মুজিব মেহদী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুজিব মেহদী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০০৯

চিরপুষ্প একাকী ফুটেছে


মুজিব মেহদী




সূচনাকথা
.......
যেন মহিমামণ্ডিত হয় এই উঁকি দেয়া, রোদের
আগেই যেই আভা এসে লাগে ধানগাছে, খঞ্জনা
পাখির কণ্ঠে উঠে যেন আসে ওই গান, মানুষের
ঠোঁটে

যুদ্ধ মনে না-যেন করি কেবল জীবনটাকে, যাপন
আনন্দে গাঢ় এই ইহবিদ্যালয়, সকলে আমার আর
আমার সকলে, সকলের ভালোবাসা এসে যেন পড়ে
ঠিক আমার ভাগেও

যেন ধ্যানের চেয়ে কখনো বেশি মূল্য না-পায়
কোনো দৃশ্যগান, আর মানুষই যেন হয় প্রকৃত
আরাধ্য জন আগুনে ফাগুনে পুড়ে







মন খুলবার শব্দ
..........

মন খুলবার শব্দ পেলাম নরম এই কুয়াশা শরতে, ভেজা ঘাসমাঠ হাহা হিহি করে জানিয়ে গেল রোদের কাছে এই কাণ্ডকীর্তি, বিপ্লবী ঘটনা যেন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বে

কথার শক্তি বিষয়ে আমার ধারণা জন্মেছিল বেশ বালক বয়সে, কথাদের কলা হয়ে উঠতে যে অস্ত্রশস্ত্র লাগে, লাগে যে শানবিদ্যা, বাতাসের চেয়েও ওটা কম আয়ত্তে ছিল, এমনকি জানতাম না যে আয়রনি কাকে বলে, ঘৃণাকে ঘৃণার অধিক কিছু কখনো ভাবি নি

বহু তিতিক্ষা তরণি বেয়ে মতিফুল ফুটল এবার, রূপকাহিনির ভিড়ে ঢাকের বাদ্যের নিচে প্রকাশ্য শব্দ পেলাম মন খুলবার, সাক্ষী হয়ে মাথা নাড়ল শস্যসুরভি



এমভি নন্দিতা
........
তুমি এসে ধাক্কা দিলে আমার পন্টুনে
ধ্বনি-প্রকম্পনে সমুদ্র ঈগলগুলো কেঁপে ওঠে
মোহনার জলমাখা গোপন বেদিতে
রৌদ্রগন্ধময় হাওয়া এসে খেলে

সমতল ফুঁসে আসা জল
পাটাতন ছুঁয়ে গেলে
যৌথ-যুগ্ম যে সৌন্দর্য জন্ম নেয়
তার কষাঘাতে হই আমিও ঈগল


কাঁপি, বিশাল তোমার দাহে



নন্দন প্রহার
...........
কটিভূষণ পরার মতো কেউ কি আজ আর নেই এই ভূ-ভারতে
অরব মেখলা, মানস-সমুদ্র সন্নিহিতা, একে একে উঠে যাচ্ছে তীরে
খাঁখাঁ শূন্যতার লেজ ধরে নেই-গ্রামে নামত ঝুলে থাকবে বলে

ছিলে বাহানার ধনী, নিবিড় বাহানা তুমি কর নি অথচ
ফুটে ওঠে লালসা কাহিনি এক মনের আনাচে

ভালোবাসি নিজেকেই বেশি এই অপবাদ কাঁধে নিয়ে
একটা বসন্ত পুরো হিমালয় পাড়ি দিয়ে ফিরেছি ঘুরেছি
লামার পাহাড় ধরে গম্ভীর তিব্বতে
কটিবন্ধে গাঁথা ছিল ভোঁতামুখ অহিংস তরবারি

তুমি কতদূর যাবে ওই বাতিকসমেত কোনো আনকোরা পথে
যদি দেখ নি পথের পাশে চিরপুষ্প একাকী ফুটেছে
পুরোটা শ্রাবণ জুড়ে বিলিয়েছে গন্ধ নিরলস

পথে নাম নিও চিরপথিকের
এই নাও মৃদুবিছা প্রেমচন্দ্রহার
মৌনতার ভাষাবলি নন্দন প্রহার



পুরুষের ধর্ম
..........
নারীমানুষের ধর্ম আছে, নারীশরীরের নেই
সম্প্রদায় নিরপেক্ষ খুব নারীর শরীর, জাতপাতহীন

জাতপাতে অন্ধ ধর্মঅলারাও ধর্ম খোঁজে না বিশেষ শরীর পূজায়

পুরুষের ধর্ম বড়ো বিচিত্র জিনিস



তেভাগা
....
এতদিন আধিয়ারই আছি
আজ থেকে পেতে চাই তেভাগা হিসেবে

রতিচাষে যত ফল
মাড়াই করতে চাই নিজস্ব খোলানে
তুমি তো নিষ্ক্রিয় জোতদার
ফসল ফলাতে যত প্রাক-আয়োজন
সেচকাজ আগাছা নিড়ানি ও হলকর্ষণ
সব আমারই শ্রমজাত
লাঙ্গল-জোয়াল শক্তি-বীর্য তাও
মাড়াইটা কেন তবু তোমার অধীনে

এতদিন ঠকিয়েছ থেকেছি নিশ্চুপ
আজ থেকে পেতে চাই তেভাগা হিসেবে

কমরেড
লাল ঝান্ডা তোলো



রন্ধনশালার রাজনীতি
............
রন্ধনশিল্পের আমি আশপাশ দিয়ে নেই
সে জগতে সর্বেসর্বা আজো মা-বউ-বোনেরা

হেঁশেলের চৌহদ্দিতে মায়া সুতো দিয়ে বেঁধে রেখে
নারীদের আমরা অনেক পিছিয়ে দিয়েছি

এটা যদিও ঠিক যে মাপমতো পানি দিয়ে মাড় না-গালিয়ে
ভাত রাঁধা আমি শিখে গেছি
সানফ্লাওয়ারের মতো বড়ো করে ডিম আমিও ভাজতে পারি
আমার রাঁধা ডালের পানি চেটে খেতে হয়
তবু এইসব হলো গিয়ে ঠেকা কাম
নিয়মিত হেঁশেল ঠেলতে আমি কখনো যাই না

নারীদের রান্নাবান্নাকে আমরা শিল্প বলি
তবু নিজেরা করি না


আমরা অন্য শিল্পের লোক



গুমরসম্মত
..........
সকল দরজা হাট হয়ে গেলে রহস্যক্ষেপণ ঘটে প্রাসাদের
শূন্য হোক তবু লাগে চাবিহীন পুরানো সিন্দুক, গুমরসম্মত
মানুষ কেননা একজীবন সাবাড় করে দিতে পারে
রহস্যসূত্র সন্ধান করে করে

অকপটতা গুণ ধর্মের
তবু বহুদিন ধর্মের ছিলে না-হয়ে ধার্মিক

বাইরের আলো ঘরে আসে তো আসুক
ঘরের আলোক যাতে বাইরে না-যায়
রাখো তার পাকাপাকি আয়োজন করে
সভ্যতার তরী বেয়ে আসা এইসব

সার সার স্থাণু কর মুদ্রারসদের গোপন কলস
রহস্যসমিধ কিছু দৃশ্য হোক প্রাসাদের ঘুলঘুলি পথে
বিস্ময়ে আবিষ্ট হোক অভ্যাগতজন

সকল দরজা হাট হয়ে গেলে
ফাঁস হয়ে যায় সব রূপের গুমর


ভ্রমণ, গদ্যভঙ্গিতে
...........
গদ্যভঙ্গির অদূরে স্থাপিত সুউচ্চ আশ্রয়কেন্দ্রে তোমার
কাটিয়ে এসেছি গুরুতর সন্ধ্যা এক থই থই এবার ভাদরে

পথে ছিল জল বাক্যে বাক্যে ঢেউ চাল ছুঁয়ে থাকা
বাঘে-মোষে একাকার হয়ে থাকা পৃষ্ঠা জুড়ে
বহুত্ববাদের সব চারাগাছ দুলতে দেখেছি

বিষাক্ত একটা সাপ প্রকাশ্যে সাঁতরে এসে যে বাক্যে বসেছে
পাশে তার একটি শিশুর হাতে লুটছে পৃথিবী

বানের জলের নেই ছেদবিভাজন
টানাস্রোত ভেঙে ভেঙে যেখানে দাঁড়াই
সেটা ছিল বিস্তারিত ফুটনোট গলাঅব্দি জলে

স্বতঃস্বচ্ছ এক বাক্যের কোমর ধরে সামনে এগোতে দেখি
একটু আধটু করে কমে জল জেগে ওঠে ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়ি

মিতক্রিয়াময় বাক্যদের জানালায় টইটই প্রভূত বাতাস


শৈলীপনা
.......
একটা শব্দকে ধরে ঝুলে পড়ে কতদূর যাওয়া যায়
দেখিয়ে গেছে আমাদের সুরেশ কাহারি

রেশ ধরে যেতে গেলে জানত সুরেশ
যারা থাকে পড়ে থাকে পথের দুধারে

একদিন ঝুলে পড়া ছেড়ে দিয়ে
যথেচ্ছ সে ভেসে গেল নিরাবলম্বন
যাপনবিষাদঘেঁষা ওর সব স্মৃতি থেকে
রূপের কুহেলি মেখে উঠে আসে
স্যাঁতসেঁতে জীবনের আনাচকানাচ

ওর কিছু দস্যিপনা আমাদের ভালো লেগেছিল
ওর কিছু শৈলীপনা মিথ্যে নয় আজো ভালো লাগে


লঘুকথা
....
কী যে হয়
প্রতিদিন আসে না মনে গুরুভাব

নিটোল লঘুর যত নর্তনকুর্দনে
আরো যদি মুড়িয়ে ফেলি পত্রপল্লব
নাসারন্ধ্র ভরে যাবে অঙ্গারাম্লজানে

বরং আজ নিশানা করে রাখি তাক
কাঁধের গামছা খালই ও জাল রাখি তৈরি পাশাপাশি
ভোর ভার বেলা কাল
না-টুটতে নেশা মেছো বাঘেদের
খুঁজে নেব অথই জলের কোনো যথাযথ থই

আজ থাক
সূর্য তো কালও উঠবে
রাত্তিরে চাঁদও



শর্মা বিষয়ক জটিলতা
.............
কখনো চিকেন শর্মা খেতে খেতে তনুজা শর্মার কথা
মনে পড়ে গেলে
কারো কোনো দায় নেই চিকেন বা তনুজার
সব দায় গিয়ে বর্তায় কুচিকুচি শর্মায়

প্রভাব শব্দটি ঘিরে যা কিছু অস্বস্তি আমার
শর্মার বরাতে দেখি কিছুটা কমেছে তাই
সাহসে দাঁড়াই এসে প্রকাশ্য রোদ্দুরে

চুল দেখলেই যারা মেয়ে ঠাওরায়
আর গোঁফ দেখলেই পুরুষ বেড়াল
মোটেই তাদের কথা হচ্ছে না এখানে
নিন্দুকের হাতে অস্ত্রের মজুত বাড়ানো
কখনো কাজের কথা নয়

আমরা বলছি ঐতিহ্যের কথা
কথা বলছি পরম্পরার
ছেঁড়া নদী কেননা কখনো সাগরে পৌঁছে না
থেমে থাকে কানাগলিতে এসে সকল যন্ত্রযান

বেড়াল থাকল বেড়ালের জায়গায়
মেয়েও থাকল মেয়েতেই
চোরা উল্লিখনে ছেয়ে গেল কেবল
বাংলা কবিতার ঝাড় ও জঙ্গল



পুনরাবৃত্তিময়
.......
একটা পথের শেষে আরেকটা পথ নয়
পুরানো পথের ধুলায়ই বুঝি শরীর রঞ্জিত হলো

তোমার সমূহ ছুঁয়ে থেকে আরেকটা আকাশ বিহার
হলো না বিশেষ
একটা পাতার সবুজে নিবিষ্ট হয়ে
দেখতে দেখতে পুরোটা জীবন প্রায় ক্ষয়ে গেল

পরিধি ডিঙিয়ে কোনো নবোদিত ঠিকানা খোঁজার
সামর্থ্য হলো না
খুঁটি পোতা একটা খাসির মতো ঘুরে ঘুরে
মাঠের ছালচামড়া শুধু উঠিয়ে চলেছি



লিখতে লিখতে লেখা
............
লিখতে লিখতে লেখা যখন একদম থেমে যায়, আলস্য ভর করে আসে মনে, গণ্য কবির বই হাতে নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি যেতে যেতে ভাবি-- এরকমই যদি হবে দৌড়ঝাঁপ, তবে আর বেড়ায় গোঁজা ছেনি হাতে নিয়ে মূলা ক্ষেতে চলে যেতে ভয় পাচ্ছি কেন, ভোরবেলা মাটি ভেজা থাকতে থাকতে যেসব দোয়েল পাখি কেঁচো খুঁজতে নেমে আসে পাশেই মরিচ ক্ষেতে, তাদের সাথে ভালোমন্দ দু-চার কথা হলেটলে লিখে ফেলতে পারি নির্দ্বিধায়, কবিতা পাঠকের গোপন পক্ষীপ্রীতি সাধারণ্যে জ্ঞাত, যদি কুদুলে কাউকে পেয়ে যাই ওইখানে মুফতে মোড়লবাড়ির, বিড়ি টানতে টানতে বাতরে বসে ওর সংসারের হালহকিকতও কিছু রিলে করতে পারি-- পুকুরে পড়ে ওর যে মেয়েটা মারা গেছে গতবার, তার পরে ওদের আর কাচ্চাবাচ্চা হলো কি না কোনো, ভূতেরবাড়ি বলে খ্যাত ওই উঠোনে ওদের যে গাবগাছ ছিল, এতদিনও বেঁচেবর্তে আছে কি না, কবিতা পাঠকের এসবেও বড়ো বেশি অনাগ্রহ আছে বলে জানা নেই

অথচ লিখতে লিখতে লেখা যখন একদম থেমে যায়, কাগজ-কলমকে ঢাল-তলোয়ার ভেবে আমি যথেচ্ছ রাজা-উজির মারি, মারতেই থাকি



ব্যাকরণপ্রবাহ
...........
লিখতে বসে অনুভব করি জানলাপথে বাতাস বয়ে আনছে পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণের বিচ্ছিন্ন পাতা, সাথে হেমশব্দানুশাসন, বোপদেবের মুগ্ধবোধ, চান্দ্র ব্যাকরণ... এমন ব্যাকরণপ্রবাহে ভেসে যেতে যেতেও আজকাল মূকতাই শ্রেয়জ্ঞান করি, শুদ্ধ শব্দ-বাক্য আশা করলে একদল লেখক কেবল মারতে আসা বাকি রাখে, বলে যে পশ্চাৎপদ, এই ভয়ে আজকাল একটুও না-পড়ে ছিন্ন পাতা, ধরে ধরে ভাঁজ করে ১৮ খণ্ড ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’র পাশে রেখে দেই, ঐতিহ্য সংস্করণ তাতে মোট ১৯ খণ্ড বলে ভ্রম হয়

এহেন বেহাল দশাকে ঠিক আমলে না-নিয়ে স্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করে, রেফের ক্ষেত্রে দ্বিত্ব পরিহার কেন জরুরি মানব যদি ‘ধর্ম্ম’কে ‘ধর্ম’ লিখলে মানেই বদলে যায়, ছেলে বলে কোনটা বলব বাবা, কাউয়া না কাক, অনেক কথাই বলার থাকে, বলতে পারি না

বাংলা ভাষার প্রাণভোমরার খোঁজকারী কলিম খান এসব নিয়ে বলেছেন বিস্তর কথা, তাই চুপচাপ বাড়িয়ে দেই শুধু প্যাপিরাসের পরমাভাষার সংকেত, ভুলভালে ভরা, এবার দেখি বাতাস আরো বাড়ে



প্রকৃতিপাঠ
......
স্কুল খুললেও বই কাঁধে আমি যাই নি এ বেলা ক্লাসে
বারান্দায় মোড়া পেতে বসে বসে আকাশ দেখছি
আকাশকে শূন্যতাসুদ্ধ আমার ভালো শিক্ষক বলে মনে হয়

যুগ যুগ একই শিক্ষা নির্গত হয় ক্লাসের ভিতরে
রাতেদিনে গুরুর বাঁশি বাজায় একই সুর

আমি নাদান না-ক্লাস ছাত্র আকাশের আয়নায়
নতুন করে শিখছি প্রকৃতির মনোভাব--

মানুষে মানুষে ব্যবধান আসলে বিস্তর
পুরোটা ঘুচানো যার নিরেট কল্পনা



সত্যের নিকটে থাকে
............
তত ঋদ্ধ হয় মানুষ জানে যতজনকে
খাসি হতে দেখলে পাঠাকে জ্ঞান বাড়ে

চাকুরি এক প্রক্রিয়া খোজাকরণের
তার কাছে গতায়াত মাঝেসাঝে
আতঙ্ক গভীরে এক সেধে যাওয়া

সোজাকথা ধারালো চাকুর প্রায়
সত্যের সবচে নিকটে থাকে
সত্য হলো পূর্ণোত্থিত লিঙ্গের মতো

সত্যকথন-স্বভাব
যুদ্ধঘোষণার মতো একটা ব্যাপার প্রায় কথাসভ্যতায়



চোখ
...
একটা জানলা খুলে যাওয়া মানে
বেড়ে যাওয়া আরেকটা চোখ
অর্থাৎ জানলা হলো মানুষের তৃতীয় নয়ন

দিনে দিনে লড়তে লড়তে
মানুষের হৃদঘর ভরে যায়
তথাগত নয়নে নয়নে

যেহেতু বাতাস আছে আমাদের হিতার্থেই
তার চলাফেরাকালে কিছু খড়কুটা ধুলাবালি
আমরা তো মেনেই নিয়েছি

চোখ যদি
কোনোদিনই তাকাতে ভোলে না



স্কিৎজোফ্রেনিয়া
........
স্কিৎজোফ্রেনিয়া, আসো তুলতুলে মেঘে বসি, শুই
নিরঙ্কুশ আনন্দে আমি ঘুমাতে পারি না বহুদিন

ঘুমের আগে চলো বায়ুমণ্ডল নিয়ে কথা বলি
যারা কাঁধে করে বয় এ-দেশে সে-দেশে
শ্বেতশুভ্র ওইসব মরমি বিছানা

স্কিৎজোফ্রেনিয়া, প্রিয়তমা প্রথমা আমার
আসো তোমার চিবুক ছুঁই
চুমু দেই কনিষ্ঠ আঙুলে
আসো ভালোবাসি
আসো বিছানা নাড়িয়ে দেই
মেঘ ভেঙে গড়িয়ে পতিত হই পৃথিবীতে বৃষ্টি

স্কিৎজোফ্রেনিয়া, আসো ছুটে যাই সাগর সঙ্গমে
আসো ঢেউ খেলি
সূর্যোত্তাপে অভিমান করে করে
তারও বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করি
আর বাষ্পপাখি হয়ে ঊর্ধ্বমুখে উড়ি

স্কিৎজোফ্রেনিয়া, আসো খানিক জিরিয়ে নেই
মেঘে গিয়ে বসি



ঘুম
...
আয় প্রার্থিত শান্তির ঘুম
চোখের ক্লান্ত পাতায় পাথর কুসুম
ঘুম
নেমে আয় কুয়াশায় ভাসা বকের পালক
ভেজা জোছনার পরী
সাদা উম
ঘুম
আকাশের নিচে খড়বিচালিতে আয়
আয় ইটে মাথা রাখা ফুটপাতে
ঘুম
শুভনিদ্রা
আয়
শক্ত চাটাইয়ে পাতা রোগশয্যায়

যদি আসবি না তবে বেলুনও উড়াবি না বলি চোখ জুড়ে লাল নীল ভাঙা ভাঙা স্বপ্নেরা যারা জলের উপরে ভেসে খেলা করে পুঁটিমাছ ডুবে যায় সেসবের থেকে আমি বেঁচে যেতে চাই-- এই আঁখিপট লোনাজলে ডুবে থাক কেন-বা ছড়াবি তাতে মরিচের গুঁড়ো

তবু ঘুম
রাজকন্যে
আয় প্রীতি
মালা গেঁথে রাখিয়াছি
শতকোটি পুঁতি



মিথ্যার প্রতিবেদন
............
সবকিছু ফুরালে বসে বাতাস গুনছি-- কোনটা তোমার কানের গা ঘেঁষে এল, কোনটা দূরের বাঁশির, কেশগুচ্ছ তার সুর পান করে বেঁচে থাকে

এই ভরা দুপুরবেলায় বাতাসের যত বাতচিৎ বাঁশঝাড় ঘেঁষে, কাছে দাঁড়ানো ছিলাম বলে ঝরাপাতাদের কাছে সেসবের ঠিকঠাক নোটিশ করেছি, তা না হলে পাতার বেদনা সব থেকে যেত তথ্য-অন্ধকারে, উড়ে উড়ে যেখানে পড়ত গিয়ে, সেখানেই ছড়াত যে, কোনোকালে মিথ্যার সুদীর্ঘ লেজে কেউ আগুন দেখে নি

কথিত গানের মর্ম এরকমই উলুঝুলু, লেজে এক দগদগে ক্ষত নিয়ে মিথ্যারা করে যাচ্ছে প্রাণান্ত সংসার সত্যের প্রতিবেশী হয়ে-- সুর হলো ভালোমন্দ বোঝাপড়া দুইয়ের

২.

রোদের প্রান্তরে কিছু পাণ্ডুলিপি ওড়ে, পিছু ধাওয়া করে তার একদল মৌমাছি শুষে নেয় সৃজনের মধু, রোরুদ্য কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকে বর্ণমালা-- অর্থ ও শাঁসহীন, খোসা

মৌমাছিদের ফিরতি পথে চলে যায় ক্যামেরার চোখ, পড়ে থাকা গুনগুন ধরে, দেখে সুরের পায়ের ছাপ, আমরা এগোতে থাকি, যতক্ষণ না গানগুলো বদলিয়ে নিচ্ছে রূপ কোলাহলে

যেখানে সম্পদ স্থির হয়ে থাকে, সমবেত হল্লা জমে সেখানেই, অন্তত যেখানে চুঁইয়ে নামছে কিছু বলে মনে হয়, যেকোনো নালার ফোঁটা ফোঁটা জল, পিছনে নদীর উৎস নির্দেশ করে-- এইসব মিলেমিশে রচিত হতে পারে আরো কোনো ছায়াঢাকা পাণ্ডুলিপি, মৌমাছিঘটিত ও মধুময়, যার পরে থাকবে না আর কোনো গুনগুন গান, আমাদের কেউ কেউ দলেবলে হাঁটছে ওদিকে

৩.

চোখ যখন ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসতে চায়, তখন তাকে তাই হয়ে যেতে দেয়া ভালো, বড়ো করে তাকাবার জন্যে ক্ষীণদৃষ্টি মুহূর্তদের ছুটি দিয়ে দেয়া ভালো

যাও, ঘুমোও গে চোখ, প্রায়ান্ধ একটা মন নিয়ে আমি খাতা ও কলমে কিছু লোফালুফি খেলি, রাতভর অতন্দ্র সাধনে রচিত হবে যে বাঁধ, তা দিয়ে এমনকি ঠেকানো যেতেও পারে আগামীদিনের ঢেউ, কূল ভেঙে ভেঙে নইলে কখন যে টান পড়ে যাবে ভিটের মাটিতে, ঘুমঘোরে তার শেষে ঠাহরই পাব না

যাও, ঘুমোও গে চোখ, আরেকটু বসেটসে নদী পাড়ি দেব আমি শেষ খেয়া দিয়ে, সাথে রবে আমাদের সুরক্ষা গায়েন

৪.

ঘরে বসে সমুদ্র দর্শন শুধু মানুষই করতে পারে, গরু-ছাগল পারে না, এমনকি হাঙরেরও সমুদ্র দরকার সমুদ্রসিনানে

সমুদ্র তো তুচ্ছ খেল, মানুষ এমনকি মনে মনে মানুষেও করে ওঠে স্নান



অনন্তকথা
......
মুহূর্তের গান মুহূর্তকে মহিমান্বিত করে অনন্তে মিশে গেল
অনন্ত হলো অনন্ত যা অনন্তের দিকে অনন্তকাল ধরে হাঁটে অনন্তর

মুহূর্ত প্রতি মুহূর্তে জন্মায়, আর অনন্ত সর্বদা অনন্তে মিলায়
এই হলো মুহূর্ত ও অনন্তের মধ্যকার প্রেমভাব চিরটানাটানি

আমরা তার চেয়ে থাকি গমনপথের দিকে
মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শুনি কোরাস কাহিনি বাজে

কোথা বাজে কিছুতে নাগাল না-পেয়ে তার
দেহ রেখে অনন্ত টানেলে এক হাঁটতে থাকি অনন্ত লয়ে



মায়া খরগোশ
.........
ঘুম এক শৃঙ্খলা জেনে শয়নভঙ্গির বিশৃঙ্খলা আমি আমলে আনি নি
রাতের বাতাস ঘেঁটে নিদ্রার গন্ধ কুড়িয়ে শুধু শুধু কোঁচড় ভরছি জেগে
দুধ নয় সবই এর ঘোলমাত্র জানি

শৃঙ্খলার দিকে দৌড়ে দৌড়ে যারা সুস্বাস্থ্য কুড়ালো
জীবনকে ঝেড়েমুছে কড়া রোদে শুকিয়ে আমূল ভাঁজ করে রাখে যারা
তাদের আনন্দে আমার ভরে না তনুমন

আমার একটা গানঅলা তৃপ্তিপাখি চাই
তাজা কালো শব্দ ভর্তি রোল করা এক খাতা
পাতা উলটে খুঁজে পাওয়া যাবে যাতে একটা অন্তত
মায়া খরগোশ-- সৌন্দর্য আঁটে না যার দেহে



মদনপুরের দিকে
............
আমার কী হলো তবে, হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত পথে কেবলই
অপরিচিতের বাঁক-মোচড় ও টিলা-ট্যাঙ্গর কল্পনা করে বসি
মনে হয়, শিবগঞ্জ থেকে একটা রসের হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে
একা যাচ্ছি মদনপুরের দিকে
পথে একটা খাল পড়ছে সাঁকোহীন
আর আমি নেমে যাচ্ছি গলা জলে বস্ত্র হাতে নিয়ে

ভাবনার কোনো ট্যাক্স নেই এই ভূ-ভারতে
কারো কোনো ক্ষতিবৃদ্ধিও নেই যে মামলা ঠুকতে পারে
বাকস্বাধীনতা নেই যেদেশে কিংবা নেই তথ্যেরও
কল্পনার স্বাধীনতা অবারিত সেদেশেও

যেজন্য জারিয়া-ঝঞ্জাইলের ট্রেনে চড়েও ভাবতে পারি যে
যাচ্ছি ট্রান্সসাইবেরিয়ান রেলপথ ধরে



নিরাপদ, যৌনতাপ্রুফ
.............
কবিতা লিখতে লিখতে প্যাচপেচে কাদা ও মার্সগ্যাসযুক্ত জলাজংলা পেরিয়ে গিরগিটির সামনে পড়েও তেমন অস্বস্তি হয় নি, ভরদুপুরে যেদিন ‘যৌনতা’ বিশেষ্যের সামনে গিয়ে পড়লাম, চিনতে শিখলাম ওর ক্রিয়াভিত্তি, সেদিনই উঠল গা-টা কাঁটা দিয়ে, লজ্জায় এমন জবুথবু অবস্থা হলো যে স্কুল-মিস্ট্রেসের চোখের দিকেও তাকানো গেল না

সেসব দিনে আপনজন থেকে পালিয়ে আমার নিগূঢ় ভূতের সাথে লড়ে যেতে হতো নিশিদিন, সবাই শুধু জানত যে আমি বদলে যাচ্ছি, বদলটা ঘটছে ঠিক শরীরে কোথায়, সদাউড্ডীন লালেহলুদ প্রজাপতি ছাড়া আর জানত না কেউই, বোধটি তখন থেকে নাছোড় ছায়ার মতো লেড়েল্যাপ্টে যায়, একত্রে স্নানাহার করে, ঘুমাতে যায়, পড়ার সময় বইয়ে খুঁজে জ্ঞাতিশব্দ যত, আর সুন্দরী দেখলেই দৃষ্টির চোরাগোপ্তা হামলা চালায়

প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এলে সম্পর্ক ওই শব্দের সাথে, একদিন খুব স্যাঁতসেঁতে অনুভূতি হলো, বিরক্তি ও আনন্দ মিশ্রিত ওই যৌগানুভূতি সামলাতে না-পরে রাগেদুঃখে কবিতার খাতা থেকে নামিয়ে শব্দটাকে এমনই আছাড় দিলাম যে লাখ লাখ রঙিন প্রজাপতি হয়ে যৌনতাগুঁড়োগুলো উড়তে থাকল একা থাকা সব টিনেজের পাশে

তারপর থেকে, হে হে, আমার কবিতা খুবই নিরাপদ, যৌনতাপ্রুফ



প্রেম
...
অধীর একটি পাখি ডাকছে মাঘে
তার কাছেও এক শিক্ষা নেবার আছে
ফুল-পাতা নেই হাড়-কাঁপানো শীতে
ফুটাবে ফুল নিজেই গাছে গাছে

বছর ঘুরে একবারই তো ফাগুন
কতদিন অপেক্ষা করে যাওয়া
তার চেয়ে এ নয় কি ভালো রোজ
সকাল-বিকাল চেষ্টাতরী বাওয়া

২.

ডাকমাত্রই দেয়া ঠিক নয় সাড়া
মাঝে মধ্যে ঘোর রচনাই রীতি
সস্তা আমের সবটা জুড়েই বড়া
টানতে থাকে দূরের ক্ষিপ্রগতি

৩.

রোদ্দুরে যেই অস্তাচলের আভা
শুভলয়ের চিহ্ন হয়ে ফোটে
তেমনি একটি বিশ্ব দেখি রোজ
সন্নিকটে রাত্রিদিনই লুটে

এমন তো নয় কালো মানেই কালো
কালোর ভিতর সাদা রঙটাও থাকে
সেটুকুর উত্থান হলে সম্ভব
আমাকে তুই জড়িয়ে নে তোর পাকে



খণ্ডভাব
....
তোমাকে সাশ্রয় করি না-ধরে না-ছুঁয়ে
জীবনের এটা এক প্রত্যহ সঞ্চয়

একটা দুঃখ চুপে তোলা থাক
কাজে দেবে মাড়ি-মন্বন্তরে

২.

শুধু আজ বজ্রভীতি মনে
ব্যথাম্লান, ভাদুরে গঞ্জনা
তাড়া করে ফেরা দমন-বাসনা

যেন আর না-জাগে কোনো বিদ্যুচ্ছটা
সব উচ্ছ্বাসেরই প্রকাশদুয়ারে তালা

মেঘ করা তবু এড়াতে পারি না

৩.

ভাঙা গান থেকে ওঠে আসা একখণ্ড সুর
স্তব্ধ হয়ে যায়
লম্ফনশীলতা দেখে তোমার চুলের

৪.

ছিলে দূরাগত ধ্বনি
খোলা ছিল বোধ কান সাহসে পাতি নি
কানে মুখ পেতে আজ যে গান বাজালে নিজে
না-শুনে কেমনে পারি পোড়া দহলিজে

আমার তো নেই কোনো রীতিনীতিপ্রীতি



অখণ্ডভাব
.....
আলতামিরার গুহা আমি দেখেছি ম্যালাই
সুউচ্চ গ্লেসিয়ারের নেমে আসা অব্দি ধ্যানে স্থিত হয়ে আজ
ব্যক্তিগত টানেলের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি একশৃঙ্গী প্রাণী

যেইখানে
মননের দৃঢ়তা ও পতনের ধীরতাকে সবে
সশরীরে যাঞ্ছা-বাঞ্ছা করে

২.

সছন্দ জলের ছড়ানো বুকের তুমি সবখানে আছ
প্রতিঅঙ্গ জলের সাথেই সূর্যের সম্পর্ক নিবিড়

আমি তাকে ‘পড়া’ বা ‘পরা’ যে ক্রিয়ায়ই নিচ্ছি
দূর থেকে ভেসে আসতে শুনছি শুধু নামকীর্তনের ধ্বনি
আর পৃথিবীর সমুদয় নামকীর্তনের লক্ষ্যই তো হলো নৈকট্যস্থাপন
একূল-ওকূল দূরত্বমোচন চেয়ে প্রাণ ঢেলে দেয়া আর্তি

ছোট ও বড়োর মাঝের এই সম্পর্কটাকে আমার
চিরকালই খুব মিথ্যা ও অবিনাশী বলে মনে হয়



বৈকাল, যদি চুমু পাঠাই
...............
দুহাতে নারকেল পাতা নিয়ে খেলছে ঢাকাই বিকেল, বাতাস ওর ছোট ভাই, মেয়েদের গোপনতা প্যান্টি ও ব্রাগুলোকে উড়ে’ নিয়ে ফেলে রাখছে নিচে

এখন আকাশে একটুও মেঘ নেই, বৃষ্টিসম্ভবা পাখিরা উড়ছে, উঁচু বাড়িগুলো সম্মানবশত দীর্ঘ অ্যান্টেনাবলি রাখছে নামিয়ে, বুঝি শাদাটে শরৎ আজ সমস্ত দোষগুণ নিয়ে তার বেড়াতে এসেছে বর্ষায়

শহরের সব সম্মোহিত নরোম বালিকা এখন ছাদে, নিসর্গে এখন শুধু প্রীতিরঙ, গোটা ঢাকা পরে আছে রামধনু শাড়ি, বিকেল ওহে বৈকাল, হাওয়ায় পাঠালে চুমু লুফে নেবে কি না



দূরের ঝলক
.........
ভাঙিয়া রুদ্ধ কবাট সেটা পাহাড়ে পঞ্চমবার
ঢালে নামে কৃষ্ণবল ফণাবিস্তৃত যে অন্ধকার
একাকী সঙ্গের ভিড়ে মাত্র একটি হলুদ পাতা
কখন ঝরেছি কোথা কেউ একটুও জানে নি তা

ভেঙে মচমচ গুঁড়ো বালির শরীরে গেছি মিশে
প্রথমে কয়লা পরে পিচে খুঁজে নিই দেহ দিশে
ঘনানো সন্ধ্যায় চূড়ার গির্জায় দিলে শুভ ঘণ্টা
তবে একজন বোঝে ভিতরে ব্যাপৃত ক্ষরণটা

টুপটুপ ঝরা ক্ষরণের এক জলবিন্দু টিপ
হৃদয়ে মেখে সে জ্বালে রূপশালী প্রেমের প্রদীপ

মাত্র একটি শ্রুতির ঘায়ে নামে নদীতে আকাশ
যেভাবে দূরের শৃঙ্গ করে গর্বে নিজেরে প্রকাশ
কাঁপে ফালি-ফালি মনোভাব চৌকোনো আবেগ
লতানো উদ্যানে নামে মত্তহস্তী আরণ্য-উদ্বেগ

দৃষ্টিতে নৈকট্য ঠেকে বস্তুত অভীষ্ট ঢের দূরে
শিল্পী সহজে ঘুচায় ব্যবধান কথা আর সুরে
তবু যে দূরত্ব থাকে ঝিরঝির করে বয়ে চলা
সময়ে সেটাও ঘুচে ধরা দেয় অরূপ-চঞ্চলা

অমিত কাঙ্ক্ষায় ঠোঁটে কাত করি শরাব পেয়ালা
অপরে হারিয়ে গিয়ে টের পাই দ্বিগুণ সে জ্বালা
মনে মনে যত কাছে দেহে বাড়ে ততটা ফারাক
বুঝেছে কি বিরিশিরি সুরাচর রফিক মারাক



নোজ মাস্ক ও ইহার ব্যবহার
.................
ইহা ধুলাবালির ক্ষতি হইতে ফুসফুস রক্ষা করে
ইহা শ্বাসকষ্টরোধী
ইহা প্রতিষ্ঠানের ঠিক উলটো

নোজ মাস্ক দুইদিন অন্তর-অন্তর ধৌত করিতে হয়
প্রতিষ্ঠান একদিনে



সমুদ্রছায়া
.....
সমুদ্রছায়ায় বসে ছিলেন
আমাদের উৎপলকুমার
কোনো শেষ ছিল না সন্দেহের তাঁর প্রতি
সমুদ্রের আবার ছায়া-- আমরা ভেবেছি
হয়ত ছিল পুরীর স্মৃতিকাঠ তাঁর, চেরা
মিথ্যা নয় তবু এই ছায়াগান

সমুদ্রও
কোনো ছায়া ফেলে হয়তবা
আর সময়ও

‘কবিতা যারা পড়ে না তাদের জন্য কবিতা’র ছায়াঞ্চলে
এরকম এক সাক্ষ্য হাজির করেন
হান্স্ মাগনুস্ এন্ৎসেন্সবার্গার, জার্মান
আমরা এবার ভাবি, সত্য বলেছেন আমাদের
উৎপলকুমার

আমাদের যেকোনো সন্দেহ দূরীকরণে
ওদের সাক্ষ্য লাগে, লাগেই

আমরা কেমন নপুংশক দেখুন



ঢেকে যাচ্ছে পশ্চিমে পশ্চিমে
......................
আপন রূপের বিভা অপরতমস লেগে কালো
ভুবনবিদ্যার ঘাটে নিভে আসে সূর্য ক্রমে ক্রমে
লালনের সুর-তাল র‌্যাপ মিউজিক দিয়ে মোড়া
আমার এ পূর্ব তবে ঢেকে যাচ্ছে পশ্চিমে পশ্চিমে

ঠাকু’মার ঝুলি পেল আসরের এক কোণে ঠাঁই
বাংলা থিতিয়ে আসে বিভাষার সীমাহীন চাপে
রসনা কাতর ধ্বনি তুলে বটে বিদেশী বর্ণের
জমা অভিমানটুকু পুবালি বাতাস লেগে কাঁপে

ইড়া ও পিঙ্গলা জানে দেহের মহিমা কত খাটো
ভিতরে বাড়ছে দ্রুত লেলিহান ভোগের পিপাসা
মানুষ এগোলো কত ভুলে থাকি তার ইতিহাস
যেন বহে পিতামহদেরই কালে কাবেরী-বিপাশা

পুবের মাটিতে মহা জেগে আছে শস্যসম্ভাবনা
মাথায় গোছানো তবু পরকীয় পশ্চিমা ভাবনা



কথা ও বার্তা
..........
এ বেলায় মনে হয় কিছু কথা বলে রাখা ভালো
এখনো বিদ্যুৎ আছে এই মগের মুল্লুকে
মণিবন্ধে তাকানোও যাবে ঢের-- এই পথে
হৃদয়ের স্পর্শ নেয়াটারও একটা চেষ্টা করা যাবে

কথা তো আসলে কথাই নয় কেবল খানিকখানি বার্তাও
‘ঢেকে যাবে এদেশ আঁধারে’--
হাসি হলো আমারই অল্প ক্রিয়া ব্যবহারে
‘ঢেকে গেছি’ স্থলে ‘ঢেকে যাবে’ বলে
যা কিছু ঢাকতে চাই
তা এমনকি অবাধে বিজ্ঞাপিত আজ হাটে মাঠে

‘আমার ঘরের চাবি মাওলা পরের হাতে’ বলে
লালন শাহ ইঙ্গিত করেছেন দেহে
ওই বাক্য ধারে নিয়ে আমি আজ দেশকে বোঝাতে চাই
অপচ্ছায়া দিয়ে যারে রেখেছে আঁধার করে নীরব উপনিবেশ
--আমার বস্তুত ছিল বার্তা এটুকুই

এবার তাহলে কথা হোক কিছু ভিতরমোহিনী
এ যে, সাবধানে থেকো
নিগূঢ় এ প্রেম রেখো নিরাপদে
হিসেব নিকেশ দিয়ে যদি তারে বেঁধে রাখো শুধু
দরদাম হবে আজ, কাল উঠবে নিলামে
আর পরশু কী হবে সে ভেবে তটস্থ আমি
লুকিয়ে রাখতে চাই বুকের ভিতরে তাই
আবেগও চাই কিছু লসলসে দানা বাঁধা

প্রেমের ছন্দ কি তুমি টের পাও দেশ
অক্ষরবৃত্তের দোলা



ক্ষত
..
কুয়াশা নাড়ার মাঠে নিশিজাগা মলুয়ার সুর ভেসে আসে

বাতাসে লতিয়ে ওঠে আগুন পোহানো ভোর
লেপ-তোষকের বাহানারহিত কুয়াশাস্বরিত আঙিনায়

পত্ররিক্ত গাছপালাসহ কেঁপে ওঠে দূর বনগ্রাম
জাগে সারা বাংলার শুষ্ক ও ক্ষুধার্ত মুখ মংগার
জমাট কঠিন কান্না শুয়ে থাকে বরফের রূপে
রামশীল থেকে দূর উল্লাপাড়া তক

মানুষেরই মাথা ফেটে হওয়া যমজ দু’ভাই মিলে
ঘরে ঘরে মিথ্যা মল্লযুদ্ধ ঈশ্বরে-আল্লায়
ভাইয়ে ভাইয়ে অযথা কামান দাগা

নামাতে আসে না কেউ এই ভার মানচিত্র থেকে



ইতিহাসপাঠ
.........
প্রচল ইতিহাসের একটা ডিসক্রেডিট হলো এই যে, ওতে প্রায়ই অলংকারের বাড়বাড়ন্ত থাকে, যেমন অতিশয়োক্তি, ইতিহাসবিদেরা ইতিহাস রেখে কাব্যে নিমগ্ন হলে, কল্পনাপ্রতিভার নবতর উন্মোচনে কাব্যের সংকট কিছুটা ঘুচত, বলা যায়

আমাদের ইতিহাস বইগুলো উপুড় করলে তা থেকে পড়তে থাকে রাশি রাশি বানানো হাত-পা, বানোয়াট মহিমা ও গৌরব, এই ধারণা আমি যেদিন লাভ করি সেটি ছিল ইতিহাসের আওতার বাইরের একটি অনৈতিহাসিক দিন, দুহাতে চোখের ওপর ধরে শুয়ে আমি পড়ছিলাম সমাজেতিহাস, সহসাই টের পাই চুঁইয়ে পড়া বহুকালের ভেজাল তথ্যপাতির গন্ধে আমার দমবন্ধপ্রায়, লাগাতার গোঁ গোঁ আওয়াজ শুনে পাশের ঘর থেকে নায়কোচিত লম্ফনশৈলী দিয়ে এসে খপ করে বই কেড়ে নিয়ে বউই সে যাত্রা আমায় প্রাণে রক্ষা করে, ওইদিন মনে হয়েছিল, সম্ভবত আমি নতুন একটা চোখ পেতে যাচ্ছি ঐতিহাসিক অন্ধকারে

কার্যকারণ সহযোগে মানুষের পরম্পরা ধরে পিছন দিকে চিন্তাকে চালিত করা গেলে ইতিহাস নামধারী গ্রন্থকে সন্দেহ করা লাগে, এরা কেননা শুধু একপক্ষ দেখে, এ যাত্রা হতে পারে মানুষের বলিরেখা, চিত্রকর্মের রঙ, চলচ্চিত্রের আলো ও সাহিত্যের রঙবেরঙের রহস্যময়তা সহযোগে



জলপাইরঙা দিনে
................
ধানের মাঠ ডিঙিয়ে এই যাওয়া, চালের স্বপ্ন ছাড়িয়ে ঠিক আলুগড়ের দিকে
পিছনে পড়ে থাকে মৌ মৌ ভাতের ঘ্রাণ, সাথে পাটশাক ও শুকনা মরিচ ভাজা

জলপাইরঙা দিনগুলো জুড়ে উদাসী মাঠে তাকিয়ে ছিল রৌদ্রালোকের মড়া
মহা উৎসাহে আমরা সকলে আজ মিলিত হয়েছি তার শেষকৃত্য ছলে

লোকে বলে
ভূত মরে গেলে তার অস্থিভস্ম থেকে নাকি প্রেতেরা জন্মায়



বাঁশফুলের ঘটনা
.............
কেন ফুটলি রে বাঁশফুল কেন
ইঁদুরবন্যা হলো আমাদের জুমযজ্ঞ ঘিরে
শস্য গেল রবি ও খরিফ
গেল ঘর-গেরস্থালি সব
বই বস্ত্র জমানো সঞ্চয়সহ সবকিছু
চাষ অধিকার গেল পাহাড়ের থেকে

ফুটলি রে বাঁশফুল যদি এতদিন পরে
অভাব আনলি কেন ডেকে



লেখার টেবিল থেকে দূরে
...............
লেখনের ফাঁকে ফাঁকে নিজস্ব টেবিলে গূঢ় কিছু কথা এসে লুটোপুটি খায়, কখনো আত্মীয় তারা কখনো অনাত্মীয় দূরের আভা, তবু লেখার বিষয় জুড়ে জড়োয়া গয়না হয়ে থেকে যায় সেসবের কিছু কিছু ছায়া-কম্পমান, বিষয়ের অনাত্মীয় এসব ছিন্নকথার যে দূর পুরীতে বাস, তোমার তুমুল হাসি সেখানেই কান পেতে আমি আজ শুনতে পেয়েছি বড়ো মাদকতাময়

সে যে কতকাল হলো, কত যে নিশির ভার তার ’পরে চেপে আছে আঁধার-পাহাড় হয়ে, আমাকে জাগায়ে যেতে এই ঘোর ভেদ করে আয়োজনহীন তুমি আসো, কালের পাথর-নুড়ি দুহাতে সরায়ে দ্রুত, বল-- অনেক তো লিখলে কবি, বিগতার আবির্ভূতি নিয়ে আজ লিখ

কলমকে আমি তাই মননে ডুবাই, মননকে ভাবে, ভাবকে তোমার নামে দাগায়িত করে করে তোমার চাহনি লিখি, তোমার লাবণ্য লিখি, আর লিখি লতা-পাতা কেঁচো-সাপ চাঁদ-নদী নীহারিকা, তোমার স্বকাল


লতা-পাতা

ছিল গানের মতো লতিয়ে ওঠা সবুজের বন, ছিল পাথরের স্থির ঢিবি, এমনকি ফুল ছিল পাথরেও বিকশিত সুগন্ধমদিরা, ছিল পিঁপড়ের ঘর আর আকাশ উজানে ফেরা পাখি-প্রজাপতি, ছিল মৃন্ময়-আনন্দ ভরা ফসলের মউমউ ক্লান্ত-প্রাণ আধিয়ার, ছিল যশোদা ও কণ্ঠমণি-- মাঠ ভরা সোনা সোনা পাকাধান


কেঁচো-সাপ

মাটিময় রাশি রাশি কেঁচো-সাপ মাথার ওপরে ক্রূর জমিদার (এ যুগের), দাঁতাল পেয়াদা তার আর যত জোতদার লাঠিয়া-বাহিনী, এসব ছাড়িয়ে সাথে ছোলাকলা নিয়ে বাবু মধ্যস্থতাকারী, কখন ফোটাবে কাঁটা কখন ঢালবে জমা নীল নীল সেঁকোবিষ, রোদে ও আগুনে পোড়া অবশিষ্ট খেটে খাওয়া মানুষের দেহে, তারই লাগি অনন্তর অপেক্ষা চলে লোকেদের চোখে ধুলা দিয়ে


চাঁদ-নদী

অয়নান্তে সূর্য তখনো যায় নি বেড়াতে, আসে নি আলোও এত পৃথিবীর কাছাকাছি, তবু তারা ছিল, নদীতে তখনো চাঁদ ডুবে গিয়ে কৌটো-ভ্রমর খুঁজে ডালিমকুমার, বনের যে ছায়া এসে পড়েছে নদীতে, চাঁদই পিছনে তার প্রথম উদ্গাতা, এই প্রেম পুরানো পুরানো অতি-- পৃথিবীর ‘রূপ নিয়ে চলে গেছে দূরে...’


নীহারিকা

তবু রক্তে ভেসে গেল রাজপথ, নিলাজ চন্দ্র কিছু আলোক ঢালিল, অধিকার চূর্ণ হয়ে ভারতবর্ষ জুড়ে কুয়াশা হলো মৃদু মৃদু, শীত হলো অনাথের, মানুষের দিন কাটে আজো খেয়ে বা না-খেয়ে


তোমার স্বকাল

আজো যত অধিকার হরণ ঘটে নারী ও পুরুষের, কালভেদে নানারূপে একই সব হরণ ডাকাতি, দূরদেশী ছদ্মবেশী হঠকারী ত্রাণকর্তা যত, নীতির বাগানে হাত সাফা করে ছিঁড়ে ফেলে মানুষের স্বস্তিকুসুম, ছোটবড়ো ম্যালা দায় তাদেরও স্কন্ধে চড়ে, জবাবদিহির ভার গুরুভাগ জমেছে তাদেরই



শ্যাঁওড়াকাহিনি
...........
শেষ কবে শ্যাঁওড়া গাছের সাথে আলাপ করেছি ঠিক মনে নেই, ঘাড়ে একটা বিকট মাছি এসে বসবার আগঅবধি অনবরত সে বলে যাচ্ছিল মাঠের রাজনীতি আর শস্য সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেলে পাখিরাজ্যে যে বিপ্লব দানা বেঁধে ওঠে তার কথা

ভূতপ্রেত ছাড়িয়ে এগোনো ওইসব কথামালা হারিয়ে ফেলেছি দ্রুত ভগ্ন জনপদে, আজ মনে হয়, আমাদের একেকটা চূড়ান্ত বৈঠক লিখে রাখা গেলে অপচয় না-করে অযথা, দূরত্ব কমত খানিক বাজারমূল্যের সাথে শস্যলগ্ন কৃষকের, ঝরা ফসলের সাথে পাখিদের

গাছপালা থেকে অনেক দূরের মরু এ নগরে মুটে বইতে বইতে আজ জাবর কাটার কথাও প্রায় ভুলে গেছি, সেইসব মহাঘোর স্মৃতি



আলুকৃষকের চটি
..........
প্রান্তর শয্যায় মধ্যরাত ঢেকে গেল চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে উড়ে আসা ধুলায়
ধূলিমলিন এই ঘাসের দেশে আমি টর্চহীন খুঁজছি একটি ন্যায়ের পালক

এবারে আলুর ফলন মিত বর্ষণে বেশ বেড়ে গেছে
সিরাজদিখান জুড়ে মাঠে মাঠে আলুকৃষকেরা মিলে করছে উৎসব

কিন্তু বহুপ্রতিক্ষিত কোথায় সেই বাহারি রঙিন পালক

বাতরে নিজের চটিজোড়া খুলে রেখে যে কৃষক ক্ষেতে নেমেছিল কাল
ভুলে থেকে যাওয়া তার চটির ফিতা পালকের বদলে আমার চোখে লাগে
এরপর থেকে পুরানো পৃথিবী জুড়ে দায়ে পড়ে হাঁটছি গ্রামকে গ্রাম
চটির বেদনা ভোলা আলুকৃষকের কল্পিত একটা নাম জপে জপে



ভাসাপদ্য
.........
ভেসে যাচ্ছে শূন্যের ওপর দিয়ে এই প্রাণ শনৈঃশনৈঃ বায়ুপ্রবাহের সাথে
একটা কুটার সাথে যেই লাগছে আঘাত উহু-আহা আর্তনাদে ভরাচ্ছে আকাশ
ভেসে যাচ্ছে ভেসে যাচ্ছে যেন ভাসাই নিয়তি এই বিরুদ্ধ সময়ে

ঠেকবে কোথায় গিয়ে ভাসাপ্রাণ ভাসাদেহ বা আদৌ ঠেকবে কি না
এইসব ভেবে ভেবে ওড়ার মুহূর্তগুলো লাল করে দিয়ে আর ফায়দা কী
বাতাস ভাণ্ডে যেখানে মিশে যাচ্ছে গোল গোল অপূর্ণ ইচ্ছেরা

ভেসে যাচ্ছে সবকিছু ব্যথা ও বেদনা, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য, প্রেম ও অপ্রেম
ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে শুধু যাপিত সময়ের স্মারক যন্ত্রণাগুলো



হারানো মুহূর্ত খুঁজি
...........
গোধূলিবেলার ত্রাসে হাহাকার এসে লেপে দিয়ে যায় মুখে কালো
বিগতার উপেক্ষাবাহনে আসে শূন্যতার সুবিপুল ধুধু বালিগ্রাস

রাত্রির কালিমা শুঁকে হারামণি তার কেশের গন্ধের বেশি
আর কোনো জেগে ওঠা বহুদিন কোথাও খুঁজি নি
হেলেঞ্চা বীথিতে ঝিলে নেচে গেলে কোমল রোদের আভা
হাস্যেলাস্যে ফুটতে দেখেছি শুধু তাকে

হিজলের ছায়ার নিচে তপস্যা নড়ে ওঠে দরদি সন্ধ্যায়
টান পড়ে ছিপের রশিতে মৃদু মনে মনে
শুধু মনে মনে আমি তার স্মৃতির সকাশে হেঁটে
বহুদূর পিছন পাহাড়ে হারা কোটি কোটি মুহূর্ত কুড়াই



যাপনবিদ্যা
..........
যৌবনবাদ্য থেমে যাবার আতঙ্ক গভীর হয়ে এলে রুটির দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে রাখো ঘাসে বসে ঝিমানো নিসর্গের প্রচ্ছদে, টানো গভীর নিঃশ্বাস, ফড়িঙের ওড়াওড়ি তাতে বাড়ে, বৃষ্টি নামে ঝমঝমিয়ে আকাশের ছাদ ভেঙে, এর যে নিজস্ব তৌর্যত্রিকতা সেটা কানে নিয়ে প্রৌঢ়ত্বের পরিধির ভিতরে নির্মিত প্রফুল্ল গৃহে করে যাও যথেচ্ছ যাপন

এটা হবে ক্রমশ পচে ঘিনঘিনিয়ে ওঠা সমাজদেহ থেকে সুদূরে স্থাপিত, রাষ্ট্রদেহের জঙ্ঘার নিচে গজানো এইসব যাপনবিদ্যার দিকে কালা সব কানুনেরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে যাবে, রাষ্ট্রের সামর্থ্য নেই যে মনের পায়ে শিকল পরাবে মানুষের, কিংবা গাধায় চড়িয়ে দেবে পার করে আচার সীমানা, রাষ্ট্রের চোখ বড়ো স্থূল, ওটা যা দেখে তা দেখে কানারাও, যা দেখার তা দেখে না কস্মিনকালে

ভিতর দিক থেকে একটা একটা করে খড়কুটা নামিয়ে এনে গড়ে তোলা ওই পাখিনীড় পাতার পৌরহিত্যে দেখবে মানিয়ে যাচ্ছে বেশ



একাগাছ
.....
শালজঙ্গলের কোনো জেরক্স হয় না
পোড়োবাড়ির কোনো সারাই হয় না

আমাকে আধলে রেখে উড়ে গেলে তুমি
পোড়োবাড়ির ধারণা পড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
বাতাসে বাতাসে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে

মাঠের ভিতরে থাকা একাগাছ যত দেখি
শূন্যতার তত বেশি পড়ে যাই প্রেমে
গোড়ার জল কী দারুণ আগলে রাখে
থমথমে কালো ছায়া

একদিন সবকিছু ছেড়েছুড়ে
ধু ধু পথে হাঁটা দেব শূন্য অভিলাষে
তুমি জেনে রেখো



শরীরগাছের জন্য এপিটাফ
...............
শরীর বিস্মৃত হয়ে যেখানে নেমেছি
সেই খাদ থেকে ওঠা মুশকিল
অবিকল অবয়ব নিয়ে

কখনো পারে নি কেউ পারব না আমি
এ ক্ষত বইতে হবে বাঁচি যে কদিন

ঘোড়া এসে দাঁড়িয়ে থাকবে
আমাকে আনন্দপুর নিয়ে যাবে বলে
চড়ে দেখবার সাহস পাব না
চোখের সামনে ঝুলবে তামাশা
শরীর চাবে না বলে দেখাই হবে না

শরীর আমাকে শরীর দিয়েছে
দেয় নি যথেচ্ছ মন্থনাধিকার--
এইকথা বুঝেছি যখন
ম্যালা ডালপাতা ঝরে গেছে ততদিনে
শরীরগাছের

দিনে দিনে এতসব হারালাম যদি
তবু কি যথেষ্ট আমি শরীর চিনেছি



সময়ের ফুরালে সময়
....................
তীরের নিকটে এসে ডুবে গেল তরী
এই ক্ষত বয়ে বেড়াবে অনন্ত জল
আমার মনের

একটা নতুন রেখা সমতলে জেগেছিল বলে
কোনোভাবে এইবারও বেঁচে যাওয়া হলো

সঞ্চয়ের মতো মনে হয় নুড়িসব
আসলে সঞ্চয় নয়
পাহারা বসিয়ে রেখে তার চারপাশে
শুধু শুধু করে যাচ্ছি আয়ু-উদযাপন

সময় সইছে বলে এত কিছু
সময়েরও ফুরালে সময় একদিন
নুড়িপাথরের প্রেম ভেঙে যাবে
জলের জগতে গিয়ে লীন হবে
জীবনের সকল রসদ



দুটি বিলবোর্ড
.........
ঘড়ি

ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালে আমার কেবলই মরে যাচ্ছি বলে মনে হয়

আত্মা

আশ্চর্য, গ্রাম গ্রামকে ছেড়ে গেছে, নদীও নদীকে
আমি কবে ছেড়ে যাব আমার আমিকে


মৃত্যু
.....
জীবনের ভিতরে আজ মৃত্যুর লোমশ একটা হাত ঢুকে গেছে
আনাচে কানাচে তার জন্মেছে পাথরকুচি

মৃত্যুর মরণ নেই



প্রবাস নদীর তীরে
..............
সবুজের নিচে হাত বাড়িয়ে পথ আগলে আছে হেমন্তকাল
ছাতিমফুলের ঘ্রাণ

সাধু অন্ধকারে কুড়িয়ে পাওয়া ঘ্রাণের তসবিগুলো
রাতের মদিরা জ্ঞানে ছুঁয়ে যায় ধ্যানে ধন্য বজরার সারি

কুয়াশার ধুতি খুলে খুলে পড়ে
পাতার উপরে জাগে দূরপ্রভারাশি
তবু সৃজনচিন্তার মৃত্যু লিখে রাখে বাচাল সময়
নগ্ন ও অস্থির

তীরাঘাতে ঝরেপড়া এক মড়া শালিকের মতো আমি
চুপ করে থাকি



এইসব নিয়ে থাকি
...........
বলি লোহালিয়া অতিরূপকথা, তোমার প্যাঁচের ভিতরে সমাজ ও সংসার যেভাবে তরতর বেড়ে ওঠে বাঁচার নিয়মে, আমাকে সেভাবে তুমি রাখো, গাছের আদরে রাখো পাখি

দূরপ্রবাসের তীরে ফণা ধরা হাহাকার ছুড়ে ফেলি, ঢুকি মনের খোড়লে, ওখানে থাকেন যিনি, ভাব করি তার সাথে, তারে ছুঁয়ে যাই, ছুঁতে ছুঁতে যাই, দেখি ঢেউ নাচে হিয়ার বাতাসে আর নাচের মুদ্রার সাথে মেশে এসে জলের গলাও

ধানে-জলে মাখামাখি ভাটিজনপদে, হেসে ওঠে বাংলার দেহবল্লরি, এই রূপকাহিনির দেশে ভেসে যায় রাশি রাশি তরী সদা’গরি, উজানি বাতাসে ভেজা রয়ানির সুর ধেয়ে আসে, বিষণ্ন বাদামি

ঘুরি পথে পথে আর পথের পাথর বুকে এইসব নিয়ে থাকি, তা না হলে কার সাথে ভাগ করে নেব বলো কুড়ানো বেদনা, এতসব যন্ত্রণাকুসুম



জীবনপাঠ
....................
পতনের পর দীর্ঘশ্বাস যতক্ষণ সম্ভাবিত
ততক্ষণ থাকা ভালো শুয়ে বা বসে ওই পতনাসনেই
ভেবে নেয়া ভালো খুব এ যাত্রার ভুলভাল
উঠে দাঁড়ানো মানেই তো আর বিজয় নিশ্চিত হওয়া নয়
ওঠারও রকমফের আছে


এক জীবনে মৌসুম আসে অনেকানেক খেলার
এবং সেটা অনেকানেক মাঠে



বরষা সাঁতার
..........

মুহূর্ত চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে
আরো একবার বেঁচে যেতে হবে


জীবনে কেননা যত রোদ্দুর পথের পাশে
লতাঝাড়ে পুষ্প হয়ে ফোটে
তাদের সুগন্ধ নেয়া আজো বাকি রয়ে গেছে


আজো আমার মনের পাখির সাথে মিলিয়ে পার্শ্ব গলা
সুর করে পাখিশাস্ত্র অধ্যয়ন করাই হলো না
আমার গ্রামের গান সময় হলো না বলে
আজো দেখো গাওয়া-থোওয়া বাকি রয়ে গেছে
এমনকি বলতে পারি নি আজো ঘরের কথাও


আমি তো এখনো ভরা বরষায় তুঙ্গ যমুনায়
মাঝনদী সাঁতরিয়ে কূলে যেতে চাই


বিস্ময় কখনো যদি এর মাঝে
ডাক পাঠিয়ে জানায় যে আমাকে যেতে হবে
অন্যথা করব আমি কীসের বাহানা দিয়ে


যাবার বেলায় এই স্বপ্ন আমি কাকে দিয়ে যাব
কোন পটে এঁকে যাব অসমাপ্ত পাহাড়ের ছবি

বালখিল্যকথন

মুজিব মেহদী


কবিতা হলো কবির জীবনের একটা পরিস্রাবিত দ্রবণ, পরিপার্শ্বের তাপে গলা, যে-দ্রবণে মিশে এসে সমুদয় ভালোমন্দ অর্জনের ভাঁপ, ক্লেদ-গ্লাণিসহ। এসবের ভিতর দিয়ে যাওয়া, ডান-বাম দেখে, পাশ দিয়ে কে যায় না-যায় তার তল্লাশ জারি রেখে। যেসব জিনিসকে মানুষ উপেক্ষা করে আসে, যেসবকে রেখে আসে পরে কাজে দেবে ভেবে, সেসবের দূরাভাও থাকে। প্রান্ত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পানির মতো প্রয়োজনীয়তা সকল, সেসবকে যথাসম্মান দিয়েও বর্জ্যপ্রায় পরিত্যাজ্য বস্তু ও বস্তুভাবনার চরাচর চুঁইয়ে নেমে আসা অবিরল জলের দিকেও মাঝেসাঝে তাকাতে হয় ফিরে। কাকে নিতে হবে কাকে রাখতে হবে এসব ঠিক করে দেয় মেজাজ, যেটা সমাজঘটনা দিয়ে মোড়া। যে সুবিধা, যে অসুবিধা বিরাজ করে ভূয়ে, যখন যাপন করেন কবি, কবিতায় তার নিঃশ্বাসধ্বনিটাই বাজে। মানুষ দেখে দেখে শেখা মহাকালবোধ, এইখানে চুপিসারে এসে মেশে।

ভয়ের রক্তচক্ষুকে যুক্তির আঙুল দেখিয়ে থামিয়ে রাখা, অথচ ভেসে থাকা গোপন এক ভীতিভাবে। সভ্যতার নিঠুরাবেশে যতসব হুংকার দিকপাশে বাজে, নাতিদূরে ঘোরঘাটে খেলে ওঠে যতসব সন্তরণ লীলা, এসবেরও আঁচ রাখতে হয়, কোথায় কোথায় ভীতি সেই কথা সামনে না-এনে। ঘোর সেই পাললিক পরিসর নেচে ওঠে ধ্যানমগ্নতায়। পাঠককে গ্রস্ত করে ঘোর, আনে সম্মোহন। শুকনো পাতার সাথে উড়ে উড়ে ঝরে পড়ে পালকের আগে। মেঘসম্ভব গাম্ভীর্য ভেঙে বৃষ্টিধারা বয়।

বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমির বেদনা রোদের আঁচে তাতিয়ে নিয়েও বড়োসড়ো অভিযোগ কাঁধে নেয়া, তার ভার। ঘরের ভয় ও পথের ভয় আলাদা-আলাদা, ওইসব হাতের চউলে নিয়ে দেখা। সামনে তাকিয়ে দেখা কারা কারা পথে নেমে গেছে, লাল-নীল। নানাদিকে হাত উঠিয়ে থাকা। পথ বন্ধ হয়ে থাকে পুরো, বড়ো নির্যাতন সয়ে তবু ওর দিকে যেতে হয়। আমোদে-আহ্লাদে যাওয়া দরকার যেইদিকে, সেদিকের প্রেমকুঁড়ি গাছ, তার ডালপাতা মূলটুল স্থান করে নেয় যথারীতি। সব করে নিতে হয় নিজেই প্রস্তুত। যারা অপেক্ষা করে থাকে যত্নের, কত তারা ধরে মিছে সত্য, তুলে আনতে হয় ওরে ধরে, তারপর শুরু হয় বাগানবিলাস। অধিগত নয় যেটা, তাকে ঘিরে অপচয় বাড়ে, তবে এরও নিগূঢ় আঁচড় থাকে মিলেমিশে, যদিও দরকারি এর থেকে দূরে বাস করা, নিজের মতো করে, ঘাড়টাকে যথারীতি ত্যাড়া করে রূপার কপাটে দিয়ে খিল।

হয়ত শোনা গেল ধনচে শিশুর কোলাহল, একপাশে থেকে যেতে পারে কোনো প্রেমময় কথার ঝিলিকও। তাকানো দরকার নেই জেনেও তাকানোর মরশুমে চোখে চোখে গেঁথে নেয়া জিওল ভাবনা। খটখট-ঘটঘট হয়তবা দূরে ঠেলে রেখে যায় সবিশেষ কামভাব, অবদমনের কোনো দমনচেষ্টায় বুঝি থরে থরে সাজানো থাকে এইসব কর্মের ডালা। যে ধ্যানে পৌঁছা যায় না, সে ধ্যানের ভিতর দিয়ে আসা মনে মনে। সেরকম ধ্যানের মায়ায় বুঝি লাল চেলি ভুলে গিয়ে অকুল-আশার গলে মালা দেয়া। অজ্ঞতা ছায়ার মতো লেড়েল্যাপ্টে থাকে, বোধকরি থাকতেও হয়। এই সবকিছু মিলেমিশে বিচিত্র রূপগুণ নিয়ে যেটা আসে, সেটাই কেবল হয় মহাকালমুখী, কোনো-না-কোনোভাবে।

২.

ব্যক্তিকবির জীবন নিষ্কাশিত হয়ে নেমে আসা অনুভূতিচূর্ণ যদি নানা আভরণের সংস্রবে অথবা সংস্রব বর্জন করে এমন কোনো দশাপ্রাপ্ত হয়, যা কবির অভিজ্ঞতাবাহিত অর্জন ছুঁয়ে বদলে যাওয়া ভাষার সহায়তায় প্রসারিত অর্থের শক্তি নিয়ে মনোহারী সৌন্দর্য অর্জন করে, তবে তাকে আমরা কবিতা বলবার অবকাশ পাই। এই রূপ বা সৌন্দর্যের নতুন হওয়া আবশ্যক হয়, যা অন্য কারো অনুকারবৃত্তির দ্বারা অর্জিত নয়, যা এই প্রথম জন্ম নিল মহাশূন্যতার উদর চিঁড়েফেড়ে। কবিতা সেই চূড়ান্ত অবস্থা, যা অনুভূতিচূর্ণের মিশেলে অনাস্বাদিতপূর্ব এক আস্বাদআঞ্জাম সংগঠিত করে রাখে, যার নিবিড় সংস্পর্শ পাঠকচিত্তে ঘটায় তীব্র সংক্রমণ, দ্রুত কিংবা ধীরে। এটা আবশ্যিক নয় যে এই সংক্রমণকে সর্বদা মধুরই হতে হয়, তা এমনকি বিষাদ-বেদনা-যন্ত্রণার কিংবা বিস্ময়-স্তব্ধতা-মূর্ছনারও হতে পারে। তবে সবই এর আনন্দপ্রদ।

সন্দেহ কী যে, কবিতা পাঠকমনকে শিক্ষিত করে, সঞ্চারিত করে। কিন্তু এ শিক্ষা কখনোই বেত্রাঘাতোৎপাদিত ও উৎসারিত নয়, বরং স্বতোৎসারিত। এ পরীক্ষা পাসের নিশ্চয়তা দেয় না, এমনকি দেয় না করে-কেটে খাবারও সুযোগ। এ শিক্ষা কেবলই সৌন্দর্য চেনায়, দেয় সৌন্দর্যের ঘোরে বাস করবার গলিঘুপচির সন্ধান। যিনি এ শিক্ষার আস্বাদ জানেন, তিনি বহুপথ হেঁটেও তার কাছে যান, চোখের দিকে চেয়ে চুপটি করে বসে থাকেন, কখনোবা ভাঁজ খুলে দেখেন, চকিতে শব্দ করেও ওঠেন। পাঠকমহান নির্দিষ্ট কবিতার কাছে গিয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন (লোকদেখানো ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিক্রিয়ার কথা আলাদা), তার সম্পূর্ণটা কবি বা কবিতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তা নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় নির্দিষ্ট পাঠকের সাথে ওই কবিতার যে যোগাযোগটি স্থাপিত হয়েছে, তাকে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার সাথে কীভাবে মিলিয়ে নিতে পারলেন না-পারলেন তার সাপেক্ষে। এই যোগাযোগটিও আবার নির্ভর করে কোন নির্দিষ্ট ও বিশেষ শ্রেণির শিল্পরূপের প্রতি তাঁর আগ্রহ বা অনাগ্রহ আছে তার ওপর।

প্রশ্নটা তাহলে ঠেকছে গিয়ে সৌন্দর্যে, যা পাঠককে আক্রান্ত করে। সৌন্দর্য ভোক্তার চিত্তাভ্যন্তরভাগে সংঘটিত ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলজাত একটা উপলব্ধি। কোনো শিল্পবস্তু ইন্দ্রিয়-সুখকর হলে এবং বুদ্ধিবৃত্তির খোরাক যোগালে তা ভোক্তার মধ্যে এই উপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। সৌন্দর্যের এ ধরনের উপলব্ধি মনোমুগ্ধকর। সৌন্দর্যের অনুভূতিটা জন্মায় এ কারণে যে, এর দ্বারা পাঠক নতুন এক ভাষাসত্যের সামনে দাঁড়ান, যা তাঁকে ভাবায় ও তৃপ্ত করে। এর ফলে ঘটে তাঁর চৈতন্যের বহুস্তরিক উন্মোচন। এ প্রক্রিয়ায় তা আর কেবল আনন্দ থাকে না, ধারণ করে ওঠে আনন্দ ও উপযোগিতার এক সমন্বিত রূপ। যেজন্য মানুষ শিল্পবস্তুর কাছে যায়, বারবার ফিরে ফিরে যায়।

৩.

এই-ই সব, যেন এই-ই সব। যদি হয়ও তা, এ ধারার তরল বর্ণনার চেয়ে তা করে ওঠা কঠিন। আর শুধু করে ওঠাই বা বলি কেন? বলাটাই বা সহজ হবে কী প্রকারে, যে বলা প্রকৃত বলা? যদিও প্রকৃতটা বলা এক্ষেত্রে নিতান্তই অসম্ভব, কারণ কবিতা শিল্প। শিল্পের কীভাবে এমন সংজ্ঞা হতে পারে যা সর্বজনীন? স্বপ্রণীত সংজ্ঞাযোগে ধারকাছ দিয়ে হয়ত যাওয়া যায় তার, কিন্তু শতভাগ ঠিক ঠিক জায়গাটা শনাক্ত করা যায় না এর। আমরা তবু চিনতে চাই একে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা ও জানাবোঝা দিয়ে। বুঝতে চাই যে, কোনপথে হাঁটলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় ও হাঁটার ভঙ্গিটা ঠিক কী হলে রচিত কবিতায় ভর করে এসে সুন্দর।

স্থান-কাল-পাত্রভেদে সর্ববাদীসম্মত সংজ্ঞাহীন সুন্দরের মান ও মানে বদলে যায়। সুতরাং একজন কেউ যখন সুন্দরকে চিনাতে যান, কবিতার সুন্দর, তখন তা প্রধানত হয় ওই কথকেরই মতো। আর যাঁরা যাঁরা নির্দিষ্ট কথকের মতো করে ভাবেন, বা দেখেন কথকের ভাবনার মধ্যে তাঁর/তাঁদের ভাবনার কোনো খোরাক আছে সামনে এগোবার, বা ধরা যাক এমন কেউ যিনি ঠিক উলটো করে ভাবেন বা ভাবতে চান কথকের চেয়ে; কথককে ছাড়া আর কেবল তাঁর তাঁর কাছে এসব বলাবলির কোনো মানে থাকলে থেকেও যেতে পারে।

৪.

‘ভাষাই বড়ো ব্যর্থতা ব্যর্থ লেখকের’-- এ কথায় মনেপ্রাণে আস্থা না-রাখবার কোনো কারণ ঘটে নি এখনো। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কোনো কোনো লেখক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা অনেক অর্থপূর্ণভাবে বলেছেন, কিন্তু ভাষাগত বিশেষত্ব ও বাগসংহতি না-থাকায় তা পাঠককে ছুঁতে পারে না। কবিতায় ভাষার ব্যবহার হতে হয় অব্যর্থ ও যথাযথ। যোগাযোগসহজতা তার একমাত্র বিবেচনা নয়। বিবেচনায় থাকে উচ্চারণসহজতা, প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য সৃষ্টির লক্ষ্য ও অর্থ প্রসারণ চেষ্টাও। অবিবেচকের মতো অবান্তর শব্দনিক্ষেপ কবিতাকে সিদ্ধির কূলে পৌঁছতে দেয় না, বরং চরে আটকিয়ে দেয়। পুরো কবিতার শব্দবিন্যাস সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ হওয়া লাগে। তবেই কেবল তা সংগীতের দিকে এগিয়ে যায়।

ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ভাষার এই পরিবর্তনের গতিটা কোনদিকে সেটা আন্দাজ করা গেলে সবচে’ সুবিধা। যেহেতু একজন কবিতাকর্মী আজকের জন্যই কবিতা লিখেন না, বরং লিখেন আগামীর জন্য, কাজেই আগামীতে ভাষার যে সম্ভাব্য রূপটি দাঁড়াতে যাচ্ছে তা যদি কেউ ঠিকঠাক ধরে উঠতে পারেন, তাহলে তিনিই আগামী সময়ে বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। একজন কবির কবিতা যতদিন প্রাসঙ্গিক ততদিনই তিনি পঠিত হন, এবং ততদিনই তিনি জীবিত। ততদিনই তাঁর লেখার নব নব দরোজা উন্মোচনের সম্ভাবনা থেকে যায়। আর্কাইভড হওয়া একজন লেখকের কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়, প্রত্যাশাও নয়।

লেখককে প্রাসঙ্গিক রাখে কেবল ভাষা নয়, তাঁর বক্তব্যও। নিহিত বক্তব্যকেও সমকালোত্তরণের স্পর্ধা রাখতে হয়। যা আজ লেখা হলো তা আজ তো সমকালীনই, কিন্তু কাল যদি তা পশ্চাৎপদ বিবেচিত হয়, তবে তা ভাষায় প্রাসঙ্গিক হলেও সার্বিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আজকের বার্তাকে যদি তাবৎ ক্ষমতাযোগে মহাকালের করে তোলা যায়, তবে সেটা প্রসঙ্গ হয় আগামীদিনের। এজন্য ভাবনাচিন্তায় আধুনিক হতে হয়, বিজ্ঞাননিষ্ঠ হতে হয়, নতুনকে গ্রহণ করবার মানসিকতাসম্পন্ন হতে হয়, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে হয়। এ হলে ছোঁয়া যায় চিরসমকাল। অর্থাৎ কবির মহাকালকে লক্ষ্যে রেখে শব্দচয়ন, শব্দসজ্জা ও বাক্য নির্মাণ করতে হয়। এটা যে যত ভালো করতে পারেন, তিনি তত বেশিদিন বেঁচে থাকেন। এ বাঁচা শারীরিকভাবে নয়, পাঠকের মধ্যে নান্দনিকভাবে বাঁচা।

পাঠকদের একটা অংশের সঙ্গে কবির যে দূরত্ব তৈরি হয়, তার একটা কারণ মহাকালকে অভীষ্ট ভাবা। এটা সংগতও। এ অবস্থা কারো ক্ষেত্রে খুবই প্রকট আকার ধারণ করে, কারো ক্ষেত্রে অপ্রকট। কিন্তু এ কখনো নয় যে, পাঠকঅপ্রিয় কবিমাত্রই মহাকালের সওদাপাতিতে ব্যস্ত। পাঠকঅপ্রিয়দের একটা বড়ো অংশই অল্পপ্রাণ কবি অথবা অকবি। পাঠকপ্রিয়দের মধ্যে এ সংখ্যা আরো বেশি।

৫.

কবিতা প্রতিবেদন নয়, প্রতিবেদন তথ্যজ্ঞাপক, কবিতা অনুভূতিজ্ঞাপক। মহান পাঠক কবির দেয়া তথ্য নয়, অনুভূতি দ্বারা সঞ্চারিত হন। অর্থাৎ, কবিতায় পাঠক খোঁজেন অনুভূতিজ জাত্যর্থ, নিজে চাঙ্গা হয়ে ওঠবার জন্য। অনুভূতির ভার বহন করাই কাব্যভাষার কাজ, কাব্যভাষার এজন্য প্রতিবেদনের ভাষা থেকে দূরবর্তী হতে হয়। কবিতায় শব্দ নতুন ব্যঞ্জনায় জেগে ওঠে, পাঠমাত্র পাঠকের মনে এর জন্ম হয়। নবজাত এই ব্যঞ্জনার প্রণোদনায়ই অর্থফাটল ভরাট করে নেন পাঠক। ফাটল কেন থাকে? প্রতিবেদনের পরম্পরা অনুসৃত হয় না বলে। এ ভাষায় ব্যক্তি-বস্তু এক পাতে বসে অভেদ রচনা করে, অচিন্তিতভাবে রূপকায়িত হয়ে লাভ করে ধ্বনির আদর আর চিন্তিতভাবে উপমায়িত হয়ে বইয়ে দেয় শুশ্রূষার মতো বাণী। ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সরাসরি অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়েই ভাষা সেখানে এরকম রূপ পায়। এটা হয় অনুভূতিরই তাড়ায়। পাঠকের মনে আবার এটি অনুভূতি জাগাবারও দায়িত্ব পালন করে। কখনো কখনো বস্তু ও ধারণায় এমনকি প্রাণসঞ্চারও ঘটে, পাথরও বাউল হয়, ভয় জোরে কেশে ওঠে।

সংবাদপত্রের পাতায় তো আমরা হামেশাই দেখি ব্যাঙের ছাতার মতো মাদ্রাসাকে গজিয়ে উঠতে, বাজারে আগুন লাগতে। এ-ও তো রূপকই। তাহলে রূপকপ্রশ্নে প্রতিবেদন আর কবিতায় পার্থক্য রইল কই? আছে পার্থক্য। যে রূপক মরে যায় নি, সংবাদপত্র সে রূপক ব্যবহার করতে পারে না। সংবাদপত্রের প্রধান দায় বক্তব্যকে সহজে বোধগম্য করা। সংবাদপত্রের ভাষায় তাই ফাটল শোভন নয়, অনুভূতিজ্ঞাপন তার কাজ নয়, তার কাজ তথ্যজ্ঞাপন। কবিতা যে রূপকের জন্ম দেয়, তার কাজ বোধগম্য হওয়া শুধু নয়, বোধকে উসকে দেওয়াও। কবিতার রূপক সার্থক হলে সময়ে সেটা মরে যায়। সংবাদপত্রও তখন পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি করে দেখতে পারে। কবিতার রূপক এ প্রক্রিয়ায়ই ক্লিশে হতে হতে মরে গিয়ে সংবাদপত্রের ভাষা হবার যোগ্যতা অর্জন করে। ঠিক এ কারণেই সংবাদপত্র যখন সাহিত্যের দায় সামলায়, তখনও মরা রূপককেই তা মহিমান্বিত করে বেশি।

ব্রাত্যজনের ভাষায় উপমা-রূপকের যথেচ্ছ ব্যবহার আছে। যেসব ভাষাকে আমরা অশ্লীল বলে অভিযুক্ত করি, সেসব ভাষায় শক্তিশালী সব রূপকের উপস্থিতি থাকে। যিনি অকথ্য গালি খান তিনি যে দ্রুত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বা পালটা গালি দেন, এটা প্রমাণ করে যে, ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগটা খুব দ্রুত শ্রোতাকে স্পর্শ করেছে এবং তার মনে পালটা অনুভূতির উদ্রেক করেছে। এটা রূপকেরই শক্তি। সাধারণ মানুষের মুখের কথা তাই কবির জন্য ব্যাপক অনুধ্যানের বিষয় হয়ে ওঠে। কবির কেন হবে শুধু? সকল লেখকেরই, সকল ভাষাকর্মীরই হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, তীব্র আক্রমণাত্মক রূপকাশ্রয়ী গালাগালির ঘটনাগুলো যখন ঘটে তখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চারপাশে ভিড় করে ওঠে। কী বলে না বলে তা তারা মনে দিয়ে শোনে। কেন শোনে এসব? কারণ এ ভাষা দারুণভাবে বোধ্য, অর্থময়, নাটকীয় অভিব্যক্তিসমৃদ্ধ ও দ্রুত সঞ্চরণশীল। মানুষের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা মন্দাগুন এ ঘটনায় চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই জন্যে সেটা হয় আনন্দময়, সম্ভবত।

অধুনা বিকশিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাংলা ভাষায় নোটানোটি শুরু হয়েছে বেশিদিন নয়। তারও আগে শুরু হয়েছে বাংলা ব্লগ। এসব মাধ্যমে ছদ্মনিক নিয়ে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের এমন এক চূড়ান্ত অবস্থা মাঝেমধ্যে দ্রষ্টব্য হয়ে উঠছে যে, তা বস্তির গালিকর্মকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দেখা যায় যে, যেসব পোস্টে এ ধরনের কাণ্ড ঘটে সেসবের পাঠক বেড়ে যায়। হিট সংখ্যা হয় অনেক বেশি। ব্লগে হিট গণনা করা গেলেও ফেসবুকে সেটা করা যায় না। তবে এখানেও যে বিস্তর মানুষের আগমন ঘটে তা কতকটা বোঝা যায় কমেন্টের বহর দেখে। সম্প্রতি ফেসবুকে এসব ছদ্মনিকের গালিবাজি প্রতিরোধের জন্য একাধিকবার আন্দোলন গড়ে তুলবার চেষ্টা করেও বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায় নি। বাকস্বাধীনতা ও স্বরবৈচিত্র্যের পক্ষে ভোট দিয়ে অনেককেই এখানে প্রকাশ্যে বলতে শোনা গেছে যে, তাঁরা নিকদের কথাবার্তা এমনকি পছন্দই করেন। ফলাফল থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা কখনোই যাবে না যে, নিকসমর্থকদের প্রত্যেকেরই গোপনে একাধটা নিক আছে। তাঁদের আকর্ষণের একটা কারণ নিকসমূহের রূপকবহুল ভাষাও। যাঁরা এসব প্রশ্নে চুপ করে থাকেন, ধারণা হয় তাঁদের মনেও হয়ত নিকদের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থনই প্রকাশ পায়। তা নইলে কথিত নিকদের বন্ধুতালিকা থেকে মুছে দেবার ব্যাপারে তাঁরা অনাগ্রহ প্রদর্শন করবেন কেন? এঁদের সবাই তো আর আক্রান্তের শত্রু নন যে, শত্রুর পরাস্ত হওয়া দেখে তাঁরা আনন্দ নেবেন। আনন্দ আসলে তাঁরা নেনই, তবে সে আনন্দটি আসে ভাষা থেকে, রূপকের ব্যবহার থেকে। আমরা আমাদের পাঠক জীবনে এমন অনেক গদ্যরচনার আস্বাদ নিয়েছি, যাকে আমরা বলেছি কাব্যগুণসমৃদ্ধ। এই বিশেষণ প্রয়োগের প্রধান কারণ সে ভাষার পরতে পরতে বস্তুতে জেগে উঠেছে সপ্রাণ বাদ্যি, রূপকের ঢাক।

৬.

একটা বহুশ্রুত প্রবাদ আছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ বা ‘বউকে মেরে ঝিকে..’,। এই প্রবাদোপরিতলে যে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, কবিতায় প্রতীক ওই কাজটিই করে। যে বস্তুকে বা যাকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে তার কথা না-বলে বর্ণিত বস্তু বা ভাব বা ঘটনার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঠিকঠাক ঘটে এমন কিছু দ্বারা মূলকে প্রতিস্থাপিত করাই প্রতীকায়ন। আড়াল সৃষ্টির জন্য এবং সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য এটির দরকার হয়। শিল্পে প্রতীকের ব্যবহার খুব প্রচলিত ঘটনা। সঠিক প্রতীক ব্যবহার করতে পারা বিষয় ও বিষয়সংশ্লিষ্ট জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। প্রতীককে হতে হয় সুপ্রযোজ্য। একটি প্রতীকের অযথার্থ ব্যবহার একটি কবিতাকে মাঠে মেরে ফেলতে পারে। সব পাঠক সব প্রতীককে ঠিকঠাক ধরতে পারবেন সেরকম ভেবে ওঠা অসংগত। কিন্তু নিবিড় পাঠে তা অধিকাংশ অভিজ্ঞ পাঠকের কাছে গ্রাহ্য হয়ে ওঠা উচিত। ব্যবহার যথার্থ হলে তা না-হবারও কারণ খুব থাকে না। অবশ্য কবি যে অর্থে প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন ঠিক সেটাই না-বুঝে পাঠক অন্য কিছুকে বুঝলে মহাভারত ক্ষণিকের জন্যও অশুদ্ধ হয় না, যেহেতু পাঠকই কবিতার ‘মানে’কে জন্ম দেন তাঁর তাঁর মতো করে। কবিতার অর্থ পাঠকভেদে বদলে যেতে পারে, এটাই কবিতার শক্তি। এমনকি বলা চলে স্থিত মানের রচনা কোনো কবিতাই নয়। সেটাই কবিতা, যে টেক্সটের মানে পাঠে পাঠে বদলায়। এটা দূর করবার চেষ্টা কবিতার কবিতাত্ব নিয়ে খানিক সংশয়কে বরং উদ্বেলিত করা।

কবির সময়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক কারণ থাকে, যা তাঁকে আড়াল সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। এ তাঁর নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে তো বটেই, শিল্পের কৌমার্য রক্ষার্থেও দরকার। কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ঘটনার দ্রষ্টা হয়ে উঠতে হয়। আর এসবের ভিত্তিতে সামাজিক মানুষ হিসেবে তিনি নানা প্রেরণাও লাভ করেন, আবেগাপ্লুুত হন। কিন্তু খুব সরাসরি তিনি তা বলতে পারেন না। বললে তাঁর উপরে নানা খড়্গ নেমে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া শিল্প হিসেবে কবিতার সব কথা সবভাবে গ্রহণ করবার সক্ষমতা নেই, এটা মনে রাখতে হয়। এত অনর্থক ভার বইতে পারে না কবিতা। যে কারণে কবিকে বক্তব্য আড়াল করতে নানা প্রতীকের আশ্রয় নিতে হয়।

ভাষা সংকেতও আদতে প্রতীক। ভাষার প্রতিটি শব্দ এক বা একাধিক বস্তুর প্রতীক। কলিম খান অবশ্য বলেন, বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারের সবচে’ বড়ো সম্ভার সংস্কৃত ভাষা ছিল ক্রিয়াভিত্তিক। তৎসম শব্দসমূহের মাধ্যমে এ গুণ বাংলা ভাষায় স্বতঃস্থানান্তরিত। ক্রিয়াভিত্তিক ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর মূল অর্থ হয় ধাতুর। নির্দিষ্ট ধাতু থেকে উদ্ভূত সমস্ত শব্দের অর্থই নিয়ন্ত্রণ করে ধাতুর অর্থ। শব্দব্যাখ্যান কর্মের যে ছবি সামনে আনে, সেই কর্মের বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে শব্দটির গঠন কী হবে। এ মতে শব্দের অর্থ বাইরে থেকে আরোপিত নয়, ভিতর থেকে উৎসারিত। পরে মুনাফালক্ষ্যী বিনিময়কে শব্দার্থজাত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে অধিক লাভজনক করবার জন্য শব্দকে সুনির্দিষ্ট মানেবাহী করে তুলতে কিছু শব্দের অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে ফেলা হয়। যে কারণে কোনো-কোনো শব্দের ধাতুমূলগত অর্থ অজস্র হলেও শোনামাত্র কেবল এক-দুটি প্রাণী, বস্তু বা বিষয়কে বোঝায়। এটা স্বাভাবিকভাবে অজস্র অর্থ হওয়াকে আস্বাভাবিকভাবে সীমিত পরিসরে বেঁধে ফেলানো। এর মানে প্রসারিত অর্থকে সংকুচিত করে ফেলা, যেভাবে আমাদের বাংলা ভাষাও, অন্যসব ভাষার মতো প্রতীকী ভাষা হয়ে উঠেছে। সব ভাষাই সময়ের সাথে বদলে যায়, ভিতরে ও বাইরে। সংকুচিত হয় প্রসারিতও হয়। এর অনেকগুলো কারণ থাকে, কলিম খান মুনাফালক্ষ্যী বহির্দেশিয় বেণিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারণটিকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

অমুনাফালক্ষ্যী শিল্পসৃজনের প্রয়োজনেও যে শব্দের অর্থ কালে কালে বদলে যায়, এটাকে তিনি সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন নি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নামক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে অভিধানকে ভিত্তি করে কলিম খানের ক্রিয়াভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব দাঁড়িয়েছে, সেটি সংকলনকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মুদ্রিত দলিলে যে সমস্ত অর্থে যেভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার একটা যথাসম্ভব ভালো ডকুমেন্টেশন, সেখানে সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের উদাহরণসহ প্রাপ্ত অর্থসমূহ নথিভুক্ত হয়েছে। ভাষাসংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরেই শব্দের মানে বদলায়, নতুন মানে সংস্থাপিত হয়; এবং শুধু লিখিতভাবে নয় এটা হয় মৌখিকভাবেও। সচল ভাষামাত্রেরই ক্ষেত্রে এরকমটা ঘটে। ভাষা যত বিচিত্র কাজে ব্যবহৃত হয়, তত বিচিত্র হয় এর জগৎ, সমৃদ্ধি। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম সবচে’ বড়ো সেক্টর, যেখানে এই কাজটা হয় সবচে’ বেশি। এখানে প্রতিনিয়ত শব্দের মানে নড়েচড়ে যায়, প্রসারিত হয়। প্রসারণার্থে শব্দের এই প্রয়োগেরও সাহিত্যে প্রতীকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার কথা, যে ধরনের প্রতীকের ব্যবহার রচনাকে কবিতা করে তোলে। একজন কবিতাকর্মী একইসঙ্গে ভাষাকর্মী। তাঁর একটা কাজ এ-ও যে তিনি ভাষাকে সম্প্রসারিত করেন। ভাষার সম্প্রসারণ ব্যবহারিকভাবে ঘটাতে গিয়ে তিনি একটি কবিতা করলেন এরকম নয়, বরং কবিতা করতে-করতে একইসঙ্গে ভাষাকে সম্প্রসারিত করছেন। কবিতাটি যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন এই ভাষাকৃতিটা উপজাত।

শব্দে নতুন প্রাণসঞ্চারের এই কাজটি কবিতাকর্মীর একটি মুখ্য কাজ। শব্দ যদি নতুনভাবে খেলে ওঠে, অর্থটা যদি একটু মুচড়ে যায়, তাহলে পাঠক নড়েচড়ে বসে। ক্লিশে মানেযুক্ত করে ক্লিশে শব্দের ব্যবহার মৃত রূপকের ব্যবহার, যা আবার প্রতীকও। কবিতায় পাঠক মৃত রূপকের রাশি-রাশি লাশ দেখতে পছন্দ করেন না।

মিথ হিসেবে খ্যাত লৌকিক পুরাণ বা পৌরাণিক লোকশ্র“তিকেও প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। পৌরাণিক একেকটি চরিত্র বা ঘটনা অতীতের একটা চরিত্র বা ঘটনার গল্পকে ছোট শব্দশরীরের মধ্যে ধরে রাখে। গোটা কবিতায় একটি শব্দ হয়ে ব্যবহৃত হলেও ওর অনেক দীর্ঘ অদৃশ্য ফুটনোট থাকে। শব্দটি ওই ফুটনোটের প্রতীক। একজন কবি অবিকল অর্থেই শব্দটি কবিতায় ব্যবহার করলে ধরতে হবে তিনি মৃত রূপক বা ক্লিশে প্রতীক ব্যবহার করলেন। মিথের এরকম ব্যবহার গতিশীল নয়, নয় প্রগতিশীলও। হাজির করতে হয় এর নতুন বয়ান। পুরোপুরি অথবা অংশত, যেটা প্রাসঙ্গিক। ধরা যাক দেবী দুর্গাকে দশ হাতে কাজ করা গার্হস্থ্যকর্মী সক্রিয় নারীর রূপে দেখা হলো। এ প্রয়োগটিকে পাঠক আরো দূর পর্যন্ত কল্পনা করে নিতে পারবেন, যে, এতকিছুর পরও একজন গার্হস্থ্যকর্মী নারী ‘কর্মী’ স্বীকৃতিটা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে না এবং এর জন্য কোনো অর্থমূল্য দাবি করতে পারে না। কাজগুলো অনর্থক না-হয়েও না-অর্থক হওয়ার কারণে এই যে পুরুষতান্ত্রিক বঞ্চনা, এটা তখন হয়ে যেতে পারে ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগের একটা তাৎপর্যপূর্ণ আলোকপাত। মিথের এই মুক্তিটা কবিতায় প্রার্থিত।

৭.

ভালো কবিতার ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। পাঠকভেদে এর অর্থ তো আলাদা-আলাদাভাবে খোলেই, এমনকি একজন পাঠকের কাছেও উপর্যুপরি পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ধরা দেয়। যে কবিতার এ সম্ভাবনা আছে সে কবিতা বহুজনকে ছুঁতে পারে। গুমরমুক্ত ও একটিমাত্র সরল অর্থে ধরা দেওয়া একরৈখিক কবিতা হীনপ্রায়। কবিতায় অর্থের এই অস্থিরতা রহস্যময়তা সৃষ্টি করে করা সম্ভব। সময়ের জীবনছন্দ ধরে শব্দকে বাঁধাধরা পরিভাষার আওতা থেকে বের করে এনে দ্ব্যর্থক বা অনেকার্থক মানে জাগিয়ে তুলতে পারলে এ সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে সূচিত হতে পারে। এর জন্য উল্লম্ফন কার্যকর নয়, নন্দনগহ্বর তক বড়োজোর পাঠক নিতে রাজি হন। বাক্যের ওপর নিরর্থকতা বা অনর্থকতার ভার চাপাতে চাইলে ফাঁকি সৃষ্টি হয়, রহস্য নয়। অদূর এমনকি সুদূর চেষ্টায় হলেও শব্দ-বাক্যের নাগাল মিলতে হয়, তা নইলে কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। যাই হোক, এরকম কবিতার মানে কোনো একটি স্থির নির্দিষ্ট পাটাতনে দাঁড়ানো থাকে না, বলাই বাহুল্য।

সাধারণীকৃত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও কবিতার মানে নানাদিকে খুলবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একইসঙ্গে গাছের-মাছের, জীবন্মাত্রের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে সাধারণীকরণ। প্রতীকের ব্যবহারও কবিতাকে অনেকার্থকতা দিতে পারে। প্রতীকবস্তুটি বাইরে একটা মানে ধরলেও ভিতরে আরেক বা অনেক। প্রাথমিক পাঠে এর বহির্বাটির খোঁজ পাওয়া যায়। অগ্রসর পাঠে আস্তে আস্তে নিহিতার্থের দরজা খোলে। এক ধরনের পাঠক বাইরের মানেটা নিয়ে তৃপ্ত থাকে। কিন্তু সবাইকে ওই মানে তৃপ্ত করতে পারে না। গুমর বয়ন করা গেলে অগ্রসর পাঠকের জন্য খোরাক হতে পারে। ব্যাজস্তুতি-ব্যাজনিন্দাও এ শ্রেণির পাঠকের আগ্রহের আওতায় স্থান পেতে পারে।

৮.

আবেগ কবিতার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটা অদৃশ্য ঘটনা যে একে ছাড়া শিল্পসৃষ্টি, বিশেষ করে কবিতা লেখা অসম্ভবপ্রায়। অবশ্য আবেগ ব্যতিরেকেও কবিতামতো দেখতে রচনা তৈরি করা সম্ভব, যেটা অতি অবশ্যই হয় যান্ত্রিক, অতএব কবিতা নয়। এ ধরনের রচনা তৈরিকে পেশাদার কাঠমিস্ত্রির একের পর এক টেবিল-চেয়ার বানানোর সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। যতক্ষণ ব্যবহারোপযোগী কাঠ আছে, হাতুড়ি-বাটালি আছে, বাইস আছে, ততক্ষণ কাঠমিস্ত্রি অবিরাম বা সবিরাম চেয়ার-টেবিল বানিয়ে যেতে পারেন। একটি চেয়ার ও টেবিলের শিল্পকর্ম হয়ে ওঠবারও অবকাশ থাকে, কিন্তু পেশাদারি উন্মাদনায় ভেতরের টান ছাড়া নির্মিত চেয়ার-টেবিল তা হয় না। একইরকমভাবে একজন কবিতাকর্মীকে কাগজ-কলম-পরিসর দিলে যখন-তখনই তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতামতো লেখা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটা পেশাদারি উপায়ে তৈরি চেয়ার-টেবিলের মতোই যান্ত্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যমার্কা একটা ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। পেশাদার ঔপন্যাসিকদের হাতে যেরকম ফল ফলতে থাকে অবিরাম। তাঁরা হলেন বারোমাসী ফলগাছ। বছরে হরদিনই সেসব গাছে ফল থাকে।

সত্যিকার কবিতা রচিত হতে গেলে তার মধ্যে আবেগের পরিমিত প্রকাশ ঘটতে হয়। এই প্রকাশ ঘটায় আবার ইন্সপিরেশন বা প্রেরণা। দাঁড়ালো তাহলে এই যে, যে-প্রেরণার গুত্তো খেয়ে বিষাদ, ক্রোধ বা আনন্দ জাতীয় আবেগ উসকে উঠবে, তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সৃজিত মানেযুক্ত রচনার কবিতাবস্তু হয়ে ওঠবার অবকাশ থাকে। অর্থাৎ আবেগ যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি অত্যাবশ্যক তার সুনিয়ন্ত্রণ। ধরা যাক, কোনো কারণে অত্যধিক ক্রোধ সঞ্চারিত হলো মনে। ঠিক তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনায় উপগত হলে এটির কবিতা হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা লোপ পায়। ক্রোধটাকে সামগ্রিকতার ওপরে দাঁড়াবার জন্য সময় দিতে হয়, তাতে তা আর ব্যক্তিগত ক্রোধ থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন, সাধারণ। এই সর্বজনীন ক্রোধ যদি কোনো একটি রচনা উৎপাদনের নেপথ্যে ভূমিকা রাখে, তবে তার মাধ্যমে সৃজিত রচনাটি কবিতা হলেও হতে পারে, এমনকি খুলে যেতে পারে তার সর্বজনীন হয়ে ওঠবার সম্ভাবনাও। চীনা একটি প্রবাদ আছে এরকম যে, রাগান্বিত অবস্থায় কখনো চিঠির জবাব দিতে নেই। কেন? ওই একই কারণে। নইলে যাকে জবাব লেখা হচ্ছে, তার প্রতি অবিচার হয়ে যাবার সম্ভাবনা শয়ে প্রায় শ’। রাগ প্রশমিত হয়ে যখন ব্যাপারটা সূক্ষ্ম ক্রোধানুভূতিতে রূপান্তিত হয়, তখন তার পক্ষে সম্ভব সামগ্রিক অবস্থার মূল্যায়ন করা ও মত স্থাপন করা। ওই প্রাবাদিক সত্যটা কাজেই এখানেও নিহিত।

কবিতায় তাৎক্ষণিকতার এই বিপদাপদ সম্পর্কে কবিমাত্রেরই সচেতন থাকা আবশ্যক জ্ঞান হয়। এর মানে কি এই যে সুতীব্র উন্মাদনার ভিতরে আনন্দ, বেদনা বা অন্য কোনো অনুভূতির কথা লেখাই যাবে না? না, তা নয়, একদমই নয়। লেখা যাবে। কারো কারো হাতে এভাবেও উৎকৃষ্ট রচনা বেরিয়ে আসা সম্ভব বৈকি, তবে এতে নিকৃষ্ট রচনা তৈরি হবার ঝুঁকিই বেশি থাকে বলে মনে হয়। সুতীব্র উন্মাদনাজাত রচনার খসড়াকে কবিতায় রূপ দেবার জন্য অনেক কাল ফেলে রাখাই সঙ্গত। এটা কতদিন, তার কোনো সুস্পষ্ট সীমা নেই। তবে এরকম বলা যায়, যতদিন ওই নির্দিষ্ট অনুভূতি, যা নেপথ্য কাণ্ডারি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল, তা একটা সামগ্রিকতার ওপরে না-দাঁড়ায়, ততদিন। নির্দিষ্ট সময় পর ওই খসড়ার একটা নিরাবেগ সম্পাদনা-শাসন দরকার হয়। ঝেড়ে ফেলতে হয় তাবৎ উৎকট অবস্থা, একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। দেখতে হয়, ওই টেক্সটে কোনো কিছুই যেন ময়লা দাঁত বের করে হাসতে না-থাকে। যেন ভদ্র জনসমাগমের ভিতর দিয়ে নিবস্ত্র হয়ে হাঁটতে শুরু করার মতো কোনো ঘটনার ওটা জন্ম দিয়ে না-বসে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটা বিপদসংঘটনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বুদ্ধির সাথে অনুভূতির একটা তুমুল ঝগড়ার মোকাবেলা করতে হতে পারে সম্পাদনাকালে। এই ঝগড়ার মীমাংসাটা কে কীভাবে করবেন তা নির্ভর করে তাঁর কাব্যরুচি, মেজাজ, বিশ্বাস ইত্যাদির ওপর। সবচে’ ভালো সম্ভবত বুদ্ধি বা অনুভূতি কারো একার হাতেই পূর্ণ শাসনভার ছেড়ে না-দিয়ে দুয়ের একটা বিবাহসম্পর্কে আস্থা রাখা।

৯.

ইমাজিনেশন হলো সংবেদন ও ধারণার মনছবি আঁকবার সামর্থ্য, যা ওই বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ-দর্শন বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা ধারণযোগ্য নয়। এটি তৈরি হয় বুদ্ধি ও আবেগের সংমিশ্রণে। ছবিমাত্রকেই ছবিকল্প ভাববার একটা রেওয়াজ আছে আমাদের মধ্যে। একটিও দৃশ্য বা শ্র“তিকল্প নেই এমন কবিতাও ইমেজারিতে ঋদ্ধ বলে প্রশংসিত হতে দেখা যায় হামেশা। আমরা এত যে দিলখুশ হই সহজনের প্রতি, ঘেন্না লাগে। আর অন্যদিকে চলতেই থাকে ‘যারে দেখতে নারি’র চলনকে চিরকাল বাঁকা ঠাওরানো দাপুটে বাসনার বজ্জাতি।

মন কীভাবে এসব ছবি তৈরি করে? কল্পনা দিয়ে ভেবে শব্দ দিয়ে ধরাধরির মাধ্যমে। কল্পনার সীমাটা কী? সীমা প্রায় নেই। কারণ যা পূর্বাভিজ্ঞতায় নেই এমন কিছুই মনের চোখ দিয়ে দেখা দরকার হয় ইমেজারি নির্মাণের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে শতভাগ মুক্তি দরকার হয় কল্পনার। অথবা হতে পারে পূর্বে অংশত বা অন্য আঙ্গিকে অভিজ্ঞতায় ছিল। এক্ষেত্রে রকমফের থাকছে মাত্রায়।

তো, এই মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে কি না সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁকে চরম স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তিনি সেই স্বাধীনতাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছেন কি না সেটা একটা সংগত বিবেচনা। অবাধ স্বাধীনতা ভোগের অধিকার লাভ করা মাত্র আমি যদি হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দেই আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দেই মাছের যৌনতাসহ, যেহেতু কাজটা যথার্থেই সংঘটিত হওয়ার দরকার হচ্ছে না, শব্দ-বাক্যের কারসাজিতেই ঘটিয়ে দেয়া যাচ্ছে সব; দোষ কি আছে তাতে? আছে। এটা ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁ’পাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেয়ার মতো ব্যাপার। পাঠকচিত্ত কতটা স্বস্তি পাবেন এহেন ভোগচর্চায়? এজন্য মাঝেমাঝে মনে হয়, সীমা বোধকরি এরও আছে কোথাও। যাই কল্পনা করি না কেন মানব ধারণায় তাকে সম্ভব মনে হতে হয়, অন্তত পরোক্ষে, তাহলেই কেবল সেখানে সৌন্দর্য ভর করবার ফুরসৎ পায়, অন্যথায় সৃষ্টি হয় অসামঞ্জস্যতা, যা কবিতার এক নম্বরের শত্রু।

যেখানে মনছবির প্রশ্ন, সেখানে মনই গুরু। যার মন যেরকম ছবির জন্ম দিতে সক্ষম, তিনি তেমনি আঁকবেন। পাগলামি বা উন্মত্ততার ব্যাপারটাও এখানে উল্লেখ্য। পাগলামি অনেক উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, আবার এ বৈশিষ্ট্য প্রলাপেও নিপতিত হতে পারে। যিনি পাগল বা উন্মাদ, তাঁর সামনে কোনো সীমারেখা বেঁধে দেয়া যায় না, সেটা সম্ভবও নয়। মনছবি আঁকবার ওই বিশিষ্ট সময়ে তাঁর মন-মস্তিষ্ক যে অবস্থায় বিরাজ করছে, সে অবস্থারই উৎপাদন সামনে আনবেন তিনি। ওটা কদ্দূর মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যে থাকল না-থাকল, সেটা পরে বিবেচ্য। তবে হ্যাঁ, একটা মাত্রার সূক্ষ্ম উন্মাদনা ভালো মনছবি আঁকবার জন্য খুবই দরকারি বিবেচ্য হতে পারে। এ অবস্থা যুক্তিশৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, স্বাভাবিক অবস্থা যে সুযোগটা মোটেই দিতে চায় না।

১০.

কবিতা সময়ের জীবনছন্দ টের পায়। জীবন যে মাপে এগোয়, সময় যেভাবে হাঁটে, কবিতাকেও সেভাবে হাঁটতে হয়। তা নইলে সময়ের কবিতা লিখিত হয় না। একজন কবি সমসময়ে যাপনধর্ম পালন করে পঞ্চাশ বা একশ’ বছর আগের কবিতা লিখুন, তা চান না পাঠক। এটা শুধু বিষয়ের মামলা কী শব্দার্থেরও মামলা নয়, মামলা ছন্দেরও। প্রতিদিন কবিতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয়, শব্দে যুক্ত হচ্ছে নতুন মানে, ছন্দ কেন পুরানোটাই থাকবে? নতুন মোড়কে পুরানো জিনিস যেমন প্রার্থিত নয়, তেমনি নয় পুরানো মোড়কে নতুন জিনিসও। কাজেই ভেঙেচুরে ওর বারোটা বাজিয়ে দিতে হয় যেকোনোভাবে। একটা কথা ওঠে প্রায়, যে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দকে ভালো করে জানলেন না বুঝলেন না তিনি ভাঙবার অধিকার পাবেন কোন বিবেচনায়? খুবই সংগত কথা। জেনে ভাঙাই ভালো। কিন্তু যিনি ওটা ভালো করে জানবার তাড়নাই বোধ করলেন না ভিতর থেকে, ভাবলেন একটা শৃঙ্খল, তাকে ব্রাত্য চিহ্নিত করবার অধিকারও কেউ রাখেন না। প্রয়োগের উদাহরণসহ ভালো করে প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ শেখা এক সপ্তাহের ঘটনা মাত্র। নিজে প্রয়োগে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে মোটমাট তিন মাস। একজন লেখক তাঁর লেখক জীবনে কাড়ি-কাড়ি জটিল বইয়ের এদিক দিয়ে ঢুকে সম্পন্ন হয়ে যদি ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, তার কাছে এক সপ্তাহের ওই কথিত আয়োজনটা যে গুরুত্বপূর্ণই মনে হলো না, এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখাও জরুরি বৈকি। কবিতা বস্তুত মুক্তি চায়। তা এমনকি বিখ্যাত কবিতাবলিঘনিষ্ঠ কাব্যিক ঐতিহ্য-- তার আবহ, শব্দরুচি, বাক্যগঠন শৈলী, বিষয়ভাবনা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক ভার, আভরণের ঘটা, ছন্দ সবকিছু থেকেই। এই মুক্তির মন্ত্রে যিনি বুঝেশুনে দীক্ষা নেন, তাঁর কাছে খোঁয়াড়প্রতিম একটা আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতেই পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দের নিটোল ব্যবহারে শাসিত অনেক কবিতার দিকে ভালো করে তাকালে দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। মনে হয় ওখানকার শব্দেরা, বাক্যেরা যেন মাত্রাতিরিক্ত শাসন সয়ে রীতিমতো কাঁচুমাচু হয়ে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। বনসাই বনসাই একটা চেহারা। এ অবস্থা থেকে যত দ্রুত বেরোনো যাবে ততই মঙ্গল। একটা কথা বলা হয় যে, ছন্দ কবিতাকে স্মৃতিতে রক্ষিত হতে সাহায্য করে। সে তো করেই। কিন্তু এ বিবৃতি কি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক তিন প্রবীণ ছন্দের বেলায়ই প্রযোজ্য? যিনি এই ছন্দগুলোর খড়্গের নিচে গলা বাড়িয়ে রাখেন না, তিনিও কি কবিতা ছন্দেই লিখেন না এক ধরনের? কবিতা হতে হলে টেক্সটের মধ্যে ভাষার যে সামঞ্জস্য তৈরি হতে হয়, গতি অব্যাহত রাখতে হয়, পাঠস্বাচ্ছন্দ্য স্থাপিত হতে হয়, এ কি কোনো ছন্দ তৈরি করে না? জীবনছন্দ কি ছন্দ নয়?

সবিশেষ, আমাদের দরকার ভালো কবিতা। কবিতাটা কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে উঠল, শৃঙ্খলের ভিতরে থেকে নাকি বাইরে এসে, সেটার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। কিন্তু শৃঙ্খল ছিল বলে মুক্তির পক্ষে কিংবা মুক্ত ছিল বলে শৃঙ্খলের পক্ষে দাঁড়িয়ে তরবারি শানানো অবশ্যই বন্ধ হওয়া আবশ্যক। একটা ভালো কবিতা পেলে বলে বসাও যায় যে, ‘সাত খুন মাফ’। কিন্তু ভালো কবিতা কোনটাকে বলে? ভালো কবিতা সেটা, যে কবিতা নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে অন্য কবিতাকর্মীকে সংক্রামিত করতে পারে, এমনকি প্রভাবিতও।

ঢাকা, জুন ২০০৯

রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০০৯

কবি মুজিব মেহদীর কবিতা ও উভলিঙ্গ রচনা

ছয়টি কবিতা

অনন্তকথা
...........

মুহূর্তের গান মুহূর্তকে মহিমান্বিত করে অনন্তে মিশে গেল
অনন্ত হলো অনন্ত যা অনন্তের দিকে অনন্তকাল ধরে হাঁটে অনন্তর

মুহূর্ত প্রতি মুহূর্তে জন্মায়, আর অনন্ত সর্বদা অনন্তে মিলায়
এই হলো মুহূর্ত ও অনন্তের মধ্যকার প্রেমভাব চিরটানাটানি

আমরা তার চেয়ে থাকি গমনপথের দিকে
মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শুনি কোরাস কাহিনি বাজে

কোথা বাজে কিছুতে নাগাল না-পেয়ে তার
দেহ রেখে অনন্ত টানেলে এক হাঁটতে থাকি অনন্ত লয়ে



গুমরসম্মত
............

সকল দরজা হাট হয়ে গেলে রহস্যক্ষেপণ ঘটে প্রাসাদের
শূন্য হোক তবু লাগে চাবিহীন পুরানো সিন্দুক, গুমরসম্মত
মানুষ কেননা একজীবন সাবাড় করে দিতে পারে
রহস্যসূত্র সন্ধান করে করে

অকপটতা গুণ ধর্মের
তবু বহুদিন ধর্মের ছিলে না-হয়ে ধার্মিক

বাইরের আলো ঘরে আসে তো আসুক
ঘরের আলোক যাতে বাইরে না-যায়
রাখো তার পাকাপাকি আয়োজন করে
সভ্যতার তরী বেয়ে আসা এইসব

সার সার স্থাণু কর মুদ্রারসদের গোপন কলস
রহস্যসমিধ কিছু দৃশ্য হোক প্রাসাদের ঘুলঘুলি পথে
বিস্ময়ে আবিষ্ট হোক অভ্যাগতজন



পুনরাবৃত্তিময়
.........

একটা পথের শেষে আরেকটা পথ নয়
পুরানো পথের ধুলায়ই বুঝি শরীর রঞ্জিত হলো

তোমার সমূহ ছুঁয়ে থেকে আরেকটা আকাশ বিহার
হলো না বিশেষ
একটা পাতার সবুজে নিবিষ্ট হয়ে
দেখতে দেখতে পুরোটা জীবন প্রায় ক্ষয়ে গেল

পরিধি ডিঙিয়ে কোনো নবোদিত ঠিকানা খোঁজার
সামর্থ্য হলো না
খুঁটি পোতা একটা খাসির মতো ঘুরে ঘুরে
মাঠের ছালচামড়া শুধু উঠিয়ে চলেছি



এমভি নন্দিতা
..........

তুমি এসে ধাক্কা দিলে আমার পন্টুনে
ধ্বনি-প্রকম্পনে সমুদ্র ঈগলগুলো কেঁপে ওঠে
মোহনার জলমাখা গোপন বেদিতে
রৌদ্রগন্ধময় হাওয়া এসে খেলে

সমতল ফুঁসে আসা জল
পাটাতন ছুঁয়ে গেলে
যৌথ-যুগ্ম যে সৌন্দর্য জন্ম নেয়
তার কষাঘাতে হই আমিও ঈগল

কাঁপি, বিশাল তোমার দাহে



মৃত্যু
.....

জীবনের ভিতরে আজ মৃত্যুর লোমশ একটা হাত ঢুকে গেছে
আনাচেকানাচে তার জন্মেছে পাথরকুচি

মৃত্যুর মরণ নেই


নোনাধ্বনিকথা
........

স্তূপ স্তূপ এত-যে ভস্মগিরি ছড়ানো হাওয়ায়
এসব আমার-- আমাদের সময়ঘটিত
বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার থকথকে যেন কোনো অনিবার ক্ষত
ক্লেদ-গ্লানি রূপভেদে এইমতো লভিয়াছে আর্ত-অবয়ব

আমাদের হত-আশাগুলি
এবং তাদের শবাবশেষের এই সারি সারি বর্জ্যটিলা
নির্বাসনে দিয়ে আসি চল উপকূলে, বদ্বীপান্তরীপে--

মানুষের এইসব স্বপ্নভস্মসার
হররোজ গাছে গাছে সবুজ-অভাব
নিঠুর এই সময়কথাগুলি লেখা আছে নোনাভাষারঙে
পেরাবনে পাতায় পাতায়


দুটি উভলিঙ্গ রচনা
............
তেরহাট্টাবেলা

রয়েছি আতংকে আজ ফুরাবে প্রিয়তম বায়ু, যতনে রেখেছি যারে এতদিন না ফেলে না ছড়ে', দূর পরবাসে এসে মনে হলো অবজ্ঞা করেছি কিছু, প্রেমের নামে খানিক কামের আভাস ছিল

আজ যারা জীবন নামের খাঁচা বয়ে নিয়ে যথাসাধ্য দৌড়ে চলেছে, কারো কাছে এই পাখি হয়ত অদরকারি, হয়ত সাধনা নেই তাদেরও আমার মতো, মোম জ্বেলে কেউ কভু বসে নি গাছতলে, অমল ধবল এই রাতখানি আজ দেখি সহসা আঁধার, মনে হয় আর বেশি দেরি নেই, যেভাবে ফুরাচ্ছে দিন যেভাবে রজনী, তার চেয়ে দ্রুতপদ বিজলীও নয়

এই যত ভ্রমণের কস্তুরি কড়িফুল পথের পাশের থেকে কুড়িয়ে রেখেছি মনে, এই যত মানুষের রগড়ের ক্লেদমালা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, দেখে দেখে এতদূর আকাশে চড়েছি, আমাকে তাদের থেকে দূরে দেখে, বেজায় কৃপণ এক তালপুকুরের বাঁশি একাকী বেজেছে

নেই বলে স্বস্তিমালা নেই বলে নিরাপদ ক্ষণ, চোখ জোড়া বন্ধ করে বসে থাকি, মায়ায় জড়িয়ে কখন আসবে ভাবি একটি আশ্বাস, সামনে দাঁড়িয়ে বলবে দেখ, এ আমার যাবতীয় কেবল তোমার লাগি, আস চুমে দেই চুদে দেই, খেলায় খেলায় মেতে পার করি তুচ্ছ এ জীবন, হেসে হেসে, তবু যে একলা এলে এই মতো অচেনার পাড়া, মাটির ওজনে যদি তোমাকেও গুলে নেয় ওরা, কী আর করবে তুমি, কোথায় দাঁড়াবে শেষে গিয়ে, সস্তা কার গায়ে মাখা সাবানের পাশে

ওরা যে পাতার বাঁশি ডেকে নেয় সুর দিয়ে, বলে বসো, আমি কী তার চেয়ে সুর তাল কম জানি, আমি কি খেয়াল জমিয়ে রেখে তানপুরা আকাশে তুলি না সুরে সুরে, আমার সেতার শুনে তারাই বাহবা বলে, সেতারের বাজনাটা যারা যারা শুনেছে জীবনে

দড়াম হাওরের এই জটলাগা ভূয়ে, জয়শ্রীপাড়ায়, যত ভুখাদের মুখের দিকে চেয়ে থেকে ভাবি, কোনো এক আফালের দিনে, পাশে এসে দাঁড়ানো না গেলে ভরা বর্ষায়, জলের কী রীতি হয়, ঢেউয়ের কী হুংকার বাজে বিশাল আকাশে উঠে, আমি তার কিছুই পাব না খুঁজে, এই যে আপদমালা এই যত ভাসা পানি, নদীবিধৌত যত বানটান, গভীর খরার কোনো বেয়াড়া মৌসুমে যদি কেউ না দাঁড়ায় পাশে, এইসব মক সেশনের তবে আসলেই মানে নেই কোনো

শুধু শুধু কিছুক্ষণ গলাবাজি হলো, কিছুটা বা আঙুলবাজিও, কোথাও ফুটে নি তবু রূপ, এতসব কথামালা, টানে নি ধরে কোনো অর্থের সূতো, সহসা দেখানো হবে বুড়ো কোনো আঙুলের চূড়া, যদিবা কেউ এসে দেখে এই খেল মনোযোগে, তবু এ জার্নিটুকু রয়ে যাক চুপচাপ, সে কবির শ্মশ্রুর সফেদ বরণ আমায় বেঁধেছে প্রাণান্ত করে, ভুল বুঝে সকলেই তাকাবে অদূর বোলে, অথচ কাছেই ছিল সূত্র একখানি, তার চেয়ে দীর্ঘদেহী হয়তবা হবে

দেখনদারিটা আজ জমেছে বেজায় দেখি, দেখনদারি, গুণবিচারের বলে কেউ যদি একদিন এইমতো বলে বসে, আমার খানিকখানি শান্তি রয়েছে, আরো একদিন আরো ম্যালাদিন, এইমতো করতে পারি যদি, তবে জানি তেমন এক রঙমাখা রোদ, খেলে যাবে আমার ভিতরে, আর জেনো এই রোদ হাওর বেলার, এই রোদ নদীপরিবেশে, ধূসর রঙের চেয়েও স্বচ্ছ কোনো বেদনা ধরেছে বুকে

সরাতে হবে মায়ার এ পরশ, যেখানে রয়েছে জেগে নাশপাতি বেলা, আহারে কথার মানে, আহারে কথার মানে চুরমার হয়ে যায় মানুষে মানুষে, যেভাবে বদলে যায় রূপারূপ মানুষের হাতে, চোখে মুখে, পাখিবেলা দেখা যাবে পাখিদের সাথে, কী করি এর চেয়ে বসে বসে, ঘুমিয়েই কবিতার স্তন আজ ছোঁব, বাতাসী আকাল দিনে এইমতো সুখান্ধকারে

তোমাদের সাথে মিলে যেই কথা বলি, সেই কথা আমি একা বলেছি নিজের থেকেও, এটা তবে প্রভাব পাখির গান, আমি যদি তেমন না জানি খেলা, খেলব কেমনে তবে, ঝড়োরাতে দূরপরবাসে, তবু এই তেরহাট্টাবেলা, তেরটা সুরের রশি টেনে ধরে, কোনোদিকে একা একা হাঁটতে লেগে যাব, লেগে যাব হয়ত-বা জানপ্রাণ দিয়ে



পাতাদের ঝরে যাওয়া মানুষের অনিবার্য মৃত্যুরই প্রতীকী ব্যঞ্জনা
....................................

লোকটার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার কথা ছিল ইস্রাফিলের শিঙাটা বেজে-না-ওঠা পর্যন্ত, কিন্তু ব্যত্যয় ঘটাল পাখিটা, অনেক পাখি আছে পৃথিবীতে, স্বর্গেও থেকে থাকবে হয়ত, যাদের বেশ ভালো লাগে, কী রূপে কী গুণে, অথচ নাম জানা যায় না, এরকম একটা পাখিরই কাণ্ড ছিল এটি, আগে কখনো এ পাখিটার গান শুনেছিল কি না মনে করতে পারে না সে, তবে সে চোখ কচলাতে কচলাতে এমত ধারণা করে যে, পৃথিবীর মানুষ ততদিন অন্তত আনন্দকে বুঝবে, যতদিন এই জাদুর পাখিটা গাবে

তার যখন বাঁশের চাঙাড়ি ও নতুন করে গজিয়ে ওঠা মাসকালাই গাছে মোড়া মাটির আস্তরণ ভেদ করে উঠে আসতে হলো, সহসাই, প্রাক-বিবেচনা ব্যতিরেকে, তখন দুপুর, নদীর অন্তরে তখন নীল আকাশের ছায়া, আকাশের অন্তরে নদীর, আর তখন শনশন বাতাস বইছিল, আকাশের নীলশাড়ি তোলপাড় করে দিচ্ছিল রূপসী নদীর স্রোত, গ্রীষ্মের এরকম রোদেলা দুপুরে কবরের ভেতর ভ্যাপসা গরম থাকতেই পারে, কিন্তু সে কখনো এজন্যে নিজেকে নদীর দিকে বয়ে নিয়ে যাবার কথা ভাবে নি, কেননা পাখিটা ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে এর মানে এ নয় যে তাকে হাঁটতেই হবে, মোটকথা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে সে কখনোই কোনো কিছু করতে উদ্যত হয় নি, কাজেই আপনি বা আপনারা দয়া করে এমত ভাববেন না যে, লোকটা নিজস্ব কোনো স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অন্যত্র গমন করছিল, এবং এটা যে, পাখিরা সবসময় এ ধরনের কার্যক্রমে আনুকূল্য দিয়ে থাকে, সে যাচ্ছিল অথবা যাচ্ছিল না, যাচ্ছিল, কেননা সে প্রতিমুহূর্তে স্থানচ্যুত হচ্ছিল, যাচ্ছিল না, কেননা তার সামনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না, এবং তার ভাবনারা একাসন তথা নড়চড়হীন ছিল, পায়ের নিচে মচমচ করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল শুকনো ঝরাপাতা, আর তার উপলব্ধিতে এসে ধাক্কা দিচ্ছিল এক ধরনের নাকী কান্নার সুর, যা অস্পষ্ট, এটি তাকে অন্যরকম করে ভাবাল, সে নিশ্চিত হলো যে, মৃত ও ইতোমধ্যে শুকনো এসব পাতা, যেগুলো দলিত হচ্ছে চারজোড়া পদ-সঞ্চালনে, সেসবের অন্তর্গত বেদনারা তার কর্ণকুহরে অসম্ভবরকম আকুতিময় অনুযোগ তুলছে

মৃতের কোনোরূপ বাদ-প্রতিবাদের শক্তি যে নেই, একথা তার চেয়ে বেশি আর কেউ বোঝে না বস্তুত, কেননা সে নিজে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কেননা তার সকল প্রকার বাদ-বিসংবাদের ক্ষমতা ইতোমধ্যে রহিত হয়েছে, এরপরও তার এরকম ভাবনা রহস্যপূর্ণ তো বটেই, অবশ্য পৃথিবীতে ভাববার মতো এত বিষয় থাকতেও, এ মুহূর্তে ঝরাপাতা বিষয়ে ভাবাটা তার জন্যে প্রাসঙ্গিকও বটে, জঙ্গলে বাসজনিত কারণে বন্যপাখি, প্রাণী ও বৃক্ষাদি, সপ্তাহচারেক থেকে তাকে মাত্রাতিরিক্ত আচ্ছন্ন করে আছে, বন্যপ্রাণী বিষয়ে তার ভাবনা এ-যাবৎ বিমিশ্র, এরা চালাক ও একই সঙ্গে বোকা, যেমন এই শেয়াল দু'টো, যারা ধূর্ত খেতাবধারী অথচ চরম বোকামির পরিচয় দিচ্ছে এখন, তার মাংসহীন কঙ্কালটাকে আগ্রহভরে বহন করে, তবে পাখিদের ব্যাপারে তার ভাবনা সবসময় ইতিবাচক, এরা গান গায় আর ঘুম ভাঙায়, ঘুম ভাঙায় আর গান গায়

আপাতত পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ নেই, সে এবং তারা এখন নদী তীরবর্তী মোটামুটি বৃক্ষহীন একটা চালায়, কিন্তু কান্নার তীব্রতা তাকে আগের মতোই হানছে, বুঝল সে, এবং এ-ও বুঝল যে, এবার তার কিছু বলা দরকার পাতাদের উদ্দেশে, এই যে-- 'অত চ্যাঁচিও না, আমাকে এবং তোমাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার নির্দেশেই তোমরা ঝরেছ, যেমন একদিন আমি ঝরেছি, যেদিন স্বর্গবৃক্ষ বর্জন করেছে আমার বৃত্তান্ত লেখা পত্রটি', কিন্তু বলতে কি আসলে পারে সে, তার ঠোঁট নেই, জিহ্বা নেই, কণ্ঠ নেই, পচে-গলে গেছে

সামনেই জলপাই গাছ, বিস্ময় মানতে হয় বৈকি, এরকম স্থানে সে জলপাই গাছ জন্মাতে দেখে নি আগে, পৃথিবীতে, ঠিক নদীর ধারে, আগে দেখতে পেলে এ গাছের নিচে এসে বসা যেত, একা অথবা সস্ত্রীক, এর সমস্ত পাতাই সুন্দর যেগুলো সবুজ, আর যেগুলো মুমূর্ষু ও কমলা-লাল, আরো সুন্দর, আহা পৃথিবী, সে কি কোনো অংশে কম সুন্দর দেখবার চোখ থাকলে, এখানে যেমন নরকের ছায়াপাত ঘটে, তেমনি স্বর্গের, অবশ্য এ মুহূর্তে সে পৃথিবীতে স্বর্গের উপমা খুঁজতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, যার একটিতে ঢুকবে বলে সে সপ্তাহচারেক ধরে রেওয়াজ সারছে, স্বর্গকে বিস্তারিত জানতে পারে নি সে এখনো, অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো জেনেছে, মৃত্যুর দিনকয় পর একজন রহমতের ফেরেশতা তাকে নিয়ে গিয়েছিল স্বর্গের দরজা অবধি বোররাক এর মতো দ্রুততায়, আবার তার সঙ্গেই ফিরে এসেছে সে কবরে, মোটামুটি প্রাথমিক হিসেব-নিকেশ সেরে ফেলবার জন্যে, প্রতিদিনই কবরে তার কাছে বিভিন্ন ফেরেশতারা আসছেন বিচিত্র সব খাতাপত্র নিয়ে, পৃথিবীতে বাসকালীন তার অর্জিত পাপ ও পুণ্যগুলোর একত্র সন্নিবেশ ও যোগ বিয়োগের পালা শেষ হলেই মাটির বিছানা থেকে তার ছুটি হবে, কবরকে তার কাছে হাজতখানার মতো লাগছে, কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে এখান থেকে সরে পড়বার পক্ষে সে, আর তাছাড়া সে জেনে গেছে, ছোটখাট যে পাপগুলো করেছে সে পৃথিবীতে, সেগুলো তার স্বর্গগমনকে বাধাগ্রস্ত করবে না, একজন মিশুক ফেরেশতা আগেভাগেই তার কানে কথাটা বলে গেছেন, কেননা সে সৎকর্মে ব্রতাবস্থায় আততায়ীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে, সে জানে, যদিও এটা অনুমাননির্ভর, তবু বলা যায় যে তার সম্মানিত আততায়ী এখনো বেশ সুন্দরভাবে স্বাভাবিক বেঁচেবর্তে আছে, কেননা জগতের ওরা বেশ প্রভাবশালী সদস্য, প্রচুর প্রতিপত্তি আছে, আর সে যতদূর জেনে এসেছে পৃথিবীর রীতিনীতি, তাতে নিঃসন্দিগ্ধ হওয়া যায় যে, তার মৃত্যুর সঠিক রহস্যটি কোনোদিনই উন্মোচিত হবে না, কমবেশি যেখানে যা প্রযোজ্য, অর্থ দিয়ে যেকোনো ছিদ্রই বন্ধ করে দেয়া যায় পৃথিবীতে, কেবল এখানে, এখন সে যেখানে আছে, বাঁ'হাতের কারবারটা পুরোপুরি অচল, কেননা ফেরেশতাগণ উৎকোচ গ্রহণ করেন না, কাজেই সে এই ভেবে মনে-মনে আনন্দিত হয় যে, ওই লোকটি, যে তাকে অকারণে খুন করেছে, তারও একদিন এখানে আসতে হবে বুকপকেটে আদ্যন্ত গড়ের মাঠটাকে পুরে নিয়ে

জলপাই গাছটির নিচে এসে থামল বাহকদ্বয়, সে দেখল ওপর দিকে চেয়ে এবং ডানে-বাঁয়ে, ভালো লাগল আরেকবার, অন্যরকম, এরপর সে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখল যে, সূর্যটা ঢেউয়ের তালে তালে খেলছে, কখনো বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, আবার জোড়া লেগে হয়ে যাচ্ছে আগেরটাই, এসময় একসাথে প্রায় তিনটে পাতা ঝরে পড়ল তার ওপর, শেয়াল দু'টো চমকাল, এমনকি সে নিজেও, যখন এইমাত্র ঝরা পাতা তিনটিও বনের ভেতরকার পাতাগুলোর মতো নাকী কান্না জুড়ে দিল, ব্যাপারটা ঘটল তখনই, গাছে যেসব পাতা অপেক্ষায় ছিল ঝরে পড়বার, কমলা-লাল, কোরাসে গেয়ে উঠল গয়বিসংগীত-- 'সবুজ ফিরায়ে দাও-- সহসা ঝরব না, আনি তো সুসাম্য-- করি তো প্রার্থনা, আমাদের এ প্রয়াণ-- নিসর্গে কাম্য না'-- এবার অবশ্যই তার কিছু বলা প্রয়োজন, অনুভব করল সে, এবং হঠাৎ সূত্রটাও পেয়ে গেল, মনে পড়ল, তার চোখ নেই কিন্তু সে সব দেখতে পাচ্ছে, কান নেই কিন্তু শুনতে পাচ্ছে, মস্তিষ্ক নেই কিন্তু ভাবতে পারছে, অতএব যৌক্তিকভাবে তার বলতে পারাটাও উচিত, এবং তা কোনোভাবে সম্ভব হয়ে উঠতেও পারে

অকস্মাৎ নড়ে উঠল কঙ্কালটা, আর তার ভেতর থেকে গমগম আওয়াজ উঠল আধিদৈবিক-- 'তোমাদের ঝরে পড়া মানুষের অনিবার্য মৃত্যুরই প্রতীকী ব্যঞ্জনা...', শেয়াল দু'টো তখন ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়াতে থাকল দুই বিপরীত দিকে