গুণ উন্মোচন।
ভাল কবিতার প্রথম লক্ষণ বিদ্রোহ।


স্মরণাঞ্জলী

সভ্যতা সৃজনে পশু পাখী গাছ জলাশয়
খনি অথবা মেঘের অবদান অনস্বীকার্য

সভ্যতা চেয়েছে বহু অন্ধকার বহু বহু ইচ্ছার মৃত্যু
যুদ্ধাস্ত্রের জন্য অনেক খনিজ
অনেক নদী হারিয়ে গেছে বাঁধ দেখে

যে পাতা ফলের দাবীতে হলুদ হয়েছে
তাপের ঢেউ দিতে গিয়ে নক্ষত্রের ওজন কমেছে যেখানে
বালিতে পরিনত হয়েছে যে সব বিব্রত পাথর
মানুষের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সমর্থনে

ওরা সবাই সভ্যতার শহীদ
হঠাৎ কোন কোন বিশেষ মুহূর্তে ওদের জন্য আমার বুক টনটন করে

আমার মাথা ভারী হয়ে নামে ওদের কথা ভেবে।


বিগত

আরে এটা কে? তোমার শিশুপুত্র বুঝি? তাহলে তো ওর
নতুন দিনের থুতনি নেড়ে
মোহনার কাছে বেড়ী বাঁধের উপর গজানো আকন্দ পাতার পাশে
দাঁড়ানোর একটু অনুভূতি নিতে হয়!

এসো এসো
ভালই হল
আমার সেই শেলাই করা চেরা যায়গাটা আজ ড্রেসিং করার দিন

দেখতে পাচ্ছি ও যেন নিজেই রহস্য খোলার রেঞ্চ
খরগোসের মতো নিখুঁত চোখ দুটিতে
নিমফুলের পিঙ্গল নীল দুফোঁটা মধূ বুঝি
হাসছে মৌরি ফুলের মত
ওর মুখে কি আমার তোমাকে ভালবাসার কোন চিহ্ণ আছে?

না না আমাকে দেখে তুমি এতোদিন পর কেঁপে উঠো না
সত্য বিনষ্টকারী শিশুটিকে আমি ভালো করে দেখি
যার জন্য তোমাকে আসতে হয় নীল পোকার ছদ্মবেশে
আমার ঘুমের ভিতর
অজানা সাঁকোর দিকে গেলেও
নিষিদ্ধ পারদঘন সোনালী বিহ্বল মদ আমার
আজ তুমি বিগত প্রাণ

তোমার মুখখানি যেন ভেজা ভেজা খুব কান্না পায় বুঝি?
বৈশাখের বিকাল ভরে ওঠে প্রাচীন চৈত্রের ধুলায়?

তুমি যা বলতে পারলে না, তা বলে দিল তোমার ছেলেটি
গালের ওপর দুষ্টুমির কাটা দাগে একটু হেসে উঠে!


কপালের চোখ

নগরীর প্রধান ফোয়ারায় একটি ব্যাঙ সোডিয়াম আলো দেখে
বলেছিল: দিনেও এমন আলো দেখি নাই ভাই
অন্য ব্যাঙটি আহলাদে ভাবে: তাইতো তাইতো তাই
এমন মহৎ কাজ যার মাথা থেকে এলো
চোখ কপালে তুলে তাকে সালাম জানাই

সেই থেকে ব্যাঙের দুচোখ কপালে। ফোয়ারা
দেখলেই বালকদের উচিৎ সেখানে ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া।


পানিদেশ ভ্রমন

হাইল হাওড় থেকে এক মুঠো পিট মাটি তুলে নেই হাতে
এরকমই পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে বরিশালে - সাতলা আর বাগদা নদীর কাছে
এমনই কালো মাটি - হালকা - যেন স্পর্শ সেই হাহাকার হাতের
যার ত্বক বাদামি হয়েও রোগা নীল
নক্ষত্রের বারান্দা রাতের বাড়ি আমি এখনো পার হতে পারি
অযুত চিন্তার নদী - যার নাম মধুমতি চন্দনা কুমার চিত্রা
আত্রাই গোপলা লংলা মনু ঘাঘর সন্ধ্যা
নোনা আর আধো স্বাদু পানিতে চোখ ধুয়ে দেখি
তুমি নীলিমার কেবিন সুদ্ধ চলেছো কোথাও

আকাশের নিচে তোমার মেঘলা সবুজ পেট - একটু উপরে লাল টিলা
নীল পুকুর
লজ্জাস্থান ঢাকা আম বাগানে কুহেলি অপরাহ্ণ
শর্ষের একটি ঝলক
সিসার নদীতে

তোমার পানি যে কতো রকম - কতো রকম
নদী হয়ে বয়ে চলেছো তুমি পানি পরি
আমি জানি - জানি - তবু ভেবে দেখি চেয়ে দেখি শুনি
সমুদ্রের পানি আর মোহনার পানি একই রকম প্রায়
রয়েছে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা, হাত পা দাঁত
ক্রোধের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে ভেঙ্গে ফেলে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে
তারপর ফিক করে হেসে ওঠে শে
আমার মত


দৃশ্যতত্ব

হাফপ্যান্টের একটি বালক ঢিল ছুঁড়ে দোকান পার হয়ে গেলে
রাস্তার মোড়ের সেই যুবকের মনে হয়েছিল
মুদি দোকানগুলো যেনো চুপচাপ শান্ত কিশোরী

কাপড় শুকাচ্ছে কে ওখানে উঠানের তারে - সেখানে
দুটি কাক স্তব্ধ হয়ে কেন যে মুখোমুখি
নইলে কি সম্পূর্ণ হত না এইদিন!
দৃশ্যটাকে পরিপূর্ণতার দিকে পাঠিয়ে দেবার জন্য
পাথর গড়িয়ে পড়েছিল যেন

প্যান্টের পকেট থেকে হাত টেনে বের করে
বাতাস কেটে কেটে জানালার পাকা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে
মনে হল এ শুধু স্মৃতি স্মৃতি
বহুযুগ আগে এরকম হয়েছিল তখন আমাদের খুব ছেলেবেলা
আবার বহুযুগ পরে হয়ত বা এরকম হবে
আজ এর কোন অর্থ কোথাও পাব না।


খোলামিল

দরোজাটা খুলছে আর লাগছে আর খুলছে বারবার
খুলতে পারার মধ্যে
বীজের সাথে গাছের
পুকুরের সাথে মাছের
তীরের সাথে হাঁসের
গাভির সাথে ঘাসের যেমন মিল
সেই রকম লাগাতে পারার মধ্যে
তোমার আমার মিল করে ঝিলমিল!


জীবনসড়ক থেকে কবিতারাস্তা
সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবে না

ছিলিমপুর থেকে জীবনসড়ক। তা থেকে একটা রাস্তা
কবিতার দিকে গেছে।
ভ্রমনের কালি থেকে রাস্তাটার জন্ম - পাড়াগাঁর রস
আর কোড়ালের গল্প শুনে শুনে
পুরানা গাছের ছায়া বড় হয়ে উঠেছে।

এই রাস্তার ওপর প্রথম দাঁড়িয়ে ছিল যে মানুষটা
আমি তারই কথা ভেবে খুব আপ্লুত হই
এর উত্তরদিকটা ছেলে দক্ষিণদিকটা মেয়ে
একটাদিক ছড়িয়ে গেছে শীতে
একটাদিক হারিয়ে গেছে বসন্তে

অতিপ্রাচীনতা থেকে আজকের দিনের দিকে আসতে গিয়ে
চলে এসেছি খুব সন্নিকটে
এসে দেখছি আমার ভিতরটা একেবারে শুকিয়ে গেছে ভয়ে
সামরিক তিষি ক্ষেতে আমরা
সূর্য উঠবে কিন্তু ভোর হবেনা

মানুষ কি এক জায়গায় দাড়িয়ে থাকবে?
পেন্সিলের দাগের মতো
বিস্মৃতির রবারের সামনে থরথর করে কাঁপবে?


জাফলং বিষয়ে একটা কবিতা কিভাবে লেখা যায়

জাফলং যেতে পাথরটিলা বাজারের কাছে গাড়ি থামাতে হল।
তাকিয়ে দেখি দূরে দুটি টিলার মধ্যে মাকড়শার আঁশের
একটি ঝুলন্ত হাসি-খুশী ব্রীজ। ব্যাঙের ছাতার মত
মাটির টিলার গায়ে শিশুদের ছোট ছোট ঘরবাড়ি।
পুরানো টাইপড়া সাহেবমত লোকটা
ট্রাক থেকে নামল।
আবার চরাই উৎরাই, স্থানীয় নিসর্গ ও তাতে সম্পাদনার ছাপ।

সকালেই পাখিগুলি ডাকছে।
খুব নামকরা এই জায়গাটা নিয়ে লেখা পাহাড়ে ঘর বাঁধবার মতই।
যে কোন ঘরই শিশুদের ঘর হয়ে যায়।
বিশালতা নয়, গভীরতা দিয়েই নিসর্গ জেগে ওঠে।

জাফলং এর কাছাকাছি হাফলং কোথায় পালিয়ে আছে?
একটা জায়গার মতো আরেকটা কি দেখা যায়?
প্রকৃতি কি দ্বৈত সত্তার পক্ষে?

একটা মানুষের মত আরেকটা মানুষ কোথায়?
একটা কবিতার মত আরেকটা কবিতা?

শীতকালীন জাফলং বিষয়ে লিখতে গেলে দুটি কবিতা লিখতে হবে
শীতকাল ও জাফলং। তারপর লিখে কেউ যদি মনে করে আমি একটি লিখবো
তখন দুটির কিছু কিছু লাইন বাদ দিতে হবে কাঠুরের মতো।
মাঝারী আকারের একটা ক্ষেত দাঁড়িয়ে গেলে যদি মনে হয় এটা ফসলের তুলনায় ছোট হয়ে
গেছে তাহলে শেষ কয়েকটা লাইনের আগে ঢুকাতে হবে এমন কিছু শাকসব্জী
যাতে পাঁচশ বছর আগেকার জাফলংকে এক ঝলক বোঝা যায়।
যদি আকারে বড় হয়ে গেছে বলে মনে হয় তবে কবিতার দশ থেকে তিরিশতম পংক্তির
সব কিছুকে সাজিয়ে নিতে হবে এমন করে যাতে বেশি কথা না বলে।

কবিতার ছন্দ হবে খাসিয়া ছন্দ অর্থাৎ যে ছন্দ
গড়াগড়ি খাওয়া কমলা এবং নদীর বুক ভর্তি
পাথরের রূপ ভেদ করবে।


----------------------------
স্বত্ব: ঋণা শাহনেওয়াজ
প্রচ্ছদ: শিবনাথ বিশ্বাস
প্রকাশকাল: ফাল্গুন ৮, ১৩৯৮, ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৯২


বিকল্প কবিতা প্রকাশনী
৯, ফ্রীস্কুল ষ্ট্রীট, ঢাকা-১২০৫
মূল্য: বার টাকা
----------------------------

আমার শ্বাসমূল

কাজল শাহনেওয়াজ


দুইটা প্রাচীন গাছ ও একটা দাদাকাছিম
........................
ঐ গ্রামে প্রাচীন দুইটা অক্ষয়গাছ আছে।
সেই গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে নিতে
বহু বছরের পূরানো একটা কাছিম
আকাশের দিকে তাকায়ে তাকায়ে গাছ দুইটারে নিয়া অনেক ভাবিছে:
কিভাবে এতোদিন ধরে বাঁচি আছে এরা?
চারিদিকে এতো ছোট গাছের মধ্যে?

একশ বছর, দুইশ বচ্ছর? কে জানে কতদিন?

গ্রামের লোকেদের মধ্যে সবচে শাদা চুল যাদের তারা বলে:
আমরাই তো বাঁচায়ে রাখছি গাছ দুইটারে
নাহলে ধরেন যখন লোকজন কুড়াল নিয়ে আসছিল,
আমরা কি তাদের ফিরাই নাই?

ভাবতে ভাবতে শ খানেক বছর কাটি গেছে মহাপিতামহ গজকচ্ছপের,
কিন্তু এখনো তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেন নাই,
গাছকে কে বাঁচায়ে রাখে - মাটি আর আকাশ?
কচ্ছপকে কে বাঁচায়? পানি আর শ্যাওলা?
তা হলে মানুষের এই কথার মানে কি?

ঐ গ্রামে মাঝে মাঝে আমি যাই,
ঘুরে ফিরে গাছ দুইটাকে সালাম জানায়ে আসি,
দিঘিটার পানিতে নেমে কাছিমদাদাকে কদমবুচি করি

ওঁরা আশির্বাদ করে: বেঁচে থাকো।

অতোদিনতো অসম্ভব,
আমার যে আর একটা দিনও বাঁচতে ইচ্ছা করেনা।


কবিতার জন্য
..........
নতুন কবিতার জন্য নিজেকে বদলায়ে বদলায়ে চলি
বহুদিন থাকি পাউরুটি খাই
কাঁটা চামচ পকেটে ঢুকাই
লাইবেরিয়া না গিয়া লাইব্রেরীতে ঘুমাই।

হো হো হো হা হা
কবিতাযে কতো রকম দেখি তাকাইয়া
দিনে দিনে কতোবার পাল্টায় কবিতার রকম সকম!

মানুষ বদলায়, কবিতাযে বদলায় আরো বেশি
মানুষ মরে, কবিতা হয় এলোকেশি।

নতুন কবিতার জন্য নিজের কান নিজেই পরিষ্কার রাখি,
পরিষ্কার করি নাক, জিহবা
লালন ফকির গেয়ে এক কলি পরীক্ষা করি ঠিক শুনতে পাচ্ছি কিনা,
একটা কামড় দেই অর্জুনের ছালে।

একটা কামড় বাংলাভাষার একহাজার বছরে,
চর্যায় এক কামড়, মঙ্গল কাব্যে একটা
পুঁথির আনন্দে কাটাই কিছুকাল
কিছুকাল উপনিবেশের ঝাপটা

ধান চাষের তিন হাজার বছর
শুঁকতে শুঁকতে আমার নাক হয়ে যায় বুনো শুয়োরের
সৌর বছরগুলি ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে বাংলা বছর হয়ে যায়

রসের ইক্ষুদন্ড চিবাইলে জিহবার আর কোনো সমস্যা থাকে না!
কবিতার জন্য জিহবা পরিষ্কার করার কায়দাটাও
নতুন শিখছি ভারতচন্দ্রের কাছে
আর কে না জানে,
হরেক রকম কবিতার জন্য নতুন স্বাদ অতি প্রয়োজন!


তাকায়ে আছে
........
ঐ দেখো কাজের খোঁজে আসা মানুষেরা বসে আছে

ওদের কারো হাতে টুকরি ও কোদাল, কারো হাতে কর্ণি,
কিন্তু যার হাতিয়ার নাই সে নিজের হাত সামনে সাজিয়ে বসে আছে

রাস্তারার পাশে কাজের খোঁজে আসা কোদাল তাকিয়ে আছে টুকরির দিকে,
দা কাঁচির দিকে,
করাত বাটালির দিকে,
কর্ণি তাকিয়ে আছে যোগালির তাওয়ার দিকে
সবাই থাকতে থাকতে অসহ্য হয়ে গেছে
কাজের লোক এভাবে বইসা থাকতে কি আর পোষায়!

মধ্য প্রহরের সূর্য তাতায়ে উঠছে নাকি?
কেউ তাকায়ে দেখছেনা

হালায় একটা রাম টুকরি : হাতের কোদাল কয়
হালায় ভোদাই করাত : বাটালি টাটায়
হউরের পো’র বিচি নাই : যোগালি চেঁচায়

কাজের সন্ধানে আসা মানুষগুলি
কোদাল, করাত, কর্ণি, টুকরি লইয়া বসা
কেউ তাকাইয়া দেখে না


এই শরতে আমাদের নামাবাজার
...................
দু কদম গেলেই ট্রাকদের অফিস, একটা ছোট বট,
হুরহুর করে মানুষ আসা যাওয়া করছে

নামাবাজার পোকায় খাওয়া একটা হলুদ ফল
বাজার করে ভুখানাঙ্গা গরীব করণিক, টেম্পু, হলার, বেরী বাঁধ
নাস্তা খাওয়া ১২ নম্বর বাস

সবাই যখন ভোরের আজান ফাঁকি দিয়ে গভীর ঘুমে
নামাবাজার তখন জেগে ওঠে,
ভাদ্র মাসের তালের দোকানী ভোর না হতেই দুয়ারখোলে
স্বপ্ন দেখে পথের ব্যাপারী বাকী খাতায় সস্তা দেবে কে

দোকানগুলি পুরানদিনের ছোট্টছোট্ট টিনের হিন্দিছবি
সারা দিনের বাছাই করা স্বপ্ন ধার করে ঘরে ফেরার সময়
কাল্পনিক সুপার মলে রিজেক্ট ষ্টোরে ফ্যাশন হাতরায় খুচরা কাস্টোমার
সোনার কাচে রূপার ফিতা পঞ্জের হাইহিল, হাতে ধরে ছোট্ট বোনটাকে
দুচোখভরে রাপাপ্লাজার আধপাকা পেলাস্টিকের সখে
রাজ্যহারা স্বপ্ন থেকে ব্যস্ত হয়ে
ভাতের হোটেল পার হয়ে যায় ছিড়া ছাতির ঘর
সারি বাধা লুঙি সেলাই মেসিনে এখন ব্লাউজের মাপ

হঠাৎ ফুলকি এসে পড়ে কামারখানা থেকে উড়ে আসা আরিচার খিদার আগুনে
আলু ভর্তা ঢেঢ়শ ভাজি চিচিংগার ঝোল
কুঁচা চিংড়ি পুঁই শাক ডিম ভুনা জাটকা ইলিশের পেটি
আল্লাগো তোমার পেটে এতো খিদা, বানাইছো কত খাদ্যখাবার
গরুর ভুনা চাপিলার চচ্চরি পাঙ্গাসের বিরান
তোমার হাত কত মিঠা, বাবুর্চি তুমি এক পালোয়ান
তোমার ইশারায় কাচকির তরকারী কি সুন্দর ডাক দিয়া যায়
তোমার চোখ কত না সুন্দর,
কি সুন্দর তোমার দাঁতফুল
তোমার চুল মেঘের কাশফুল
সামান্য প্লাস্টিক তোমার হাতে পড়ে হয় যে নাক ফুল
তোমার জুলুসে পচা মাটি বানায় কাঁঠাল
তোমার জ্বসনে চাঙারি ভরা ভাঙা কাঁচ ফ্যাক্টরী আলো করে
তোমার আদরের ছোঁয়ায় মিষ্টি হয় কাউফল

সবই ঠিক আছে, যেখানে যা যা তুমি দিয়াছো নিজ হাতে
তবে কেন তুমি বানাইলে এ শহরে আমাদের জন্য নামাবাজার?
দুনিয়ার যত রং দেখি চোখে নিত্য পথে যাতায়াতে
আমাদের ফলপাকুর, মাছগোস, তরিতরকারী, পোলাপানের ভিডিও গেমে
পাই না তাতো
তোমার সবই তো সুন্দর, কিন্তু হাত দুইটা কেনো এতো ছোটো?


মাডস্কিপার
.......
কাদামাখা মাডটাকি তুমি কি জোয়ারের না ভাটার দলের?
কোটি কোটি বছর ধরে আন্ধারমানিক নদীতে তুমি কি আওয়ামি লীগ না বিএনপি করেছো
আমাকে বলবে কি?

তখন আমাকে একটা আশ্চর্য ঘটনা দেখালো:
আমি দেখলাম প্রতিটা মানুষই এক একটা মাডটাকি
আবার বললো, এবার দেখো:
দেখলাম আমাদের মানুষেরা না না প্রকার পশুপাখিদের মতো

মাডটাকির কাছে মানুষ কি ভিন গ্রহের প্রাণি
তারা কাদার বদলে কাপড় পড়ে থাকে
কোথাও যেতে লাগে ট্রেন বা উড়োজাহাজ

আমরা নিজেরাই আমাদের ভুলছি
তারপরও স্বীকার করি, সকল মাড চায় মানুষের মতো দুটি হাত
কানকো দিয়ে হাটতে চায় না কাদায় কাদায়
মাডস্কিপারীনি নাচতে চায়

তোমরা ভাই আমাদের ডাকো
আমাদের সাথে নাও
মাছকে ডাকো, কুমিরকে ডাকো, ডলফিনকে ডাকো
গ্রামের মানুষদের সাথে নাও

কুকুরকে যেমন পুলিস বাহিনীতে নিয়েছো
বানরকে নিয়েছো কেবল টিভিতে
তোমাদের জন্মদিনে যেমন রয়েছে
স্টারফিসের ভাগ
তোমাদের অংক করছে হাতি
টিকটিকি দিচ্ছে একলা দিনের সংগ
বক হচ্ছে ভাষা বিজ্ঞানী
টিয়া ইংরাজির শিক্ষক
তেমনি আমাদের মতো সাধারনকে দলে নাও
তোমাদের দলে

বকবক করা মাড রাজকুমার
হঠাৎ জোয়ারের আগে থামে

আমরা স্বপ্নের ভিতর থেকে বের হয়ে আসি
মাড টাকি ওখানেই ঘুরঘুর করে


আমাদের রউফ
...........
আমরা ধাঙ্গর বস্তিতে যেতাম শুধু মাত্র চোলাই চাখতেই নয়, কিঞ্চিত পানোন্মত্ততায় যার যা প্রাপ্য তা অকাতরে বিলিয়ে দেবার জন্যেও বটে: যে অর্জন করেছে ইতোমধ্যে তরুণ হৃদয়ের ভালোবাসা অর্থাৎ সংবেদনা ও শ্রদ্ধা যার রয়েছে আর কিছুটা স্বপ্নছুট তরমুজ লাল হয়েছে তারায় তারায় আমরা তাকে মাথায় নিয়ে ধেই ধেই করে নাচতাম যেন ওই ধাঙ্গর এখনো টিকে থাকা আমাদের প্র-প্র-প্র-পিতামহ

তখন রউফ আমাদের দলে সহজেই মিশে গেল : সেদিন পার্টির সদ্য লাল গ্লামারের সদস্যপদ মোড়ানো প্রাপ্তির আনন্দে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছিল ও

কেন মানুষ হেরে যায়?
হাসতে হাসতে এ ধরনের প্রশ্ন ও সহজেই করতো

কিন্তু ও ছিল নির্বিকার
তিরাশীর পহেলা বৈশাখের তপ্ত বেলা এগারোটায় যখন আমরা চুলা থেকে সদ্য নামানো উষ্ম দোচোয়ানি মগকে মগকে হল্লা করে করে গিলছিলাম তখন রউফ এক ফাজিল নেতার মতো উসকে দিচ্ছিল আমাদের প্রেম ও ক্রোধের বিষয়গুলি, আমরা আল মাহমুদ আর শহীদ কাদরীকে তাদের প্রাণনিষ্ঠা আর গ্রাম ও নগর বেদএর জন্য আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠষাঁড়ের কুঁজে একটু হাত বোলাতে দিচ্ছিলাম আর আমরা পায়ের কাছ থেকে শুয়োরের বিষ্ঠা মাখান আঠাল মাটি তুলে লেপে দিচ্ছিলাম তাদের নাম ফলকে যারা প্রথম পুস্তকের সাথেই আমাদের প্রতারিত করেছে

আর আমাদের মনে হয়েছিল : কেন মানুষ হেরে যায়?
হাসতে হাসতে এ ধরনের প্রশ্ন ও সহজেই করত

আমরা সেরকম নেতাদের পাছায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁসের স্প্রিং-লিঙ্গ ঢোকাচ্ছিলাম, সেরকম সমরনায়কদের ঘিলু বের করে চুবিয়ে রাখছিলাম পোড়া মবিলের মধ্যে যাতে তা কিছুটা হলেও চালু হয়; আমরা সেরকম হতভাগ্য সরকারগুলিকে অভিষাপ দিচ্ছিলাম আর হাতের কাছে যে ঝাঁটাগুলি পড়েছিল দুহাতে শক্ত করে ধরে ইতিহাস থেকে বিদায় দিচ্ছিলাম তাদের ঝেঁটিয়ে

আমাদের উসকে দিচ্ছিলো রউফ, যে ওর মায়ের সম্মানে ছিলো বদ্ধপরিকর

আমরা সবাই ক্রোধে অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম; একে একে ধাঙ্গর পল্লীর সকল মহিলাকে মা বলে ডাকছিলাম, নাকি আমরা কেবলই এই মহিলাদের অপমান করছিলাম পহেলা বৈশাখের বাংলা গেরূয়া শাড়িকে? ওরা যে পড়েছে ভাটিখানার গরম চোলাই সে কথা না ভেবে রিফাত এক মহিলাকে ভগ্নিজ্ঞানে দ্রবীভূত হতে গিয়ে দ্রুত-চুম্বন চেয়েছিল বলে হঠাৎ পুরো ধাঙড় পাড়া ক্ষেপে গেল,
বুড়োরা হলুদ চোখ তুলে যুবকদের বললো : ওদের বলি দে!

বৈশাখ দুপুরের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলাম এইভাবে।
একপ্রকার শান্তি প্রক্রিয়ায় দেখলাম,
কবিকে চুম্বন প্রস্তাব করতে নাই, করা ঠিক না,
বিশেষত নিরাপত্তা নিরাপদ নয় যখন -


রঙের সন্তান
........
কোন স্বপ্ন সত্যি দেখি নাই রূপায়িত হতে
কি ভাবে বলবো যে তুই আমারই রঙের সন্তান

এই ভালো
তোর জন্মদাতা : হাওয়া
হাওয়া-ই তোকে মানুষ করবে

চল বাছা তোকে তোর প্রকৃত বংশ চেনাই :

এই যে বনস্পতি, এ তোর পিতা
এই যে মাটি, ইনি হলেন মাতা
আর তুই ঘাসফুল

সূর্যের দুধ খেয়েছিলি বলে
তুই চঞ্চল

নদীতে ঘুমিয়ে ছিলি
তাইতো একটু একটু করে মনে তোর বড়ো হবার ঢেউ জাগছে

আমার হাতে মিথ্যার দুধ
আর বিষের কলম
তুই তাকিয়ে থাকলে
পুড়ে যাবি
তাই লিখবো না তোকে।


চন্দ্রবিন্দু ও শ এর কবিতা
................
পটিয়া বাজারে সারি সারি পাঁঠা বাঁধা, আজ পাঁঠা বাজার, শুক্রবার, ২১ শে শ্রাবণ, ১৪০১ শাল, মহাশড়কের দুপাশে দলে দলে হো চি মিনের শশ্রুমণ্ডিত চিবুক, টান টান শিরদাঁড়া, গর্বে খানিক পরপর কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে কচি পাঁঠাগুলি

স্বত:স্ফুর্ত পাঁঠা গন্ধ মসৃন বিচিগুলি ঢেকে রেখেছে হালকাভাবে তবুও চোখ চলে যায় বারবার। পাঁঠার তো ওটাই গর্ব।
নিম পুরুষের হাত বারবার পকেটে যাচ্ছে আর ইর্ষায় পতপত করছে ওদের পতাকা।

বান্দরবানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেরাবার সময় পাঁঠার তাকদ চাই
যেন পাহাড়ে চড়তে পারি, নামতে পারি পাহাড় থেকে।


কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোটগ্রহে

কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোটগ্রহে
কেন যে দেখতে হয়
মানুষের চোয়ালে রূপার লাগাম তাতে অফুরন্ত হাসি হাসি ভাব

বাকপটুতার অনাবিল যত্ন সাজ

কেন যে আজ সংখ্যালঘুরাই আন্তর্জাতিক।


শামুক মা
........
শামুক মা শামুক মা আমি যে তোর মুক ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকিস না
তোর সোয়েটার বোনার কাঁটা আমার চোখে ঢুকে রয়েছে
আজ আমি যে কিছুই দেখিনা।

কেঁচো মা কেঁচো মা স্বপ্ন কী তোর আজ
আজান শুনে তাকাস, আমি তো আর বিশ্বাসীটি নইরে পাগলি

ঘড়ির গোল মুখটা নাই আর যে তোকে দেখবো
আমার বোতামও আর ছিঁড়ে না, তোর ঐ সুঁই লাগবে কিসে?

আমি বাদুড় পুষি তার খাঁচা নাই কোন
বধির মন্ত্রে প্রহর কাটাই আটটাই
তুমি যাতে লজ্জা না পাও আমি আশ্রয় হারালে

মা তুমি দেখে নিও, ঠিকই খুঁজে পাবো আমি বিচার বসার আগে তোমার চরণ

তোর ছেলে যে ফোঁপায় ভোররাত্রি দিনের ভয়ে
আমার কালো ডেরায় ও মা তুই কই তোকে যে দেখতে পাই না।


সঙ্গীত পরিবারে সতীদাহ
..............
উচ্চারণে ত্রুটি ছিল, তবু শে গেয়েছিল ঠিক রবীন্দ্রনাথ।

পা টেনে টেনে ক্লান্ত সারাদিন শেষে
সামনে একটা শুকনা দেহের নদী
তারপর ইতিহাসের সর্বশেষ সতীদাহ মাঠ।
কলকাতায় ব্রিটিশদের আইন লেখা হলেও
গণ্ডগ্রামে খবর পৌঁছায় নাই বলে
দাউ দাউ করে চিতায় পুড়েছিল শে
জীবন্ত, শ দুয়েক বছর আগে।

নরসুন্দার পাড়ে বহু পুরানো গ্রাম
জংলা টংলা সরিয়ে এখনো ভ্যাপসা নৈ:শব্দে
কয়েক ঘরের লোকালয়
কেবলই বলে না না না না না।

পড়ো পড়ো বাড়ি, জাম্বুরা গাছ অবনত টকফলে
নিয়তির অনুরোধে দীঘি আজ মজা বিষপুকুর
বড় ভিটায় ছোট ছোট ঘর
দিনের বেলায়ই রাত দেখে যারা রোজ
মস্ত উঠান, লম্বা অন্ধকার
একটা বালিকা ঝাঁটায় রৌদ্র তুলে
এই বাড়িটার অসুখ সারাতে রত।

আমরা কোন খবর দিয়ে আসি নাই
তবু কাকাবাবু তার হুকাটা নামায়ে
কিছুক্ষণ বসে থাকেন, উঠানটার দিকে তাকায়ে বলেন :
গান শুনতে এসেছেন... মজা পুকুরে মাকড়শার বুদবুদি...
গান তো সব আপনাদের ঘরে... এ বাড়িতে গৌরিকে উঠান ঝাঁট দিতে হয়
... খোলের কিরন চটা, তাছাড়া হাঁপানি হার্মনিয়ামের...
বলে আবার জাম্বুরা গাছের দিকে তাকান।

কফিল যখন চর্যাপদে সুর বসায়ে গাইল,
মনে হল ও কেন আজ যুদ্ধ ডেকে আনছে?
গৌরি তখনো ব্যস্ত, অস্থির হাতে চা বানায়...
আর সেই ফাঁকে লুঙ্গি পড়া পাশের বাড়ির ছেলেটা গাইছিল
ঠিক যেমন করে গায় আর সকলে
অতুল রজনী কাজী নজরুল।

অবশেষে গৌরি গাইতে এল
খালি-পায়ে-হাটতে-হাটতে-ছড়িয়ে-যাওয়া পা দুটা
কোন রকম লুকিয়ে রেখে বসে
হার্মনিয়ামে শ্যামলা হাওয়া দিল।

উচ্চারণে ত্রুটি ছিল কিন্তু শে গাইল ঠিক-রবীন্দ্রনাথই
বর্ষাদিনে বিকালবেলা সংখ্যালঘু পরিবারের ক্ষয়ে যাওয়া মেয়ে
সোপেনহাওয়ার টোনে গাইলো শ্যামা নাট্টের সেই দুখানা গান...।

ফেরার সময় তখন প্রায় সন্ধ্যা
ঘন্টা বাজো বাজো। গৌরি বিদায় দেবে
আমাদের এক প্রবীণ কবি বললো:
তোমার সবই তো ভাল শুধু উচ্চারণটা ঠিক করা চাই।

অপমানটা ভাসল ওর চোখে
শক্ত হাতে বিদায় ভা-ররী হয়
কবি তো কী হয়েছে, এক্কেবারে মাথা কেটে নেবে?
থামরে কুলাঙ্গার, এক্ষুণি তুই আত্মহত্যা কর!
আমরা দাঁড়ায়ে যাই।
দাঁড়াও গৌড়ি! তোমাকে অপমানের ফল
ভুলের কবি চিত্ত থেকে কেমন করে প্রায়শ্চিত্ত করে, দেখো!

ঠিক হলো কেদো পুকুর পাড়ে ইঁটের উপর মাথা রাখবে বৃদ্ধ কবি
আমাদেরই কেউ আরেকটা ইটে যতক্ষণে পারে
গুড়াগুড়া করে উড়িয়ে দেবে ওর নিরেট মাথাটা।

গৌরি তখন বলে:
চাইনা যে একা যেতে দিতে কবিকে কোথাও, অপমানে
সাজাও চিতা, সাথে যাবো আমি!

ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক, অগাষ্টের প্রথম সপ্তাহে, ১৯৯৬ শালে
কিশোরগঞ্জের সাকিন করিমগঞ্জ।


কেওড়া গাছের বাড়ি
............
নোনা বাদাবন সৃজনে
মা বাবাদের রেখে ফরেস্টবিটে
নেচে নেচে তারা বেরোয়ে পড়েছে সুন্দরবন থেকে
ওরা কী নিৎসের মর্মবাণী নিজ কানে শোনে নাই?

নুনের পানিতে পলির ছড়াছড়ি
এখানে অতিকায় সবুজ পনিরে
কেওড়া গাছের বাড়ি
শাবাজপুর মোহনায়
নোনাগন্ধ তার শীতের পাখিরা টের পায়

ভোলা থেকে বাংলাবাজার, তারপর খায়েরহাট, বোরহানুদ্দি, উদয়পুর,
কুঞ্জেরহাট, ডাওরি, লালমোহন, কর্তারহাট, চরফ্যাসন

সব শেষে চর শশীভূষন
মোটরের শেষ চাকা লেতরা ঘাটে
আকাশ হাটুর কাছে আসতে শুরু করেছে
হাসির শব্দ মুছে গেছে বদন থেকে
কপাল থেকে চন্দ্রবিন্দু গড়াতে শুরু করেছে
হাত ভরা বেরী বাঁধ
অনন্ত সমুদ্রের বিপদে বুক গুরু গুরু
ঐ যে বিন্দু বিন্দু দ্বীপ দেখা যায়।

পড়ে ছিল বুঝি এলোচুল
কচ্ছপিয়াঘাটে বাংলা আকাশ
চওড়া কাকড়ার ডাকে
গলা ধরে অচেনা দুয়েন্দে
বুক ঝালে বসে থাকি
প্লেটে নিয়ে চুলেরডাটি ঝোল।

শ্যালো নৌকায় ছাতি ধরে কোথায় হে মন মাঝিরা
আমায় নিয়ে চল্লে কোন টেম্পোতে
টুস্ট্রোক শব্দে যে কিছু বোঝার উপায় নাই।

বনেরও লম্বা হাতছানি
সন্ধ্যায় বাচ্চা বাচ্চা দ্বীপের চি চি চেঁচামেচি কান্না
বড় দ্বীপগুলি কতদূরে
কার কোলে উরুখোলে গাঙুরি গুঙুরি
ঐ যে কারা যায়, ওটা সমুদ্র পরীর ঝাঁক না?

পকেটেতো ছিল মন চিনি, তাই এখানেতে আজ দিনমনি
পথ থেকে তুলে নিল পিছুটান
কপালেতে বিষ তিল তিষি নাই, চোখে নাই আর কোন উদ্বেগ
ইঞ্জিনের মনটা কি ফুরফুরে, নিৎসের নাই কোন ডালভাত।

হাবাগঙ্গারাম চর কুকরি
দিনভোর ডাক দেয় চিলদের
মহিষের সৎ বোন দুধ দেয়
পনিরের হাঁক ডাক তাই তোলে গোয়ালে
গতকাল যারা ছিল উজানে
আজ তারা ঝিঁকিমিকি তারাদের হাত পা রাত জেগে গুনেগুনে ক্লান্ত।

গোলপাতা গোল নয়, চ্যাপটাও নয়
দূর থেকে মনে হয় চিনি উহারে
বাদা বনে ছৈলা দাঁত তার সবজে
সে নাকি বুদ্ধের নাম শোনে নাই।

ছোট চর কুকরি মুকরি
জেগে উঠে চোখ মেলে ছয় ঘন্টা পর পর
ভাটা রেখে যায় পলি মাটি,
বাড়ছে বাংলার পরিসীমানা।

প্রথমে ধানশী, হারগোজা তারপর
পাখিরা বেড়ায় সকালে আর বিকালে
মাছেরা দেখেনা কি করে তার জেলে
খুব ভোর যদিও, কুয়াশা কার্তিকেয়
ঘুমন্ত বনের মন্দ ফাঁকে
হাঁসেরা ডাকছে কিয়ের্কেগার্দ কিয়ের্কেগার্দ।

কুয়াশাটা নুন ছিল না কিন্তু খালটা ভরা নুন
ফর্সা হতে দেখা গেল সবুজ আগুন
ছৈলাগাছের গোল মনোরম ফল গো
উদবিড়ালের সাঁতার দেখে শ্বাসমূল তার জাগলো।

খালের ঢালু পাড় না তো জীবনানন্দের বাড়ি
তোমাকে কী দরকার আজ জাঁ পল সার্ত্র।

নোনা আশ্বিনের ম্যানগ্রোভ আজ
মুচমুচে আর সকালবেলাডা ঝিকিমিকি
কুকড়ির ভোর ভাইয়া তুমি একাকীকির কিকি কিকি
আজ তা হলে চল যে চই নীল চখাদের চুচকি হাচাই
আয়তনে বাড়বো আর কান চিচুরাই আশনাই।

আমার বর্ষাকাল - কবিতাগুচ্ছ

কাজল শাহনেওয়াজ


আমাকে তছনছ করে
.............
আমাকে তছনছ করে দিলে, আমাকে থমকে দিলে আজ
মাত্র দশ মিনিটের দর্শন আমার সারাটা দিনকে পথে বসিয়ে দিল
উত্তর থেকে দক্ষিণে বাসে চরলাম,
পূর্ব থেকে পশ্চিমে রিকসায় চরলাম, হাওয়ার উড়িয়ে দিলাম হাতপাখা
মনে হচ্ছে আমার দেহের ভিতরে এই গ্রীষ্মের তপ্ত হাওয়া ঢুকে পড়েছে।
দোকানের ছোট ছোট জেনারেটরগুলি আমার ভিতরে চলতে শুরু করেছে
ঢাকা থেকে আমি চলে গেছি সিচুয়ানের ভূমিকম্পে
ছোট ছোট শহরগুলি দেবে যাচ্ছে

সকাল না হতেই
..........
সকাল না হতেই, জ্যৈষ্ঠ মাসের পাখিরা ডাকছে ‘থ্যাঙ্কিয়্যু’
ঢাকার পাখিরা শিখলো করে ইংরেজী
পাখিগুলি সব ভদ্রপাখি
যদিও কাকেরা ডাকছে হায় হায়
যেনবা ওরা খবর পেয়েছে
মিয়ানমারে চিনে মানুষের খুব দিন অসহায় সাইক্লোন আর ভূমিকম্প

তুমি কি বিশ্বাস করো, পাখিরা মানুষের মনের কথা বোঝে?
নইলে কেনো সে বলছে থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ,
তোমাকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ তোমাকে
আমাকে তুমি দিয়েছো যে তোমার অমূল্য মন
যার তুলনা নই এ পৃথিবীতে
দেখো কিযে শিউরে উঠছে আমার ত্বক
শুধু ভাবতেই তোমার প্রসঙ্গ এই বেলা।
আজকাল প্রায়ই প্রত্যুষে

আজকাল প্রায়ই প্রত্যুষে উঠে বসে থাকিদ
দেখতে দেখতে রাস্তা ও গাছ ভেসে ওঠে অন্ধকার থেকে
আকাশে লুকায় প্রতিপদের চাঁদ লজ্জার
ছেলেটি যেনবা বাড়ি ফেরে নাই রাতে
পথে পথে আর এখানে সেখানে দেরী করে
সূর্য ওঠার আগেই ফিরছে আজ ঘরে

বলতো এসব দেখে কি মনে পড়ে যায়?
কৃষ্ণ ফিরছে সারারাত পরে রাধার আঙ্গিনায়
কলংকিত চাঁদ সে কারণ শত সখীর ব্যস্ত বিবিএ
আমি বলি, খেলে আমার মাথাটি চিবিয়ে
সারা দুপুর আর বিকাল সন্ধ্যা
ক্লান্ত আমাকে দেখাচ্ছে খুব অফিস ফেরতা
আসলে কি হয়েছে তোমার সঙ্গে সে কথা কাউকে বলা কি যায়?
খুবতো হাসছো মন খুলে
এদিকে আমাকে বাসায় ঢুকতে হচ্ছে মুখ শুকনো করে।


পাশাপাশি অনেকগুলি দালান
...............
পাশাপাশি অনেকগুলি দালানের মধ্যে
দাঁড়িয়ে আছে একটা মাত্র গাজর রঙের দালান
আমি দেখতে থাকি তাকেই
মাঠ ভর্তি কোলাহল, যেন তুমি খেলছো ছোটবেলাকার ছেলেমেয়েদের মিশ্র ফুটবল
সূক্ষ্ণ কলাকৌশল যার ছিল না
সূর্যাস্তের দিকে পিঠ দিয়ে বসে থাকায়
দালানগুলির ওপর শেষ আলোকচ্ছটা ঠিকরে পড়ার শব্দ বেশ টের পাচ্ছি

এই বিকালটা যেন একটা ক্ষুধার্ত কাছিম
জবা ফুলগুলি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে
তার পাশে বসে, তোমার নাম মিশেল,
তুমি পূরানো ও নতুন দিনকে চঞ্চল স্রোতে বেঁধে দিচ্ছ

একটা ছাতার মত আকাশের নিচে
একটা কাপের মত আলো অন্ধকারে
পাষানের সাথে ঝর্নাকলমের বিয়ে হচ্ছে


তোমার ক্রিকেট পিচে
.............
তোমাকে স্পর্শ করে বাতাস ও বইতে পারে না
তোমার কাছে এসে পুলিসের বাঁশি থেমে যায়
সেই প্রায় আয়তাকার মাঠটি থেকে সবার চোখ এসে
তোমার ক্রিকেট পিচে একবার করে বল করে যাচ্ছে

তোমাকে স্পর্শ করে যাচ্ছে পুরানো পাখিরা
তোমাকে দেখে যাচ্ছে কার্নিশের ছায়া
তোমাকে স্পর্শ করে করে গেল অনেক গাছের ভিড়ে
দেয়াল ঘেঁষা একটা ছোট্টো চারা

তোমাকে ঘুরে গেল একটা বদমাশ মাছি
কার যেন রেকর্ড করা এস্রাজের সুর
তোমার বাহুর সোনালী হলদে ত্বকের নিচ থেকে এমন
মরমী শিরাগুলি ছুঁয়ে গেল আমার জন্মদিন
যেন পৃথিবীতে কোন কালে ক্ষুধা তৃষ্ণা ক্ষমতার কোন সমস্যা ছিল না
আমরা শুধু চুপচাপ বসে ছিলাম।


কেমন ভেজে রেখেছে ফুলগুলি
.................
কেমন ভেজে রেখেছে ফুলগুলি, কেমন সাজানো টবে গাছ
বাটি ভর্তি পদ্মার ইলিশ, থোকা থোকা অন্ধকার, স্বচ্ছ পানির দেশি সরপুটি
সবাই খাচ্ছে সবাইকে, কেউ বন্ধুর চাঁদামাছ
সহপাঠির উষ্ণ ভাজা
সম্পর্কের আম জাম, নতুন পরিচয়ের তালশাস
গল্পের রসালো লিচু থেকে খোসা ছাড়িয়ে
অনেকেই টুকটাক আলাপ করছিল

কিন্তু তোমাকে আমার খেতেই ইচ্ছা করল না
মনে হলো একদিনে না খেয়ে
বহুদিন একটু একটু করে দেখেই থাকিনা!


তোমাকে নিয়ে হেটে আসি
...............
চলো তোমাকে নিয়ে হেটে আসি মানিকদি’র মাঠ
যেখানে ঢাকা শহর তলিয়ে যেতে যেতে একটু ভেসে উঠছে
সামরিক ছাউনির রাগ থেকে বাঁচার জন্য আমরা কতকিছুই না করতে চাই

রাত এখন মুক্তি পাবে কি?
বিছানার নিচে নড়ে উঠছে শর্ষের বিচি
আষাঢ় মাসের রাতে কান পেতে শুনতে পাচ্ছি
চিড়িয়াখানার অচেনা পশুদের দীর্ঘশ্বাস

তুমুল বৃষ্টির রাস্তায় আছড়ে পড়ার শব্দে
শুনতে পাচ্ছি তোমার ফোঁপানোর শব্দ
তুমি গুচ্ছগুচ্ছ ভোরের শিশুদের জন্ম দেবে বলে কি
এমন রাতগুলিতে একা থাকা বেছে নিলে
যখন ক্রুদ্ধউরু ভালবাসতে চায়
তখন এলোমেলো হচ্ছে বকুলের ঝরে যাওয়া

মানিকদি’র আকাশে আমরা খেলনা হেলিকপ্টার ওড়াতে গিয়ে
হাতে পেলাম ব্যাটারী শেষ হবার লাল সংকেত
ভিজে যাবার পরেও দরজাটা খোলা রইল
তোমার গলার সাথে আমার গলার মিল হবার জন্য


হাতে গোনা কয়েকটা দিন
................
হাতে গোনা কয়েকটা দিন। গ্রীষ্মের পর বর্ষাকাল।
তীব্র সূর্যের দিনগুলি ভিজা দিনে প্রবেশ করছে।

আমি বসে বসে কাঁদি, কিন্তু কোন কান্নার চিহ্ণই তো আমার নাই।
হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র দিন বাস্তব
আর সব আমার কল্পনার রংয়ে ছন্দে বোনা
তোমার একটা কানের ছবি তোলা
তোমার একটা কানফুল মেঝেতে কুড়িয়ে পাওয়া
তোমার একটা অল্প লালচে চুল আমার ঘরে

হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র বাস্তব দিন নিয়ে
আমি জুয়া খেলায় নেমেছি কল্পনার সাথে
তুমুল বৃষ্টিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি আর
নিজেকে তুলে দিচ্ছি হুড তোলা রিকসার
একটুকরা পলিথিনের পর্দার পিছনে
কি গাদাগাদি করেই না বসেছি আর
কি চেষ্টা করেই না স্পর্শ বাঁচানোর কষ্ট করে যাচ্ছি
যাতে তুমি কোন ভুল সংকেত আমার কাছ থেকে না পেয়ে যাও

তাহলে বাস্তব কি ঐ তোমার স্পর্শ বাঁচানো?
আর কল্পনা হলো শক্ত করে তোমার বা হাতের পাঁচটা আঙ্গুলের মধ্যে
আমার ডান হাতের পাঁচটা আঙ্গুল খুব জোর দিয়ে চেপে ধরা?


ঢাকা শহরে
........
ঢাকা শহরে কোন মাঠ নাই।
ঢাকার ছাদগুলি হচ্ছে মাঠ।
সরু সরু রাস্তাগুলি অন্ধকারে ডুবে আছে।
তুমি তোমাদের ছাদের ছোট মাঠটাতে দাঁড়িয়ে
তাকিয়ে আছো শ্রাবন মাসের পূর্নিমার চন্দ্রোদয় দেখবে বলে।

মনে পড়ছে কি আষাঢ়ের প্রথম দিনের কথা?
আকাশ ভর্তি কালো উড়ে যাওয়া মেঘগুলিতে
শহরের আলো পড়ে সাদা দেখাচ্ছিল
মাঝে মাঝে ফাঁকা, সেখানে অনেক দূরের মহাশুন্য পর্যন্ত শুন্য আকাশ

তুমি কথা বলতে বলতে
মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে
যেন আমি তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি
তুমি প্রায় আমার সমান উচ্চতায় থেকে
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে
কিছুটা ঘোরলাগা কন্ঠে বললে, আমি ভালবাসি তোমাকে...
আমি তোমাকে চাই আমি তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে চাই
তারপর বললে তারপর বললে বললে তারপর
বিরবির করে শুন্য মুহূর্তের দিকে বললে
যা বোঝা গেল আবার বোঝা গেল না

শ্রাবন মাসের আকাশ ঢেকে ফেলা কাঁচা পাকা মেঘ
কেমন গম্ভীর, বয়স্ক আর দুষ্টুমির ভিতর থেকে
পূর্নিমার চাঁদকে তোমার চোখ থেকে লুকিয়ে রেখেছে

কিন্তু আমি জানি, তোমার দুচোখ ভিজে আসছে কান্নায়
সেদিন যে কথাটা বলেও শেষ করতে পারনি
আমরা মুখোমুখি আসতে পারিনি বলে
সেটাই প্রতিনিয়ত তুমি বলে যাচ্ছ

চাঁদ উঠুক না উঠুক
বৃষ্টি হোক না হোক
চোখ ভিজে ওঠে শ্রাবন মাসে।


ঢাকায় কোন
........
ঢাকায় কোন শ্রাবন মাস নাই।
বছর বছর শুধু বন্যার কষ্ট
ঢাকার কোন হৃদয় নাই।

মিরপুরে হৃদয় নাই। কচুক্ষেতে হৃদয় নাই। বাড্ডায় হৃদয় নাই।
হৃদয় নাই শ্যাওড়াপাড়ায়, যাত্রাবাড়ি, উত্তরখানে।
ক্যান্টনমেন্টের হৃদয়হীনতা সারা শহরে।

যখন কেউ মধ্যরাতে আর্তনাদ করে ওঠে
সেই আর্তনাদ ঘরের এককোনায় আটকে থাকে,
যখন কেউ গুমরাতে থাকে বিরহে
তখন তা এক চিলতে বারান্দার মধ্যে বসে থেকে।

একরুম থেকে আরেক রুমে পায়চারী
রান্নাঘর থেকে পানির জগ ভরে নেবার চেষ্টা
টেবিলে কাগজ পড়ে থাকে, কলমের অভাবে তোমাকে লেখা হয় না।

শ্রাবন মাসে তুমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে
উঠানের কাদায় পা ডুবিয়ে গভীর রাতে ফোন করে যাচ্ছো
আর আমি নেটওয়ার্ক বিভ্রাটে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!

সত্য সত্যই কি আমার ষাটভাগ বাস্তবতার মাঝে
তুমি চল্লিশভাগ কল্পনা কোথাও আছো?

গতসপ্তাহে আমিওতো গিয়েছিলাম পাহাড়ে
তুমি ছিলে রাজধানীর বিছানায়
আমি যত আবেগে, সেই মধ্যরাতে
সাপ আলিঙ্গন আর ব্যাঙের পাহারায়
ঘরের বাইরে, নিরালায়
তোমাকে চেয়েছিলাম ফোনের ইশারায়
প্রায় সারারাত নিষিদ্ধ আগ্রহে
তোমাকে টেনে বের করেছিলাম
নির্ঘুম নীল রাতের পোষাকে

আজ একি হলো
তুমি গেলে নীল যমুনার পাড়ে
যেখানে গ্রাম টাঙ্গাইলের শ্রাবনে
নৌকায় করে তোমাকে টানার কথা
সেখানে নাকি শুকনা খটখটে
নদীর বুকে ঘনঘটা নাই ঢেউয়ের

তুমি ফিরে এলে ঝগড়ার ছলনায়
পাশের ঘরে শাশুড়ির নাক ডাকা
জেগে থেকে পার করে দিলে নিশি ভোর
অথচ দেশে ফিরে এলো খুব ভোট
নির্বাচিত, পুরানো যত চোর

কিছুই বদলায় না, অন্তত বদমাস,
বদলায় শুধু আমাদের যা হবার কথা
আমরা যখন রাত জেগে থাকি শ্রাবনেপ্রেমের দেবতা রাস্তায় নামে মাগনে!

একগুচ্ছ কবিতা - আমার গ্রীষ্মকাল১

কাজল শাহনেওয়াজ



রচনাকাল: মে - আগষ্ট, ২০০৮
কবিতাগুচ্ছ: আমার গ্রীষ্মকাল

আমাকে আবার লাইনে দাঁড় করালে
......................
আবার আমাকে হাজির করেছো তোমার সামনে
এক লাইনে দাঁড় করালাম অনেকগুলি আমাকে
অনেক দূর চলে গেছে সেই লম্বা লাইন

তাকিয়ে দেখি কারো বয়স বারো, হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরেছে
কেউবা আঠারো, ভিড় করে আছে তার মুখে একা থাকার চরম নির্যাতন
কারো বা ছাব্বিশ -- অস্থিরতা, যন্ত্রণার মুখোশ পরা
কেউ তিরিশ -- ক্লান্ত, পথহারা, সোনালি মাথায় কালো চুল

তুমি কি ন্যায্যমূল্য? তুমি কি বিকল্প বাজার?
আমার সাধ্যের জোর যখন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে
তুমি এলে ত্রাতা হয়ে?

আমাকে আবার লাইনে দাঁড় করালে
আমাকে আবার টেনে নিলে তোমার সাশ্রয়ী দোকানে!
১৪/৫/০৮


দুইটা চাঁদ
........
তোমাকে দেখবো কবে ও চাঁপা কাষ্ঠগোলাপ?
তোমার আমার মাঝখানে একটা যে ফাঁকা মাঠ
অনেকগুলি টাওয়ার
অনেকগুলি চাঁপা শাদা ফুল সবুজ পাতার
আমাকে টেনে নিয়ে গেলে একটা খোলা মাঠে
যেখান থেকে স্পষ্ট বিদ্যুতচমক দেখা যায়
আমি দেখতে পাচ্ছি র‌্যাবের টহল হেলিকপ্টার
তুমি সেই দিগন্ত জোড়া মাঠে আমার সাথে বসে থাকলে
আমাদের সামনেই সমস্ত মহানগর
বৈশাখ মাসের সন্ধ্যায় লোড শেডিং-এ ডুবে গেল
দেখলাম আকাশ ভর্তি অর্ধেক আলোকিত চাঁদ
বাকি অর্ধেক অন্ধকার চাঁদকে নিয়ে হাওয়া খাচ্ছে

তা হলে দুইটা চাঁদ মিলেই একটা চাঁদ হয়!
বিশাল মাঠটাকে চলো দুইভাগ করে ফেলি
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো একটায়
আমি শুয়ে থাকি অন্য মাঠে
ঐ দেখো আকাশ কেমন খালি? এটা শহরের আকাশ
আমাদের ছোট বেলার আকাশ ছিল কত তারাময়
অনেকগুলি টাওয়ার পার হয়ে তোমার কথা ভেসে এলো
অনেকগুলি দালান, রাস্তা, পার্ক, বস্তি পার হতে হতে
তারপরও তোমার কন্ঠস্বর কেমন সুরভি ছড়াচ্ছে
মনে হয় এই তো তুমি আমার পাশের মাঠে, শুয়ে
আমি অর্ধেক চাঁদ দাঁড়িয়ে!
১৪/৫/০৮


শোনাই তোমাকে আবার কাঁচা পদ্য
....................
তোমার কন্ঠস্বর অবিকল তোমার মতই নাকি?
নাকি কিছুটা আঞ্চলিক?
বনলতা সেনকেও দেখা যায় নাই
শেও কি ছিল না কিছু কাল্পনিক?

গতকাল তোমাকে কথার আঘাত দিয়েছি
বলেছি খুলে ধরো পুরোটা তোমাকে
আজ তুমি ব্যস্ত থাকবে, ভোটার আইডি কার্ড বানাতে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে মন
মেতেছে সবাই খুব স্বপ্নে
আমি পড়ে গেছি তোমার কুহকে
টাওয়ার টাওয়ারে সংযোগ খুঁজি
তোমার চুল খুলি খুব যত্নে

থাক আলোচনা পরিচয় নিয়ে
তুমি কি বাঙালি আর আমি বাংলাদেশী
পাশে এসে বসো না গো এলোকেশী
শোনাই তোমাকে আবার কাঁচা পদ্য

হাঁড়িতে যদিও বা দানা টানাটানি
গাও না গান আজ ওগো টুনটুনি
কিছুটা ভুলভাল, কিছুটা পুরানা
আমার হাতে থাক চলেশ রিসিলের মদ্য।
১৪/৫/০৮


ধারানি শোধানি
..........
কেন তুমি আজ এতো বেশি চুপচাপ
বোরখায় ঢেকে রেখেছো মুখখানি
পাড়ার সবাই দিয়েছে কি অভিশাপ
হাতে দিয়েছে কি হারাম হালালের তালিকাটা।

টাওয়ারে টাওয়ারে রচিছে ভবিষ্যত?
তোমার কোনো ধারানি শোধানি নাই।

তুমি এক নাও, আমারও ছোট্ট তরী
এই কাল বৈশাখে পাল তুলে দেবে নাকি
দুই পাল আর দুই হাল ধরে চলো
একই নদীতে বহু দূরে চলে যাই।

তোমার কাছে কি এ সবই কুল্লু হারাম
গণতন্ত্রেই শুধু ভোট দিয়ে যাবে?
মাঝিমাল্লারা যদি হয় বেশি লোভী
খেয়ে ফেলে যদি নদীটাই তীরসহ?
১৪/৫/০৮

কবি কাজল শাহনেওয়াজের দুটি কবিতা

মুস্তফা আনোয়ার, তোমাকে পাব কোথায়, কোন প্রটোকলে?
.................................
এইতো সেদিন মাটিতে শোয়ালাম
এখন কিভাবে মেঘে মেঘে তুমি হাসো

আমাদের ফুলে ওড়ে না যে মৌমাছি
ও যে বাসা বেঁধেছে ভার্চুয়ালে
বসি দিন আশায়, মধু দেবে বনসাঁই
বুক থেকে শুধু ধিঁকি ধিঁকি পোড়ে
প্রেমের পাইরোপ্লাস্টিক।

ইন্টারনেটে প্রতিদিন লিখি নাম
তোমাকে পাইনি আজো কোনো চ্যাটরুমে
তুমি কী এখন সিগনাসে বাঁধো ঘর
ম্যাজিক মেমব্রেনে এগারো মাত্রা গোন?

এখন আমাকে একলা যাওতো বলে
কিভাবে তোমার নতুন কবিতা পাবো

তোমাকে পাব কোথায়, কোন প্রটোকলে?

ফেব্রুয়ারি, ২০০৭


আবিদ আজাদ
.........
আবিদ আজাদ আর আমার মাঝখানে
এখন একটা শাদা কাগজ
কাগজটার সামনে আবিদ ভাই তাঁর কবিতার মতই
স্পন্দিত আঙ্গুলগুলি বুলিয়ে যাচ্ছেন
আমি ওপাশ থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।

হতে পারে তাঁর হাত কাফনের কাগজ ভাঁজ করছে
আর আমি খালি কলমগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি
সন্ধ্যা বেলায় বহুদিন পর রতন বাসায় এসেছিল
লণ্ডন থেকে বেড়াতে এসে
আমি বাসায় ছিলাম না
ওতো কত দিন পরে এসেও আমার দেখা পেল না

আবিদ আজাদের কবিতার বইগুলি নড়াচড়া করার সময়
চোখে ভাসে বইগুলি ছাপা হবার দৃশ্য
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রুফ দেখার ছলে কী গোপনেই না
কবি তার নতুন কবিতাগুলি আমাকে পড়িয়ে ফেলেছিলেন!

কিন্তু আমরা পরস্পরকে জানাইনি আসল কথাটা
হয়ত একটু আধটু চুল ছিঁড়তে দেখেছি
শ্বাসকষ্ট দেখেছি
কিন্তু আমিতো সারাক্ষণই আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম!

বলা হয়নি বলা হয়নি বলা হয়নি
আপনাকে আমার মনের কথাটি
তোমাকে আমার মনের কথাটি
তোকে আমার মনের কথাটি

কাফনের কাগজে দাগ কাটলে কি হবে
তোর সব কবিতাই আমার মনে মনে
তোর সব কবিতাই আমি যত্ন করে রাখি

এপ্রিল, ২০০৮

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০০৯

কবি কাজল শাহনেওয়াজের সাথে কথাবিনিময়


স্বাক্ষাতকার - 'কথা' লিটল ম্যাগাজিন অংশ১


প্রকাশিত হয়েছে: কথা, ৫ম সংখ্যা, চৈত্র ১৪১৪/এপ্রিল ২০০৮
সম্পাদক: কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, রেলওয়ে হাসপাতাল (অন্তর্বিভাগ), সিআরবি, চট্টগ্রাম-৪০০০
ই-মেইল: editorkatha@yahoo.com
..........................................................................

আমরা আমাদের আলোচনার শুরুতেই আপনার শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
আসলে এ সম্পর্কে আামি খুব একটা বলতে চাই না। কারণ যতটুকু এ নিয়ে লেখা যায়, ততটুকু আসলে বলা যাবে না। আমার বাবা সরকারি চাকুরি করতেন - তিনি ছিলেন ভ্যাটেরেনারি সার্জন। তাঁর চাকুরিসূত্রে আমাকেও নানান জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। যার ফলে আমার দেশ বলতে সারা দেশটাই আমার দেশ। আর বন্ধু বলতে সব জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো আমার বন্ধুসকল। আমার শৈশব অনেকটা চরভাঙা মানুষের মতো।

আপনার গ্রামের বাড়ি তো বিক্রমপুর?
বিক্রমপুরে তো আমার দাদার বাড়ি - সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়টা ছাড়া আমি সেখানে থাকিনি।
আচ্ছা ঠিক আছে - কিন্তু কথা হচ্ছে একাত্তরের সেই যুদ্ধের সময়টা সেখানে তো ছিলেন। সেই সময়ের টোটাল ফিলিংসটা সম্পর্কে কিছু বলুন।
হ্যাঁ, এই বিষয়টা আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সময়টা সম্পর্কে কোথাও কিছু বলি নাই। তবে এই সম্পর্কে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই - কারণ এটা আমার জন্য এত বেশি আলোড়িত করার জিনিস, তা নিয়ে কিন্তু মহাপরিকল্পনা নিয়ে বসে আছি। এটা আমার ভিতরে খুব কাজ করে। এ প্রসঙ্গে আমি একটা কথা বলি - কিছু আগেই আমি মাহমুদুল হকের মাটির জাহাজ পড়ছিলাম। তো, সেখানে বিক্রমপুর, একাত্তর/বাহাত্তর আছে- যাই হোক। সেই বইটা পড়েই আমি আমার একাত্তর পুনরায় বোঝার চেষ্টা করলাম। তখন আমার বয়স কত হবে? এই ধরুন, ১০ বছর। আমি কিন্তু তখন অনেক কিছুই বুঝি। ওই জায়গাটা তো তখন ছিল দুর্ভেদ্য এলাকা। চারদিকে নদী - যার ফলে যোগাযোগ ছিল পানি পথে। আমি বাবার সাথে যেখানে ছিলাম সেটা কিন্তু এপ্রিলেই আক্রান্ত হয়ে গেছে। তখন আমরা ছিলাম ফরিদপুরে, সেই সময় আমরা পোটলাপুটলিসহ বিক্রমপুরে চলে আসি। বাবা তখন ফরিদপুর-বিক্রমপুর আসা-যাওয়া করতেন। আর আমি তার আগেই ৬৯-এর মিছিল দেখে ফেলেছি আর-কি। এই মিছিলে যাওয়াটা কিন্তু তখন সবার মধ্যে। আবার বাবা তো সরকারি চাকুরে, যার ফলে যারা মিছিল করত তারা কিন্তু আমাদের বাসার দিকে ঢিল মারত। এটা কিন্তু একধরনের মজার ব্যাপার ছিল - একই সাথে আমরা দুইটা দিকই দেখছি। আর সেই মিছিল, মানুষজন, শ্লোগান - এসব তো এখনও আমার মনে জ্বলজ্বল করছে। হ্যাঁ যা বলছিলাম, একাত্তরের সেই সময় হঠাৎ একদিন গুলির শব্দ শুনলাম, মানুষজন দলে দলে পালাচ্ছে। তখন বয়সের কারণেই হোক, আর যে জন্যই হোক, এইসব ব্যাপারে আমার ছিল দারুণ কৌতুহল। আপনাকে একটা সকালের কথা বলি। সেই সকালে পাকিস্তানি মিলিটারিরা একটা বাজারে এসে আগুন দিল। ফরিদপুরের সেই জায়গাটা ছিল হিন্দু অধ্যুসিত। যার ফলে আর্মিদের আগ্রহটাও ছিল। ওরা পুরা প্যানিক তৈরি করতে যাচ্ছিলো তো। আমি কিন্তু বালকের নির্ভয়ে ১২টার দিকে পুড়ে যাওয়া বাজার দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি আমি তখন যে পাগলটাকে চিনতাম, সে সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। এটা একটা সাংঘাতিক দৃশ্য ছিল আমার জন্য। আমার এখনও মনে হয়, একটা দারুন বিভতসতা তখনই আমি দেখে ফেলছি।
আমরা যেহেতু সরকারি বাসায় ছিলাম, যার ফলে আর্মিদের সাথেও ইশারায় আমাদের কথা হইতো। কিন্তু ওদের মানুষ বলে মনে হতো না। আরেকটা ঘটনার কথা বলি, তখন মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। তারা সেইখানকার থানা এ্যাটাক করল। সারারাত চারদিকে গুলির শব্দ। সকালে যুদ্ধ থেমে গেলে আমরা গুলির খোসা কুড়াতে গেলাম। তাতে আমরা সেই যুদ্ধের জায়গাটাও দেখলাম। তখন কিন্তু আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে একটা বড় যুদ্ধ হচ্ছে এবং তাতে আমরাও একটা পক্ষ। প্রথম দিকে এটা ছিল একটা খেলা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর সবদিকেই সাজসাজ রব শুরু হয়ে গেল। আমাদের স্কুলের মাঠে কে একজন লোক যার যা আছে তাই দিয়ে প্রতিরোধ ট্রেনিং দিতে লাগল। আমরা বালকেরাও ট্রেনিংয়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে যেতাম। তখন এসব আমাদের খেরার অংশ। কিন্তু আর্মিরা যখন অনেক মানুষ মেরে ফেলল, তখন কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেল।
তো, যা বলছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা যখন থানা আক্রমণ করল, তখন দেখলাম আমাদের চেনাজানা ওসি আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। তখন কিন্তু আমার খারাপ লাগল। কারণ সে তো চেনাজানা একজন মানুষ। সেই পাগলটা দেখে খারাপ লেগেছিল, আবার এই ওসিকে দেখেও খুব খারাপ লাগল। আমরা সবাই খুব কাঁদ কাঁদ হয়ে গেলাম। মায়েরা তাকে সেবা-শুশ্রূষা করলো একজন মানুষ হিসাবে। এইভাবেই আমার মনে হয় কি, যুদ্ধটাকে অনেকভাবে দেখার আছে।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একটা কমিটমেন্টের ব্যাপার তো আছে?
আমি ঘটনাসমূহই বলি, তাতেই আমার দৃষ্টিভঙ্গিটাও ক্লিয়ার হবে। আমরা কিন্তু বেশী দিন ওভাবে থাকতে পারলাম না। কারণ কেউ ভরসা পাচ্ছিল না পাকিস্তানিদের নানামুখী অত্যাচারের কথা শুনে। আমাদেরকে দাদার বাড়ি বিক্রমপুরে চলে আসতে হলো। আমরা কার্যত সেখানে স্থবির হয়ে গেলাম। স্কুল নাই, বাইরে যাওয়া নাই। গেরিলা যুদ্ধ ক্রমশ: বাড়তে থাকল। আরেকটা বিষয় হলো, ঐ এলাকাটা সিরাজ শিকদার বাহিনীর জায়গা হওয়াতে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের টাইপটাও ছিল অন্যরকম। মুক্তিযোদ্ধারা লৌহজং থানা দখল করেছে এবং সেটা পুড়ায়ে ফেলছে। আমার মনে আছে, আমাদের চাচারা সেখানে গেছে এবং পোড়া কয়লা নিয়ে এসে বলছে, আমরা এই কয়লা নিয়ে দাঁত মাজবো। তাহলে বোঝেন সবার কত খুশি। যুদ্ধের ভিতর কিন্তু বলতে গেলে সব পরিবারই পড়েছে। পলিটিকাল প্রসেস যাই হোক, এতে কিন্তু সব মানুষ ইনভলভ হয়ে গেছিলো, সবাই স্বপ্ন দেখছিল। যুদ্ধ করছিল। জয় পরাজয় নিয়ে ভাবছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছিল। বিশাল আলোড়ন ঘটে যাচ্ছিল। এটা ছোটোখাটো কিছু ছিল না। এটা পুরো জাতির অস্তিত্বের বিষয় ছিল, ছিল একটা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।

হ্যাঁ, একটা পরিবর্তনের বিষয় নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মানুষের জাগরণের সাথে সাথে বিভিন্ন বামদল ও গ্রুপের যে উত্থানটা হলো তাতে রাষ্ট্রীয় নীতির ধরনে কি আপনাকে আশান্বিত বা হতচকিত করেছে?
দেখুন, এর পরে-টরে কিছু নাই; তখন আমার বয়স ১০ বছর ছিল, এখন আমি ৩৫ বছর ধরে দেখছি - আমার অবজার্ভেশনটা হলো এরকম, যারা ক্ষমতা নিয়ে প্লে করছে, মানে যারা পাওয়ার উইনার, তারা প্রতিটি জিনিসকে কিন্তু একটা যুদ্ধ অবস্থার মইধ্যেই রাখতে চাচ্ছে। সবাইকে সর্বদাই সন্ত্রস্ত হয়েই থাকতে হচ্ছে। ক্ষমতার মূল বিষয় মনে হচ্ছে, মানুষজনকে ক্রমাগত সংকটের মইধ্যে রাখতে হবে। যেন সন্ত্রস্ত করে রাখলেই মেজোরিটি মানুষ ক্ষমতাকে ভয় পাবে, কাছে আসতে পারবে না। নিজেকে সেইফ করতে-করতেই তার সময় চইলা যাবে। বড় কিছু করার দিকে সে আসতেই পারবে না। পুরা পৃথিবীর ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার এটা একটা চাল ও বটে। আসল কথা হচ্ছে, কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধ তৈরি করে রাখা। সেটা আমেরিকার ইরাকে গিয়েও হইতে পারে কিংবা বাংলাদেশে উইনি গেম খেলে ও হতে পারে। এটাই এখন পাওয়ারের প্রিয় পদ্ধতি।



স্বাক্ষাতকার - 'কথা' লিটল ম্যাগাজিন। অংশ১ এর পর...

হ্যাঁ, তা হা নয় মানলাম, কিন্তু কথা হচ্ছে তখন প্রগতিশীল রাজনীতির ধারার কিন্তু বিকাশ ঘটল। আমরা তাদের ডেডিকেশনটাও দেখলাম। কিন্তু আপনার এধরনের লেখা বিশেষত রোকনের মৃত্যু বা বাবা নুরদীন-এ কিন্তু এর কিছুই দেখিনি।

লেখার কাজ কিন্তু ঐটা না। আমি সবসময় যেটা বলি, তা হচ্ছে, লেখা আমার সময়টাকে বুঝাইতে পারে, তা কিন্তু কোনো কিছুকে তৈরী করে না। সে সামাজিক বাস্তবতার পিছনে পিছনে যায় আর-কি। যে কথাগুলি আপনি দেখতে চাইলেন, ওইগুলি আসলে স্বপ্ন কথা হচ্ছে, ধরুন, একটা শক্তি অর্গানাইজড হওয়ার আগে অনেক মালমশলা লাগে তো? প্রণোদনা, ব্যাকগ্রাউন্ড ইত্যাদি লাগে। দ্বান্দ্বিকতার অনেক লেয়ার আছে। শিল্প যা করে তা হচ্ছে, যদি মানুষের মনে তা থাকে, তা সে বের করে নিয়ে আসতে পারে। সে মানুষের মনে সেটা ঢুকাতে পারে। ক্ষমতা বদলানোর কাজটা কিন্তু নেতৃত্বের। একজন রাজনৈতিক নেতা স্বপ্নকে নেতৃত্ব দিতে পারে, আর শিল্প-সাহিত্য সেটা জাগাইয়া দিতে পারে। মানুষগুলি আগায়ে গেলে শিল্প-সাহিত্য তা রূপায়িত করতে পারে। কিন্তু তা জোর করে করার বিষয় না।

আমার কথাটাকে আরেকটু পরিষ্কার করতে চাই, স্বাধীনতারপর পর কিন্তু জনমনের ব্যাপক জাগরণ হলো, সর্বহারা পার্টি, আব্দুল হক বা তোয়াহার পার্টি, জাসদ ইত্যাদি হুহু করে বাড়তে থাকল। তার মানে মানুষের ভিতর তখন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ষ্পষ্ট হচ্ছিল। আমার কথা হচ্ছে, ওইধরনের পটভূমিতে আপনার গল্প আছে ঠিকই কিন্তু মানুষের সেই স্বত:স্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষাকে আপনি ধরতে চাননি।
কথা হচ্ছে, আমিও কিন্তু সেই ধরনের বিপ্লবী ক্যারেক্টারদের ভিতরই বড় হইছি। আপনি তো বাজিতপুরের সশস্ত্র বিপ্লবের কথা জানেনই। আবার কিশোরগঞ্জে কিন্তু নগেন সরকারসহ আরও মারাত্মক বিপ্লবীরা ছিলেন। এদের ব্যাপারগুলি কিন্তু আমি ভালো করেই জানি। আমি কিন্তু লেখাপড়ার পাশাপাশি এইধরনের লোকগুলি ধারেকাছেই বড় হইছি। আমার সিনিয়র বন্ধুরা আঙ্গুল কেটে রক্তে নিজের নাম লিখে ওই পার্টি করত। এরা কিন্তু পুরাজীবনটাই ওইসবের পিছনে ব্যয় করছে। কিন্তু ব্যাপার সেটা না, এর এক-একটা সময়ের এক-একটা ভাষা থাকে তো। এখন ধরেন, আমাদের যদি ১৯২০ সালের দিকে জন্ম হতো তাহলে কাজী নজরুলের ভাষায় সবকিছু ভাবতাম। আমি বলতে চাচ্ছি, ১৯২০ সাল আর ১৯৮০ সাল তো আর এক না। কথা হচ্ছে, স্বপ্নের বহুরকম রং তৈরি হয়। যাই হোক, আমাদের আলোচনাটা বোধ হয় অন্যদিকে চলে যাচ্ছে, অবস্টাকল তৈরি হচ্ছে।

তার মানে আমরা কি এটা ধরে নেবো যে রাজনীতির এইধরনের আলাপ আপনার ভাল্লাগছে না?
না না তা নয়, এখানে দুইটা জিনিস আর-কি, রাজনৈতিক চেতনাকে দুইভাবে দেখা যায়। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের কথাই ধরেন, শেখ মুজিব যেদিন নিহত হলেন, আমাদের পরিবারের সবাই কিন্তু ভীষণভাবে আহত হয়েছিল, আমরা সবাই কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। আবার যখন আমি বিকালে বাইরে গেলাম, তখন যারা গোপন-বামপন্থি রাজনীতি করত তাদের সাথে দেখা হলো। সেখানে নগেন সরকারের সাম্যবাদী দল, অন্য গ্রুপ ছিল, জাসদ ছিল - তখন তাদের ইন্টারপ্রিটেশন ছিল একদম ভিন্ন। তখন আমি হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। তখন মনে হল, আমি তাহলে কোনটা গ্রহণ করব! আমি তখন এত গভীরভাবে জানি না যে কোনটা ঠিক। তখন কিন্তু বলা যায়, ওদের দ্বারা আমি এক বেলার জন্য নিষ্ঠুর হয়ে গেলাম, মনে হল, ব্যাপারটা তাহলে হয়ত অন্যরকম কিছু। তার মানে ব্যক্তিগত অনুভূতি আর পলিটিকাল এনালাইসিস এক হয় না। এতে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল, এরা যারা পলিটিকাল ফ্রেমওয়ার্কে থেকে পার্টিজান হয়ে আছে তাদের ভিতর একধরনের যান্ত্রিকতাও আছে। আমি অনেক কিছুই পাঠ করছি, অনেক কিছুই অনেক ভাবে দেখেছি। আমার তখন মনে হলো - না, এই ভাবে আমার যাওয়া সম্ভব না। তখন আমি অনেক আলোচনায় অংশ নিয়েছি। ওই বয়সেই খুব পাকা ছিলাম তো (হা হা হা)। আমার কাছে অনেকে আসত, আমিও অনেকের কাছে গেছি। এমনকি ময়মনসিংহে এগ্রিভার্সিটিতে পড়ার সময়য়েও আমার রুমে অনেক দলের আগাগোনা ছিল। তবে কখনই আমি কিন্তু ওই ফ্রেমের ভিতর ঢুকে যেতে পারিনি। আমি একটা বিষয় বুঝি, যখন বড় জোয়ার আসে, তখন কিন্তু ছোট ছোট বাঁধ আর থাকে না, ভেঙে যায়। ওই যে বড় জোয়ার, তা কিন্তু এখানে আর আসছে না। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টি হওয়ার পর থেকেও অনেক দিনেও কিন্তু শ্রেণীসংগ্রামের বড় জোয়ারও তৈরি হয় নাই। সেই জোয়ার তৈরি হয়নাই বলেই হয়ত আমি সক্রিয়ভাবে সেসবের সাথে যাইনাই। তবে এটা সত্যি যে, কায়েদে আজমের জীবনী পড়ার সাথে একেবারে সস্তা কাগজে ছাপানো চারু মজুমদারের জীবনী পড়ে আলোড়িত হই। কারণ, এইখানে আমি দেখি - এক. চারু মজুমদারের ফাইটিং স্পিরিট। দুই. তার মানুষকে বাঁচাতে চাওয়া। তার কাছে যে যায় তাকেই সে বদলে ফেলতে পারছে। সবচেয়ে বড়ো কথা সে কাজটা করেছিল সম্পূর্ণ লোভশূন্য হয়ে।

আপনি লেখালেখির বিষয়টাতে যখন এভাবে নিজেকে রাখতে চাচ্ছেন, আমি একটা বিষয় জানি, আপনি কবিতাও লিখে থাকেন। তো, গল্প আর কবিতার পার্থক্যটা আপনি কিভাবে করেন? আপনার লেখালেখির প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কেও বলুন।
এই সম্পর্কে বলতে গেলে আমার কিছু বাল্যকাল বলতে হয়, আমার বয়স তখন ১৪, তখন আমি প্রথম কিশোরগঞ্জ যাই। তো, সেই বয়সে একজায়গায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া খুব সহজ নয়। ওইখানে একটা লাইব্রেরি ছিল, সেইখানেই আমি যেতাম। তখন ভাবিনি যে আমি লিখব। আমি তখন প্রচুর পড়তাম। তখন পারভেজ নামের এক বন্ধু জুটে যায়। সে লিখত - শুধু লিখত না, প্রেমে পড়ে লিখত। প্রতিদিন একটা করে গল্প লেখে। ও খুবই রোমান্টিক। আর আমি ওর লেখার এনালাইসিস করতাম। এরকম অনেককেই আমি প্রেম-বিরহ-আসা-যাওয়া এসব নিয়ে বৈদগ্ধতা দিতাম। মানে এইদিক থেকে আমি হলাম ওদের তাত্ত্বিক। তবে খুব মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই বন্ধু আমার এখন খুবই ম্যাটারিয়ালিস্ট। এখন সে ইহজাগতিকতার ভিতর ডুবে আছে। যা বলছিলাম, তখন বুঝলাম যে, হ্যাঁ লেখাটা তো এরকম না, লেখাটা তো ওইরকম হওয়া দরকার ছিল। ওরা কিন্তু সেইটা বুঝতেই পারে না। তখন আমি ওদেরকে দেখানোর জন্য কঠিন কঠিন কবিতা লিখতে শুরু করি। কারণ আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ার আগেই, ধরেন, ওই সুধীন্দ্রনাথ পড়তে শুরু করছি। তখন পারভেজকে দেখানোর জন্য গল্পও লিখে ফেললাম। এইভাবে গল্প-কবিতা লিখে ফেললাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করবো। ওই সবার সাথে যোগাযোগ করল। সবকিছুর আয়োজন হল। কিন্তু যখন প্রিন্টার্স লাইনে নাম দেয়ার সময় হল তখন আমরা কেউই সেইভাবে জানি না যে কোন পদের কি অর্থ। তবে পারভেজ যেহেতু সবকিছু করছে, ওকে আমরা বানালাম নির্বাহী সম্পাদক। আর যেহেতু আমি প্রুফ দেখছি, কার কার লেখা যাবে না-যাবে ইত্যাদি করেছি, সম্পাদকীয় লিখেছি - সেই জন্য আমি হয়ে গেলাম সম্পাদক। হা হা হা।


ওই ছোটকাগজটার কি নাম নাম ছিল?
মনুমেন্ট।

তখন ওইটাকে কি শুধু কিশোরগঞ্জে অবস্থানকারী সব লেখক ছিল।
না না, ওইটাতে আবিদ আজাদ বা অন্যান্যদের লেখাও ছিল। কাগজটি বের করার পর দেখা গেল লোকজন আমার বন্ধুকে আর খোঁজে না, খোঁজে আমাকে। এই একটা মাত্র ভুলে আমি সম্পাদক হয়ে গেলাম। আমি আসলে কিন্তু তখন একজন বিজ্ঞানী । তখন বন্ধুদের নিয়ে বিজ্ঞান প্রজেক্ট করি। তবে ফরিদপুরে আমার একবন্ধু ছিল, ও ছিল কবি। ওর কথা খুব মনে পড়ে। ওর নাম ছিল খোসবু। ও প্রতিদিন কবিতা লিখত। ওর জীবনটা ছিল নজরুলের মতো। ও এক আত্মীয়ের বাসায় থাকত। তবে ওর কবিতা লেখা সেখানে পাত্তা পেত না। একসময় বাসায় জায়গা নেই বলে ওকে মসজিদে থাকতে হতো। মসজিদের ভিতর লুকায়ে লুকায়ে সে তার বইগুলো পড়ত। আমি তখন বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাপার-স্যাপার, এডভেঞ্চার ইত্যাদি পড়তাম। আমাদের বন্ধু ছিল একজন বৃদ্ধ দরজী। তো ক্লাশ ফাইভে পড়ার সময় একবন্ধুকে পেয়েছিলাম যে কবিতা লিখত আর ৯ ক্লাশে থাকতে পেলাম আর এক বন্ধুকে, যে গল্প লিখত। যখন আমার মনে হত, এইসব আর এমনকি, আমি তো বিজ্ঞানী, অন্য লাইনের লোক। ওরা আসলে না পড়েই লিখত, ওদের ইমোশনটাই ছিল মুখ্য। তবে এখন মনে হয় ওরাই আমাকে কবিতা আর গদ্যের প্রথম পাঠ দিয়েছে।
আচ্ছা, আমাদের তো কথা হচ্ছিলো কবিতা আর গল্পের পার্থক্য নিয়ে। আমি আমার প্রথম কাব্যসাধনার কথা বলি, তখন একটা কবিতা লেখা আমার কাছে রীতিমতো প্রজেক্ট টাইপের ব্যাপার ছিল। তবে গল্পটাকে মনে করতাম কবিতার ফাঁকে-ফাঁকে একটা কিছু। আমি গল্পলেখার শুরুতে অন্যদের নিয়ে গল্প লিখলাম। কিন্তু ৮৫ তে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ কাছিমগালার প্রথম গল্প প্রথম কবিতা লিখতে গিয়ে আমি রীতিমতো অন্যরকম হয়ে গেলাম। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমাদের গ্রুপটা ছিল যারা এত দিন ভালো ছাত্রত্বের মধ্যে থাকতে থাকতে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে চায় অন্যত্র তাদের নিয়ে। ওইখানকার একাডেমিকরা আমাদের খুব বেশি ইমেপ্রস করতে পারে নাই। আর তখন দেশে ঘনঘন সামরিক থাবা সব কিছুকে গোলমেলে করে দিচ্ছিল। তখন জীবনকে ডেঞ্জারাস করার দিকেই ঝুঁকে পড়লাম। ওইসময় আমি সত্যিকারের কিছু বিপর্যয়ের মুখোমুখি হই। এর ভিতর সম্পর্কের একটা জটিলতা ছিল। আমি তখন বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা-টাড্ডা দিতাম। ফকির-বাউলদের বৈঠকে যেতাম - কখনও দলবদ্ধভাবে, কখনও-বা একা। তখন ঐ আড্ডায় বসে বসে টুকরা টুকরা গদ্য লিখতাম। হয়ত জার্নাল লিখতে চেয়েছিলাম। তো একদিন চয়ন খায়রুল হাবিব বললো (১৯৮৫) ও একটা কাগজ করতে চায়, গদ্যের। আমিও ভাবলাম ছাপবো নাকি এই গদ্যটা? জলপ্রপাত এ ছাপা হল - প্রথম কবিতা। ছাপা হবার পর বুঝতে পারলাম হ্যাঁ আমার মন মতো হয়েছে এটা।

এবার নিজের সাইকোলজি সম্পর্কে কিছু বলুন।
একটা ব্যাপার হচ্ছে, কোনো কিছু থেকে আমি নিজেকে সরায়ে নিতে পারি। যেমন, ধরেন আবৃত্তি/পেন্টিং করলাম কিছুদিন, আবার এসব থেকে আমি নিজেকে হঠাৎ সরায়েও নিলাম। আমার ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এমনও হয়েছে যে, নিজেকে নিরাপদ অবস্থান থেকে সরায়ে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। বারবার নিচ্ছি। এটা ঠিক কেন, তা হয়ত পরে বিস্তারিত বোঝা যাবে। এবার মনস্তত্বের দিকে যাচ্ছি না। শুধু বলতে চাই আমি নিজেকে আসলে বদলাইতে থাকার মধ্যেই রাখতে চাই।

সেটা শিল্পসাহিত্যের জন্যও দরকার?
হ্যাঁ। সরায়ে ফেলতে হয়, তা না হলে এত বিষয় নিয়ে কিভাবে আপনি লিখবেন। একটা বিষয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলে আপনি তো আত্মপ্রেমী হয়ে গেলেন।

ঠিক আছে, আপনার পুর্বের কথা রেশ ধরেই বলছি, সত্যিকারের বিপর্যয়টা সম্পর্কে বিস্তারিত বলা যাবে কি?
না সবকিছু বলা যাবে না, পরে বলব আর-কি হাহাহা। সেভেন্টি সেভেন থেকে আমার ডায়েরিগুলো আছে। তাতে একদম খোলামেলা সব লেখা আছে। তবে এটা স্বীকার করতে হবে আমার খুব নিঃসঙ্গতা ছিল। আর আমি মনে করি, এটা আমাদের ভিতর খুবই কমন বিষয়। আসলে যাদের সিক্সটি বা সেভেন্টিতে জন্ম এবং এইটিজে যারা তাদের কৈশোর গেল, যারা অফুরন্ত স্বপ্নের কথা, সম্ভাবনার কথা শুনল, তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের বেদনা তাদের বেশি কষ্ট দিল। তখন আমি মনে করতাম আমিই সবচেয়ে দুঃখী। কিন্তু পরে বুঝলাম যে এটা আমার সময়ের একটা দুঃখ। আমি খুঁজে খুঁজে সেরকম পাঠ করে ফেললাম যাদের এই ব্যাপারগুলোর সমর্থন আছে। এটাকে সবাই তো আর ক্রিয়েটিভিটির দিকে ট্রান্সফার করতে পারে না। সামগ্রিক কষ্ট যে খুব ফেলনা জিনিস না, সেটাই আমি তখন অনুভব করি। এর তো পজেটিভ সম্ভাবনা থাকে। এখন আমাদের যদি কোনো পজেটিভ বলার জায়গা থাকে তাহলে সেটাই - মানে বলা যায় যে, দেখো, আমরা কিন্তু প্রচুর কষ্ট করছি। এত কষ্ট করছি যে, আমাদের এখন সেই কষ্টের অবসান হওয়া উচিৎ। এই যে আপনি ঘুরেফিরে পলেটিকাল কন্সাসনেসের কথা বলেন, দেখেন, আমাদেরকে বিন্দুমাত্র সময় কি গেছে যেখানে পাকিস্তানের প্রব্লেমের সাথে সাথে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের বিষয় নিয়ে কষ্ট পাই নাই, কি পারিবারিক ভাবে, কি ব্যক্তিগত ভাবে!

সেটা তো আছেই, মানুষ তার বেসিক রাইট নিয়ে ভাববেই।
হ্যাঁ, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বড়ো আকর্ষণ কিন্তু ছিল অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সমাধান।

এবার আপনার গল্পলেখার ধরন সম্পর্কে কিছু কথা জানার বাসনা রাখি। আচ্ছা, আপনার গল্পে একধরনের কথনভঙ্গি কিন্তু আছে। তা কি স্বত:স্ফূর্তভাবে করেন নাকি এটা আপনার একটা সচেতন স্টাইল?
এটা কিন্তু একটা মজার ব্যাপার, আর আমি এটা নিয়েও ভাবছি। আমি যেটা ইতিমধ্যে বলেছি, নিজেকে ভাঙবার আগ পর্যন্ত নিজেকে আমি একজন পাঠক হিসাবে তৈরি করি আর দেখি যে আসলে আমি কারও সাথে ভাবের লেনদেন করতে পারছি না। আমার স্বাভাবিক মুখচোরা স্বভাব ছিল, অচেনা লোকতো বটেই অতিচেনা লোকের সাথেও কথাসূত্রে কমিউনিকেট করতে পারতাম না। এটা কিন্তু সামাজিক অবস্থারই একটা কারণ। আমি বলি কি, দীর্ঘঅবদমন কিন্তু আমাদের এই জাতির উপর দিয়ে গেছে। আমার কাছে মনে হয় কি, গত কয়েকশ বছরের ইতিহাস হলো আমাদের অবদমনের ইতিহাস। যৌথচৈতন্যের ভিতর ধারাবাহিক অবদমন ঘটছে, এসবের চিহ্ণ সংস্কৃতির বিভিন্ন পকেটে এখনও দেখা যায়। আপনি যে পলিটিকাল যৌথউত্থানের কথা বলেন, তা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি যোগাযোগের বিষয়গুলো ভাঙ্গি। আমি এর জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী বা গ্রুপের শরণাপন্ন হই। বাউল-সন্ন্যাসী বা খামখেয়ালিতে ভরপুর মানুষজনের কাছে আমি যাই। আনঅর্থোডক্স যে জিনিসগুলো আছে, সেসবই কিন্তু অবদমন কাটানোর একটা পথ। আমি কিন্তু প্রচুর সময়, বিভিন্ন রকম করে ওদের সাথে কাটাইছি। আমি জানি, আমি শহুরে জীবনে ওইরকম না, তবু জোর করে আমি ওইখানে গেছি। এইভাবে ভাঙাটাই আমার ক্ষেত্রে কাজে দিয়েছে। এটা নিজের ক্ষমতাকে বোঝার জন্যও দরকার। যাই হোক এইসব করতে গিয়ে হয়ত আমার একটা কথন তৈরী হয়েছে, তবে এ বিষয়ে আপনারাই ভাল বলতে পারবেন!
কমিউনিকেট করার সমস্যাটা এখনকার ছেলেমেয়েদের কিন্তু কম হয়। এখন ওরা যে কোনো সমস্যাকে ট্যাকল করতে শেখে। এখন দেখবেন, অবসাদ, নিঃসঙ্গতা এইসব শব্দ বাজারে কম চালু।

কমিউনিকেট করার সমস্যাটা এখনকার ছেলেমেয়েদের কিন্তু কম হয়। এখন ওরা যে কোনো সমস্যাকে ট্যাকল করতে শেখে। এখন দেখবেন, অবসাদ, নিঃসঙ্গতা এইসব শব্দ বাজারে কম চালু।

এসব কেন হচ্ছে? ইন্টারনেট, সেলফোন, ইনফর্মেশন টেকনোলজির উন্নয়ন...
হ্যাঁ, অনেককিছুই এখন তাদের হাতের কাছে আছে। আমাদের স্বপ্নগুলি না-পাওয়ার যে অবসাদ, সেটা তাদের ভিতর সেইভাবে কাজ করছে না।

তার মানে এখন শিল্পের একটা সহজাত উৎকর্ষ বেশি হবে?
না সেরকমও বলা যাচ্ছে না। ওদের অন্তর্গত কষ্টগুলো কম থাকবে।

ওদের কিন্তু নির্জনতা-নিঃসঙ্গতাও নষ্ট হচ্ছে।
এটার কিন্তু দরকার ছিল। কারণ আমরা দীর্ঘসময়ব্যাপী একই রকম নি:সঙ্গ ছিলাম। ওরা নিশ্চয়ই এতো জনসংখ্যার ভিতর নির্জন হবার আনন্দটুকু সহজে ছাড়বে না।

আচ্ছা, তাহলে এই প্রসঙ্গে এটা কথা বলে নিই, আপনি কি নির্জনতা বা একাকীত্বের যে অনুসঙ্গগুলো বললেন তা আপনার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ গতকাল লাল-এ সেইভাবে বদলাতে পেরেছেন?
আমি এই ক্ষেত্রে শুধু এইটুকু বলতে পারি, নিজেকে যে বদলাতে পারে তাকে আর আলাদাভাবে সচেতন হওয়ার দরকার হয় না। ভাঙচুরের এই প্রক্রিয়ার ভিতরই তার সব হয়ে যায়।

আসুন আমরা আপনার শিল্পসত্তার অদ্ভুত এক বিস্তারের গল্প করি। আপনার কাছিমগালায় জীবনের যে বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়, তাই কিন্তু আপনার সদ্যছাপা কবিতা দাদাকাছিম ও দুটি গাছে আমরা লক্ষ করি। এটা তো শিল্পসত্তার একধরনের রূপান্তর বা এক্সটেনশন - নাকি?
সেটাও হতে পারে। পৃথিবী কিন্তু একটা জিনিসে তৈরি হয় না। এর জন্য সমুদ্র লাগে, পাহাড় লাগে। মরুভূমি বা অন্য অনেককিছু লাগে। কাজেই সবকিছু পরিপূর্ণ করতে গেলে অনেককিছুই দিতে হয়। আপনার জীবন যদি শুধু বিষাদের ভিতর দিয়েই যায়, তাহলে কোথাও না কোথাও তার ছায়া কিন্তু থেকেই যাবে।

তাহলে যাপিত জীবনের ভিতর যা-ই উপলব্ধি করেন তা-ই গল্পে আনতে চান।
তাই, মানে যা কিছু আমি তাই আমি। যেমন ধরেন, আমার খুব ঘনিষ্ঠ বয়জেষ্ঠ্য বা সমবয়সি বন্ধুদের মৃত্যু আমি দেখে ফেলছি। যতকিছুই আমরা বলি না কেন, যেই মুহূর্তে ও মারা যাচ্ছে, সেই মুহূর্ত থেকে সে কিন্তু আর একটা লেখাও লিখতে পারছে না। তার মানে এইয়ে এইভাবে বদলানোর কথা বলছি, সেটাও কিন্তু আমার জীবন। আমি যখনই আরেকটা গল্প বা কবিতা লিখতে পারছি না, তখনই কিন্তু আমি কিছুদিনের জন্য মারা যাচ্ছি। শৈল্পিক মৃত্যু যাদের হইছে তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একের ভিতর অনেকগুলো চোখ স্থাপন করা এটাই হলো বদলানো।

এবার আমি চাঁদের ব্লেড গল্পের উদয় ভানু নামের পুলিশ কর্তাব্যক্তিটির কথা বলি, সে কিন্তু আর লিখতে পারছে না। কারণ আমার মনে হয়েছে, সে তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার বাইরে আসতে পারছে না।
এটা শুধু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়, আসলে সে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমরা যদি নিজেদেরকে কোনো রেজিমেন্টেশান আটকাইয়ে ফেলি, তা খাকি বা শাদাকালো বা লাল যে পোশাকই হোক বা পার্টির ফ্রেমই হোক, তাহলে কিন্তু তার পক্ষে ফৃ শিল্পচর্চা করা মুশকিল।

আমি আপনার বিষয়গুলো ক্লিয়ার করে ধরতে পারছি না। তাহলে যৌথচৈতন্যের বিকাশটা কিভাবে হবে?
ওই যে বলছিলাম, যৌথঅবদমন থেকে যখন আমরা বেরিয়ে আসতে পারব, তখনই ওই চৈতন্যেরও বিকাশ ঘটবে।

আচ্ছা, তাহলে রাষ্ট্র সম্পর্কে আপনি কেমন আকাঙ্ক্ষা লালন করেন? সেখানকার মানুষজন, প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, মিলিটারি কেমন হবে?
এখানে দুইটা জিনিস আছে, এই সময়ে বসে রাষ্ট্রহীন পৃথিবী কল্পনা করা মুশকিল। আর হচ্ছে, ইহজাগতিকতার ভিতর অমরত্বের বিষয়টা সার্বিকভাবে এভাবে জাগিয়ে রাখতে হয়। মানুষ কখনই সমস্ত কিছু পাওয়ার পরও সন্তুষ্ট হবে না। মানুষের আল্টিমেট আনন্দের কোনো জায়গা নাই। মানুষ আনন্দের ভিতরও দুঃখ বা অবসাদের জায়গাগুলি থাকবে। এটা বোধ হয় মানুষের জিনের একটা ব্যাপার।

আচ্ছা, তাহলে আপনি বলুন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন, ধর্ম বা ঈশ্বরের সাথে আপনার বোঝাপড়াটা কেমন?
ধর্মের কিন্তু এক চেহারা নেই, টাইম টু টাইম এর চেহারার বদল হয়। যেমন ধরুন, একপক্ষ বলছে, এর কোনো কার্যকারিতা নেই। অন্যপক্ষ বলছে, এটাই বারবার কার্যকর হয়ে আসছে। ধর্ম নানান সময়ে নানান কাজ কিন্তু করছে। একই সময় সে দর্শনের প্রভুত্ব দেয়, আবার মনস্তাত্বিক বা সামাজিক শৃঙ্খলার নির্দেশনা দেয়। সে একটা কর্পোরেট এমবিএ’র মতো সবকিছু জোড়া দিয়ে দিয়ে করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিন্তু বিভিন্ন যায়গা থেকে ভাল ভাল জিনিস নিয়ে একটা কিছু করে। অর্থাৎ বিজ্ঞান যে জিনিসগুলো খুঁজে বের করে, অর্থনীতি যার রহস্য জেনে যায়, মনস্তত্ব যে কৌশলের কথা বলে, চলমান ধর্ম কিন্তু তা ধার করেই তার নির্দেশনা গুলি তৈরী করছে। তারপর সে তার ব্র্যাণ্ড লাগাচ্ছে। সমস্যা এই ব্যাণ্ডিং এর। আমি যদি চাই লাল রঙের কাগজ তো সাদা রঙের ফেরিঅলা এসে আমাকে জোর করে তা কেনাচ্ছে। আমার কাগজ না লাগলেও তা কিনতে হবে। এখানেই ঝামেলা হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যখন পাওয়ার পলিটিক্সের সাথে পাল্লা দিচ্ছে, তখন সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে ক্ষমতাহীন মানুষদের। লোকাচারের জিনিসগুলো ধর্ম কখনও কখনও নিয়ে নিচ্ছে। এবং সে তা প্যাকেটজাত করছে। আমাদের লালন নিজের মতো করে ব্যক্তিগত অর্জন, ব্যর্থতা, বিশ্বাস নিয়ে মানুষের মনের মধ্যে যাচ্ছে, কি দরকারীই না হয়ে উঠেছে। তার জন্য তো কোন ব্র্যাণ্ডিং দরকার হয় নাই। কি হবে আর বলে, এই দেখো লালন কিন্তু মুসলিম বা অন্যরা যদি বলে, লালন মুসলিম হলেও হতে পারে, কিন্তু তার জন্ম তো হিন্দুঘরে বা কেউ যদি বলে, না, সে ছিল সুফিবাদী। আসলে সে কিন্তু নিজের জীবনযাপন, নিজের অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদি দিয়ে তার নিজস্ব জিনিস তৈরি করছে। যা নিজস্ব আবার সবার। কারণ মানুষ তো সমবেত ভাবেই যায়। সে কিন্তু নিজে একা কিছু করার কোনো ব্যাপার না। দেয়া-নেয়ার ব্যাপারটা আসলে ওই জায়গাটাই, কথা হচ্ছে, দেয়া-নেয়ার এই ব্যাপারটা আমার ক্লিয়ার থাকা দরকার। একজন ধর্মের লোক যখন মানববোমা হচ্ছে, তখন কিন্তু সে নিজেকে তার প্রভুর কাছে উৎসর্গ করছে না, সে একটা রাজনৈতিক শক্তিকেই তা উৎসর্গ করছে। কারন প্রভুর কাছে উৎসর্গ করতে বোমা নয়, একটু ধ্যানই যথেষ্ট। এই জিনিসটা আমাদের বুঝতে হবে। এই জিনিসটা যদি বুঝি তাহলে নেয়া-দেয়ার ব্যাপারটাও পরিষ্কার হবে।

ঠিক আছে, এবার আপনার গল্প নিয়েই ফের কথা বলি। আপনার গল্পগুলির ভিতর বাসেত হিরনচি অত্যন্ত প্রিয় এবং সমকালের ভয়াবহ বাস্তবতার এক নিগূঢ় চ্ছবি। আপনি এর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
একটা বিষয় তো সত্যি যে, আমি আনঅর্থোডক্স প্রসেস খুব পছন্দ করি। আমি নিজে কিন্তু বৈচিত্রময় জীবনযাপন করে থাকি।

এখনও আপনি তাই করেন?
তা বলতে পারেন। এই গল্পটি যখন লিখি তখন কিন্তু হিরনচিদের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। দিনটা শুরু হয়তো পাঁচতারা হোটেলে অফিস করে, আবার রাতটা ওদের সাথে। যেমন, ইদানীং একটা বিষয় খেয়াল করছি, রাস্তা দিয়ে চলার সময় অনেকেই দেখবেন চরম উদাসীন, কে আসলো কে গেল কোনোই খেয়াল নাই। আমি কিন্তু লোকজনের মুখের দিকে তাকাই। আমি ভাবি, আচ্ছা, আমি এই কাজটা কেন করি! আমি কি কাউকে খুঁজি? এই তো গতবছর আমার ঘনিষ্ট একটা বন্ধু মারা গেছে। তার সাথে একেবারে বালককাল থেকে দীর্ঘসময় একসাথে আমার কাটছে। তার জীবন ছিল খুবই বর্ণাঢ্য, সে সামরিক অফিসার ছিল, নিজেও একটা আনঅর্থোডক্স লোক আর-কি। যখন যেটা করা দরকার সেটাও করত, আবার উল্টাটাও করত। তো হয়েছে কি, ও মারা যাওয়ার পরে একদিন দেখি কি ও আমার সামনের রিক্সায় করে যাচ্ছে, দেখতে দেখতে ওর রিক্সাটার কাছে যাবার আগে আমি জ্যামে আটকাইয়া গেলাম। ও কোথায় যেন চলে গেল। আবারও ওকে আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখতেছি। আমার মনে হচ্ছে, মৃত্যুটা কি বাসা বদল। মানে ও হয়ত মোহাম্মদপুর থেকে উত্তরায় গিয়ে থাকতেছে। বাসেত-কে আমি চিনতাম। ওর ঘরে গেছি। ওর অনেক কথাই বলা বাকি আছে। যদিও ওর প্রথম বউ এখন খুব ভাল আছে, কিন্তু কবরে নিশ্চই ওর হাড়গোড়গুলিও আর আগের জায়গায় নাই।


আপনার 'কাছিমগালা' খুবই দরকারি এক গল্প মনে হয়। এর পটভূমি সম্পর্কে বলুন।
এখানে কিন্তু দুইটা জিনিস ছিল, আমরা যখন এগ্রিভার্সিটিতে পড়তাম, তখন ক্যাম্পাসটা আমাদের কাছে পুরা একটা সাম্রাজ্যের মত ছিল। আমরা যারা যা যা করার দরকার না তাই করতাম। সেখানকার স্টুডেন্টদের লাইফটা হচ্ছে, ওরা ক্লাশ করবে, পড়বে, সন্ধ্যায় রাস্তা দিয়ে একটু হাঁটবে; পাকারাস্তায় হাটবে, হলে ঘুমাবে এই আর-কি। আমরা পাকা রাস্তাকে অগ্রাহ্য করতাম। সবাই হয়ত ডাইনিং হলের দিকে যাচ্ছে, আমরা চায়ের দোকানে চইলা গেলাম। গল্পটা নিয়া যখন সেইসময়কার বন্ধুদের সাথে বলি তারা বলে যে, ওরা মনে করে এই গল্পটা লিখেছে ওরাই। মানে কাছিমগালা একটা সবার গল্প। ওইসময় আমি নিজেও ভাবতাম যে আমি বলে কিছু নেই। এটা যৌথমনের একটা ব্যাপার বলেই ধরে নিতাম। কারণ মানুষ তো একলা জীবনযাপন করে না। এইভাবে যুক্ততার ভিতরই কিছু হয়। আর তার নিজের জিনিসগুলি তো তার ভিতরে থাকেই, আবার অন্যের জিনিসগুলিও তার ভিতরে থাকে।
আমি ময়মনসিংহের পাঠ চুকাইয়া যখন জব লাইনে আসি, তখন আমার জবটাও ছিল এইরকম যে আমি অনেক জায়গায় ঘুরতাম। গল্পটাতে বিভিন্ন এলাকার বিষয় আছে। ময়মনসিংহের ভাষা তো আছেই, আবার মূল ক্যারেক্টারটা চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসলেও, সে কিন্তু রংপুর থাকত । যার ফলে সে কোন নির্দিষ্ট জায়গারও না।

সেখানে আপনার নিজস্ব উপস্থিতিও কিন্তু আমি টের পাই।
সটা তো আছেই, আমি যতগুলি গল্প লিখছি, তার কোনোটাই আমার অচেনা নয়। তো, যা বলছিলাম, আমি দেখতাম, ওই লোকটা নদী দিয়ে কাছিম শিকার করতে আসত। আবার সবাই মিলে শ্মশান-টশানে আড্ডা দিতাম যখন, তখন আমার শ্মশান বন্ধুরা রূপকথার গল্পের মত করে তাদের বাস্তবজীবনের গল্প শোনাত। এইসবের একটা যৌথ ব্যাপার ছিল। এটা কিন্তু আমার বিবাহপূর্ব জীবনের গল্প। তখন আমি ভাবতাম যে আমি বিয়ে-টিয়ে করব না। এটা নিয়া খুবই ইতরামি করতাম। ওইটাকে এস্টাব্লিস্ট করার তাগিদে ছোট্ট ইউনিটের একটা ফ্যামিলি আনলাম। এইসব ভাবতে-ভাবতেই বোধ হয় গল্পটটা তৈরি হইছে। এটা কিন্তু একটা অবাস্তব কন্ট্রাস্ট।

আপনার গল্পে দেখা গেল, মানুষ হয়ত বৃক্ষ হয়ে যাচ্ছে, মানুষের পেটে তিনশ বছর জীবনপ্রাপ্ত একটা কাছিমের বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, তাহলে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা আপনাকে তৃপ্ত করে না? আপনি কি মানুষের ভিতর প্রাণীর রূপান্তর নিয়ে কিছু ভাবেন?
না, তা না, আমি আসলে জীবনকে খুবই ক্রুড জায়গা থেকে ভাবি। কাছিমগালা গল্পটার কথাই ভাবেন - এখন কিন্তু ইউনিট ফ্যামিলি আরও আলগা হয়ে গেছে। এখন আর শতপুত্রের জননী না, এখন সন্তানহীনতাই যেন গৌরবের বিষয়। স্বাধীনতা শুধু নয়, দায়িত্বমুক্তি, স্বার্থপরতা ইত্যাদি বেড়ে যাচ্ছে। ওই টেক্সচারের ভিতর ক্লান্তিও চলে আসছে। শহর বলেন, আরবানাইজড ভিলেজ বলেন, সেইসব জায়গা ইনফর্মেশন বা ইলেকট্রিসিটির জন্যই হোক, মানুষর ক্ষুদ্র জগৎও অনেক বদলে যাচ্ছে। আর্বানাইজেশন, জিনিসপত্রের দাম বাইড়ে যাওয়া, রিসোর্স কমে যাওয়া - এসবের ফলেই একটা পরিবর্তন কিন্তু স্পষ্ট হয়ে গেছে। আর এইসব মানুষের চিন্তাজগতে ক্ষয় করে দিচ্ছে। একটা ছোট্ট ফ্যামিলির একই চেয়ার-টেবিল, সংসারের ২/৩ টি ফিক্সড চেহারাও তাকে ক্লান্ত করছে। অন্যত্র সরে যাওয়ার জন্য তাকে প্রণোদিত করছে। মানুষের ভিতর ইহলৌকিক অমরত্ব পাওয়ার বিষয়টা কিন্তু ইনহেরেন্ট। সে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেই পারে। বিকল্প অমরত্বের বিষয়টাও সে ভাবে।

'একটা অত্যন্ত সাধারণ বিকাল' আমার কাছে একটা খুবই ভয়াবহতম গল্প মনে হয়। আপন ভাইয়ের সামনে বোনটার সেক্সুয়েল হেরাজমেন্ট একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার মনে হয়েছে। সেই সময়কার সামাজিক বাস্তবতা কি ওইরকম ছিল?
এটা আসলে পুরা ফ্যান্টাসি ধরনের গল্প। গল্পের স্টোরিলাইনটা কিন্তু বেশি না। এই গল্পের মূল টার্গেট হলো একটা সিচুয়েশনকে প্রকাশ করা। একটা ডেস্ট্রাকশনকে যদি চিহ্নিত করতে চাই তাহলে কী করা যেতে পারে। গল্পটা হচ্ছে, ফ্যান্টাসি নিয়ে কথকতা হচ্ছে - চলো ভাবি এই রকম। এটা হচ্ছে সেইধরনের গল্প। এটা তাই রিয়েলিটির চেয়েও হার্স। কিন্তু রিয়েলিটি কি এর চেয়ে ক্রুয়েল নয়?

আচ্ছা, গল্পের আলাপসালাপের একটা সাধারণ জায়গা থেকেই আপনাকে প্রশ্নটি করা যাক, এমন কোনো গল্প কি আছে যেখানে সরাসরি আপনাকে চিহ্নিত করা যায়?
আসলে সব গল্পের ভিতরই কিন্তু আমার নিজের জিনিস আছে। আমি নিজে লিপ্ত হওয়া ছাড়া কোনো গল্পই লিখতে পারি না। কোনো না কোনোভাবে আমার একটা জায়গা তো অবশ্যই আছে।

এইখানে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই, বিষয়টা হচ্ছে গল্পের মালিকানা বলতে যে বিষয়টাকে আমরা এস্টাব্লিস্ট করি, তা কি শুধুই একজন গল্পকারের? কারণ এটা পরিষ্কার যে, আমরা এটা প্রত্যক্ষ করি - গল্পের চরিত্র, বিষয়, ভাষা, গল্পের ইতিবৃত্ত প্রকাশনা মাধ্যম, মুদ্রণযন্ত্রের প্রিভিলেজ ইত্যাদি অলরেডি আমাদের সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আছে। আমি যখন একজন লেখক হিসাবেও নিজের নামটি যুক্ত করি, তখনও খানিক বিহ্বলতায় ভোগি - নিজেকে কখনও কখনও স্রেফ সংগ্রহকারী বা গল্পের সংযুক্তকারী মনে হয়।
এটা কিন্তু খুবই চমৎকার একটা প্রশ্ন। এই বিষয়টা নিয়ে আমিও খুব ভাবি। তা-ই একটা একটা করে বলি। এই ব্যাপারে আমি একদম মনে করি যে, এইগুলির মালিকানা বলতে কিছু নাই। গল্পগুলির পাঠ নিয়েই আমার বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হইছে। একজন এসে বলতেছে, আমি কাছিমগালা গল্পটা তো দেড়শ বার পড়ছি। তাতে গল্পে তার একধরনের ইনভলভমেন্ট হয়ে গেল। আরও নানান জন নানান কথা বলছে। গল্পটার ব্যাপারে সেইসময়কার বন্ধুদের কথাতো আমি বলেইছি। গল্পের সাথে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাও বলা হয়েছে। তো ওই পাঠকদের ব্যাপারে বলা যায়, ওরা যখন কোনো গল্পপাঠ করে, তখন আমি ব্যক্তি হিসাবে তো থাকি না। আমারও তাই হয়, আমি যখন কারও লেখা পড়ি, তখন লেখক তো আমার কাছে থাকে না। লেখক তো নিজে বলে দেয় না যে এটা এই জিনিস। আমি কিন্তু আমার বোধ দিয়ে একটা অল্টারনেট জিনিস তৈরি করছি। কথা হচ্ছে, একটা গল্পের লেখক শুধু একজন না, লেখক তো পাঠকসহই লেখক। পাঠকও এটাকে তৈরি করতেছে। ভালো লেখাগুলোর বোধ হয় এটা একটা গুণ। আরেকটা কথা হলো স্টোরিলাইনের কথা যেটা বলছেন, ঠিক আছে, সেটা ফাইন - কিন্তু একটা জিনিস আপনার একটু মনে করতে হবে, সাহিত্যের কিন্তু নিজের কিছু জিনিস আছে যেটা লেখক হিসাবে টাইম টু টাইম করতে হয়। যেমন দেখুন ভারতচন্দ্র যখন কবিতা লিখতেছে, সেগুলি কিন্তু কবিতায় উপন্যাস। তখন কিন্তু তাকে অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করতে হইছে। একই সাথে তাকে রাজসভা মনোনয়ন করতে হইছে। তাকে ইনফর্মেশন দিতে হইছে। তাকে বিভিন্ন ক্যারেক্টার তৈরি করতে হইছে। তাকে তার এভ্‌রিডে লাইফের স্কেচ করতে হইছে। তাকে সেসব আবার বর্ণনা করতে হইছে। একেকটা সময়ে একেকজন লেখক একেকটা দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের এই সময়ে এসে সে অনেকগুলো মিডিয়া পাচ্ছে যার জন্য তাকে সিনেমার নাচ গান, পত্রিকার খবর, ক্যাবল টিভির ব্রেকিং নিউজ দেবার দায়িত্ব নিতে হয় না। তাহলে একটা পাঠযোগ্য গল্পের দায়িত্ব কি হতে পারে? সে এখন অনেক কিছুতে মগ্ন হতে পারে। তার জন্য এখন আরও বেশি মুক্ততা অনুভব করার সময়। তার মানে হচ্ছে, আপনি যে স্টোরিলাইনের কথা বলতেছেন, কথকতার কথা বলেন, এর সব কিছুতেই আপনি অপ্রচলিত অনেক কিছুর প্রয়োগ করতে পারেন। নতুন কিছু আনতে পারেন। এটাকে আমি ব্যবহার করতেছি, কারণ আমি তো একটা গল্প বলতে গিয়ে একটা গল্পই বলতেছি না, অনেকগুলো গল্পই বলতেছি। বলার কায়দাটাও খুজতেছি।
এটা কিন্তু অন্য সবার ক্ষেত্রেই হওয়ার কথা।
তা তো নিশ্চয়ই। আমি তো শুধু আমার কথা বলতেছি না। অন্যদের কথাও বলতেছি। সে কিন্তু জিনিস বোঝানোর কায়দা বের করছে, বৈচিত্র আনছে, এই যে সে এত জিনিস দিচ্ছে, এটা কিন্তু একটা কাজ। সে এই কাজগুলো করছে বলে গল্পকার হিসাবে তার নামটি যেতে পারে। আবার ওই কথাও ঠিক যে, পাঠক যখন গল্পটি পড়ছে তখন কিন্তু সে কিছু আবিষ্কার করছে। কারণ গল্পকার তো সেখানে নাই, সেখানে শুধু তার স্টেটমেন্টটা আছে। একজন লেখক তার সৃজনীশক্তি দিয়ে গল্পটি তৈরি করে, ডিটেইলে যায়। আবার একজন গুড-রিডারও তা করতে পারে। এখানে সময়টাও একটা ব্যাপার।

আচ্ছা, আপনার গল্প পড়ে কখনও কখনও আমার মনে হয় যে, মাহমুদুল হকের ভাষা, উপমা, শব্দের দ্যুতিময়তা আপনাকে খুবই আকর্ষণ করে। তাঁর ভিতরে যে বিষয়গুলি একটু সহজভাবে বলে দেয়া, একটু হেয়ালিপনা, অপ্রচলিত উপমা ব্যবহার - এসব কিন্তু আপনার লেখায় পাই।
শুধু মাহমুদুল হক নয়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক বা অন্য লেখকদের লেখাও আমি ভালোভাবে পাঠ করেছি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, দীপেন্দ্রনাথ বলেন, বুদ্ধদেব বসু, সতীনাথ ভাদুড়ি, কমল কুমার... তারাশংকর, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এঁদের যে কথা বলার ভঙ্গি তা আমার ভীষন পছন্দের। আমার কথকতায় এঁদের প্রভাব থাকবে না তো কার থাকবে? এটা আমি ভাবতেও পারি না যে তা কিভাবে হয়। তা হয়ত গদ্যের নিজস্ব পদ্ধতির কারণে হতে পারে। আমি কিন্তু অনেক লেখকের মতো নিষ্ঠুর বা মোলায়েম দুইধরনের গল্পই লিখতে চাই। পৃথিবীর অনেক লেখকের ভিতরই এই জেনেরিক কোয়ালিটির মিল আছে ।

গল্পকারের লেখার বিষয় তো এল, এখন আপনার সময়ের মানে ৮০-এর কোন লেখকের নাম কি বলবেন যাদেরকে আপনার উল্লেখযোগ্য মনে হয়।
একটা লেখাকে মুগ্ধতার চোখে দেখা একজিনিস আবার ক্লিনিক্যালি দেখাটা ভিন্ন জিনিস। আমরা যেহেতু সমসাময়িক লেখক, আমাদের অনেকেরই জেনেরিক মিল আছে, তবে অমিলটাও কম না। আমার সময়ের গল্পকারের লেখা অবশ্যই পড়ি। তবে সেখানে লেখাটির ট্রিটমেন্ট, ভাষার ধরন, একটা চরিত্রের কয়েকটা মুহূর্ত এই সবই আমাকে ভীষন আনন্দ দেয়, আবার গভীর বিষাদে থরে দেয় ওদের কোন কোন চ্যুতি তে। আমার সমকালীনদের ভিতর অনেকেই ভালো লিখেছেন এবং ভবিষ্যতেও ভালো লিখবে।

এবার ভাষা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক, এইক্ষেত্রে এও বলতে হয়, আপনি কিন্তু ভাষার বেশ জোর দেন। এর ভাঙচুর করেন। ভাষায় আঞ্চলিক আবহ দেন, লৌকিক ক্রিয়াও অনায়াসে ব্যবহার করেন। তো ভাষার এই যে ধরন তা কি মানভাষার মান রাখার ব্যাপারে কোনো সমস্যা করে না।
জীবনযাপনের একটা ব্যাপার। ভাষাও সেইভাবে আমার লেখার ধরনে বদলায়। এমন কথা চালু আছে যে, ইলিয়াস পুরানো ঢাকার বদ্ধভাষা নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। আচ্ছা, ইলিয়াস যদি এখন একটা লেখা লিখতেন, তাহলে ঢাকার চতুর্প্রান্তে যে নতুন ঢাকা তৈরি হচ্ছে, সেখানে কি একটা মিক্সড ভাষার সন্ধান তিনি করতেন?। একজন হয়ত কৃষিজীবীর আবহ থেকে শ্রমিকের আবহতে মিক্সিং হচ্ছে। ভাষাও কিন্তু ওইখানে নতুনভাবে তৈরি হয়। আসলে প্রাণময় ভাষা তো ওইটাই। আমার ধারণা, ইলিয়াস এই সময়ে লিখলে কিন্তু ওইরকম ভাষাতেই লিখতেন। জীবনের প্রয়োজনে যে ভাষার উদ্ভব সেটাই তো আসল ভাষা। মানে হচ্ছে, ইহলৌকিকতা, পারলৌকিকতা, ভালোবাসা, যৌনতা ইত্যাদির প্রয়োজনেই নতুন ভাষাভঙ্গি পাওয়া যায়। মাহমুদুল হকের ভাষায় দেখবেন কলকাতার একটা স্টাইল আছে। এটা ঠিক পুর্ববঙ্গীয় নয়। পরে জানা গেল, ওঁর মা ওইভাবে অলঙ্কার দিয়ে কথা বলতেন। আপনার কথকতার জন্য একটা স্টাইল তো আপনাকে খুঁজে নিতেই হবে। স্টাইলই ভাষাকে কাছে টেনে নেয়। সৃজনশীলতা, বলার বিষয়, শিল্পতা এসবকিছু মুক্ত ভাষাকে নতুন মাত্রা দেয়। মুক্ত ভাষা ছাড়া সাহিত্য হয় না এবং এসবই মাননীয় ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে। এমন কোনো কিছু সাহিত্যের ভাষা হতে পারে না যা সৃজনশীলতার গভীরতা দিবে না। আঞ্চলিকতা কিন্তু একটা বিশেষ জিনিস, এটা এক ধরনের আদিগোষ্ঠির এক্সপ্রেসন। আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা বই হচ্ছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আঞ্চলিক ভাষার অভিধান। এর সব শব্দ দিয়ে সাহিত্য হবে না, কিন্তু এ ভিতর যে সৌন্দর্যটা আছে, উদাহরণে যে কথা বলার ভঙ্গিটা দেয়া আছে, তা জরুরী। আপনার কান-এর রেওয়াজ করার জন্য। আঞ্চলিক ভাষার টেকনিকটা আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। মানুষের কথাভঙ্গিই হয়তো চিন্তা।

আচ্ছা, আপনাদের ফৃ স্ট্রিট স্কুল নামের লিটল ম্যাগাজিন-এর পরবর্তী পরিকল্পনা কি?
আমি এটা চালিয়ে যেতে চাই। একেক সময় একেক ফর্মে হয়ত। যেমন গতবছর চারটি কাব্য গ্রন্থিকা বেরিয়েছে: খায়রুল হাবিব-এর 'গরম কাদার ক্যান্টো', আহমেদ মুজিব-এর 'শুধু টের পাই আমি', আবু আহসান-এর 'সেলিমের চোখ' আর আমার নিজের 'আমার শ্বাসমূল'। এবছর বের হচ্ছে চয়ন খায়রুল হাবিব-এর চতুর্দশ পংক্তির কবিতা বই ‘রেঙ্গুন সনেটগুচ্ছ’ ও আমার কবিতার ইংরেজি রূপান্তর 'Hullabaloo or Tacit’

আমরা দেখেছি, একসময় আপনি শুধু লিটল ম্যাগাজিনেই লিখতেন, কিন্তু পরবর্তীতে আপনার লেখা প্রথম আলোতেও দেখলাম। এটা কি একধরনের বিচ্চুতি নাকি বড় কাগজে লেখাটা দরকারি কাজ মনে করছেন?
এইক্ষেত্রে আমি আমার মূল ট্রেইন্ডটা কি তাই বলি। আমার মূল এটিচিউড কিন্তু আনঅর্থোডক্সকে প্রাধান্য দেয়া। আমি যখন শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিনেই লিখছি, তখনও কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনপনার ভিতর ছিলাম না।

এই পনাটা কি?!
পনাটা হলো প্রিটেনশন, আপনি যদি চোখ বন্ধ করে দশটা লিটল ম্যাগাজিন নেন, তাতে এর লেখক নির্বাচন, সম্পাদকীয়, ছাপার পদ্ধতি, টাইপ সেটিং, এই-সেই সব একই। আমি মনে করি, লিটল ম্যাগাজিনচর্চা হবে একটা গ্রুপের ব্যাপার - তা বিশেষভাবে একসাথে হওয়া, কাজ করা। এই গ্রুপে পাঁচজন যদি থাকে তারা পাঁচরকম লিখবে। তাদের বিশ্বাসও একরকম না। ওরা সবাই মিলে একটা বিশেষধরণের বিশ্বাসকে ধারণ করে। তাদের কাছে ক্রিয়েটিভিটিটাই মুখ্য। আমার কাছে মনে হয়, লিটল ম্যাগাজিন শব্দটাই এই পারপাস সার্ভ করে না এখন। আর প্রাতিষ্ঠানিকতা বলেন? সেটা কী? আমরা যেটাকে রেজিমেন্টেশন বললাম তা শুধু পোষাকেই নয়, অন্য অনেক কিছুতেই প্রকাশ পায়। সাহিত্যের শত্রু হচ্ছে এই রেজিমেন্টেশন, আপনি কি কোন ফ্রেমের ভিতর আটকে বসছেন কিনা। লিটল ম্যাগাজিনের সাথে যখন কেউ তার ক্যারিয়ার, পেশা, স্বার্থের ব্যাপার যুক্ত করে ফেলে, তখন কিন্তু তার এখান থেকে প্রস্থানের সময় হয়ে এসেছে। আমি মনে করি এটা হল বিজ্ঞাপন বিরোধী লাভবিহীন একটা চেষ্টা যার উদ্দেশ্য সাহিত্য প্রকাশ আর লক্ষ নতুন মাত্রা। কম বয়স হলেই যেমন লিটল ম্যাগাজিনের ফৃ ভিসা পাওয়া যাবেনা, তেমনি আজীবন পাসপোর্টও কেউ এর কাছ থেকে পায়না। আমার দৈনিকে লেখালেখির কোন স্পষ্ট কোন কারন বা উদ্দেশ্য নাই। কারণ এর থেকে কোন ফায়দা-ই আমার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। আপনি করেন? তাহলে বলেন তো শুনি। আগেই বলেছি সব ধরণের প্রিটেনশান থেকে মুক্ত থাকাই আমার চেষ্টা। জগতে নেই কোন বিশুদ্ধ পত্রিকা।

এটাও কিন্তু রাজনীতির ব্যাপার, সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিষ্ঠানের ঝামেলা ইত্যাদির জন্য ক্রিয়েটিভিটির একটা যথার্থতার ব্যাপার তো আছেই।
এখানে প্রত্যেকটা জিনিসই লেখকের প্রতিপক্ষ। যে প্রকৃত ক্রিয়েটিভ, সে তো যেটা নাই সেটা সে করতাছে। আপনি যে একটা ক্যারেক্টার নিলেন, ধরেন সে দেশের ল এন্ড অর্ডারএ সন্তুষ্ট না। সাহিত্য যদি সত্য প্রকাশের জিনিস হয়, তাহলে তো অটোমেটিকেলি আপনি এর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছেন। রােষ্ট্রর প্রতি অসন্তুষ্টি আপনার লেখায় চলে আসবে। একটা এরোগেন্ট মানুষ চলে আসবে। বাই ডিফল্ট, আপনি বাউন্ড টু ডু দিস। কেউ যদি সেটা না করে তাহলে তো সে লেখকই না। আমি এই ব্যাপারে খুবই চরমপন্থি আর-কি। এটা যদি সেই লেখককে বুঝাতে হয়, তাহলে তাকে বলা দরকার, এখানে তোমার দরকার নাই, তুমি চলে যাও। আর যদি তুমি বুইঝাই থাকো তাহলে তুমি বুইঝাই এই কাজটা করো। আসলে লেখককে লিখেই দেখানো উচিৎ, অন্য কোনোভাবে দেখানির কিছু নাই।

লেখালেখির সাথে প্রতিষ্ঠানের একটা বিরোধিতা কিন্তু আছেই।
তাই নাকি? তাহলে কি বলবেন গাণ্ডীব-এর সাজ্জাদ শরিফ লিখছে না কারণ সে একটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব পূর্ণ ব্যক্তি হয়ে গেছে বলে?

সেই হিসাবে গাণ্ডীব সম্পাদক তপন বড়ুয়ার ডেডিকেশনটাকে কিন্তু আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। আচ্ছা, তাঁর মৌলিক কাজ কি?
তাঁর ডেডিকেশনের ব্যাপারটা তো আছেই। তপন বড়ুয়া গল্প লেখেন, কিন্তু তিনি নিজেও জানেন যে, অনেকদিন তার লেখা নেই। নিশ্চয়ই তার খারাপ লাগে।

আপনি খুব প্রাঞ্জলভাবেই বললেন যে আপনি লেখালেখিরই ভিতরই শুধু থাকতে চান। গল্পের কথিত দুর্দিনে আপনার এই মানসিক তাড়নাটা বজায় থাকার কারণ কি?
এখন বহুকিছুর সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপার আছে। ইনফর্মেশন টেকনোলজির এই যুগে বহু কিছু নিয়ে কাজ করার সুযোগ বেড়ে গেছে। তবে সব কিছুকে একসাথে নিয়ে কাজ করাটা জটিল। গডস আর মেনি বাট আই এম এলোন। যার ফলে বহুকিছুর জরুরী চাপ থেকে বাঁচার জন্যই লেখালেখিটা বেশি দরকার। সহজের সহজ আর জটিলের জটিলকে প্রকাশ করার জন্য লেখা ছাড়া আর কোন উপায় নাই।

গল্প নিয়ে কিন্তু একটা কথা চালু আছে যে গল্প নাকি মরে যাচ্ছে! গল্পলিখনের ভাবসাব সম্পর্কেও কিছু বলুন।
এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপার। মরে যাওয়ার বিষয়টা কিন্তু অনেক দিন থেকেই চালু। কবিতা মরে যাচ্ছে, গল্প মরে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের পরে তো সবকিছুই মরে গেছিল! ঘূর্ণিঝড়ের পর কি সুন্দরবন মরে যায়? তবে হ্যা, পুরানো মরে যায়, নতুন জন্ম নেয়। আসলে ভালো লেখার সাথে ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্টই বড়ো কথা। সে লিখতে পারে কিনা সেটাই হলো কথা। লেখক কিন্তু ওয়ার্কশপ করে বানানো যায় না, ভাল লেখাও। তবে সাহিত্যের একটা প্রিটেনশান হচ্ছে, আমরা এটা বলতেই আগ্রহী যে কিছুই হচ্ছে না। কিছু হলে সেটা বলতে আমরা অনাগ্রহী। আমি গত পনের বছরেও ট্যালেন্টেড ক্রিটিক দেখি নাই। আপনি কথার শুরুতেই গল্পের ওরাল হিস্ট্রির কথা বললেন তো - আসলে আমাদের যা কিছু তার সবই অরাল। এখানে কেউ কাগজে-কলমে কিছু করতে চায় না। এই যে এত আগ্রহ নিয়ে আমরা আজকে বসেছি, এই যে আমার আগ্রহটা আপনি ডকুমেন্টেড করতেছেন, এটাই কিন্তু আমাদের রক্তের মধ্যে নাই। কেউ দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলে না। খালি পুস্তক পরিচিতি। যে ক্রিটিক, সে দুইদিন পরে ফুকো-দেরিদা-ড্যেলুজ ইত্যাদিতে ঘুরপাক খাইতে-খাইতে তার আসল কাজ করা হইয়া ওঠে না। সে আর বোঝেই না যে আমাদের নিজস্ব পৃথিবীটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব। সে খালি মার্কসের ইশতেহারের আওড়ায়, দুনিয়াকে বদলানোর আগে নিজেকে বদলাও। খালি বলে বদলাইতে, খালি বদলানোর কথা বইলা গেলাম - কি বদলাইতে হবে তা আর বললাম না। ঠিক আছে, এরা ফুকো-দেরিদার কথা বলুক, কিন্তু এটাকে দিয়ে তো নিজের বদলানোর জায়গাটা এক্সপ্লেইন করতে হবে। সেইদিন একটা ছেলের সাথে কথা হলো, সে বলছে, আমাদের এখানে পোস্টকলোনিয়াল লেখক নাই কেন? আমি বললাম, এটা তো ভাই এরকম প্রশ্ন হলো যে ঢাকা শহরে একটা সুন্দর পাহাড় নাই কেন। যেটা নাই সেটা নিয়া আপনি কেন মাথাখারাপ করছেন! যেটা আছে সেটা নিয়া কথা বলেন। জ্ঞানের একটা বিষয় হচেছ, এইটা সর্বত্র একরকম থাকে না। প্রয়োজন একে লোকালাইজ করা। এটা করতে না-পারলে এর প্র্যাকটিক্যাল ইউজটা হয় না।
লালনের অনুসারীরা কিন্তু গুরুবাদে খুব বিশ্বাসী। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি তা হচেছ, নিজেকে আনন্দ দেয়ার জন্য, আনন্দের সাথে নিজেকে বদলানোর জন্য যেখানে যার কাছে যাওয়া দরকার তাই যাওয়া উচিৎ। আমি আমার লালনবান্ধবদের কাছে কোনো এক জলসায় ‘টেসিট’ শব্দটি বলেছিলাম। মানে হৈচৈ-এর ভিতর থেকে যে নিরবতা গড়ে ওঠে তার কথা তুলেছিলাম। ওরা বিষয়টাকে খুব সায় দিয়েছিল।
আমরা কিন্তু পাওয়ার স্ট্রাকচার, রিএকশান ইত্যাদি দিয়ে কিছু বুঝতে চেষ্টা করি। এখন দেশটা যেভাবে বদলে যাচ্ছে, এর ভিতরে থেকে এর বিশৃংখলা থেকে সমাজের শৃংখলাটা বুঝতে হবে। হৈ চৈ থেকে নিরবতাকে বুঝতে হবে।

আপনার সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগল, আপনাকে বেশ কালারফুল মানুষই মনে হচ্ছে।
কালারের কী আর দেখলেনরে ভাই, সেই দিন তো আর নাই। হা...হা...হা...

২৫-০১-০৮/সকাল ১১-দুপুর ২টা
ধানমণ্ডি/ঢাকা