মাসুদা ভাট্টি
এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে, মুখে চুন, কালি, চুন-হলুদ মিশিয়ে লাল রং বানিয়ে সেটা মেখে, পাটের “ফেউসা” দিয়ে দাঁড়ি-গোঁফ বানিয়ে, ছেঁড়া কাপড় বা চটের আলখাল্লা পরে এ বাড়ি থেকে ওবাড়ি যাচ্ছে, তাদের মাঝে এক কুমারী, কলাপাতা দিয়ে মোড়া, পাড়ার বউঝিরা আগে থেকেই তাদের চালের কোণায় কুলো গুঁজে রেখেছে, সবাই জানে, আসবে “দ্যাওয়া-নামানিরা”।
উঠোনের কোণে রাখা এক হাড়ি জল, দুষ্প্রাপ্য জল, চৈত্র মাস। গ্রামের পুকুরগুলো প্রায় সবই শুকিয়ে আসছে প্রায়, আর না শুকুলেও প্রচণ্ড রোদে তলা থেকে দলা দলা বুদ্বুদের সঙ্গে শ্যাওলা ভেসে উঠছে, দুর্গন্ধে পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যায় না। শুধু দু’একটি পুকুর, যেগুলো অনেক গভীর, সারা বছর সেখানে কচুরি-দাম পোষা হয়, যাতে রোদে পানি পঁচে না ওঠে, কচুরির লম্বা দাঁড়ি পানির তলায় আটকে রাখে শীতলতা। সেই সব পুকুরের জল ধরা যাবে না, কেবলমাত্র খাওয়ার জন্য তা। যে সময়টার কথা বলছি সেটা খুব বেশি দূরের নয়। মাত্রই পঁচিশ বছর আগের, আবার সেই অর্থে পঁচিশ বছর সিকি শতাব্দীও বটে।তখন আমাদের গ্রামে মাত্র দু’টো চাপকল ছিল। তারমধ্যে একটিতে পানির সঙ্গে গিজগিজে বালি উঠতো বলে, একটার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তো। বেচারা চাপকল চাপ খেতেই থাকতো, খেতেই থাকতো, সূর্য ওঠা-ডোবার আগে-পরে সব সময়।
দ্যাওয়া-নামানি’রা এসেছে। উঠোনের কোণে এসে দাঁড়িয়েছে, সুর ধরেছে,
একজন বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
তারপর সমস্বরে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”।
এরপর দলনেতা একেকটি লাইন বলে আর সমস্বরে সবাই সেই লাইনটি শেষে বলে, “ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়”
এই বাড়ির বিটিরা ঘামে জর জর
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির বিটাগো, পিঠি নুন জাগে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ঝিয়েরি নাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির ছাওয়ালডা সাঁতরাবার পারে না
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির মুরগিডা ট্যাও ট্যাও করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির হাঁসটি জল-বিনে মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির গাইডা ঘাস না পাইয়া মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির দামড়াডা ছট্ফট্ ছট্ফট করে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ি বাছুরডা হামলাইয়াগো মরে
ওরে দ্যাওয়া এই বাড়ি আয়
এই বাড়ির কুত্তাডা তৃষায় ফাইডা যায়
ওরে দ্যাও এই বাড়ি আয়
এভাবে বাড়ির প্রতিটি জীবিত প্রাণীর কথা বলা শেষ হলে বাড়ির হাঁড়ি-কুড়ি, এমনকি ধান রাখা ডোল, গোলা; গুড় রাখার জ্বালা এবং শেষাবধি বাঁশের চটি দিয়ে বোনা পেঁয়াজ রাখার “চাঙ”-এর জন্যও বৃষ্টি কামনা করে
তারপর “দ্যাওয়া” তাকে কি কি দেয়া হবে তার ফিরিস্তি হতো।
যেমন
দ্যাওয়া তোরে দুধ দিবো
দ্যাওয়া তোরে ত্যাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে সিন্দুর দিবো
দ্যাওয়া তোরে ধান দিবো
দ্যাওয়া তোরে পান দিবো
দ্যাওয়া তোরে আম দিবো
দ্যাওয়া তোরে কাঁঠাল দিবো
দ্যাওয়া তোরে শাক দিবো
দ্যাওয়া তোরে মাছ দিবো
দ্যাওয়া তোরে সোনা দিবো
দ্যাওয়া তোরে রূপা দিবো
এরকম দীর্ঘ ফিরিস্তি থাকতো “দ্যাওয়া”র জন্য। সবশেষ যে বাক্যটি বলা হতো তা আমাকে এখনও দারুণ ভাবে নাড়া দেয়।
বলা হতো,
দ্যাওয়া তুই রাইতি আসিস
দ্যাওয়া তুই বিয়ানে আসিস
দ্যাওয়া তুই যহনই আসিস পাবি যুবতী।
এরপর ঘরের চালে গুঁজে রাখা কুলোর ওপর হাঁড়িতে রাখা জল উঁচু করে ঢেলে দিতেন বাড়ির কত্রী। সেই জল কলাপাতা দিয়ে মোড়া কিশোরীর ওপর পড়তো, এবং সেই জলের সঙ্গে আরও জল মিলে উঠোনে কাঁদা করা হতো, এবং সেই কাঁদায় পড়ে গড়াগড়ি যেতো দলের বাকিরা।এরপর বাড়ির কত্রী একমুঠ বা কখনও তার চেয়ে বেশি কিছু চাল এনে দলের কেউ একজনের হাতে থাকা বেতে তৈরি “ধামা”য় ঢেলে দেন। একে পাড়ার প্রতিটি বাড়ি যাওয়া হতো। একেবারে শেষ বাড়ি থেকে যখন দলটি বেরুতো তখন তাদের চেহারা হতো দ্যাখার মতো। কাউকেই ঠিক চেনা যেতো না। কাঁদা গড়াগড়ি দিতে দিতে শরীরে ওপর পুরু কাঁদার স্তর পড়তো। কিন্তু সেদিন দত্ত বাড়ির বিশাল দীঘিটি, যদিও তখন আর দত্ত বাড়ি ছিল না, তার মালিকানা গিয়েছিল রহিম শেখের হাতে, রহিম শেখ শশী দত্তের লাঠিয়াল ছিল এক সময়, ১৯৫০ সালে রহিম শেখের লাঠি শশী দত্তের মাথাটি দু’ভাগ করে দিয়েছিল।
বৃষ্টির কথায় যাই।বৃষ্টির আকুতি শুরু হতো মাঘের শেষ কিংবা ফালগুনেই। ফালগুনের কোনও এক শনি-মঙ্গল বারে বাড়ির বউ “জলি দুধের শিন্নি” দিতেন জলে। সেদিন সকালে উপোষ, শুধু উপোষ নয়, কারো সঙ্গে কথাও বলা যাবে না। খুব ভোরে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে “আগলা চুলোয়” এক দাম দিয়ে কিনে আনা (দোকানী প্রথমেই যে দাম চাইবে সে দাম দিয়েই কিনতে হবে) মাটির ছোট্ট “চৌরা”য় করে একমুঠ আতপ চাল আর এক হাঁড়ি (আমাদের ওখানে দুধ বিক্রি হয় মাটির হাঁড়ি বা পেতলের বদনা মেপে) দুধ দিয়ে শিরনি রান্না করে সেই মাটির পাতিলটি হাতে নিয়ে বউ জলে নেবে যাবে, এক ডুবে শিরনিশুদ্ধ পাতিলটি বসিয়ে দিয়ে আসবে পুকুরের তলায়। জলকে “জলি দুধ” (যে দুধে আর কিছুই মেশানো যাবে না)দিয়ে তুষ্টু রাখা, যদি চৈত্র মাসে কখনও আগুন লাগে তাহলে যেনো হাতের কাছে জল থাকে। অনেকেই হয়তো একে হিন্দু রীতি, কুসংস্কার বলবেন কিন্তু এমনটাই দেখেছি গ্রামের বেশিরভাগ মুসলমান বউকে করতে। আর আগুনের ভয়? সে এক ভয়ঙ্কর রূপ, চৈত্রে যদি কোথাও আগুন লেগেছে, তাহলে সেই গ্রামের আর একটি বাড়িও আস্ত থাকতো না, সে জন্য আগের দিনে দুই বাড়ির মাঝখানে খালমতো কেটে দূরত্ব বাড়ানো হতো বলে শুনেছি।
আর চৈত্রে আরেক ভয় ছিল কলেরার। আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে প্রায় প্রতি বছরই এই কলেরায় গ্রামের কয়েকজনকে ওপারে যেতে হতো। আমার খেলার সাথীদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি হারিয়েছি এই কলেরায়। বৃষ্টির জন্য আকুতির সঙ্গে এই কলেরা থেকে মুক্তির ব্যাপারটিও তাই একীভূত। আসলে কি রেখে কীসের কথা বলবো? এই বৃষ্টির সঙ্গে ফসল বোনা, বিশেষ পাট বোনা, আউশ ধান বোনা এইসব জড়িত। আসলে বৃষ্টির সঙ্গে জীবন জড়িত, আজ বৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে আমি তাই জীবনের ঘ্রাণ পাচ্ছি।
নিজেকে আমার মাঝে মাঝে প্রাগৈতিহাসিক মনে হয়। মনে হয় কারণ, প্রতিবার বৃষ্টির জন্য কলাপাতায় মোড়া হতো আমাকে। আমি কলাপাতার ভেতর ভিজে চুপচুপে হয়ে থাকতাম যতোক্ষণ না পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে “দ্যাওয়া” নামানো শেষ হতো। খুব বেশি খর না হলে বৈশাখেল শেষ দিকে এমনিতেই বৃষ্টি আসে। মাঝে মাঝে দেরি হয় কিছুদিন, কিন্তু প্রতিদিনই বিকেলে আকাশ ভারী হতো। আর আমরা “দ্যাওয়া-নামানি”রা ভাবতাম আমাদের জন্যই বৃষ্টি আসছে। আমরা আনন্দে দাঁড়িয়ে থাকতাম আকাশমুখো হয়ে, বৃষ্টি এলে চাতক হবো, জল খাবো। একদিন ঠিকই বিকেলমুখো রোদ কালো হয়ে যেতো, উত্তর পশ্চিম কোণ থেকে প্রথমে গরম হাওয়া আসতে আসতে এক সময় ঝপাত করে আরামদায়ক ঠাণ্ডা বাতাস আসতো।অবশ্য বাতাসের যে গতি, তাকে ঝড় বলতেই হতো। কিন্তু তাতে কি? ঝড়ের সঙ্গে জলওতো আসতো বৃষ্টি হয়ে। আর সেই বৃষ্টিতে আমি, কলাপাতা পরা মেয়েটি “বৃষ্টিদেবী” হয়ে যেতাম। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বউঝিদের বৃষ্টিতে নামিয়ে সাদা ঠোঁট লাল চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। আমার দেবীত্ব কে কেড়ে নিলো? বয়স? সময়? আধুনিকতা?
আমি বৃষ্টিদেবী ছিলাম, আজ আমার দাওয়া শুষ্ক খটখটে ইঁট-পাথর।
(লেখাটি আমার বালিকাবেলা নিয়ে বিশাল লেখার একটি ক্ষুদ্রাংশ)
স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা
মাসুদা ভাট্টি
আমাকে মাঝে মাঝে ভূত-এ পায়, আমার পাশের মানুষটি এই ভূত-এ পাওয়া আমিকে খুব ভয় পান, আমি নিজেও বুঝি যে, তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন এই সময়গুলিতে। এ যেনো চাঁদগ্রস্ততা এক, হাঁটছি ফিরছি সংসার করছি জীবনের ঘানিতে তেল দেয়ার প্রয়োজনেও নিত্য জীবনক্ষয়কারী চাকরিটিও ঠিকই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমি নেই, এই জীবনে কোথাও নেই। তাহলে কোথায় আমি? প্রশ্নটা করি, উত্তর নেই। এ এক অসম্ভব হেঁয়ালিময়তা, নিজেরই সাথে নিজের। এই সময়টা বেশ কষ্টের।
অনেক দিন আগের এক গল্প বলি। কোনও এক কার্ত্তিক মাসের গল্প। তখন আমাদের ওদিকে ইরি চাষ হতো না। ইরি-র চাষকে সবাই তখনও “বোলোক করা” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল পাচেঁক দূরে আমার ফুপু বাড়িতে তখন সবেমাত্র এই ব্লক করা শুরু হয়েছে।তার ফলাফল তখনও অজানা বলে, আমাদের শুধু বিলের নীচু জমিতে বোরো ধান আর তার চেয়ে আরেকটু উঁচুতে আউশ ধান আর বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের পরে (যার নাম বাইন পড়া) আমন ধান বোনা হোত। আমন ধান বলে আমরা অবশ্য তাকে জানতাম না, জানতাম লক্ষ্মী দীঘা ধান হিসেবে। এই ধান পানির সঙ্গে বাড়ে। যতো পানি ততো ধান, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন দক্ষিণ থেকে জল শুধু আসতেই আসতেই থাকে, তখন এক রাতে নাকি এই ধান আধ হাত বাড়ে, জানি না কতোটা সত্যি কতোটা মিথ্যে, এই হাত মাপায়।
আশ্বিনের সংক্রান্তিতে এই ধানে ফুল আসে, আর সেই সংক্রান্ত্রিতে যে “আড়ং” হয় কুমার নদে, সেই আড়ং-এ আসা বাইচ-এর নৌকোর বৈঠার ঘায়ে ফুল ঝরে দুধ-ধান ধরে। জলের ওপর সত্যি সত্যি তখন ধানের ফুলের পাপড়ি ভাসে। আর সাত হাত আট হাত গভীর জলের তলায় সবুজ শ্যাওলা দোল খায়, নৌকোয় বসে সেই জলের ভেতর রোদ ঢুকে যেতে দেখতে কী যে ভালো লাগে, সে বলে বোঝানোর নয়। তবে সবচেয়ে মজা হতো ছোট্ট নৌকোয় করে কোনও ধান ক্ষেতের ভেতর ঢুকে গিয়ে “ঢিমা” দিয়ে পুঁটি মাছ ধরায়।ভাতের সঙ্গে কুড়ো মিশিয়ে একটা মন্ড তৈরি করা হয়, তার সঙ্গে অনেকখানি পাটেনর “ফেউসা” মিশিয়ে শক্ত গোল করা হয় যাতে পানিতে ভিজে ভিজে ঢিমাটি ভেঙে না যায়। একটা মোটা পাটখড়ির মাঝে চিকন দড়ি বেঁধে তার আগায় এই ঢিমা ঝুলিয়ে পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়, মিনিট খানেকের মধ্যে পুঁটি মাছ সেই ঢিমা খেতে আসে আর তার পাশেই তিন চারটি ছোট ছোট বড়শিতে ভাত গেঁথে টপাটপ পুঁটি মাছ শিকার। এই শিকারের হিসেব হয় কুড়িতে, এক কুড়ি কোনও ব্যাপারই না, সাত আট কুড়ি না হলে লোকে তাকে ঢিমা দেওয়া বলে শিকারই করে না। মাঝে মাঝে অবশ্য পুঁটির সঙ্গে ছোট ছোট কই মাছও ধরা পড়ে, কিন্তু সেগুলো সব ‘কাইশ্যা কই’, আমাদের বিলে-অঞ্চলে কই মাছ “দো-সইনা, তে-সইনা” না হলে খায় না কেউ, ছোট কই খেলে নাকি কাশি হয়।
যাহোক, আশ্বিনের শেষেই আমাদের বাড়িতে পদ্মার চর এলাকা থেকে লোকজন আসতো ধান কাটার জন্য। স্থানীয়রা নিজেদের ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো বলে অতো দূর থেকে তারা আসতো ধান কাটতে। যদিও তারা আষাঢ় মাসে একবার এসে জেনে যেতো ধানের কি অবস্থা। আর তখন নিয়ে আসতো কাঁঠাল, ছানার সন্দেশ, দানাদার, আমার অবশ্য গজাই খুব প্রিয় ছিল। ময়দার ছাঁচ ভেজে চিনির শিরায় ডুবোনো গজা। ওহ্ ভুলে গেছি, আশ্বিন সংক্রান্তির আড়ং আসলে বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে, তাই এ সময় মিশ্রি দিয়ে ঘোড়া হাতি শিঙাসহ নানা ধরনের ছাঁচ পাওয়া যেতো, আমি সারা বছরের জন্য সেই সব ছাঁচ জমাতাম, মনে হতো আমি সব দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেই সব ছাঁচ দেবো না, যদিও খেতে কী যে ইচ্ছে হতো। কিন্তু খেতাম না। আমার প্রিয় কুটিকালের প্রেমিক বনি আমিনকেও দিতাম না। উল্টো বনি আমিন সেসব চাইলে ওর পেটের ওপর পা দিয়ে নিজে মা-কালি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বনি আমি শিব, আর আমি কালি। যদিও সে ছিল আমাদের মসজিদের হুজুরের ছেলে।
কার্ত্তিকে ধান পাকলে বাড়ি ভর্তি কিষ্ষান, তারা বিশাল পাতিলে ভাত রাঁধে, বাইর-বাড়ির উঠোনে গর্ত করে চুলো বানিয়ে তাতে ইটেঁর ঝিক্ দিয়ে তাতে রান্না করতো। সেই ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল, মাঝে মাঝে কচুর “গাঠি” দিয়ে মাঝের ঝোল। কেন যে তারা শুধু কচুর মুখি কিনতো কে জানে? সেদ্ধ কচুর মুখি আমি ছিলে দিতাম। যদিও আমার ওদের ওখানে যাওয়া মানা ছিল। কে শোনে কার কথা, আমি রেঁধে দিতাম, বেড়ে খাওয়াতাম। নিজেও খেতাম, চুলোর পাশে গনগনে আগুন (আসলে ছাই) তুলে তার ওপর বড় বড় শুকনো মরিচ ছেড়ে পুড়িয়ে নিয়ে, সামান্য শর্ষের তেল দিয়ে সেই মরিচ ডলে, সেই পাতলা ডাল আর গাঠি ভর্তা দিয়ে লাল লাল লক্ষ্মী দীঘা ধানের ভাত খেতে অমৃত মনে হতো। তখন সন্ধ্যে বলে বনি আমিন থাকতো না, কিন্তু ওকে খাওয়াতে খুব ইচ্ছে করতো। কি আর করা? আমি বনি আমিনের জন্য এক মুষ্টি ভাত চুলোর মধ্যে ফেলে দিতাম।
একেক দিন কিষ্ষানরা একেক ক্ষেতে যেতো। সারাদিন বাড়িতে ধান নিয়ে নানা কাজ হচ্ছে, আগের রাতে মাড়াই করা (আমরা বলি মলন দেয়া) ধান শুকোনো হচ্ছে, বাতাসে ধরে উড়িয়ে ধুলোমুক্ত করা হচ্ছে, তারপর ঝনঝন আওয়াজ হলে শুকনো ধান গোলায় তোলা হচ্ছে। ঠিক এই সময়ই তিনি আসতেন। পরনে আধ ময়লা ধূতি, কোমর থেকে লুঙ্গির মতো করে এক খন্ড, আরেক খন্ড এখনকার ল্যাহেঙ্গার ওড়নার মতো এক পাশ কোমরে গুঁজে অন্য পাশটি গলার দু’পাশে পেঁচিয়ে রাখা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, খালি পা, শিরা দ্যাখা যায়। এসেই বলতেন, “আইলামগো মা, সেই যে গ্যালো বছর আইছিলাম, আর এইবার আইলাম। আইজ কিন্তু চাইড্ডা স্যাবা করবো আপনাগো বাড়ি”।
আমার জন্মের পর থেকে তাকে দেখেছি, চিনি, কোথায় থাকে তাও জানি, কিন্তু বছরের আর কোনও সময় তার সঙ্গে আমার দ্যাখা হতো না। আমাকে দেখেই বলতেন, “যাওতো তাকের উপর বাতাসা রাখা আছে, পেতলের গিলাশটা মেজে জল আনবা, আর তিনটে বাতাসা আনবা, বড্ড তেয়াশ লেগেছে”। আমি “ভুন্নুত” (এটাও সেই মানুষটির থেকে শোনা শব্দ) করে ছুট লাগাতাম, হয়তো তখন ধান নাড়ছিলাম, কিংবা হাতে কোনও কাজ থেকে থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? তখন মনে হতো না, এখন মনে মনে ভাবি, উনি কেমন করে জানতেন যে, তাকের ওপর বাতাসা রাখা আছে? সেই ধানের সময় উদাসীন ময়রা আসতেন, নানা রকমের মিষ্টি নিয়ে, বিশাল এক গামলার মধ্যে অর্ধেক পানি দিয়ে তার ভেতরে আরেকটি গামলায় করে নানা পদের মিষ্টি রাখা থাকতো, আমি সেখান থেকে প্রতিটি পদ একেকটি করে পেতলের থালায় সাজিয়ে, তেঁতুল দিয়ে মাজা গ্লাশে জল ঢেলে নির্মল দা’র বউ মাধবী বউদি যেমন করে পুজোর কোশাকুশি মেজে ঘাট থেকে বাড়ি ফিরতেন, ঠিক তেমন করে ডান হাতটা উঁচু করে তার পাতার ওপর পেতলের থালায় মিষ্টি নিয়ে, বাঁ হাতে জলের গ্লাশ নিয়ে তার সামনে নামিয়ে রাখতাম। তিনি তৃপ্তি করে জল খেতেন, তা দেখে আমার খেতে ইচ্ছে করতো খুব। এটা অবশ্য আমার আজীবনের, কাউকে কিছু খেতে দেখলেই আমার খেতে ইচ্ছে করে।
এই জল খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই শুরু করতেন গান। প্রথম গানটি আমি এখনও মুখস্ত পারি, “আমি পরের জন্য বানলাম রে বাড়ি ঘর” এবং তারপর দীর্ঘ সময় নিয়ে গাইতেন যে গানটি, সেটি আমি এই হঠাৎ একজনের মুখে শুনতে পেলাম, তিনি নাকি কোলকাতা থেকে শান্তি নিকেতন যাওয়ার পথে রেলে এক গাতক-এর গলায় শুনেছেন। কার্ত্তিকের দুপুর, বউঝিরা ধান ওড়াচ্ছে, ঝকঝকে রোদে কেউ ধান নাড়ছে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, সবাই গেছে ধান কাটতে। তখন তিনি গাইছেন, “চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা গো” – আমি সেই বয়সে, তখনও রোহিনী হয়েছি কি না মনে নেই, তখনও সেই চিকন কালার জন্য শরীরে মনে পুলক অনুভব করতাম। এতে কেউ আমায় ইঁচড়ে পাকা বললে, আমার কোনও আপত্তি নেই। একের পর এক গান হতো, কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই, ওইড্যা গাও না?” কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই কালার বাঁশি শুইনা মন জানি কী অয়, ওইড্যা গাও দিহি”।
আমি কার্ত্তিকের গল্প বলি, কতো কার্ত্তিক আসে, আমি কেন যেনো এখনও সেই লোকটির অপেক্ষায় থাকি, নাকি কে জানে আমি সেই চিকন কালার অপেক্ষায় থাকি? যে বেছে বেছে শুধু দুপুরেই বাঁশি বাজায়। আমার খুব মন কেমন করে সেই গোসাঁইয়ের জন্য। মনে হয়, কতো কাল, ক. . তো. . কা. . ল আমার গোঁসাই আসে না।
(বালিকার ঋতু-দর্শণ শীর্ষক রচনার খণ্ডাংশ)
আমাকে মাঝে মাঝে ভূত-এ পায়, আমার পাশের মানুষটি এই ভূত-এ পাওয়া আমিকে খুব ভয় পান, আমি নিজেও বুঝি যে, তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন এই সময়গুলিতে। এ যেনো চাঁদগ্রস্ততা এক, হাঁটছি ফিরছি সংসার করছি জীবনের ঘানিতে তেল দেয়ার প্রয়োজনেও নিত্য জীবনক্ষয়কারী চাকরিটিও ঠিকই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমি নেই, এই জীবনে কোথাও নেই। তাহলে কোথায় আমি? প্রশ্নটা করি, উত্তর নেই। এ এক অসম্ভব হেঁয়ালিময়তা, নিজেরই সাথে নিজের। এই সময়টা বেশ কষ্টের।
অনেক দিন আগের এক গল্প বলি। কোনও এক কার্ত্তিক মাসের গল্প। তখন আমাদের ওদিকে ইরি চাষ হতো না। ইরি-র চাষকে সবাই তখনও “বোলোক করা” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল পাচেঁক দূরে আমার ফুপু বাড়িতে তখন সবেমাত্র এই ব্লক করা শুরু হয়েছে।তার ফলাফল তখনও অজানা বলে, আমাদের শুধু বিলের নীচু জমিতে বোরো ধান আর তার চেয়ে আরেকটু উঁচুতে আউশ ধান আর বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের পরে (যার নাম বাইন পড়া) আমন ধান বোনা হোত। আমন ধান বলে আমরা অবশ্য তাকে জানতাম না, জানতাম লক্ষ্মী দীঘা ধান হিসেবে। এই ধান পানির সঙ্গে বাড়ে। যতো পানি ততো ধান, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন দক্ষিণ থেকে জল শুধু আসতেই আসতেই থাকে, তখন এক রাতে নাকি এই ধান আধ হাত বাড়ে, জানি না কতোটা সত্যি কতোটা মিথ্যে, এই হাত মাপায়।
আশ্বিনের সংক্রান্তিতে এই ধানে ফুল আসে, আর সেই সংক্রান্ত্রিতে যে “আড়ং” হয় কুমার নদে, সেই আড়ং-এ আসা বাইচ-এর নৌকোর বৈঠার ঘায়ে ফুল ঝরে দুধ-ধান ধরে। জলের ওপর সত্যি সত্যি তখন ধানের ফুলের পাপড়ি ভাসে। আর সাত হাত আট হাত গভীর জলের তলায় সবুজ শ্যাওলা দোল খায়, নৌকোয় বসে সেই জলের ভেতর রোদ ঢুকে যেতে দেখতে কী যে ভালো লাগে, সে বলে বোঝানোর নয়। তবে সবচেয়ে মজা হতো ছোট্ট নৌকোয় করে কোনও ধান ক্ষেতের ভেতর ঢুকে গিয়ে “ঢিমা” দিয়ে পুঁটি মাছ ধরায়।ভাতের সঙ্গে কুড়ো মিশিয়ে একটা মন্ড তৈরি করা হয়, তার সঙ্গে অনেকখানি পাটেনর “ফেউসা” মিশিয়ে শক্ত গোল করা হয় যাতে পানিতে ভিজে ভিজে ঢিমাটি ভেঙে না যায়। একটা মোটা পাটখড়ির মাঝে চিকন দড়ি বেঁধে তার আগায় এই ঢিমা ঝুলিয়ে পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়, মিনিট খানেকের মধ্যে পুঁটি মাছ সেই ঢিমা খেতে আসে আর তার পাশেই তিন চারটি ছোট ছোট বড়শিতে ভাত গেঁথে টপাটপ পুঁটি মাছ শিকার। এই শিকারের হিসেব হয় কুড়িতে, এক কুড়ি কোনও ব্যাপারই না, সাত আট কুড়ি না হলে লোকে তাকে ঢিমা দেওয়া বলে শিকারই করে না। মাঝে মাঝে অবশ্য পুঁটির সঙ্গে ছোট ছোট কই মাছও ধরা পড়ে, কিন্তু সেগুলো সব ‘কাইশ্যা কই’, আমাদের বিলে-অঞ্চলে কই মাছ “দো-সইনা, তে-সইনা” না হলে খায় না কেউ, ছোট কই খেলে নাকি কাশি হয়।
যাহোক, আশ্বিনের শেষেই আমাদের বাড়িতে পদ্মার চর এলাকা থেকে লোকজন আসতো ধান কাটার জন্য। স্থানীয়রা নিজেদের ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো বলে অতো দূর থেকে তারা আসতো ধান কাটতে। যদিও তারা আষাঢ় মাসে একবার এসে জেনে যেতো ধানের কি অবস্থা। আর তখন নিয়ে আসতো কাঁঠাল, ছানার সন্দেশ, দানাদার, আমার অবশ্য গজাই খুব প্রিয় ছিল। ময়দার ছাঁচ ভেজে চিনির শিরায় ডুবোনো গজা। ওহ্ ভুলে গেছি, আশ্বিন সংক্রান্তির আড়ং আসলে বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে, তাই এ সময় মিশ্রি দিয়ে ঘোড়া হাতি শিঙাসহ নানা ধরনের ছাঁচ পাওয়া যেতো, আমি সারা বছরের জন্য সেই সব ছাঁচ জমাতাম, মনে হতো আমি সব দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেই সব ছাঁচ দেবো না, যদিও খেতে কী যে ইচ্ছে হতো। কিন্তু খেতাম না। আমার প্রিয় কুটিকালের প্রেমিক বনি আমিনকেও দিতাম না। উল্টো বনি আমিন সেসব চাইলে ওর পেটের ওপর পা দিয়ে নিজে মা-কালি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বনি আমি শিব, আর আমি কালি। যদিও সে ছিল আমাদের মসজিদের হুজুরের ছেলে।
কার্ত্তিকে ধান পাকলে বাড়ি ভর্তি কিষ্ষান, তারা বিশাল পাতিলে ভাত রাঁধে, বাইর-বাড়ির উঠোনে গর্ত করে চুলো বানিয়ে তাতে ইটেঁর ঝিক্ দিয়ে তাতে রান্না করতো। সেই ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল, মাঝে মাঝে কচুর “গাঠি” দিয়ে মাঝের ঝোল। কেন যে তারা শুধু কচুর মুখি কিনতো কে জানে? সেদ্ধ কচুর মুখি আমি ছিলে দিতাম। যদিও আমার ওদের ওখানে যাওয়া মানা ছিল। কে শোনে কার কথা, আমি রেঁধে দিতাম, বেড়ে খাওয়াতাম। নিজেও খেতাম, চুলোর পাশে গনগনে আগুন (আসলে ছাই) তুলে তার ওপর বড় বড় শুকনো মরিচ ছেড়ে পুড়িয়ে নিয়ে, সামান্য শর্ষের তেল দিয়ে সেই মরিচ ডলে, সেই পাতলা ডাল আর গাঠি ভর্তা দিয়ে লাল লাল লক্ষ্মী দীঘা ধানের ভাত খেতে অমৃত মনে হতো। তখন সন্ধ্যে বলে বনি আমিন থাকতো না, কিন্তু ওকে খাওয়াতে খুব ইচ্ছে করতো। কি আর করা? আমি বনি আমিনের জন্য এক মুষ্টি ভাত চুলোর মধ্যে ফেলে দিতাম।
একেক দিন কিষ্ষানরা একেক ক্ষেতে যেতো। সারাদিন বাড়িতে ধান নিয়ে নানা কাজ হচ্ছে, আগের রাতে মাড়াই করা (আমরা বলি মলন দেয়া) ধান শুকোনো হচ্ছে, বাতাসে ধরে উড়িয়ে ধুলোমুক্ত করা হচ্ছে, তারপর ঝনঝন আওয়াজ হলে শুকনো ধান গোলায় তোলা হচ্ছে। ঠিক এই সময়ই তিনি আসতেন। পরনে আধ ময়লা ধূতি, কোমর থেকে লুঙ্গির মতো করে এক খন্ড, আরেক খন্ড এখনকার ল্যাহেঙ্গার ওড়নার মতো এক পাশ কোমরে গুঁজে অন্য পাশটি গলার দু’পাশে পেঁচিয়ে রাখা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, খালি পা, শিরা দ্যাখা যায়। এসেই বলতেন, “আইলামগো মা, সেই যে গ্যালো বছর আইছিলাম, আর এইবার আইলাম। আইজ কিন্তু চাইড্ডা স্যাবা করবো আপনাগো বাড়ি”।
আমার জন্মের পর থেকে তাকে দেখেছি, চিনি, কোথায় থাকে তাও জানি, কিন্তু বছরের আর কোনও সময় তার সঙ্গে আমার দ্যাখা হতো না। আমাকে দেখেই বলতেন, “যাওতো তাকের উপর বাতাসা রাখা আছে, পেতলের গিলাশটা মেজে জল আনবা, আর তিনটে বাতাসা আনবা, বড্ড তেয়াশ লেগেছে”। আমি “ভুন্নুত” (এটাও সেই মানুষটির থেকে শোনা শব্দ) করে ছুট লাগাতাম, হয়তো তখন ধান নাড়ছিলাম, কিংবা হাতে কোনও কাজ থেকে থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? তখন মনে হতো না, এখন মনে মনে ভাবি, উনি কেমন করে জানতেন যে, তাকের ওপর বাতাসা রাখা আছে? সেই ধানের সময় উদাসীন ময়রা আসতেন, নানা রকমের মিষ্টি নিয়ে, বিশাল এক গামলার মধ্যে অর্ধেক পানি দিয়ে তার ভেতরে আরেকটি গামলায় করে নানা পদের মিষ্টি রাখা থাকতো, আমি সেখান থেকে প্রতিটি পদ একেকটি করে পেতলের থালায় সাজিয়ে, তেঁতুল দিয়ে মাজা গ্লাশে জল ঢেলে নির্মল দা’র বউ মাধবী বউদি যেমন করে পুজোর কোশাকুশি মেজে ঘাট থেকে বাড়ি ফিরতেন, ঠিক তেমন করে ডান হাতটা উঁচু করে তার পাতার ওপর পেতলের থালায় মিষ্টি নিয়ে, বাঁ হাতে জলের গ্লাশ নিয়ে তার সামনে নামিয়ে রাখতাম। তিনি তৃপ্তি করে জল খেতেন, তা দেখে আমার খেতে ইচ্ছে করতো খুব। এটা অবশ্য আমার আজীবনের, কাউকে কিছু খেতে দেখলেই আমার খেতে ইচ্ছে করে।
এই জল খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই শুরু করতেন গান। প্রথম গানটি আমি এখনও মুখস্ত পারি, “আমি পরের জন্য বানলাম রে বাড়ি ঘর” এবং তারপর দীর্ঘ সময় নিয়ে গাইতেন যে গানটি, সেটি আমি এই হঠাৎ একজনের মুখে শুনতে পেলাম, তিনি নাকি কোলকাতা থেকে শান্তি নিকেতন যাওয়ার পথে রেলে এক গাতক-এর গলায় শুনেছেন। কার্ত্তিকের দুপুর, বউঝিরা ধান ওড়াচ্ছে, ঝকঝকে রোদে কেউ ধান নাড়ছে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, সবাই গেছে ধান কাটতে। তখন তিনি গাইছেন, “চিকন কালা গো, বাঁশি না বাজাইও দুপুর বেলা গো” – আমি সেই বয়সে, তখনও রোহিনী হয়েছি কি না মনে নেই, তখনও সেই চিকন কালার জন্য শরীরে মনে পুলক অনুভব করতাম। এতে কেউ আমায় ইঁচড়ে পাকা বললে, আমার কোনও আপত্তি নেই। একের পর এক গান হতো, কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই, ওইড্যা গাও না?” কেউ বলতেন, “ও গুসাঁই কালার বাঁশি শুইনা মন জানি কী অয়, ওইড্যা গাও দিহি”।
আমি কার্ত্তিকের গল্প বলি, কতো কার্ত্তিক আসে, আমি কেন যেনো এখনও সেই লোকটির অপেক্ষায় থাকি, নাকি কে জানে আমি সেই চিকন কালার অপেক্ষায় থাকি? যে বেছে বেছে শুধু দুপুরেই বাঁশি বাজায়। আমার খুব মন কেমন করে সেই গোসাঁইয়ের জন্য। মনে হয়, কতো কাল, ক. . তো. . কা. . ল আমার গোঁসাই আসে না।
(বালিকার ঋতু-দর্শণ শীর্ষক রচনার খণ্ডাংশ)
লেবেলসমূহ:
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির স্মৃতিচারণ,
স্মৃতিচারণ
চৈতালী-কথা (১)
মাসুদা ভাট্টি
ভর চৈত্র মাস। সেই যে ফাল্গুনের পনের তারিখে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে বসে আছেন, আর নামার নাম নেই। ন্যাড়া চক-পাথার, ফসলহীন। চৈতালী উঠে গেছে। শুধু গম পড়ে আছে, পড়ে থেকে পেকে ঝনঝন করার পর তাদের কেটে আনা হবে। সকালে উঠে আমাদের বাড়ির সামনের বড় উঠোনে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মাইল দেড়েক দূরের ত্রিভাগদি গ্রাম কেমন আবছা দেখা যায়, অথচ এই মাত্র কিছুদিন আগেই শীতের সকালে এই উঠোনে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে একধামা জামরং চোখে হামলে পড়ে, শীতকালে আমার সূর্য ওঠে ত্রিভাগদি গ্রামের মাথা ছাড়িয়ে যে দেবদারু গাছ, ঠিক তার আগ-পাতাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। যদিও পুরো গ্রামটি ঢাকা থাকে কুয়াশায়। কিন্তু চৈত্রে কুয়াশা নেই, তবুও ত্রিভাগদি দ্যাখা যায় না।
ফালগুনের মাঝামাঝিই জলদেবকে তুষ্টু করা হয়ে গিয়েছে। শনিবারের হাট থেকে দোকানি যে দাম চাইবে সেই দামে মাটির পাতিল কিনে এনে তাতে জলি-দুধের শিরনি রেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য সকালে উঠে কোনও কিছু মুখে না দিয়ে, কারো সঙ্গে কথা না বলে পুকুরে ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে এই শিরনি রাঁধতে হয়। প্রায় বাড়িতেই হয়েছে এই ডুব-শিরনি, শুধু অমুদা’র মা “বড় ঠাইরেন”, যিনি এক সময় সমাদ্দার বাড়ির “বউ ঠাকুরুন” ছিলেন, তিনিই তখন বড় ঠাইরেন, সারাদিন আক্ষেপ করে মরেন, “আহারে আমার কেউ নেই বরুণদেবকে তুষ্টু করার, এই চৈতে আগুন ধরলে নিবানোর কেউ থাকপেনানে রে। ওহ্ ভগবান, এতো ভরা বাড়ি ছিল, কোহানে সব হারাইয়া গ্যালো রে”।সত্যিই, আমার জন্মের পর থেকেই দেখছি, সমাদ্দার বাড়ি থেকে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে, শুধু সমাদ্দার বাড়ি কি, আমার জন্মের আগেই পাঠক, দত্ত আর বানারি(ব্যানার্জি) বাড়ি খালি হয়ে গিয়েছিল, আর আমার চোখের সামনে একে একে ভূঁইমালি বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি খালি হতে লাগলো, সেই সব বাড়িতে মান্নান কাকা, খালেক কাকা, হারুন ফুপারা একে একে গিয়ে উঠলেন। সমাদ্দার বাড়িতে তখনও ফাল্গুনে দোল্ হতো, আমি রঙে নেয়ে ভূত হতাম। ঝুলনযাত্রা হতো ঠাকুর বাড়িতে, দূরদেশ থেকে কীর্ত্তনীয়ারা আসতেন, রাতভর কীর্তন হতো। সেইসব কীর্ত্তনীয়ারাও চলে যাওয়ার আগে গ্রামের জন্য আশীর্বাদ করে যেতেন, “এই চত্তিরি মা ওলা তুমি আইসো নাগো, চরণ ধরি তোমার তুমি আইসো না ইদিক পানে”। যাওয়ার আগে কীর্ত্তনীয়ারা চাউল তুলে নিয়ে যেতেন, আমরা মুঠো মুঠো চাল দিতাম, এক মুঠোর বেশি চাল দিলে ওরা নিতেন না, বলতেন, “বলতেন, প্যাডে যেটুকু আঁটে সেইটুকুনই খাইতে হয় দিদি, বেশি খাইতে নাই, চাইতে নাই, আমরা বাড়ি ঘুরি, তোমাগো বাড়ি থিকাই যদি সব নিয়া যাই তাইলে আমাগো নারায়ন দর্শণ হবেনিগো দিদি”।
এই কীর্ত্তনীয়াদের মধ্যে একজন ছিলেন বড়ু গোসাঁই। ছিপছিপে লম্বা, তখনও লম্বা পরিমাপের বোধ হয়নি, এখনকার হিসেবে ছয় ফুটের ওপরে হবেন। একখানি ধুতি দু’টুকরো করে একটুকরো লুঙ্গির মতো করে পরা, আরেকখানি শরীরে জড়ানো। গলায় কন্ঠী। ঠাকুর বাড়ির উঠোনের এক কোণায় স্বপাক খান কীর্ত্তনীয়ারা। আর অবধারিত ভাবেই আমি গিয়ে তাদের পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকি, সন্ধ্যের পর কীর্ত্তন হবে, তাতে কী? আমি দুপুর থেকেই পারলে গিয়ে বসে থাকি। দিনভর যা যা উঠেছে, চাউলকলামুলোকুমড়াডালকলমিহেলেঞ্চা সবই একটি বিশাল মাটির হাঁড়িতে ফুটছে, একেবারে শেষে তিন চারটে দুর্বা ঘাসের ডগা এনে ছেড়ে দেয়া হতো সেই পাতিলে। সমাদ্দার বাড়ি থেকে বড় ঠাইরেন আমার হাত দিয়ে নারকেলের আচায় করে একদলা ঘি দিয়ে দিয়েছেন, আমি সেটি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, কখন রান্না শেষ হবে আর কলাপাতায় সেই খিচুড়িমতো জিনিসটি ঢেলে তার ওপর খানিকটা ঘি ছিটিয়ে বড়ু গোসাঁই এক অদ্ভূত শব্দ করে খাবেন। আমার মায়ের হাতে আমি অনেকবার মার খেয়েছি এরকম মানুষের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি নকল করে। আর বড়ু গোসাঁই আমাকে যেসব কীর্ত্তণ শিখিয়েছিলেন, গলায় সুর না থাকলেও আমি তার প্রতিটির কথা এখনও মনে করতে পারি।
তো সেবারও ফাল্গুনে কীর্ত্তনীয়ারা গেয়ে গেছেন, দোল হয়ে গেছে।আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ হয়েছে, কারণ সূয্যি-ঠাকুর আকাশে পা তুলে বসে আছেন।চারদিক পুড়ে যাচ্ছে, হাঁসমুরগিগরুবাছুরকুকুরবেড়াল সবাই কেমন জিভ বের করে হাঁপায় সারাদিন, দেখলে মায়া লাগে। আমাদের বড় উঠোনের পাশে একমাত্র চাপকলটি অনেকক্ষণ চাপতে হয় জল তুলতে, কারণ জল নেমে গেছে অনেক নীচে, সহজে উঠতে চায় না। বিরাট বড় বড় মাটির ভাসি ভর্তি করে জল রাখা হয়েছে আমাদের ঘরের কোণে, ঠান্ডা থাকবে বলে, আবার খুব প্রয়োজন পড়লে মানে চৈতে যার কথা মুখে আনতে নেই সেই আগুন লাগলে যাতে সহজেই সেখান থেকে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু যেবার আমাদের বাড়িতে আগুন লেগে আমাদের সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সেবার এই ভাসি ভর্তি জল আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। আমার একেবারে এক কাপড়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর আগুনের হল্কা দেখছিলাম, কিছুই করার ছিল না। সেই আগুন দেখে ভয় পেয়ে আমার টাইফয়েড হয়েছিল, প্রায় ছ’মাস ভুগেছিলাম আমি সেই জ্বরে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকতাম শুধু, আগুন আগুন করে চিৎকার করে উঠতাম – পরে শুনেছি এসব।
এমনিতে পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আগে তলা থেকে তাল তাল কাঁদা তুলে এনে টিনের চালের ওপর দিয়ে রাখতেন কেউ কেউ। যাতে কারো বাড়িতে আগুন লাগলে সেখান থেকে গোলা ছুটে এসে চালের ওপর পড়ে আগুন ছড়াতে না পারে। কিন্তু তাতেও কি কিছু হতো? হতো না। গ্রামের একদিকে আগুন লাগলে আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়ি পরবর্তী বর্ষা পর্যন্ত ক্যামন ন্যাড়া দ্যাখাতো, দূর থেকেই বোঝা যেতো এই গ্রামে আগুন লেগেছিল। কতোবার বৈশাখ মাস ধরে চলা নানা জায়গার মেলা দেখতে যেতে যেতে এরকম পোড়া গ্রামের দেখা পেয়েছি।সবচেয়ে খারাপ লাগতো সেই সব পোড়া বাড়ির ছেলেমেয়েদের দেখে, ওরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো করুণ চোখে, তাদের মেলায় যাওয়া বারণ, বাড়ি পুড়ে গেছে, থাকা-খাওয়ারই কী ব্যবস্থা তার নেই ঠিক, তার আবার “আড়ঙ্গে” যাওয়া।
আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে বড় উঠোন পেরিয়ে মাইল খানেক চক দেখা যেতো। আমরা ঘরে বসে বসে দেখতাম মাঠে “বিলাই দৌঁড়ায়”, পরে জেনেছি এর নাম মরীচিকা। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি ফাঁকা মাঠে ক্লান্তিহীন এই বেড়াল দৌঁড়ানো দেখে দেখে আমার চোখে ধাঁধাঁ লাগতো। আমাদের খাবার-দাবারের ব্যাপারে মা খুব সতর্ক থাকতেন। হাত ধুয়ে এসে মুছে তারপর খেতে হবে। এই সব নিয়ম কানুন বছরের অন্য সময় শিথিল। ফ্রকে হাত মুছেই খেয়ে ফেলতে পারি, কেউ দেখলেও কিছু বলে না। শুধু অমুদা’র মা বড় ঠাইরেনের সামনে এমন কিছু করলে, “এ ম্যায়াডা, কতোবার না তোরে কইছি হাত ধুয়া ছাড়া কিছু মুখে দিবি না, আবার দেখলি তোর একদিন কি আমার একদিন”। উনি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেই “তার একদিন কি আমার একদিন” আসেনি, উনি আমাকে শাঁসিয়েছেন, আদর করেছেন, আমার ভেতর ভরে দিয়েছেন সামান্য যেটুকু নম্রতা -যেটুকু আমার ভেতর এখনও আছে সেটুকু, অনেক খানি সৌন্দর্যবোধ, আর চলে যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছেন উনাদের পারিবারিক লাইব্রেরীর সমস্ত বই। সেসব আরেকদিন, আজ চৈত্রের কথাই শুধু। এক চৈত্রকথায়, আরেক চৈত্রের চেয়ে খরতর কাহিনী বড় ঠাইরেনের চলে যাওয়ার গল্প বড্ড বেমানান।
চৈত্রের প্রথম কি দ্বিতীয় শনিবার, হাটের দিন, শনি-মঙ্গলবার হরির হাট বসে, সেরকমই এক সন্ধ্যায় আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় কান্নার রোল ওঠে। ছহেরদ্দি শেখের ছেলে আব্দুল আলি শেখ-এর কলেরা হয়েছে। হাট থেকে আসার পথে জিলাপি কিনে খেতে খেতে আসছিলো কালি সাঁঝের কালে, হঠাৎ পেছনে এক বিরাটাকার কুকুর, কালি সাঁঝের মতোই রং। আব্দুল আলি তাগড়া যুবক, এইসব কুকুর-টুকুর ভয় পাওয়ার লোক নয়। সে কুকুরকে পাত্তা না দিয়ে হাট থেকে বাড়ির দিকে এগোয়, হাট আর আব্দুল আলির বাড়ি মাত্র আধ মাইল দূরত্ব, মাঝে শেলই-খাল। খটখটে শুকনো খাল পার হতে গিয়ে আব্দুল আলি আছাড় খায়। আর টের পায় তার হাত থেকে কলাপাতায় মোড়ানো জিলাপি টেনে নেয় কুকুর। যাওয়ার সময় বলে যায়, “জিলাপি দিলি না, কাইড়া নিলাম, এই বার পুরা গ্রাম খাবার আসফারলাগছি”। পরের দিন সকালে এই গল্প আমরা শুনি ময়না দাদি, মজিরোনের মা, রহিবোন ফুপু সহ নানাজনের মুখে। আমরা যেতে চাই দেখতে আব্দুল আলি ভাইকে, কিন্তু আমাদের যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আমাদের সঙ্গে গল্প করে যায়।
কিন্তু যেই মা বাড়ির পেছন দিকে কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত ওমনি এক ছুটে আমি চলে যাই আব্দুল আলি ভাইদের বাড়ি। গিয়ে দেখি, বাড়িটা কেমন থমথমে। আব্দুল আলি ভাইকে একটা চৌকিতে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। তার পরনে লুঙ্গিটা শুধু লজ্জাস্থান ঢেকে রেখেছে। আগের রাত থেকেই বমি করতে করতে এখন আর বমি করার মতো শক্তিও নেই। নিম্নাংশ থেকে চৌকিতে বিছানো কলাপাতা বেয়ে যে জলের মতো জিনিস বেরুচ্ছে তার গন্ধে সেখানে দাঁড়ানো মুস্কিল। মাছি উড়ছে ভন ভন করে। আব্দুল আলি ভাইয়ের মা চাচি আম্মা তার বোন উজিরোন, লাইলি, লিলি আপারা চারপাশে ঘিরে বসে আছেন। আর ছহেরদ্দি কাকা বাইরে চৌকি পেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারও চারপাশে গ্রামের অনেক মুরুব্বি। ঝিনুক ভর্তি করে লবন পানি তুলে দেয়া হচ্ছে মুখে। বেতের নরোম আগা ছেঁচে তার রস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু “কিছুতেই কিছু হয়নি’।
গ্রামের একমাত্র ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ এসেছিলেন, স্যালাইন দিয়েছেন একটা, কিন্তু আব্দুল আলি ভাই ক্রমশঃ শক্তিহীন হতে হতে নির্জীব হয়ে গিয়েছেন। চৌকির ওপর বিছানো কলাপাতায় শোয়া আব্দুল আলি ভাইয়ের চেহারাটা আমার চোখে এখনও আঘাত করে। মাত্র কিছুদিন আগেই তার বিয়ে খেয়েছি আমরা। কি সুন্দর বউটি, একটু মোটাসোঁটা, আব্দুল আলি ভাই নিরক্ষর কিন্তু তার বউ ক্লাশ ফাইভ অবদি পড়েছেন। বিয়ের পর দ্বিতীয়বার বাপের বাড়িতে গিয়েছেন। তাকে ফিরতে হলো সেদিন রাতেই, কিন্তু ততোক্ষণে বাড়িতে কারবালার মাতম। আব্দুল আলি ভাই মারা গেছেন। আমার জীবনে কলেরায় দেখা প্রথম মৃত্যু। আব্দুল আলী ভাইয়ের স্ত্রী তখন অন্তঃস্বত্তা, তাও জানা গেলো তার মৃত্যুর দিনই। সে কি করুণ দৃশ্য! অথচ কেউই সে বাড়িতে আসতে পারছে না। কলেরার মৃত্যু, বাড়ি ছেড়ে লাশ যায় তবু ওলা যায় না, ওলা পেছন পেছন হেঁটে আসে ওই মৃত্যু থেকে যে যেদিকে যায়, সেদিকে। তাও আব্দুল আলি ভাইকে পরদিন ভোর ভোরে কবর দেয়া হলো, আর কবর দিয়ে আসতে আসতেই শোনা গেলো মারলং কাকার ছেলে ছিরাকে ওলা ধরেছে। আমাদের উঠোনে তখন গনগনে চৈত্র মাস।
ভর চৈত্র মাস। সেই যে ফাল্গুনের পনের তারিখে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে বসে আছেন, আর নামার নাম নেই। ন্যাড়া চক-পাথার, ফসলহীন। চৈতালী উঠে গেছে। শুধু গম পড়ে আছে, পড়ে থেকে পেকে ঝনঝন করার পর তাদের কেটে আনা হবে। সকালে উঠে আমাদের বাড়ির সামনের বড় উঠোনে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মাইল দেড়েক দূরের ত্রিভাগদি গ্রাম কেমন আবছা দেখা যায়, অথচ এই মাত্র কিছুদিন আগেই শীতের সকালে এই উঠোনে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে একধামা জামরং চোখে হামলে পড়ে, শীতকালে আমার সূর্য ওঠে ত্রিভাগদি গ্রামের মাথা ছাড়িয়ে যে দেবদারু গাছ, ঠিক তার আগ-পাতাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। যদিও পুরো গ্রামটি ঢাকা থাকে কুয়াশায়। কিন্তু চৈত্রে কুয়াশা নেই, তবুও ত্রিভাগদি দ্যাখা যায় না।
ফালগুনের মাঝামাঝিই জলদেবকে তুষ্টু করা হয়ে গিয়েছে। শনিবারের হাট থেকে দোকানি যে দাম চাইবে সেই দামে মাটির পাতিল কিনে এনে তাতে জলি-দুধের শিরনি রেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য সকালে উঠে কোনও কিছু মুখে না দিয়ে, কারো সঙ্গে কথা না বলে পুকুরে ডুব দিয়ে এসে ভিজে কাপড়ে এই শিরনি রাঁধতে হয়। প্রায় বাড়িতেই হয়েছে এই ডুব-শিরনি, শুধু অমুদা’র মা “বড় ঠাইরেন”, যিনি এক সময় সমাদ্দার বাড়ির “বউ ঠাকুরুন” ছিলেন, তিনিই তখন বড় ঠাইরেন, সারাদিন আক্ষেপ করে মরেন, “আহারে আমার কেউ নেই বরুণদেবকে তুষ্টু করার, এই চৈতে আগুন ধরলে নিবানোর কেউ থাকপেনানে রে। ওহ্ ভগবান, এতো ভরা বাড়ি ছিল, কোহানে সব হারাইয়া গ্যালো রে”।সত্যিই, আমার জন্মের পর থেকেই দেখছি, সমাদ্দার বাড়ি থেকে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে, শুধু সমাদ্দার বাড়ি কি, আমার জন্মের আগেই পাঠক, দত্ত আর বানারি(ব্যানার্জি) বাড়ি খালি হয়ে গিয়েছিল, আর আমার চোখের সামনে একে একে ভূঁইমালি বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি খালি হতে লাগলো, সেই সব বাড়িতে মান্নান কাকা, খালেক কাকা, হারুন ফুপারা একে একে গিয়ে উঠলেন। সমাদ্দার বাড়িতে তখনও ফাল্গুনে দোল্ হতো, আমি রঙে নেয়ে ভূত হতাম। ঝুলনযাত্রা হতো ঠাকুর বাড়িতে, দূরদেশ থেকে কীর্ত্তনীয়ারা আসতেন, রাতভর কীর্তন হতো। সেইসব কীর্ত্তনীয়ারাও চলে যাওয়ার আগে গ্রামের জন্য আশীর্বাদ করে যেতেন, “এই চত্তিরি মা ওলা তুমি আইসো নাগো, চরণ ধরি তোমার তুমি আইসো না ইদিক পানে”। যাওয়ার আগে কীর্ত্তনীয়ারা চাউল তুলে নিয়ে যেতেন, আমরা মুঠো মুঠো চাল দিতাম, এক মুঠোর বেশি চাল দিলে ওরা নিতেন না, বলতেন, “বলতেন, প্যাডে যেটুকু আঁটে সেইটুকুনই খাইতে হয় দিদি, বেশি খাইতে নাই, চাইতে নাই, আমরা বাড়ি ঘুরি, তোমাগো বাড়ি থিকাই যদি সব নিয়া যাই তাইলে আমাগো নারায়ন দর্শণ হবেনিগো দিদি”।
এই কীর্ত্তনীয়াদের মধ্যে একজন ছিলেন বড়ু গোসাঁই। ছিপছিপে লম্বা, তখনও লম্বা পরিমাপের বোধ হয়নি, এখনকার হিসেবে ছয় ফুটের ওপরে হবেন। একখানি ধুতি দু’টুকরো করে একটুকরো লুঙ্গির মতো করে পরা, আরেকখানি শরীরে জড়ানো। গলায় কন্ঠী। ঠাকুর বাড়ির উঠোনের এক কোণায় স্বপাক খান কীর্ত্তনীয়ারা। আর অবধারিত ভাবেই আমি গিয়ে তাদের পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকি, সন্ধ্যের পর কীর্ত্তন হবে, তাতে কী? আমি দুপুর থেকেই পারলে গিয়ে বসে থাকি। দিনভর যা যা উঠেছে, চাউলকলামুলোকুমড়াডালকলমিহেলেঞ্চা সবই একটি বিশাল মাটির হাঁড়িতে ফুটছে, একেবারে শেষে তিন চারটে দুর্বা ঘাসের ডগা এনে ছেড়ে দেয়া হতো সেই পাতিলে। সমাদ্দার বাড়ি থেকে বড় ঠাইরেন আমার হাত দিয়ে নারকেলের আচায় করে একদলা ঘি দিয়ে দিয়েছেন, আমি সেটি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, কখন রান্না শেষ হবে আর কলাপাতায় সেই খিচুড়িমতো জিনিসটি ঢেলে তার ওপর খানিকটা ঘি ছিটিয়ে বড়ু গোসাঁই এক অদ্ভূত শব্দ করে খাবেন। আমার মায়ের হাতে আমি অনেকবার মার খেয়েছি এরকম মানুষের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি নকল করে। আর বড়ু গোসাঁই আমাকে যেসব কীর্ত্তণ শিখিয়েছিলেন, গলায় সুর না থাকলেও আমি তার প্রতিটির কথা এখনও মনে করতে পারি।
তো সেবারও ফাল্গুনে কীর্ত্তনীয়ারা গেয়ে গেছেন, দোল হয়ে গেছে।আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ হয়েছে, কারণ সূয্যি-ঠাকুর আকাশে পা তুলে বসে আছেন।চারদিক পুড়ে যাচ্ছে, হাঁসমুরগিগরুবাছুরকুকুরবেড়াল সবাই কেমন জিভ বের করে হাঁপায় সারাদিন, দেখলে মায়া লাগে। আমাদের বড় উঠোনের পাশে একমাত্র চাপকলটি অনেকক্ষণ চাপতে হয় জল তুলতে, কারণ জল নেমে গেছে অনেক নীচে, সহজে উঠতে চায় না। বিরাট বড় বড় মাটির ভাসি ভর্তি করে জল রাখা হয়েছে আমাদের ঘরের কোণে, ঠান্ডা থাকবে বলে, আবার খুব প্রয়োজন পড়লে মানে চৈতে যার কথা মুখে আনতে নেই সেই আগুন লাগলে যাতে সহজেই সেখান থেকে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু যেবার আমাদের বাড়িতে আগুন লেগে আমাদের সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সেবার এই ভাসি ভর্তি জল আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। আমার একেবারে এক কাপড়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর আগুনের হল্কা দেখছিলাম, কিছুই করার ছিল না। সেই আগুন দেখে ভয় পেয়ে আমার টাইফয়েড হয়েছিল, প্রায় ছ’মাস ভুগেছিলাম আমি সেই জ্বরে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকতাম শুধু, আগুন আগুন করে চিৎকার করে উঠতাম – পরে শুনেছি এসব।
এমনিতে পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আগে তলা থেকে তাল তাল কাঁদা তুলে এনে টিনের চালের ওপর দিয়ে রাখতেন কেউ কেউ। যাতে কারো বাড়িতে আগুন লাগলে সেখান থেকে গোলা ছুটে এসে চালের ওপর পড়ে আগুন ছড়াতে না পারে। কিন্তু তাতেও কি কিছু হতো? হতো না। গ্রামের একদিকে আগুন লাগলে আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়ি পরবর্তী বর্ষা পর্যন্ত ক্যামন ন্যাড়া দ্যাখাতো, দূর থেকেই বোঝা যেতো এই গ্রামে আগুন লেগেছিল। কতোবার বৈশাখ মাস ধরে চলা নানা জায়গার মেলা দেখতে যেতে যেতে এরকম পোড়া গ্রামের দেখা পেয়েছি।সবচেয়ে খারাপ লাগতো সেই সব পোড়া বাড়ির ছেলেমেয়েদের দেখে, ওরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো করুণ চোখে, তাদের মেলায় যাওয়া বারণ, বাড়ি পুড়ে গেছে, থাকা-খাওয়ারই কী ব্যবস্থা তার নেই ঠিক, তার আবার “আড়ঙ্গে” যাওয়া।
আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে বড় উঠোন পেরিয়ে মাইল খানেক চক দেখা যেতো। আমরা ঘরে বসে বসে দেখতাম মাঠে “বিলাই দৌঁড়ায়”, পরে জেনেছি এর নাম মরীচিকা। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি ফাঁকা মাঠে ক্লান্তিহীন এই বেড়াল দৌঁড়ানো দেখে দেখে আমার চোখে ধাঁধাঁ লাগতো। আমাদের খাবার-দাবারের ব্যাপারে মা খুব সতর্ক থাকতেন। হাত ধুয়ে এসে মুছে তারপর খেতে হবে। এই সব নিয়ম কানুন বছরের অন্য সময় শিথিল। ফ্রকে হাত মুছেই খেয়ে ফেলতে পারি, কেউ দেখলেও কিছু বলে না। শুধু অমুদা’র মা বড় ঠাইরেনের সামনে এমন কিছু করলে, “এ ম্যায়াডা, কতোবার না তোরে কইছি হাত ধুয়া ছাড়া কিছু মুখে দিবি না, আবার দেখলি তোর একদিন কি আমার একদিন”। উনি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেই “তার একদিন কি আমার একদিন” আসেনি, উনি আমাকে শাঁসিয়েছেন, আদর করেছেন, আমার ভেতর ভরে দিয়েছেন সামান্য যেটুকু নম্রতা -যেটুকু আমার ভেতর এখনও আছে সেটুকু, অনেক খানি সৌন্দর্যবোধ, আর চলে যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছেন উনাদের পারিবারিক লাইব্রেরীর সমস্ত বই। সেসব আরেকদিন, আজ চৈত্রের কথাই শুধু। এক চৈত্রকথায়, আরেক চৈত্রের চেয়ে খরতর কাহিনী বড় ঠাইরেনের চলে যাওয়ার গল্প বড্ড বেমানান।
চৈত্রের প্রথম কি দ্বিতীয় শনিবার, হাটের দিন, শনি-মঙ্গলবার হরির হাট বসে, সেরকমই এক সন্ধ্যায় আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় কান্নার রোল ওঠে। ছহেরদ্দি শেখের ছেলে আব্দুল আলি শেখ-এর কলেরা হয়েছে। হাট থেকে আসার পথে জিলাপি কিনে খেতে খেতে আসছিলো কালি সাঁঝের কালে, হঠাৎ পেছনে এক বিরাটাকার কুকুর, কালি সাঁঝের মতোই রং। আব্দুল আলি তাগড়া যুবক, এইসব কুকুর-টুকুর ভয় পাওয়ার লোক নয়। সে কুকুরকে পাত্তা না দিয়ে হাট থেকে বাড়ির দিকে এগোয়, হাট আর আব্দুল আলির বাড়ি মাত্র আধ মাইল দূরত্ব, মাঝে শেলই-খাল। খটখটে শুকনো খাল পার হতে গিয়ে আব্দুল আলি আছাড় খায়। আর টের পায় তার হাত থেকে কলাপাতায় মোড়ানো জিলাপি টেনে নেয় কুকুর। যাওয়ার সময় বলে যায়, “জিলাপি দিলি না, কাইড়া নিলাম, এই বার পুরা গ্রাম খাবার আসফারলাগছি”। পরের দিন সকালে এই গল্প আমরা শুনি ময়না দাদি, মজিরোনের মা, রহিবোন ফুপু সহ নানাজনের মুখে। আমরা যেতে চাই দেখতে আব্দুল আলি ভাইকে, কিন্তু আমাদের যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আমাদের সঙ্গে গল্প করে যায়।
কিন্তু যেই মা বাড়ির পেছন দিকে কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত ওমনি এক ছুটে আমি চলে যাই আব্দুল আলি ভাইদের বাড়ি। গিয়ে দেখি, বাড়িটা কেমন থমথমে। আব্দুল আলি ভাইকে একটা চৌকিতে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। তার পরনে লুঙ্গিটা শুধু লজ্জাস্থান ঢেকে রেখেছে। আগের রাত থেকেই বমি করতে করতে এখন আর বমি করার মতো শক্তিও নেই। নিম্নাংশ থেকে চৌকিতে বিছানো কলাপাতা বেয়ে যে জলের মতো জিনিস বেরুচ্ছে তার গন্ধে সেখানে দাঁড়ানো মুস্কিল। মাছি উড়ছে ভন ভন করে। আব্দুল আলি ভাইয়ের মা চাচি আম্মা তার বোন উজিরোন, লাইলি, লিলি আপারা চারপাশে ঘিরে বসে আছেন। আর ছহেরদ্দি কাকা বাইরে চৌকি পেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারও চারপাশে গ্রামের অনেক মুরুব্বি। ঝিনুক ভর্তি করে লবন পানি তুলে দেয়া হচ্ছে মুখে। বেতের নরোম আগা ছেঁচে তার রস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু “কিছুতেই কিছু হয়নি’।
গ্রামের একমাত্র ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ এসেছিলেন, স্যালাইন দিয়েছেন একটা, কিন্তু আব্দুল আলি ভাই ক্রমশঃ শক্তিহীন হতে হতে নির্জীব হয়ে গিয়েছেন। চৌকির ওপর বিছানো কলাপাতায় শোয়া আব্দুল আলি ভাইয়ের চেহারাটা আমার চোখে এখনও আঘাত করে। মাত্র কিছুদিন আগেই তার বিয়ে খেয়েছি আমরা। কি সুন্দর বউটি, একটু মোটাসোঁটা, আব্দুল আলি ভাই নিরক্ষর কিন্তু তার বউ ক্লাশ ফাইভ অবদি পড়েছেন। বিয়ের পর দ্বিতীয়বার বাপের বাড়িতে গিয়েছেন। তাকে ফিরতে হলো সেদিন রাতেই, কিন্তু ততোক্ষণে বাড়িতে কারবালার মাতম। আব্দুল আলি ভাই মারা গেছেন। আমার জীবনে কলেরায় দেখা প্রথম মৃত্যু। আব্দুল আলী ভাইয়ের স্ত্রী তখন অন্তঃস্বত্তা, তাও জানা গেলো তার মৃত্যুর দিনই। সে কি করুণ দৃশ্য! অথচ কেউই সে বাড়িতে আসতে পারছে না। কলেরার মৃত্যু, বাড়ি ছেড়ে লাশ যায় তবু ওলা যায় না, ওলা পেছন পেছন হেঁটে আসে ওই মৃত্যু থেকে যে যেদিকে যায়, সেদিকে। তাও আব্দুল আলি ভাইকে পরদিন ভোর ভোরে কবর দেয়া হলো, আর কবর দিয়ে আসতে আসতেই শোনা গেলো মারলং কাকার ছেলে ছিরাকে ওলা ধরেছে। আমাদের উঠোনে তখন গনগনে চৈত্র মাস।
লেবেলসমূহ:
মাসুদা ভাট্টি,
মাসুদা ভাট্টির স্মৃতিচারণ,
স্মৃতিচারণ
রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০০৯
বাবা,আমার হাতটি আবার ধরো

মৌসুমী কাদের
একটি বৃত্তপথ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মস্তিকে জিরো পয়েন্ট অঙ্ক কষে বসে আছে। কাঁধের ঝোলাটা বুকের মধ্যে কষে ধরে ভাবছি, বৃত্ত বরাবর একটা লম্বা হাটা দেবো। ইসা খাঁ রোড থেকে শুরু করে হাতের বা বরাবর জগন্নাথ হল, শহীদ মিনার, তারপর আরো বায়ে টি, এস, সি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন। ডানে গেলে যেখানে তিনভাগ পথ বিয়োগ হতে পারে, তবে কেন বায়ে যাওয়া? যাবো কারন এইটুকু প্রলম্বিত পথে যেতে যেতে আমি বিশটি বইয়ের নাম মনে করবো। শহীদ মিনারের সামনে সবুজ কচিপাতা ঘাসে পা মেলে দিয়ে…কোন বইটি প্রিয় মানুষগুলোকে উপহার দেবো সেই কথা ভাববো। যখন আমি কলাভবন পৌছে যাবো তখন আমার বিশটি বইয়ের তালিকা নিতে বাবা আসবেন লাইব্রেরীতে। মধ্যবিত্তের ভারী কাঁচের চশমা খুলে একি সঙ্গে আমার এবং আমার তালিকায় তার মুখ, তাকিয়ে অনুমান করবার চেষ্টা করবে, মুল্যটা কত? প্রতি বছর একুশ এলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার এই এককালীন ১২০০ টাকা প্রাপ্তি। যার প্রতিটি পয়সা আমি গোগ্রাসে গিলেছি বছরের পর বছর, রাস্তার ধারে বসে কার্ল মার্ক্স, বিচ্ছিন্নতার তত্ব, সাম্যবাদ এবং পাশাপাশি কত কবিতা ও গান। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে ফিরেছি বাংলা একাডেমির মেলা থেকে, হাতে ধরা ডজন ডজন বই। বাবা কোনোদিন তা খুলে দেখেননি, জানতেও চাননি কি পড়ছি বা আদৌ পড়ছি কিনা। টাকা মেরে দিয়ে চানাচুর, ফুচকা…অথবা যাবতীয় উদ্ভ্রান্ত ও উদবাস্তু সময়ের কত অসহায় গান রচনা করেছি, সেকথা কোনদিন বাবাকে শোনানো হয়নি…… কত বিভ্রান্ত বলিরেখায় আকাঁ হয়েছে একেকটি প্রসারিত নদী, তাও বাবাকে দেখানো হয়নি……।
বাবা, আজ আমার হাতটি ধরো, এই সেই ছোট্ট হাত যা তুমি নেড়েচেড়ে বলতে, ‘ওমা, এত ছোট্ট হাতে তুই লিখবি কেমন করে?’ তুমি ঠিকই বলতে, জীবনের কথা আমার আর লেখা হয়না, একটু একটু করে ক্রমশ আমি বৃক্ষ হয়ে উঠছি, বিলম্বিত সময় ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নতুন করে জন্মাতে ভুলে যাচ্ছি। কেন জানি মনে হয়, অন্তত একটি ভোরের সূর্যোদয় দেখবার জন্য হলেও আমার বেঁচে থাকা উচিত ছিল, তাহলে সকল ব্যর্থতার প্রায়শ্চিত্তে ফিরে যেতাম সেই একই বৃত্তপথে, যে পথ অবধারিত কিছু বালুকনা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সমুদ্রে যদি কখনও যেতেই হয়, আমি ঐ পথ ধরেই যাবো, জানি, এবারও তুমি কিছু বলবেনা। কিন্তু যাবার আগে প্রজন্মের হাতদুটো তোমায় উৎসর্গ করে যাই, যে হাত দিয়ে সে কবিতা লিখতে শুরু করেছে।একুশ লগ্নে এটুকুই তোমার আশীর্বাদ।
ত্বিষের কবিতার ক’টি লাইন বাবা তোমাকে দিলাম;
Memories Fade
Bonds Stay
Eyes of Sorrow
Day and Day
Reminiscence of the Forgotten
Chains that drag me down
Down to the depths of the sea
Until I open my eyes and believe
Believe that this is a dream
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০০৯
আমাদের পকেটে তখন কবিতা থাকত – শহীদ কাদরী
(২০০৬-এর ২০ আগস্ট, শামসুর রাহমানের মৃত্যুর তিন দিন পর, নিউইয়র্ক প্রথম আলো বন্ধুসভা আয়োজন করেছিল কবি শামসুর রাহমান স্মরণসন্ধ্যা। সেই সন্ধ্যায় অসুস্থ শরীর নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন শামসুর রাহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহযাত্রী কবি শহীদ কাদরী। তিনি তাঁর কবিবন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করেন। শহীদ কাদরীর সেদিনের সেই স্মৃতিচারণার ভাষ্য এখানে ছাপা হলো। তাঁর বক্তব্য ধারণ করেছিলেন আদনান সৈয়দ।)
আমি সত্যি এখনো শামসুর রাহমানের এই প্রয়াণ মেনে নিতে পারছি না। বছর দুয়েক আগে আমার সাথে শামসুর রাহমানের শেষ কথা হয় টেলিফোনে। তখন আমি অসুস্থ, শামসুর রাহমান নিজেও অসুস্থ ছিলেন। তিনি তখন আমাকে বলেছিলেন, ‘আই সিনসিয়ারলি উইশ ইওর স্পিডি রিকভারি।’ তারপর আর শামসুর রাহমানের সাথে আমার কথা হয়নি। কিন্তু আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শামসুর রাহমানকে সেই কৈশোরকাল থেকে চেনার। কবিতা পাঠ এবং কবিতা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
আমাদের কলকাতার এক বন্ধু ছিলেন, যাঁর মাধ্যমেই কবি শামসুর রাহমানের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমরা বায়ান্ন সালে ঢাকায় এসেছিলাম। আমাদের এক বন্ধু, নাম খোকন, ওঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল কলকাতায়। চুয়ান্ন সালে হঠাৎ তিনি ঢাকায় আমাদের বাসায় এসে হাজির হলেন। তিনি আবার বড় ভাইয়ের ক্লাসমেটও ছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘এই, তোরা এসেছিস কবে?’ তখন আমি সুকান্তর কবিতার একজন নিমজ্জিত পাঠক। সুকান্তর মতোই লেখার চেষ্টা করছি। তা আমার বড় ভাই খোকনকে বললেন, ‘শহীদ তো আজকাল কবিতা-টবিতা লেখার চেষ্টা করছে, জানিস নাকি?’ শুনে তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখা তো তোর কবিতা? তিনি আমার কবিতা দেখলেন-টেখলেন কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। আমাকে বললেন, ‘তুই শামসুর রাহমানের নাম শুনেছিস?’
আমি বললাম, ‘না তো?’
‘কী বলিস! শামসুর রাহমানের কবিতা প্রত্যেক সপ্তাহে দেশ-এ ছাপা হচ্ছে।’
তখন পর্যন্ত আমি শামসুর রাহমানের নাম শুনিনি। সদরঘাটের উল্টো দিকে খান মজলিসের একটা বুক স্টল ছিল। সেখানে পরিচয়, নতুন সাহিত্য, দেশ, পূর্বাশাসহ সব রকম পত্রিকাই আসত। এর মধ্যে আমার একটি কি দুটি কবিতা হয়তো ছাপাও হয়েছে। তখন মহিউদ্দিন আহমেদ সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন, নাম ছিল স্পন্দন। স্পন্দন-এ আমার একটা কবিতা বের হয়। কবিতা বের হওয়ার পরই নিজেকে লেখক-টেখক ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম। ওই কবিতাটি ছিল টিপিক্যাল মার্কসিস্ট, কিছুটা মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়-ভাবধারায় লেখা। তারপর পূর্বাশা আর চতুরঙ্গ পড়তে শুরু করলাম। আমার চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে রোমান্টিক কবিতার দিকে মোড় নিল। তখন আমি ‘জলকন্যার জন্যে’ কবিতাটি লিখি। কবিতাটি খুবই আনাড়ি ছিল, তবে এই কবিতাটির শরীরজুড়ে ছিল এক ধরনের বিষণ্ন রোমান্টিকতা।
এর মধ্যে একদিন খোকন আমাকে বললেন, ‘তোর কথা আমি শামসুর রাহমানকে বলব এবং তোর সাথে পরিচয় করে দেব।’ ‘জলকন্যার জন্যে’ কবিতাটি ছাপা হবার পর আমি প্রায়ই পত্রিকার স্টলে দাঁড়িয়ে আমার কবিতাটি বারবার পড়তাম এবং আড় চোখে দেখতাম অন্য কেউ আমার কবিতাটি পড়ছে কি না। রোজই আমাকে এ কাজ করতে হতো। একদিন দুপুরবেলার দিকে স্টলে দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কবিতাটি পড়ছি। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক যে আমাকে লক্ষ করছিলেন তা আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম। আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখি, খুব ফরসামতো, মানে সর্ব-অর্থে সুন্দর একজন সুপুরুষ স্পন্দন খুলে আমার কবিতাটি পড়ছেন। তখন আমাদের চোখাচোখি হলো। শামসুর রাহমান বললেন, ‘আচ্ছা, আপনি কি শহীদ কাদরী?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কী করে বুঝলেন?’
‘আপনার কথা আমাকে খোকন বলেছে।’
আমি খুব অভিভূত হয়ে গেলাম শামসুর রাহমানের সাথে পরিচিত হয়ে। তখন সদরঘাটে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, নাম ‘রিভার ভিউ’। সেখানেই চা খেতে খেতে শামসুর রাহমানকে বললাম, ‘আপনার কবিতা তো দেশ-এ পড়ছি।’ শামসুর রাহমান তাঁর পকেট থেকে বের করে অনেকগুলো কবিতা আমাকে পাঠ করে শোনালেন। তখন আমাদের সবার পকেটেই কবিতা থাকত।
আমি বললাম, ‘আমার পকেটেও একটা কবিতা আছে, শুনবেন?’ কবিতাটি তাঁকে পড়ে শোনালাম। সেটাও ছিল গতানুগতিক রোমান্টিক ধারার একটা কবিতা। ওই কবিতার একটা লাইনে ‘ভূল’ শব্দটির দিকে ইঙ্গিত করে শামসুর রাহমান বললেন, ভুল শব্দটার বানান ভুল হয়েছে।
সেখান থেকে শামসুর রাহমানের বাসায় গেলাম। শামসুর রাহমান আমাকে কালের পুতুল বইটি পড়তে বললেন। সেই থেকে আমরা বহুদিন মধ্যরাত পর্যন্ত একসাথে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি, চা খেয়েছি, সিগারেট খেয়েছি। আমাদের আড্ডায় ফজল শাহাবুদ্দীন থাকত আর মাঝে মাঝে আল মাহমুদ যোগ দিত।
আমার সঙ্গে শামসুর রাহমানের এত ্নৃতি জড়িয়ে আছে যে আমি এ মুহূর্তে বুঝতে পারছি না যে আমি কোনটা ছোঁব আর কোনটা ছোঁব না। এখনো আমার মনে হচ্ছে শামসুর রাহমান আছেন, আমি সুস্থ হয়ে যখন ঢাকায় যাব তখন শামসুর রাহমানের সাথে আবার আমার দেখা হবে। তাই প্রেস, টিভি-খবরটি যে-ই দিক, শামসুর রাহমানের প্রয়াণের খবর আমার কাছে ভয়াবহভাবে অপ্রত্যাশিত। আমি পুরোপুরিভাবে এখনো এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
আমার মতে, আমি বিশ্বাস করি যে ১৯৪৭ সাল পার হওয়ার পর এই মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম ফসল কবি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান আমাদের এই দেশে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ, যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার সবকিছুর এক অসমান্য সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। শামসুর রাহমান সারা বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২৪, ২০০৮
আমি সত্যি এখনো শামসুর রাহমানের এই প্রয়াণ মেনে নিতে পারছি না। বছর দুয়েক আগে আমার সাথে শামসুর রাহমানের শেষ কথা হয় টেলিফোনে। তখন আমি অসুস্থ, শামসুর রাহমান নিজেও অসুস্থ ছিলেন। তিনি তখন আমাকে বলেছিলেন, ‘আই সিনসিয়ারলি উইশ ইওর স্পিডি রিকভারি।’ তারপর আর শামসুর রাহমানের সাথে আমার কথা হয়নি। কিন্তু আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শামসুর রাহমানকে সেই কৈশোরকাল থেকে চেনার। কবিতা পাঠ এবং কবিতা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
আমাদের কলকাতার এক বন্ধু ছিলেন, যাঁর মাধ্যমেই কবি শামসুর রাহমানের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমরা বায়ান্ন সালে ঢাকায় এসেছিলাম। আমাদের এক বন্ধু, নাম খোকন, ওঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল কলকাতায়। চুয়ান্ন সালে হঠাৎ তিনি ঢাকায় আমাদের বাসায় এসে হাজির হলেন। তিনি আবার বড় ভাইয়ের ক্লাসমেটও ছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘এই, তোরা এসেছিস কবে?’ তখন আমি সুকান্তর কবিতার একজন নিমজ্জিত পাঠক। সুকান্তর মতোই লেখার চেষ্টা করছি। তা আমার বড় ভাই খোকনকে বললেন, ‘শহীদ তো আজকাল কবিতা-টবিতা লেখার চেষ্টা করছে, জানিস নাকি?’ শুনে তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখা তো তোর কবিতা? তিনি আমার কবিতা দেখলেন-টেখলেন কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। আমাকে বললেন, ‘তুই শামসুর রাহমানের নাম শুনেছিস?’
আমি বললাম, ‘না তো?’
‘কী বলিস! শামসুর রাহমানের কবিতা প্রত্যেক সপ্তাহে দেশ-এ ছাপা হচ্ছে।’
তখন পর্যন্ত আমি শামসুর রাহমানের নাম শুনিনি। সদরঘাটের উল্টো দিকে খান মজলিসের একটা বুক স্টল ছিল। সেখানে পরিচয়, নতুন সাহিত্য, দেশ, পূর্বাশাসহ সব রকম পত্রিকাই আসত। এর মধ্যে আমার একটি কি দুটি কবিতা হয়তো ছাপাও হয়েছে। তখন মহিউদ্দিন আহমেদ সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন, নাম ছিল স্পন্দন। স্পন্দন-এ আমার একটা কবিতা বের হয়। কবিতা বের হওয়ার পরই নিজেকে লেখক-টেখক ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম। ওই কবিতাটি ছিল টিপিক্যাল মার্কসিস্ট, কিছুটা মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়-ভাবধারায় লেখা। তারপর পূর্বাশা আর চতুরঙ্গ পড়তে শুরু করলাম। আমার চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে রোমান্টিক কবিতার দিকে মোড় নিল। তখন আমি ‘জলকন্যার জন্যে’ কবিতাটি লিখি। কবিতাটি খুবই আনাড়ি ছিল, তবে এই কবিতাটির শরীরজুড়ে ছিল এক ধরনের বিষণ্ন রোমান্টিকতা।
এর মধ্যে একদিন খোকন আমাকে বললেন, ‘তোর কথা আমি শামসুর রাহমানকে বলব এবং তোর সাথে পরিচয় করে দেব।’ ‘জলকন্যার জন্যে’ কবিতাটি ছাপা হবার পর আমি প্রায়ই পত্রিকার স্টলে দাঁড়িয়ে আমার কবিতাটি বারবার পড়তাম এবং আড় চোখে দেখতাম অন্য কেউ আমার কবিতাটি পড়ছে কি না। রোজই আমাকে এ কাজ করতে হতো। একদিন দুপুরবেলার দিকে স্টলে দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কবিতাটি পড়ছি। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক যে আমাকে লক্ষ করছিলেন তা আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম। আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখি, খুব ফরসামতো, মানে সর্ব-অর্থে সুন্দর একজন সুপুরুষ স্পন্দন খুলে আমার কবিতাটি পড়ছেন। তখন আমাদের চোখাচোখি হলো। শামসুর রাহমান বললেন, ‘আচ্ছা, আপনি কি শহীদ কাদরী?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কী করে বুঝলেন?’
‘আপনার কথা আমাকে খোকন বলেছে।’
আমি খুব অভিভূত হয়ে গেলাম শামসুর রাহমানের সাথে পরিচিত হয়ে। তখন সদরঘাটে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, নাম ‘রিভার ভিউ’। সেখানেই চা খেতে খেতে শামসুর রাহমানকে বললাম, ‘আপনার কবিতা তো দেশ-এ পড়ছি।’ শামসুর রাহমান তাঁর পকেট থেকে বের করে অনেকগুলো কবিতা আমাকে পাঠ করে শোনালেন। তখন আমাদের সবার পকেটেই কবিতা থাকত।
আমি বললাম, ‘আমার পকেটেও একটা কবিতা আছে, শুনবেন?’ কবিতাটি তাঁকে পড়ে শোনালাম। সেটাও ছিল গতানুগতিক রোমান্টিক ধারার একটা কবিতা। ওই কবিতার একটা লাইনে ‘ভূল’ শব্দটির দিকে ইঙ্গিত করে শামসুর রাহমান বললেন, ভুল শব্দটার বানান ভুল হয়েছে।
সেখান থেকে শামসুর রাহমানের বাসায় গেলাম। শামসুর রাহমান আমাকে কালের পুতুল বইটি পড়তে বললেন। সেই থেকে আমরা বহুদিন মধ্যরাত পর্যন্ত একসাথে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি, চা খেয়েছি, সিগারেট খেয়েছি। আমাদের আড্ডায় ফজল শাহাবুদ্দীন থাকত আর মাঝে মাঝে আল মাহমুদ যোগ দিত।
আমার সঙ্গে শামসুর রাহমানের এত ্নৃতি জড়িয়ে আছে যে আমি এ মুহূর্তে বুঝতে পারছি না যে আমি কোনটা ছোঁব আর কোনটা ছোঁব না। এখনো আমার মনে হচ্ছে শামসুর রাহমান আছেন, আমি সুস্থ হয়ে যখন ঢাকায় যাব তখন শামসুর রাহমানের সাথে আবার আমার দেখা হবে। তাই প্রেস, টিভি-খবরটি যে-ই দিক, শামসুর রাহমানের প্রয়াণের খবর আমার কাছে ভয়াবহভাবে অপ্রত্যাশিত। আমি পুরোপুরিভাবে এখনো এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
আমার মতে, আমি বিশ্বাস করি যে ১৯৪৭ সাল পার হওয়ার পর এই মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম ফসল কবি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান আমাদের এই দেশে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ, যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার সবকিছুর এক অসমান্য সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। শামসুর রাহমান সারা বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২৪, ২০০৮
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৯
সেলিম আল দীনঃ কিছু স্মৃতি কিছু প্রশ্ন
সেজান মাহমুদ
গত সোমবার (জানুয়ারি ১৫, ২০০৮) আধুনিক বাংলা নাটকের অন্যতম পুরোধা, বাংলা নাটককে বিশ্বমানে উন্নীত করার অগ্রগণ্য সৈনিক সেলিম আল দীন মৃত্যুর সংগে লড়াই করতে করতে অবশেষে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। চলে গেলেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, ভক্ত, অনুরাগী, প্রিয়জন, সর্বোপরী বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিশালী ধারাকে কিছুকালের জন্যে হলেও কান্ডারীবিহীন করে দিয়ে।
এ্যাংলো-আইরিশ নাট্যকার, লেখক অস্কার ওয়াইলড একবার বলেছিলেন, ’এই পৃথিবী এক নাট্যশালা, কিন্তু এর পাত্রপাত্রি নির্বাচন করা হয়েছে একদম বাজে ভাবে ’। নাটকান্তপ্রাণ সেলিম আল দীন একথা খুব ভালোভাবে জানতেন বলেই বোধহয় কখনও রাজনীতি বা ক্ষমতা নিয়ে কোন ধরনের টানাহেচরাতে যেতেন না। বরং নিভৃতে, নিরালায়ে গবেষক, ধ্যানীর একাগ্রতা নিয়ে কাজ করে গেছেন আপন মনে। আর তারই ফলশ্রুতিতে ’কেরামত মঙ্গল’, ’চাকা’, ’হাত হদাই’, ’যৈবতী কন্যার মন’, ’বনপাংশুল’, ’প্রাচ্য’, ’নিমজ্জন’ বা ’স্বর্ণবোয়াল’ -এর মতো আধুনিক, বিশ্বমানের নাটকের জন্ম।
সেলিম আল দীনের সংগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় সেই আশির দশকের শেষদিকে তাঁরই এক ছাত্র ’রাজু’র মাধ্যমে। আমরা তখন ’ডকুমেন্টারি ড্রামা’ বা ’কমিউনিটি থিয়েটার’ এর ধারণাগুলোকে ব্যবহার করে স্বাস্থ্য-শিক্ষাকে একেবার সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দেয়া যায় কিনা, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে চায়ের কাপে ঝড় তুলি। রাজুই একদিন বললো, ’আমি সেলিম স্যারের কাছে তোমাদের গল্প করেছি, তিনি জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির বাসায় নেমন্তন্ন করেছেন।’ তখন তৃষ্ণা আর আমি নিমগ্ন প্রেমিক-প্রেমিকা, এমনিতেই পুরনো ঢাকার মেডিক্যাল কলেজের গন্ডি পার হয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ। সেদিন জাহাঙ্গীর নগরে সেলিম ভাইয়ের বাসায় সারাদিন কাটিয়েছিলাম। প্রথম পরিচয়ে মানুষ যে এতোটা কাছে টেনে নিয়ে পারেন আমার ধারণা ছিলো না। গল্প, নাটক নিয়ে আলোচনা চললো; তখন আমিও টগবগে তাজা তরুন, তড়িৎ গতিতে কথায় চলে আসে ইস্কিলাস, মলিয়ের, কাম্যু, আরও কত কি! খুব গর্বের সংগেই বলি, সেলিম ভাই ভীষণ পছন্দ করেছিলেন সেই একদিনেই। নিজের হাতে নিজের রোপা গাছ থেকে পেয়ারা এনে খাওয়ালেন। সেলিম ভাই এবং ভাবীর গাছ লাগানোর শখ ছিল খুব।তারপর থেকে শুধু যোগাযোগ একটা সম্পর্কে দাড়িয়ে গিয়েছিল খুব কম সময়েই। তাঁর সংগে সম্পর্কের একটি ঘটনা না বললেই নয়, তার কারণ এটি আমার জীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনার একটি। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে সেলিম ভাইয়ের ধারাবাহিক নাটক হচ্ছে, ’ছায়াশিকারী’। তৃষ্ণা তাতে একটি চরিত্রে অভিনয় করছে। নাটকের রিহার্সেল হবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি রুমে। ফোনে কথা বলার সময় সেলিম ভাই বললেন তুমিও চলে আসবে রিহার্সেলে। আমি বললাম, আমি কেন? আমি হয়তো তৃষ্ণাকে নামিয়ে দিয়ে আসবো। সেলিম ভাই বললেন, না, তুমি থাকবে এই রিহার্সেলে, তোমার কাজ হবে ক্যারেক্টারগুলো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যাখ্যা করে দেয়া। এ আবার কেমন কথা? কোন নাট্যকার কি এটা করেন? এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়ের সব প্রতিশ্রুতিশীল, এখনকার স্বনামখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রী, শহীদুজ্জামান সেলিম, আফসানা মিমি, নাদের চৌধুরীসহ আরও অনেকে। নাটকের কোন চরিত্র কেমন হবে না হবে এগুলো নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে আমি বললাম, ‘এই নাটকটিকে গুন্টার গ্রাসের টিনড্রামের সংগে তুলনা করলে কেমন হয়? সেখানে যেমন প্রধান চরিত্রটি প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ঘোষণা করে সে আর বড় হবে না, অর্থাৎ প্রতিবন্ধী থেকে যাবে, এখানেও নাটকের প্রত্যেকটা চরিত্র কোন না কোনভাবে প্রতিবন্ধী, একধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দী, এটাও একধরনের প্রতিবাদ। তারপর যার যার অবস্থান থেকে চরিত্রায়ন করা যায়।’সেলিম ভাই আমার মনতব্য ভীষণ পছন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন তুমি ঠিক আমার মনের কথাটি ধরে ফেলেছো। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটা ঘোষণা দিয়ে ফেললেন। এই নাটকে একটি চরিত্র ছিল অন্ধ একজন শিল্পীর। সেলিম ভাই বললেন, এই চরিত্রে সেজান অভিনয় করো। আমি জানি যারা এটা শুনেছিলেন ঐ সময়ে তারা নিশ্চয়ই অবাক ও ঈর্ষান্নিত হয়েছিলেন। আমি নিজেও জানি না তিনি কেন এটা বলেছিলেন, এবং এটা যে কথার কথা ছিল না তাও প্রমানিত যখন তিনি রিহার্সেলের পরেও কয়েকবার বলেছিলেন তার মধ্য দিয়ে। আমি বলেছিলাম, ’সেলিম ভাই, আমি পর্দার আড়ালে থাকার মানুষ। তাছাড়া আমি নাটকে আভিনয় করলে আমি একবারেই শেষ, আর না করলে আমি সারা জীবন বলতে পারবো বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান নাট্যকার আমাকে তাঁর নাটকে আভিনয় করতে বলেছিলেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ সেই চরিত্রটি পরে খ্যাতিমান অভিনেতা বুলবুল আহমেদ চরিত্রায়ন করেছিলেন।এরপর বিদেশে চলে এলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে যোগাযোগ হতো টেলিফোনে। একবার তাঁর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকী পালন হলো ঘটা করে। আমরা আমেরিকা থেকে ফোন করি তাঁর বাসায়। এতোদিন পরেও ’সেলিম ভাই, শুভ জন্মদিন, হ্যাপী বার্থ ডে’ এটুকু বলার সংগে সংগেই বলেন, সেজান কেমন আছো? তৃষ্ণার কি খবর? আমাদের আরও আবাক হবার পালা!
তাঁর মতো মহান শিল্পী প্রত্যেককে নানাভাবে অবাক করবেন, এতে অবাক হবার কিছু নেই। বাংলাভাষার নাটকে তাঁর অবস্থান যথার্থই কোথায় তা নির্ধারণ করা হলে আরও অবাক হতে হবে আমাদের। তিনি নাটকের আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছেন, ধ্রুপদীধারার সঙ্গে আধুনিক অনুসঙ্গ বিনির্মানে কখনও আশ্রয় নিয়েছেন প্রাচীন উপকথার, কখনও জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দর্শনের তত্ত্বজ্ঞানের ভান্ডারকে রুপকাশ্রয়ী করে গেঁথেছেন গল্পের বুনন। তাঁর প্রথমদিকের নাটকে কালমুখীনতা লক্ষ্যনীয় থাকলেও, শেষেরদিকের কাজে কালবিরোধীতার লক্ষন দেখা যায়। এর থেকে অনুমান করি যে তিনি তাঁর নিজের সৃজনশীলতার নিরিক্ষাতেও নাটকের মতই ক্লাইমেক্সের বা চূড়ান্ত পর্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হা হতস্যি, সেই কাজ শেষ হবার আগেই থমকে গেল তাঁর জীবনের ’চাকা’।
আমরা জানি সেলিম আল দীন এক সংগে অনেকগুলো রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ক্রনিক রোগগুলো এরকমই, একটা বাসা বাঁধলে অন্যগুলোও মেহমানের মতো আসে, জুড়ে বসে। তাছাড়া তাঁর মতো নিয়ম-মাফিক-চলা মানুষের মধ্যেও অনেক অনিয়ম জীবনের অনিবার্য সংগী হয়ে ছিল। সৃজনশীল কাজের নিত্য সংগী ’স্ট্রেস’, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্য হূদরোগের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। তাঁর জন্য সেটাই স্বাভাবিক। এও জানি তাঁকে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে কেন এই প্রস্তুতি নিতে হয় জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে? কেন বন্ধু-বান্ধব, শিল্পীদেরই প্রিয়জন হারানোরোধে শেষ মুহূর্তে এসে তড়িঘড়ি করে সব জোগার করতে হয়, যখন আর কিছুই করার থাকে না? আমরা কি জাতীয় পর্যায়ে কোন দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারি না? প্রতিষ্ঠা করতে পারি না কোন ফাউন্ডেশন যা জাতীয় সম্পদের মতো প্রতিভাবানদের অসুস্থতার দূঃসময়ে অর্থ জোগান দেবে? অন্তত পক্ষে ততদিন যতদিন আমাদের নিজের দেশে সুচিকিৎসার সব ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে থাকছে না। এক্ষেত্রে বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালগুলো এগিয়ে আসতে পারে। নাকি তারাও ঢাকা থাকবে মাত্রাহীন মুনাফার ঘেরাটোপে?
সেলিম আল দীন চিরকালের মতো চলে গেছেন। সংগে নিয়ে গেছেন বাংলা ভাষায় আরেকটি নোবেল পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা। কিম্বা কে জানে তাঁর ওপর গবেষণায় হয়তো দেখা যাবে সে সম্ভাবনার বীজ এখানেই নিহিত আছে। এ আমার আতিশয্য নয়, নির্মোহ ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। শুধু দেখার পালা তাঁর বিশ্বজনীন আবেদনকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার প্রতিভা কোথায়! ফরাসি-আলজেরিয়ান লেখক, দার্শনিক, নাট্যকার আলবিয়ার কাম্যু’র একবার বলেছিলেন,
"Accept Life, take it as it is? Stupid. The means of doing otherwise? Far from our having to take it, it is life that possesses us, and on occasion shuts our mouths."
জীবনের কাছে আত্নসমর্পন করে জীবনকে মেনে নেয়াই ভালো, নাকি জীবনকে খুঁড়ে নিতে হবে জীবনেরই নির্যাস?, একথার উত্তরও দেবে সেলিম আল দীনের নাটক, এখানেই তাঁর মহৎ কালজয়ীতা।
গত সোমবার (জানুয়ারি ১৫, ২০০৮) আধুনিক বাংলা নাটকের অন্যতম পুরোধা, বাংলা নাটককে বিশ্বমানে উন্নীত করার অগ্রগণ্য সৈনিক সেলিম আল দীন মৃত্যুর সংগে লড়াই করতে করতে অবশেষে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। চলে গেলেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, ভক্ত, অনুরাগী, প্রিয়জন, সর্বোপরী বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিশালী ধারাকে কিছুকালের জন্যে হলেও কান্ডারীবিহীন করে দিয়ে।
এ্যাংলো-আইরিশ নাট্যকার, লেখক অস্কার ওয়াইলড একবার বলেছিলেন, ’এই পৃথিবী এক নাট্যশালা, কিন্তু এর পাত্রপাত্রি নির্বাচন করা হয়েছে একদম বাজে ভাবে ’। নাটকান্তপ্রাণ সেলিম আল দীন একথা খুব ভালোভাবে জানতেন বলেই বোধহয় কখনও রাজনীতি বা ক্ষমতা নিয়ে কোন ধরনের টানাহেচরাতে যেতেন না। বরং নিভৃতে, নিরালায়ে গবেষক, ধ্যানীর একাগ্রতা নিয়ে কাজ করে গেছেন আপন মনে। আর তারই ফলশ্রুতিতে ’কেরামত মঙ্গল’, ’চাকা’, ’হাত হদাই’, ’যৈবতী কন্যার মন’, ’বনপাংশুল’, ’প্রাচ্য’, ’নিমজ্জন’ বা ’স্বর্ণবোয়াল’ -এর মতো আধুনিক, বিশ্বমানের নাটকের জন্ম।
সেলিম আল দীনের সংগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় সেই আশির দশকের শেষদিকে তাঁরই এক ছাত্র ’রাজু’র মাধ্যমে। আমরা তখন ’ডকুমেন্টারি ড্রামা’ বা ’কমিউনিটি থিয়েটার’ এর ধারণাগুলোকে ব্যবহার করে স্বাস্থ্য-শিক্ষাকে একেবার সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দেয়া যায় কিনা, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে চায়ের কাপে ঝড় তুলি। রাজুই একদিন বললো, ’আমি সেলিম স্যারের কাছে তোমাদের গল্প করেছি, তিনি জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির বাসায় নেমন্তন্ন করেছেন।’ তখন তৃষ্ণা আর আমি নিমগ্ন প্রেমিক-প্রেমিকা, এমনিতেই পুরনো ঢাকার মেডিক্যাল কলেজের গন্ডি পার হয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ। সেদিন জাহাঙ্গীর নগরে সেলিম ভাইয়ের বাসায় সারাদিন কাটিয়েছিলাম। প্রথম পরিচয়ে মানুষ যে এতোটা কাছে টেনে নিয়ে পারেন আমার ধারণা ছিলো না। গল্প, নাটক নিয়ে আলোচনা চললো; তখন আমিও টগবগে তাজা তরুন, তড়িৎ গতিতে কথায় চলে আসে ইস্কিলাস, মলিয়ের, কাম্যু, আরও কত কি! খুব গর্বের সংগেই বলি, সেলিম ভাই ভীষণ পছন্দ করেছিলেন সেই একদিনেই। নিজের হাতে নিজের রোপা গাছ থেকে পেয়ারা এনে খাওয়ালেন। সেলিম ভাই এবং ভাবীর গাছ লাগানোর শখ ছিল খুব।তারপর থেকে শুধু যোগাযোগ একটা সম্পর্কে দাড়িয়ে গিয়েছিল খুব কম সময়েই। তাঁর সংগে সম্পর্কের একটি ঘটনা না বললেই নয়, তার কারণ এটি আমার জীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনার একটি। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে সেলিম ভাইয়ের ধারাবাহিক নাটক হচ্ছে, ’ছায়াশিকারী’। তৃষ্ণা তাতে একটি চরিত্রে অভিনয় করছে। নাটকের রিহার্সেল হবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি রুমে। ফোনে কথা বলার সময় সেলিম ভাই বললেন তুমিও চলে আসবে রিহার্সেলে। আমি বললাম, আমি কেন? আমি হয়তো তৃষ্ণাকে নামিয়ে দিয়ে আসবো। সেলিম ভাই বললেন, না, তুমি থাকবে এই রিহার্সেলে, তোমার কাজ হবে ক্যারেক্টারগুলো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যাখ্যা করে দেয়া। এ আবার কেমন কথা? কোন নাট্যকার কি এটা করেন? এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়ের সব প্রতিশ্রুতিশীল, এখনকার স্বনামখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রী, শহীদুজ্জামান সেলিম, আফসানা মিমি, নাদের চৌধুরীসহ আরও অনেকে। নাটকের কোন চরিত্র কেমন হবে না হবে এগুলো নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে আমি বললাম, ‘এই নাটকটিকে গুন্টার গ্রাসের টিনড্রামের সংগে তুলনা করলে কেমন হয়? সেখানে যেমন প্রধান চরিত্রটি প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ঘোষণা করে সে আর বড় হবে না, অর্থাৎ প্রতিবন্ধী থেকে যাবে, এখানেও নাটকের প্রত্যেকটা চরিত্র কোন না কোনভাবে প্রতিবন্ধী, একধরনের সীমাবদ্ধতায় বন্দী, এটাও একধরনের প্রতিবাদ। তারপর যার যার অবস্থান থেকে চরিত্রায়ন করা যায়।’সেলিম ভাই আমার মনতব্য ভীষণ পছন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন তুমি ঠিক আমার মনের কথাটি ধরে ফেলেছো। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটা ঘোষণা দিয়ে ফেললেন। এই নাটকে একটি চরিত্র ছিল অন্ধ একজন শিল্পীর। সেলিম ভাই বললেন, এই চরিত্রে সেজান অভিনয় করো। আমি জানি যারা এটা শুনেছিলেন ঐ সময়ে তারা নিশ্চয়ই অবাক ও ঈর্ষান্নিত হয়েছিলেন। আমি নিজেও জানি না তিনি কেন এটা বলেছিলেন, এবং এটা যে কথার কথা ছিল না তাও প্রমানিত যখন তিনি রিহার্সেলের পরেও কয়েকবার বলেছিলেন তার মধ্য দিয়ে। আমি বলেছিলাম, ’সেলিম ভাই, আমি পর্দার আড়ালে থাকার মানুষ। তাছাড়া আমি নাটকে আভিনয় করলে আমি একবারেই শেষ, আর না করলে আমি সারা জীবন বলতে পারবো বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান নাট্যকার আমাকে তাঁর নাটকে আভিনয় করতে বলেছিলেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ সেই চরিত্রটি পরে খ্যাতিমান অভিনেতা বুলবুল আহমেদ চরিত্রায়ন করেছিলেন।এরপর বিদেশে চলে এলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে যোগাযোগ হতো টেলিফোনে। একবার তাঁর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকী পালন হলো ঘটা করে। আমরা আমেরিকা থেকে ফোন করি তাঁর বাসায়। এতোদিন পরেও ’সেলিম ভাই, শুভ জন্মদিন, হ্যাপী বার্থ ডে’ এটুকু বলার সংগে সংগেই বলেন, সেজান কেমন আছো? তৃষ্ণার কি খবর? আমাদের আরও আবাক হবার পালা!
তাঁর মতো মহান শিল্পী প্রত্যেককে নানাভাবে অবাক করবেন, এতে অবাক হবার কিছু নেই। বাংলাভাষার নাটকে তাঁর অবস্থান যথার্থই কোথায় তা নির্ধারণ করা হলে আরও অবাক হতে হবে আমাদের। তিনি নাটকের আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছেন, ধ্রুপদীধারার সঙ্গে আধুনিক অনুসঙ্গ বিনির্মানে কখনও আশ্রয় নিয়েছেন প্রাচীন উপকথার, কখনও জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দর্শনের তত্ত্বজ্ঞানের ভান্ডারকে রুপকাশ্রয়ী করে গেঁথেছেন গল্পের বুনন। তাঁর প্রথমদিকের নাটকে কালমুখীনতা লক্ষ্যনীয় থাকলেও, শেষেরদিকের কাজে কালবিরোধীতার লক্ষন দেখা যায়। এর থেকে অনুমান করি যে তিনি তাঁর নিজের সৃজনশীলতার নিরিক্ষাতেও নাটকের মতই ক্লাইমেক্সের বা চূড়ান্ত পর্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হা হতস্যি, সেই কাজ শেষ হবার আগেই থমকে গেল তাঁর জীবনের ’চাকা’।
আমরা জানি সেলিম আল দীন এক সংগে অনেকগুলো রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ক্রনিক রোগগুলো এরকমই, একটা বাসা বাঁধলে অন্যগুলোও মেহমানের মতো আসে, জুড়ে বসে। তাছাড়া তাঁর মতো নিয়ম-মাফিক-চলা মানুষের মধ্যেও অনেক অনিয়ম জীবনের অনিবার্য সংগী হয়ে ছিল। সৃজনশীল কাজের নিত্য সংগী ’স্ট্রেস’, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্য হূদরোগের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। তাঁর জন্য সেটাই স্বাভাবিক। এও জানি তাঁকে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে কেন এই প্রস্তুতি নিতে হয় জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে? কেন বন্ধু-বান্ধব, শিল্পীদেরই প্রিয়জন হারানোরোধে শেষ মুহূর্তে এসে তড়িঘড়ি করে সব জোগার করতে হয়, যখন আর কিছুই করার থাকে না? আমরা কি জাতীয় পর্যায়ে কোন দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারি না? প্রতিষ্ঠা করতে পারি না কোন ফাউন্ডেশন যা জাতীয় সম্পদের মতো প্রতিভাবানদের অসুস্থতার দূঃসময়ে অর্থ জোগান দেবে? অন্তত পক্ষে ততদিন যতদিন আমাদের নিজের দেশে সুচিকিৎসার সব ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে থাকছে না। এক্ষেত্রে বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালগুলো এগিয়ে আসতে পারে। নাকি তারাও ঢাকা থাকবে মাত্রাহীন মুনাফার ঘেরাটোপে?
সেলিম আল দীন চিরকালের মতো চলে গেছেন। সংগে নিয়ে গেছেন বাংলা ভাষায় আরেকটি নোবেল পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা। কিম্বা কে জানে তাঁর ওপর গবেষণায় হয়তো দেখা যাবে সে সম্ভাবনার বীজ এখানেই নিহিত আছে। এ আমার আতিশয্য নয়, নির্মোহ ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। শুধু দেখার পালা তাঁর বিশ্বজনীন আবেদনকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার প্রতিভা কোথায়! ফরাসি-আলজেরিয়ান লেখক, দার্শনিক, নাট্যকার আলবিয়ার কাম্যু’র একবার বলেছিলেন,
"Accept Life, take it as it is? Stupid. The means of doing otherwise? Far from our having to take it, it is life that possesses us, and on occasion shuts our mouths."
জীবনের কাছে আত্নসমর্পন করে জীবনকে মেনে নেয়াই ভালো, নাকি জীবনকে খুঁড়ে নিতে হবে জীবনেরই নির্যাস?, একথার উত্তরও দেবে সেলিম আল দীনের নাটক, এখানেই তাঁর মহৎ কালজয়ীতা।
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০০৯
আমায় লাবণ্য দাও
মৌসুমী কাদের
১.
আমাদের বাড়িটা তোমাকে,
সেই বাড়িটা কেমন যেন ঘোলাটে ঘোলাটে ছিল। ইস্কুল ঘরের মত লম্বা এক ফালি বারান্দা। মাটির মেঝে, চারটে চৌকাঠ, একটা ভাংগা বেন্চ, একটা শীতল পাটি, দাদার তালপাখা আর লাঠি, এই মিলিয়ে বারান্দা। মূল ঘরটি ছিল অনেকটা পৌরানিক বিলম্বিত লয়ের মত। তাকে যেভাবে খুশী ভাবা যায়, সেভাবেই সাজানো। তার মানে, দুটো রহস্যময় উঁচু উঁচু খাট, দুটো গম্ভীর ভারী কেদারা, দুটো লিকলিকে পাটের শিকে, যার ভেতরে পেট মোটা তিন তিনটে করে মাটির হাড়ি, মাটির সমতল মেঝে, আর রহস্যময় দুটো শরীর। আমার দাদা আর বুবু। কেন রহস্যময় বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। দাদা আর বুবু যখন খড়ম পায়ে দিয়ে হাটতেন তখন একজনের খড়মে খুব জোরে খট খট শব্দ হোত, অন্য জনের হোতনা, আবার খালি পায়ে হাটলেও বোঝা যেত, কে হাটছে, দাদা, না বুবু!!!! একজন মহা শব্দ পছন্দ করতেন, অন্যজন চুপচাপ।
উঠোনের বাম পাশে পর পর রান্নাঘর আর কাচারী ঘর। রান্না ঘরে বুবু রান্না করতেন। কাচারী ঘরে পাখিরা প্রেম করত। পাখিরা টের পেত, এ এক মহা নিরাপদ জায়গা। গান বাজনা, ধর্ম-কর্ম কোন কিছুতেই কোন বাঁধা নেই। সারাদিন সারারাত ধরে চলত উৎসবের পর উৎসব। বৈশাখী মেলায় উৎসবের ঘ্রাণটা বেশী হোত, আমের মুকুলের ছড়াছড়ি ছিল যে!।
উঠোনের পরই পুকুর। সেই পুকুরেও রোজ ঘরোয়া উৎসব চলতো। পাখিদের উচচাঙ্গ, মাছেদের রবীন্দ্রসংগীত, বেল গাছ আর বড়ই গাছদের ভাটিয়ালি। দাদা আর বুবু পুকুর পাড়ে বসে এইসব জলখেলায় অংশ নিতেন। হাডুডু, ডাংগুলি..কত কি!!!। পৃথিবীর জাগতিক সারল্যে সময় কেটে যেত তাদের। কখনও মনে করতেন না, এক কন্যা-এক পুত্র সন্তানদ্বয় ক্রমশ শোক থেকে অশোক হয়ে উঠছে। একি প্রাপ্তি না অপ্রাপ্তি?
২
বাবা,
আমাদের সেই ঘোলাটে বাড়িটা আর নেই। রান্না ঘর, কাচারী ঘর, কিচছু নেই। পুকুরটা মজে গেছে অনেকদিন। চাপকলে চাপ দিলে পানি নেই। দাদা, বুবু, তুমি, কেউ নেই। তুমি যখন বেঁচে ছিলে, তখন দুনিয়ার সকল মানুষকে যেমনটি দেখতে চাইতাম, দেখতে পেতাম। এখন কি ঘুমহীন হয়ে উঠছি? সারারাত সিড়িঘরে, দরজার ওপারে, পায়ের শব্দ, ফিসফিস আওয়াজ। বিছানা ছেড়ে উঠবো কি? ভয়; চোখে, মুখে,নাকে... ভয়, আলাদা হয়ে যাবার ভয়, বন্ধুহীন হবার ভয়, একাকীত্বের যনত্রনার ভয়। নিজেকে নিয়ে ভীষণ ভয় আমার। কোথাও কিছু ঘটে যাচেছ নিশ্চয়ই!!! ভ্রমরেরা জাল বুনতে শুরূ করেছে। নইলে এমন বিষন্নতা গ্রাস কোরত না। সত্যরা আটকে পড়েছে দেয়ালে, খূঁজে পাচেছনা সঠিক পথ। আবার চারপাশ ঘুড়ে টুড়ে বলছে, দরজাটা কোথায়? এপারে আমি দাঁড়িয়ে থাকি র্দীঘকাল-ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, অপেক্ষায় অপেক্ষায় আমার শরীরের ঘাম বেয়ে পড়ে। অনর্তগত নিয়মগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়, আমি গ্রামদেশে চলে যাই, সেই পুকুরপাড়, কলাপাতার নাক বরাবর মাটির পথ ধরে হেটে চলে যাই, যেখানে এখনও ‘সীমাবদ্ধ মানুষ’ ও ‘পোকামাকড়’ পথ খোঁজে। পুকুর বা নদীরা মজে গেলেও মনে পড়ে তাদেরই। দাদা, বুবুসহ মনে পড়ে তোমাকেই।
তুমি চলে যাবার পর একটা মৃত্যু উৎসব হোল। মানুষ মারা গেলেও রঙীন কাপড় টানিয়ে, গরু জবাই দিয়ে গ্রামবাসীদের খাওয়ানো হোল। শ্রাদ্ধ কুলখানি যাই বলি, তোমার বেলায়ও তাই হলো। তিন তিনটে কবর। দাদা, বুবু, আর তুমি- আর একফালি উঠোন, সেইটুকু জায়গা-তে সামিয়ানা টানানো। গ্রাম বাসীরা আর এখন মাটিতে বসে খেতে চায় না। শহরে সভ্যতা তাদের চোখে মুখে শরীরে লেগে গেছে। চেয়ার টেবিলে বসে মহা উৎসবে খাওয়া-দাওয়া হলো। এই দৃশ্য পাখীরা, যারা কাচারী ঘর খসে পড়ার পর বড় আম গাছটিতে বংশ বিস্তার করেছিল, তারা দেখেছে। এই দৃশ্য মজা পুকুর দেখেছে, যার ঘোলাটে পানির বুদবুদ শবদ প্রতিদিন তোমাদের কানে পৌছোয়। এই দৃশ্য, সারি সারি সুপারি গাছ দেখেছে, যারা কবরগুলোকে ঘিরে ওপেনটু বায়োস্কপ খেলছে। এই দৃশ্য তোমরাও কি দেখেছ বাবা?
বাবা, তোমাকে ঠিকঠিক কথাগুলো বলা যাচেছনা। অথবা বলেই ভাবছি, ভাবনাটা এরকম ছিলনা। যতই যুক্তি-তর্ক, নিয়নত্রন, কাঠামো, এইসব ভাবছি, ভেতরে ভেতরে ততটাই অপদার্থ, অর্থহীন আবিষ্কারকেরা ঘরবাড়ী, দরজা-জানালা তৈরী করছে। আকাশ বরাবর খোলা জানালায় আলোর প্রলোভনে প্রলোভিত হতে চাই আমি। অথচ মৃত্যু আমাকে ডাকছে। বলছে, আয়, আয়, কাছে আয়..এই অসীম আকাশের মেঘেরা ভেসে ভেসে গিয়ে যদি বলে তোমায় আমার অপেক্ষার কথা ! ভালোবাসা কত বিচিত্র দেখ! তুমি যখন ছিলে, কাছে ছিলে, আমি বড় ‘দৈনন্দিন‘ ভাবেই ভেবেছি তোমায়। ইংরেজীর দূর্বলতা কাটানো, পড়াশোনার যত সংশোধন, ভাত খাওয়া, টেলিভিশন দেখা, বেলের সরবত, ডিকশনারী ‘মুখস্তকরন‘ অনুবাদ, বইমেলার প্রাপ্য ১২০০ টাকা, এই দৈনন্দিনতা এখন বড়ই মধুর ও বিশেষ হয়ে উঠছে। তুমি এখন কতটা ‘বিশেষ’ এবং মুক্তির জায়গায় আছো, চারপাশের অস্থিরতা দেখলে তা টের পাই।
বাবা, এই নির্লিপ্ত সভ্য শহরে একটা ডুব সাতার কতটা যে জরুরী, তা আমরা কেউ বুঝিনা। সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম এই চলায় সকলেই সুখী। আমি কি সুখী বাবা? আমি কি সুখী? তুমি কি জানো বাবা? একটা আশ্চর্য, বাধঁন কোনদিন কখনও আমায় নম্রতায়িত করে ফেলবে সে আমি ভাবিনি। আমরা ভাই-বোনেরা যেমন তোমার, তেমনি, আমার সনতান আমার। আমি যত দূরেই যাই, সমুদ্র বা বিশাল আকাশ, ততই যেন ফিরে ফিরে আসি, কোথায় এই দায়ভার কে জানে? এসব কথা বলছি বলে কি ভাবছো, আমি ‘সভ্য‘ হয়ে গেছি, মৃত্যুমূখী ভাবনা‘র ভূত আমার ঘাড় থেকে নেমে গেছে? না তা নয়, তা নয়।
৩
মেঘবালিকা বন্ধু আমার, এই আমার মেঘবালিকা,
মেঘবালিকা বলছি, আসলে সে বালিকা নয়, না বয়সে-না স্বভাবে। তার বিশেষনগুলো বলা যায়। গভীর কালো চোখ, আটপৌড়ে চেহারা, বড় একটা গোল টিপ, টুকটাক গয়না, আটপৌড়ে শাড়ী অথবা সেলওয়ার কামিজ। সে একজন পরিনত নারী। মেঘবালিকা বলছি, কেন? মেঘের সংগে তার চির ভাব। শৈশবে সে ঘাসফড়িং এর ডানায় ভর করে হেটে বেড়াত; একটুও মাটিতে পা পড়তনা তার। মফন্বলের মাটি, আধপাকা ঘর, প্রতিবেশী আর পলাতক মেঘ ভেতরে তার সঙ্গী হোল। তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবেই এটি সে জানতো। এক ধরনের অহংকার তার চুলে, ঠোটে, শরীরে শিহরন তৈরী কোরল। আমি তার নাম দিলাম মেঘবালিকা। আমি তার বন্ধু হতে চাইলাম। মেঘবালিকা নবীন ঘাসফুলের মতন তার ফুলদানিতে জায়গা করে নিল আমায়। মেঘবালিকা ছলনাময়ী। আমাকে প্রলোভিত করে নানাভাবে; শব্দ করে, রং করে.. ও ছবি এঁকে, ঘরবাড়ী-জানালা, সর্ষে ফুল, সমুদ্র, ঝাউবন। নানান মাধ্যমে কাজ করে সে, ডিজিটাল প্রিন্ট, তেল রং, স্কেচ, কত কি! হঠাৎ হঠাৎ পাগলের মত দৌড়ে আসে; বলে চল, চলনা যাই! বাইরে যাই.. আমরা হুড ফেলে রিকশায় চড়ে বসি। ঘন্টার পর ঘন্টা রিকশা চলতে থাকে, চলতে চলতে বুড়িগঙ্গার ধারে গিয়ে থামে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এটা কি তার জৈবিক প্রয়োজন? ক্ষুধা নিবৃত্তি? জীবন বাঁচানোর খেলা? নাকি নৈর্ব্যত্তিক চিনতার খোড়াক? আমাদের যাবতীয় বিনিময় কি পরাবাসতববাদী একটি পেইন্টিং? আমি জানিনা।
আমি যদি বলি, ‘তোমাকে সুন্দর লাগছে; সে বলবে, ‘লাগতেই হবে; আমিতো সুন্দর, আমি যদি বলি, ‘তুমি কালো, তুমি খাটো; তুমি অর্পূব সুন্দরী নও, ভেবোনা তুমি জীবনানন্দের বনলতা সেন!!! সে বলবে, আমি জানি ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো‘। ‘তুমি আমার ছবি ভালোবাসো’। তুমি আমার অভিনয় ভালোবাসো। আমারতো নাক, কান, গলার ডাক্তার প্রয়োজন নেই, যে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষনা করে বলবে, আমার ‘সাইনাস’ নাকি এলাজীর্র সমস্যা আছে? আমি, ‘ডোপেক’, ‘সিনারন’, নাকি ‘ডেনজিট’ খাবো! তারপর তিনমাস পর আমার রূপ সৌন্দর্য ফিরে পাবো?
এই আমার মেঘবালিকা। এই আমার বন্ধু।
আমার মেঘবালিকার পুরুষ বন্ধু‘র অগুনতি কাহিনী রয়েছে। সমপ্রতি এক জনের সাথে তার বাসষ্ট্যান্ডে পরিচয়। সামান্য কথাবার্তা, টেলিফোন নাম্বার বিনিময়, তার ২/১ দিন পরই ‘মেঘবালিকার মহা প্রেম, হাবুডুবু। আমি যতই বোঝাই ততই সে অনঢ়। ছেলেটি প্রেম নিবেদনের আগ পর্যন্ত বিষয়টি গ্রহণযোগ্য ছিল, ব্যাঘাতটা ঘটলো তারপরই। ছেলেটা ভাব গতি বুঝে যখনই তাকে প্রপোজ করল, ওমনি সে খ্যাত, গাইয়া এবং ছাগল গোতের অতি সামান্য একজন পুরুষ হয়ে উঠল। দ্বিতীয় পুরুষটিও প্রাথমিক দর্শনে সুপুরষ। কিন্তু দীর্ঘ দর্শনে ‘সংস্কৃতিহীন’, ‘অ-সভ্য’। কাজেই চুড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই। ৩য় পুরুষটি মেধাবী, সংস্কৃতিমনা; মেঘবালিকার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ও যত্নবান, কিন্ত তার বয়সটা উদ্ধেগজনকভাবে বেশী। সামাজিক পরিচয়ে পরিচিত করা তাকে কঠিন। চতুর্থ পুরুষটির বিশেষণ, বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা, কারণ সে অসম-ধর্মী। ৫ম পুরুষটি-কে হয়েছেন বা হবেন; তা আমি জানিনা। তবে নিঃসন্দেহে বাতিলকৃত ০৪ জনের মততো নয়ই। মেঘবালিকা বন্ধু তুমি কি রাগ করবে? যদি আমি ৫ম পুরুষের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাই? জানি তোমার অভিমান হবে। তাই বললাম না। আমাকে পৃথিবীর সব অন্তরঙ্গ গোপন কথা বলা যায়, আর আমি তার এইটুকুন ‘গোপন‘ রাখবো না!!! তাই মেঘবালিকার বাকি কথা গোপন রাখলাম। শুধু এইটুকুন বলি, মেঘবালিকা ৫ম পুরুষটিকে হঠাৎ একদিন হুট করে বিয়ে করে ফেললো। এই রহস্য কেউ জানলোনা, এই রহস্য কেউ বুঝলোনা।
ক্যানভাসে ছাইরঙ্গে ধূসর আকাশ আঁকা একটা সবুজ তামাটে দীঘল আলোর জানালা যদি বেয়ে এসে কাপড়ে পড়ে, আকাশটা ক্রমশ প্রসারিত হয়। হঠাৎ আকাশের এককোনায় জমে থাকা কালো মেঘ ক্যানভাস চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমসত আকশে। ঐ কালো রং আকাশ নগ্নতা ঢেকে দিতে চেয়েছিল! হে ঈশ্বরী নারী ! হে মানবী ! আকাশে যেওনা, যেওনা তুমি, পাতালে ফিরে আসো মেঘবালিকা!!! ফিরে আসো পাতালে।
ঢাকা শহরটা ক্রমশ গোলকধাঁধা হয়ে উঠছে। ডানের রাস্তা, বায়ে, বাঁয়ের রাস্তা ডানে, এই রকম ভুল হচ্ছে। রাত বাড়লেই কুকুরের চিৎকার, একগুয়ে ল্যাম্পপোস্ট..;;;;;ইত্যাদি ইত্যাদি শহর ছেড়ে দূরে যাই। মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই। মেঘনা নদীর জল বয়ে আনি মেঘবালিকার জন্য। তার চোখে আমি জল দেখেছিলাম, আর ভেবেছিলাম, কোন এক পূর্ণিমার রাতে আলো দিয়ে চোখের জল শুকিয়ে দেবো।
মরতে মরতে ওর মধ্যে আমি বেচেঁ থাকবো। বেঁচে যাওয়া আর বোধ হয় হলোনা আমার। স্বপ্নের শরীর খসে পড়লে মানুষ বড় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সময়কে তখন অদৃশ্য মনে হয়, যতই কাজ-কাজ-কাজের ভেতরে ডুবি, স্বপ্নকে ভূলে থাকবো বলে, ততই অসহায় নিঃস্বরন চলে। মনে পড়ে, কেন মেঘবালিকা মৃত্যুমুখী হোল, কেন সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেল? কিসের অহংকারে, কোন অভিমানে।
একটা অপরিচিত দ্বীপে একবার আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম; মনে পড়ে মেঘবালিকা তোমার? কিছুতেই খূঁজে পাচিছলামনা নিজেকে, কোথায় আমি, কেনই বা????? হঠাৎ একদিন মনে হলো, বেঁচে থাকা নির্মম কোন অপরাধ নয়। বরং অবলম্বন। চুড়ান্ত প্রগতি ও সভ্যতার পেছনে ছোটা। আমি হাজার বছর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, তোমার মনে পড়ে? চুলে, চোখে. নখে, আবিষ্কারের যাবতীয় পরিণত শব্দাবলী তখন আমার হাতের মুঠোয়। চাইলেই লেখা যায় একটা সুদীর্ঘ উপন্যাস। কিন্তু উপন্যাসের শব্দাবলীর ক্ষরণ ধীরে ধীরে আমার বুকে, শ্বাস-প্রশ্বাসে ভার হয়ে নেমে এলো। আমি হৃদয়ে ক্যান্সার বহন করলাম। একটা যুদ্ধ চলছে, আর সেটা হলো, মরা না মরার যুদ্ধ। বন্ধুর সঙ্গে যেমন শক্র শব্দটি ভয়ংকর, তেমনি ‘মৃত্যু’ ও ‘মৃত্যুহীন’। এই যুদ্ধটা কি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ? অথবা কোন ব্যাভিচার মিলন দৃশ্য?
৪
চার পরিনত বন্ধু,
‘রোদ’, চেতন’, ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘আামি রাত্রি’, এই চারজন আমরা ‘পরিণত বন্ধু’। ‘পরিণত‘ শব্দটি ব্যবহার করছি, কেবলমাত্র 'প্রাপ্ত বয়স্ক’ ভেবে নয়, একই সংগে কতটা ‘অপ্রাপ্ত’ সেইটিও ব্যাখ্যা করার জন্য। প্রাপ্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তি কি করে কুঁড়ে খায় তাই নিয়েই আমার এই বান্ধব কাহিনী।
রোদ...
‘রোদ’ একজন নারী লেখক। ভীষণ ঝলমলে, ছটফটে। সারাক্ষণ কথা বলে, শোনাতেও চায়। কেউ তাকে ভালোবাসলো কি বাসলো না কি যায় আসে? রোদ ভালোবাসে সবাইকে। আজিজ সুপার মার্কেটে তার ভারী নাম ডাক। আমি যখন ওর পাশে হাটি, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়; মনে হয়, পৃথিবীতে এমন একটি কাজ এখনও করতে পারিনি, যার জন্যে লোকে আমায় চিনবে! সস্নেহে ভারী চোখে তাকাবে; আমি ভেতরে পুলকিত বোধ কোরব, গর্ব হবে আমার। আজিজ মার্কেটের এক তলা, দোতলার প্রতিটি দোকানের সামনে আমি দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকবো। অনেক নামী-দামী লেখক বন্ধু হবে আমার। ‘রোদ’ কে দেখে আমার এরকম অনুভূতি হয়। ওর কবিতা, প্রেমের উপন্যাস, প্রবন্ধ, শব্দকোষ সবধরনের লেখায় দক্ষতা আছে। একজন মানুষ একসঙ্গে এত দক্ষ কেমন করে হয় ? আমি অবাক হই। অবাকেরা আমার কপাল বেয়ে মাটিতে নামে। টিকটিকির মত নিঃশব্দে হাটে। তারপর কোথায় যায় কে জানে?
বছর কয়েক আগে রোদের একটা পৌরানিক কল্পকাহিনী বেড়িয়েছে। কোন এক ভীনদেশী রাজকুমারীর গল্প। বইটার শুরুতে তসলিমা নাসরীনের ‘মামদো ভূতের‘ ছবি। অর্থাৎ আহমদ ছফার ছবি। লেখক সম্পর্কে উনি দীর্ঘ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সুন্দর সুন্দর কথা। কি করে র্সূযাস্তে ও ভোরে ‘রোদের জন্ম হোল, কি করে প্রবল রোদ ওকে আরো গাঢ় রং দিল, এসব কথা। আমি ভাবলাম; নিশ্চয় একদিন এরকম একটি বই ছাপা হবে আমার। আমার জন্যে লিখবেন এমন কি কেউ আছেন? আছেন কি? আমি জানিনা। আমি সাহস করে একটি দুটি ‘কবিতা’ লিখতে শুরু করলাম। এখন আমি. কবিতা লিখছি আর ভাবছি-দিগন্ত শেষে এক মহাসূর্য্যের প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি আমি। ঢং ঢং ঢং, ঘন্টা বেজে যাচ্ছে, প্রহর পেরিয়ে যাচ্ছে, কোথায় আমি ? আমার কবিতাগুলো আদৌ কবিতা হচ্ছে কি?
খুব সাহস করে রোদ কে আমি আমার কয়েকটা কবিতা মেইল করে পাঠালাম। তারপর অপেক্ষা করলাম, ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, এ যেন আমার গ্রামের বাড়ীর পুকুর ধারের শৈশব কালের মরিচ গাছ গোনা; এক, দুই, তিন, চার, একশ, একশ এক, তারপর ক্লান্তি, মরিচ গাছ গোনা আর শেষ হয়না, কিন্তু অপেক্ষার উত্তর আসে; 'রোদ, এস.এম.এস’ করে আমার মোবাইলে, ’খুব ভাল হচ্ছে, আই, এম, প্রাউড অফ ইয়ু”। আমার মনে হয় কবিতা ভাল হলো কি হলোনা, তার চেয়ে বেশী-আমি পুলকিত, শিহরিত, লেখক-কবি বন্ধুর প্রশংসা শুনে। সারাটা বিকেল আমার আনন্দে কাটে। পৃথিবীর তাবৎ জীব-জন্তু, পশু-পাখী আমার সুন্দর মনে হয়। আমি শাহবাগে যাই, আজিজ মার্কেটের সবগুলো দোকান ঘুড়ি, ক্যাসেট কিনি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাই, বন্ধুদের সিগরেট কিনে দিই। চেতন আমায় সাজেশন দেয় 'কবিসভা’ বলে একটা ইয়াহু গ্রপস আছে, ওখানে 'কবিতা’ পোষ্ট করলে নাকি ভাল মতামত পাওয়া যায়। আমি সাইবার ক্যাফেতে ঢুকি। কবিসভার রাইসুকে আমার কবিতা পাঠাই। একদিন, দুদিন এভাবে চলতে থাকে আবার অপেক্ষা। কবিসভার সদস্যরা বিশ্রীভাবে আমায় গালিগালাজ দিয়ে মেইল করতে থাকে। 'আমার কবিতা’ কোন কবিতাই হয়নি, শব্দ ব্যবহারে যৌনতার গন্ধ, ছন্দ, বাক্য, সবকিছুতেই ঝামেলা । নিজেকে আমার মহা বোকা মনে হয়, মহা 'গরু’ মহা 'ছাগল’ মনে হয়। ঝাঁ ঝাঁ রোদ রশ্মি আমার মাথা থেকে পায়ে নেমে আসে। আমি আমার ঢাকা শহরের দালান বাড়িতে ফিরে যাবার কথা ভুলে যাই; হাটতে থাকি গ্রামদেশ বরাবর, মাইলকে মাইল হাটতে থাকি, খুঁজে বেড়াই ধানক্ষেত, কাঁদার মাঠ, কচি পাটগাছ, বাঁশের সেতু, কালীগঞ্জ বাজার, ভেঙে পড়া মন্দির, ভুলে যাই, কবি বন্ধু, কবিসভা, আজিজ মার্কেট আর 'অন্তরা’র লুচি-সবজি।
চেতন হংসরাজ..
‘চেতন’ নামে নাকি হিন্দি সিরিয়ালের একজন নায়ক আছে। সেই নায়ক দেখতে অসাধারন সুন্দর। আমাদের চেতনও নিজেকে পৃথিবীর একজন অসম্ভব সুন্দর পুরূষ বলেই দাবী করে। সকাল বেলায় সে খুবই উত্তেজিত হয়ে আমায় এসে বলল, দেখ ব্রিটেনের যুবরাজ চার্লস তিন দশক ধরে প্রেম করে প্রেমিকা ক্যামিলাকে বিয়ে করেছে। খুব ইন্টারেষ্টিং না? পেইনফুলও বটে, তাইনা! এতদিন র্ধৈয্য ধরল!!! আহারে!!! আমি বললাম, যুবরাজদের আবার বিয়ে করা আর না করা! সুখী মানুষদের আবারও সুখ? দাড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়না! চেতন প্রবল আপত্তি জানালো; সুখের আবার শেষ কিরে? ওর নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুখ, হাটতে হাটতে সুখ, বাসে চড়ে সুখ, চুমু খেয়ে সুখ.. সবকিছুতেই সুখ সুখ লাগে? ‘অ-সুখ’ বলে ওর জীবনে কিছু নেই। আমার ‘কবিতা‘ নাকি কিসব ‘অখাদ্য-কুখাদ্য‘ হচ্ছে এবং এইযে ভালো হচ্ছেনা এইটি নিয়েও তার সুখ। আমি খুবই মর্মাহত, পীড়িত, আমার বন্ধুর এহেন আচরনে, চিন্তায়। পৃথিবীর সব পুরুষ কি এইরকম? না, না. এইরকম না। খোকনদা ওইরকম ছিলনা। খোকনদা যখন ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি লিখতো, আমার সমস্ত প্রাণ জুড়িয়ে যেত; আমার প্রতিটি দিন ডাকপিয়নের প্রতীক্ষায় কাটতো। আমি তিনটি শালিক খূঁজে খূঁজে বের করতাম আর বলতাম; ‘থ্রি ফর লেটারস,’ ---‘ থ্রি ফর লেটারস’----
চেতনের সাথে দেখা নাই কয়েকদিন। ওর সংঙ্গে দেখা না হলে, বিষন্নতা বাড়তে থাকে। নিজেকে দূদর্শাগ্রস্ত মনে হয়, পরিত্যাক্ত হবার ‘সম্ভাবনায়‘ ভুগি। দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে রাখি নিজেকে, ভয় হয়, ভয় হয়, আবারও ভয় হয়। দুদিন পরপর চেতন এরকম হারিয়ে যায়। আমার ভয় ওকে ছুঁয়ে যায়না; ও দিব্যি হাসতে হাসতে বলে, ‘শোন, এবার না সীতাকুন্ডে জাহাজ কাটা দেখতে গিয়েছিলাম। অথবা শেরপুরের হাতির পাল কবে ওকে তাড়া করেছিল, সেই গল্প। কোন না কোন পৃথিবীর সরল ছবি ওর আঁকা চাই । বাহ্যত মনে হতে পারে সব সত্য। আসলে পুরোটাই হতে পারে মিথ্যা। এই যেমন গত সপ্তাহে চার্লস-ক্যামিলার বিয়ে নিয়ে সে উত্তেজিত। আমায় এসে বললো, ‘রাত্রি, চলনা আমরা বিয়ে করি। আমি তোকে ভালোবাসি, বিশ্বাস কর, ভীষণ ভালোবাসি।’ আমি বললাম, ভালোবাসিস, ভালো কথা, তো বিয়ে করতে হবে কেন?’ ও বললো, প্রেম এখন ওর তীব্র স্বাদ হয়ে উঠেছে। আপেলের মত কচকচ করে সে প্রেম খাবে। আমি অবাক হই, ছি: একি কথা!! এরকম একটা রোমান্টিক বিষয় নিয়ে ’ফান’? তখন ও খুব সিরিয়াস হয়ে আমার হাত ধরে বললো, ‘রাত্রি, আমি এত সভ্য, ভব্য নই। তোর মত রবি ঠাকুরের আবেশ ধরানো গান আমি গাইতে পারিনা। আমি বরং ওই গানটা গাইতে পারি----আমিতো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।.. .. .. .. গানটার মানে কিরে? দ্যাখ, আমার শরীরটা কেমন গাছ হয়ে উঠবে, আর আমি তা দিনের পর দিন মেনে নেবো? চল আমরা সংসারের সবুজ গেলাসে সুরা পান করি।’
আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে। কোন দস্যূ এসে চেটেপুটে লুট করে নিলেও আমি তখন টের পাবোনা। মগ্নতা এমনই শরীরে বয়ে যায় আমার। ভেঙে পড়ে কোমল মাটির শরীর। আমি ভাবতে পারিনা, একি ভোগ ভাঙার চাওয়া? নাকি প্রেম? প্রেম কি ভোগ মানে? আনন্দও তো প্রেমে পড়েছিল হেরম্বের ’দিবারাত্রির কাব্যে’। সেই প্রেম তার শরীরের সন্চয় ছিল, তার নৃত্যভঙি, তাল, তেহাইয়ে ফেটে পড়েছিল সেই সন্চয়। আমার ভেতরেও কেমন কল্পনার ফানুস বাসা বাঁধছে। আমার চেতনকে নিয়ে আগুনে ছাপ দিতে ইচ্ছে করছে। আগুনের উত্তাপ পোড়াচ্ছে আমায়। ‘হে সূর্য, আলোর নাট্যে একাঙ্কিকা যদিবা মহৎ, তবুও তোমার দৃশ্যে মেঘের বাসর রচে দিও।’ হাসানের মত আমিও কি র্সূযকে বলবো, ‘মেঘের বাসর রচে দিও’,.. .. .. ‘মেঘের বাসর রচে দিও’।
সন্ধ্যা
সন্ধ্যাকে গোধূলির মত নরম, কোমল, বেহাগ ভাবতে পারিনা। গাইতে পারিনা ‘যখন আমার গান ফুরাবে তখন এসো ফিরে, ভাঙবে সভা বসবো একা রেবা নদীর তীরে’। যদিও গড়নে কোমল, পড়নে নমনীয় সবুজ, অথচ তূখোর বুদ্ধিমতী, যুক্তিবাদী, নিরাশের আশ্রয়। মনে হয় পৃথিবীর সবটাই ও জানে। একা নারীর যুদ্ধ পলে পলে ওর কথায়, চিন্তায় বাসা বেঁধেছে। এর বাইরে নিজেকে ভাবতে পারেনা সে। এক ক্ষিপ্র, যন্ত্রণাহত রহস্যজাল তার জীবনে আঘাত হানছে। ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ ও ‘স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তি-তর্ক ও কলাকৌশলে নিজেকে অংকের কঠিন সূত্রাবলীতে বেঁধে ফেলেছে সে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয়, কি চাই তার ? নিশ্চিত নিরাপদ জীবন? নাকিসে প্রশ্নহীন সমাধানের দিকে ফিরেও তাকায়না; কেবলি চলা, চলা আর চলা।
সন্ধ্যা সেই নারী, বাড়ী ভাড়া নিতে গেলে যার পদে পদে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়; ‘স্বামী নাই’ তাহলে ‘বাবা-মা’, অথবা নিদেনপক্ষে ছোট ভাই বা বোন নিশ্চয়ই থাকবে। ‘অবিবাহিত’ এবং ‘একা’ এইটি বাড়ীওয়ালারা মেনে নেয়না, যেন ছোটভাই ওর রক্ষাকর্তা! বহুকষ্টে নবোদয় হাউজিং সোসাইটিতে সাততলার মাচায় একখানা ঘর পাওয়া গেল, তাইতেই তার বাস। সাততলার বহুজাতীয় সম্ভাবনা ও বিড়ম্বনা একইসঙ্গে উপভোগ এবং অস্বসি' দুটোকেই মেনে নিতে হয়। প্রতিদিন একবিরাট আকাশ; কাক সাম্রাজ্য, আর মহাসূর্য্য ওর পৃথিবী ঘিড়ে রাখে। পচাঁত্তর ধাপের সিড়ি বেয়ে ওঠা ও নামা। মাঝে মাঝে থামা। প্রতিদিন একটি করে কবিতা রচনা করা যায়, কখনও বিশাল ---- কখনও জটিল। একবার কবিতার সংগে ব্যান্ড পার্টির ---- একক এ্যালবাম রচনা করল সে। সারারাত ধরে ব্যান্ড পার্টি বাজনা বাজাল আর সন্ধ্যা তার অসুস' ভাইয়ের পরিনতির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল। নিজস্ব সুখ, স্বাচ্ছন্দে, ডুবে গেল সে। দৈহিক সম্পর্কে নীতি মানা না মানা, এইসব তাকে আর দ্বিধায় ফেললোনা। সন্ধ্যা ডুবে গেল, ডুবে গেল।
সন্ধ্যাকে আমার ‘বৃক্ষ’ মনে হয়। বিশাল বৃক্ষ। যার ছায়ায় একটা সকাল, একটা দুপুর, একটা গোধূলি পার করে আমি পানপাতার মত, লাউডগার মত নম্রতায়িত হই। কখনও কখনও ‘উষ্নতা‘ ধার করে, শরীরে বিলাই, হাপুস-হুপুস করে খাই। ভয় কাটাবার এ এক মজার খেলা। ধার যখন বেশী চাই, তখন বৃক্ষটা ঢলে পড়ে, মর্মাহত হয়, বৃক্ষটা যেন ‘কচ্ছপ’ হয়ে মাটিতে ঢুকে পড়ে। একদিন, দুদিন, তিনদিন.. অনেকদিন ওর কোন খোঁজ থাকেনা। আমি যদি কোন গভীর অরন্য হতে পারতাম? তাহলে বৃক্ষটি নিশ্চয়ই আমায় ছেড়ে যেতে পারতোনা। আমি যদি কোন গভীর সমুদ্র হতে পারতাম ! তাহলে কচ্ছপটি নিশ্চয়ই সাগরে ভেসে উঠত! কিন্তু আমি গভীর অরন্য বা গভীর সমুদ্র কোনটাই হতে পারলাম না। সর্ষে ক্ষেতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকলাম দীর্ঘকাল। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলোনা, ভেতরে গভীর বাজন বাজতে থাকল; ‘সন্ধ্যা মালতী যবে, ফুলবনে ঝুড়ে, কে আসি বাজাবে বাঁশীঁ, ভৈরবী সুরে।’
সন্ধ্যা, আমি আমার অনুভূতির জায়গায় প্রবল সৎ হতে চাই। আমি বলতে চাই, যে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও আস্থার ছায়া আমার গায়ে মেখেছি, তার কোনটা মিথ্যে ভান নয়। তুমি আমায় বিশ্বাস কর, তুমি আমায় চকের গুড়োর মত ধূলোয় মিশে যেতে দিওনা।সন্ধ্যা আমায় বিশ্বাস করে কিনা জানিনা, তবে ভালোবাসা দেয়। অনেক জখম আর পঁচে যাওয়া ক্ষতে, আর্য়ূবেদ লাগায়। আমি পুটিমাছ ভাজা আর ঘি দিয়ে, দু’বেলা পেট ভরে ভাত খাই। এ আমার শখের খাওয়া। গ্রামদেশে গেলে বুবু আমায় পেট ভরে খেতে দিতেন। পাখীরা, মাছেরা চোখ ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করত। দাদা তার শীতল পাটি বারান্দায় বিছিয়ে মাটিতে শুয়ে থাকতেন। আর বুবু তালপাখায় বাতাস নাড়তেন। পাশের ঘরের সফু কাকা প্রায় সময়ই দাদা আর বুবুর অন্তরঙ্গ সময়ে গান শোনাতেন; তার একটা হোল; ‘কইনসান দেহি, কইনসান দেহি আমার প্যাটের খাওন কি? আল্লাহতালায় দিসে খাওন, গরম ভাত আর পুটি-ঘি’। আমার প্রিয় খাওয়া নিয়ে এসব রসিকতা রৌদ্রজয়ী হয়ে উঠেছে আজ। সন্ধ্যা একে বলে, 'স্মৃতির অপরন্তহীন ঢেউ’, আর আমি বলি 'ঘুমহারা ঘরছাড়া বিষাদ’। ডুবিয়ে মারে, আবার উঠায়, আবার উঠায়, কি মানে? কি মানে জীবনের? সন্ধ্যা বলে, 'পথ যতদূর যায় তারচে ঢের দূর আমাদের জীবনের মানে’। আমি এই মানে বুঝিনা। সন্ধ্যা কি সব বুঝে? সব জানে? সন্ধ্যা কি ক্রমশ ঈশ্বর হয়ে উঠছে?
৫
পরিশেষ ও প্রিয় কবি
নামটা এমন হলে ভাল হোত জয়গো-স্বামী। দুহাত জড়ো করে প্রনাম করতাম। কিন্তু নামটা ‘জয় গোস্বামী ! প্রণাম করিনা, মাথার নিচে তার বইগুলো নিয়ে ঘুমাই। মনে হয় মাথার উপর স্বপ্নেরা খাড়া ঝুলতে থাকে। ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’, ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল,’ হাতড়ে বেড়াই। প্রতিরাতে বালিশের পাশে বেডসাইড টেবিলে তাকিয়ে দেখি থরে থরে সাজানো কবিতারাশি। ‘পাঁচিলে দাঁড়িয়েছি, বৃষ্টি এসে কথা বলতে চায়। কথা বলেওছিলাম, প্রেরণাদোলায়। অথবা গুনগুন করি, ‘সকলেই টুপি, লম্বাপানা, সকলেই বলো ভালোবাসি। সকলেই যদি কবিকে বলে ‘ভালোবাসি‘, কবি কি তা মেনে নেবে? লম্বা চুল, লম্বা দাঁড়ি, ঘন মোছ, তীক্ষ চেহারা; এই কবিকে আমি ভালোবাসি। কবি কি তা মেনে নেবেন? হয়ত তিনি মানা-না মানা নিয়ে আরেকটি কবিতা লিখবেন; কিন্তু সত্যিই কি তিনি মেনে নেবেন? হয়ত প্রশ্ন করবেন, কি ভালোবাসি, কবিতা? কবিতার অনুভূতি? স্টাইল? মানুষ কবিকেতো চিনিনা, ভালোবাসিনা। আর সব মানুষকে কি চিনি? বন্ধুদের কি চিনি? গভীর বোধে আচছন্ন হয়ে আছি। সারা শরীরে অযত্ন, কাটাছেরা, বাধনহীন, নির্মম। একটা গুরুত্বহীন পাখী, একটা গুরুত্বহীন কবিতার মত একটা গুরুত্বহীন মানুষ। ঘুমিয়ে থাকে, আড়ালে..নি:শব্দে, আর ভাবে, প্রিয় কবি, অসহায় কবিতা আর নিষ্ঠুর পাঠক। সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, বিষন্নতারা চোখ, মুখ, উজাড় করে খায়। কেবল কয়েকটি কবিতাই অসহায়ত্বের সঙ্গী, নিরব সংসার। একথা বান্ধবেরা কি জানে? জানে না। চেতন একটা অলৌকিক স্বপ্নের কথা বলে; 'মাটির তলে বাড়ী- তার উপরে গাড়ী, তার উপরে বাঁশ-সেই বাঁশেরই অন্ধকারে আমার লম্বা লাশ, লাশের গায়ে চুন-কেউ দেখেনি, শোকের মুখে শোক পোহাতে আমার হোল খুন।’ এই অলৌকিক স্বপ্নটা রূপকথার মত চোখে ভাসে, ভাসে আর ভাসে। মনে হয় শুয়ে পড়ি কোন মাটির তলে, ধানিজমির নিচে শুয়ে পড়ি, বাবাকে ডাকি, দাদুকে ডাকি, বুবুকে ডাকি, বলি; ’বান্ধবেরা আমায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিল বাবা; বান্ধবেরা আমায় রোদ্দুরে ছায়া দিয়েছিল; তবুও দেখো, আমার হাতের শাঁখা কেমন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, চাঁদ ফসকে ডুবে গেল কুয়োয়। তাই এখন কেবলই অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকার অমাবস্যা; আয়নায় দেখি পশুর মত মুখ আমার, অতৃপ্ত বান্ধবে। প্রিয় কবি, লিখেছেন,
‘আজ নয় অন্ধকার, আজ নয় দূরত্ব পাথর
আজ নয় দ্বগ্ধ লেখা, নয় মাথা ঠোকার দেওয়াল
নয় পাপ, স্বীকারোক্তি, কান্না অনুশোচনার ঘর. .
আজ শুধু খোলা চাঁদ, আজ শুধু তারা চোখে পড়া
একা উদযাপন আজ,
একাকী দ্বিশত পূর্ণ করা ।’
আমি তাই পূর্ণ দিগন্তে লাবণ্য ধার চাইলাম; হে বন্ধুরা, আমায় লাবণ্য দাও, আমায় লাবণ্য দাও, কেবলি লাবণ্য দাও।
১.
আমাদের বাড়িটা তোমাকে,
সেই বাড়িটা কেমন যেন ঘোলাটে ঘোলাটে ছিল। ইস্কুল ঘরের মত লম্বা এক ফালি বারান্দা। মাটির মেঝে, চারটে চৌকাঠ, একটা ভাংগা বেন্চ, একটা শীতল পাটি, দাদার তালপাখা আর লাঠি, এই মিলিয়ে বারান্দা। মূল ঘরটি ছিল অনেকটা পৌরানিক বিলম্বিত লয়ের মত। তাকে যেভাবে খুশী ভাবা যায়, সেভাবেই সাজানো। তার মানে, দুটো রহস্যময় উঁচু উঁচু খাট, দুটো গম্ভীর ভারী কেদারা, দুটো লিকলিকে পাটের শিকে, যার ভেতরে পেট মোটা তিন তিনটে করে মাটির হাড়ি, মাটির সমতল মেঝে, আর রহস্যময় দুটো শরীর। আমার দাদা আর বুবু। কেন রহস্যময় বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। দাদা আর বুবু যখন খড়ম পায়ে দিয়ে হাটতেন তখন একজনের খড়মে খুব জোরে খট খট শব্দ হোত, অন্য জনের হোতনা, আবার খালি পায়ে হাটলেও বোঝা যেত, কে হাটছে, দাদা, না বুবু!!!! একজন মহা শব্দ পছন্দ করতেন, অন্যজন চুপচাপ।উঠোনের বাম পাশে পর পর রান্নাঘর আর কাচারী ঘর। রান্না ঘরে বুবু রান্না করতেন। কাচারী ঘরে পাখিরা প্রেম করত। পাখিরা টের পেত, এ এক মহা নিরাপদ জায়গা। গান বাজনা, ধর্ম-কর্ম কোন কিছুতেই কোন বাঁধা নেই। সারাদিন সারারাত ধরে চলত উৎসবের পর উৎসব। বৈশাখী মেলায় উৎসবের ঘ্রাণটা বেশী হোত, আমের মুকুলের ছড়াছড়ি ছিল যে!।
উঠোনের পরই পুকুর। সেই পুকুরেও রোজ ঘরোয়া উৎসব চলতো। পাখিদের উচচাঙ্গ, মাছেদের রবীন্দ্রসংগীত, বেল গাছ আর বড়ই গাছদের ভাটিয়ালি। দাদা আর বুবু পুকুর পাড়ে বসে এইসব জলখেলায় অংশ নিতেন। হাডুডু, ডাংগুলি..কত কি!!!। পৃথিবীর জাগতিক সারল্যে সময় কেটে যেত তাদের। কখনও মনে করতেন না, এক কন্যা-এক পুত্র সন্তানদ্বয় ক্রমশ শোক থেকে অশোক হয়ে উঠছে। একি প্রাপ্তি না অপ্রাপ্তি?
২
বাবা,
আমাদের সেই ঘোলাটে বাড়িটা আর নেই। রান্না ঘর, কাচারী ঘর, কিচছু নেই। পুকুরটা মজে গেছে অনেকদিন। চাপকলে চাপ দিলে পানি নেই। দাদা, বুবু, তুমি, কেউ নেই। তুমি যখন বেঁচে ছিলে, তখন দুনিয়ার সকল মানুষকে যেমনটি দেখতে চাইতাম, দেখতে পেতাম। এখন কি ঘুমহীন হয়ে উঠছি? সারারাত সিড়িঘরে, দরজার ওপারে, পায়ের শব্দ, ফিসফিস আওয়াজ। বিছানা ছেড়ে উঠবো কি? ভয়; চোখে, মুখে,নাকে... ভয়, আলাদা হয়ে যাবার ভয়, বন্ধুহীন হবার ভয়, একাকীত্বের যনত্রনার ভয়। নিজেকে নিয়ে ভীষণ ভয় আমার। কোথাও কিছু ঘটে যাচেছ নিশ্চয়ই!!! ভ্রমরেরা জাল বুনতে শুরূ করেছে। নইলে এমন বিষন্নতা গ্রাস কোরত না। সত্যরা আটকে পড়েছে দেয়ালে, খূঁজে পাচেছনা সঠিক পথ। আবার চারপাশ ঘুড়ে টুড়ে বলছে, দরজাটা কোথায়? এপারে আমি দাঁড়িয়ে থাকি র্দীঘকাল-ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, অপেক্ষায় অপেক্ষায় আমার শরীরের ঘাম বেয়ে পড়ে। অনর্তগত নিয়মগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়, আমি গ্রামদেশে চলে যাই, সেই পুকুরপাড়, কলাপাতার নাক বরাবর মাটির পথ ধরে হেটে চলে যাই, যেখানে এখনও ‘সীমাবদ্ধ মানুষ’ ও ‘পোকামাকড়’ পথ খোঁজে। পুকুর বা নদীরা মজে গেলেও মনে পড়ে তাদেরই। দাদা, বুবুসহ মনে পড়ে তোমাকেই।
তুমি চলে যাবার পর একটা মৃত্যু উৎসব হোল। মানুষ মারা গেলেও রঙীন কাপড় টানিয়ে, গরু জবাই দিয়ে গ্রামবাসীদের খাওয়ানো হোল। শ্রাদ্ধ কুলখানি যাই বলি, তোমার বেলায়ও তাই হলো। তিন তিনটে কবর। দাদা, বুবু, আর তুমি- আর একফালি উঠোন, সেইটুকু জায়গা-তে সামিয়ানা টানানো। গ্রাম বাসীরা আর এখন মাটিতে বসে খেতে চায় না। শহরে সভ্যতা তাদের চোখে মুখে শরীরে লেগে গেছে। চেয়ার টেবিলে বসে মহা উৎসবে খাওয়া-দাওয়া হলো। এই দৃশ্য পাখীরা, যারা কাচারী ঘর খসে পড়ার পর বড় আম গাছটিতে বংশ বিস্তার করেছিল, তারা দেখেছে। এই দৃশ্য মজা পুকুর দেখেছে, যার ঘোলাটে পানির বুদবুদ শবদ প্রতিদিন তোমাদের কানে পৌছোয়। এই দৃশ্য, সারি সারি সুপারি গাছ দেখেছে, যারা কবরগুলোকে ঘিরে ওপেনটু বায়োস্কপ খেলছে। এই দৃশ্য তোমরাও কি দেখেছ বাবা?
বাবা, তোমাকে ঠিকঠিক কথাগুলো বলা যাচেছনা। অথবা বলেই ভাবছি, ভাবনাটা এরকম ছিলনা। যতই যুক্তি-তর্ক, নিয়নত্রন, কাঠামো, এইসব ভাবছি, ভেতরে ভেতরে ততটাই অপদার্থ, অর্থহীন আবিষ্কারকেরা ঘরবাড়ী, দরজা-জানালা তৈরী করছে। আকাশ বরাবর খোলা জানালায় আলোর প্রলোভনে প্রলোভিত হতে চাই আমি। অথচ মৃত্যু আমাকে ডাকছে। বলছে, আয়, আয়, কাছে আয়..এই অসীম আকাশের মেঘেরা ভেসে ভেসে গিয়ে যদি বলে তোমায় আমার অপেক্ষার কথা ! ভালোবাসা কত বিচিত্র দেখ! তুমি যখন ছিলে, কাছে ছিলে, আমি বড় ‘দৈনন্দিন‘ ভাবেই ভেবেছি তোমায়। ইংরেজীর দূর্বলতা কাটানো, পড়াশোনার যত সংশোধন, ভাত খাওয়া, টেলিভিশন দেখা, বেলের সরবত, ডিকশনারী ‘মুখস্তকরন‘ অনুবাদ, বইমেলার প্রাপ্য ১২০০ টাকা, এই দৈনন্দিনতা এখন বড়ই মধুর ও বিশেষ হয়ে উঠছে। তুমি এখন কতটা ‘বিশেষ’ এবং মুক্তির জায়গায় আছো, চারপাশের অস্থিরতা দেখলে তা টের পাই।
বাবা, এই নির্লিপ্ত সভ্য শহরে একটা ডুব সাতার কতটা যে জরুরী, তা আমরা কেউ বুঝিনা। সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম এই চলায় সকলেই সুখী। আমি কি সুখী বাবা? আমি কি সুখী? তুমি কি জানো বাবা? একটা আশ্চর্য, বাধঁন কোনদিন কখনও আমায় নম্রতায়িত করে ফেলবে সে আমি ভাবিনি। আমরা ভাই-বোনেরা যেমন তোমার, তেমনি, আমার সনতান আমার। আমি যত দূরেই যাই, সমুদ্র বা বিশাল আকাশ, ততই যেন ফিরে ফিরে আসি, কোথায় এই দায়ভার কে জানে? এসব কথা বলছি বলে কি ভাবছো, আমি ‘সভ্য‘ হয়ে গেছি, মৃত্যুমূখী ভাবনা‘র ভূত আমার ঘাড় থেকে নেমে গেছে? না তা নয়, তা নয়।
৩
মেঘবালিকা বন্ধু আমার, এই আমার মেঘবালিকা,
মেঘবালিকা বলছি, আসলে সে বালিকা নয়, না বয়সে-না স্বভাবে। তার বিশেষনগুলো বলা যায়। গভীর কালো চোখ, আটপৌড়ে চেহারা, বড় একটা গোল টিপ, টুকটাক গয়না, আটপৌড়ে শাড়ী অথবা সেলওয়ার কামিজ। সে একজন পরিনত নারী। মেঘবালিকা বলছি, কেন? মেঘের সংগে তার চির ভাব। শৈশবে সে ঘাসফড়িং এর ডানায় ভর করে হেটে বেড়াত; একটুও মাটিতে পা পড়তনা তার। মফন্বলের মাটি, আধপাকা ঘর, প্রতিবেশী আর পলাতক মেঘ ভেতরে তার সঙ্গী হোল। তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবেই এটি সে জানতো। এক ধরনের অহংকার তার চুলে, ঠোটে, শরীরে শিহরন তৈরী কোরল। আমি তার নাম দিলাম মেঘবালিকা। আমি তার বন্ধু হতে চাইলাম। মেঘবালিকা নবীন ঘাসফুলের মতন তার ফুলদানিতে জায়গা করে নিল আমায়। মেঘবালিকা ছলনাময়ী। আমাকে প্রলোভিত করে নানাভাবে; শব্দ করে, রং করে.. ও ছবি এঁকে, ঘরবাড়ী-জানালা, সর্ষে ফুল, সমুদ্র, ঝাউবন। নানান মাধ্যমে কাজ করে সে, ডিজিটাল প্রিন্ট, তেল রং, স্কেচ, কত কি! হঠাৎ হঠাৎ পাগলের মত দৌড়ে আসে; বলে চল, চলনা যাই! বাইরে যাই.. আমরা হুড ফেলে রিকশায় চড়ে বসি। ঘন্টার পর ঘন্টা রিকশা চলতে থাকে, চলতে চলতে বুড়িগঙ্গার ধারে গিয়ে থামে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এটা কি তার জৈবিক প্রয়োজন? ক্ষুধা নিবৃত্তি? জীবন বাঁচানোর খেলা? নাকি নৈর্ব্যত্তিক চিনতার খোড়াক? আমাদের যাবতীয় বিনিময় কি পরাবাসতববাদী একটি পেইন্টিং? আমি জানিনা।
আমি যদি বলি, ‘তোমাকে সুন্দর লাগছে; সে বলবে, ‘লাগতেই হবে; আমিতো সুন্দর, আমি যদি বলি, ‘তুমি কালো, তুমি খাটো; তুমি অর্পূব সুন্দরী নও, ভেবোনা তুমি জীবনানন্দের বনলতা সেন!!! সে বলবে, আমি জানি ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো‘। ‘তুমি আমার ছবি ভালোবাসো’। তুমি আমার অভিনয় ভালোবাসো। আমারতো নাক, কান, গলার ডাক্তার প্রয়োজন নেই, যে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষনা করে বলবে, আমার ‘সাইনাস’ নাকি এলাজীর্র সমস্যা আছে? আমি, ‘ডোপেক’, ‘সিনারন’, নাকি ‘ডেনজিট’ খাবো! তারপর তিনমাস পর আমার রূপ সৌন্দর্য ফিরে পাবো?
এই আমার মেঘবালিকা। এই আমার বন্ধু।
আমার মেঘবালিকার পুরুষ বন্ধু‘র অগুনতি কাহিনী রয়েছে। সমপ্রতি এক জনের সাথে তার বাসষ্ট্যান্ডে পরিচয়। সামান্য কথাবার্তা, টেলিফোন নাম্বার বিনিময়, তার ২/১ দিন পরই ‘মেঘবালিকার মহা প্রেম, হাবুডুবু। আমি যতই বোঝাই ততই সে অনঢ়। ছেলেটি প্রেম নিবেদনের আগ পর্যন্ত বিষয়টি গ্রহণযোগ্য ছিল, ব্যাঘাতটা ঘটলো তারপরই। ছেলেটা ভাব গতি বুঝে যখনই তাকে প্রপোজ করল, ওমনি সে খ্যাত, গাইয়া এবং ছাগল গোতের অতি সামান্য একজন পুরুষ হয়ে উঠল। দ্বিতীয় পুরুষটিও প্রাথমিক দর্শনে সুপুরষ। কিন্তু দীর্ঘ দর্শনে ‘সংস্কৃতিহীন’, ‘অ-সভ্য’। কাজেই চুড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই। ৩য় পুরুষটি মেধাবী, সংস্কৃতিমনা; মেঘবালিকার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ও যত্নবান, কিন্ত তার বয়সটা উদ্ধেগজনকভাবে বেশী। সামাজিক পরিচয়ে পরিচিত করা তাকে কঠিন। চতুর্থ পুরুষটির বিশেষণ, বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা, কারণ সে অসম-ধর্মী। ৫ম পুরুষটি-কে হয়েছেন বা হবেন; তা আমি জানিনা। তবে নিঃসন্দেহে বাতিলকৃত ০৪ জনের মততো নয়ই। মেঘবালিকা বন্ধু তুমি কি রাগ করবে? যদি আমি ৫ম পুরুষের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাই? জানি তোমার অভিমান হবে। তাই বললাম না। আমাকে পৃথিবীর সব অন্তরঙ্গ গোপন কথা বলা যায়, আর আমি তার এইটুকুন ‘গোপন‘ রাখবো না!!! তাই মেঘবালিকার বাকি কথা গোপন রাখলাম। শুধু এইটুকুন বলি, মেঘবালিকা ৫ম পুরুষটিকে হঠাৎ একদিন হুট করে বিয়ে করে ফেললো। এই রহস্য কেউ জানলোনা, এই রহস্য কেউ বুঝলোনা।
ক্যানভাসে ছাইরঙ্গে ধূসর আকাশ আঁকা একটা সবুজ তামাটে দীঘল আলোর জানালা যদি বেয়ে এসে কাপড়ে পড়ে, আকাশটা ক্রমশ প্রসারিত হয়। হঠাৎ আকাশের এককোনায় জমে থাকা কালো মেঘ ক্যানভাস চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমসত আকশে। ঐ কালো রং আকাশ নগ্নতা ঢেকে দিতে চেয়েছিল! হে ঈশ্বরী নারী ! হে মানবী ! আকাশে যেওনা, যেওনা তুমি, পাতালে ফিরে আসো মেঘবালিকা!!! ফিরে আসো পাতালে।
ঢাকা শহরটা ক্রমশ গোলকধাঁধা হয়ে উঠছে। ডানের রাস্তা, বায়ে, বাঁয়ের রাস্তা ডানে, এই রকম ভুল হচ্ছে। রাত বাড়লেই কুকুরের চিৎকার, একগুয়ে ল্যাম্পপোস্ট..;;;;;ইত্যাদি ইত্যাদি শহর ছেড়ে দূরে যাই। মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই। মেঘনা নদীর জল বয়ে আনি মেঘবালিকার জন্য। তার চোখে আমি জল দেখেছিলাম, আর ভেবেছিলাম, কোন এক পূর্ণিমার রাতে আলো দিয়ে চোখের জল শুকিয়ে দেবো।
মরতে মরতে ওর মধ্যে আমি বেচেঁ থাকবো। বেঁচে যাওয়া আর বোধ হয় হলোনা আমার। স্বপ্নের শরীর খসে পড়লে মানুষ বড় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সময়কে তখন অদৃশ্য মনে হয়, যতই কাজ-কাজ-কাজের ভেতরে ডুবি, স্বপ্নকে ভূলে থাকবো বলে, ততই অসহায় নিঃস্বরন চলে। মনে পড়ে, কেন মেঘবালিকা মৃত্যুমুখী হোল, কেন সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেল? কিসের অহংকারে, কোন অভিমানে।
একটা অপরিচিত দ্বীপে একবার আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম; মনে পড়ে মেঘবালিকা তোমার? কিছুতেই খূঁজে পাচিছলামনা নিজেকে, কোথায় আমি, কেনই বা????? হঠাৎ একদিন মনে হলো, বেঁচে থাকা নির্মম কোন অপরাধ নয়। বরং অবলম্বন। চুড়ান্ত প্রগতি ও সভ্যতার পেছনে ছোটা। আমি হাজার বছর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, তোমার মনে পড়ে? চুলে, চোখে. নখে, আবিষ্কারের যাবতীয় পরিণত শব্দাবলী তখন আমার হাতের মুঠোয়। চাইলেই লেখা যায় একটা সুদীর্ঘ উপন্যাস। কিন্তু উপন্যাসের শব্দাবলীর ক্ষরণ ধীরে ধীরে আমার বুকে, শ্বাস-প্রশ্বাসে ভার হয়ে নেমে এলো। আমি হৃদয়ে ক্যান্সার বহন করলাম। একটা যুদ্ধ চলছে, আর সেটা হলো, মরা না মরার যুদ্ধ। বন্ধুর সঙ্গে যেমন শক্র শব্দটি ভয়ংকর, তেমনি ‘মৃত্যু’ ও ‘মৃত্যুহীন’। এই যুদ্ধটা কি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ? অথবা কোন ব্যাভিচার মিলন দৃশ্য?
৪
চার পরিনত বন্ধু,
‘রোদ’, চেতন’, ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘আামি রাত্রি’, এই চারজন আমরা ‘পরিণত বন্ধু’। ‘পরিণত‘ শব্দটি ব্যবহার করছি, কেবলমাত্র 'প্রাপ্ত বয়স্ক’ ভেবে নয়, একই সংগে কতটা ‘অপ্রাপ্ত’ সেইটিও ব্যাখ্যা করার জন্য। প্রাপ্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তি কি করে কুঁড়ে খায় তাই নিয়েই আমার এই বান্ধব কাহিনী।
রোদ...
‘রোদ’ একজন নারী লেখক। ভীষণ ঝলমলে, ছটফটে। সারাক্ষণ কথা বলে, শোনাতেও চায়। কেউ তাকে ভালোবাসলো কি বাসলো না কি যায় আসে? রোদ ভালোবাসে সবাইকে। আজিজ সুপার মার্কেটে তার ভারী নাম ডাক। আমি যখন ওর পাশে হাটি, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়; মনে হয়, পৃথিবীতে এমন একটি কাজ এখনও করতে পারিনি, যার জন্যে লোকে আমায় চিনবে! সস্নেহে ভারী চোখে তাকাবে; আমি ভেতরে পুলকিত বোধ কোরব, গর্ব হবে আমার। আজিজ মার্কেটের এক তলা, দোতলার প্রতিটি দোকানের সামনে আমি দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকবো। অনেক নামী-দামী লেখক বন্ধু হবে আমার। ‘রোদ’ কে দেখে আমার এরকম অনুভূতি হয়। ওর কবিতা, প্রেমের উপন্যাস, প্রবন্ধ, শব্দকোষ সবধরনের লেখায় দক্ষতা আছে। একজন মানুষ একসঙ্গে এত দক্ষ কেমন করে হয় ? আমি অবাক হই। অবাকেরা আমার কপাল বেয়ে মাটিতে নামে। টিকটিকির মত নিঃশব্দে হাটে। তারপর কোথায় যায় কে জানে?
বছর কয়েক আগে রোদের একটা পৌরানিক কল্পকাহিনী বেড়িয়েছে। কোন এক ভীনদেশী রাজকুমারীর গল্প। বইটার শুরুতে তসলিমা নাসরীনের ‘মামদো ভূতের‘ ছবি। অর্থাৎ আহমদ ছফার ছবি। লেখক সম্পর্কে উনি দীর্ঘ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সুন্দর সুন্দর কথা। কি করে র্সূযাস্তে ও ভোরে ‘রোদের জন্ম হোল, কি করে প্রবল রোদ ওকে আরো গাঢ় রং দিল, এসব কথা। আমি ভাবলাম; নিশ্চয় একদিন এরকম একটি বই ছাপা হবে আমার। আমার জন্যে লিখবেন এমন কি কেউ আছেন? আছেন কি? আমি জানিনা। আমি সাহস করে একটি দুটি ‘কবিতা’ লিখতে শুরু করলাম। এখন আমি. কবিতা লিখছি আর ভাবছি-দিগন্ত শেষে এক মহাসূর্য্যের প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি আমি। ঢং ঢং ঢং, ঘন্টা বেজে যাচ্ছে, প্রহর পেরিয়ে যাচ্ছে, কোথায় আমি ? আমার কবিতাগুলো আদৌ কবিতা হচ্ছে কি?
খুব সাহস করে রোদ কে আমি আমার কয়েকটা কবিতা মেইল করে পাঠালাম। তারপর অপেক্ষা করলাম, ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, এ যেন আমার গ্রামের বাড়ীর পুকুর ধারের শৈশব কালের মরিচ গাছ গোনা; এক, দুই, তিন, চার, একশ, একশ এক, তারপর ক্লান্তি, মরিচ গাছ গোনা আর শেষ হয়না, কিন্তু অপেক্ষার উত্তর আসে; 'রোদ, এস.এম.এস’ করে আমার মোবাইলে, ’খুব ভাল হচ্ছে, আই, এম, প্রাউড অফ ইয়ু”। আমার মনে হয় কবিতা ভাল হলো কি হলোনা, তার চেয়ে বেশী-আমি পুলকিত, শিহরিত, লেখক-কবি বন্ধুর প্রশংসা শুনে। সারাটা বিকেল আমার আনন্দে কাটে। পৃথিবীর তাবৎ জীব-জন্তু, পশু-পাখী আমার সুন্দর মনে হয়। আমি শাহবাগে যাই, আজিজ মার্কেটের সবগুলো দোকান ঘুড়ি, ক্যাসেট কিনি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাই, বন্ধুদের সিগরেট কিনে দিই। চেতন আমায় সাজেশন দেয় 'কবিসভা’ বলে একটা ইয়াহু গ্রপস আছে, ওখানে 'কবিতা’ পোষ্ট করলে নাকি ভাল মতামত পাওয়া যায়। আমি সাইবার ক্যাফেতে ঢুকি। কবিসভার রাইসুকে আমার কবিতা পাঠাই। একদিন, দুদিন এভাবে চলতে থাকে আবার অপেক্ষা। কবিসভার সদস্যরা বিশ্রীভাবে আমায় গালিগালাজ দিয়ে মেইল করতে থাকে। 'আমার কবিতা’ কোন কবিতাই হয়নি, শব্দ ব্যবহারে যৌনতার গন্ধ, ছন্দ, বাক্য, সবকিছুতেই ঝামেলা । নিজেকে আমার মহা বোকা মনে হয়, মহা 'গরু’ মহা 'ছাগল’ মনে হয়। ঝাঁ ঝাঁ রোদ রশ্মি আমার মাথা থেকে পায়ে নেমে আসে। আমি আমার ঢাকা শহরের দালান বাড়িতে ফিরে যাবার কথা ভুলে যাই; হাটতে থাকি গ্রামদেশ বরাবর, মাইলকে মাইল হাটতে থাকি, খুঁজে বেড়াই ধানক্ষেত, কাঁদার মাঠ, কচি পাটগাছ, বাঁশের সেতু, কালীগঞ্জ বাজার, ভেঙে পড়া মন্দির, ভুলে যাই, কবি বন্ধু, কবিসভা, আজিজ মার্কেট আর 'অন্তরা’র লুচি-সবজি।
চেতন হংসরাজ..
‘চেতন’ নামে নাকি হিন্দি সিরিয়ালের একজন নায়ক আছে। সেই নায়ক দেখতে অসাধারন সুন্দর। আমাদের চেতনও নিজেকে পৃথিবীর একজন অসম্ভব সুন্দর পুরূষ বলেই দাবী করে। সকাল বেলায় সে খুবই উত্তেজিত হয়ে আমায় এসে বলল, দেখ ব্রিটেনের যুবরাজ চার্লস তিন দশক ধরে প্রেম করে প্রেমিকা ক্যামিলাকে বিয়ে করেছে। খুব ইন্টারেষ্টিং না? পেইনফুলও বটে, তাইনা! এতদিন র্ধৈয্য ধরল!!! আহারে!!! আমি বললাম, যুবরাজদের আবার বিয়ে করা আর না করা! সুখী মানুষদের আবারও সুখ? দাড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়না! চেতন প্রবল আপত্তি জানালো; সুখের আবার শেষ কিরে? ওর নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুখ, হাটতে হাটতে সুখ, বাসে চড়ে সুখ, চুমু খেয়ে সুখ.. সবকিছুতেই সুখ সুখ লাগে? ‘অ-সুখ’ বলে ওর জীবনে কিছু নেই। আমার ‘কবিতা‘ নাকি কিসব ‘অখাদ্য-কুখাদ্য‘ হচ্ছে এবং এইযে ভালো হচ্ছেনা এইটি নিয়েও তার সুখ। আমি খুবই মর্মাহত, পীড়িত, আমার বন্ধুর এহেন আচরনে, চিন্তায়। পৃথিবীর সব পুরুষ কি এইরকম? না, না. এইরকম না। খোকনদা ওইরকম ছিলনা। খোকনদা যখন ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি লিখতো, আমার সমস্ত প্রাণ জুড়িয়ে যেত; আমার প্রতিটি দিন ডাকপিয়নের প্রতীক্ষায় কাটতো। আমি তিনটি শালিক খূঁজে খূঁজে বের করতাম আর বলতাম; ‘থ্রি ফর লেটারস,’ ---‘ থ্রি ফর লেটারস’----
চেতনের সাথে দেখা নাই কয়েকদিন। ওর সংঙ্গে দেখা না হলে, বিষন্নতা বাড়তে থাকে। নিজেকে দূদর্শাগ্রস্ত মনে হয়, পরিত্যাক্ত হবার ‘সম্ভাবনায়‘ ভুগি। দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে রাখি নিজেকে, ভয় হয়, ভয় হয়, আবারও ভয় হয়। দুদিন পরপর চেতন এরকম হারিয়ে যায়। আমার ভয় ওকে ছুঁয়ে যায়না; ও দিব্যি হাসতে হাসতে বলে, ‘শোন, এবার না সীতাকুন্ডে জাহাজ কাটা দেখতে গিয়েছিলাম। অথবা শেরপুরের হাতির পাল কবে ওকে তাড়া করেছিল, সেই গল্প। কোন না কোন পৃথিবীর সরল ছবি ওর আঁকা চাই । বাহ্যত মনে হতে পারে সব সত্য। আসলে পুরোটাই হতে পারে মিথ্যা। এই যেমন গত সপ্তাহে চার্লস-ক্যামিলার বিয়ে নিয়ে সে উত্তেজিত। আমায় এসে বললো, ‘রাত্রি, চলনা আমরা বিয়ে করি। আমি তোকে ভালোবাসি, বিশ্বাস কর, ভীষণ ভালোবাসি।’ আমি বললাম, ভালোবাসিস, ভালো কথা, তো বিয়ে করতে হবে কেন?’ ও বললো, প্রেম এখন ওর তীব্র স্বাদ হয়ে উঠেছে। আপেলের মত কচকচ করে সে প্রেম খাবে। আমি অবাক হই, ছি: একি কথা!! এরকম একটা রোমান্টিক বিষয় নিয়ে ’ফান’? তখন ও খুব সিরিয়াস হয়ে আমার হাত ধরে বললো, ‘রাত্রি, আমি এত সভ্য, ভব্য নই। তোর মত রবি ঠাকুরের আবেশ ধরানো গান আমি গাইতে পারিনা। আমি বরং ওই গানটা গাইতে পারি----আমিতো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।.. .. .. .. গানটার মানে কিরে? দ্যাখ, আমার শরীরটা কেমন গাছ হয়ে উঠবে, আর আমি তা দিনের পর দিন মেনে নেবো? চল আমরা সংসারের সবুজ গেলাসে সুরা পান করি।’
আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে। কোন দস্যূ এসে চেটেপুটে লুট করে নিলেও আমি তখন টের পাবোনা। মগ্নতা এমনই শরীরে বয়ে যায় আমার। ভেঙে পড়ে কোমল মাটির শরীর। আমি ভাবতে পারিনা, একি ভোগ ভাঙার চাওয়া? নাকি প্রেম? প্রেম কি ভোগ মানে? আনন্দও তো প্রেমে পড়েছিল হেরম্বের ’দিবারাত্রির কাব্যে’। সেই প্রেম তার শরীরের সন্চয় ছিল, তার নৃত্যভঙি, তাল, তেহাইয়ে ফেটে পড়েছিল সেই সন্চয়। আমার ভেতরেও কেমন কল্পনার ফানুস বাসা বাঁধছে। আমার চেতনকে নিয়ে আগুনে ছাপ দিতে ইচ্ছে করছে। আগুনের উত্তাপ পোড়াচ্ছে আমায়। ‘হে সূর্য, আলোর নাট্যে একাঙ্কিকা যদিবা মহৎ, তবুও তোমার দৃশ্যে মেঘের বাসর রচে দিও।’ হাসানের মত আমিও কি র্সূযকে বলবো, ‘মেঘের বাসর রচে দিও’,.. .. .. ‘মেঘের বাসর রচে দিও’।
সন্ধ্যা
সন্ধ্যাকে গোধূলির মত নরম, কোমল, বেহাগ ভাবতে পারিনা। গাইতে পারিনা ‘যখন আমার গান ফুরাবে তখন এসো ফিরে, ভাঙবে সভা বসবো একা রেবা নদীর তীরে’। যদিও গড়নে কোমল, পড়নে নমনীয় সবুজ, অথচ তূখোর বুদ্ধিমতী, যুক্তিবাদী, নিরাশের আশ্রয়। মনে হয় পৃথিবীর সবটাই ও জানে। একা নারীর যুদ্ধ পলে পলে ওর কথায়, চিন্তায় বাসা বেঁধেছে। এর বাইরে নিজেকে ভাবতে পারেনা সে। এক ক্ষিপ্র, যন্ত্রণাহত রহস্যজাল তার জীবনে আঘাত হানছে। ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ ও ‘স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তি-তর্ক ও কলাকৌশলে নিজেকে অংকের কঠিন সূত্রাবলীতে বেঁধে ফেলেছে সে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয়, কি চাই তার ? নিশ্চিত নিরাপদ জীবন? নাকিসে প্রশ্নহীন সমাধানের দিকে ফিরেও তাকায়না; কেবলি চলা, চলা আর চলা।
সন্ধ্যা সেই নারী, বাড়ী ভাড়া নিতে গেলে যার পদে পদে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়; ‘স্বামী নাই’ তাহলে ‘বাবা-মা’, অথবা নিদেনপক্ষে ছোট ভাই বা বোন নিশ্চয়ই থাকবে। ‘অবিবাহিত’ এবং ‘একা’ এইটি বাড়ীওয়ালারা মেনে নেয়না, যেন ছোটভাই ওর রক্ষাকর্তা! বহুকষ্টে নবোদয় হাউজিং সোসাইটিতে সাততলার মাচায় একখানা ঘর পাওয়া গেল, তাইতেই তার বাস। সাততলার বহুজাতীয় সম্ভাবনা ও বিড়ম্বনা একইসঙ্গে উপভোগ এবং অস্বসি' দুটোকেই মেনে নিতে হয়। প্রতিদিন একবিরাট আকাশ; কাক সাম্রাজ্য, আর মহাসূর্য্য ওর পৃথিবী ঘিড়ে রাখে। পচাঁত্তর ধাপের সিড়ি বেয়ে ওঠা ও নামা। মাঝে মাঝে থামা। প্রতিদিন একটি করে কবিতা রচনা করা যায়, কখনও বিশাল ---- কখনও জটিল। একবার কবিতার সংগে ব্যান্ড পার্টির ---- একক এ্যালবাম রচনা করল সে। সারারাত ধরে ব্যান্ড পার্টি বাজনা বাজাল আর সন্ধ্যা তার অসুস' ভাইয়ের পরিনতির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল। নিজস্ব সুখ, স্বাচ্ছন্দে, ডুবে গেল সে। দৈহিক সম্পর্কে নীতি মানা না মানা, এইসব তাকে আর দ্বিধায় ফেললোনা। সন্ধ্যা ডুবে গেল, ডুবে গেল।
সন্ধ্যাকে আমার ‘বৃক্ষ’ মনে হয়। বিশাল বৃক্ষ। যার ছায়ায় একটা সকাল, একটা দুপুর, একটা গোধূলি পার করে আমি পানপাতার মত, লাউডগার মত নম্রতায়িত হই। কখনও কখনও ‘উষ্নতা‘ ধার করে, শরীরে বিলাই, হাপুস-হুপুস করে খাই। ভয় কাটাবার এ এক মজার খেলা। ধার যখন বেশী চাই, তখন বৃক্ষটা ঢলে পড়ে, মর্মাহত হয়, বৃক্ষটা যেন ‘কচ্ছপ’ হয়ে মাটিতে ঢুকে পড়ে। একদিন, দুদিন, তিনদিন.. অনেকদিন ওর কোন খোঁজ থাকেনা। আমি যদি কোন গভীর অরন্য হতে পারতাম? তাহলে বৃক্ষটি নিশ্চয়ই আমায় ছেড়ে যেতে পারতোনা। আমি যদি কোন গভীর সমুদ্র হতে পারতাম ! তাহলে কচ্ছপটি নিশ্চয়ই সাগরে ভেসে উঠত! কিন্তু আমি গভীর অরন্য বা গভীর সমুদ্র কোনটাই হতে পারলাম না। সর্ষে ক্ষেতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকলাম দীর্ঘকাল। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলোনা, ভেতরে গভীর বাজন বাজতে থাকল; ‘সন্ধ্যা মালতী যবে, ফুলবনে ঝুড়ে, কে আসি বাজাবে বাঁশীঁ, ভৈরবী সুরে।’
সন্ধ্যা, আমি আমার অনুভূতির জায়গায় প্রবল সৎ হতে চাই। আমি বলতে চাই, যে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও আস্থার ছায়া আমার গায়ে মেখেছি, তার কোনটা মিথ্যে ভান নয়। তুমি আমায় বিশ্বাস কর, তুমি আমায় চকের গুড়োর মত ধূলোয় মিশে যেতে দিওনা।সন্ধ্যা আমায় বিশ্বাস করে কিনা জানিনা, তবে ভালোবাসা দেয়। অনেক জখম আর পঁচে যাওয়া ক্ষতে, আর্য়ূবেদ লাগায়। আমি পুটিমাছ ভাজা আর ঘি দিয়ে, দু’বেলা পেট ভরে ভাত খাই। এ আমার শখের খাওয়া। গ্রামদেশে গেলে বুবু আমায় পেট ভরে খেতে দিতেন। পাখীরা, মাছেরা চোখ ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করত। দাদা তার শীতল পাটি বারান্দায় বিছিয়ে মাটিতে শুয়ে থাকতেন। আর বুবু তালপাখায় বাতাস নাড়তেন। পাশের ঘরের সফু কাকা প্রায় সময়ই দাদা আর বুবুর অন্তরঙ্গ সময়ে গান শোনাতেন; তার একটা হোল; ‘কইনসান দেহি, কইনসান দেহি আমার প্যাটের খাওন কি? আল্লাহতালায় দিসে খাওন, গরম ভাত আর পুটি-ঘি’। আমার প্রিয় খাওয়া নিয়ে এসব রসিকতা রৌদ্রজয়ী হয়ে উঠেছে আজ। সন্ধ্যা একে বলে, 'স্মৃতির অপরন্তহীন ঢেউ’, আর আমি বলি 'ঘুমহারা ঘরছাড়া বিষাদ’। ডুবিয়ে মারে, আবার উঠায়, আবার উঠায়, কি মানে? কি মানে জীবনের? সন্ধ্যা বলে, 'পথ যতদূর যায় তারচে ঢের দূর আমাদের জীবনের মানে’। আমি এই মানে বুঝিনা। সন্ধ্যা কি সব বুঝে? সব জানে? সন্ধ্যা কি ক্রমশ ঈশ্বর হয়ে উঠছে?
৫
পরিশেষ ও প্রিয় কবি
নামটা এমন হলে ভাল হোত জয়গো-স্বামী। দুহাত জড়ো করে প্রনাম করতাম। কিন্তু নামটা ‘জয় গোস্বামী ! প্রণাম করিনা, মাথার নিচে তার বইগুলো নিয়ে ঘুমাই। মনে হয় মাথার উপর স্বপ্নেরা খাড়া ঝুলতে থাকে। ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’, ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল,’ হাতড়ে বেড়াই। প্রতিরাতে বালিশের পাশে বেডসাইড টেবিলে তাকিয়ে দেখি থরে থরে সাজানো কবিতারাশি। ‘পাঁচিলে দাঁড়িয়েছি, বৃষ্টি এসে কথা বলতে চায়। কথা বলেওছিলাম, প্রেরণাদোলায়। অথবা গুনগুন করি, ‘সকলেই টুপি, লম্বাপানা, সকলেই বলো ভালোবাসি। সকলেই যদি কবিকে বলে ‘ভালোবাসি‘, কবি কি তা মেনে নেবে? লম্বা চুল, লম্বা দাঁড়ি, ঘন মোছ, তীক্ষ চেহারা; এই কবিকে আমি ভালোবাসি। কবি কি তা মেনে নেবেন? হয়ত তিনি মানা-না মানা নিয়ে আরেকটি কবিতা লিখবেন; কিন্তু সত্যিই কি তিনি মেনে নেবেন? হয়ত প্রশ্ন করবেন, কি ভালোবাসি, কবিতা? কবিতার অনুভূতি? স্টাইল? মানুষ কবিকেতো চিনিনা, ভালোবাসিনা। আর সব মানুষকে কি চিনি? বন্ধুদের কি চিনি? গভীর বোধে আচছন্ন হয়ে আছি। সারা শরীরে অযত্ন, কাটাছেরা, বাধনহীন, নির্মম। একটা গুরুত্বহীন পাখী, একটা গুরুত্বহীন কবিতার মত একটা গুরুত্বহীন মানুষ। ঘুমিয়ে থাকে, আড়ালে..নি:শব্দে, আর ভাবে, প্রিয় কবি, অসহায় কবিতা আর নিষ্ঠুর পাঠক। সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, বিষন্নতারা চোখ, মুখ, উজাড় করে খায়। কেবল কয়েকটি কবিতাই অসহায়ত্বের সঙ্গী, নিরব সংসার। একথা বান্ধবেরা কি জানে? জানে না। চেতন একটা অলৌকিক স্বপ্নের কথা বলে; 'মাটির তলে বাড়ী- তার উপরে গাড়ী, তার উপরে বাঁশ-সেই বাঁশেরই অন্ধকারে আমার লম্বা লাশ, লাশের গায়ে চুন-কেউ দেখেনি, শোকের মুখে শোক পোহাতে আমার হোল খুন।’ এই অলৌকিক স্বপ্নটা রূপকথার মত চোখে ভাসে, ভাসে আর ভাসে। মনে হয় শুয়ে পড়ি কোন মাটির তলে, ধানিজমির নিচে শুয়ে পড়ি, বাবাকে ডাকি, দাদুকে ডাকি, বুবুকে ডাকি, বলি; ’বান্ধবেরা আমায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিল বাবা; বান্ধবেরা আমায় রোদ্দুরে ছায়া দিয়েছিল; তবুও দেখো, আমার হাতের শাঁখা কেমন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, চাঁদ ফসকে ডুবে গেল কুয়োয়। তাই এখন কেবলই অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকার অমাবস্যা; আয়নায় দেখি পশুর মত মুখ আমার, অতৃপ্ত বান্ধবে। প্রিয় কবি, লিখেছেন,
‘আজ নয় অন্ধকার, আজ নয় দূরত্ব পাথর
আজ নয় দ্বগ্ধ লেখা, নয় মাথা ঠোকার দেওয়াল
নয় পাপ, স্বীকারোক্তি, কান্না অনুশোচনার ঘর. .
আজ শুধু খোলা চাঁদ, আজ শুধু তারা চোখে পড়া
একা উদযাপন আজ,
একাকী দ্বিশত পূর্ণ করা ।’
আমি তাই পূর্ণ দিগন্তে লাবণ্য ধার চাইলাম; হে বন্ধুরা, আমায় লাবণ্য দাও, আমায় লাবণ্য দাও, কেবলি লাবণ্য দাও।
লেবেলসমূহ:
আলোচনা,
মৌসুমী কাদের,
স্মৃতিচারণ
সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০০৯
আমাদের সুরাইয়া খানম
আমাদের সুরাইয়া খানম/মুহম্মদ জুবায়ের
সুরাইয়া খানম চলে গেলেন গত ২৫ মে। আমেরিকার মরুময় রাজ্য আরিজোনার একটি শহরে তিনি বাস করতেন জানতাম। হয়তো দুরূহ ছিলো না, তবু যোগাযোগ করা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খবর এলো কিছুটা গুজবের মতো, বিশ্বাস হয়নি বা করতে চাইনি বলেই হয়তো গুজব মনে হয়েছিলো। ৬০ আর কী এমন বয়স যে চলে যেতে হবে?
কবি বদিউজ্জামান নাসিম জানালেন, সুরাইয়া খানমের মৃত্যুসংবাদ-সংবলিত একটি ইমেল পেয়েছেন তিনি। অনেককে ফোন করেছেন, নিশ্চিত হতে পারেননি। জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিছু শুনেছি কি না। জানতাম না। জানলাম জনকণ্ঠে মাহবুব তালুকদারের লেখায়। তাতে উল্লেখ ছিলো, ওই কাগজের শোক সংবাদ বিভাগে খবরটি ছিলো। কয়েকটি বাংলা সংবাদপত্র প্রতিদিন ইন্টারনেটে পড়া হলেও শোকসংবাদে আমার কী কাজ? কিন্তু সুরাইয়া খানমের চলে যাওয়ার সংবাদটি যে সেখানেই পাওয়া যাবে, কে জানতো!
১৯৭৩-এ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় সুরাইয়া আপা ছিলেন না, শিক্ষক হয়ে এলেন ওই বছরের শেষের দিকে অথবা ৭৪-এর শুরুতে। ক্যামব্রিজে পড়া বিদুষী এবং অসামান্য রূপসী সুরাইয়া খানম সাড়া জাগালেন অবিলম্বে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে মহিলা শিক্ষকদের আপা বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিলো না। ম্যাডাম বলা হতো, সম্ভবত এখনো হয়।
সেই হিসেবে সুরাইয়া খানমকে আমারও ম্যাডাম সম্বোধন করার কথা। হয়নি, তার পেছনে আমার ছোটো বোন ঝর্ণার খানিকটা অপ্রত্যক্ষ ভুমিকা ছিলো। ঝর্ণা থাকতো শামসুননাহার হলে, সুরাইয়া খানম সেখানে হাউস টিউটর হয়ে এলেন। তাঁর জন্যে আলাদা আবাস বরাদ্দ হলো না। অথবা করতে পারলো না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনি তখন সংসারী নন, একা মানুষ। তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো ছাত্রীদের জন্যে নির্ধারিত একটি কক্ষে।
রুম নম্বর ২৪০। ঠিক পাশেই ২৩৯-এর বাসিন্দা ঝর্ণার সঙ্গে তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠতা হয়। ঝর্ণার জন্যে তাঁর বরাদ্দ প্রশ্রয়ের কিছু আমার ভাগে এসে পড়ায় তিনি সুরাইয়া আপা হয়ে গিয়েছিলেন। ক্লাসে আমার নিয়মিত অনুপস্থিতির ফলে বেশি যোগাযোগ ছিলো না, ছাত্র হিসেবে আমার নিতান্ত অনুজ্জ্বলতাও হয়তো একটি কারণ।
স্নব বলে আমাদের ইংরেজি বিভাগের খ্যাতি ছিলো, হয়তো এখনো আছে। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য, নিয়ে কথা বলবে বা চর্চা করবে তা যেন খুব নিম্নমানের কাজ, জাত খোয়ানোর মতো নিন্দনীয় অপরাধ।
ব্যতিক্রম অবশ্য সবখানেই থাকে, ইংরেজি বিভাগে নিম্নবর্গীয় সেই সংখ্যালঘুদের একজন ছিলেন সুরাইয়া খানম। নিজে কবিতা লিখতেন, তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘নাচের শব্দ’ প্রকাশিত হয়েছিলো সত্তর দশকের মাঝামাঝি। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রাজিয়া খান ও সেলিম সারোয়ার এবং কিছু পরের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কাশীনাথ রায় ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন। সেই সময়ের ইংরেজির ছাত্রদের মধ্যে নূরুল করিম নাসিম ও শিহাব সরকার লেখালেখিতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বলে মনে পড়ে।
অন্যসব ক্লাসের মতোই সুরাইয়া আপার ক্লাসেও আমার বারকয়েকের বেশি যাওয়া হয়নি। তিনি কী পড়াতেন, তা-ও মনে নেই। অমনোযোগী ছাত্র হলে যা হয় আর কি। আরেকটি কারণ স্বীকার করে নিতে সংকোচ নেই। প্রিয়দর্শিনী সুরাইয়া আপার ছিলো দৃপ্ত ও দৃঢ় বাচনভঙ্গি এবং প্রখর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা। যে কয়েকবার তাঁর ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি, হয়তো এইসব গুণাবলিই বেশি চোখে পড়েছে, বিদ্যা অর্জন গৌণ।
ক্লাসের বাইরে বারকয়েক তাঁর অফিসে গিয়েছি। একা বা দুয়েকজন বন্ধুবান্ধবসহ। তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ আমার দুই লাজুক সহপাঠী কীভাবে যেন আবিষ্কার করে ফেলে যে, সুরাইয়া আপার সঙ্গে আমার সামান্য যোগাযোগ আছে। তাদের খুব ইচ্ছে তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা, কিন্তু কীভাবে সম্ভব জানে না।
মনে আছে, মধুর ক্যান্টিনে চা-সিঙাড়ার বিনিময়ে দুই গুণমুগ্ধকে এক দুপুরে তাঁর অফিসে নিয়ে যাই। সেই সাক্ষাতের সময় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো। দুই সহপাঠী বন্ধুকে নিয়ে সুরাইয়া আপার কক্ষে গিয়ে দেখি তাঁর উল্টোদিকের চেয়ারে বসা আমাদের দুই-এক বছরের কনিষ্ঠ চশমা-পরা একটি মেয়ে বসে এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। সুরাইয়া আপা আমাদের বসতে ইঙ্গিত করে মেয়েটির কথায় হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিলেন।
সে মেয়ের কথা আর থামেই না। তার একটি কথা এখনো আমার মনে আছে। সে সাহিত্যে কতোটা নিবেদিতপ্রাণ তা বোঝাতে গিয়ে জানায়, ‘জানেন ম্যাডাম, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ সাহিত্যচর্চা না করলে আমার ঘুমই আসে না!’ সুরাইয়া আপার মুখে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখলাম।
তাঁর অফিসে গেলে কথা হতো বাংলা সাহিত্য নিয়ে। ঠিক আড্ডা বলা চলে না, আপা ডাকলেও শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কজনিত দূরত্ব কিছু ছিলোই। যোগাযোগটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কথাবার্তায় তাঁকে খুব আবেগতাড়িত মানুষ বলে মনে হতো। কথা বলতেন সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের গভীর থেকে। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ছিলেন, যা তাঁকে কিছু মানুষের চোখে অপ্রিয়ও করে থাকবে।
সুরাইয়া আপার আরেকটি কীর্তির কথা অনেকের জানা নেই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয়ের পর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়্যারে বাঙালিদের বিজয় অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকাটি উত্তোলিত হয়েছিলো তাঁরই হাতে।
১৯৭৫-এর ২৬ নভেম্বর। সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে খবর পাওয়া গেলো, তরুণ কবি আবুল হাসান প্রয়াত। তাঁর কবিতা আমার প্রিয়। আবুল হাসান দীর্ঘকাল অসুস্থ ছিলেন, সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসার জন্যে তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো বার্লিনে। যতোদূর জানি, একজন কবির চিকিৎসার জন্যে সরকারি তৎপরতা ও সহায়তার ঘটনা বাংলাদেশে সেই প্রথম।
ফিরে আসার পর হাসান অল্প কিছুদিন ভালো ছিলেন, তারপর তাঁকে আবার পি জি হাসপাতালে (এখন শেখ মুজিব হাসপাতাল) ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, সুরাইয়া আপা ছাড়েননি। আবুল হাসানের সঙ্গে সুরাইয়া আপার বন্ধুত্ব বা ততোধিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো, এই মর্মে কথাবার্তা শোনা যেতো। সেসব অবান্তর, কবির সেই শেষ সময়ে সুরাইয়া খানম অবতীর্ণ হয়েছিলেন মমতাময়ীর ভূমিকায়।
প্রিয় কবির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লাস করতে যাওয়া যায় না। পি জি হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম উদভ্রান্ত সুরাইয়া আপাকে, প্রয়াত কবির বিছানার পাশে দাঁড়ানো। তাঁকে অমন করুণ ও অসহায় আগে কোনোদিন দেখিনি। কিছু কিছু ছবি চিরকালের মতো হৃদয়কন্দরে জেগে থাকে, আজও সে মুখ ভোলা হয়নি।
কবির বন্ধু-আত্মীয়-ভক্তরা তখন ধীরে ধীরে সমবেত হচ্ছেন পি জি হাসপাতালে কবির অন্তিম শয্যাটিকে ঘিরে। অতো মানুষের সংকুলান সেই ছোট্টো কক্ষে হওয়ার কথা নয়, আমরা কেউ কেউ বাইরে বারান্দায় দাঁড়ানো। সুরাইয়া আপা হঠাৎ বেরিয়ে এলেন। কী ভেবে কে জানে, আমার হাত ধরে বললেন, ‘ওরা হাসানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তা কিছুতেই হতে পারে না, হাসানের খুব ইচ্ছে ছিলো তার কবর হবে রেসকোর্সের একপাশে। সে বলে গেছে। আমার কথা কেউ শুনছে না, তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে ওদের?’
জীবনে একেকটা অসহায় সময় আসে যখন মানুষ খুব অবুঝ ও যুক্তিহীন হয়ে যায়। তখন অতি সামান্য কিছুকেও শক্ত অবলম্বন ভাবতে ইচ্ছে করে। না হলে এতো মানুষ থাকতে সুরাইয়া আপা আমাকে এই অনুরোধটি কেন করবেন? আমার কী ক্ষমতা, আমি তো সত্যিই কেউ না, আমার কথা কে শুনবে? তাঁর তখন সেসব বিবেচনা করার অবস্থা নেই।
বুঝতে পারি, অনেকের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়ে সবাইকে তিনি একই অনুরোধ করে যাচ্ছেন, হাসানের কবর যেন ঢাকায় হয়। হঠাৎ রাহাত খানকে দেখতে পাই। আমি সুরাইয়া আপাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। বলি, ‘রাহাত ভাই কিছু একটা করতে পারবেন হয়তো।’
নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে সরে এসেছিলাম সেদিন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আর কোনোদিন হয়নি। পেরে উঠিনি। সুরাইয়া আপা একটিমাত্র অনুরোধ করেছিলেন, যা রক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিলো না।
একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে মেয়েদের মেধা ও সৌন্দর্যের সম্মিলন কম দেখা যায়। হয়তো খুব অমূলক নয়। কিন্তু সুরাইয়া খানম সেই সংখ্যালঘুদের একজন যাঁর মধ্যে মেধা, প্রতিভা ও সৌন্দর্য এক হয়ে মিশে গিয়েছিলো। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, রূপসী নারী হিসেবে তিনি যতো প্রচারিত হয়েছেন, মেধাবী শিক্ষক বা প্রতিভাবান কবি সুরাইয়া খানমকে নিয়ে আলোচনা সে তুলনায় ততোটাই কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে প্রবাসী হয়েছিলেন আশির দশকের শুরুতে। বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন, স্বামী সৈয়দ সালাউদ্দিন এক দুর্ঘটনায় মারা যান বছর দুয়েক আগে। তাঁর মেয়ে সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেছে, স্বামীসহ ওয়াশিংটন ডি সি-তে বাস করে। সুরাইয়া আপা শেষের দিনগুলিতে সম্পূর্ণ একা ছিলেন শুনেছি। তাঁরও সময় ফুরিয়ে গেলো।
বিদায়, সুরাইয়া আপা। আপনার অন্তর্ধানের খবরে ঝর্ণা বলছিলো, কারণে-অকারণে প্রায়ই আপনাকে তার মনে পড়ে। আপনাকে সে ভোলেনি (‘অমলকে বোলো, সুধা তাকে ভোলেনি!’)। আপনার সম্পর্কে তার শেষ কথা, আপনি সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রবর্তী ছিলেন।
আপনার আরেক ছাত্র, আমার বন্ধু বিক্রম ইমেলে জানালো, তাদের ‘পদাতিক’ পত্রিকার জন্যে একটি কবিতা দিয়েছিলেন আপনি। আপনার স্বহস্তে লেখা মূল কপিটি তার কাছে রক্ষিত ছিলো দীর্ঘদিন। এখন খুঁজে না পেয়ে তার অনুশোচনার শেষ নেই। আপনাকেও তো আর পাওয়া যাবে না।
সবশেষে আমার কথাটুকু জানিয়ে রাখি, যতোদিন আয়ু অবশিষ্ট আছে, বছরে অন্তত একবার হলেও আপনাকে মনে পড়বে। আপনার চলে যাওয়ার দিনটির খুব আশেপাশেই যে আমার জন্মদিন। ভুলি কী করে?
সুরাইয়া খানমের কবিতা/
দহন/
লজ্জা আমার শরসয্যা,
প্রেম আমার চিতা।
বিরহে পোড়া একাকী রাত এখন আমার মিতা।
শুশ্রূষাগার/
এই দেখো শরীর আমার
এ যেন তোমার শান্ত শুদ্ধি নিকেতন,
এ যেন বিশ্রামাগার হে পথিক ক্লান্ত পথচারী
বসো তুমি শীতলপাটির বুকে
গোলাপ জলের ঝারি, কাঠাঁল ছায়ায়!
এই দেখো হৃদয় আমার :
তোমার দুঃখের আলোয়ান
মলিন ও পরিধেয় সব কিছু
খুলে ফেলে রাখো এই উষ্ণ আলনায়
ওই সব বিগত বোতাম খুলে ফেলো :
এই যে মুকুর আমি, চেয়ে দেখো
পথিক নিজেকে রাখো আমার ছায়ায়!
এইখানে বসো মন :
মন আমি, আমার চিরুণী
তোমার দুঃখের জটা খুলে ফেলে রাখব এখনি!
আমার উনুনে তেতে নাও
তোমার যা কিছু আছে, সুস্থ হও!
ঝুলন্ত পেরেক/
পেরেকের দিন এই
এ নয় প্রেমের দিন!
হাতে হাতে চলবার দিন নয়
এই দিন পেরেকের দিন!
ললাটে লাগাও তালা
দু’ঠোঁটে কুলুপ;
হৃৎপিন্ডে বেঁধে রাখো লালফিতে
কানে দাও সীসে!
দুই করতল ভেদ করে চলে যাক
লৌহশলাকার দেহঃ
দ্যাখো,দ্যাখো-চেয়ে চেয়ে দ্যাখো!
হায়রে উলঙ্গ শব , হায়রে ঝুলন্ত শব!
চোখ মেলে চেয়ে চেয়ে দ্যাখো!
সুরাইয়া খানম চলে গেলেন গত ২৫ মে। আমেরিকার মরুময় রাজ্য আরিজোনার একটি শহরে তিনি বাস করতেন জানতাম। হয়তো দুরূহ ছিলো না, তবু যোগাযোগ করা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খবর এলো কিছুটা গুজবের মতো, বিশ্বাস হয়নি বা করতে চাইনি বলেই হয়তো গুজব মনে হয়েছিলো। ৬০ আর কী এমন বয়স যে চলে যেতে হবে?
কবি বদিউজ্জামান নাসিম জানালেন, সুরাইয়া খানমের মৃত্যুসংবাদ-সংবলিত একটি ইমেল পেয়েছেন তিনি। অনেককে ফোন করেছেন, নিশ্চিত হতে পারেননি। জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিছু শুনেছি কি না। জানতাম না। জানলাম জনকণ্ঠে মাহবুব তালুকদারের লেখায়। তাতে উল্লেখ ছিলো, ওই কাগজের শোক সংবাদ বিভাগে খবরটি ছিলো। কয়েকটি বাংলা সংবাদপত্র প্রতিদিন ইন্টারনেটে পড়া হলেও শোকসংবাদে আমার কী কাজ? কিন্তু সুরাইয়া খানমের চলে যাওয়ার সংবাদটি যে সেখানেই পাওয়া যাবে, কে জানতো!
১৯৭৩-এ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় সুরাইয়া আপা ছিলেন না, শিক্ষক হয়ে এলেন ওই বছরের শেষের দিকে অথবা ৭৪-এর শুরুতে। ক্যামব্রিজে পড়া বিদুষী এবং অসামান্য রূপসী সুরাইয়া খানম সাড়া জাগালেন অবিলম্বে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে মহিলা শিক্ষকদের আপা বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিলো না। ম্যাডাম বলা হতো, সম্ভবত এখনো হয়।
সেই হিসেবে সুরাইয়া খানমকে আমারও ম্যাডাম সম্বোধন করার কথা। হয়নি, তার পেছনে আমার ছোটো বোন ঝর্ণার খানিকটা অপ্রত্যক্ষ ভুমিকা ছিলো। ঝর্ণা থাকতো শামসুননাহার হলে, সুরাইয়া খানম সেখানে হাউস টিউটর হয়ে এলেন। তাঁর জন্যে আলাদা আবাস বরাদ্দ হলো না। অথবা করতে পারলো না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনি তখন সংসারী নন, একা মানুষ। তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো ছাত্রীদের জন্যে নির্ধারিত একটি কক্ষে।
রুম নম্বর ২৪০। ঠিক পাশেই ২৩৯-এর বাসিন্দা ঝর্ণার সঙ্গে তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠতা হয়। ঝর্ণার জন্যে তাঁর বরাদ্দ প্রশ্রয়ের কিছু আমার ভাগে এসে পড়ায় তিনি সুরাইয়া আপা হয়ে গিয়েছিলেন। ক্লাসে আমার নিয়মিত অনুপস্থিতির ফলে বেশি যোগাযোগ ছিলো না, ছাত্র হিসেবে আমার নিতান্ত অনুজ্জ্বলতাও হয়তো একটি কারণ।
স্নব বলে আমাদের ইংরেজি বিভাগের খ্যাতি ছিলো, হয়তো এখনো আছে। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য, নিয়ে কথা বলবে বা চর্চা করবে তা যেন খুব নিম্নমানের কাজ, জাত খোয়ানোর মতো নিন্দনীয় অপরাধ।
ব্যতিক্রম অবশ্য সবখানেই থাকে, ইংরেজি বিভাগে নিম্নবর্গীয় সেই সংখ্যালঘুদের একজন ছিলেন সুরাইয়া খানম। নিজে কবিতা লিখতেন, তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘নাচের শব্দ’ প্রকাশিত হয়েছিলো সত্তর দশকের মাঝামাঝি। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রাজিয়া খান ও সেলিম সারোয়ার এবং কিছু পরের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কাশীনাথ রায় ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন। সেই সময়ের ইংরেজির ছাত্রদের মধ্যে নূরুল করিম নাসিম ও শিহাব সরকার লেখালেখিতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বলে মনে পড়ে।
অন্যসব ক্লাসের মতোই সুরাইয়া আপার ক্লাসেও আমার বারকয়েকের বেশি যাওয়া হয়নি। তিনি কী পড়াতেন, তা-ও মনে নেই। অমনোযোগী ছাত্র হলে যা হয় আর কি। আরেকটি কারণ স্বীকার করে নিতে সংকোচ নেই। প্রিয়দর্শিনী সুরাইয়া আপার ছিলো দৃপ্ত ও দৃঢ় বাচনভঙ্গি এবং প্রখর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা। যে কয়েকবার তাঁর ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি, হয়তো এইসব গুণাবলিই বেশি চোখে পড়েছে, বিদ্যা অর্জন গৌণ।
ক্লাসের বাইরে বারকয়েক তাঁর অফিসে গিয়েছি। একা বা দুয়েকজন বন্ধুবান্ধবসহ। তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ আমার দুই লাজুক সহপাঠী কীভাবে যেন আবিষ্কার করে ফেলে যে, সুরাইয়া আপার সঙ্গে আমার সামান্য যোগাযোগ আছে। তাদের খুব ইচ্ছে তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা, কিন্তু কীভাবে সম্ভব জানে না।
মনে আছে, মধুর ক্যান্টিনে চা-সিঙাড়ার বিনিময়ে দুই গুণমুগ্ধকে এক দুপুরে তাঁর অফিসে নিয়ে যাই। সেই সাক্ষাতের সময় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো। দুই সহপাঠী বন্ধুকে নিয়ে সুরাইয়া আপার কক্ষে গিয়ে দেখি তাঁর উল্টোদিকের চেয়ারে বসা আমাদের দুই-এক বছরের কনিষ্ঠ চশমা-পরা একটি মেয়ে বসে এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। সুরাইয়া আপা আমাদের বসতে ইঙ্গিত করে মেয়েটির কথায় হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিলেন।
সে মেয়ের কথা আর থামেই না। তার একটি কথা এখনো আমার মনে আছে। সে সাহিত্যে কতোটা নিবেদিতপ্রাণ তা বোঝাতে গিয়ে জানায়, ‘জানেন ম্যাডাম, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ সাহিত্যচর্চা না করলে আমার ঘুমই আসে না!’ সুরাইয়া আপার মুখে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখলাম।
তাঁর অফিসে গেলে কথা হতো বাংলা সাহিত্য নিয়ে। ঠিক আড্ডা বলা চলে না, আপা ডাকলেও শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কজনিত দূরত্ব কিছু ছিলোই। যোগাযোগটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কথাবার্তায় তাঁকে খুব আবেগতাড়িত মানুষ বলে মনে হতো। কথা বলতেন সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের গভীর থেকে। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ছিলেন, যা তাঁকে কিছু মানুষের চোখে অপ্রিয়ও করে থাকবে।
সুরাইয়া আপার আরেকটি কীর্তির কথা অনেকের জানা নেই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয়ের পর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়্যারে বাঙালিদের বিজয় অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকাটি উত্তোলিত হয়েছিলো তাঁরই হাতে।
১৯৭৫-এর ২৬ নভেম্বর। সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে খবর পাওয়া গেলো, তরুণ কবি আবুল হাসান প্রয়াত। তাঁর কবিতা আমার প্রিয়। আবুল হাসান দীর্ঘকাল অসুস্থ ছিলেন, সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসার জন্যে তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো বার্লিনে। যতোদূর জানি, একজন কবির চিকিৎসার জন্যে সরকারি তৎপরতা ও সহায়তার ঘটনা বাংলাদেশে সেই প্রথম।
ফিরে আসার পর হাসান অল্প কিছুদিন ভালো ছিলেন, তারপর তাঁকে আবার পি জি হাসপাতালে (এখন শেখ মুজিব হাসপাতাল) ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, সুরাইয়া আপা ছাড়েননি। আবুল হাসানের সঙ্গে সুরাইয়া আপার বন্ধুত্ব বা ততোধিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো, এই মর্মে কথাবার্তা শোনা যেতো। সেসব অবান্তর, কবির সেই শেষ সময়ে সুরাইয়া খানম অবতীর্ণ হয়েছিলেন মমতাময়ীর ভূমিকায়।
প্রিয় কবির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লাস করতে যাওয়া যায় না। পি জি হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম উদভ্রান্ত সুরাইয়া আপাকে, প্রয়াত কবির বিছানার পাশে দাঁড়ানো। তাঁকে অমন করুণ ও অসহায় আগে কোনোদিন দেখিনি। কিছু কিছু ছবি চিরকালের মতো হৃদয়কন্দরে জেগে থাকে, আজও সে মুখ ভোলা হয়নি।
কবির বন্ধু-আত্মীয়-ভক্তরা তখন ধীরে ধীরে সমবেত হচ্ছেন পি জি হাসপাতালে কবির অন্তিম শয্যাটিকে ঘিরে। অতো মানুষের সংকুলান সেই ছোট্টো কক্ষে হওয়ার কথা নয়, আমরা কেউ কেউ বাইরে বারান্দায় দাঁড়ানো। সুরাইয়া আপা হঠাৎ বেরিয়ে এলেন। কী ভেবে কে জানে, আমার হাত ধরে বললেন, ‘ওরা হাসানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তা কিছুতেই হতে পারে না, হাসানের খুব ইচ্ছে ছিলো তার কবর হবে রেসকোর্সের একপাশে। সে বলে গেছে। আমার কথা কেউ শুনছে না, তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে ওদের?’
জীবনে একেকটা অসহায় সময় আসে যখন মানুষ খুব অবুঝ ও যুক্তিহীন হয়ে যায়। তখন অতি সামান্য কিছুকেও শক্ত অবলম্বন ভাবতে ইচ্ছে করে। না হলে এতো মানুষ থাকতে সুরাইয়া আপা আমাকে এই অনুরোধটি কেন করবেন? আমার কী ক্ষমতা, আমি তো সত্যিই কেউ না, আমার কথা কে শুনবে? তাঁর তখন সেসব বিবেচনা করার অবস্থা নেই।
বুঝতে পারি, অনেকের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়ে সবাইকে তিনি একই অনুরোধ করে যাচ্ছেন, হাসানের কবর যেন ঢাকায় হয়। হঠাৎ রাহাত খানকে দেখতে পাই। আমি সুরাইয়া আপাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। বলি, ‘রাহাত ভাই কিছু একটা করতে পারবেন হয়তো।’
নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে সরে এসেছিলাম সেদিন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আর কোনোদিন হয়নি। পেরে উঠিনি। সুরাইয়া আপা একটিমাত্র অনুরোধ করেছিলেন, যা রক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিলো না।
একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে মেয়েদের মেধা ও সৌন্দর্যের সম্মিলন কম দেখা যায়। হয়তো খুব অমূলক নয়। কিন্তু সুরাইয়া খানম সেই সংখ্যালঘুদের একজন যাঁর মধ্যে মেধা, প্রতিভা ও সৌন্দর্য এক হয়ে মিশে গিয়েছিলো। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, রূপসী নারী হিসেবে তিনি যতো প্রচারিত হয়েছেন, মেধাবী শিক্ষক বা প্রতিভাবান কবি সুরাইয়া খানমকে নিয়ে আলোচনা সে তুলনায় ততোটাই কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে প্রবাসী হয়েছিলেন আশির দশকের শুরুতে। বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন, স্বামী সৈয়দ সালাউদ্দিন এক দুর্ঘটনায় মারা যান বছর দুয়েক আগে। তাঁর মেয়ে সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেছে, স্বামীসহ ওয়াশিংটন ডি সি-তে বাস করে। সুরাইয়া আপা শেষের দিনগুলিতে সম্পূর্ণ একা ছিলেন শুনেছি। তাঁরও সময় ফুরিয়ে গেলো।
বিদায়, সুরাইয়া আপা। আপনার অন্তর্ধানের খবরে ঝর্ণা বলছিলো, কারণে-অকারণে প্রায়ই আপনাকে তার মনে পড়ে। আপনাকে সে ভোলেনি (‘অমলকে বোলো, সুধা তাকে ভোলেনি!’)। আপনার সম্পর্কে তার শেষ কথা, আপনি সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রবর্তী ছিলেন।
আপনার আরেক ছাত্র, আমার বন্ধু বিক্রম ইমেলে জানালো, তাদের ‘পদাতিক’ পত্রিকার জন্যে একটি কবিতা দিয়েছিলেন আপনি। আপনার স্বহস্তে লেখা মূল কপিটি তার কাছে রক্ষিত ছিলো দীর্ঘদিন। এখন খুঁজে না পেয়ে তার অনুশোচনার শেষ নেই। আপনাকেও তো আর পাওয়া যাবে না।
সবশেষে আমার কথাটুকু জানিয়ে রাখি, যতোদিন আয়ু অবশিষ্ট আছে, বছরে অন্তত একবার হলেও আপনাকে মনে পড়বে। আপনার চলে যাওয়ার দিনটির খুব আশেপাশেই যে আমার জন্মদিন। ভুলি কী করে?
সুরাইয়া খানমের কবিতা/
দহন/
লজ্জা আমার শরসয্যা,
প্রেম আমার চিতা।
বিরহে পোড়া একাকী রাত এখন আমার মিতা।
শুশ্রূষাগার/
এই দেখো শরীর আমার
এ যেন তোমার শান্ত শুদ্ধি নিকেতন,
এ যেন বিশ্রামাগার হে পথিক ক্লান্ত পথচারী
বসো তুমি শীতলপাটির বুকে
গোলাপ জলের ঝারি, কাঠাঁল ছায়ায়!
এই দেখো হৃদয় আমার :
তোমার দুঃখের আলোয়ান
মলিন ও পরিধেয় সব কিছু
খুলে ফেলে রাখো এই উষ্ণ আলনায়
ওই সব বিগত বোতাম খুলে ফেলো :
এই যে মুকুর আমি, চেয়ে দেখো
পথিক নিজেকে রাখো আমার ছায়ায়!
এইখানে বসো মন :
মন আমি, আমার চিরুণী
তোমার দুঃখের জটা খুলে ফেলে রাখব এখনি!
আমার উনুনে তেতে নাও
তোমার যা কিছু আছে, সুস্থ হও!
ঝুলন্ত পেরেক/
পেরেকের দিন এই
এ নয় প্রেমের দিন!
হাতে হাতে চলবার দিন নয়
এই দিন পেরেকের দিন!
ললাটে লাগাও তালা
দু’ঠোঁটে কুলুপ;
হৃৎপিন্ডে বেঁধে রাখো লালফিতে
কানে দাও সীসে!
দুই করতল ভেদ করে চলে যাক
লৌহশলাকার দেহঃ
দ্যাখো,দ্যাখো-চেয়ে চেয়ে দ্যাখো!
হায়রে উলঙ্গ শব , হায়রে ঝুলন্ত শব!
চোখ মেলে চেয়ে চেয়ে দ্যাখো!
লেবেলসমূহ:
কবিতা,
মুহাম্মদ জুবায়ের,
সুরাইয়া খানম,
স্মৃতিচারণ
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০০৯
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ
শেষ দিনটি
(বুদ্ধদেব বসুর মৃত্যুর স্মৃতি)
আমি কখনো কোনো শোক মিছিলে যাই না। শুধু, সুধীন্দ্রনাথ মারা গেলে তাঁর শবের অনুগামী হয়েছিলুম। তাঁর ছাত্র ছিলুম তথন, যাদবপুরে। বুদ্ধদেব আমাদের বিভাগের প্রধান ছিলেন তখন। তারপর অনেকেই গেলেন- প্রায় সকলেই অপ্রত্যাশিতভাবে গেলেন। নারায়ণবাবু চলে গেলেন, শান্তিদা- শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন হঠাৎ, নরেনদা গেলেন। তার কিছুকাল আগেই গেছেন বুদ্ধদেব। শেষ গেলেন অচিন্ত্যকুমার আর ঋত্বিক। এঁরা আমার চেনাশুনো, আপনার জন। আপনার জনের এই হঠাৎ-যাওয়া আমি সহ্য করতে পারি না। কিন্তু, সহ্য করতেই হয়। আমি শুধু যা পারি, তা এই শবানুগমনে না থাকা। শ্রাদ্ধশান্তিতে যোগ না দেওয়া। পালিয়ে-যাওয়া মানুষের সঙ্গে কোনো সংশ্রব না থাকুক- এই চাই।
বুদ্ধদেব নেই- আকাশবানী থেকে প্রচারিত সংবাদটুকু শুনে বালিশে মুখ গুজেঁ শুয়ে পড়েছি- তখন সকাল। জানালা-দরোজা বন্ধ করে অন্ধকার বানিয়েছি। শুয়েই ছিলাম, আমার বন্ধুরা এসে জোর করে নিয়ে গেল। যামিনী রায়ের পুত্র মণিদা ছিলেন, গাড়ি নিয়ে। তাঁর সংগে আমি আর নিখিল নাকতলা যাই। সেখানে পৌছেঁই সব মানুষের অবনত মাথা আর ফুলগন্ধ আমাকে ভীষণ জব্দ করে। তখনো তাঁর ঘুমন্ত মুখশ্রী দেখিনি। সেখানে স্তব্ধতা আর মানুষের অসহনীয় ভীড়। কারুকে কাঁদতে দেখলেই আমার চোখে জল এসে পড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন খালি-খালি লাগে। যেখানে সবার চোখে জল, মুখ বিষাদ-থমথমে, আমি সেখানে দাঁড়াতে পারি না। কেন এলুম? নিজেকে ভর্ৎসনা করতে থাকি, মনে মনে। অনহ্য এক বেদনার নীলরঙ আমার মুখে চোখে জুড়ে বসে। আমরা এক ঝলক তাঁকে দেখে, পাশে, দেবব্রতর ফ্লাটে চলে যাই। সেখানে গিয়ে অবিরাম সীধুপান চলে। গান হয়, চোখ জলে ভাসে- ওঁর সম্পর্কে কথা একেবারেই হয় না। যেন এক সমূহ দৃশ্য থেকে উদ্ধার পেতে, স্মৃতি থেকে পার- আমরা গলাধঃকরণ করতে থাকি অগ্নি। যা তাকেঁও, কিছুকাল বাদে, বৃত্তাকারে ঘিরে ধরবে। অনুমান করি।
কিছুক্ষণ বাদে স্টেসম্যান কাগজের অরণি আসেন, নরেশ গুহ তাকেঁ বুদ্ধদেব সম্পর্কে রচনা তৈরি করতে সাহায্য করেন। আমরা মাঝে মধ্যে শুনি। অরণির হাতের কাগজ পুড়ে যায় অকস্মাৎ। আমাদের মনে হয়, তিনি তাঁর সম্পর্কে কোনোরকম রচনাই চান না। আমরা ঐ ঘটনার পর, কেমন অন্যরকম হয়ে যাই। অরণি আবার শুরু করেন। নরেশদাকে বলিঃ এমন কোনো কথা বলবেন না যাতে ওঁকে আবার কাগজ পুড়িয়ে দিতে হয়!
সারাদিন আমরা আর ঐ খুপরি থেকে বেরুই না। কেউ কেউ বেরোয়। আমি, নিখিল আর মণিদা ঠায় বসে থাকি। সন্ধে নাগাদ ওরা কেওড়াতলা যায়, আমাকেও যেতে হয়। না যাওয়াই ভালো ছিল। সেখানে আমি, পরে শুনেছি, প্রচণ্ড গোলযোগ করেছি- যাতে কিছুতেই অগ্নি তাকেঁ স্পর্শ না করে- আমি এমন দাবী করেছিলুম পাগলের মতো। বলেছিলুম, ওঁর দেহ আমাদের দিয়ে দেওয়া হোক, আমরা কাছে রাখব।
পাগলের কথা কেউ শোনেনি। প্রতিবাদে সমস্ত পাগল স্থানত্যাগ করে সেদিন।
বুদ্ধদেবের সঙ্গে আমাদের যোগাযাগ প্রায় বিশ বছরের। বিশ বছরের স্মৃতি একটা সার্থক পাহাড়। এখানে সেই শেষ দিনটির সামান্য চিত্র তুলে ধরা হল।
(শব্দমন্ত্র, বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা, তারিখ নেই। ১৯৭৪?)
শেষ দিনটি
(বুদ্ধদেব বসুর মৃত্যুর স্মৃতি)
আমি কখনো কোনো শোক মিছিলে যাই না। শুধু, সুধীন্দ্রনাথ মারা গেলে তাঁর শবের অনুগামী হয়েছিলুম। তাঁর ছাত্র ছিলুম তথন, যাদবপুরে। বুদ্ধদেব আমাদের বিভাগের প্রধান ছিলেন তখন। তারপর অনেকেই গেলেন- প্রায় সকলেই অপ্রত্যাশিতভাবে গেলেন। নারায়ণবাবু চলে গেলেন, শান্তিদা- শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন হঠাৎ, নরেনদা গেলেন। তার কিছুকাল আগেই গেছেন বুদ্ধদেব। শেষ গেলেন অচিন্ত্যকুমার আর ঋত্বিক। এঁরা আমার চেনাশুনো, আপনার জন। আপনার জনের এই হঠাৎ-যাওয়া আমি সহ্য করতে পারি না। কিন্তু, সহ্য করতেই হয়। আমি শুধু যা পারি, তা এই শবানুগমনে না থাকা। শ্রাদ্ধশান্তিতে যোগ না দেওয়া। পালিয়ে-যাওয়া মানুষের সঙ্গে কোনো সংশ্রব না থাকুক- এই চাই।
বুদ্ধদেব নেই- আকাশবানী থেকে প্রচারিত সংবাদটুকু শুনে বালিশে মুখ গুজেঁ শুয়ে পড়েছি- তখন সকাল। জানালা-দরোজা বন্ধ করে অন্ধকার বানিয়েছি। শুয়েই ছিলাম, আমার বন্ধুরা এসে জোর করে নিয়ে গেল। যামিনী রায়ের পুত্র মণিদা ছিলেন, গাড়ি নিয়ে। তাঁর সংগে আমি আর নিখিল নাকতলা যাই। সেখানে পৌছেঁই সব মানুষের অবনত মাথা আর ফুলগন্ধ আমাকে ভীষণ জব্দ করে। তখনো তাঁর ঘুমন্ত মুখশ্রী দেখিনি। সেখানে স্তব্ধতা আর মানুষের অসহনীয় ভীড়। কারুকে কাঁদতে দেখলেই আমার চোখে জল এসে পড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন খালি-খালি লাগে। যেখানে সবার চোখে জল, মুখ বিষাদ-থমথমে, আমি সেখানে দাঁড়াতে পারি না। কেন এলুম? নিজেকে ভর্ৎসনা করতে থাকি, মনে মনে। অনহ্য এক বেদনার নীলরঙ আমার মুখে চোখে জুড়ে বসে। আমরা এক ঝলক তাঁকে দেখে, পাশে, দেবব্রতর ফ্লাটে চলে যাই। সেখানে গিয়ে অবিরাম সীধুপান চলে। গান হয়, চোখ জলে ভাসে- ওঁর সম্পর্কে কথা একেবারেই হয় না। যেন এক সমূহ দৃশ্য থেকে উদ্ধার পেতে, স্মৃতি থেকে পার- আমরা গলাধঃকরণ করতে থাকি অগ্নি। যা তাকেঁও, কিছুকাল বাদে, বৃত্তাকারে ঘিরে ধরবে। অনুমান করি।
কিছুক্ষণ বাদে স্টেসম্যান কাগজের অরণি আসেন, নরেশ গুহ তাকেঁ বুদ্ধদেব সম্পর্কে রচনা তৈরি করতে সাহায্য করেন। আমরা মাঝে মধ্যে শুনি। অরণির হাতের কাগজ পুড়ে যায় অকস্মাৎ। আমাদের মনে হয়, তিনি তাঁর সম্পর্কে কোনোরকম রচনাই চান না। আমরা ঐ ঘটনার পর, কেমন অন্যরকম হয়ে যাই। অরণি আবার শুরু করেন। নরেশদাকে বলিঃ এমন কোনো কথা বলবেন না যাতে ওঁকে আবার কাগজ পুড়িয়ে দিতে হয়!
সারাদিন আমরা আর ঐ খুপরি থেকে বেরুই না। কেউ কেউ বেরোয়। আমি, নিখিল আর মণিদা ঠায় বসে থাকি। সন্ধে নাগাদ ওরা কেওড়াতলা যায়, আমাকেও যেতে হয়। না যাওয়াই ভালো ছিল। সেখানে আমি, পরে শুনেছি, প্রচণ্ড গোলযোগ করেছি- যাতে কিছুতেই অগ্নি তাকেঁ স্পর্শ না করে- আমি এমন দাবী করেছিলুম পাগলের মতো। বলেছিলুম, ওঁর দেহ আমাদের দিয়ে দেওয়া হোক, আমরা কাছে রাখব।
পাগলের কথা কেউ শোনেনি। প্রতিবাদে সমস্ত পাগল স্থানত্যাগ করে সেদিন।
বুদ্ধদেবের সঙ্গে আমাদের যোগাযাগ প্রায় বিশ বছরের। বিশ বছরের স্মৃতি একটা সার্থক পাহাড়। এখানে সেই শেষ দিনটির সামান্য চিত্র তুলে ধরা হল।
(শব্দমন্ত্র, বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা, তারিখ নেই। ১৯৭৪?)
লেবেলসমূহ:
শক্তি চট্টোপাধ্যায়,
স্মৃতিচারণ
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
