বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০০৯

'আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার'

আহমাদ মোস্তফা কামাল

[উৎসর্গ : প্রিয় ব্লগার একরামুল হক শামীমকে, যার জীবনানন্দ-প্রেম আমাকে বিস্মিত করে।]

এরকম একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে, কবিতা বোঝার আগেই স্পর্শ করে। জীবনানন্দ দাশের ‌'আট বছর আগের একদিন' কবিতাটি সম্বন্ধেও সম্ভবত এ কথা বলা যায়। প্রথম পাঠের সময় যে-কোনো পাঠকের কাছে কবিতাটি তার সম্পূর্ণতা নিয়ে ধরা না-ও দিতে পারে, কিন্তু এই পাঠ যে ঘোরটি তৈরি করবে তার মনে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে তার পক্ষে। ফলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে কবিতাটির কাছে, আর বারবার পড়ার পর হয়তো তার মনে জীবন সম্বন্ধে একটি অনির্বচনীয় বোধ তৈরি হবে; আর এই বোধ তখন এতটাই তীব্র হয়ে উঠবে যে, কবিতাটির অপূর্ব নির্মাণ-কৌশল তার দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে হয়তো। নির্মাণ কৌশল মানে - এর ভাষা, ছন্দ, শব্দ ব্যবহার; চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির ব্যবহার। আর 'ভালো' কবিতার এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এর নির্মাণ-কলা এমন এক কৌশলে কবিতার সঙ্গে মোলায়েমভাবে মিশে থাকে, যে, পাঠকের জন্য সেটি কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করে না। পাঠক ভুলেই থাকে যে, এই কবিতাটির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় কবির তীব্র সচেতনতা ছিলো, নির্মাণ কৌশল নিয়ে তাঁকে প্রচুর ভাবতে হয়েছে।

এই কবিতাটি খেয়াল করা যাক : এটি শুরু হয়েছে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে -

শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ।

মনে হচ্ছে কবি এখানে নিজেকে আড়াল করে যে-কোনো একজন ব্যক্তির গল্প বলছেন। গল্পকাররা যেমন করে নিজেকে আড়ালে এবং সর্বজ্ঞ অবস্থানে রেখে চরিত্র সম্বন্ধে কথা বলে যান, অনেকটা সেইরকম। এমনকি চরিত্রগুলোর মনের কথাও তিনি জানেন, কিন্তু যেহেতু তিনি প্রকাশ্য হন না কখনো, তাই পাঠকরা লেখকের উপস্থিতি বুঝতে পারেন না। এমনকি, কখনো মনে এই প্রশ্নও জাগে না যে, এই গল্পটি আসলে কে বলছেন! বা যিনিই বলুন না কেন, তিনি গল্পের পাত্র-পাত্রীর মনের কথা পর্যন্ত কীভাবে জেনে ফেললেন!

এর পরের পংক্তিগুলো খেয়াল করুন, এবার লোকটির পরিচয় দেয়া হচ্ছে :

বধূ শুয়ে ছিলো পাশে - শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিল, আশা ছিলো-

অর্থাৎ লোকটি সংসারী মানুষ। বধূ এবং শিশু আছে। এবং তারা পাশেই আছে। প্রেম আছে, আশাও আছে। ক্রমগুলো খেয়াল করুন - বধূর সঙ্গে প্রেম, শিশুর সঙ্গে আশা। অর্থাৎ বধূর সঙ্গে প্রেমই থাকে, আর শিশুকে ঘিরে থাকে আশা। কিন্তু এর পরের পংক্তিগুলো এই ইঙ্গিত দেয় যে, এই সংসারী মানুষটির জীবনে কোথাও কোনো একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে, - 'তাই হয়নি ঘুম বহুকাল।' এই ঘুম চেয়েছিলো কী না সে নিয়ে সংশয়পূর্ণ ভাষ্যও দেয়া হচ্ছে।

বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো - জোৎস্নায়, - তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি !
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবে না আর।

এরপরে জীবনানন্দ একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ঊর্ধ্ব-কমার ( ' ' ) মধ্যে কতোগুলো কথা বলে, জানালেন, এই কথাগুলো তাকে বলেছিলো 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে' -

'কোনোদিন জাগিবে না আর
জানিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম - অবিরাম ভার
সহিবে না আর - '
এই কথা বলেছিলো তারে
চাঁদ ডুবে চলে গেলে - অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।

এরকম একজন 'সুখী' সংসারী মানুষের কাছে যখন 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে' এরকম কথা বলে, আর সে সেই কথায় সাড়া দিয়ে চলে যায়- বোঝা যায়, প্রশ্নবোধক চিহ্নটি সত্যিই ছিলো।

এরপর তিনি আরেকটি অভূতপূর্ব কাণ্ড করলেন। আমাদের চারপাশের প্রকৃতির তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণীকূলের জীবন-তৃষ্ণা আঁকলেন এক অসামান্য ভঙ্গিতে, এই পঙক্তিগুলোতে :

তবুও তো প্যাঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায় - অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।

ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন - যেন কোন বিকীর্ণ জীবন
অধিকার করে আছে ইহাদের মন;
দূরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;


গলিত স্থবির ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িঙ - এসবই যেন বেঁচে থাকবার জন্য এক প্রাণপন লড়াইয়ে নেমেছে। চিত্রকল্পগুলোও অসামান্য। 'দূরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ' পঙক্তিটি পড়ার সাথে সাথেই কি এরকম একটি দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে ওঠে না? কিংবা 'মশারীর ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা' সত্ত্বেও মশারা যে রাতভর সেটি ভেদ করে জীবনের আয়োজন করতে চায়, সেই দৃশ্যও তো আমাদের চোখে ভাসিয়ে তোলে ওই লাইনগুলো। তো, এই যে এতসব জীবনের আয়োজন আমাদের চারপাশে ছড়ানো, এর কোনোকিছুই কি সে দেখেনি? কবি লোকটির সঙ্গে এই সমস্ত ঘটনার সম্পর্কসূত্র নির্মাণ করছেন এভাবে :

চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা - একা;

ওই 'তবু' শব্দটিই বলে দেয় - সে দেখেছে বটে, কিন্তু তার জীবনটি যে মানুষের; ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িঙের নয়! আর তাই, কবি উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ পঙক্তি :

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা
এই জেনে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো : এই পঙক্তিগুলোর আগ পর্যন্ত কবি লোকটির সঙ্গে নিজেকে বিযুক্ত রেখেছেন, আড়ালে রেখেছেন, দূরে থেকে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু এইখানটায় এসে তিনি সরাসরি লোকটিকে সম্বোধন করছেন, এবং আমরা দেখবো, এই সম্বোধন চলতে থাকবে এরপরও।

লোকটি যে গেল দড়ি হাতে, তাতে কেউ কি কোনো প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেনি? তিনি আবারও প্রকৃতির অনুষঙ্গ টেনে এভাবে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করছেন :

অশ্বথের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে
বলেনি কি : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার! -
ধরা যাক দু -একটা ইঁদুর এবার!'
জানায়নি প্যাঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?

এবং জানাচ্ছেন, সবই দেখেছে সে, তবু :

জীবনের এই স্বাদ - সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের -
তোমার অসহ্য বোধ হলো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে - গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

কি হয়েছিলো লোকটির? কেন সে মরতে গেলো? জীবনের কোথায় ফাঁক ছিলো তার? প্রশ্নবোধক চিহ্নটাই বা কি বা কোথায়? তার এই আত্নহত্যার কারণই বা কি? দাম্পত্য সম্পর্ক, অভাব, দারিদ্র, পরাজয়, গ্লানি? এই বিষয়গুলো জানাতেই তিনি এবার কথা বলছেন সরাসরি পাঠকের সঙ্গে :

শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; - কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যার্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোন খাদ,
সময়ের উর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ
মধু - আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;

অর্থাৎ কোথাও কোনো ব্যর্থতা নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো তিনি এই ব্যর্থতাহীনতার কথা বলে একই টানে বলে যাচ্ছেন আরেকটি কথাও :

তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ' পরে।

এর মানে কি? নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়নি, বিবাহিত জীবনের সাধ পূরণ করেছে কোনো খাদ না রেখেই, বধূ মধু ও মনন দুই-ই জানতে দিয়েছে (অর্থাৎ বউ শুধু শরীরের সঙ্গীই হয়নি, মননেরও হয়েছে!), কোনোদিন ক্ষুধার কষ্ট পায়নি - 'তাই' তাকে মরতে হলো! তার মানে কি এই যে, এত এত সাফল্য না থাকলে তাকে মরতে হতো না? তার মানে কি এই যে, জীবনে কিছু কিছু ব্যর্থতা থাকা ভালো?

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তিনি এইভাবে, (এবং এবার আর নিজেকে তিনি আড়াল করছেন না, সরাসরিই নিজের উপলব্ধির কথা জানাচ্ছেন) :

জানি - তবু জানি
নারীর হৃদয় - প্রেম - শিশু - গৃহ - নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় -
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে;
ক্লান্ত - ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে।

অর্থাৎ, জীবন-বর্ণনার জন্য আমরা সচরাচর যে সব বিষয় নিয়ে কথা বলি; আমাদের ক্লান্তি, আমাদের পরাজয়, আমাদের হতাশা, আমাদের দুঃখ ও বেদনা, আমাদের হাহাকার, আমাদের প্রেম-আশা-সুখ ও সাফল্য ইত্যাদি - এসবকিছুর বাইরে খুব গোপনে-গভীরে এক 'বিপন্ন বিস্ময়' থাকে।

কি সেই বিস্ময়?

কবি সে সম্বন্ধে পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন সেই বিস্ময় খুঁজে দেখার ভার।

হয়তো সেই বিস্ময় আমাদের অস্তিত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নবালী থেকে উদ্ভুত। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, এই পৃথিবীতে আমার ভূমিকা কী, আমার অস্তিত্বের অর্থ কী, আমি না থাকলে কী হতো, আমার অস্তিত্বহীনতায় এই পৃথিবীর আদৌ কিছু যেত-আসতো কী না, আমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীকে এমন কী তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, এই জীবন শেষে আমি কোথায় যাবো, জীবন মানে কি মাত্র এই কয়েকদিনের খেলা যা দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়, মৃত্যুই যদি একমাত্র অনিবার্য সত্য হয় তাহলে এই জীবনের এত এতসব কর্মকাণ্ডের অর্থ কী - এইরকম প্রশ্নের তো শেষ নেই। এবং প্রশ্নগুলোর উত্তরও নেই। প্রশ্নগুলো তাই কোনো সমাধান না দিয়ে বরং এক 'বিপন্ন বিস্ময়' জন্ম দেয় মনে।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো - কবি এখানেই থামেননি। লোকটির আত্নহত্যা, তার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখে এবং 'বিপন্ন বিস্ময়ের' মতো একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে পাঠককে ছেড়ে দিয়ে তিনি এবার নিজের কথা বলছেন :

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বথের ডালে বসে এসে,
চোখ পালটায়ে কয় : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার !
ধরা যাক দু - একটা ইঁদুর এবার -'

হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব - বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব
কালীদহে বেনো জলে পার;
আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

অর্থাৎ ওই লোকের যা হয়েছে, তা তো হয়েছেই, আমার জীবন তাতে থেমে থাকবে কেন! আমি বরং ' চেয়ে দেখি'...। এবং ওইসব সত্য জানার পর তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, জীবনের 'প্রচুর ভাঁড়ার' শূন্য না করা পর্যন্ত তিনি যাচ্ছেন না। থেকে যাবেন এখানেই, এই 'বিপন্ন বিস্ময়'মাখা জীবন নিয়ে এই আলোছায়াময় পৃথিবীতেই।

আর এইখানটাতে এসে কবিতাটি খুব জীবনবাদী হয়ে ওঠে।

জীবনে অনেক কবিতা পড়েছি - মৃত্যু আর জীবনের এমন অসামান্য মূল্যায়ন আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।


..........................................................
সম্পূর্ণ কবিতাটি একবার একসঙ্গে পড়ে নেয়া যাক :


শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ।

বধূ শুয়ে ছিলো পাশে - শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো - জোৎস্নায়, - তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি !
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবে না আর।

'কোনোদিন জাগিবে না আর
জানিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম - অবিরাম ভার
সহিবে না আর - '
এই কথা বলেছিলো তারে
চাঁদ ডুবে চলে গেলে - অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।

তবুও তো প্যাঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায় - অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।

ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন - যেন কোন বিকীর্ণ জীবন
অধিকার করে আছে ইহাদের মন;
দূরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা - একা;
যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা
এই জেনে।

অশ্বথের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে
বলেনি কি : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার! -
ধরা যাক দু -একটা ইঁদুর এবার!'
জানায়নি প্যাঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?

জীবনের এই স্বাদ - সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের -
তোমার অসহ্য বোধ হলো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে - গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; - কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যার্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখে নি কোন খাদ,
সময়ের উর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ
মধু - আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ' পরে।

জানি - তবু জানি
নারীর হৃদয় - প্রেম - শিশু - গৃহ - নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় -
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে;
ক্লান্ত - ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে।

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বথের ডালে বসে এসে,
চোখ পালটায়ে কয় : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার !
ধরা যাক দু - একটা ইঁদুর এবার -'

হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব - বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব
কালীদহে বেনো জলে পার;
আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন